(প্রথম কিস্তির লিংক)

আগের কিস্তিতে বলেছি যে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ‘ক্লাস’ যে সকালে হয় সেটা সায়ীদ স্যারের কাছ থেকে ঠিকভাবে শুনি নি। ফলে ভুল করে প্রথম দিনে চলে গিয়েছিলাম বিকেলে। পরের রোববারে কিন্তু আর সে ভুল হলো না। পৌঁছে গেলাম সকাল নয়টার মধ্যেই।

আমি প্রতিদিন না হলেও মাঝে মাঝে ডায়েরি লিখি সেই উনিশশো আশি সাল থেকে। মাঝে মাঝে অনেক গুরুত্বহীন কথাও লিখে রেখেছি। আবার গুরুত্বপূর্ণ অনেক দিনের কথা লেখা হয়ে ওঠে নি। ১৯৮১ সালে যে খাতায় আমি দিনলিপি লিখতাম সেটা বাঁধানো ভালো ডায়েরি নয়, সেটা ছিল আমার নিজের হাতে বানানো ছোট লম্বাটে একটা খাতা। তখন আমরা দোকান থেকে এক দিস্তা দুই দিস্তা করে ফুলস্কেপ সাইজের কাগজ কিনে নিজেরা খাতা বানিয়ে লিখতাম। আমার ডায়েরিটাও সেই ফুলস্কেপ সাইজের কাগজ ভাঁজ করে বানানো। কোথা থেকে একটা শক্ত বোর্ড পেয়েছিলাম মনে নেই, সেটা দিয়ে কভার বানিয়ে নিয়েছিলাম। কভারসহ কাগজের ওপরে একটি নিচে একটি করে স্ট্যাপলারের পিন দিয়ে আটকে দিয়েছিলাম। স্ট্যাপলার ঢোকানো যায় না বলে স্ট্যাপলারের পাটাতন বাদ দিয়ে হাত দিয়ে চিপে ধরে পিন আটকেছিলাম। কভারের ওপরে লেখা আছে ‘রোজনামচা’। ঠিকানা লেখা আছে ৭২/২/৫ উত্তর যাত্রাবাড়ি, ডেমরা ঢাকা।

ভাড়া নেওয়া ভবনের সামনে সায়ীদ স্যারের অস্টিন গাড়ি
ভাড়া নেওয়া ভবনের সামনে সায়ীদ স্যারের অস্টিন গাড়ি

সেই ছোট্ট ডায়েরিটার পাতা উল্টে দেখলাম কেন্দ্রে প্রথম পা রাখার তারিখ ছিল ৮ নভেম্বর ১৯৮১। সেদিন উপস্থিতির সংখ্যা কত ছিল আজ আর মনে নেই। দেখলাম ডায়েরিতেও কিছু লিখি নি এ সম্পর্কে। কেন্দ্রের পরিবেশ খুবই ভালো লেগেছিল। এতটাই ছিল ভালোলাগা যে সেখানে উপস্থিত হতে পেরে যে নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হয়েছিল। ডায়েরিতে দেখলাম সে-কথাও লেখা আছে। কিছুক্ষণ আলোচনা শুনেই বুঝেছিলাম যারা কথা বলছেন তারা আমার তুলনায় সাহিত্যক্ষেত্রের অনেক বুঝদার ও অগ্রসর মানুষ। মনে মনে ভাবছিলাম এমন একটি রুচিশীল জায়গাই তো খুঁজছি আমি। এটাই তো সেই জায়গা যেখানে সাহিত্যিকদের সঙ্গে আমি মেলামেশা করতে পারব। মনে হয়েছিল এখানে নিয়মিত আসলে এবং লেখাপড়ার চর্চা করলে একদিন না একদিন আমি লেখক হতে পারবই! অনুশীলন সংঘে এসে লেখক-সাহিত্যিকদের সঙ্গে কথা বলে বা মেলামেশা করে ততদিনে যে আমার মনে লেখক হবার বাসনা তীব্র হয়ে উঠেছিল সে-কথা আগের কিস্তিতেও বলেছি।

মনে আছে ৩৭ ইন্দিরা রোডের সে বাড়ির (বড় অ্যাপার্টমেন্ট উঠে জায়গাটার ভূগোল এমন ভাবে বদলে গেছে যে কয়েকদিন আগে ঐ জায়গা পার হতে গিয়ে বাড়িটার এখনকার হাল দেখে খুবই খারাপ লেগেছিল!) বারান্দা ছিল বেশ বড়। ওখানেই হতো কেন্দ্রের ‘ক্লাস’। বারান্দাটায় কোনাকুনি দুইদিকে সাদা রঙকরা মশানিরোধক তারজালের বেড়া দেয়া। সত্যি বলতে কী আমি তার আগে এমন কোনো বাড়ি দেখি নি যেখানে জানালার বাইরে এমন করে নেটের আলাদা দরজা-জানালা আছে। নেটের জানালা-দরজা দেখে এর মশা ঠেকানোর ক্ষমতার চেয়ে আমার কাছে একে বেশ একটা আভিজাত্যের প্রতীক বলে মনে হয়েছিল।

বারান্দা থেকে বেরোবার জন্য নেটের দরজা ছিল একটা। দুই-তিন ধাপ নামলেই খোলামেলা ঘাসাচ্ছাদিত সবুজ লন। বাড়ির দেয়ালের রঙ যেমন সাদা তেমনি তারজালেও ছিল সাদা রঙকরা। লনের ঘাস যত্ন করে ছাঁটা। ভবনের প্রতিটা জায়গায় পরিচর্যার ছাপ। এতটা পরিপাটি কোনো বাড়ি দেখবার অভিজ্ঞতা বলতে আমার ছিল কেবল ফুলার রোডের বৃটিশ কাউন্সিল ভবন। বারান্দার চারপাশে কাঠের সোফা বসানো। সোফার গদির কভার শাদা কাপড়ে তৈরি। মাঝখানে লাল নীল আর হলুদ রঙের প্লাস্টিকের তার প্যাঁচানো গোটা দশ পনেরো লোহার ফোল্ডিং-চেয়ার। বহুদিন এই ফোল্ডিং-চেয়ারগুলি ছিল কেন্দ্রের পরিচিতি-চিহ্ন।

