কথা বলছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ১৯৮২
কথা বলছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ১৯৮২

ডায়েরির পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে দেখলাম প্রথম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে গিয়েছিলাম ১৯৮১ সালের পয়লা নভেম্বর তারিখে, কেন্দ্র তখন ছিল ৩৭ ইন্দিরা রোডের বাড়িতে।

দিনটা ছিল রবিবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। আমি গিয়েছিলাম বিকেলে, তিনটার দিকে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কার্যক্রম চলছিল যে-ভবনে সেটা ছিল তখনকার দিনের তুলনায় যথেষ্ট আভিজাত্যপূর্ণ স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত একটি শাদা রঙের একতলা বাড়ি। সত্যি বলতে কী তার আগ পর্যন্ত এতটা আভিজাত কোনো বাড়িতে আমি প্রবেশাধিকার পাই নি। কারণ আমি ছিলাম গ্রাম-থেকে-আসা নিম্নপদস্থ একজন দরিদ্র সরকারী কর্মকর্তার সন্তান। আর তখন পর্যন্ত ঢাকায় আমার আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে কেউ ঐ রকমের আভিজাত্যপূর্ণ বাড়িতে থাকতেন না। ফলে সে-রকম বাড়িতে আমার প্রবেশাধিকার ঘটবার সুযোগ হয় নি।

এমনিতেই আমি অপ্রতিভ স্বভাবের বলে সুস্পষ্ট আহ্বান না-পেলে কোথাও যেতে চাই না। সুতরাং বিত্তবান বা অভিজাত যে স্বল্পসংখ্যকের সঙ্গে পরিচয় তখন পর্যন্ত ঘটেছিল তাদেরও কারো বাড়িতে আমার যাওয়া হয়ে ওঠে নি। ফুলার রোডের যে জায়গায় বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি আর মিলনায়তনটি রয়েছে সেখানে প্রবেশ করেছিলাম বটে, কিন্তু সেটা তো দেশীয় কারো বাড়ি নয়, বা দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় নয়! সুতরাং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রকে আমার আভিজাত্যে ‘বিদেশী’ প্রতিষ্ঠানের মতো ‘উন্নত’ আর ‘রুচিশীল’ বলে মনে হচ্ছিল।

সুন্দর ছিমছাম সবুজ ঘাসে মোড়ানো লন, বাড়ির প্রধান ফটক থেকে গ্যারেজের দিকে যাওয়া সিমেন্ট করা পথ। দুই পাশে বড় বড় টবে পাতাবাহার গাছ। নিয়মিত পরিচর্যায় ধুলিমলিনতাহীন সতেজ পাতাবাহারের সৌন্দর্য আমাকে সংকুচিত করে তুলল। প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকেই দেখতে পেলাম গ্যারেজের ভেতরে বসে থাকা সায়ীদ স্যারকে। কারণ বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ঐ একজন মানুষের সঙ্গেই আমার মাত্র কয়েকদিন আগে পরিচয় ঘটেছে। এর আগে আমি কেবল একজনের কাছে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের নাম শুনেছি। যাঁর কাছে শুনেছি সেই বাকিউল্লাহ ভাইকে সেখানে দেখলাম না।

আমার ভর্তি হবার আগেই কিংবা অল্প পরে ঢাকা কলেজ থেকে বাকিউল্লাহ ভাই অনার্স পাস করেছিলেন। ছড়াকার মাহমুদউল্লাহ ভাইয়ের অনুজ বাকিউল্লাহ ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ‘অনুশীলন সংঘে’র সাপ্তাহিক সাহিত্য সভায়। তিনিই আমাকে প্রথমে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। তোফাজ্জল ভাই, মানে শেখ তোফাজ্জল হোসেন, দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার তখনকার কার্টুনিস্ট তোফা, ছিলেন ‘অনুশীলন সংঘে’র নিয়মিত সাহিত্যসভার আয়োজক।

তোফাজ্জল ভাইয়ের কথাও এখানে একটু বলে নিই। কারণ ঐ সময় তাঁর পরিচালনায় যে নিয়মিত সাহিত্যসভা হতো তাতে অংশগ্রহণ করতে করতেই সাহিত্য আস্বাদনের ইচ্ছা ও আনন্দ দুইই আমার মধ্যে তীব্র হয়ে উঠেছিল। বলতে গেলে তোফাজ্জল ভাই গদ্য লেখার সবচেয়ে কার্যকর টিপস দিয়েছিলেন আমাকে। সে-কথায় একটু পরে আসছি। তার আগে বলতে হবে আমার বন্ধু বর্তমানে ইংল্যান্ডপ্রবাসী মোস্তফা জামানের কথা।

কেন্দ্রে প্রথম দিন যেমনটি দেখেছিলাম – লেখক
কেন্দ্রে প্রথম দিন যেমনটি দেখেছিলাম – লেখক

মোস্তফা জামান আর আমি ছিলাম একই স্কুলের অর্থাৎ ঢাকার খিলগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র। সে আমার এক বছর আগে এসএসসি পাশ করলেও আমরা একসঙ্গে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে পুরোনো ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে পড়তাম। স্কুলে থাকতে ওর সঙ্গে কখনও দেখা হয়েছিল বলে মনে পড়ে না। কলেজে একদিন ওর হাতে আবিষ্কার করলাম একটা কিশোর বাংলা, দেশের একমাত্র কিশোর সাপ্তাহিক। দেখলাম ‘আমাদের পাতা’ বিভাগটি খোলা, আরেকজন সহপাঠিকে দেখাচ্ছে। পত্রিকাটা দেখে ওকে বললাম, কিশোর বাংলা আমি নিয়মিত কিনি।

