প্রমিত বাংলার খাঁটি ব্যাকরণকে বর্ণনা করতে যারা বেশ খাটাখাটি করছেন তাদের প্রতিশ্রুতিশীল কর্মকাণ্ড আমি সময় পেলে সাগ্রহে ঘেঁটে দেখি। তো সেদিন দেখছিলাম এ বছরের গত মে মাসে (২০১৬) প্রথমা থেকে প্রকাশিত অধ্যাপক শিশির ভট্টাচার্য্যের বই ‘বাংলা ব্যাকরণের রূপরেখা।’

বইটিতে প্রমিত বাংলার ধ্বনিতত্ত্ব আর রূপতত্ত্ব বর্ণনার প্রয়াস নিয়েছেন লেখক। ব্যাকরণের কেন্দ্রীয় অঙ্গ বাক্যতত্ত্ব নেই এই বইতে, অর্থতত্ত্ব/প্র্যাগমেটিক্সও নেই। তা সত্ত্বেও এটি ব্যাকরণের বই হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ‘এই পুস্তক বাংলা ব্যাকরণচর্চার স্তিমিত ধারাকে বেগবান করতে সক্ষম হবে’—‪লেখকেরএই আশাটা ন্যায্যই বলব আমি।

আমাদের প্রমিত বাংলার বর্ণনায় ধ্বনিতত্ত্ব আর রূপতত্ত্বই বেশি আলোচিত হয়েছে একাডেমিতে, তবুও একাডেমিতে আলোচিত বাংলার ধ্বনিতত্ত্ব আর রূপতত্ত্বের ওপর লিখিত অভিসন্দর্ভগুলির ঘেঁটে পর্যালোচনা করে ব্যাকরণের বই খুব বেশি হয় নি। এর আগে বাংলা একাডেমির বর্ণনামূলক ব্যাকরণে তেমন প্রচেষ্টা চোখে পড়েছে। তবে এই বইটিতে পেলাম প্রমিত বাংলার ধ্বনিতত্ত্ব এবং রূপতত্ত্বের বর্ণনায় নির্দিষ্ট মডেলের ব্যবহার।

এটা নতুন। লেখকের ব্যবহৃত অধ্যাপক রাজেন্দ্র সিংহ গং প্রবর্তিত ধ্বনিতত্ত্ব এবং রূপতত্ত্বের মডেল দুটি হল যথাক্রমে সঞ্জননী ধ্বনিকৌশল তত্ত্ব এবং অখণ্ড রূপতত্ত্ব। বিষয়টি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। বইটির আরও একটি দিক আমার কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। তা হলো বইটিতে ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষাগুলি বাংলায় দেয়া আছে।

shishir-v-4

এই পুস্তকে ফনেটিক্সের অ আ ক খ খুব সহজ ও সংক্ষিপ্তভাবে লেখক আলোচনা করে নিয়েছেন বাংলা ধ্বনি পরিচয়ের ক্ষেত্র তৈরির লক্ষ্যে। তারপর বিভিন্ন বাংলা ভাষার ধ্বনিতত্ত্বর ওপর কাজগুলির পর্যালোচনা করে প্রমিত উপভাষার ধ্বনিগুলির ভাষাবৈজ্ঞানিক বিবরণ হাজির করেছেন লেখক।