যতদূর মনে পড়ছে আমি যেদিন প্রথম ক্লাসে বসেছিলাম সেদিন আলোচনা হয়েছিল লালন ফকিরের কবিতা নিয়ে। লালনের জীবন-পরিচিতি লিখে এনেছিলেন যিনি তাঁর নাম তোফায়েল আহমদ; আলোচনার পরে জেনেছিলাম তিনি সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্র। লালনের জীবনপরিচয় তুলে ধরতে যে রচনা পাঠ করেছিলেন সেটা খুবই ভালো লেগেছিল। কেন্দ্রে আসবার আগে আগে ফরিদা পারভীনের গান শোনা ছাড়াও লালনের গান পড়েছিলাম। সেদিন আলোচনা হয়েছিল বাংলাভাষার মধ্যযুগের ও আধুনিকতা-পূর্ব যুগের কিছু কবিতা নিয়েও। বলতে গেলে প্রায় সকলের আলোচনাই যাচ্ছিল আমার মাথার ওপর দিয়ে। তবু একটা অসাধারণ ভালোলাগার বোধে আমি আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম দিনের বাকি সময়টুকু জুড়ে।

সেদিন দুপুরের খাবার খেয়েছিলাম কেন্দ্রের কেন্টিনে। টিনের বড় সাদা থালার একপাশে ভাত ও বড় আকারের বেগুন ভাজার চাকতি, আর ছিল রুই মাছের মুড়িঘণ্ট! মনে পড়ে সেদিন যাঁদের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম তাঁরা হলেন: লিয়াকত ভাই, সারওয়ার ভাই, কায়েস ভাই, নাঈম ভাই, জাকারিয়া ভাই, আমির ভাই, শামসুল আলম জীবন ভাই, জুয়েল ভাই, ফরিদা আপা; আর একজন ছিলেন সেদিন, তিনি সুশীলদা।

কেন্দ্রের ‘ক্লাস’ সেদিন আমাকে যতটা না বিস্মিত করেছিল আমার মনে তার চেয়ে বেশি অবাক-করা আনন্দ জাগিয়েছিল এঁদের সবার উপস্থিতি। দুপুরের খাবারের সময়ে ও তার পরে যে মুক্ত আড্ডাটি সেদিন হয়েছিল এবং ওখানে যে-সব কথা হয়েছিল তার সবটা সেদিন বোধগম্য ছিল না আমার পড়াশোনার স্বল্পতাহেতু। দুপুরের খাবারের পরে খানিক সময় আড্ডা দিয়ে অনেকেই চলে গেলেও আমি অপেক্ষা করলাম লাইব্রেরি খোলার সময় হওয়া পর্যন্ত। সায়ীদ স্যারও রইলেন।

কায়েস ভাই, মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস। সুশীল সূত্রধরের তোলা ছবি। - লেখক
কায়েস ভাই, মোহাম্মদ মিজারুল কায়েস। সুশীল সূত্রধরের তোলা ছবি। – লেখক

প্রথম দিন বই নিয়ে আলোচনা না পেলেও লাইব্রেরি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সমসময়ে প্রকাশিত বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক বইই সেখানে দেখলাম যার অনেকগুলি স্টেডিয়ামের তখনকার বিখ্যাত বইয়ের দোকান ম্যারিয়েটা/আইডিয়াস-এ দেখেছি। কিন্তু কিনবার যেমন সামর্থ্য ছিল না, তেমনি ছিল না পড়বারও সুযোগ!

স্যার আমাকে বললেন, রিডিং রুমে বসে পড়তে হলে টাকা লাগে না, তবে বাড়িতে বই নিতে হলে ৩০০ টাকা নিরাপত্তা অর্থ দিতে হয়। মাসিক চাঁদা মাত্র ১০ টাকা। এ-কথা ঠিক যে মাত্র ১০ টাকা হলেও আমার পক্ষে সেটাও যোগাড় করা কম কঠিন ছিল না তখন। নিরাপত্তা অর্থের ৩০০ টাকাও যে আমার পক্ষে যোগাড় করা কঠিন সেটা বোধহয় আমার মুখ দেখে স্যার বুঝতে পেরেছিলেন। তাই বলেছিলেন, “নিরাপত্তা অর্থও কিস্তিতে দেয়া যায়। প্রথমে ১০০ টাকা দিয়ে শুরু করতে পারবে। মাসে মাসে ৫০ টাকা করে দিয়ে সেটা পুরো করতে পারবে! সেই ক্ষেত্রে নিরাপত্তা অর্থের এক তৃতীয়াংশ মূল্যের মানে ৩৩ টাকার চেয়ে বেশি দামের বই নিতে পারবে না।”

নতুন পলিথিনমোড়া বইগুলি আমাকে খুবই লোভী করে তুলেছিল। বইয়ের প্রচ্ছদ যাতে নষ্ট না হয় সেজন্য স্যার বইয়ের ওপর পলিথিন মুড়িয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। সত্যি বলতে কী এইভাবে পলিথিন মোড়ানো বই দেখার অভিজ্ঞতা এর আগে হয় নি আমার। সে-সময় কাজটি করতে দেখেছিলাম লকিয়তুল্লাহ ভাইকে! তাঁর সঙ্গে কথা বলে জানলাম স্যার তাঁকে নিয়ে এসেছিলেন সরকারি বিজ্ঞান কলেজ থেকে। তাঁর কাছেই শুনলাম স্যার একসময় সেই কলেজের প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন। তিনি ছিলেন স্যারের আস্থাভাজন!