কিশোর বাংলার সেই সংখ্যার পৃষ্ঠাসজ্জার কথা আমার এখনও মনে আছে। কিশোরদের ঐ পত্রিকাটি ছাপা হতো টেবলয়েড সাইজে, অর্থাৎ দৈনিক পত্রিকা একভাঁজ করা অবস্থায় যে আকারে সরবরাহ করা হয় সেই সাইজে। আমরা প্রথম ভাঁজ খুলে ঘুরিয়ে নিয়ে তারপর দৈনিকের শিরোনাম পড়ি। টেবলয়েড সাইজের কাগজটা ঘুরিয়ে নিয়েই শিরোনাম পড়তে হয়। মাঝখানের পৃষ্ঠাদুটি ছিল ‘আমাদের পাতা’, অর্থাৎ লেখক হিসেবে যারা এখনও প্রতিষ্ঠিত হয় নি এমন লেখকদের পাতা। মাঝের সেই দুই পাতার ডানদিকেরটাতে ছাপা হয়েছে একটি গল্প, নাম ‘ডাহুক ডাহুকী’, লেখকের নাম মোস্তফা জামান। গল্পটার বাঁ দিকে দুটো পাখির ইলাস্ট্রেশন। কিশোর বাংলায় তখন ছবি আঁকতেন আজকের তারকা আভিনয়শিল্পী ও বিজ্ঞাপনশিল্পের কৃতিপুরুষ আফজাল হোসেন। গল্পের নামও তাঁরই অনবদ্য লেটারিঙে লেখা। আমাকে গল্পটির দিকে ইশারা করে মোস্তফা জামান বলল, ‘এটা আমার লেখা।’

প্রথম সংখ্যা প্রকাশের কাল থেকেই আমি কিশোর বাংলা পত্রিকার নিয়মিত পাঠকই শুধু নই, অনুরক্তও। সে হিসেবে ঐ পত্রিকার লেখক আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তখন থেকেই খাতির হয়ে গেল মোস্তফা জামানের সঙ্গে। আমি সোহরাওয়ার্দী কলেজের লাইব্রেরি থেকে বাংলাদেশের লেখকদের বই যোগাড় করে পড়তাম। কিন্তু ওর সঙ্গে সামান্য কথা বলেই বুঝলাম আমার চেয়ে অগ্রসর পাঠক সে। কলেজের ক্লাসে আমরা পাশাপাশি বসতে শুরু করলাম। সাহিত্য বিষয়ে পরস্পরের মধ্যে ভাব বিনিময় হতে থাকল।

আমার আর এক স্কুলজীবনের বন্ধু ছিল যার নাম এটিএম মোস্তফা, সেও ঐ কলেজে আমার সঙ্গে পড়ত। কয়েক বছর আগে ঢাকা বইমেলায় ওর সঙ্গে শেষ যেদিন দেখা হয়েছিল সেদিন জেনেছিলাম বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান বিভাগে চাকরি করছে সে। ওরও বই পড়ার অভ্যাস ছিল। বই সংগ্রহ করতে পারলে আমি আর সে বই দেয়া-নেয়া করে পড়তাম। আমাদের খেলাধুলা, ঘোরাফেরা, পড়াশোনা চলত একসঙ্গে। মোস্তফা জামানের যোগ ঘটায় কলেজে আমরা তিনজন হলাম। আমাদের নিবাসও ছিল একদিকে। আমি থাকতাম উত্তর শাহজাহানপুরে, এটিএম মোস্তফা থাকত গোড়ানে আর মোস্তফা জামান মাদারটেকে। কলেজ থেকে মতিঝিল পীরজঙ্গী মাজার মোড় পর্যন্ত তিনজনে একসঙ্গে ফিরতাম। তারপর মোস্তফা জামান যেত বাসাবো রেলক্রসিঙের দিকে। বর্তমান খিলগাঁও ফ্লাইওভারের উত্তর শাহজাহানপুর প্রান্ত পর্যন্ত এসে আমি চলে যেতাম বাঁয়ে, এটিএম মোস্তফা যেত খিলগাঁও রেলক্রসিং পার হয়ে গোড়ানের দিকে।

আমাদের তিন বন্ধুর আড্ডার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল সাহিত্য। পড়াশোনার দিক থেকে এটিএম মোস্তফা ছিল আমাদের দুইজনের চেয়ে মেধাবী। গণিতও সে আমাদের তুলনায় ভালো বুঝত। কিন্তু সাহিত্যের সাম্প্রতিক বিষয়গুলি সম্পর্কে ওর কৌতূহল থাকলেও আমাদের দুজনের তুলনায় একটু নিস্পৃহ ধরনের। আমরা তিনজনে একত্রে আড্ডা দিতে দিতে ঠিক করলাম দেয়াল পত্রিকা করব। নিজেদের যোগ্যতা বিচার করে দেখলাম আমি খানিকটা ছবি আঁকতে পারি, এটিএম মোস্তফার হাতের লেখা সবার চেয়ে ভালো, আর লেখা বিচারে মোস্তফা জামানের যোগ্যতা আমাদের সকলের চেয়ে পরিপক্ব। মোস্তফা জামানকে আমরা সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব দিলাম সম্পাদকের। চিত্রকর হিসাবে অঙ্গসজ্জার দায়িত্ব বর্তাল আমার ওপর, আর গোটা পত্রিকা হাতে লেখার দায়িত্ব পড়ল এটিএম মোস্তফার ওপর। পত্রিকার নাম ঠিক হলো ‘পদক্ষেপ’।

আমরা লেগে পড়লাম কাজে। কলেজের দেয়ালে নোটিশ সাঁটালাম লেখা চেয়ে। যথেষ্ট সাড়া মিলল। মোস্তফা লেগে পড়ল লেখা বাছাইয়ে, আমি অঙ্গসজ্জার জন্য নকল করবার মতো চিত্রানুষঙ্গ খুঁজতে লাগলাম। মাউন্ট বোর্ড কিনে তৈরি হয়ে রইল এটিএম মোস্তফা। খুব দ্রুততার সঙ্গে আমাদের কাজ চলল। একসময় দেয়ালে টাঙিয়েও দিলাম আমাদের পত্রিকা পদক্ষেপ