এভাবে অধ্যায় সাজানোর ভাল দিক হল, পাঠক নিজেই ততক্ষণে বাংলা ধ্বনিপরিচয় নিয়ে তার বিচার উপস্থিত করতে সক্ষম হয়ে ওঠে। যেমন, বাংলা ভাষার কিছু ধ্বনির বর্ণনা নিয়ে যে বিতর্ক আছে একাডেমির বাইরে (ভিতরেও ছিল), লেখক তেমন বিতর্কে কিছু সুরাহা দেয়ার প্রয়াস নিয়েছেন। একটা মজার উদাহরণ হল বাংলা ব্যাঞ্জন ফ; এটা কবিতার ক্লাসে স্পৃষ্ট ধ্বনি তথা দুই ঠোঁট চেপে শুরু করতে হয় উচ্চারণ; কিন্তু সেটা কবিতার ক্লাসেই; লেখক দেখিয়েছেন লোকমুখে ব্যাপারটি তেমন নয়; ফ শুরুতেও ঘৃষ্ট (ঠোঁট দুটি একবারে বন্ধ হয় না, কিংবা কারও নিচের দাঁত এসে ঠোঁটে লাগে ইংরেজি এফ-এর মত। আর শব্দের মাঝে বা শেষে হলে তো কথাই নেই; দুই ঠোঁট চেপে ফ বলা বেশ আয়াস সাধ্য—‪যেমন, সফল, মাফ ইত্যাদি। সকল প্রতিবেশে ঘৃষ্ট ফ-এর ব্যবহার বাংলাদেশের প্রমিত বাংলাভাষীগণ উচ্চারণ করেন, এ বাবদে এটা বাংলার ফনেমিক (লেখকের ভাষায় প্রাণবিক) বর্ণমালার সদস্য। আবার স্পৃষ্ট ফ-কে লেখক মুক্ত বিকল্প বলছেন। কেন বলছেন পাঠক পুরো চ্যাপ্টারটা পড়লে নিজেই বিচার করতে সমর্থ হবেন। এমন আরও অনেক বিষয়ে নিজস্ব মত রাখার সক্ষমতা অর্জন করবেন।

এরপর বাংলা ধ্বনিতত্ত্বের কিছু আলোচিত নিয়ম (প্রক্রিয়া)-কে ধ্বনিতাত্ত্বিক প্রতিবন্ধের দৃষ্টিকোণ থেকে সাজিয়েছেন। যেমন ধরা যাক, আমরা জানি, বাংলা কোনো শব্দই ঙ দিয়ে শুরু হয় না। ফলে ধরা যায় যে বাংলা ভাষায় এমন একটি ধ্বনিতাত্ত্বিক প্রতিবন্ধ আছে যা ঙ-কে শব্দের শুরুতে বসতে বাধা দেয়।

কেন বাধা দেয়? কারণ হলো বাংলা ভাষায় ঙ দিয়ে শুরু করা ধ্বনিগুচ্ছ বা শব্দ সুঠাম গঠন পায় না।

এই দিক থেকে প্রমিত বাংলায় বিদ্যমান কিছু সুগঠন শর্ত লেখক ছক করে দেখিয়েছেন প্রমিত বাংলার সম্ভাব্য ধ্বনি বিন্যাস—‪অর্থাৎ কোন ধ্বনি কোন ধ্বনি পর পর ঘটতে পারে কোন ধ্বনি কোন ধ্বনি পর পর ঘটতে পারে না। উদাহরণ যেমন, বাংলায় ক্‌ এবং ব্‌ পরপর উচ্চারণে ঘটে না, উচ্চারণ করতে গেলে ক্‌ হয়ে যায় গ্‌—‪অর্থাৎ তোমাকে ডাকব বললে ক্‌ টি গ্‌-এর মত শোনাবে, কিন্তু ডাক পাঠাব বললে ক্‌ ঠিক থাকবে, কারণ ক্‌ এবং প্‌ পর পর উচ্চারণ যোগ্য। তালিকাটি সম্পূর্ণ নয়, সে কথা লেখকও বলেছেন।

রাজেন্দ্র সিংহের মডেলের বর্ণনা যেভাবে লেখক দিয়েছেন তাতে ভাষাবিদ্যা অনুরাগী পাঠক নিজে শর্তের তালিকা বাড়ানোয় ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আমিও মনে করি।

