মানসী

১.

একটা দাওয়াত ছিল পুরান ঢাকায়। আমাদেরই কোনো এক বন্ধুকে দাওয়াত দিয়েছে তারই কোনো এক বন্ধু। এই রকম বন্ধুর বন্ধু’র দাওয়াতে খুব বেশি হলে দুজন যাওয়া যায়। এদিকে আমরা ছিলাম চারজন। তাই আমি একটু ইতঃস্তত করলাম—যাওয়া ঠিক হবে কিনা!

আমার সরাসরি দাওয়াতপ্রাপ্ত বন্ধু বলল যে ওর বন্ধুর গার্লফ্রেন্ডের জন্মদিনের দাওয়াত। একশ জন গেলেও কোনো অসুবিধা হবে না।

পুরান ঢাকার এইসব তেহারি বিরিয়ানি খাওয়ার শখ আমার কোনো কালেই ছিল না। ফ্রি পেলেও না। কিন্তু হুদাই এইসব বন্ধুবান্ধবের  সাথে ঘোরাঘুরি করে সময় নষ্ট করা একটা অভ্যাসই ছিল। তাই একজনের জায়গায় চারজনই গেলাম বন্ধুর বন্ধুর গার্লফ্রেন্ডের জন্মদিনের দাওয়াতে।

পুরান ঢাকার বিরিয়ানির দোকানে ঢুকে আমার মাথায় হাত। দোকানে কোনো মেয়েই নাই। যে প্রেমিকার জন্মদিন, তাকেও দেখা গেল না। আমাদের বয়সী বিভিন্ন সাইজের ছেলে, যথারীতি আমাকে দেখে অবাক হয়ে বিরিয়ানি ছেড়ে আমার দিকেই হা করে থাকল।

আমি ভাবলাম, গার্লফ্রেন্ড হয়তো এখনো এসে পৌঁছায় নি। আরো পরে আসবে।

খাওয়া দাওয়া হল জম্পেশ। সবাই পেট পুরে তেহারি-বিরিয়ানী-কাবাব খেল। মোট বারো জনের খানাপিনা। যে হোস্ট তাকে আমি তখনও চিনি না। কিন্তু অন্যদের সাথে পরিচয় হয়ে গেল আগেই আর তাদের কাছ থেকেই বুঝলাম হোস্টে’র নাম—বুড়া।

 

‘বুড়া’ কখনো কারো নাম হতে পারে না সত্যি। কিন্তু আমার বন্ধুবান্ধবদের এ রকমই নাম ছিল। মানে একে অন্যকে কোনো এক প্রাগৈতিহাসিক কারণে কোনো একটা অদ্ভুত নামে ডাকা শুরু করলে ওই নাম এমনভাবে প্রচলিত হয়ে যেত যে, বাপ মায়ের দেয়া আকিকা করা নাম কারো আর মনেই থাকত না।

বিল দেওয়ার সময় বুঝলাম, এর মধ্যে ফর্সা, লম্বা, হাড় জিরজিরে ছেলেটার নামই বুড়া। সত্যিই কিন্তু ও দেখতে বুড়াদের মত। মানে ওর শরীর এতটাই হাড় জিরজিরে আর ও উচ্চতায় এতটাই লম্বা যে কেমন একটু বুড়ো মতনই লাগে। আমার বন্ধু ওর সাথে পরিচয় করিয়ে দিল।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, এই আসল নাম কীরে?

ও বলল, বুড়া।

আমি বললাম, ধুর, নিজেই কি নিজের নাম ভুলে গেছো নাকি!

ও বলল, ও আচ্ছা! নাম! উত্তম, আমার নাম উত্তম।

খেয়াল করলাম কথা বলার সময় একটু তোতলায় উত্তম।  আর ওর মানিব্যাগটা শতছিন্ন। মানিব্যাগটা রাখার সময় পকেট থেকে ওর মোবাইলটা পড়ে গেল। তখন দেখলাম, ওর মোবাইলটাও হলুদ রাবার ব্যান্ড দিয়ে বাধা একটা প্রায় বিধ্বস্ত মোবাইল।

আমার একটু মায়া হল। ছেলেটার টাকা পয়সা নাই। এইরকম একটা ছেলের দাওয়াতে এতজন মিলে খাওয়াটা ঠিক হয় নাই মনে হল আমার। তখনই আমার মনে হল, যার বার্থডে সে কই? এখনো এসে পৌঁছতে পারল না! খাওয়াই শেষ!

manoshi-2

আমরা তখন হোটেলের নিচে পান খাচ্ছি। অতিথিদের মধ্যে চারজন বিদায় নিল। বাকিদের মধ্যে একজন বলল যে,  ওর ব্যাগে বোতল আছে। কোনো চিপায় গিয়ে সেটা সবাই মিলে খাব।

চিপার খোঁজে সবাই মিলে বুয়েটের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। আর আমার মাথায় তখন নানা হিসাব নিকাশ শুরু হল।

বোতল আছে মানে এরা সবাই মিলে মদ খাবে এখন। আর কোনো গার্লফ্রেন্ড টার্লফ্রেন্ড এর অপেক্ষায় এরা আছে বলে মনে হয় না। তাহলে ঘটনাটা আসলে কী? এখানকার কোনো ছেলেই কি আসলে উত্তমের গার্লফ্রেন্ড?

এ রকম ভাবার কারণ ছিল। আমার বন্ধু বান্ধবদের কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই। তাদের বন্ধুবান্ধবেরও যে কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই সেটা বুঝতে সময় লাগে না।

আমরা একটা ভালো জায়গা খুঁজে পেলাম। সবাই যে যার মত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছি।  সবার হাতেই সিগারেট আর মুখে পান। উত্তম এসে বসল আমার পাশে। আমার দিকে সিগারেট এগিয়ে দিল।

আমি সিগারেটে দুটা টান দিয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, কীরে বুড়া, কার জন্মদিনের দাওয়াত খাইলাম রে? তোর প্রেমিকা কোথায়?

সবাই হো হো করে হেসে উঠল। আর উত্তম তোতলাতে তোতলাতে বলল, অ মানসী! অরে পাবো কই? অয় তো চট্টগ্রামে!

আমি অবাক হয়ে গেলাম! মানে! ও ছাড়াই ওর জন্মদিনের পার্টি!

উত্তম একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল, মাথা নাড়ল, তারপর অনেকক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে থাকল।

দীর্ঘসময় পরে বলল, প্রতি বছরই এই দিন ওর জন্মদিনে আমি পার্টি করি। ও নাই তাতে কী! সে..সে..সেলিব্রেট করতে হবে না?