আমার সেই সময়েরই অন্য দুই সহপাঠী আজকের অনন্যা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী মনিরুল হক ও শিখা প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম আমাদের পদক্ষেপ পত্রিকার চাক্ষুষ সাক্ষী। মনে পড়ে আমাদের আসা-যাওয়ার পথে পড়ত চলচ্চিত্রের অভিনয় শিল্পী আবদুল মতিনের বাড়ি। নারিন্দায় তাঁর বাড়ির বারান্দায় প্রায়শই তাঁকে দেখতাম বসে থাকতে। আমি একদিন গেলাম তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে। দেয়াল পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকার নিতে চাইলেও তিনি আমাকে অবহেলা করেন নি। আন্তরিকভাবে কথা বলেছিলেন। পদক্ষেপ-এ সে সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছিলাম আমরা।

মোস্তফা জামানকে সঙ্গে নিয়েই আমি প্রথম লেখা দিতে কিশোর বাংলা আফিসে হাজির হয়েছিলাম। লেখা দিয়ে এসেছিলাম রফিকুল হক দাদুভাইয়ের টেবিলে। আমার লেখা প্রথম ছড়া ছাপাও হয়ে গেল কিশোর বাংলার পরবর্তী সংখ্যাতেই। চার লাইনের ছড়ার একটি লাইন তিনি সম্পাদনা করে বদলে দিয়েছিলেন। আমাদের পাতায় ছাপা হওয়া সে-ছড়ার সঙ্গে ছবি এঁকে দিয়েছিলেন আফজাল হোসেন। আরেকদিন নিয়ে গিয়েছিলাম একটা গদ্যরচনা, ‘রেডিয়ামের কথা’; দুই তিন জায়গা থেকে তথ্য নিয়ে লেখা। সেটাও কিশোর বাংলায় ছাপা হয়ে যাওয়ায় নিজেকে একটু একটু লেখক ভাবতে শুরু করেছিলাম তখন। সে সময়ে নিজের নাম লিখতাম মাযহারুল ইসলাম সেলিম, সার্টিফিকেটেও আমার নাম এই-ই।


দেয়াল পত্রিকা পদক্ষেপ করতে করতেই খোঁজ পেলাম বিচিত্রা ফোরাম ক্লাবের। খোঁজ পেলাম মানে বিচিত্রায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপন দেখে জানলাম।

বিচিত্রা ফোরাম ক্লাব ছিল তখনকার জনপ্রিয় সাপ্তাহিক পত্রিকা বিচিত্রার পাঠকদের সংগঠন। একদিন ঠিকানা খুঁজে হাজির হলাম ঐ সংগঠনের আরামবাগ শাখার অফিসে। অফিস আর কি! শাহনূর আবদুল কুদ্দুসদের বাসার ঠিকানাই ছিল ওই সংগঠনের অফিসের ঠিকানা। পরিচয় হলো স্থানীয় বাসিন্দা শাহনূর কুদ্দুস ও তাঁর ভাইদের সঙ্গে। পরবর্তী কালের থিয়েটারকর্মী ও অভিনেতা শেখ আজমের সঙ্গে জানাশোনা হলো এই আড্ডার মাধ্যমেই। শুভানুধ্যায়ী হিসেবে পেলাম পরবর্তীকালের উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা শামসুদ্দীন তৌহিদকে। পরিচয় হলো পরবর্তীকালের ঢাকা থিয়েটারের কর্মী, অভিনেতা ও চলচ্চিত্র প্রযোজক রাশিদুল আমিন হলির সঙ্গেও। আরও যাদের পেয়েছিলাম তাদের সকলের কথা এখন মনে পড়ছে না।

আমি ওখানে যাওয়ার কিছুদিন পর রোজার সময় এসে গেল। বিচিত্রা ফোরাম ক্লাবের আলোচনায় প্রসঙ্গ উঠল ঈদ উপলক্ষে একটা সংকলন বের করার। আমি খুবই উৎসাহিত হলাম। কথাবার্তা বলতে বলতে নাম ঠিক হলো ‘বিস্ময়’।

যথারীতি লেখা চেয়ে বিজ্ঞপ্তিও দেয়া হল বিচিত্রায়। সে-সময়ে এভাবেই লেখা সংগ্রহ করা যেতো, কারণ ডাকে কেউ লেখা পাঠালে বিবেচনা করা হতো। মনে আছে ঐ সংকলনের জন্য কবিতা পাঠিয়েছিলেন এখনকার বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান, তখন তিনি নিজের নাম লিখতেন নাসরীন জাহান বিউটি; আরও লেখা পাঠিয়েছিলেন কথাসাহিত্যিক পারভীন সুলতানা। তখন নাম ছিল পারভীন সুলতানা রুবী। কিশোর বাংলায় তাঁদের দুজনেরই লেখা নিয়মিত দেখা যেত। দুজনেই তখন থাকতেন ময়মনসিংহে। বিচিত্রা ফোরাম ক্লাবের একজনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল কবি খালেদা এদিব চৌধুরীর, তিনিও কবিতা দিয়েছিলেন একটি। ওই সংকলনে আমারও একটা ‘আধুনিক’(!) কবিতা ছিল, গদ্যে লেখা; আমার অবস্থা তখনও এমন যে গদ্যে লাইন ছোটবড় করে ভেঙে লিখলে সেটাকে ‘আধুনিক কবিতা’ বলে মনে করতাম। আমি একা অবশ্য তা মনে করতাম না, অন্য অনেকেরই ধারণা ছিল এমন। চিত্রশিল্পী হিসেবে ঐ সংকলনের প্রচ্ছদ করবার দায়িত্ব পেয়েছিলাম আমি। সেটা ছিল লেটারপ্রেসের যুগ। সেট-স্কয়ার ব্যবহার করে ‘বিস্ময়’ কথাটা লিখলাম জ্যামিতিক রেখায়। দুটি লাইনকে সমান্তরাল ভাবে টেনে দরকারি জায়গায় মিলিয়ে দিলাম। এইবার তুলি দিয়ে কালি ছড়িয়ে দিলাম সমান্তরাল দুই রেখার দুই পাশের অংশে। আমার ডিজাইন দেখে সবাই পছন্দ করল।

আহমাদ মাযহারের করা ‘বিস্ময়’ ছোট পত্রিকার প্রচ্ছদ।
আহমাদ মাযহারের করা ‘বিস্ময়’ ছোট পত্রিকার প্রচ্ছদ।

