বনলতার অলঙ্কার মূল্যায়ন

চূড়ান্ত উপমা বা তুলনাটা দুইটা ফিজিক্যাল জিনিসের মধ্যে নয়, তাদের নিজ নিজ উপমাদের মধ্যে।

জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ কবিতার অলঙ্কার নিয়ে চঞ্চল আশরাফ এবং সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের মধ্যে সাম্প্রতিক মতবিরোধ আমাদের জন্য একটা রাস্তা খুলে দিয়েছে কবিতাটার অলঙ্কার নিয়ে পর্যালোচনা করবার। প্রথমে তাদের মতবিরোধের বিষয়টি এবং সঙ্গে তাদের নিজ নিজ মতের সার অংশ তুলে ধরছি। তারপরে আসব আমাদের প্রস্তাব ও আলোচনায়। সম্প্রতি চঞ্চল আশরাফ ফেইসবুকে ‘পাঠ : বনলতা সেন/২০০৭’ নামে একটা লেখা ছেপেছেন, যেখানে—

“চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর
হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে : এতদিন কোথায় ছিলেন?
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।”

‘বনলতা সেন’ কবিতার এই লাইনগুলো তুলে দিয়ে বলেছেন, “বনলতা সেনের এই বর্ণনায় রয়েছে হাইপারবৌল বা অতিশয়োক্তি:…।” সে লেখার উত্তরে সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ বলেছেন, “অতিশয়োক্তি নামে একটা অলঙ্কার আছে, তা পশ্চিমা হাইপারবোলের তরজমা নয়, বা তার ভাবধারকও নয়। এ-দুই অলঙ্কারের কোনো আত্মীয়সম্পর্ক নাই।” আরও বললেন, “[…] হাইপারবোলি বা হাইপারবোল-ও আমি এই রচনাংশে বড় একটা দেখতে পাই নি। […]। এই কবিতাংশে বাক্যগুলির উদ্দেশ্যই হাইপারবোলি-মূলক নয়। এগুলি এক ধরনের প্রলম্বিত লুপ্তোপমা বা উৎপ্রেক্ষা।” প্রত্যুত্তরে চঞ্চল আশরাফ বলেছেন, “ভাষাবিজ্ঞানে হাইপারবৌল টার্মটি বাঙলায় শেষ পর্যন্ত অতিশয়োক্তিই, তবে অত্যুক্তিও বলা যেতে পারে। “তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে” এটাও হাইপারবৌল, কারণ অন্ধকারে কাউকে দেখতে পাওয়া যেমন মুশকিল, তার চেয়ে বেশি কঠিন এবং অসম্ভব ওই অভিজ্ঞতা থেকে তার চেহারার বর্ণনা দেয়া। […। …] এই কবিতা শুরুই হয়েছে হাইপারবৌল দিয়ে: ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ  হাঁটিতেছি’…।”

আপাত পাঠে মনে হতে পারে সর্বতই চঞ্চল আশরাফ এবং সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ দুইটা বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছেন ওই লাইনগুলোতে ব্যবহৃত অলঙ্কার বিষয়ে। কারণ,  চঞ্চল ওই অলঙ্কারগুলোকে বলছেন, হাইপারবোলি বা অতিশয়োক্তি। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ বলছেন, না হাইপারবোলি বা অতিশয়োক্তি নয়, ওগুলো হল প্রলম্বিত লুপ্তোপমা বা উৎপ্রেক্ষা। তাছাড়া হাইপারবোলি এবং অতিশয়োক্তি এক নয়। সে প্রসঙ্গে চঞ্চল আশরাফ বলছেন ভাষাবিজ্ঞানে হাইপারবৌল টার্মটি বাঙলায় শেষ পর্যন্ত অতিশয়োক্তিই। এদিকে বিষয়টা আমাদের পাঠে যা ধরা পড়েছে তা হল, এক, কোথাও তারা ঠিক আছেন, দুই, কোথাও তারা একটি মিশ্র জিনিসের দুইটা দিক নিয়ে বিরোধে দাঁড়িয়েছেন। মিশ্রণটা তারা ধরতে পারছেন না। তিন, অন্য এক জায়গায় একজন আপাত জিনিশকে আসল ভেবে ভুল করছেন এবং অন্যজন সেটার প্রকৃত রূপ ধরতে পারেন নাই।

আমাদের বিবেচনায় চঞ্চল ঠিক আছেন এখানে, “হাইপারবৌল টার্মটি বাঙলায় শেষ পর্যন্ত অতিশয়োক্তিই।” এবং “এই কবিতা শুরুই হয়েছে হাইপারবৌল দিয়ে : ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ  হাঁটিতেছি’…”। অবশ্য এটাকে  অলঙ্কারশাস্ত্রের বক্তব্য বলাই শ্রেয়, যদিও ভাষাবিজ্ঞানে এর চর্চা আছে। আবার গোমেজ ঠিক আছেন, এই বলাতে যে, “এই কবিতাংশে বাক্যগুলির উদ্দেশ্যই হাইপারবোলি-মূলক নয়। এগুলি এক ধরনের প্রলম্বিত লুপ্তোপমা বা উৎপ্রেক্ষা।”

