নারগিস (৯)

ওই দুইটা আমার বয়সী মেয়ে একজন আরেকজনকে জড়ায়ে ধরে থর থর করে কাঁপতেছে। তাদের চোখেমুখে কী ভয়ঙ্কর আতঙ্ক!

আগের কিস্তি প্রথম কিস্তি

২৬.
নারগিসের আনা স্কেলটা অদ্ভুত সুন্দর।  স্কেলের একপাশে সোজা দাগ টানার জায়গা, অন্যপাশে ঢেউয়ের মতন খাঁজকাটা। ভেতরে পারদের মতন কোন একটা তরলের মধ্যে অনেক ছোট ছোট তারার মতন জরি। স্কেলের মাথায় একটা ছোট্ট ম্যাগনিফাইং গ্লাস বসানো। কোনো কিছুর ওপরে ধরলে সেটাকে অনেক বড় দেখা যায়। দশদিন টানা বিছানায় শুয়ে থাকার পর আবার যখন কুয়ার পাশে বসার অনুমতি পাইলাম তখন ওই স্কেলই হল সময় কাটানোর প্রধান অনুষঙ্গ।

যে কোনো জিনিস—মাটি, ফুল, পাতা যে কোনো জিনিসের ওপরে ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা ধরলে সেটার চেহারাই বদলে যায়। অনেক নতুন নতুন জিনিস দেখা যায়। নতুন রঙ পাওয়া যায়। আবার সূর্যের আলো ম্যাগনিফাইং গ্লাসের ওপরে ধরলে নিচে একটা কাগজ, পাতা বা পোড়ানোর মত কিছু রাখলে সেটায় আগুন ধরে যায়।

কুয়ার পাশে মাটির ছোট ছোট উঁচু নিচু ঢিবি ধরে সারি সারি পিঁপড়ার লাইন। পত্রিকার কাগজ পোড়াতে পোড়াতে আলোটা এনে ওদের গায়ে ধরলাম। সঙ্গে সঙ্গে ফট ফট শব্দ করে পিঁপড়াগুলো পুড়তে থাকল।

হঠাৎ একটা বাজখাই গলার শব্দ শুনে আমি কেঁপে উঠলাম। স্কেলটা সরে গেল আগের জায়গা থেকে।

—এটা কী ধরনের কাজ?

চোখ তুলে দেখলাম মোটা ফ্রেম চশমাওয়ালা সাজ্জাদ কোমরে দুই হাত রেখে দাঁড়ানো। আবারো বলল, এটা কী ধরনের কাজ? কোনো সুস্থ মানুষ কাউকে পোড়ায়ে মারে?

আমার যেন একটা হার্টবিট মিস হয়ে গেল। আমি কী বলব বুঝে উঠতে পারলাম না।

সাজ্জাদ বলল, একমাত্র মানসিক ভাবে অসুস্থ মানুষই এ রকম একটা কাজ করতে পারে। পিপড়াগুলা তোমার কী ক্ষতি করল? তোমার শারীরিক অসুস্থতা একটা মানসিক বিকারে রূপ নিচ্ছে। তুমি বাসায় থাকতে থাকতে খুব পেরেশান হয়ে গেছ। কিন্তু তোমার যা রোগ, এখন তো একটু রেস্ট নিতেই হবে। তোমাকে আমি একটা বই দিলাম। পড়ছিলা?

আমি হ‍্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম। বাকি লেকচার আমার মাথার ওপর দিয়ে গেল।

সাজ্জাদ বলল, একটা মাছকে ভালোবেসে লোকটা নিজের জীবন বিপন্ন করে ফেলল। আর তুমি সেই বই পড়ার পরেও কোনো প্রাণীকে এভাবে মারতে পারলা? তুমি আসলে বইটা পড়ো নাই, তাই না?