লেটারপ্রেসের ছাপা সম্পর্কে এর আগে পর্যন্ত আমার অভিজ্ঞতা ছিল চোখের দেখা পর্যন্তই। এই সাহিত্য সংকলন বিস্ময়-এর কাজ করতে গিয়ে শিখলাম প্রুফ দেখার কৌশল। ব্লক কীভাবে বানানো হয় দেখলাম সেটা। আরামবাগে বিচিত্রা ফোরাম ক্লাবের আড্ডাতেই একদিন শামসুদ্দীন তৌহিদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। কথায় কথায় আমি লুৎফর রহমান রিটনের কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম তার ছড়া পড়েছি, ছবি আঁকা দেখেছি। শামসুদ্দীন তৌহিদ বললেন, ওর সঙ্গে তাঁর পরিচয় আছে। আরও খবর দিলেন, প্রতি রোববার ইসলামিক ফাউন্ডেশনে একটা সাহিত্যসভা হয়। ওখানে রিটন যায় প্রায়ই! শামসুদ্দীন তৌহিদের কাছ থেকে পাওয়া খবর নিয়ে বললাম মোস্তফা জামানকে। ঠিক হলো আমরা রোববারে যাব সে সাহিত্যসভায়। কিন্তু রোববারে আমি ইসলামিক ফাউন্ডেশনে গিয়ে কোনো সভাটভার চিহ্নমাত্র দেখলাম না। আমার ধারণা ছিল ইসলামিক ফাউন্ডেশনে কোনো মিলনায়তন আছে যেখানে মাইকটাইক লাগিয়ে সভা হবে। পাঁচ-দশ মিনিট ঘোরাঘুরি করে কোথাও কাউকে না পেয়ে হতাশ হয়ে বাসায় ফিরে এলাম।

পরের দিন কলেজে গিয়ে শুনলাম মোস্তফা জামান গিয়েছিল সেখানে, তবে যেতে একটু দেরি হয়েছিল। সাহিত্যসভার খোঁজও সে পেয়েছে। ওর কথা শুনে বোঝা গেল যে, একটু বেশি আগে চলে গিয়েছিলাম বলে কারো দেখা পাই নি। মোস্তফা জামান আমার চেয়ে বুদ্ধিমান। সে ভালোভাবে খোঁজ করে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠেছিল। একটা দরজা খোলা পেয়ে উঁকি দিয়েছিল সেখানে। দশ-পনেরজন ছিল ওখানে। যাদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে বলে জানাল তার মধ্যে তোফাজ্জল ভাই আর আবু হাসান শাহরিয়ারের কথা মনে আছে। সাহিত্যসভাটি ওর বেশ ভালো লেগেছে। কেউ কেউ নিজের লেখা পড়েছে। সেই লেখাগুলির ওপর আলোচনা করেছেন আবু হাসান শাহরিয়ার ও আরো কার কার যেন নাম বলেছিল – মনে নেই!

খুবই আফসোস হলো আমার সাহিত্যসভার দুয়ার থেকে সেটা না-পেয়ে ফিরে এসে। পরের রোববারে আর সাহিত্য সভা খুঁজে পেতে অসুবিধা হয় নি। আমি গিয়েছিলাম একটা গল্প নিয়ে। নাম ‘সুরুজ জ্বলে’; গল্পটা ছিল একজন খেটে খাওয়া মানুষের দুঃখময় জীবনের কথা। সেদিনের সাহিত্য সভায়ও আলোচক ছিলেন আবু হাসান শাহরিয়ার। লেখা পাঠের পর আলোচনা পর্বে নির্দয় সমালোচনা করলেন তিনি। বিশেষ করে ভাষাগত দুর্বলতা প্রসঙ্গে বলেছিলেন গল্পের ভাষা হয় নি, হয়েছে ফুটবল খেলার ধারাবিবরণী। আর গল্পের কাহিনিকাঠামোতে কোনো নতুনত্ব নেই!

পরের রোববারে গেলাম আরেকটা নতুন গল্প নিয়ে। নাম ‘বন্ধুর জন্য’; সেদিন শাহরিয়ার ভাই ছিলেন না। আলোচনায় কে ছিলেন মনে নেই। যিনিই থাকুন না কেন গল্পটাকে মোটের ওপর ভালোই বলেছিলেন। সাহিত্যসভা শেষ হওয়া মাত্রই সবাই চলে যায় নি। তোফাজ্জল ভাইয়ের টেবিলের সামনে আড্ডা দিচ্ছিল কেউ কেউ। তোফাজ্জল ভাই আমাকে ইশারায় ডাকলেন। তাঁর মনে ছিল আমার গল্প নিয়ে আগের সপ্তাহে শাহরিয়ার ভাইয়ের কঠোর সমালোচনার কথা। আমার গল্পটার সামান্য অংশ পড়লেন। বললেন গল্পের ভাষা এমন হয় না। বলে একটা প্যারাগ্রাফ লিখে দিলেন। বক্তব্য মোটামুটি একই। কিন্তু স্পষ্ট অনুভব করলাম আমার লেখার তুলনায় আকর্ষণীয়। বাসায় ফিরে গল্পটা নিয়ে বসলাম আবার। তোফাজ্জল ভাইয়ের লিখে দেয়া প্যারাগ্রাফটা পড়লাম বারবার। সেই ভঙ্গিটাকে যতদূর সম্ভব অনুসরণ করে লিখলাম নতুন করে। তারপর ডাকে পাঠিয়ে দিলাম সংবাদ পত্রিকার ঠিকানায়, ছোটদের বিভাগ ‘খেলাঘর’-এ প্রকাশের জন্য। পরের সংখ্যাতেই সেটা ছাপা হয়ে গেল। গল্পের সঙ্গে ছবি এঁকেছিলেন শিল্পী মাসুক হেলাল, তখন সবেমাত্র তিনি ‘খেলাঘর’ বিভাগের ছবি আঁকার দায়িত্ব নিয়েছেন। লেখক হিসেবে আমার আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে গেল তখন।