আমি অবশ্য ব্যক্তিগতভাবে জেনেরাটিভ ফৌনলজি (সঞ্জননী ধ্বনিতত্ত্ব) চমস্কি ও হালি (১৯৬৪) থেকে শুরু করে লেক্সিকাল ফনলজি (আমি এর বাংলা করব শব্দকৌষিক ধ্বনিতত্ত্ব; আমি লেখকের ‘আভিধানিক ধ্বনিতত্ত্ব’ কথাটি নিতে পারলাম না, কেননা তিনি নিজেও বলেছেন লেক্সিকন হল শব্দকোষ, ডিকসনারি বা অভিধান না), গ্রাউনডেড ফনলজি, এভুলিউশনারি ফনলজি (বিবর্তনমূলক ধ্বনিতত্ত্ব, এর প্রবর্তক জুলিয়েট ব্লেভিন্স আমার এমএ এবং পিএইচডি-র তত্ত্বাবধায়ক) এবং অপটিমালিটি তত্ত্ব ইত্যাদির সঙ্গে পরিচিত; লেখকের ব্যবহৃত রাজেন্দ্র সিংহ গঙের জেনারেটিভ ফনটাকটিকস বা সঞ্জননী ধ্বনিকৌশল তত্ত্ব সম্পর্কে আমার তেমন জানাশোনা নাই। তাই খুব গভীর কোনো পর্যালচনা এখানে সম্ভব না। তবে এ লেখার জন্য যতটুকু জানলাম তাতে বহু প্রশ্নই জন্মালো যা এখানে সব উপস্থাপন সম্ভব না।

তবে কয়েকটি না বললেই নয়। লেখকের উদাহরণ থেকে অনুমান করা কষ্ট যে একটি শব্দ গঠনে একাধিক শর্ত প্রযুক্ত হলে তার উপস্থাপনটা কেমন হবে। শর্ত প্রযুক্ত হবার ক্রমকে কীভাবে উপস্থাপন করা হয় এই মডেলে। ইত্যাদি।

এরপর, ‘প্রমিত বাংলার রূপতাত্ত্বিক বিবরণ’ দেয়ার ক্ষেত্রে লেখক ব্যবহার করেছেন অধ্যাপক সিংহের ‘অখণ্ড রূপতত্ত্ব’ মডেলটি। এই মডেলটির নাম শুনেছি বটে, তবে আমার বিচরণ ছিল মরফলজির আণবিক মডেলগুলিতে; সেখান থেকে ডিস্ট্রিবিউটেড মরফলজি বা বণ্টিত রূপতত্ত্ব (বইতে লেখকের হয়ত টাইপো হয়েছে, সেখানে লেখা আছে ডিস্ট্রিবিউটরি মরফলজি এবং বাংলায় লেখা আছে বিতরণমূলক রূপতত্ত্ব) হয়ে মরফো-সিনট্যাক্সের লম্বা রাস্তায় ওই মডেলটিকে জানার সুযোগ হয় নি আমার। এ কারণেও বইটি পড়ার আগ্রহ পাচ্ছিলাম আমি।

আগ্রহ আরও বেড়ে গেল আমার এক প্রিয় শিক্ষক এই মডেলের সঙ্গে জড়িত দেখে। লেখক মডেলটি বেশ বোধগম্য করে উপস্থাপন করেছেন। নতুন শব্দ তৈরির, নতুন শব্দকে বুঝতে পারার, এবং ভুলে যাওয়া শব্দকে মনে করতে পারার ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটি আমাদের মনে ঘটে থাকে তাকে বিভিন্ন মডেলে উপস্থাপন করা হয়েছে, এটি তার একটি। এখানে শব্দকে অখণ্ড ধরা হয়। উল্টো দিকে আণবিক মডেলগুলিতে শব্দ শব্দানু তথা মরফিম কিংবা লেক্সিম দিয়ে গঠিত হয়।

লেখকের ব্যবহৃত মডেল কিংবা আণবিক মডেল দুটোতেই অখণ্ড শব্দকোষের ধারণাটি বিদ্যমান—‪শব্দ আণবিক ভাবে গঠিত হোক আর অখণ্ডই হউক তা একটি শব্দকোষে থাকে।