সদস্য হতে হবে লাইব্রেরির! দ্বিতীয় দিনে লাইব্রেরিতে পড়তে এসেছিলাম বিকেল বেলা। সুশীলদাকে মানে সুশীল সূত্রধরকে পেয়েছিলাম সেদিনও। তিনি তখন তারুণ্যের পুরো ফর্মে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের ছাত্র। কথা বলে জানলাম কেন্দ্রে তিনি তখন ছিলেন মিউজিক লাইব্রেরির দায়িত্বে। রাতেও ওখানেই ঘুমাতেন। ঝকঝকে কেন্দ্রের দেখভাল করার জন্য দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিশেবে তিনি এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

জাকারিয়া ভাই, জাকারিয়া আহমেদ। সুশীল সূত্রধরের তোলা ছবি। - লেখক
জাকারিয়া ভাই, জাকারিয়া আহমেদ। সুশীল সূত্রধরের তোলা ছবি। – লেখক

লাইব্রেরিতে তখন বই ভুক্তি করার জন্য লাইব্রেরি সায়েন্সে ডিগ্রিধারী ইদ্রিস ভাই দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁকে দেখলাম বইয়ের গায়ে ও বিশাল আকারের ভুক্তি খাতায় ভুক্তি নম্বর বসাতে। ইদ্রিস ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় হলো। তিনি তখন ছিলেন সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজের লাইব্রেরিয়ান। তাঁকে লিয়াকত ভাই নিয়ে এসেছিলেন। বিকেলে দু-তিন ঘণ্টা সময় দিতেন। পরে জেনেছিলাম এই কাজ করে যা পেতেন তাতে তাঁর সংসারে তেমন কিছু যোগ হতো না। তবে কেন্দ্রে পরিবেশ তাঁর খুব ভালো লাগে। একটি ভালো কাজের সঙ্গে থাকা যাচ্ছে বলে তিনি কাজটা চালিয়ে যাবার ইচ্ছে রাখেন। তিনি স্বভাবেও খানিকটা নিভৃতচারী। বিকেলে দুই-তিন দিন গিয়েই তাঁর সঙ্গে মৃদু খাতির জমিয়ে এই কথাগুলি জেনে নিলাম।

দিনদুনিয়ার বিষয়ে আমি তখন এতটাই অজ্ঞ ছিলাম যে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, “এই ভুক্তি নম্বর দিলে লাভ কী।” আমার গাধামার্কা প্রশ্ন শুনে ইদ্রিসভাই হেসে ফেললেন। বললেন, “বইগুলি কিনলেই তো খালি চলবে না, এগুলির হিসাবও রাখতে হবে। বইগুলি লাইব্রেরির সদস্যরা বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। কারও কাছ থেকে হারিয়ে গেলে কীভাবে বোঝা যাবে কোন সংস্করণের, কত পাতার, কত দামের বই হারিয়ে গেছে? এ জন্য প্রত্যেকটা বইয়েরই একটা ভুক্তি নম্বর থাকতে হবে। ভুক্তিনম্বর অনুসারে ভুক্তি খাতায় বইয়ের সব তথ্য লেখা থাকতে হবে। আমি বইগুলির ভুক্তি করছি মানে এই ভুক্তিখাতায় বইয়ের তথ্যগুলি লিখছি আর বইয়ের ভুক্তি নম্বরটি খাতায় যেমন তুলছি তেমনি বইয়ের টাইটেল পৃষ্ঠায়ও নম্বরটা তুলে সিল মারছি। অর্থাৎ এই বইটা যে এই লাইব্রেরির সেটা চিহ্নিত করে রাখলাম।”

আরেকটা কাজ করলেন তিনি, প্রতিটা বইয়ের শিরোনামপৃষ্ঠায় তো লিখলেনই ১০০ পৃষ্ঠায় এবং শেষ পৃষ্ঠায়ও ভুক্তি নম্বরটা লিখলেন। আবারও গাধার মতো জিজ্ঞাসা করলাম, “১০০ পৃষ্ঠার ভেতরে সেলাইয়ের ফাঁকে নম্বরটা আবার লিখলেন কেন?”তিনি বললেন, “বইয়ের শিরোনামপৃষ্ঠা অনেকের হাতে হাতে ঘুরতে ঘুরতে ছিঁড়ে যেতে পারে। প্রায়ই এমন হতে দেখা যায়। ফলে প্রথম ও শেষ পৃষ্ঠার নম্বরের ওপর পুরো ভরসা করা যায় না। তখন ভেতরের ভুক্তিনম্বর থেকে বইয়ের পরিচয় উদ্ধার করা যাবে। একটা হারিয়ে গেলে ভুক্তি নম্বরগুলি দেখে তো বলা যাবেই যে এই বইয়ের যতগুলি কপি কেনা হয়েছিল তার মধ্যে ঠিক কোন কপিটা হারিয়ে গেছে। তা ছাড়া আবার বিভিন্ন সময় একই নামের বই কেনা লাগতে পারে। তখনও কত কপি বই কিনতে হবে তা ঠিকঠাক মতো হিসাব করা যাবে। এগুলি লাইব্রেরি সায়েন্সের ব্যাপার। সারা দুনিয়াতেই এভাবে বইয়ের তথ্য সংরক্ষণ করা হয়!”

একদিনেই আমাকে লাইব্রেরি সায়েন্সে অনেকটা অভিজ্ঞ করে ফেললেন ইদ্রিস ভাই। হাতেকলমে লাইব্রেরি সায়েন্সের দীক্ষা পেয়ে গেলাম তাঁর কাছ থেকে!

শাহ আলম প্রধান, ১৯৮২। সুশীল সূত্রধরের তোলা। - লেখক
শাহ আলম প্রধান, ১৯৮২। সুশীল সূত্রধরের তোলা। – লেখক

আমি প্রায় প্রতিদিনই যেতে লাগলাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। একদিন লক্ষ করলাম একেকটা বইয়ের অনেকগুলি করে কপি কেনা হলেও ইদ্রিসভাই ভুক্তি নম্বর লিখছেন ২ বা ৩টি কপিতে। আবার যেগুলি ৩ কপি বা ২ কপি আছে তার সবগুলিতেই ভুক্তি নম্বর তুলছেন। ইদ্রিসভাইয়ের কাছ থেকে কয়েকদিন আগে যে-কথা শুনেছিলাম তাতে কেমন যেন লাগল। দুই তিন দিন পর একদিন জিজ্ঞাসাই করে ফেললাম তাঁকে। আবারও হেসে ফেললেন তিনি। বললেন, “সবগুলি বইয়ের কাজ একা হাতে করতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু স্যার চান সবাই যেন এখনই বই পড়তে পারে। তাই এই বুদ্ধি করা হয়েছে। দুই তিন কপি এন্ট্রি করে শেলফে দিয়ে দেয়া হচ্ছে। বাকিগুলি সদস্যদের দেয়া হচ্ছে না! ভুক্তি শেষ হলে দেয়া হবে!”

“এতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ হয়ে গেলে না একটু!”

“তা তো হলোই! কিন্তু তা না হলে যে আগামী এক বছরেরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে বইয়ের জন্য!”

ভুক্তি সম্পর্কে ইদ্রিসভাইয়ের কাছ থেকে আরো জেনেছিলাম যে বইগুলির সব তথ্য ভুক্তিখাতায় তোলার পরেই এর বিল-ভাউচার হিসাব বিভাগের কাছে যাবে। প্রতিদিনই যেতাম বলে তাঁর সঙ্গে অল্প অল্প করেও অনেক কিছু জানতে বুঝতে শিখতে লাগলাম। তাঁর কাছে দেখে দেখে শিখলাম কীভাবে টাইটেল কার্ড, অথরকার্ড বা সাবজেক্টবার্ড বানাতে হয়। জানলাম কীভাবে বড় বড় লাইব্রেরির হাজার হাজার বইয়ের মধ্য থেকে কাঙ্ক্ষিত বইটাকে খুঁজে বের করা হয়! ডিউইডেসিমেল সিস্টেমে কীভাবে শেলফে বই সাজানো হয়!

আমি সে-সময়টাতে থাকতাম উত্তর যাত্রাবাড়ি এলাকায়। ওখানে তখন বিদ্যুৎ গেলেও ওয়াসার পানির লাইন যায় নি। বর্ষাকালে বেশ পানি ওঠে চারপাশে। যাতায়াত ব্যবস্থা আমাদের কাছে দূরত্ব বিবেচনায় খুবই ভালো। দশ পনেরো মিনিটের হাঁটা পথ পাড়ি দিলেই যাত্রাবাড়ি চৌরাস্তায় চলে আসা যেত। ওখান থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম বা ঢাকা নারায়ণগঞ্জ রুটের গুলিস্তানগামী যে কোনো বাসেই উঠে পড়তাম। গুলিস্তান আসতে দশ-পনেরো মিনিটের বেশি লাগত না। গুলিস্তান মোড় থেকে মিরপুর বা মোহাম্মদপুরগামী বাসে ফার্মগেট এলাকায় আসতে সাকুল্যে বিশ পঁচিশ মিনিটের বেশি লাগত না! ফার্মগেট থেকে ইন্দিরা রোড তো দশ মিনিটের পায়ে-হাঁটা পথ!

আমি করতাম কী, নাস্তা খেয়ে সকাল সাতটা-সাড়ে সাতটায় বেরিয়ে পড়তাম। গুলিস্তান হয়ে চলে যেতাম ঢাকা কলেজে। দুপুর বেলা কলেজ কেন্টিনে কিছু খেয়ে নিতাম। ক্লাস না থাকলে কোনো কোনো দিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউর ভারতীয় তথ্যকেন্দ্র লাইব্রেরিতে চলে আসতাম। ওখান থেকে চারটার একটু আগেই বেরিয়ে পড়তাম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের উদ্দেশে। বেশি আগে ফার্মগেটে চলে এলে সময় কাটাতাম ফুটপাথের স্টলে দাঁড়িয়ে পত্রিকা পড়ে।

খুবই দারিদ্রপূর্ণ অবস্থা হলেও তখনই আমি টাকা বাঁচিয়ে পত্রিকা বা বই কিনতাম। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে অনেকগুলি পত্রিকা উল্টালেও কোনো কোনো স্টল থেকে আমার পত্রিকা পড়া নিয়ে আপত্তি উঠত না। অন্যদের উদ্দেশ্যে স্টলের লোকদের আমি বলতে শুনেছি পত্রিকা নিলে নেন, না নিলে সরে গিয়ে অন্যদের দেখতে দেন। আমি কেবল নিয়মিত পত্রিকা কিনতাম বলেই নয়, হয়তো আমার মতো অল্পবয়সী একটা ছেলে মনোযোগ দিয়ে পত্রিকা পড়ে ও কেনে বলে পাঠক হিশেবেই তাদের কাছে আমি সমীহ পেতাম। পত্রিকার স্টলে প্রথম এ-রকম খাতির পেয়েছিলাম পল্টন মোড়ের কাছে বায়তুল মোকাররমের কোণার স্টলে গোলাম রহমানের কাছে। ফার্মগেটেও বাস থেকে নেমে ইন্দিরা রোডের দিকে যাওয়ার সময় ফুটপাথে তিন-চারটি পত্রিকার স্টল ছিল। ওখানকারও আমি নিয়মিত পাঠক ছিলাম।

রিয়াজুল হক জুয়েল। সুশীল সূত্রধরের তোলা।  - লেখক
রিয়াজুল হক জুয়েল। সুশীল সূত্রধরের তোলা। – লেখক

সে-সময়টাতে আমি ছিলাম সর্বগ্রাসী পাঠক। অনুশীলন সংঘ বা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে আমি জানতে পারতাম ভালো বই কী পড়তে হবে। কিন্তু পত্রিকা পড়া ছিল আমার একরকম নেশা। স্থূল বিনোদন পত্রিকা থেকে শুরু করে গাম্ভীর্যপূর্ণ পত্রিকা — সবই আমার পড়তে ইচ্ছে হতো। সে-সময়ই আমার ছোটদের পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন ও সাহিত্যপত্রিকা সংগ্রহের সূচনা। যা হোক সে-সব কথা পরে আরও বলা যাবে। সংগীত কক্ষের কথা এখনও অনেক বাকি আছে। কারণ ‘সংগীত কক্ষ’ বা মিউজিক লাইব্রেরি সম্পর্কে নতুন জানতে পারার ঘোর আমার শেষ হচ্ছিল না।