যা হোক, তারা যেটা ধরতে পারছেন না তা হল লাইনগুলোতে  হাইপারবোলিক মেটাফর বা অত্যুক্ত রূপক, এপিক সিমিলি বা মহাকাব্যিক উপমা এবং মেটাফিজিক্যাল সিমিলি বা অধিবিদ্যক উপমার ব্যবহার। লক্ষণীয়, এখানে বাংলা অলংকারশাস্ত্র মতেই, মেটাফর এর বাংলা রূপক, এবং সিমিলির বাংলা উপমা ব্যবহার করা হয়েছে।

আমাদের প্রস্তাব, “চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,/ মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য”-এ হাইপারবোলিক মেটাফর বা অত্যুক্ত রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। এটার রূপান্তর করলে হাইপারবোলিক সিমিলি বা অত্যুক্ত উপমা পাওয়া যায়—চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশার মতন কালো। তার মুখের আদল শ্রাবস্তীর কারুকার্যের মত সৌকর্যপূর্ণ। ওই লাইনদুটিতে একই সঙ্গে মেটাফর বা রূপকের যে কাজ—সেই তুলনামূলক চিত্রকল্প সৃষ্টি হয়েছে, আবার হাইপারবোলির যে কাজ—অসম্ভব বাড়িয়ে বলা—তাও হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেগুলো মেটাফর বা রূপকই, কারণ বাড়িয়ে বলার উদ্দেশ্য খোদ মেটাফর বা রূপকের অভিঘাতের ওজন বাড়ানো।

আবার, “অতিদূর সমুদ্রের ’পর/ হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা/ সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি দ্বীপের ভিতর,/ তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে” এটাকে ইংরেজিতে বলা হবে এপিক সিমিলি বা মহাকাব্যিক উপমা। ফলে গোমেজ ঠিক বলেছেন “প্রলম্বিত লুপ্তোপমা”। এরমধ্যে হাইপারবোলি বা অতিশয়োক্তির বিষয় নাই। দুইটা দিশাহীন অবস্থার তুলনা লুকিয়ে আছে—এপিকাল বা প্রলম্বিত চিন্ত্রকল্প দিয়ে। আবার যেমন, “হাজার বছর ধরে আমি পথ  হাঁটিতেছি…” এটা হাইপারবোলি বা অতিশয়োক্তি বলে চঞ্চল ঠিক আছেন, কেননা এখানে অ্যানালজি বা তুলনা নাই—ফলে ঠিক মেটাফর বা সিমিলি না। অবশ্য গোমেজ এটা নিয়ে কোনো কথা বলেন নাই।

এবার আসি, “পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন” লাইনটায়। আমাদের প্রস্তাব এটা মেটাফিজিক্যাল সিমিলি বা অধিবিদ্যক উপমা। এটা “প্রলম্বিত লুপ্তোপমা”ও নয় আবার হাইপারবোলিও নয়। অধিবিদ্যক উপমার ক্ষেত্রে দুই পর্বের দুটি উপমা একটা চূড়ায় গিয়ে এক হওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্বে পাখির নীড় থেকে আশ্রয়ের উপমা, অন্য পর্বে বনলতার চোখ থেকে আশ্রয়ের উপমা। চূড়ান্ত উপমা বা তুলনাটা দুইটা ফিজিক্যাল জিনিসের মধ্যে নয়, তাদের নিজ নিজ উপমাদের মধ্যে। এখন গোমেজ যদি “উৎপ্রেক্ষা” শব্দটি ব্যবহার করে অধিবিদ্যক উপমা বলতে যা আমরা এখানে বললাম তা ইঙ্গিত করে থাকেন তাহলে তার সঙ্গে এ বিষয়ে আমরা একমত হতে পারি। তাছাড়া এখানে হাইপারবোলি প্রাসঙ্গিক নয়, কারণ বস্তু পাখির নীড় মুখ্য নয়, মুখ্য তার উপমা।

পরিশেষে, মেটাফর বলি, সিমিলি বলি আর হাইপারবোলি বলি—মোটা দাগে ওগুলোকে রূপক বলা যায়। কেননা এদের সবার কাজ রূপক অর্থ তৈরি করা। কিন্তু সেটা বললে পুরো বিষয়টার ওপর সুবিচার হয় না। সুবিচার হয় না জীবনানন্দ দাশের উপর। কবি উপমার, রূপকের যে বর্ণিল বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেন বাংলা ভাষায়—তাকে কেবল মোটা দাগে দেখলে চলবে কেন? আর, এপিক সিমিলি বা মহাকাব্যিক উপমা, মেটাফিজিক্যাল সিমিলি বা অধিবিদ্যক উপমা এবং হাইপারবোলিক মেটাফর বা অত্যুক্ত রূপক বিশ্বসাহিত্যে অপ্রতুল হলেও নতুন কোনো অলংকার নয়। আগ্রহী জীবনানন্দের অনুজেরা একটু খোঁজ নিলেই তা ধরতে পারবেন।

More from আহমেদ শামীম

‘বাংলা ব্যাকরণের রূপরেখা’ — ‪একটি পর্যালোচনা

প্রমিত বাংলায় বিদ্যমান কিছু সুগঠন শর্ত লেখক ছক করে দেখিয়েছেন...
Read More