আবার চুপ করে গেল। আবার নিজে নিজেই বলল, ওর বাসায় খুব রেস্ট্রিকশন রে। মানসীর বাপ একটা চুতিয়া আর মা একটা দ..দ..দজ্জাল। একবার ফোনেও কথা বলতে পারি নাই আজকে।

তোতলা স্বরে কথাগুলো বলে আবারও কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল ছেলেটা। সিগারেট নিয়ে নিল আমার হাত থেকে।

একই সিগারেট ভাগাভাগি করে খাবার কারণে কিনা জানি না, নাকি ওর দুঃখভরা চেহারাটা দেখে আমার খুব মায়া হল। ততক্ষণে আরেকটা ঘটনা ঘটে গেছে।

বাইশ তেইশ বছর বয়সী পোলাপান সব। প্রতিদিন তো আর এভাবে মদ খেতে পায় না! দুইটা মাম পানির বোতলে হুইস্কি মেশানো ছিল। উত্তমের উদাস উদাস সময়ে প্রায় সবটুকুই অন্যরা খেয়ে ফেলেছে। আমিও খেয়েছি। তখন বুঝতে পারি নাই, বোতলে আর কিছুই নাই।

তাই হঠাৎ করেই উত্তম যখন বলে বসল, আ..আমার জন্যও রাখিস, সব মেরে দিস না… তখন সবাই জিভ কাটল। একটু আগেই ওর পয়সায় বিশাল খাওয়াদাওয়া করে আসল সবাই, আর ওর জন্য কিনা এক পেগও রাখে নাই, এইটা কে কীভাবে ওকে বলবে বুঝে উঠল না ওরা।

আমার মাথায় সবসময় দুষ্ট বুদ্ধি। আমি আমার ব্যাগ থেকে মাম পানির বোতলটা বের করে ওর হাতে দিলাম। আমার কেমন যেন মনে হচ্ছিল, ও এমনেই টাল, কিচ্ছু টের পাবে না।

বাকিদের মধ্যে একটা নিরব হাসির আলোড়ন বয়ে গেল।

উত্তম বোতলটা হাতে নিয়েই ঢক ঢক করে খেতে শুরু করল। আর মাতালের মত বলল, মানসী, মানসী। বলতে বলতেই সেখানে শুয়ে পড়ল ও।

আমি বললাম, কীরে তুই তোতলালি না? তুই তো সব কিছুতে তোতলাস, ওর নামের সময় তোতলাস না কেন?

সবাই খুব জোরে হেসে উঠল। আমার কথা  শুনে না। সামান্য পানি খেয়ে ওর মাতলামি দেখে সবাই খুব মজা পাচ্ছিল। ওকে নানা রকম টিজ করা শুরু করল সবাই।

বলল, বুড়া, এই যে তুই প্রতি বছর মানসীর জন্মদিনে খাওয়াস, কোনোদিন তো তারেই দেখলাম না! যার জন্য প্রতি শীতকালে এ রকম একটা খাস খাওয়াদাওয়া হয়, সে কই? তারে দেখবো কখন!

উত্তম তখন চরম পিনিকে। কারণ ওর পুরো বোতল খাওয়াই শেষ। মাতালের প্রলাপের মতই বলল, ওরে তোরা দেখবি কেমনে! আমিই দেখি না পাঁচ বছর! তোরা দেখবি কই থেকা!

আমরা সবাই ততক্ষণে শীত ভুলে গেছি। গায়ের চাদর খুলে রাখছি। সিগারেট ধরাচ্ছি। শব্দ না করে হাসছি। দেখ কাণ্ড! মদনটা কিনা পানি খেয়েই মাতাল!

আমি একসাথে দুইটা সিগারেট ধরালাম, একটা উত্তমের হাতে দিয়ে বললাম, বলে কী! পাঁচ বছর দেখা হয় না! প্রতি বছর বার্থডে করিস! তুই তো দেবদাস রে বুড়া!

উত্তমের কথা তখন আরো জড়িয়ে যাচ্ছে, বলল, যখন এইটে পড়ি মানসীর সাথে দেখা। হে..হেমশের লেইনে মানসীর বাসা। ওইখানে আমি পড়তে যাইতাম, কেন যে যাইতাম রে! একদিন ফোনের দোকানে গেছি, একটা ফোন করব। অনেকক্ষণ দাঁড়ায়ে থাকলাম একটা মাইয়ার পিছে। মাইয়ার কথা বলা শেষ হয় না। মাইয়ার চুলগুলা এত বড়—এত ব..ব..বড়—কোমরের সমান। বিশ মিনিট দাঁড়ায় আছি রে, আর পারি না, জরুরি ফোন। মাইয়াটারে বললাম, ইয়ে মানে আমার একটা  ইয়ে মানে ফোন…।

মাইয়াটা ঘুরে তাকায়ে আমারে একটা মুখ ঝামটা দিল। বলল, তোমার ফোন, তোমার ফোনই সব। আমার ফোন কিছু না! ঝটকা মেরে চলে গেল রে মেয়েটা। সেই দেখা, প্রথম দেখা। আমি তো আর নাই রে।

উত্তম ফোঁপাতে শুরু করল। সহজ সরল ছেলে। এমনিতেই আজকে অনেক ঘটনা হয়ে গেছে। ও যে পানি খেয়ে টাল হয়ে গেল সে কথা সমগ্র বাংলাদেশ হতে শুধু আজকের রাতটা লাগবে। কালকে সকালের মধ্যেই এখানকার সব বন্ধুরা দেশে বিদেশে সব জায়গার বন্ধুদের কাছে পৌঁছে দেবে উত্তমের আজকের কাণ্ড। তার ওপর মানসীর জন্য এই কান্নাকাটি, প্রতি দিন প্রতি মুহূর্ত ওকে অনুকরণ করে দেখাবে এসব বন্ধুরা।

তাই আমি বললাম, ওই বুড়া যা বাসায় যা। আমার হল বন্ধ হয়ে যাবে।

 

২.

সেদিন পরিচয়ের পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হত উত্তমের সাথে। ওকে পাওয়া যেত চারুকলার আশেপাশেই। ও সেবার চারুকলায় ভর্তি হবে। ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আমি তখন বিকেলের দিকে ছবির হাটে যেতাম।  প্রায়ই দেখতাম, উত্তম গায়ে সেই ময়লা শাল জড়ানো, ময়লা আর ছেড়া জিন্সের প্যান্ট পড়া,  একটা সবুজ ঝোলা কাঁধে, সেই ঝোলা থেকে বের হয়ে থাকা রোল করা আর্টপেপার, বড় বড় স্কেল, ত্রিভূজ আরো কত কী!

উত্তম ছবির হাটেই বেশি থাকত। আর গাছ আঁকত। নানা ধরনের গাছ। নিজেও প্রায়ই বসত একটা গাছের নিচে। আমি গেলেই সিগারেট এনে দিত। আর লাল চা। সেই সাথে পান খাওয়া দাঁতের লাল হাসি। আর দেখা হলেই মানসীকে নিয়ে কোনো না কোনো কথা বলবেই সে!

—মানসীর কবুতরের আজকে বাচ্চা হইছে।

—মানসীর ছোট ভাই এসএসসিতে জিপিএ ফাইভ পাইছে।

—মানসীর কাকায় মুরগীর দোকান দিছে।

—মানসী আজকে কলেজে গেছে অনেকদিন পর।

 

৩.