বইয়ের লাইব্রেরি সম্পর্কে তো জানতামই। ততদিনে কারো কারো ব্যক্তিগত সংগ্রহের বিশালতা দেখে বিস্ময়ও খানিকটা কেটে গিয়েছিল। কিন্তু লংপ্লে ডিস্ক-রেকর্ডের বা ক্যাসেটের এমন সংগ্রহ কারো বাড়িতে আমার তখনও চোখে পড়ে নি। (পড়বে কী করে! আমার জন্ম ও বেড়ে-ওঠা যে কোনো জমিদার পরিবারে নয়, নগর-সংস্কৃতিবিবর্জিত হতদরিদ্র কৃষি পটভূমির পরিবারে! এমন উন্নত রুচির কোনো নিকট আত্মীয়স্বজনও যে আমার ছিল না তখন!) সায়ীদ স্যার যখন মিউজিক লাইব্রেরি সম্পর্কে বুঝিয়ে বললেন তখনও যেন ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না!

সে-কালে ডিস্ক রেকর্ড শোনার জন্য টার্ন টেবিল বা চেঞ্জার নামে এক ধরনের যন্ত্র ছিল। চেঞ্জার আমি দেখেছিলাম ছিয়াত্তর-সাতাত্তর সালে ঢাকার শাহজাহানপুরে, এক প্রতিবেশীর বাড়িতে। ৬টি ডিস্ক একত্রে চড়িয়ে দিলে একটার পর একটা ঘূর্ণায়মান পাটাতনের ওপর নেমে আসত এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে পিন এসে রেকর্ডের ওপর বসত। ঘূর্ণায়মাণ ডিস্কের শেষপ্রান্তে পিনটা এসে নামলে ঘুরে ঘুরে চলে আসত ডিস্কের কেন্দ্রের কাছাকাছি। শেষ হয়ে গেলে পিনটা আবার সরে যেত। দ্বিতীয় ডিস্কটা পাটাতনের ওপর নেমে এলে আবার পিনটা গিয়ে বসতো ডিস্কের বাহির দিকের প্রান্তে।

আগেই চেঞ্জার দেখেছিলাম বলে গ্রামোফোন যন্ত্রের সঙ্গে এর পার্থক্যটুকু খানিকটা বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু গানের শব্দ ভালো করে শোনার জন্য যে অ্যামপ্লিফায়ার লাগে, ভালো মানের স্পিকার লাগে সে-সম্পর্কে আমার প্রায় কোনো ধারণাই ছিল না। আমি স্পিকার বলতে দেখেছি রেডিও সেটের সঙ্গে লাগানো স্পিকার। সত্যি বলতে কী ‘বোস’-এর লোগো লাগানো স্পিকারগুলি এতটাই দৃষ্টিনন্দন লেগেছিল যে আমি একেবারে অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। দেখলাম সুশীলদা ফ্লানেল জাতীয় কাপড় দিয়ে যত্ন করে রেকর্ড মুছছেন। চুপচাপ দেখতে থাকলাম। পাশাপাশি ডিস্ক রেকর্ড বাজিয়ে ডিস্কের গান বা মিউজিক ডেক সেটের ক্যাসেটে কপি করছেন। ডেকসেট সম্পর্কেও আমার একেবারেই কোনো ধারণা ছিল না তখন। এ ছাড়াও ওখানে বড় বড় ক্যাসেট রেকর্ডার দেখেছিলাম দুটি। ক্যাসেট থেকে ক্যাসেটে ভালো মানের রেকর্ডিং হতো।

পরিচয়ের প্রথম দিনেই টের পেয়েছিলাম যে, সুশীলদা বেশ ছটফটে স্বভাবের মানুষ। তাঁকে বেশি কিছু জিজ্ঞাসা করলাম না। এক সময় সায়ীদস্যার এসে ঢুকলেন সংগীত কক্ষে। তিনি হয়তো আমার কৌতূহলী চেহারা লক্ষ করেছিলেন। অথবা এইসব বিষয়ে অজ্ঞতার ছাপ আমার চোখেমুখে এতটাই প্রকট হয়ে উঠেছিল যে সবকিছু বুঝিয়ে দেয়া সমীচীন মনে করেছিলেন। ধীরে ধীরে আমাকে সংগীত কক্ষ ও এর বিচিত্র সব সামগ্রী সম্পর্কে ধারণা দিলেন। বুঝলাম ডেকসেট থেকে অ্যামপ্লিফায়ার ও ইকুইলাইজার হয়ে স্পিকারে যখন শব্দ যায় তখন তার মান হয় খুব ভালো। ওখানে আলাদাভাবে রাখা ইকুইলাইজার যন্ত্রটিও আমাকে কতটা যে বিস্মিত করেছিল তা বলে বোঝাতে পারব না।

সুশীল সূত্রধর, ১৯৮২ সালে। আমার তোলা ছবি। - লেখক
সুশীল সূত্রধর, ১৯৮২ সালে। আমার তোলা ছবি। – লেখক

লজ্জায় স্যারকে জিজ্ঞাসাও করি না পাছে আমার মূর্খতা আরো বেশি প্রকট হয়ে পড়ে! কিন্তু স্যার তো ঠিকই বুঝে ফেলেছেন আমার হাল। তিনি বললেন, ভালো যন্ত্রে সংগীত শুনলে সংগীতের সূক্ষ্মতা অনুভব করা যায়। সেজন্যেই এতসব আয়োজন এখানে। তারপর স্টেরিও ও মনো সাউন্ড সম্পর্কেও ধারণা দিলেন। আমার ধারণা এখনকার ঐ বয়সের যে কোনো ছেলেমেয়েই এসব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