‘অনুশীলন সংঘে’র ঐ সাহিত্যসভায় আমি একেবারে নিয়মিত হয়ে গেলাম। বিচিত্রা ফোরাম ক্লাবের লোকজনের চেয়ে ‘অনুশীলন সংঘে’ যাদের পেতাম তাঁদের অনেকেই ছিলেন সাহিত্যাঙ্গনের পরিচিত মুখ। ওখানে যে আমি নিয়মিত যেতাম তার কারণ সাহিত্যের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হবার বাসনা! কে কী লিখছে, কোনটা ভালো সাহিত্য, কোন পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে কীভাবে সুযোগ পাওয়া যাবে সেসব জানতে হলে আমাকে সাহিত্যিক মহলে চলাফেরা করতে হবে, সবাইকে চিনতে-জানতে হবে – এরকম একটা ধারণা আমার মধ্যে ততদিনে জেগে উঠতে শুরু করেছে। আমি মনে করতে লাগলাম এটাই আমার সাহিত্যাঙ্গনে প্রবেশের সদর দরজা। সাহিত্যাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে অনেক পড়তে হবে, জানতে হবে। আর এসবের খোঁজ পাওয়া যাবে এখানেই।

বলছিলাম বাকিউল্লাহ ভাইয়ের কথা। তিনিও মাঝে মাঝে ‘অনুশীলন সংঘে’র সাহিত্যসভায় যেতেন। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়ও সেখানেই। কথায় কথায় বাকিউল্লাহ ভাই আমাকে একদিন বললেন, ‘তুমি তো প্রচুর ভালো বই পড়তে চাও, তাহলে একদিন চলো তোমাকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে নিয়ে যাব, ওখানে বই নিয়ে ক্লাসে আলোচনা হয়। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার নিজে ক্লাসে থাকেন।’

সেটা আশি সালের শেষদিকের কথা। আমিও খুব উৎসাহিত হলাম। ততদিনে আমি উচ্চ-মাধ্যমিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের (!) সঙ্গে খারাপ ফলাফল অর্জন করে ফেলেছি। ততদিনে পত্রিকায় লেখা ছাপা হতে শুরু করেছে। এটুকুতেই তাঁদের সকল আশা-ভরসাকে ধূলায় লুটিয়ে দিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সাহিত্যিক হব! দৃঢ়তার সঙ্গে বললাম আমার উচ্চতর পড়াশোনা যদি চলেই তাহলে তা চলবে বাংলাভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে। আব্বা চেয়েছিলেন আমি যেন ইমপ্রুভমেন্ট পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফল করে উন্নততর (?) কোনো বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা করি। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে যাবার যেটুকু সুযোগ এখনও বাকি রয়েছে তা যেন হাতছাড়া না-করি।

কিন্তু আমি এক নদীতে দুইবার গোসল করতে রাজি নই কিছুতেই! যা হবার হয়ে গেছে! এই পরিস্থিতি মেনে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে আমাকে। আমার এইসব গোঁয়ার্তুমির কারণে পরিবারে আমার অবস্থান তখন খুবই খারাপ পর্যায়ে চলে গেছে। বাবা-মায়ের কাছে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছি নিজের হতাশাজনক ভবিষ্যতের সামনে দণ্ডায়মান মানুষের ভাবমূর্তি। একে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস! তায় আবার অনুজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে আমি যাচ্ছি; এসব নিয়ে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত আব্বা আমার ব্যর্থ্যতা-গৌরবের ফাঁকা বুলির সঙ্গে পেরে না-উঠে হাল ছেড়ে দিয়েছেন।

আত্মীয়-স্বজনের কাছে তিনি মুখ দেখাতে পারেন না। চার-পাশ থেকে যখন খবর পান যে অমুকের ছেলে ফার্স্ট ডিভিশন পেয়ে ডাক্তারিতে ভর্তি হয়েছে, অমুকের ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিঙে চান্স পেয়েছে – তখন বিষণ্ন হয়ে ঘরে ফেরেন। আমি সে-সব থোড়াই কেয়ার করে সাহিত্যের জন্য পথে পথে ঘোরার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। কিন্তু সিদ্ধান্ত নিলে কী হবে! পথ তো চিনি না মোটেও! উচ্চ-মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্র থাকাকালে অনুশীলন সংঘের খোঁজ পেয়েছিলাম। ওখানেই সাহিত্যিকদের সঙ্গে পরিচিত হবার যেটুকু সুযোগ পেয়েছিলাম ওইটুকুতেই আমি মনে করতে লাগলাম সাহিত্যের পথে আমার যাত্রা শুরু হয়ে গেছে! লেখক হতে আমার আর বুঝি বেশি বাকি নেই!


বাকিউল্লাহ ভাইয়ের কথা প্রথমে আমার কাছে স্পষ্ট হয় নি! শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু ক্লাস! এ আবার কেমনতর ব্যাপার! পরে বুঝেছি এটা গতানুগতিক অর্থে যাকে ক্লাস বলে তা নয়। বলেছেন ক্লাসে স্যারও থাকেন। আমি তাঁকে বললাম, যাব। কিন্তু বাকিউল্লাহ ভাই নিজেই অনুশীলন সংঘে যেমন নিয়মিত ছিলেন না তেমনি ছিলেন না কেন্দ্রেও। ফলে তাঁর সঙ্গে ওখানে যাওয়া হয়ে ওঠে নি। অনুশীলন সংঘের সূত্রে অনেকের সঙ্গেই নতুন বন্ধুত্ব হয়েছিল আমার। তাদের মধ্যে ছিল প্রায় সমবয়সী ছড়াকার আমীরুল ইসলাম। আমীরুল তখন উচ্চ-মাধ্যমিক শ্রেণীর ছাত্র হলেও ঢাকা কলেজ ছাত্র-সংসদের নির্বাচিত বার্ষিকী সম্পাদক। জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হবার ফরম সংগ্রহ করেও ওখানে ভর্তি হই নি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ছাত্র হব বলে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ছাত্র হতে চাওয়ারও পেছনে ছোট্ট একটা কাহিনি আছে। সে কাহিনি বলব অন্যত্র।