ছবির হাটের সব মানুষ ওকে চেনে তত দিনে। চেনে ওখানকার সব দোকানদার আর আমার মত নিয়মিত যাওয়া অতিথিরাও। আমার কেমন যেন মনে হত উত্তমের হয়েই যাবে চারুকলায়। অন্য বন্ধুবান্ধবের কাছে জেনেছিলাম, ও বয়সে বেশ বড় আমাদের। পড়াশোনায় গ্যাপ আছে অনেক। বাসা থেকে উধাও হয়ে যেত কিছু দিন পর পর। আর চারুকলার এই পরীক্ষার মত সিরিয়াস আর কোনো দিনও নাকি ওকে দেখে নি কেউ।

শীতকালে গাছের সব পাতা ঝরে গেছে তখন। কেমন যেন শুকনা খটখটে চারিদিক। আর প্রচণ্ড শীত। এর মধ্যেই একদিন চারুকলার ভর্তি পরীক্ষা হয়ে গেল। রিটেন পরীক্ষার রেজাল্টের দিন ফোন করেছিলাম। ধরে নি। তাই সেদিন বিকেলে যখন ছবির হাটে গেলাম, টেনশনে বুক ধুকপুক করছিল আমার।

দেখলাম, সেই গাছের নিচে উত্তম বরাবরের মতই ওর চাদর বিছিয়ে মাথায় হাত দিয়ে শুয়ে আছে। আমি পাশে বসে একটা সিগারেট ধরালাম। কিন্তু ও আমাকে খেয়াল করল না।

কিছুক্ষণ পর ওর সাড়াশব্দ না দেখে আমি ওকে ডাকলাম, বুড়া, ওই বুড়া, ঘুমালি নাকি?

ও মাথা থেকে হাত নামালো। অনেক কষ্টে চোখ খুলল। ওর চোখ গাঢ় হলুদ। জিজ্ঞাসা করলাম, রেজাল্ট দিছে না?

ও বলল, হ্যাঁ, টিকি নাই তো। শালা ইংরেজিই পারি না আমি।

বলতে বলতে অন্যপাশে ফিরে গেল ও। আমার কেমন যেন মনে হল ওর চোখের পানি লুকাচ্ছে। আমি কিছুক্ষণ চুপ মেরে গেলাম। ওর এত আগ্রহ, এত পরিশ্রম। আমরা সবাই চেয়েছিলাম ওর এ বছর চারুকলায় হয়ে যাক। হলে আমার এক রুমমেট আছে, চারুকলায় পড়ে। ওকে ফোন করলাম। জানলাম, আরো এক বছর পরীক্ষা দিতে পারবে উত্তম। এরপরে আর ওর সেশনের ছাত্রদের পরীক্ষায় বসতে দিবে না।

ডাকলাম উত্তমকে। বললাম কথাটা। বললাম, তুই আগামি বার দিস আবার। আগামি বার হবেই। তুই তো ভাল আঁকিস। এত মন খারাপ করার কিছুই নাই। পৃথিবীর বড় বড় আর্টিস্টরা কেউ চারুকলায় পড়ে নাই!

ও উঠে বসল। ওর চোখের রঙ গাঢ় হলুদ। গাঞ্জা খেয়েছে নিশ্চয়ই। আমি আর জিজ্ঞাসা করতে গেলাম না।

বললাম, চা খাবি?

—তোর টাকা আছে? আমার খুব খিদা পাইছে। তিনদিন ধরে ভার্সিটির পানি খেয়ে আছি।

—পানি খেয়ে আছিস কেন?

—পকেটে টাকা নাই।

—টাকা নাই তো বাবুল মামার দোকান থেকে বাকিতে খেয়ে নিতি!

—অলরেডি অনেক টাকা বাকি হয়ে গেছে। আর দিবে না।

 

উত্তম যে গাছের নিচে সারাদিন শুয়ে বসে থাকে বাবুল মামার দোকান ঠিক তার পশ্চিম পাশে। আমরা সবাই ওই দোকান থেকেই চা বিড়ি কিনে খাই। ওই দোকানে ওর যত টাকা বাকি পড়ে গেছে সেখানে আমাদের অংশীদারিত্বও কম না। আমি বাবুল মামার দোকানের পিচ্চিকে হাত দিয়ে ইশারা করলাম। ও দৌড়ে আসল। বললাম, কত টাকা বাকি পড়ছে জিজ্ঞাসা  করে আসো।

ও গিয়ে আবার দৌড়ে এসে জানাল, ১২০০ টাকা।

১২০০ টাকা একেবারে দেওয়ার মত পকেটের অবস্থা আমার তখন নাই। আমি বাবুল মামাকে পাঁচশ টাকার একটা নোট দিয়ে বললাম, বাকি যা হয় মাসের শুরুতে দিব। বাবুল মামা উত্তরে গালভরা হাসি দিল।

উত্তমকে নিয়ে গেলাম ওইখানেরই একটা ভাতের হোটেলে। উত্তম চুপচাপ দুই প্লেট ভাত খেল, দুই বাটি ডাল খেল আর তিন বাটি গরুর মাংস নিল।

কিছু একটা বলা লাগে । এমন নিরবতা কেমন অস্বস্তিকর। দোকানের লোকজন ভাবছিল আমি রাস্তা থেকে কোনো লোককে তুলে এনে খাওয়াচ্ছি।

আমি ওর গরুর মাংসের প্লেটের দিকে ইশারা করলাম, কীরে, তুই হিন্দু না?

ও ওর লাল লাল চোখ তুলে বলল, আমি হিন্দু, মানসী হিন্দু না।

উত্তমের সব কথাই কোনো না কোনোভাবে মানসীতে গিয়ে শেষ হয়। তাই আমি অবাক হলাম না।

বললাম, ‘মানসী’—নাম শুনে কিন্তু হিন্দু মনে হয়।

ও গরুর হাড্ডি চুষতে চুষতে বলল, ‘মানসী’ তো ওর আসল নাম না। আমার দেওয়া নাম ‘মানসী’। আসল নাম তো অন্য কিছু।

আমি হা হয়ে গেলাম। তবে তখন প্রেমিক-প্রেমিকাকে এরকম নামকরণ খুব কমন ব্যাপার ছিল। তাই বললাম, আসল নাম কী?
এ কী যেন ভাবল। যেন আসল নাম ওর মনে নাই। ভাত খাওয়া শেষে যখন পান আর সিগারেট মুখে দিল, তখন বলল, ‘স্বর্ণা’।

—কী?

—ওর আসল নাম স্বর্ণা।

—তোর এতক্ষণ পরে মনে পড়ল?

—হ্যাঁ, মনে আসতেছিল না। বলতে বলতে মাটিতে পানের পিক ফেলল। সুন্দর সবুজ জায়গাটা বিশ্রী লাল হয়ে গেল।

—এত পান খাস কেন? বাজে স্বভাব।

—দাঁত মাজি না তাই। পান খেলে দাঁত পরিষ্কার থাকে। মুখে গন্ধ হয় না।

আমি একটুও অবাক হলাম না। বললাম, দাঁত মাজিস না কেন? আয় তোকে ব্রাশ কিনে দিব।

—না আমি ব্রাশ করতে পারি না। আমার মাড়িতে খুব ব্যথা করে। রক্তও পড়ে ব্রাশ করলে।

—তার মানে দাঁতের অবস্থা শোচনীয়। মাড়িতে ইনফেকশন। দাঁতের মাজন দিয়ে আঙুল দিয়ে একটু একটু মাজা শুরু কর। সামনে কিন্তু আরো খারাপ হবে।

—এর চেয়ে পান খাওয়াই ভালো।

উত্তম আবার ছবির হাটের দিকে চলে গেল। আমি হলের দিকে একটা রিকশা নিলাম। উত্তম কখনো কারো সাথে রিকশায় চড়ে না। জীবনে একবার নাকি মানসীর সাথে রিকশায় চড়েছিল। এরপর আর কখনো কারো সাথে রিকশায় ওঠে নি। আবার যখন উঠবে মানসীর সাথেই উঠবে। সব জায়গায় হেঁটেই চলাচল করে ও। একবার মহাখালীতে আমাদের এক বন্ধুর বাসা থেকে হেঁটে হেঁটে ক্যাম্পাসে এসেছিল ও।

 

৪.