আমি মৃদুস্বরে বললাম, পড়ছি। ভাল। লাগে। নাই।

সাজ্জাদ হাত পা ছুঁড়ে বক্তৃতা করা শুরু করল, ভাল লাগে নাই? ভাল লাগে নাই মানে? একটা নোবেল প্রাইজ পাওয়া বই, আর তোমার নাকি ভাল লাগে নাই—এইটা একটা কথা হইল! তুমি বুঝছ তুমি কী বলতেছ? এই যে লোকটা বোরড, তোমারও তো একই অবস্থা—বোরড। ও তোমারে তো আবার বেশি কিছু বলা যাবে না, মাথা ঘুরায়ে যাবে।

এই প্রথম আমি মাথা তুলে তাকালাম। রোদ ভালই, সূর্যটা ঠিক সাজ্জাদের মুখের পাশে, তাই নাক মুখ কুঁচকে গেল। বললাম, মানুষের অসুস্থতা নিয়ে ফাজলামো করা ঠিক না।

সাজ্জাদ হেসে ফেলল। সূর্যের আলোর সাথে সাজ্জাদের দাঁতের কিছু একটা মিশে গেল, ওর হাসির সাথে সাথে শরীর দুলতেছিল। হঠাৎ মনে হইল ওর শরীর থেকে একটা অদ্ভুত আলো বের হইতেছে। হঠাৎ মনে হইল আমার বুকের মধ্যে কী একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি হইছে। আর ওই ফাঁকা জায়গা যেন অদ্ভুতভাবে কাঁপতে শুরু করল। পেটের মধ্যে যেন প্রজাপতি দৌড়াতে শুরু করল আর আমি দৌড়ে বাসায় চলে গেলাম।

পেছনে সাজ্জাদ ডাকতে থাকল, এই মেয়ে, বই ফেরত দাও, এই! রাগ করো কেন?

২৭.
বিলিরুবিন কমে জণ্ডিস ঠিক হয়ে আসল। আমার বাপ মা তখনো ঢাকা থেকে ফিরে নাই। আমি একটু একটু ঘোরাঘুরি করা শুরু করলাম। সাজ্জাদের বই এনে এনে পড়ে শেষ করলাম।

প্রায় সময়ই সাজ্জাদ থাকে না বাসায়। থাকে ওর ছোট ভাই বাবু। ওর সাথেও আমার খুব ভাল খাতির হয়ে গেল। সাজ্জাদকে দেখলে আমার খুব লজ্জা লাগে। কিন্তু ওর ভাইদের সাথে কোনো দ্বিধা কাজ করে না। তাই আমার যত গল্প সব সাজ্জাদের বড় ভাই ওমর আর ছোট ভাই বাবুর সাথে। তবে ওমর বাসায় থাকত না বেশি একটা, বাসায় থাকত বাবু।

বাবুর চেহারা ওর নামের মতই। সাজ্জাদের চেহারার সাথে কোনো মিল নাই। সাজ্জাদ ফর্সার ফর্সা আর বাবু কেমন যেন খুব কালো হতে গিয়েও একটুর জন্য বেঁচে গেছে।

ও নিজেকে বলে—বিউটিফুল ব্রাউন। মাথায় সবসময় একটা G লেখা ক্যাপ পরে থাকে। হাতে শিকলের মত চেইন পরে। আর বাসায় সারাদিন ইংরেজি গান শোনে আর টিভিতে কীসব হাবিজাবি শো দেখে।

ওর সাথে আমার খুবই ভাব জমল। অল্প কয়েকদিনেই বাবুর সব বন্ধু-বান্ধবের নাম আমার মুখস্থ হয়ে গেল। তবে বাবুর কাছ থেকে আমি সব সময় সাজ্জাদের ব্যাপারে জানতে চাইতাম। সব গালগল্পের মাঝখানে ওই একটা চরিত্রকেই আমি কেন্দ্রে দেখতে পাইতাম।

সাজ্জাদ যখন থাকত না, আমি ওর বইপত্র ঘাটতাম, হাতের লেখা দেখতাম। ওর বালিশ বিছানার দিকে তাকায়ে থাকতাম, আর দেখা হলে কী কী বলব তা মনে মনে প্র্যাকটিস করতাম।