‘অনুশীলন সংঘে’র অনেকের সাথে লেখক আহমাদ মাযহার।
‘অনুশীলন সংঘে’র অনেকের সাথে লেখক আহমাদ মাযহার।

এদিকে আমার উচ্চ-মাধ্যমিকের ফল ভালো নয় বলে জানা ছিল যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি পড়বার সুযোগ পাব না। কিন্তু খারাপ ফলাফলের কারণে সরাসরি সুযোগ পাচ্ছিলাম না ঢাকা কলেজেও। আমীরুল কলেজের ছাত্র-সংসদের নেতা বলে আমি ঢাকা কলেজে ভর্তি হবার আশা করতে থাকলাম। কিন্তু প্রতিদিন যাত্রাবাড়ি থেকে আজিমপুরে এসে, কিংবা ঢাকা কলেজে এসে আমীরুলের সঙ্গে আড্ডাই কেবল দেয়া হচ্ছিল, আমার ভর্তির ব্যাপারে কোনো উদ্যোগই নিতে দেখা গেল না আমীরুলের মধ্যে। হতাশার যখন প্রায় শেষ সীমানায় এসে দাঁড়িয়েছি তখন একদিন আমীরুল বলল, ‘কাইল আহো, কামরুল ভাইয়ের লগে কথা কমু নে। তোমার সব সমস্যার সমাধান হইয়া যাইব।’

অন্যদিনের মতো উদাস না হয়ে আমীরুল সত্যি সত্যি সেদিন আমাকে ঢাকা কলেজের ছাত্র-সংসদের তৎকালীন ভিপি সৈয়দ কামরুল আহসানের কাছে নিয়ে গেল। কামরুল ভাই আমার মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিকের বাংলার ফল দেখে বললেন, ‘চিন্তা কইরো না, তোমার বাংলায় পাওয়া নম্বর তো দেখি ম্যাট্রিক-ইন্টারমিডিয়েট দুইটারই মোটামুটি ভালো। রওশনারা আপারে বইলা ভর্তি করাইয়া দিতে পারুম।’ অধ্যাপক রওশনারা রহমান ছিলেন ঢাকা কলেজের তখনকার বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। তিনি আমার নম্বরপত্র দেখে বললেন ঠিক আছে ভর্তি করে নেব। কামরুল ভাইয়ের সুপারিশে আমি ভর্তি ফরম নিয়ে মহানন্দে ঘরে ফিরেছিলাম সেদিন।

কেন্দ্রে আসবার সুযোগ কীভাবে ঘটল সে-কথা বলবার আগে সায়ীদ স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম দেখার গল্পটা বলে নিতে হবে। তার আগে বলতে হবে সায়ীদ স্যারের ছাত্র কেন হতে চেয়েছিলাম। ১৯৭৮ সালের বিটিভিতে ঈদের যে বিশেষ আনন্দমেলা হয়েছিল তার উপস্থাপক ছিলেন তিনি। তাঁর কথা প্রথম শুনলাম সেই অনুষ্ঠানে। যেমন সুন্দর উচ্চারণ, তেমনি সুন্দর কথা বলার ভঙ্গি। বোঝাই যায় তিনি হাসান, কিন্তু হাসির আড়ালে থাকে গভীর কোনো উপলব্ধি। এখনকার খ্যাতিমান অলোকচিত্রী চঞ্চল মাহমুদ আমার খালাত ভাই হন সম্পর্কে। সেদিনের সেই আনন্দমেলার পরে কোনো একদিন কথা হচ্ছিল তাঁর সঙ্গে। তিনি তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। চঞ্চল ভাই বললেন, স্যারের ক্লাসে অন্য কলেজের ছেলেরাও চলে আসে। এত মজার হয় স্যারের ক্লাস। তখনই আমার ইচ্ছে জাগে স্যারের ছাত্র হবার। কিন্তু পরীক্ষায় ভালো ফল না-করলে ঢাকা কলেজে উচ্চ-মাধ্যমিক পড়বার সুযোগ হবে না। ফলে তাঁর ছাত্র হবার চিন্তা উবে গিয়েছিল। কিন্তু অনুশীলন সংঘ, আমীরুলের সঙ্গে পরিচয় ইত্যাদির পথ ধরে শেষ পর্যন্ত বিএ সম্মান পড়তে গিয়ে সায়ীদ স্যারের ছাত্র হতে পারলাম! জগন্নাথ কলেজের ভর্তি ফরম পেয়েও ওখানে ভর্তি না-হয়ে অনিশ্চয়তাকে বরণ করবার কারণ ছিল বিটিভিতে প্রচারিত সেদিনের সেই আনন্দমেলা।

ঢাকা কলেজে তাঁর ছাত্র হিসেবে প্রথম সায়ীদ স্যারের ক্লাস পেয়েছিলাম ১৯৮১ সালের ২৪ অক্টোবর। সেদিনই তাঁকে আমি প্রথম সামনাসামনি দেখি। স্যারের আগের সপ্তাহের ক্লাসের দিন আমি ছিলাম অনুপস্থিত। ভর্তির আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবার আগেই বোধহয় দু-একটা ক্লাস হয়ে গিয়েছিল। সায়ীদ স্যারের প্রথম ক্লাসটা সম্ভবত সে-কারণেই মিস হয়েছিল আমার।

প্রথম দিনেই সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম সায়ীদ স্যারের ক্লাস হয়েছে কিনা। স্যারের উচ্চ-মাধ্যমিক শ্রেণীর ক্লাসের বক্তৃতা শুনতে আশেপাশের কলেজের ছাত্ররাও চলে আসতো বলে শুনেছি। আর এও শুনেছি যে তিনি রোলকল করতেন না। কারণ এতে ১৫ মিনিট সময় নষ্ট হবে। তাঁর ক্লাস না-করলেও পার্সেন্টেজ দিয়ে দেয়া হয়। স্যারের ক্লাস মজার হয় বলেই এত ছাত্র চলে আসতো।