বন্ধুরা সবাই একে অন্যকে ফোন করা শুরু করল উত্তমের রেজাল্ট জানার জন্য। আমি জানালাম, এবার ওর হয় নি। পারলে ওকে একটু সময় দিতে, ওর মনটা খুবই খারাপ।

কেউ অবাক হল না। বলল, ওর বাংলা আর ইংরেজি বানান যা খারাপ! ও তো রিটেনে কোনোদিনও টিকবে না। আর রিটেনে না টিকলে ওর ভালো ভালো ছবি আঁকা দেখবে কে?

আমার চারুকলার রুমমেটের কাছ থেকে আমি ভালোভাবে জেনে নিলাম, আসলে ঠিক কতটুকু বাংলা, ইংরেজির দখল থাকতে হয় রিটেনের জন্য। ও যা বলল, তা আমার কাছে মোটেও কঠিন মনে হল না। আমার রুমমেট আরো জানালো যে, চারুকলার সিনিয়র ব্যাচ সবসময়ই ভর্তি কোচিং করায়, যারা চারুকলায় ভর্তি হতে চায়, আগে থেকেই কোচিং করলে, পরীক্ষাটা ভালোভাবে দিতে পারে। এবারও ওই কোচিং এর অনেকজনই টিকে গেছে।

পরদিন বিকেলে আমি ছবির হাটে গেলাম উত্তমকে কোচিং এর কথাটা বলব ভেবে। গিয়ে দেখি আমাদের বন্ধু বান্ধবদের অনেকেই সেখানে আড্ডা দিচ্ছে। উত্তমকে আরো বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। কোনো রকমে গাছের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে। দু চোখ আরো হলুদ। সবাই নানারকম কথা বলছে। সেদিন ঠাণ্ডাও পড়েছে খুব। এমন ঠাণ্ডার দিনে আমরা শুকনা পাতা কুড়িয়ে এনে বড় আগুন জ্বালাই। আর সে আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে থেকে সিগারেট খাই, চা খাই, নানা রকম গল্পগুজব করি। কেউ কেউ আগুনের পাশে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েও থাকে।

সে দিন বিকাল সন্ধ্যার দিকে গড়াতেই কেমন কনকনে হাওয়া বইতে শুরু করল চারদিক থেকে। শীতের চোট থেকে বাঁচতে আমরা বরাবরের মত শুকনো পাতা দিয়ে বড় একটা আগুন জ্বালালাম। তারপর সেটার চারপাশে বসে গল্পগুজব করতে থাকলাম। উত্তমের সাথে একই মেসে যারা থাকে, তারা জানালো, ও কাল রাতে মেসে যায় নি। আজকেও নাকি যাবে না। ওর মনটা ভেঙে গেছে বোঝাই যাচ্ছে, কিন্তু ওরা ওকে কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না।  সবসময় ফাজলামি দুষ্টামি করতেই সবাই অভ্যস্ত। সিরিয়াস বিষয় কীভাবে ডিল করা যাবে সেটা বুঝে উঠলেও, করাটা কঠিন।

আমি খেয়াল করলাম, উত্তম আমাদের কোনো আলোচনাতেই নাই। কিছুক্ষণ ঘুমাচ্ছে আর কিছুক্ষণ পর পর উঠে খুব মনোযোগ দিয়ে গাঞ্জা বানাচ্ছে। টানছে।

আমি ওর পাশে গিয়ে বসলাম। ও তখন শেখ সিগারেট খালি করে সেখানে গাঞ্জার পাতা ঢোকানোতে খুব ব্যস্ত। আমি ওকে বললাম, এত গাঞ্জা খাইস না। শরীর খারাপ করবে।

ও শুনলো বলে মনে হল না।

আমি ওকে চারুকলার ভর্তি কোচিং এর কথা বললাম। এখনই শুরু করা উচিত সেটাও বললাম। আর আমার বান্ধবী সুপারিশ করে দিবে, তাই খুব বেশি টাকা লাগবে না কোচিং করতে, সেটাও বললাম।

উত্তম শুনলো বলে মনে হল না।

এদিকে, আগুন কমে গেল। উত্তরের কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ায় নেশাগ্রস্তদেরও কাঁপুনি ধরে গেল। কারো মোবাইলে গান বাজছিল—

cause nothing last forever/ and we both know hearts can change/ and its hard to hold a candle/ in the cold November Rain.’

আমরা কেউ কেউ খুব নিচু গলায় কথা বলছিলাম। উত্তম শুয়েছিল। হঠাৎ ঝটকা মেরে উঠে বসল। বলল, ঠাণ্ডা লাগে। আগুন বাড়া।

তখন পুরোপুরি সন্ধ্যা, আড্ডাও খুব জমে গেছে। কে তখন যাবে পাতা কুড়াতে? কেউ নড়েচড়েও বসল না।

উত্তম বলল, মানসীর বাপ মা খুব ডিস্টার্ব করতেছে। ওর নাকি বিয়ে ঠিক করছে! ওকে নাকি দেখতে আসবে।

কেউ কিছু বলল না। ও প্রায়ই এরকম বিচ্ছিন্ন দুএকটা কথাবার্তা বলে, যার বেশির ভাগই মানসীকে নিয়ে। মানসীকে কখনো ফোন বা এসএমএস করতে দেখা যায় নাই। বিস্তারিত কিছু জিজ্ঞাসা করলে উত্তম কখনো উত্তরও দেয় না। তাই কেউ এ বিষয়ে মাথা ঘামাল না।

উত্তম শুয়ে পড়ল, আবার হঠাৎ, বলা নাই কওয়া নাই, উত্তম তার সবেধন নীলমনি একখানা চাদরটাই গা থেকে খুলে নিয়ে আগুনের মাঝখানে দিয়ে দিল। চাদরটা পুড়ে ছাই না হওয়া পর্যন্ত আমি সেখানে ছিলাম। এরপর শীতের তীব্রতা অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাওয়ায় হলে চলে আসি।

পরদিন আর ওমুখো গেলাম না। তার পরের দিন বিকেলের দিকে ছবির হাটে গেলাম, দেখলাম গাছের নিচে উত্তম বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। আমাকে দেখে বাবুল মামা এগিয়ে আসল। বলল, সালাম আপা। মামায় তো তিন রাত ধইরা বাসায় যায় না। এই হানেই ঘুমাইতেছে। চাদর টাদর নাই! এই রকম ফিনফিন্যা শার্ট পইড়্যা ঘুমাইতেছে, অসুখ বিসুখ হইবে কিন্তু। বাসায় নিয়া যান পারলে।

আমি ভাবলাম, উত্তমকে কঠিন বকাবকি করবো। ওর পাশে বসে কয়েকবার ডাকলাম। কোনো জবাব না পেয়ে ওর গায়ে হাত দিয়ে ডাকতে গেলাম। টের পেলাম জ্বরে ওর গা পুড়ে যাচ্ছে। আর খুব সম্ভবত ওর কোনো হুঁশও নাই তখন। মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ল।

আমি কোনো ডাক্তার হাসপাতাল চিনি না। কোন এলাকায় কীভাবে যাওয়া যায় তাও জানি না। উত্তমের সেই ছেঁড়া জিন্স আর সাদা পাতলা শার্টের ভেতরে পাজরের সবখানি হাড় গোনা যায়। শরীরের ওঠানামা দেখে আমার মনে হল, ও বোধহয় আর বাঁচবে না।

 

৫.