আর সাজ্জাদ আমার সামনে এসে পড়ামাত্র  এর সবকিছুই গুবলেট পাকায়ে যায়। আমি প্র্যাকটিস করা কোনো কিছু বলতে তো পারিই না, উল্টো যখন সাজ্জাদ আমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করে তখন আমার মাথায় সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। কথা বলতে গেলেই গলার স্বর কেমন আটকে গিয়ে খসখসে হয়ে যায়। আমি বারবার গলা খাঁকারি দিয়ে কণ্ঠ ঠিক করার চেষ্টা করি, ঠিক হয় না। আর স্টুপিডের মতন কোনো একটা উত্তর দিয়ে ফেলি। উত্তর দিয়ে ফেলার পরেই আমি বুঝি ওইটা ঠিক হয় নাই আর আমার চেহারাটাও আমি যে রকম বানায়ে রাখছি তাতে আমাকে আমার কথাবার্তার মতই স্টুপিড দেখাচ্ছে।

তবে সাজ্জাদের কথায় কখনোই কোনো আড়ষ্টতা নাই। ও ওর মতই সবসময় আকাশ-বাতাস, হাবিজাবি, অমুক বই, তমুক লেখক নিয়ে কথা বলে ননস্টপ। আমি ওর কথা শুনতে ভালবাসি, কিন্তু ওর মুখের দিকে তাকাই না।

কিন্তু হঠাৎ একদিন ওর মুখের দিকে তাকালাম। কারণ সেদিন সাজ্জাদ বলল, আচ্ছা একটা কথা বলি তোমাকে, বাবুর সাথে বেশি মিশবা না। খুব সুন্দর নীল রঙের একটা সোয়েটার গায়ে দিয়ে সাজ্জাদ। ওর চশমার ফ্রেমটাও নীল আর নতুন মনে হইল।

আমি বললাম, কেন?

সাজ্জাদ বলল, না  মানে এমনি। ওর কিন্তু খারাপ অভ্যাস আছে। নেশা করে। তুমি কথা বললে বলো। নেশা করতে যেও না।

বাবু সিগারেট খায় সেটা ঠিক। কিন্তু সিগারেটকে এত খারাপভাবে নেয়ার কী আছে আমি বুঝলাম না। বাবুর সাথে ঘুরতে বরং আমার ভালই লাগে। আমি সাজ্জাদকে কোনো উত্তর দিলাম না। মনে মনে বললাম, তোমার নেশা করেই তো বাঁচি না!

একদিন বিকেলে বাবু আমাকে বলল, চল তোমাকে নিয়ে বেড়াতে যাই। তোমার কি বেড়াতে যাবার পারমিশন আছে?

আমি বললাম, কোথায়? কাছে কোথাও হলে যেতে পারি, দূরে যাব না।

বাবু বলল, কাছেই।  চল।

আমি এর আগেও বাবুর সাথে বেড়াতে গেছি। প্রায় সময়ই ও একটা বিশাল মাঠে আড্ডা দেয়। খুবই সুন্দর সে মাঠ। চারপাশে পাহাড়, আর মাঝখানে বিশাল সবুজ মাঠ। সেখানে কেউ একপাশে ফুটবল খেলে, আরেকপাশে ক্রিকেট, আবার এক কোণায় গরু ঘাস খায়। মেয়েরা কুতকুত খেলে। মহিলারা মরিচ শুকায়। বাবু মাঠের কোণার বেঞ্চে আমাকে বসায়ে রেখে বন্ধুদের সাথে কথা বলতে চলে যায়। এই মাঠটা আমার খুব ভাল লাগে। উপরে অনেকটুকু নীল আকাশ দেখা যায়।

আমি বাবুকে জিজ্ঞাসা করলাম, কোথায় যাবা? মাঠে?