কিন্তু এখানে শুনলাম ভিন্ন খবর; স্যারের ক্লাসের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়! শুনলাম ছেলেদের খুব অপমান করেছেন তারা শুধু শুধু বাংলায় পড়তে এসেছে বলে। ঘটনা শুনে খুবই খারাপ লেগেছিল। কারণ সেদিন ছেলেরা যে-প্রসঙ্গে না-জানার কারণে অপমানিত হয়েছিল, সেটা ছিল আমার জানার। স্যার বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের নাটক পড়াব। পড়া শুরুর আগে জেনে নিই তোমরা কে কী নাটক পড়েছ। এর মধ্যে মুনীর চৌধুরীর রক্তাক্ত প্রান্তর নাটকের নাম বলা যাবে না। কারণ এইটা উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে পাঠ্য ছিল।’ সুগভীর চিন্তার পর একজন মাত্র ছাত্র জবাব দিয়েছিল, ‘পড়েছি স্যার!’ স্যার খুশি হলেন, যাক একজন তবু পাওয়া গেছে! জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কোন নাটক পড়েছ?’ ছেলেটির জবাব ছিল ‘দেবদাস’ স্যার। এই জবাবের প্রতিক্রিয়াতেই নাকি স্যার বলেছিলেন, ‘তোমাদের সাহিত্য পড়ানো মানে পণ্ডশ্রম। অন্য কোথাও সুযোগ না পেয়ে তোমরা পড়তে এসেছ সাহিত্য! এইভাবে সাহিত্য পড়ে লাভ নেই!’

খুব আফসোস হয়েছিল সেদিন। মনে হচ্ছিল আমি ক্লাসে থাকলে গোটা অনার্স ফার্স্ট ইয়ার ক্লাস সম্পর্কে স্যারের এত খারাপ ধারণা হতো না!

যাহোক, স্যারের দ্বিতীয় ক্লাস কিছুতেই যেন মিস না-হয় সেদিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখলাম। স্যার ক্লাসে এসে যখন কথা বলছিলেন তখন মাঝেমাঝেই কথা বলে উঠছিলাম। আমার উদ্দেশ্য পড়ুয়া হিসাবে স্যারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। স্যার একটু বিরক্ত হলেন আমার আগ বাড়ানো কথা শুনে। বললেন, ‘আরে, একটু চুপ কর তো! বেশি বেশি কথা না বলে আগে পড়াশোনা কর, তারপরে বুঝবা কখন কথা বলতে হবে।’

আমি খুবই প্রতিহত হলাম। ক্লাসশেষে স্যার আমাকে কাছে ডাকলেন, কথা শুনে তো মনে হয় পড়াশোনা করতে চাও। যদি চাও তাহলে রবিবারে আমাদের কেন্দ্রে এসো। আমরা একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছি। ওখানে লাইব্রেরি আছে। বসেও পড়া যায়, বাড়িতেও বই নেয়া যায়। আমাদের ঠিকানা ৩৭ ইন্দিরা রোড। তারপর জায়গাটা বুঝিয়ে দিলেন আমাকে।

স্যার আমাকে যা যা বলেছিলেন তার মধ্যে কেন্দ্রে নিয়মিত বই-আলোচনা ও লাইব্রেরি দুটো বিষয় নিয়েই কথা বলেছিলেন। ফলে সময়ের ব্যাপারটা গুলিয়ে ফেলেছিলাম। আমার মনে ছিল বিকেল ৪টার কথা। সময়ের একটু আগেভাগেই চলে গিয়েছিলাম। স্যার গ্যারেজের ভেতরে প্লাস্টিকমোড়ানো লোহার চেয়ারে বসেছিলেন। দুপুরের খাওয়া সেরে আড্ডা দিচ্ছিলেন। স্যারের সঙ্গে ছিলেন যতদূর মনে পড়ে ডা. লিয়াকত আলি, সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ছাত্র বা ইন্টার্নশীপ করছেন, অর্থাৎ তখনও পুরোদস্তুর ডাক্তার ওয়ে ওঠেন নি বোধহয় – কেন্দ্রের সচিব হিসাবে তখন দায়িত্ব পালন করছিলেন; ছিলেন জাতীয় টেলিভিশন বিতর্কের তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন শাহ আলম সারওয়ার – যিনি এখন আইএফআই সি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক; আর ছিলেন সুশীল সূত্রধর, যাঁর দায়িত্ব কেন্দ্রের মিউজিক রুমের দেখভাল করা, এবং যিনি ছিলেন কেন্দ্রের আবাসিক। কেন্দ্রের পরিবেশটি যে আমার কাছে উন্নত মনে হয়েছিল তা বাস্তবায়িত হতে পেরেছিল তাঁরই তৎপরতা ও তত্ত্বাবধানে।

আগেই বলেছি, যে গ্যারেজে বসেছিলেন স্যার ও অন্যান্যরা সেটা রূপান্তরিত হয়েছিল ক্যাফেটেরিয়াতে। দুপুরবেলা খেতে চাইলে সকালে এসেই চাঁদা দিয়ে নাম তালিকাভুক্ত করে রাখতে হতো। এর ফলে বই নিয়ে আলোচনার পর দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে আড্ডা দিয়ে ধীরেসুস্থে বাড়ি ফেরার সুযোগ হতো। সেদিন আমি তাদের দুপুরের খাওয়া শেষ হবার পরের আড্ডায় গিয়ে পড়েছিলাম। আড্ডার যে স্বল্প সময় সেদিন পেয়েছিলাম তাতেই আমার বোঝা হয়ে গিয়েছিল কতটা উচ্চস্তরের পঠন-পাঠন থাকলে এই রকম আলোচনা করা যায়! এইজন্যেই স্যার আমাকে বলেছিলেন আগে পড়তে, কথা পরে বলতে!

