ঠিক কেন কী কারণে মনে হইছিল জানি না, রংপুর পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে আমার মনে হইছিল আমার জন্ম হইছে সাহিত্যিক হওয়ার জন্য। ক্লাস ফাইভ থেকে সিক্সে উঠছি — ঐদিনই ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার শেষ হইছে। ভাল হয় নাই। আবার ফাইভের ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট আগের টার্মের চেয়ে খারাপ হইছিল, আমার মনে হইছিল বৃত্তি পরীক্ষার প্রিপারেশনের জন্য খারাপ হইছে রেজাল্ট।

মা আমার মন খারাপ দেইখা বিশ টাকা দিছিলেন, খেলতে যাইতেও বলছিলেন। দুই ওভার বল করে বল ডোবায় পইড়া গেছিল, ঠাণ্ডায় কেউই কাদায় নামতে চাইতেছিল না, আমার হাইজিন আর কমফোর্ট সেন্স কম থাকায়, কিংবা এ ওরে ঠেলে নামার জন্য — বিরক্ত লাগত, তাই সাধারণত আমিই নামতাম বল তুলতে। সেদিন খেলতে ভাল্লাগতেছিল না।  আমি কাউকে কিছু না বইলাই রংপুর কলেজের ভেতর দিয়ে হনুমানতলার সামনে দিয়া হাঁটতে হাঁটতে পুলিশ লাইন স্কুলের সামনে চিড়িয়াখানায় ঢুকব কি না বেশ অনেকক্ষণ ভাবছিলাম। তারপর পুলিশ লাইন স্কুলের আর একদিকে গার্লস স্কুল, কী কারণে জানি না, অনেক কলেজে পড়া মেয়ে ছিল রাস্তায় (বিকালের ঐ টাইমে হয়ত থাকেই, কিন্তু আমি আগে বিকালে রংপুর কলেজ পার হইয়া ওদিকে একাই আসি নাই বিকালে) হাসতে হাসতে বের হইতেছিল, তাদের হাসি আমারে কেমন একটা বুক হু হু করা নিঃসঙ্গতায় ফেলে দিছিল।
আটানব্বই সাল শেষ, নিরানব্বই শুরু হইছে কিংবা হবে — ব্রাজিল ওয়ার্ল্ডকাপ হারছিল সেইবছর, ঐ সময় আমাদের এলাকায় একজন তার বাচ্চার নাম রাখছিল জিদান। উনার বউটা সুন্দরী ছিল অনেক, তুইলা আইনা নাকি বিয়া করছিলেন। লোকটারে আমার অপছন্দ হইত। ছেলের নাম জিদান রাখায় মজা পাইছিলাম। আর ছেলের জন্মের পর পর উনার বউকেও দেখতে আর ভাল লাগত না। তাই পরবর্তীতে উনার প্রতি অপছন্দটা ছিল না। আগ্রহ নিয়া সালাম দিতাম, আর জিদান কেমন আছে খোঁজ নিতাম। তো রাস্তায় জিদানের মাকে দেখছিলাম সেদিন, চোখের নিচে কালো দাগ আর কোলে জিদানরে নিয়া তিনি একটা রিক্সায় আমাকে অতিক্রম কইরা সামনে চইলা গেছিলেন।

শীত যেমন পড়ে রংপুরে আর কি, ঐদিন দিনের অনেকটা সময় ধইরা কুয়াশা ছিল, আমি একটা সোয়েটার পরে ছিলাম এইটা মনে আছে। আমার সোয়েটারের হাতা সেইসময় সর্দিতে সাদা হইয়া থাকত। আমার আরো কী কী হইতো এই বিষয়ে আমার পরিষ্কার ধারণা ছিল। এই তীব্র আত্মসচেতনতা ঐ বয়সে আমারে এতই মগ্ন কইরা রাখত যে আমি প্রায় উদাসীন এক কিশোর হিসেবে শহরে পরিচিত হয়ে উঠছিলাম পরবর্তীতে। পাবলিক লাইব্রেরির ঘোলাটে জানালার ফাঁক দিয়ে আমার থেকে বয়সে বড় ছেলেরা ক্রিকেট খেলতেছিল, যে বল করতেছিল তার রানআপ দেখতে দেখতে আমার জন্মের উদ্দেশ্য আমি আবিষ্কার করে ফেলি। ঐ গোটা দৃশ্যের মধ্যে শক্তিশালী কিছু একটা ছিল, যেইটা আমাকে এখনো নাড়া দেয়।