কয়েক সপ্তাহ পরে সংগীত কক্ষের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই কেন্দ্রে আমার নিয়মিত দায়িত্ব পালনের শুরু হয়েছিল। এত এত রেকর্ড, ডেকসেট, স্পীকার — এইসব দেখে সংগীত বিষয়ে অনেক আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। সে-সব কথা বলা যাবে পরের কিস্তি থেকে।

***

অনুশীলন সংঘে যাবার সময় থেকেই আমার মনে লেখক হবার স্বপ্ন তীব্র হয়ে উঠেছিল। তবে খানিকটা হতাশাও এর পেছনে পেছনে কাজ করত। কারণ ততদিনে আমি এটুকু উপলব্ধি করতে সমর্থ হয়েছিলাম যে, সত্যিকারের বড় লেখকেরা একদিকে যেমন হন উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন তেমনি আরেক দিকে হয়ে থাকেন অনেক জ্ঞানীও। সুতরাং লেখক হতে হলে অনেক কিছু শিখতে ও জানতে হবে আমাকে। কেন্দ্রে এসে প্রথম দিনেই আমার অজ্ঞতা ও মূর্খতার অনুভব নিজেকে এতটাই হীনম্মন্য করে তুলেছিল এবং তা অতিক্রমের আকাঙ্ক্ষা এতটাই দুর্মর হয়ে উঠেছিল যে আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম এখানে যতটা বেশি সম্ভব সময় আমি কাটাবো! এটুকু বোঝার মতো বুদ্ধি আমার হয়েছিল যে, লেখক হতে হলে অনেক সাধনা করতে হবে আমাকে। এর কোনো বিকল্প নেই!

তখন সাপ্তাহিক সরকারি ছুটির দিন ছিল রোববার। তাই প্রতি সপ্তাহের এই দিনে বসত কেন্দ্রের ‘ক্লাস’। স্কুল-কলেজে যে অর্থে ক্লাস বসে কেন্দ্রের ক্লাস ঠিক সে-রকম নয়। সেজন্য ‘ক্লাস’ কথাটা দিয়ে সেই ‘ক্লাসে’র ধরন বোঝানো যাবে না। প্রথম দিন ক্লাসে থেকে বুঝলাম, যে একটা বই নিয়ে আলোচনায় উপস্থিত সবাই আলোচ্য বইটি পড়ে এসেছেন। একে একে প্রায় সবাই কথা বললেন। কারো বলা ভালো লাগছিল, কারোটা তেমন নয়। তবে দেখলাম সকলেই কথা বললেন অকপটে। আরো ব্যাপার দেখলাম যারা বই পড়েন তারা তাদের পঠিত বইয়ের কিছু উদ্ধৃতি নোট খাতায় টুকে এনেছেন। সেই টোকাটুকু কেন ভালো লেগেছে তা বলে একে একে সবাই পড়েও শোনালেন। আমার কাছে বেশ কৌতূহল-উদ্দীপক লেগেছিল ব্যাপারটা।

একেবারে প্রথম দিকের এক দিনের কথা মনে পড়ছে। স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে তাহলে সেদিন ছিল গোয়েটের ‘যুবক হ্বের্টরের দুঃখকষ্ট’ বই নিয়ে আলোচনা। নাঈম ভাই সেদিন গোয়েটের পরিচিতি দিয়েছিলেন। বলতে গেলে গোয়েটে সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা সেদিনই আমি অর্জন করেছিলাম। খুব গুছিয়ে সুন্দর বললেন তিনি। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলাম নাঈম ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির ছাত্র। আরো অনেকেই অংশ নিলেন আলোচনায়। কথা বললেন যে যার বুঝমতো। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন বেশি অগ্রসর। কেউ কেউ এমন প্রসঙ্গ তুললেন যা ঠিক সাহিত্য আলোচনার বিষয় নয়! সেদিনই আমি প্রথম জেনেছিলাম গোয়েটের জীবনে সতেরোটি প্রেম ছিল। তার প্রেমিকাদের কারও কারও কথাও কথাও বোধ হয় নাঈম ভাই বলেছিলেন কিন্তু সে-সব এখন আর কিছু মনে নেই! কেবল সতেরো সংখ্যক প্রেমের কথাই মনে আছে। তবে এটা মনে আছে ‘যুবক হ্বের্টরের দুঃখ’ উপন্যাসটা পড়ে খুব ভালো লেগেছিল। আমিও একটা খাতা বানিয়েছিলাম উদ্ধৃতি লিখে রাখবার জন্য। ঐ বইটা থেকে বেশ কিছু লাইন লিখেও রেখেছিলাম বলে মনে পড়ে। স্যারের উদ্ধৃতি খাতা সংরক্ষণের নিয়মটা খুবই পছন্দ হয়েছিল আমার। সেই উদ্ধৃতি খাতাটা খুঁজলে হয়তো এখনও পাওয়া যেতে পারে।

কায়েস ভাইয়ের কথা তো আমি সেদিন প্রায় কিছুই বুঝলাম না। এর তার কাছে জিজ্ঞাসা করে জানলাম তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ডাক্তারির ছাত্র; কিন্তু ইদানিং ক্লাসে যান না। কার কাছ থেকে শুনেছিলাম তা আজ আর মনে নেই। কিন্তু যিনি তথ্যটা দিয়েছিলেন তাঁর কথা থেকে এটুকু বুঝলাম কায়েস ভাই এতই মেধাবী, এত কিছুই পড়া আছে যে তার ডিগ্রিফিগ্রি না থাকলেও চলে। তাঁর কথা যে ঠিক তার প্রমাণ কায়েস ভাইয়ের বক্তব্যে পেয়েছিলাম। বক্তৃতায় এমন অনেক রেফারেন্স ছিল যার মাথামুণ্ডু আমি কিছুই বুঝি নি। বলেছিলেনও দীর্ঘ সময় ধরে!