সবাইকে ফোন করলাম। সত্যি সত্যি আমাদের যত কমন ফ্রেন্ড আছে, সবাইকে। ফোন দেওয়ার সময়ই সংশয় ছিল আসলে এদের কাউকে পাব কিনা। আগেই তো বলেছি আমার বন্ধুদের কারোরই ঠিক-ঠিকানা নাই। কারো ফোনে সংযোগ পাওয়া যায় না, কারো ফোন বন্ধ, কেউ কেউ ফোন ওঠায় না, আর দুয়েকজন ফোন ধরলেও তারা ঢাকার অন্য প্রান্তে। আমি দুই চোখে অন্ধকার দেখা শুরু করলাম।

সবাইকে এসএমএস করে রাখলাম—উত্তম সিরিয়াসলি ইল। আই নিড হেল্প।

তবে সত্যি কথা ওদের কারো ওপরে আমার ভরসা ছিল না। আমার চারুকলার রুমমেটকে ফোন দিলাম। ও চারুকলাতেই ছিল। দৌড়ে চলে আসল ছবির হাটে।

উত্তমের অবস্থা দেখে বলল, ও তো অজ্ঞান হয়ে আছে। ঢাকা মেডিকেল নিয়ে যাই। ওকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।

ও ফোন করে আরো অনেক চারুকলার বন্ধুবান্ধবদের ডেকে আনল। ওর মধ্যে একজন বলল, গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে ওর পরিচিত লোক আছে। উত্তমকে সেখানে নেওয়াই ভালো।

গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের তিনতলায় আরো তিনজন রোগীসহ এক রুমে উত্তমকে তিনদিন রাখা হল। ডাক্তার জানালো ওর নিউমোনিয়া হয়েছে, তবে ভয়ের কিছু নাই।

রাত হতে না হতেই আমাদের সব বন্ধুবান্ধবেরা আসতে শুরু করল। এদিকে, আমি ব্যস্ত উত্তমের মোবাইল নিয়ে। ওর বাসায় তো জানাতে হবে, আর মানসীকেও তো বলা উচিত। কিন্তু উত্তমের এ এক অদ্ভুত মোবাইল, বলতেই হবে। ডায়ালড লিস্টে কোনো নাম্বার নাই। রিসিভড লিস্টেও কোনো নাম্বার নাই। যা নাম্বার সব মিসড কলে। এবং অবশ্যই কারো নামে না। উত্তমের কন্টাক্ট লিস্টে কোনো নাম্বারই নাই।

বাকি থাকে মেসেজ বক্স। মেসেজ আছে বটে ইনবক্স, আউটবক্সে, এমনকি ড্রাফটও আছে। সেখান থেকে নাম্বার বের করতে গিয়ে দেখা গেল উপস্থিত বন্ধুদেরই কারো কারো নাম্বার। পরিবারের কারো সাথে কিংবা মানসীর সাথে কোনো মেসেজ চালাচালি নাই।

আর এই ইনবক্স ঘাঁটতে গিয়েই, আমি প্রথম উত্তমের ইংরেজি বানান সম্পর্কে ধারণা পেলাম। একটা মানুষ DHAKA বানান পর্যন্ত জানে না! কাকে যেন মেসেজ পাঠিয়েছিল—‘ami daka’!

এই কথাটা বন্ধুদেরকে বলতে না বলতেই সব একসাথে হেসে উঠল।

একজন বলল, “তোর কোন ধারণা নাই রে ওর বানান সম্পর্কে! ঢাকা তো কঠিন বানান, মি (m e) বানানটাই ও জানে না, লেখে এম আই (mi)!’

“ওর কল লিস্টে নাম্বার থাকবে কোথা থেকে! ওর ফোনের রিসিভার নষ্ট। ফোন ধরলেও কিছু শুনতে পাবে না ও, তাই ধরেও না।” বলেই হাসতে থাকল আরেক বন্ধু।

হাসপাতালের চেহারা বদলে গেল। সারাদিন বন্ধু বান্ধব আর তাদের বন্ধুবান্ধবেরা দল বেঁধে আসে।  আসে চারুকলার সেই ছেলেমেয়ে আর তাদের সহপাঠীরাও। আসে সিনিয়র, জুনিয়র, কাছের আত্মীয়, দূরের আত্মীয়। উত্তমের বাসা থেকে কেউ আসে না। অবশ্য ওদেরকে জানানোর পরে ওরা কোনো আগ্রহ দেখায় নি। উত্তমের মা সিজোফ্রেনিক রোগী, পরিবারের সবাইকে শত্রু  মনে করেন উনি, আর নিজেকে আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন, এসব নিয়ে এমনিতেই খুব ঝামেলায় থাকে উত্তমের পরিবারের সবাই।  শুনলাম, উত্তমের বড় ভাইকে ফোন দেওয়ার পর সব শুনে উনি বলে দিয়েছে—গোল্লায় যাক উত্তম।

 

৬.

হাসপাতালের ডাক্তার আর নার্সরা তো বটেই, উত্তমের রুমের বাকি রোগীরাও আমাদেরকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে। এই রুমের বাকি তিনজন রোগী অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী। উত্তমের পাশের বেডের রোগী তো জীবনের একেবারে শেষ দিন গুণছে। মহিলার বয়স ষাটের ওপরে হবে। দেখলে অবশ্য আশির্ধ্বো মনে হয়। এক বছর ধরে এ হাসপাতালে আছেন। ক্যান্সার আক্রান্ত। বাঁচার আর কোনো আশা নাই। তার দেখাশোনা করার জন্য একজন  বুয়া রেখে দিয়েছে তার পরিবার। মাসে একবার তার স্বজনেরা তাকে দেখতে আসে আর ২৪ ঘণ্টাই তার সাথে থাকে তার বুয়া।

এ এক কঠিন চাকরি—বলতেই হবে। রোগী সারাদিনই ঘুমায় (ব্যথা কমানোর জন্য ডাক্তার ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখে)। আর যখনই জাগে তখন হাউমাউ করে কাঁদে। আর এর মধ্যেই তার খাওয়া দাওয়া, গোসল, সবকিছু করাতে হয়। উত্তম তো এ রোগীকে দেখে খুবই আপসেট হয়ে গেল। থাকতেই চাইল না এই রোগীর পাশে! তবে, আমাদের অন্যান্য বন্ধুবান্ধবরা তার প্রতি খুবই সহানুভূতিশীল আচরণ করল।

ওই রোগী আর বুয়ার সাথে সবচেয়ে বেশি মিশত কাকলী। চারুকলার যারা নিয়মিত উত্তমকে দেখতে আসত, তাদের মধ্যে একজন কাকলী। ও অন্যদের সাথে আসত। ও অবশ্য ওদেরই স্টুডেন্ট। মানে চারুকলায় ভর্তি হওয়ার জন্য কোচিং শুরু করেছে। বেশ হাসিখুশি আর মিষ্টি মেয়েটা। আর হাসলে অদ্ভুত সুন্দর একটা গজদাঁত বের হয় ওর। উত্তমের চেয়ে পাশের বেডের রোগীর সাথেই ওর আলাপ জমল বেশি। আমাদের সাথেও কম আলাপ হল না। আলাপে আলাপে জানা গেল, কাকলীও বয়সে বড়ই হবে আমাদের। চারুকলায় ভর্তি হতে চায়। খুব চেষ্টা করছে এবার ভালোভাবে পরীক্ষা দেবে। কাকলী হাসপাতালে এলে ওই বিছানাতেই বসে থাকত। রোগিনী ঘুমালে উনার বুয়ার সাথে গল্প করত। কেক-কলা খেত। আর রোগিনী জেগে থাকলে তার সাথে আবোল তাবোল কথা বলত। উনি অবশ্য কিছু্ই বলত না। ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকত।