এইরকম আর একটা দৃশ্য আমার মনে আছে। আরও ছোটবেলার। আমার খালার বাড়ি ছিল শালবন মিস্ত্রীপাড়া, আমরা তখন থাকতাম গণেশপুরে, খালা বাড়ি যাওয়ার সময় আমরা রিক্সায় করে বেতপট্টির উপর দিয়া যাইতাম। শ্যামাসুন্দরী খালের উপর একটা ছোট কালভার্ট আছে, সারা রংপুর শহর জুইড়াই এমন কালভার্ট ছিল, আমরা বলতাম পুল। ঐ জায়গায় প্রচুর শূকর চড়ত, আমার ইমিডিয়েট বড় যে বোন সে জানি কার কাছে শুনছিল শূকর দেখে যদি চল্লিশবার কালেমা না পড়া হয় তাইলে শরীর নাপাক থাকে। আমার শরীর পাক রাখার ফিচারটা তেমন টানে নাই। কিন্তু একদিন খালা বাড়ি থিকা আইসা আমার একটা খেলনা গাড়ি হারায় গেছিল জন্য ব্যাপারটা আমি সিরিয়াসলি নিছিলাম। ভাবছিলাম শূকর দেইখা কালেমা না পড়ার সাথে এই খেলনা হারনোর কোনো সম্পর্ক আছে। দুই আঙুলে চল্লিশ গুনতে এদিক ওদিক হইলে সেফ সাইডে থাকার জন্য আমি সারা রাস্তা কালেমা পড়ছিলাম একবার। পরে সিদ্ধান্ত নিছিলাম, ঐ জায়গাটা চোখ বন্ধ কইরাই থাকব। শহীদ জররেজ স্মরণী রাস্তাটা গোমস্তাপাড়ার, শেষ হইলে হাতের ডানে ঐ পুলটা। অনেক পরে এই রাস্তায় আমার কৈশোরের অনেক কাণ্ড হইছিল — সেইটা পরের গল্প, সেই রাস্তায় রিক্সা চইলা আসলেই আমি চোখ বন্ধ করে রাখতাম। একবার বৃষ্টির দিন, আমি আর মা যাইতেছিলাম। পর্দার ফাঁক দিয়ে আমি শ্যামা সুন্দরীর আবর্জনা ভরা খাল দিয়ে একটা দলছুট কেশরওয়ালা সিংহরে হাঁটতে দেখছিলাম। পারিপার্শ্বিকতা ইত্যাদি বিবেচনায় আমি যে একটা শুয়োরই দেখছি সেইটা আমি দশ এগারো বছর বয়সেই ধরতে পারছি। কিন্তু দৃশ্যটা এত প্রবল ছিল যে আমি বাস্তবতাটা বহুদিন না মাইনা পার করছিলাম।

আমার ঐদিনের অস্থিরতার আর একটা কারণ ছিল। গত দুইদিন বৃত্তি পরীক্ষায় আমার পাশে গ্রামের স্কুলের একটা মেয়ে বসছিল, মেয়েটা শাড়ি পইরা আসছিল, খুব চকমকা — পরীক্ষা দিতে আমার বয়সী একটা মেয়ে শাড়ি পইরা আসবে সেটা বিরক্ত লাগছিল। একটু পর পর খাতা দেখতে চাইতেছিল, প্রথম দিন মোটামুটি উত্তর দেখাইলেও তার এই চাওয়া দাবিতে গড়াইতেছিল — এইটা কী লিখছি সেটা আবার জিজ্ঞেস করতেছিল। তারে যে আমি খাতা দেখতে দিতেছি এই বিষয়টা নিয়া আমার একটু সংকোচও ছিল, পরীক্ষায় আমার পাশে এমন একটা মেয়ে বসছে বইলা দুই তিনজন এমনিতেই হাসাহাসি করছে। সে আমারে আদেশের সুরে পৃষ্ঠা উল্টাইতে না করতেছে — সেইটা পছন্দ হইতেছিল না।