ওদিকে ডিস্ট্রিবিউটেড মরফলজি বা বণ্টিত রূপতত্ত্বে অখণ্ড একক কোন শব্দকোষ নেই—‪রূপতত্ত্ব আর বাক্যতত্ত্বে বণ্টিত হয়ে আছে বিধায় ওটার অমন নাম। সেখান থেকে শুরু হয়ে বর্তমানে কিছু মডেল মরফলোজিকে সিনট্যাক্স থেকে আর আলাদা করে পাঠ করে না। এই মডেলগুলি আবার আণবিক মডেলের মতই শব্দের ভেতরকার আণবিক গঠন এবং তাদের হায়ারার্কি স্বীকার করে। আমার দীক্ষা ও আগ্রহ সেই দিকে; ফলে এখানেও অধ্যাপক সিংহের মডেলটির ব্যবহার নিয়ে কোনো পর্যালোচনা হাজির করা গেল না। তবে এই মডেল ব্যবহারের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে অধ্যাপক ভট্টাচার্য্য প্রথাগত রূপতাত্ত্বিক বর্ণনার কিছু খামতি দেখিয়েছেন। যেমন কয়েকটি উদাহরণ আছে সন্ধি বিষয়ক আলোচনায়; কয়েকটি ক্রিয়াপদীয় রূপতত্ত্বে। এখানে প্রথাগত বর্ণনার যে খামতি দেখিয়ে নতুন মডেল প্রস্তাব করেছেন, তা নিয়ে আমার কিছু কথা বলব।

আমার মতে, লেখক তার উদাহরণগুলিতে যে সমস্যায়গুলি দাগিয়েছেন সে সবের সমাধান আণবিক বর্ণনাতেই অধিকতর বোধগম্য। কেননা সেখানে (ধ্বনি) বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগুলি অনেক স্বচ্ছ। আমি সেখান থেকে কয়েকটি উদাহরণ টেনে আমার আলোচনাটি শেষ করব। উল্লেখ্য যে, প্রথাগত বর্ণনার প্রতি আমার কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। আর লেখকের ব্যবহৃত মডেল নিয়েও আমার কোনো পর্যালোচনা নেই। তবে প্রথাগত সমস্যা দাগানোতে ভাষাবিদসমাজ আরও সাবধানী হবেন সেই তাগিদ দিতেই শেষে এই কয়টি বিষয় লেখা।

উদাহরণ ১। সূর্য /ʃurjɔ/+ উদয় /udɔʸ/ = সূর্যোদয় /ʃurjodoʸ/

অধ্যাপক ভট্টাচার্য্য প্রথাগত বর্ণনাকে বিবৃত করেছেন এভাবে: “এখানে /ɔ/ আর /u/ এই উভয় প্রণব (ধ্বনিমূল-কে প্রণব বলেছেন তিনি) পরিবর্তিত হয়ে /o/-তে পরিণত হয়েছে। অথবা এও বলা যেতে পারে যে /ɔ/ আর /u/ এই উভয় প্রণব লোপ পেয়েছে এবং এ দুটি প্রণবকে প্রতিস্থাপিত করেছে /o/।” কিন্তু এই উদাহরণের ক্ষেত্রে তিনি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলিই উল্লেখ করেন নি। স্বাভাবিক বলতে স্বরযন্ত্রের বৈশিষ্ট্যের কারণে যে প্রক্রিয়াগুলি প্রযুক্ত হয়। উদাহরণের ক্ষেত্রে দুটি প্রক্রিয়া প্রযুক্ত হয়েছে।

প্রক্রিয়া ১. বাংলায় (আরও অনেক ভাষায়, যেমন ইতালীয় কিছু ভাষায়) একটি অনুচ্চ স্বরের পরের স্বরটি যদি উচ্চ হয়, তাহলে পূর্বের স্বরটির উচ্চতা এক স্তর বাড়ে। এখানে, /ɔ/ -এর পরে /u/ থাকায়, /ɔ/ এক স্তর ওপরে উঠে /o/ হয়েছে।

প্রক্রিয়া ২. বাংলায় (আরও বহু ভাষায়) পর পর দুটি স্বরধ্বনি উচ্চারণ দুরূহ বিধায় বিবিধ উপায়ে স্বরধ্বনির জোড়া ভেঙে উচ্চারণযোগ্যতা হয়। একটি উপায় হল, একটি স্বরের লোপ। এখানে /o/ এবং /u/ এই স্বর জোড় থেকে /u/টি লোপ পায়। ফলে, সূর্য /ʃurjɔ/+ উদয় /udɔʸ/ থেকে সূর্যোদয় /ʃurjodoʸ/ হয়।