আড্ডা দিতে দিতে চারটা বাজলে গেলাম লাইব্রেরিতে। ততদিনে ভারতীয় তথ্যকেন্দ্র লাইব্রেরি, জাতীয় গণ গ্রন্থাগার, শিশু একাডেমী লাইব্রেরিতে আমার নিয়মিত যাতায়াত থাকায়, দেশ পত্রিকা ও সাপ্তাহিক বিচিত্রা কিংবা সচিত্র সন্ধানী নিয়মিত পড়ায় কী বই পড়তে চাই সে ব্যাপারে আমার মোটামুটি ধারণা হয়ে গিয়েছিল!

লাইব্রেরিতে ঢুকেই অনুভব করলাম এই লাইব্রেরিরই সদস্য হতে হবে আমাকে! যদিও লক্ষ করলাম যে পরিমাণে বই সেখানে খুব বেশি না থাকলেও এমন সব বই আছে যা আমি তখন খুঁজছিলাম। ঢাকা স্টেডিয়ামে তখন ম্যারিয়েটা নামে একটা বইয়ের দোকান ছিল। সেখানে ভারতীয় বাংলা বইয়ের খুব ভালো সংগ্রহ ছিল। আমি প্রায়ই সেখানে যেতাম বই দেখতে। কেনার সামর্থ্য ছিল না বলে উল্টেপাল্টে দেখেই তেষ্টা মিটাতাম। দেখলাম ওখানে যেসব বই দেখেছি তার অনেকগুলিই আছে এখানে। তারপর গেলাম মিউজিক রুমে। শাদা বোর্ডের ওপর লাল লেটারিঙে লেখা – সংগীত কক্ষ। দরজা খুলে উঁকি দিয়ে দেখতে পেলাম অনেকগুলি যন্ত্রপাতি। একটা শেলফে সারি সারি লংপ্লে ডিস্ক। চেঞ্জার যন্ত্র আমি আগেও দেখেছি। চেঞ্জারে একত্রে ছয়টা রেকর্ড চাপানো যায়। সেখান থেকে একটা রেকর্ড নেমে এসে বাজা শেষ হলে নেমে আসে আর একটা। এমন যন্ত্র আমি আগে দেখলেও এতগুলি ডিস্ক রেকর্ড একত্রে এর আগে দেখি নি। পরে মনে হলো, লাইব্রেরিতে যেমন অনেক বই থাকে শেল্ফে তেমনি মিউজিক লাইব্রেরিতে থাকবে রেকর্ড – এমনই তো হবার কথা! কিন্তু মিউজিক রুমটা এমন সুসজ্জিত আর আভিজাত্যপূর্ণ ছিল, আর ধারণাগত দিক থেকে আমার কাছে এতই নতুন লেগেছিল যে বিস্ময়ের ঘোর কাটছিল না।

প্রথম দিনে শুধু বুঝলাম এটাকে বলা হয় মিউজিক লাইব্রেরি। কোন যন্ত্র দিয়ে কীভাবে সংগীত শুনতে হয়, কী ধরনের রেকর্ড সেখানে ছিল সে-সব সম্পর্কে জানতে আমাকে আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কয়েক মাস পরেই আমি দায়িত্ব পেয়েছিলাম সেইসব যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ আর গান রেকর্ডিঙের। ঐ শ্রমের বিনিময়ে আমার লাভ হয়েছিল অনেক ধরনের সংগীত শোনার আভিজ্ঞতা। ঐ সময় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে না গেলে ঐ বয়সে আমার মতো নাগরিক-সংস্কৃতিবিবর্জিত এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান এত বিচিত্র ধরনের গানের রেকর্ড শোনার সুযোগ আর কোথায় পেতাম! গান শুনে আনন্দ লাভ করবার কান তৈরি হতো কী করে! সংগীত শোনার অভিজ্ঞতার কথায় পরে আসছি। তার আগে কেন্দ্রের ‘ক্লাস’-এ যোগ দেয়ার প্রথম অভিজ্ঞতার কথা বলে নেই। এক বিকেলে কেন্দ্রের ভবনে সুসজ্জিত সবকিছু দেখে অধীর আগ্রহে পরের রোববার সকালের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। এবারে আর সময় ভুল হয় নি। পৌঁছে গিয়েছিলাম সকাল সাড়ে নয়টার মধ্যেই। মুখোমুখি হয়েছিলাম সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতার।

(২য় কিস্তি)

[লেখাটির প্রথম কিস্তি বাংলা ওয়েব পোর্টালে প্রকাশিত হয় ১ জানুয়ারি ২০১৪ তারিখে। দ্বিতীয় কিস্তি থেকে এটি সাহিত্য ডটকমে প্রকাশিত হচ্ছে। সুবিধার জন্যে সাহিত্য ডটকমে প্রথম কিস্তিটুকু যুক্ত করা হলো। প্রকাশনার সময় বাংলা ওয়েব পোর্টাল অনুসারে ১ জানুয়ারি ২০১৪ অবিকল রাখা গেল। – বি. স.]

 

SHARE
Next articleYves Saint Laurent
আহমাদ মাযহার
জন্ম: ২৭ মার্চ ১৯৬৩, ঢাকায়। শিক্ষা : ১৯৭৮ সালে ঢাকা খিলগাঁও উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এস এস সি, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে ১৯৮০ সালে এইচ এস সি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৮৩ সালে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে স্নাতক এবং ১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর। ছোটদের জন্য গল্প কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে প্রথম দিকে পরিচিত হলেও সাম্প্রতিক কালে সমাজ-চিন্তা ও গবেষণামূলক প্রবন্ধ, সংস্কৃতি-বিষয়ক রচনা ও সাহিত্য-সমালোচনা লিখছেন। অনুবাদ-রূপান্তর ও পুনর্কথনমূলক লেখালিখিও রয়েছে কিছু। বর্তমানে বাংলা শিশুসাহিত্য নিয়ে এবং সাহিত্যপত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিন বিষয়ে স্বাধীনভাবে গবেষণা করছেন। রচিত-অনূদিত-সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। শিক্ষা ও সংস্কৃতিধর্মী প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের গঠন যুগে দীর্ঘ ১৭ বছর যুক্ত ছিলেন কর্মী হিশেবে। বর্তমানে চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়াও বইয়ের জগৎ নামে একটি ত্রৈমাসিক লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করছেন।