আমি এরপর দ্বিতীয় দিন যখন খাতা ঢাইকা লেখা শুরু করলাম, আশ্চর্য! মেয়েটা একবারও আমারে কিছু জিজ্ঞাসা করে নাই, গোটা পরীক্ষার টাইম সে কিছু লেখারও চেষ্টা করে নাই। পরে পরীক্ষা শেষে তার বাপ আর ছোট বোন পলিথিনের ব্যাগভর্তি  সদ্য কেনা সস্তা কাপড় নিয়া যখন দাঁড়ায় ছিল, তার বোন জানাইল সে চিড়িয়াখানায় গেছিল, কোনো কারণ ছাড়াই ঐ ভিড়ের মধ্যে তার ছোটবোনরে চড় মাইরা সে গড়াগড়ি দিয়া কান্না শুরু করছিল। কান্নাটা আমারে খুব অনুশোচনায় ফেলছিল। আমার কেন জানি মনে হইছিল এইখানে আমার কিছু একটা ভূমিকা আছে। কাউকে ক্লাসের কারণে উপেক্ষা করার মত স্বাভাবিক বিষয় ঐবয়সে গিল্টে ফেলে থাকতে পারে। কিন্তু মেয়েটার কান্নায় অনেক গভীর কিছু ছিল। সুতরাং আমার ঐ সাহিত্যিক হওয়ার জন্যই যে জন্ম এই ব্যাপারটা নিশ্চিত হওয়ার পর আমি সেই মেয়েটারে নিয়া একটা গল্প ভাবি। খুব দরদি গল্প। আউটলাইনটা মনে আছে।

আমি গল্পে লিখতে চাইছিলাম মেয়েটা যে শাড়ি পইরা আসছিল সেইটা তার মায়ের বিয়ার শাড়ি, ওদের বাড়িতে ভাল কোনো কাপড় নাই বইলাই সে এইটা পইরা আসছে। তার চিড়িয়াখানা দেখার খুব শখ, কিন্তু তাড়া খুব গরীব বইলা তার রংপুরে আসা হয় না, তার বাপে বুঝায় এইটে পরীক্ষা দিতে আসলে তখন দেখাবে কিন্তু তার আগেই তার বিয়া হয়ে যায়। গল্পটা আমি আর টানতে পারি না। কিন্তু আমার মনে হইতে থাকে গল্পটা যেইভাবেই যাক মেয়েটা মারা যাবে। মেয়েটার মৃত্যুর কথা ভাইবা আমি ঐদিন কান্দছি। পরে একাধিক দিন যেখানে আমার কাঁদা উচিৎ কিন্তু কান্না আসতেছে না, যেমন আমার দাদির মৃত্যুর দিন, যিনি আমার বয়সী কাজিনদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমাকেই আদর করছেন, ৯৯ সালের জুন মাসে উনি মারা যান, সবাই কানতেছিল, আমার কাজিনরাও, কিন্তু আমার কান্না আসতেছে না, তখন আমি ঐ মেয়েটার মৃত্যু উছিলা করে কান্না শুরু করতে পারছিলাম। এমন বহুবার আমি যে কোনো অপ্রীতিকর দুঃখে একান্ত পরস্বার্থে কান্নার আরামদায়ক রুচিশীল সংবেদনশীলতারে আস্কারা দিছি। আর গল্পটা আমি লেখার চেষ্টা করি নাই। এই যে গল্প নিয়া সেটার ভেতরে বিভিন্ন আকাশ কুসুম ভাবার নেশাটা তখন আমাকে আনন্দ দিছিল অনেক।