হাসপাতাল একটা অদ্ভুত জায়গা বলতে হবে। কেমন যেন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের একটা বাতাস আছে হাসপাতালের পরিবেশে। যারা হাসপাতালে যায় না আর যারা নিয়মিত হাসপাতালে যায়, তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই বিস্তর ফারাক আছে। গণস্বাস্থ্য হাসপাতাল আকারে বড় হলেও বেশিরভাগ জায়গাই ফাঁকা পড়ে আছে। অকেজো যন্ত্রপাতিতে ঠাসা বেশির ভাগ রুম। রোগীও কম। রাতের বেলা কেমন যেন গা ছম ছম করে। উত্তমের জন্য অবশ্য প্রতি রাতেই তিন থেকে চারজন বন্ধু থাকে। তারপরেও, হাসপাতালই একমাত্র জায়গা যেখানে শত শত বন্ধু থাকার পরেও নিজেকে অনেক একা মনে হয়।

চারদিন পর ডাক্তার জানালো উত্তমকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যেতে পারি আমরা। ভালো ডিসকাউন্ট দেওয়ার পরেও, হাসপাতালের বিল দিতে গিয়ে আমরা মহাঝামেলায় পড়লাম। আরো ঝামেলায় পড়লাম এটা ভেবে যে, হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে উত্তমকে নিয়ে যাওয়া হবে কোথায়! ওর মেসে—ওর রুমমেটরাই বলছে—এখনই নেওয়াটা ঠিক হবে না। আর বাদবাকিরাও হয় হলে থাকে, না হয় মেসে। একজন ফুলটাইম রোগীর সেবাযত্ন করার মত অবস্থা কারোরই নাই। আমরা উত্তমের ওয়ার্ডের বাইরে এসে নিজেদের মধ্যে এটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। হঠাৎ করেই মনে হল, আমি যেন বুঝতে পারলাম, উত্তম কেন পাশের বেডের ওই রোগীকে সহ্য করতে পারে না। দুজনের বাসা বলে আর কিছু নেই।

এমন সময় কাকলী এগিয়ে আসল। আমাদের আলোচনা শুনে বলল, ও বাসায় থাকে। খুব বেশি সমস্যা হলে উত্তম ওর বাসায় থাকতে পারে। ওর বাবা মাকে ও ম্যানেজ করে নেবে। আর একটা পরিবারে থাকলে ওর যত্নটাও ঠিকমত হবে।

কিন্তু আমাদের মন কেমন খচ খচ করছিল। শত হলেও ওর মত একটা জিনিসকে কারো ঘাড়ে তুলে দেয়াটা ঠিক হবে না। তবে আর কোনো উপায় না হলে, কাকলীর বাসাতেই রাখবো বলে আমরা মনস্থির করলাম।

পঞ্চম দিন উত্তমকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নেয়া হল। অবশ্য কাকলীর বাসায় না। চারুকলারই এক বড় ভাইয়ের বাসায়। আমার রুমমেট সব ব্যবস্থা করে দিল। ওর বড়ভাই আর তার বউ দুইজনেই চারুকলায় পড়ে। ওদের বাসায় ঠাঁই হল উত্তমের আর সেই সাথে আমাদেরও যাওয়ার আরেকটা জায়গা হল।

 

৭.

বেশ কিছুদিন ধরে ছবির হাটে যাই না। তাই আমার সাথে উত্তমের দেখাও হয় না। তবে, উত্তমের সাথে মোবাইলে এসএমএসে যোগাযোগ হয়। উত্তমের বানানের ছিরি দেখলে মন চায় ওকে ওর বানানসহ জাদুঘরে রেখে দেই।

যেমন আমি ওকে লিখলাম, shorir kemon?

ওর উত্তর, Bal.

ও কিন্তু লিখেছে, ‘ভালো’। আর এই হল ওর ভালো বানান!

আমার রুমমেট জানালো, ওরা ওকে ধরে বেঁধে চারুকলার কোচিং এ ভর্তি করে দিয়েছে। আর উত্তম নাকি খুব পরিশ্রমও করছে। স্কেচ, ড্রইং এগুলায় সময়ও দিচ্ছে। আমি জানালাম ওকে যে ওর বাংলা ইংরেজির অবস্থাই খারাপ। রিটেনেই পাশ করতে পারে না ও। প্র্যাকটিকেল পর্যন্ত চান্স পেলে তো টিকেই যেত ছেলেটা!

দেখতে দেখতে গরম কাল চলে এল। গাছে গাছে নতুন পাতা। চারিদিকে ঝলমল করে রোদ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান যেন গা ঝাড়া দিয়ে উঠল। উত্তমকে পাওয়া গেল আগের গাছটার নিচেই। তবে, একজন নয়, দুজন। সাথে কাকলী।

উত্তমের সাথে কাগজ কলম, পেনসিল, স্কেল, রঙ তুলি। আর সবসময়ই ব্যস্ত আঁকাআঁকিতে। চোখের সামনে যা পায়, তাই আঁকে। পার্কের কোনো গাছ বাদ গেল না। সকাল দুপুর বিকাল সন্ধ্যা উত্তম চারুকলার লোকজনের সাথে চারুকলার আশেপাশেই থাকে। তবে,  ওকে সবচেয়ে বেশি দেখতাম কাকলীর সাথে।

দেখা হলেই একটা ঝলমলে হাসি হাসত কাকলী। ওকে দেখেই বোঝা যায় সচ্ছল আর সুখী পরিবারের মেয়ে। পরনের জামা-জুতা আর ব্যাগ সবই ম্যাচ করা, সবই গোছানো। তারপরেও অগোছালো উত্তমের সাথেই ওর খুব জমে। আমাদের সাথেও। প্রায়ই আমাদের সাথে বসে চা খেত। বলত, উত্তম এত ভালো আঁকে, আমি তো টিকবো না, ওকে দেখলেই আমি বুঝি।

আমি বলতাম, ওর দুর্বলতা আঁকায় না। ওর বানান দেখলে বুঝতে পারবা। পারলে ওকে একটু বাংলা ইংরেজি শিখতে সাহায্য করো। ও কিন্তু রিটেনে টিকবে না। কাকলী আবারো হাসে।

উত্তম বলে মানসীর কথা। মানসীর অমুক খবর, তমুক খবর। দেখা গেল, চারুকলার সবাই উত্তমকে চেনে। আর আগামি ব্যাচে উত্তমের আগমন অবধারিত ধরে নিয়েছে ওরা । উত্তমের সাথে সাথে চেনে মানসীকেও। দেখা হলে প্রায় সবাইই মানসীর কুশল বিনিময় করে। উত্তমও এমনভাবে উত্তর দেয়, যেন এইমাত্রই ও মানসীর সাথে দেখা করে এল।

কাকলী আমাকে জিজ্ঞাসা করে মানসীর কথা। বলে, ওরা কথা বলে না কেন? উত্তমকে তো কখনো মানসীর সাথে যোগাযোগ করতে দেখলাম না । ও তো বাড়িতেও যায় না। ওরা দেখা করে না?