বাবু বলল, না, মজা দেখাব তোমাকে। ওই এলাকার কাছেই।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা মাঠ ছেড়ে এবার একটা কলোনির মধ্যে ঢুকে পড়লাম। ধুলায় ধুলাময় অলিগলি, আর দুইপাশে পুরানো সাদা বিল্ডিং। সরকারি কলোনি।

বিল্ডিংগুলো চারতলা করে হলেও বারান্দাগুলোতে বাঁশের বেড়া লাগানো। আর ঘরে ঘরে কেমন অযত্ন আর কিপটামির ছাপ। কোনো একটা বিল্ডিং দেখলাম না যেটাতে ঢোকার পথ বা সিঁড়িঘর সুন্দর। এমনকি যে সব ছেলেমেয়ে বাইরে খেলতেছে তাদের জামাকাপড়ও কেমন পুরানো, মলিন আর ছেঁড়াবেড়া। বোতামের ঘরে বোতাম নাই, প্যান্টের জিপারের জায়গায় বড় সেফটিপিন লাগানো।

এ সমস্ত দৃশ্য পার করে আমরা একটা অন্ধকার সিঁড়িঘর বেয়ে দোতলায় উঠলাম। কালো রঙের ওপর লাল বোতাম বসানো কলিংবেল চাপলাম। দুই পাল্লার দরজার একটা খুলে গেল। কেউ একজন আমাদেরকে ভেতরে বসতে বলল। আমরা যেখানে বসলাম সেটা আসলে বারান্দা। সেখানেও খোলা অংশে বাঁশের বেড়া লাগানো। এটাকে তারা এই অদ্ভুত উপায়ে ড্রইং রুম বানাইছে। আমাকে অদ্ভুত ড্রইং রুমে বসায়ে বাবু ভিতরে চলে গেল। আবার দশ সেকেণ্ডের মাথায় ফিরেও আসল। আমি দেখলাম একটা বয়স্ক ভদ্রলোক পায়চারি করতে করতে এই রুম পর্যন্ত এসে আবার ফিরে গেল। আবার যখন লোকটা পায়চারি করতে করতে আসল আর এই রুমে বাবুর দিকে উঁকি দিল, বাবু তখন চোখ লাল করে দেয়ালের দিকে চোখ রেখে বলল, কোনো লাভ হবে না।

লোকটা ঘুরে আবার আসল, এবার বলল, বাবা এইবার, এই শেষবার।

বাবু ওদিকে না তাকায়েই বলল, কোনো শেষমেশ নাই। এ বাসায় দুইটা মেয়ে। ভয় পান না?

লোকটা কিছু না বলে আবার চলে গেল। ফিরে আসল মুহূর্ত পরেই। বলল, বাবা…।

সঙ্গে সঙ্গে কালো জ্যাকেট সরায়ে একটা কী যেন বের করল বাবু। আর খুব শব্দ করেই সেটা সামনের টেবিলের ওপর রাখল।

আমি ভয়ে কাঁপতে শুরু করলাম। একটা কালো রিভলবার।

বাবু এখানে ভয় দেখাতে আসছে! আমার মাথা বন বন করে ঘুরতে শুরু করল।

আমি দেখলাম আমার সামনের বয়স্ক ভদ্রলোক থর থর করে কাঁপতেছে। কাঁপতে কাঁপতেই পাঁচ ছয়টা বাদামি রঙের প্যাকেট টেবিলটার ওপর রাখলো। প্যাকেটগুলা খুব আয়েশ করে খুলল বাবু। তারপর মুখের থুতু তর্জনীর আগায় লাগায়ে টাকা গুনতে শুরু করল। আমার দিকে একটা প্যাকেট আগায়ে বলল, গুনতে চাও?

টাকা গোনা শেষে প্যাকেটগুলি আবার আগের মত গুছায়ে জ্যাকেটের পকেটে ভালোমত সেট করে রিভলবারটা বাম হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল বাবু। তারপর শিস দিতে দিতে বের হয়ে গেল। আমি ওর পেছনে পেছনে বের হতে গিয়ে দেখলাম ওই দুইটা আমার বয়সী মেয়ে একজন আরেকজনকে জড়ায়ে ধরে থর থর করে কাঁপতেছে। তাদের চোখেমুখে কী ভয়ঙ্কর আতঙ্ক!

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই পিস্তলটা আবার জ্যাকেটের মধ্যে লুকায়ে ফেলল বাবু। বলল, মজা আরো বাকি আছে। ওয়েট।

এবার আমি কান্নাভেজা গলায় বললাম, আমি বাসায় যাব।

বাবু আমার দিকে তার লাল চোখ সরু করে তাক করে বলল, ধুর!