আমার এমন গভীর দুঃখবোধ এবং নারী ক্ষমতায়ন টাইপ গল্পের ব্যাপারটা আসছিল সম্ভবত আমার সবচেয়ে বড় বোনের কারণে। আমার ক্লাস ফোরের ফাইনাল পরীক্ষার পর সে আমারে সমরেশের সাতকাহন এর দুই খণ্ডই পড়াইছিল। তখন সে কেবল ভার্সিটিতে ভর্তি হইছে, তার ছোট ভাইরে নিয়া এক্সপেরিমেন্টের এই কারণ আমি এখনো ধরতে পারি না। তারে পরবর্তীতে সবসময়ই আমার খুব ডাউন টু দ্যা আর্থ আর কনজারভেটিভ লাগছে । যাই হোক তার তত্ত্বাবধানে বড়দের বই পড়ার কারণে সে আর আমার বড় ভাই ভার্সিটিতে চইলা গেলে তাদের বইয়ের শেলফ আর ক্যাসেটগুলার দায়িত্ব আমি পাই। সুতরাং আমার সাহিত্যিক হবার মৌলিক আকাঙ্ক্ষাও মফস্বল মধ্যবিত্তের চর্চিত কিছু লিগেসি ভারাক্রান্ত হইয়া পড়ে। আমার বড় বোনের তরফ থিকা সুনীল সমরেশ হুমায়ূন শীর্ষেন্দু,তসলিমা, নচিকেতা ইত্যাদি আমারে নিতে হয় আমার বড় ভাইয়ের তরফ থিকা সুমন চট্টোপাধ্যায় আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। যদিও খোয়াবনামা আমি ঐ সময় বহুবার চেষ্টা কইরা পড়তে পারি নাই, পরে দুই হাজার দুই সালে মনে হয় পড়তে পারছি। অবশ্য নচিকেতা, সমরেশরে আমার বাতিল করতে টাইম লাগে নাই। আমি প্রথমে সাফার করছি সুনীলরে আর সুমনরে নিয়া, বড় দীর্ঘ সময়। সৈয়দ শামসুল হক পড়ার পর আমার মনে হইছে লেখা একটা স্টাইলেরও ব্যাপার, তারপর সুনীল হালকা হইতে লাগছিল। সে সব এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়। যেমন ক্লাস এইটে থাকতেই কাফকার ডায়েরি পইড়া আমি যেমন আপ্লুত হইছিলাম সেইটা অনেকদিন পর্যন্ত আমার কাছে বড় ব্যাপার মনে হইছিল। কিন্তু ঐ যে বোলারের রানআপ দেখতে দেখতে মনে হওয়া, আমার সাহিত্যিক হওয়ার জন্যই জন্ম সেইটা অন্য কিছু ছিল।
সব মফস্বল শহর এমন লাইফ সাইকেলের ভেতর দিয়া যায় কি না আমি জানি না। কিন্তু ঐ সময়টা রংপুর শহর উচ্চশিক্ষিত সন্তানের স্বপ্নে বিভোর ক্লান্ত বাপ আর মলিন মায়েদের দিয়া ভইরা উঠছিল। ব্যাচ কইরা পড়ার রমরমা অবস্থা। কোচিংও রমরমা। মহিলাদের বয়স ত্রিশের উপরে যাওয়া মানেই বাচ্চার বয়স দশের উপরে, তাদের স্কুল কোচিং ইত্যাদি নিয়াই তারা সময় পার করতেন। বিমর্ষ, বিষণ্ণ এক পরিবেশ। কোন বাড়ির ছেলেমেয়েরা পড়াশুনায় ভাল করলে একধরনের দীর্ঘশ্বাস, আবার খারাপ করলে নিজেদের সন্তানের জন্য শঙ্কা। আমি ঐ সময় অনেক স্কুল এবং কলেজ ম্যাগাজিনে দেখছি গল্পগুলাতে দুই ভাইবোনের বোনটা ডাক্তারি ভর্তি হইছে, ভাইটা বড়, সে বুয়েটে পড়ে, বোনরে টিউশনি কইরা পড়ার খরচ জোগায়। এইগুলারে আমার স্বপ্ন হিসেবে ভাল লাগে নাই। আমার জিদানের বাবার মত হইতে ইচ্ছা করছিল। একটা ভেসপা মটরসাইকেল, আর গোলগাল একটা বউ। ঐ লাইফটার ভেতরে আমি শহরের একটা কম উদ্বাস্তু স্পিরিট অনুভব করছিলাম।