উদাহরণ ২। সন্ত্রাস {ʃɔntraʃ} + ত {to} = সন্ত্রস্ত {ʃɔntrosto}

এই উদাহরণের মাধ্যমে তিনি বলতে চেয়েছেন সন্ত্রাস শব্দের শেষ ব্যাঞ্জন ধ্বনি /ʃ/ (উচ্চারণ শ)-এর পর ত [t] থাকায় তা ত্রস্ত-তে [s] (উচ্চারণ দন্ত্য স) রূপ পেয়েছে। কিন্তু এই নিয়ম ক্রিয়াপদ আসতে -তে খাটে না, সেখানে স /ʃ/এর পর ত [t] থাকলেও উচ্চারণ শ /ʃ/ রয়ে যায়। সুতরাং ২ নং উদাহরণের সন্ধির নিয়মটি বাংলা ধ্বনিতত্ত্বের মডিউলের অংশ না।

প্রথম কথা হল উদাহরণ ২ -এর প্রক্রিয়াটি লেখক তার যুক্তি প্রমাণের জন্য যেভাবে বর্ণনা করেছেন তাতে গলদ আছে। বলাই বাহুল্য, এটা প্রথাগত বর্ণনায় সন্ত্রস্তের সন্ধি বিচ্ছেদ নয়। উনিও জানেন, সম্‌ + ত্রস্ত মিলে সন্ত্রস্ত। এখন উনি হয়ত বলবেন, ঠিক আছে ত্রাস + ত = ত্রস্ত, কথা তো একই হলো। না একই হলো না। ত্রাস এবং ত্রস্ত দুটাই বাংলায় এসেছে সংস্কৃত থেকে এবং ধ্রুপদ সংস্কৃতে দেখি দুটাতেই স-এর উচ্চারণ দন্ত্য স [s]। বাংলায় বিবর্তিত হবার সময় ত্রাসেরসহ ওই ভাষার সকল দন্ত্য স [s]-এর উচ্চারণ তালব্য শ /ʃ/ হয়ে গেছে প্রতিবেশের প্রভাব ব্যতিরেকেই। কেবল যেসব শব্দে দন্ত্য স [s] এর পর অন্য একটি দন্ত্য ধ্বনি ছিল সেসব শব্দে সেই স দন্ত্য স [s]-ই রয়ে গেছে। বিন্যাস এবং বিন্যস্ত তার আরেকটা উদাহরণ। এটা সঞ্জননী ধ্বনিতত্ত্বের যে শাখা ধ্বনিবিজ্ঞানকে ভিত্তিভূমি হিসেবে নিয়েছে সেই শাখামতে সিদ্ধ। বিষয়টি হলো পাশাপাশি দুটি দন্ত্যধ্বনি উচ্চারণের জন্য সহজতর তাই তা তেমন রয়ে গেছে। তবে হ্যাঁ  এটা রূপধ্বনিতত্ত্বের অন্তর্গত, কেননা ওই শব্দগুলি এভাবেই বাংলাভাষীর শব্দকোষে স্থান পেয়েছে, কিন্তু তার পেছনে পূর্বোক্ত ধ্বনিবৈজ্ঞানিক কারণ আছে। আবার বাংলা ভাষার একটি উপভাষায় (কলকাতা একটি শাহরিক উপভাষা) এই নিয়মটি ধ্বনিতত্ত্বেরও অন্তর্গত। কলকাতার সেই উপভাষায় ক্রিয়াপদ আসতের উচ্চারণ আশতে নয়, বরং আস্তে। এতে ধ্বনিবিজ্ঞানের ভিত্তির জোরটি বোঝা যায়।

উদাহরণ ৩। লেখক লিখেছেন, “বাংলা ‘করছে’ ক্রিয়াপদের মধ্যসর্গ (বা প্রত্যয় বা বিকিরণ) (infix) ‘ছ’ যদি ঘটমানতা বোঝায়, তবে ‘করেছে’ ক্রিয়ারূপে ‘ছ’ কী বোঝাচ্ছে? আর একটি সমস্যা হচ্ছে এই যে ‘করেছে’ ক্রিয়ারূপটিতে দুটি ‘এ’ আছে ({√কর্‌}+ {এ}+ {ছ}+ {এ}), প্রথমটি মধ্যসর্গ, দ্বিতীয়টি বিভক্তি। একই ‘এ’ তাহলে কখনো বিভক্তি, কখনো মধ্যসর্গ?”