বলতে বলতে জোরে জোরে হেঁটে অলিগলি পার হয়ে আরো সরু একটা রাস্তায় চলে গেল বাবু। আমি ওর পেছনে পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে রাস্তা চেনার চেষ্টা করলাম। বাসার রাস্তা চিনতে পারলে নিজেই দৌড়ে চলে যাব। কিন্তু কিছুই চিনতে পারলাম না।

মাঠটার কোনো নাম নিশানাও দেখলাম না। এমন সময় বাবু দুই বিল্ডিংয়ের মাঝখানের একটা চিপা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়ে গেল। দুইটা জ্যাকেট পরা লোক সামনে এসে দাঁড়ালো তখন। দুইজনের মুখেই চাঁপদাড়ি। চোখগুলা অসম্ভব ধূর্ত। বাবু জ্যাকেট থেকে টাকার প্যাকেটগুলা বের করে ওদেরকে দিল। আর ওরাও ফটাফট সেগুলা নিজেদের পোশাকের মধ্যে লুকায়ে ফেলল। একজন টাকা নিজের পোশাকে ঢুকাচ্ছে, আরেকজন বাবুর হাতে ছোট ছোট প্লাস্টিকে মোড়ানো পাউডারের মত কোনো একটা জিনিসের প্যাকেট দিচ্ছে। বাবু প্রথমে সেগুলো নিজের পকেটে ঢুকালো, তারপর কী মনে করে আমার কাছে এসে নিজের পকেট থেকে প্যাকেটগুলা বের করে আমার সোয়েটারের পকেটে রেখে দিল। আর রিভলবারটা ওদের দিয়ে একটা অট্টহাসি দিল।

আমি ততক্ষণে ফোঁপাচ্ছি। আমি কোনোভাবেই কাঁদতে চাচ্ছিলাম না। আমাকে ও রকম স্টুপিডের মতন দেখাক, অসহায় দেখাক তাও চাচ্ছিলাম না। কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা আমার নাই, এটার কারণেই যেন আমার সবচেয়ে বেশি কান্না পাইতেছিল। আমার মন তখন কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এক ভাগ বলতেছে, চুপ থাক, ধৈর্য্য ধরো, ঠাণ্ডা মাথায় ভাবো কী করা যায়। আরেক মন তখন পাগলের মত দৌড়াচ্ছে। এবং এ দ্বিতীয় ভাগের কারণে প্রথম মন কিছুতেই ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করতে পারতেছে না।

ঘটনাগুলা খুব দ্রুত ঘটল। আমরা এসব রাস্তা ঝড়ের গতিতে পার করে এসে মাঠে এসে পড়লাম। মাঠ পার হয়ে মেইন রোডে নামার আগে বাবু আমাকে বলল, তুমি সাজ্জাদের প্রেমে পড়ছো। আমি জানি। তুমি যদি আজকের ঘটনা কাউকে বলো, আমার বাসায় কিংবা তোমার বাসায়, আমি তোমার ব্যাপারটা সাজ্জাদকে বলে দিব। সাজ্জাদের বান্ধবী আছে, সুতরাং ও তোমাকে জীবনেও পছন্দ করবে না। উল্টা কথাই বলবে না আর কোনোদিন। সুতরাং, একদম চুপ থাকবা। ওকে?

এই কথা শোনার পরে আমার চোখ থেকে আমার অনিচ্ছায় আর কোনো পানি গড়াল না। আমার দ্বিতীয় ভাগের মন একদম ঠাণ্ডা হয়ে গেল। আমি শক্ত এবং শান্ত হয়ে গেলাম। বাবুকে আমি বন্ধু ভাবতাম। সে কখনোই ভাবে নাই—বিষয়টা এতটুকুই।

বড় রাস্তা পার হবার আগেই ৩/৪ জন পুলিশ এসে বাবুকে ঘিরে ফেলল।

ও বলল, কী ব্যাপার? কী ব্যাপার?

পুলিশ কিছু না শুনেই ওর জামাকাপড়, পুরা শরীর হাতড়াতে শুরু করল। সার্চ করতে করতে বলল, মনসুরের বাসা থেকে কত টাকা আনছস? টাকা কই? কী করছস?