রাতের বেলায় আমি বিছানা ঘেঁষা জানালায় দাঁড়াইলে আশেপাশের বাড়িগুলাতে টিম টিম ষাইট ওয়াটের লাল আলো জ্বলতে দেখতাম, মনে হইত ছোট ছোট নৌকা থেমে আছে, যেন ওরা এখানে কিছুক্ষণের জন্যে দাঁড়াইছে, আপতকালীন এই উপস্থিতিতে, হয়ত চইলা যাবে। এই বাড়িগুলারে, এই পরিবারগুলারে এমন ক্ষণস্থায়ী ভাবার দুইটা ঘটনা আমার মনে আছে । সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দীন মারা যাওয়ার পর, আমি উনার মৃত্যুর হাহাকার শুনছিলাম দৈনিক জনতা কিংবা যুগের আলো পত্রিকায়, তো উনার পরিবার মনে হয় আমাদের এরিয়ার আশেপাশে কোথাও থাকেন, উনার ছোট ছেলেটা আমার থেকে একটু বড় ছিল, তারে আমি কোনো একটা বাড়ির দাওয়াতে দেখছিলাম, ঐটুকুন একটা ছেলের প্রতিভাবান বাবা মারা গেছে সেইটা আমাকে মৃত্যু বিষয়ে খুব সচেতন কইরা তুলছিল — ওরা নাকি রংপুর ছাইড়া চইলা যাবে এমন শুনতেছিলাম।
আর একটা ঘটনা, বেশ হৃদয়বিদারকই। আমাদের ফ্যামিলির পরিচিত এক ফ্যামিলির তিনজন ইলেক্ট্রিক শক খেয়ে মারা গেছিল। আমি ঐ পরিবারটাকে চিনতাম না, আমার বড় ভাইবোনেরা চিনত। আমার জন্মের আগে আমার বাবায় যখন উপজেলায় চাকরি করতেন তখন কাউনিয়া কিংবা পীরগাছা এই নামের কোনো একটা উপজেলায় পাশাপাশি বাড়িতে থাকতেন উনারা। তো ঘটনাটা ছিল এমন শুক্রবারে ভদ্রলোক ছাদে কাপড় নাড়তে গেছিলেন, তো কাপড় শুকানোর লোহার তারের সাথে ঘাপটি মাইরা ইলেকট্রিক তার যে ছিঁইড়া জড়ায় ছিল সেটা তিনি টের পান নাই, ছাদে উনার সাথে উনার বড় আর ছোট ছেলেও ছিলেন, কাপড় তারে দেয়া মাত্রই উনি আটকায় যান, উনারে সরাইতে যাইয়া যথাক্রমে বড় আর ছোট ছেলেও বিদ্যুৎতাড়িত হন, ভদ্রমহিলা হুটাপুটি শুনে ছাদে আইসা এই দেইখা মূর্ছা যান। মেজো ছেলে বাসায় ছিল না। সবাই যখন এই খবর শোনে, এমন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবরের প্রাথমিক বিমূঢ় অবস্থা কাটায় তারা জিজ্ঞেস করে টিপুর (মানে বড় ছেলেটা) না সরকারি চাকরি হইছিল? বইলা তারা আরও কিছুক্ষণ ভাবে। আবার ভদ্রলোকের যেহেতু সাধারণত কাপড় নাড়তে দেয়ার কথা না, সুতরাং তার মৃত্যু নিয়াও একটু আফসোস ছিল। ঘটনাটা না ঘটলে মানুষ অবশ্যই খুশি হইত, কিন্তু আমার ধারণা ঘটনাটার একটা কম দুঃখজনক বিকল্প ছিল — মা, কম সম্ভাবনাময় মেজো ছেলে, এবং ছোট ছেলে এরা এই দুর্ঘটনায় মারা গেলে মানুষের দুঃখটা মনে হয় কম হইত। পরে উনারা বাড়ি বিক্রি করে গ্রামে চইলা গেছিল যতদূর শুনছিলাম।