প্রথম দু-তিনটি ক্লাসের একটিতে কথা শুনেছিলাম জাকারিয়া ভাইয়ের। তাঁর পুরো নাম জাকারিয়া আহমেদ। তিনি তখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল সায়েন্স ফ্যাকাল্টির মেধাবী ছাত্র। তাঁর কথাও খুব ভালো লাগল আমার। জাকারিয়া ভাইয়ের কথায় মার্কস-এঙ্গেলসের প্রসঙ্গ ছিল। শুধু জাকারিয়া ভাইই নয়, আরও কারও কারও কথায় মার্কস-এঙ্গেলসের প্রসঙ্গ ছিল। মার্কস-এঙ্গেলসের প্রসঙ্গ টেনে তাঁর কথা শুনে আমি চমকিত হলাম। সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে তাঁদেরটা একটু ভিন্ন লাগল। অন্তত আমি এমন ধারণাই পেয়েছিলাম। তবে কেন্দ্রের আলোচনায় তাঁদের সমালোচনাও হতে শুনেছি তখন। সেদিনের ক্লাসেই শ্মশ্রুমণ্ডিত ও সুদর্শন এনামুল ভাইকে পেয়েছিলাম কিনা নাকি পরের কোনো এক ক্লাসে মনে নেই, লক্ষ করলাম, এনামুল ভাইও বেশ গুছিয়ে সুন্দর ও স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বললেন।

কায়েস ভাইয়ের পরিচয় ভালোভাবে পেতে আমাকে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়েছিল। লক্ষ করেছি সারওয়ার ভাইয়ের কথা। তাঁর বক্তব্য আমি কিছুটা বুঝতে পারছিলাম। নানা তত্ত্ব সম্পর্কে বিস্তৃত পঠনপাঠন আছে তাঁর। পরে জেনেছি সারওয়ার ভাই অর্থনীতির ছাত্র। আমি টেলিভিশনের নিয়মিত দর্শক ছিলাম না বলে তখনও জানতাম না যে তিনি পরপর কয়েক বছর জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তাঁর কথা শুনে যে ভালো লাগত তার একটি কারণ অল্প সময়ের মধ্যে স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বলতে পারতেন তিনি। কেন্দ্রে আমার যাতায়াত শুরুর কয়েকদিনের মধ্যে শাহ আলম সারওয়ার-ঝর্ণার বিয়ে হয়। তাঁরা দুজনে সহপাঠী এবং তখনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্র। এক রোববার বিকেলবেলা কেন্দ্রের সবাইকে আপ্যায়ন করলেন তাঁরা! কেন্দ্রের সকলকেই নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল। একেবারে নতুন হওয়া সত্ত্বেও আমিও ছিলাম নিমন্ত্রিতদের মধ্যে। হাস্যময়ী ঝর্ণা ভাবিকে সেদিনই প্রথম দেখেছিলাম মনে হয়। পর পর কয়েকটি ক্লাসে উপস্থিত থেকে এবং সারওয়ার ভাই-ঝর্ণা ভাবির বিয়েতে সকলের কথাবার্তা শুনে আমার মনে হয়েছিল যাঁরা বেশি জানে তারাই বেশি হাসতে পারে। লক্ষ করেছিলাম এত এত কঠিন কথা সবাই যেমন বলছে তেমনই আবার নিজেদের মধ্যে হাসি-ঠাট্টাও চলছে সমানে।

প্রতি রোববারে না হলেও নিয়মিতই আসতেন নাঈম ভাই। তিনিও সুন্দর কথা বলতেন। জানলাম নাঈম ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। যেমন মার্জিত তাঁর বাংলা উচ্চারণ তেমনই ইংরেজি। গলার স্বরও সুন্দর। তাঁর আলোচনা শুনে শুনে অনুভব করেছিলাম যে তিনি একই সঙ্গে সৌন্দর্য ও পরিশীলনপন্থী। ধীরে ধীরে জানলাম ‘রৌদ্রের রঙ’ নামে একটা সাহিত্য পত্রিকাও সম্পাদনা করেন তিনি। তাঁর কথাবার্তায় পরিশীলনমুখীনতার পরিচয় এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে তাঁকে একটু বেশি উন্নাসিক মনে হতো। যেমন কেন্দ্রে যাওয়া-আসা শুরুর একেবারে প্রথম দিকে একদিন তিনি বলেছিলেন বাংলাদেশে সফল উপন্যাস বেশি লেখা হয় নি। আমি আমার স্বল্পবিদ্যা নিয়ে প্রতিবাদ করে বলেছিলাম, “কেন, মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’ কি ভালো উপন্যাস নয়?”

জবাবে তাঁর কথা শুনে আমার হৃদয় একেবারে ভেঙে খান খান হয়ে গিয়েছিল! তিনি বলেছিলেন, “হ্যাঁ ভালো লেখা, তবে ওটা তো উপন্যাসের একটা তরঙ্গ মাত্র!” তখন কেন্দ্র সম্পর্কে এমন একটু কানাঘুষাও শুনতাম যে ওখানে কিছু আঁতেল যায় যারা চারপাশের সবকিছুকে কেবল নস্যাৎ করে দেয়! তখন বুঝলাম সে-কথার তাৎপর্য!

সে-সময় যাঁরা কেন্দ্রের পাঠচক্রে নিয়মিত কথা বলতেন তাঁদের মধ্যে জাকারিয়া ভাইও ছিলেন খুব তীক্ষ্ণবক্তা। তাঁরা দুই ভাই একত্রে আসতেন। জাকারিয়া ভাই ছিলেন ছোট, বড় ভাইটির নাম মনে করতে পারছি না। কিন্তু মেধায় যে ছোটভাইটি তীক্ষ্ণতর সেটা বড় ভাইও খুব প্রসন্নতার সঙ্গে অনুমোদন করতেন।

নিজামউদ্দিন আহমেদ নামে স্বল্পভাষী আরেকজন আসতেন তখন কেন্দ্রে। তিনি খুব বেশি কথা বললেন না। কিন্তু যা দু-একটা কথা বললেন তাতে তাঁকেও আমার ভালো লাগল। তিনিও সে-সময় মেধাবী ছাত্র ছিলেন। সায়ীদস্যারই তাঁর পরিচয় দিয়েছিলেন আমাকে। বলেছিলেন, “নিজাম কবিতাও লেখে।”