বিষয়টা আসলে আমিও খুব ভালো জানি না। উত্তম যতটুকু বলে, ততটুকুই। আর চারুকলায় ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত মনে হয় না ও মানসীর সঙ্গে দেখা করবে।

শুনে কাকলী হাসে। আমিও হাসি। মানসীর ছবি না দেখলেও আমরা ওর সবই জানি। কত বড় চুল আর কত বড় নখ, একটু মোটামতন মানসী, ভালোই লম্বা মানসী আর কত খারুস পরিবার মানসীর!
৮.

ঋতুবদলের মতই আমাদের সেমিস্টার বদল হতে থাকে। সময় কোন ফাঁকে যেন বহুদূর গড়িয়ে যায়। সকাল দুপুর বিকাল একই রুটিন, একই ক্যাম্পাস, একই বন্ধু, একই গল্প, একই আড্ডা একসময় একঘেঁয়ে লাগতে থাকে। তারপরেও বন্ধুদের নিত্যনতুন বিনোদনের আইটেম ফুরায় না। কাকলীকে ওরা ডাকতে থাকে—অধম। বলে, “উত্তম নিশ্চিন্তে চলে ‘ গজদাঁতবিশিষ্ট অধমে’র সাথে।”

উত্তম-কাকলীর পেছনে অনেক গালগল্প হয় বন্ধুমহলে। সবাই বলে, কাহিনি কীরে! মেয়েটা তো সারাদিনই দেখি ওর সাথে থাকে! মানসী জানে তো?

এই যে উত্তম রিকশায় চড়ে না, মেয়েটাও নাকি সব জায়গায় হেঁটে হেঁটে যায় ওর সাথে।

আমি খুব জোরের সাথে বলি, আরে ভালো বন্ধু ওরা। মেয়েটার নরম মন। হাসপাতালের বুড়িটার সাথে বসে থাকত দেখতি না! তোরা হুদাই এগুলা বলিস।

দেখতে দেখতে মানসীর আরেক জন্মদিনের সময় চলে আসল। এ বছরও ধুমধাম করে মানসীর জন্মদিন করা হল। আর খাওয়া দাওয়া শেষে হাজার ভোল্টের ইলেকট্রিক শক দিল উত্তম। মানসীর মনে হচ্ছে আরেকটা প্রেম হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম থেকে কে নাকি খবর এনেছে, কোচিং থেকে ফেরার পথে মানসীকে অন্য ছেলের সাথে কথা বলতে দেখা গেছে।

শুনে আমি আর কাকলী হা হা হা হা করে হাসলাম। কারো সাথে কথা বললেই বুঝি প্রেম হয়ে যায়! তাহলে তো আমার আর কাকলীর কয়েক ডজন প্রেম একদিনেই হয় বলতে হবে!

কিন্তু উত্তম হাসল না। ওর কাছে খাঁটি তথ্য আছে।

এইবারও মদের আয়োজন করা হল। আর সেটা খাওয়ার জন্য ভালো জায়গাও পাওয়া গেল। চারুকলার সেই বড় ভাইয়ের বাসায় চলে গেলাম আমরা সবাই। এইবার সত্যি সত্যি মদ খেয়ে মাতাল হল উত্তম। আর আমরা সবাই মিলে ওকে চেপে ধরলাম।

বললাম, তুই মানসীকে সন্দেহ করিস কেন? ও কি যোগাযোগ করে না তোর সাথে?

উত্তমকে প্রশ্ন করি একটা, ও উত্তর দেয় আরেকটা। এমনিতেই ও এই রকম।

বলে, মানসীর সাথে তো এক কোচিংয়েই পড়তাম। ওর জন্যই তো কোচিংয়ে ভর্তি হলাম। ও আর আমি তো একসাথে আসতাম। ও কীভাবে এখন অন্য ছেলের সাথে আসে? নিশ্চয়ই ওই ছেলেটার সাথে প্রেম হয়ে গেছে! আমাকে তো ফোন করে না, নিশ্চয়ই অন্য ছেলেকে ফোন করে!

কাকলী বলল, ও ফোন করে না। তো তুই ওকে ফোন করিস না কেন?

উত্তম বলল, ওর ফোন নাই। ওর বাসায় ফোন নাই। ও আমাকে দোকান থেকে ফোন করত আগে। তারপর তো ও মোবাইল কিনছে, কই আমাকে তো ফোন করে নাই! ওই ছেলের সাথে ফোন করে নিশ্চয়ই এখন। তাই আমাকে আর ফোন করে না!

কাকলী বলল, তোর ফোন নাম্বার হারায়ে ফেলছে, হতে পারে। হতে পারে, তোকে খুঁজতেছে। তোর তো ফোনের রিসিভারও নষ্ট। হতে পারে না ফোন করছে তুই ধরিস নাই, আর তুই তো একবারও চিটাগাং গেলি না। ও নিশ্চয়ই ভাবে তুই ভুলে গেছিস। তুই অন্য মেয়ের সাথে ঘুরিস!

কাকলীর কথায় যুক্তি আছে। আমি বললাম, তুই এত বক বক না করে ওর সাথে গিয়ে দেখা কর।

উত্তম বলল, সব মেয়েরা দুইটা করে প্রেম করে। একটা প্রেমে বিরহ লাগায় আর আরেকটাকে গিয়ে ওইটার কথা বলে। দুইটা প্রেম না করলে মাইয়াদের ভালো লাগে না। মানসীরও এই রোগ হইছে। আমার সঙ্গে প্রেম করার সময় বলত আগের প্রেমিকের কথা। আগের প্রেমিক কেমন ছিল, কী করত। আর এখন ওই ছেলের সাথে আমার কথাই…।

কথাটা শেষ করার আগেই আমি আর কাকলী চিৎকার করে উঠলাম—কী! এইটা কি কথা? কে বলছে তোরে? কয়টা মাইয়া চিনোস তুই?

উত্তম বলল, চিনি চিনি। জানি আমি। এই যে কাকলীকে দেখ। ওই যে ওর বিদেশে চইলা যাওয়া বয়ফ্রেন্ডের কথা আমাকে বলে, কেন বলে? হেন হইছে, তেন হইছে, আরে এগুলা দিয়া আমি কী করবো? এইগুলাই মাইয়াদের প্রেম। এইগুলা আমারে বইলা সিমপ্যাথি চায়। এই সিমপ্যাথি থেকে শুরু হবে আরেকটা প্রেম। আমি ওরে সিমপ্যাথি দেখানো শুরু করব। সেইটা প্রেম হবে। সেই প্রেম হয়ে গেলে আরেকটা বন্ধু হবে। সেই বন্ধুকে গিয়ে বলবে—বুড়া এমন, বুড়া তেমন। মেয়েরা কোনোদিন একটা প্রেম করতে পারে না।

দশ বারোটা ছেলে হা করে উত্তমের কথা শুনছে। যাদের বাসা, তারাও আছে। সবার সামনে কাকলীকে এইভাবে কিছু বলতে পারে উত্তম, আমরা তো দূর, কাকলীও কখনো ভাবে নাই। তাছাড়া কাকলীর এসব একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলি আমরা কেউই জানতাম না। কাকলী ভেউ ভেউ করে কাঁদল। তারপর নিজে নিজেই চোখ মুছল। আমি আর কাকলী তখনই বের হয়ে গেলাম।