আমাদের গণেশপুরের বাড়িটা ছাইড়া দিতে হইছিল স্থানীয়দের হুমকি-ধামকিতে। ১৯৯৬ সালে, আমি তখন জিলা স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হইছিলাম। মা আব্বা খুব শখ কইরা বাড়িটা বানাইছিলেন, তাই আব্বার অফিস কোয়ার্টারে চইলা আসায় উনাদের মন খুব খারাপ ছিল। আমার বড় দুই ভাইবোন পিঠাপিঠি ছিল, ওরা নিজেদের মধ্যে এই বিব্রতকর অবস্থাটা শেয়ার কইরা নিছিল। আমি আর আমার ইমিডিয়েট বড় বোন ব্যাপারটার ভাবগাম্ভীর্যটা ঐভাবে পালন করতে পারি নাই। কিন্তু সবার মন খারাপ অবস্থাটা আমাকে মাঝে মাঝে ক্ষেপায় তুলত আব্বার উপর। বাপেরা কোথাও ভয় পাইয়া চইলা আসলে ঐরকম বয়সে ছেলেদের বাপরে নিয়া একটা মোহভঙ্গ ঘটতেই পারে। ঐসময়টায় আমার ভেতরে বেশ একটা প্যাসিভ অ্যাগ্রেসিভ অ্যাটেটিউড গ্রো কইরা থাকতে পারে।

এই পরিবেশ আমার মধ্যে একধরনের উদ্ভট বঞ্চনাবোধ তৈরি করছিল । ক্লাস সিক্সের পুরা টাইমটা আমি স্কুল পালাইতাম। একা। কাচারিবাজার দিয়া শিশু নিকেতন হয়ে নিউ ইঞ্জিনিয়ারপাড়ার দিকে যাইতাম। ঐ জায়গাটা শুনশান থাকত। রংপুর শহরের পুরাতন লোকেরা এই নিউ ইঞ্জিনিয়ার পাড়া নামটা পছন্দ করত না, তার বলত “কীসের নিউ ইঞ্জিনিয়ার পাড়া, ওইটার নাম তো নাওয়াটারি।”

আমার এমন ঘোরাঘুরি দেইখা অনেকই আগ্রহ দেখাইত। তারা আমারে যাই জিজ্ঞাস করত আমি মিথ্যা বলতাম। যেমন বাবা কী করে, বাড়ি কোথায় ইত্যাদি। কিন্তু নিজের নামটা মিথ্যা বলতাম না। কারণ নাম দিয়াই যেহেতু শুরু হইত প্রশ্ন ঐটা কনফিডেন্টলি বলার দরকার থাকত।