লিয়াকত ভাই ছাড়াও তাঁদের সমসাময়িক আরেকজন ডাক্তারকে পেয়েছিলাম। তিনি মাহমুদ খসরু। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়তেন তখন। আজিমপুরে ছিল তাঁর পৈত্রিক বাড়ি। কেন্দ্রের বই-আলোচনায় থাকতেন নিয়মিত।

প্রথম দিকের আরেকজন ছিলেন জুয়েল ভাই। তাঁর পুরো নাম রিয়াজুল হক জুয়েল। তিনি তখন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে গ্র্যাজুয়েশন করছিলেন ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে। প্রথম দিকের প্রায় সবগুলি ক্লাসেই তিনি কথা বলেছিলেন বলে মনে পড়ে।

সামসুল আলম জীবন ভাইয়ের কথাও মনে পড়ে গেল। ঢাকার শান্তিবাগ এলাকায় থাকতেন। পারিবারিক সূত্রে তাঁদের প্রেস ছিল একটা। তাঁর স্ত্রীও আসতেন কেন্দ্রে, তিনি বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন। সরকারী কলেজে অধ্যাপনা সূত্রে ঢাকার বাইরে পোস্টিং হয়ে যাওয়ায় সবসময় আসতে পারেন না বলছিলেন।

ফরিদা আপার কথা কেন যে এতক্ষণ মনে এল না! প্রথম ক্লাসেই তাঁকে পেয়েছিলাম। প্রথম দিনের ক্লাসের পরেই ফরিদা আপা আমার সঙ্গে খুব আন্তরিক ভাবে কথা বলেছিলেন মনে পড়ে। কোথায় থাকি, কী পড়ছি এইসব খোঁজ-খবর নিলেন আমার। কথায় কথায় বললেন কবি খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীন তাঁর চাচা। খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীনের নাম বলাতে আমি একটু চমকিত হলাম। কারণ তাঁর গল্প-সংকলন ‘ঝুমকো লতা’ আমি অনেক ছোটবেলায়, সেভেন-এইটে পড়বার সময়ই পড়েছিলাম। আম্মার সংগ্রহে বইটি ছিল। আমি ফরিদা আপাকে বললাম, “বইটা প্রকাশ করেছিল আলহামরা লাইব্রেরি।” আমার কথা শুনে ফরিদা আপাও বেশ মজা পেলেন। বললেন, “এইটা আমার চাচার নিজের প্রকাশনা-সংস্থা ছিল।”

faridabsk1
ফরিদা আখতার খান

আমি কবি মঈনুদ্দীনকে সমীহ করতাম তিনি নজরুলের বন্ধু ছিলেন বলে। ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’ বইটিও আমার পড়া ছিল। তাছাড়া নজরুলের মৃত্যূত্তর শোকসভায়ও তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বক্তৃতা দিতে দেখেছিলাম। পরেও বাংলা একাডেমীর বইমেলার মঞ্চে তাঁর বক্তৃতা শুনেছি। সে-সব খবরও গড় গড় করে তাঁকে বললাম। আরেকটা মজার খবর দিলাম ফরিদা আপাকে, “‘ঝুমকো লতা’ বইটা আম্মা কীভাবে পেয়েছিলেন জানেন? আম্মাকে বিয়ের কনে হিসেবে দেখতে এসে উপহার দেয়া হয়েছিল!”

ফরিদা আপা খুব মজা পেয়েছিলেন আমার কথা শুনে। বললেন, “তোমাকে আমাদের বাসায় নিয়ে যাবো। আমার চাচার স্মৃতি তোমাকে দেখাবো।”

দুপুরে সেদিন ফরিদা আপা কেন্দ্রে আমাদের সঙ্গে ভাত খেয়েছিলেন বলে অনেকক্ষণ ধরে আমরা গল্প করতে পেরেছিলাম। আমি যে তখন যাত্রাবাড়িতে থাকি, ওখান থেকে পায়ে হেঁটে দয়াগঞ্জ-শরৎ গুপ্ত রোড নারিন্দা হয়ে লক্ষ্মীবাজারে শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে ক্লাস করতে যেতাম সে-সব কাহিনি ততক্ষণে তাঁর জানা হয়ে গিয়েছিল। কয়েক সপ্তাহ পরে আমি ঠিকই তাঁদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। ফরিদা আপার সঙ্গে কেন্দ্রে যেদিন আলাপ হচ্ছিল তার কয়েকমাস আগে কবি মঈনুদ্দীন প্রয়াত হয়েছিলেন। ফলে তাঁর স্মৃতি তখনও ওই বাড়িতে তাজা ছিল।

ফরিদা আপা বয়সে লিয়াকত ভাই-খসরু ভাইদের চেয়েও বড় ছিলেন। সবাই তাঁকে আপা ডাকতেন। বিয়ে করেন নি।

প্রথম দিনের মাত্র তো কয়েকজনের কথা বলতে পারলাম এখানে! লিখতে লিখতে অনেকের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে, কারোর কথা আসবে আলোচনা প্রসঙ্গে। এক কিস্তিতে তো সবার কথা লিখে শেষ করা যাবে না! তাই এই কিস্তিটি আর দীর্ঘ করলাম না। এই লেখার সূত্রে কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত কারো কারো হয়তো সে-সব দিনের কথা মনে পড়ে যাবে, তাঁরাও হয়তো কেউ কেউ মনে করিয়ে দেবেন অনেক কথা। সে-সব অনুষঙ্গ যোগ হবে আমার লেখার পরবর্তী কিস্তিগুলিতে।

(চলবে)

(কভারের ছবি: শিশু সাহিত্য পরিষদের ছড়া পাঠের আসরে ছড়া পাঠ করছিলাম। তারিখ ছিল ১৬ অক্টোবর ১৯৮১। খুব সম্ভবত ফটোটা তুলেছিলেন সাপ্তাহিক রোববার পত্রিকার তৎকালীন ফটোগ্রাফার বাতেন সিরাজ। বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-প্রবাসী। — লেখক)

Flag Counter