লেখক এখানে প্রথাগত বর্ণনাটিকে জেনেরাটিভ ফনলজি দিয়ে দেখতে পারতেন—‪এখানে কোনো মধ্যসর্গ বা infix নাই। মূল রূপ কর্‌ -এর পর সবই suffix (infix অন্য জিনিস): এখানে বিশ্লেষণ ও তুলনাচিত্রে গলদ আছে। সঠিক বিশ্লেষণ হল, একদিকে, করছে = কর্‌ + ছ + এ। এখানে ‘ছ’ continuous বা ক্রিয়ার ঘটমান অবস্থা নির্দেশক এবং ‘এ’ হল পারসন বা পক্ষের চিহ্ন (এ-এর স্থলে ই দিলে করছি, ও দিলে করছ- অর্থাৎ পক্ষ বদলে যায়)। অপর দিকে, করেছে -এর বিশ্লেষণ হল, কর্‌ + এছ+ এ। এখানে perfect বা ক্রিয়ার পুরাঘটিত অবস্থার নির্দেশক হল ‘এছ’। দুটি এ -এর বালাই নাই এখানে।

উপরোক্ত উদাহরণ দুটিতে মরফিম অর্ডার হল: root + aspect marker+ tense marker+ person marker (এখানে দুইটি উদাহরণই বর্তমান কালের অবস্থা, তাই tense marker নাই, কেননা বাংলায় বর্তমান কাল আন-মার্কড)।

উপরি কাঠামোর মরফিম ব্যবহার করে বিভাজনটি দেখানো গেল—‪সঙ্গে ওর মরফ-ফনলজিও বলা দরকার। ঘটমান ‘ছ’ এসছে ‘ইতা+আছ’ থেকে এবং পুরগঠিত ‘এছ’ এসছে ‘ইয়া+আছ’ থেকে। দুই ক্ষেত্রেই suffix এর সম্মুখে থাকা ই ধ্বনির কারণে মূল কর্‌ (ক+অ+র্‌) -এর উচ্চারণ কোর্‌ -এ রূপান্তরিত হয়: কোরছে, কোরেছে। যা হোক এগুলি হয়ত দ্বিতীয় সংস্করণে লেখক ভেবে দেখবেন। আর বইটির শক্তির জায়গা তো রইলই।

সর্বোপরি বইটি ব্যাকরণ অনুরাগীদের জন্য সংগ্রহে রাখার মত একটা বই। দামও বেশি না। গায়ে ৪৫০ টাকা লেখা থাকলেও জাদুঘরের পাঠক সমাবেশ বেশ বড় একটা ডিস্কাউন্ট দেয়—‪তাতে যদ্দুর মনে পড়ে, আমার একশ টাকার মত কম পড়েছিল।

SHARE
Previous articleহোস্টেল (৯)
Next articleরকি রোড সানডে (১০)
আহমেদ শামীম
টেক্সাস ইউনিভার্সিটির (অস্টিন) এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগে বাংলা পড়াচ্ছেন। পাশাপাশি সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডির অংশ হিসেবে রাজশাহীর কডা ভাষার ব্যাকরণ বর্ণনার কাজ করছেন। তার আগে, ভাষাতত্ত্ব পড়িয়েছেন নিউইয়র্কের লাগুয়ারডিয়া কমিউনিটি কলেজে, ঢাকায় ব্র্যাক এবং ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভাষাবিদ্যায় আসার আগে তিনি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, এবং পড়িয়েছেন স্ট্যামফোর্ড, ইন্ডিপেন্ডেন্ট এবং নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাংলা ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব নিয়ে বেশ কিছু পত্র পত্রিকায় এবং জার্নালে তার লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৩ সনে প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন 'বাঙলা কথা' একমাত্র গ্রন্থ ।