“তো এমন ঘুরতে ঘুরতেই এক বাড়ির বারান্দায় বিশ বাইশের একজন মেয়ের সাথে পরিচয় হইছিল। উনি বারান্দার দড়িতে কিছু একটা শুকাইতে দিছিলেন, আমি তার কাঁপতে থাকা বুকের দিকে তাকাইছিলাম।” অলঙ্করণ. অর্জয়িতা রিয়াঐ সময় জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান মনে হয় আর্মি চীফ হইছিলেন। উনি ভোট করার জন্য প্রস্তুতি নিতেছিলেন। উনি নাকি জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তো রংপুরে ঐসময় উনারে নিয়া আলোচনা হইত। আমি ঐসময় একটা বয়স্ক লোক দেখছিলাম, উনি নাকি একসময় জিলা স্কুলের পিয়ন ছিলেন, তো উনি নাকি জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমানকে জিলা স্কুলে পড়তে দেখছিলেন, যদিও আমার যতটুকু মনে পরে উনার বয়স ৬০ এর কমই হবে, তাই আমার মনে হইছিল রাস্তাঘাট কল্পনার স্বাধীনতার জায়গা। এইখানে যা তা বলা যায়। তো এমন ঘুরতে ঘুরতেই এক বাড়ির বারান্দায় বিশ বাইশের একজন মেয়ের সাথে পরিচয় হইছিল। উনি বারান্দার দড়িতে কিছু একটা শুকাইতে দিছিলেন, আমি তার কাঁপতে থাকা বুকের দিকে তাকাইছিলাম। উনি বেশ কর্কশ স্বরে ডাকছিলেন, আমি গেছিলাম। আমার নাম-টাম জিজ্ঞেস করতেছিল, ভয়ে আমার গলা শুকায় আসতেছিল। আমি বাসায় দেরিতে গেলে আমার মায়ে চিন্তা করবে কি না এই বিষয়ে আগ্রহ দেখাইলে আমি জানাইছিলাম আমার মা মারা গেছে, আমি ঘোরের মধ্যেই বলছিলাম, ঠিক সচেতন মিথ্যা হিসেবে না। পরে আরও দুই একদিন তার সাথে দেখা হইছিল, উনি মনে হয় আমারে একদিন পেয়ারা খাইতে দিছিলেন। আমি ভাবতাম উনারে বলি যে সেদিন ভয়ে মিথ্যা কথা বলছি। কিন্তু আর বলা হয় নাই।

কয়দিন পর আমার স্কুল পালানোর আর একজন সঙ্গী জুটছিল। ওর মামায় নাকি লেখক। আমি ওর মামার সাথে দেখা করতে চাইছিলাম। কিন্তু ওর মামায় কুমিল্লায় থাকত। প্রকৃতপক্ষে ঐ ছিল মারাত্মক গল্পকার। ওর মামার বইয়ে লেখা আছে বইলা সে অনেক গল্প বলত, বাস হেল্পারের গল্প। ঐ বাস হেল্পার বিভিন্ন আজব শহরে যায়, বাংলাদেশের ভেতরেই। তার বলার ভঙ্গি এমন ছিল, তার কালো মুখ, ঠোঁটের উপরে তিল আর খনখনে গলা নিয়া সেই আমার কাছে বাস হেল্পার হিসেবে ধরা দেয়। গল্পের একটু পর পর বাস নষ্ট হয়, তো বাস হেল্পার কী কী কইরা বাসটারে আবার চালু করত এইসব অনেকক্ষণ ধইরা বলত। তার বাসের রুট ছিল মূলত আরব্য রজনীর দুনিয়া, জ্বীন ভূত আর খারাপ মেয়েতে ভর্তি। এই খারাপ মেয়ের কোনো বোধগম্য ক্রাইটেরিয়া কিংবা আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট করা যাইত না। মানে খারাপ মেয়েরা কী কী করে সেটা নিয়া তার গল্প আগাইত না, বরং যাত্রাপথে খারাপ মেয়ে ছিল একটা অনুসঙ্গ। খারাপ মেয়ে দুনিয়ার যাবতীয় ঘটনা ঘটাইতে সক্ষম ছিল, অনেক ক্ষেত্রে বাস নষ্টের কারণও হইত খারাপ মেয়ে, তারে বাস থাইকা নামায় দিলে আবার বাস চলতে শুরু করত। তবে হ্যাঁ, খারাপ মেয়েরা হইত সুন্দরী, তাকাইলে চোখ ফিরাইতে ইচ্ছা করবে না, আর খারাপ মেয়েরা রাস্তার মাঝপথে বাস থামানোর অনুরোধ করত।

হঠাৎ ছেলেটা নাই হইয়া গেল, ওর নাম ডাকলে আমি এদিক-ওদিক খুঁজতাম, কিন্তু অল্প কয়দিন পর স্যার রোল আর ডাকত না ওর। ওর বাড়ির ঠিকানা সে একেকবার একেকটা বলছিল, আমি খোঁজার ইচ্ছা নিয়াও আর খুঁজি নাই পরে। অনেকদিন পর্যন্ত আমি বাস হেল্পারদের মুখ খুঁটায় খুঁটায় দেখছি। কেউই ওর মত না।
(চলবে)

Write A Comment