বাবু খুব ভাল মানুষের মতন বলল, আমি তো মনসুর টনসুরের বাসায় যাই নাই। মাঠে গেছিলাম খেলতে। এইগুলা কী, এইগুলা কী, আমার নামে মিথ্যা কথা বলে এলাকার মানুষ। আমি তো এখন কিছু করি না। তারপরেও কেন এ রকম বলে!

আমি পাশেই দাঁড়ায়ে সব দেখলাম এবং শুনলাম। আমাকে কেউ খেয়াল করল না। বাবুকে ছেড়ে দিল। বাবু বাসায় এসে আমার সোয়েটারের পকেট থেকে সব প্যাকেট নিয়ে ওর টেবিলের ড্রয়ারে আমার সামনেই তালা মেরে রাখল। আর তারপরই হঠাৎ আমাকে শক্ত করে জড়ায়ে ধরে গালে একটা খুব জোরে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করল। আমি দৌড়ে বাসায় চলে আসলাম।

সেদিন, সারারাত এবং তার পরের দিন সারাদিন রাত কাঁদলাম। কিছু খাই নাই। ফুপু অনেকবার জিজ্ঞেস করছে, কী হইছে।

আমি উত্তর দেই নাই।

ফুপু আমার আব্বাকে ফোন দিল, তোমার মেয়ে দিনরাত কানতেছে। কী সমস্যা তোমাদের? গেছ তো গেছ আর আসার নাম নাই। মেয়ে একটা আছে ভুলে গেছ নাকি?

আব্বা কী বলল জানি না। ফুপু সকালে অফিসে যাওয়ার পরে আমি দরজার সামনেই বসে থাকলাম মোড়া নিয়ে। সাজ্জাদকে দেখামাত্র ডেকে বললাম, জরুরি কথা আছে। পেয়ারা গাছের ওখানে আসেন।

পেয়ারা গাছের নিচে কলোনির আর কোনো ছেলেমেয়ে নাই। সাজ্জাদ বলল, এই জায়গাটা সুন্দর খুব, তাই না?

সাজ্জাদের চুল তখন এলোমেলো। একটা সাদা শার্ট গায়ে দেয়া। আমি ওর দিকে একবার তাকায়েই দুদিন আগের সমস্ত ঘটনা ওকে খুলে বললাম। কোন ড্রয়ারে বাবু সেই প্যাকেটগুলো রাখছিল সেটাও। শুধু বললাম না দুইটা কথা।

এক—বাবু সাজ্জাদকে আমার ব্যাপারে কী বলবে বলছিল।

দুই—বাসায় আসার পর বাবু আমাকে জড়ায়ে ধরে কী করতে চাইছিল।

সাজ্জাদ খুব গম্ভীর হয়ে গেল। ওর ফর্সা মুখ লাল আভায় ভরে গেল। কানগুলোও লাল হয়ে গেল রাগে। বলল, বাবা না থাকলে অনেক সমস্যা হয় ছেলেদের। তাদের বড় হওয়াটা পরিপূর্ণ হয় না। বাবা হল ছেলেদের রোল মডেল, হিরো। আমার ছোট ভাইটা কোনো রোলমডেল পায় নাই তো ছোটবেলা থেকে, তাই মাস্তানদেরকেই হিরো মনে করে নিছে।

মাটির দিকে তাকায়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সাজ্জাদ। তারপর আমার দিকে তাকায়ে বলল,  তুমি আজকেই তোমার বাসায় চলে যাও। আরেকটা কথা, আর কখনো এখানে মানে তোমার ফুপুর বাসায় আসবা না।  এক মুহূর্তের জন্যও না।

সাজ্জাদের চোখে সেই নীল ফ্রেমের চশমা। গায়ে সাদা শার্ট। চুলগুলো এলোমেলো। চোখের কোণে একটু পানি আছে কি? চশমার কারণে ঠিক বোঝা গেল না।

(কিস্তি ১০)

More from পারমিতা হিম

নারগিস (৩)

আন্টি বলল, দেখ প্রেম করো, যাই করো, তোমার আব্বার বয়সী লোকের সাথে...
Read More