মেয়েদের নিয়ে ওই রকম ধারণার জন্য না, কাকলীকে ওইভাবে অপমান করার কারণেই আমি উত্তমের সাথে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিলাম। ওই দিকেই আর যেতাম না। ফলে উত্তমের সাথে আমার দেখাও হত না। আর ক্যাম্পাসে আমার বন্ধু বান্ধবের অভাব ছিল না। তাই উত্তমের কথা আমার মনেও পড়ল না খুব একটা।

উত্তমও ওই রাতের পরে আমাকে কোনো এসএমএস করে নি, যোগাযোগের চেষ্টা করে নি। সব মিলিয়ে, কোনো ধরনের কথাবার্তা ছাড়াই নিরবে আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল।

তবে, কাকলী আবার উত্তমের সাথে মেশা শুরু করল। বন্ধুদের কাছে শুনলাম ও আগের মতই উত্তমের ছায়াসঙ্গী হয়ে গাছের নিচে বসে থাকে। বন্ধুরা আমাকে নিয়ে হাসল।

বলল, যার অপমানের জন্য তুই ওরে ত্যাগ করলি, তার নিজেরই অপমান লাগে নাই, আর তুই কিনা সম্পর্কটাই শেষ করে দিলি! তোর কীসের অপমান! বুড়া তোর বন্ধু। কাকলী কে? ওর জন্য কেন তুই বুড়াকে ত্যাগ করবি!

আমার কোনো উত্তর ছিল না এসবের। আমাকে ‘বেগম রোকেয়া’ উপাধি দেওয়া হল।  আমি হাসলাম। তবু ছবির হাট কিংবা চারুকলার ছায়া মাড়ালাম না। তাছাড়া, ততদিনে কার্জন হলে আড্ডা দিতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।

 

৯.

এরই মধ্যে চারুকলার পরীক্ষা হয়ে গেল। রিটেনে টিকে গেল উত্তম। আমাকে আমার রুমমেট জানাল এ খবর। আর জানাল, সবকিছুই কাকলীর খাতা দেখে লিখেছে উত্তম।

তারপর প্র্যাকটিক্যাল। প্র্যাকটিক্যালেও চান্স হয়ে গেল উত্তমের। হয়ে যাবে আমরা সবাই জানতাম। কিন্তু পাস হল না কাকলী। ও চলে গেল ওয়েটিং লিস্টে। তাও এত পেছনে যে টেকার কোনো সম্ভাবনা নাই।

শুনে আমার একটু খারাপও লাগল। উত্তমকে রিটেনে দেখাল ও, কিন্তু ড্রইং তো ড্রইং-ই। সেটা তো আর দেখানো যায় না! সেটা নিজেকেই আঁকতে হয়। আমার রুমমেটকে বার বার বললাম, কাকলীর চান্স হওয়ার কি কোনো সম্ভাবনা নাই?

ও বলল, না। কোনো সম্ভাবনা নাই। কোনো কোটায় হলেও একটা কথা ছিল।

আমি সে রাতে ঘুমাতে পারি নি। কাকলী আমার তেমন বন্ধু ছিল না সত্যি। কিন্তু চারুকলায় পড়ার জন্য ওর যে চেষ্টা ছিল, সেটা তো আমার নিজের চোখেই দেখা। যদি এমন হত, উত্তমও টিকল না, কাকলীও না—আমি হয়ত এতটা কষ্ট পেতাম না।

সকাল হতে না হতেই, আমি আমাদের হল প্রভোস্ট রাবেয়া ম্যাডামের বাসায় গেলাম। বলে রাখা ভাল, উনি আমার মায়ের খুব কাছের বন্ধু। আর সায়েন্স ফ্যাকাল্টির ডিন। আমাদের পুরো পরিবারের সাথেই তার খুব ভালো সম্পর্ক। আমি পুরা বিষয় তাকে খুলে বললাম। আর বললাম, কাকলী যদি এবার চারুকলায় চান্স না পায়, তাহলে আত্মহত্যা করবে। সব কিছু রেডি আছে। ও ঠিক করেছে, ওয়েটিং লিস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। তারপর সব শেষ।

কথাটা ডাহা মিথ্যা ছিল। কিন্তু কাজে লাগল।

তখন সত্যি সত্যি ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আত্মহত্যাপ্রবণতা বেড়ে গেছে। পর পর কয়েকটা আত্মহত্যার ঘটনায় ভার্সিটির সব হলে কাউন্সিলরও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তার ওপর আমি সাইকোলজির স্টুডেন্ট। আমার কথা শুনে, চেহারা দেখে রাবেয়া ম্যাডাম বিশ্বাস করল।

বলল, তুই তো খুব ভালো করেই জানিস, অ্যাডমিশন টেস্টে না টিকলে আর কোনো কিছু করার চান্স নাই। প্রতিবন্ধী কোটা বা শিক্ষকদের সন্তান কোটা… এগুলা তো একেবারে ফরম ফিল আপ করার আগে বলতে হত। কী যে করা যায়! আচ্ছা, আমি একটু চারুকলার ডিরেক্টরের সাথে কথা বলে দেখি। মনে হয় না রে কিছু হবে। তুই আমাকে রোল নাম্বার আর প্লেস জানা। আমি দেখি কী করতে পারি। আর তুই বরং ওকে কাউন্সিলিং এর চেষ্টা কর। তোর নিজেরও প্র্যাকটিস হবে। প্রফেশনাল লাইফে তো এসবই দরকার হবে তোর।

 

বের হয়ে কাকলীকে ফোন করলাম আমি।

ও বলল, আমরা চারুকলায়।

আমি একছুটে গেলাম সেখানে।

দেখলাম, কাকলী বসে আছে একলা। আর উত্তম আরেকটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে। কথা বলছে চারপাঁচজন ছেলেমেয়ের সঙ্গে। খুবই সুখী সুখী চেহারায়। নিজের ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে থাকার কনফিডেন্স সহ কথা বললে যা হয়। কাকলীর চেহারা দেখে কিছুই বোঝা গেল না।

আমি কাকলীকে বললাম, তোর রোল নম্বর আর প্লেসমেন্টটা বলতো।

ও জানতে চাইল, কেন?

আমি বললাম, এক টিচার আছে আমার পরিচিত। তাকে বলে দেখি যদি কিছু হয়।

কাকলী বলল, না থাক। না হলে, না হবে।

বলল ঠিকই, কিন্তু শব্দগুলির মধ্যে কেমন একটা অদ্ভুত গভীর কিন্তু নিরব বিষাদের সুর ছিল।

আমি জোরাজুরি করলাম। হয়ত কিছুই করতে পারব না, তবুও।

উত্তমের সময় হল আরো দুই ঘণ্টা পর। খুব ব্যস্ত, বড় ভাই, ক্লাসমেট, ভর্তি এসব নিয়ে। আমাকে দেখে একগাল হাসল।

বলল, কীরে, সাইকো মনোজোমাস, খ..খবর কীরে?

নামটা আসলে সাইকো মনোগেমাস। আমার ডিপার্টমেন্টের নাম আর দুইটা প্রেমের তর্কাতর্কি নিয়ে বন্ধুরা এই নাম দিয়েছে। উত্তম অবশ্যই এর মানে জানেও না।

আমি বললাম, মানসীকে জানাইছিস? নাকি আগের মতনই মদনামি করতেছিস?

উত্তমের হাসি যেন ধরে না। তোতলাতে তোতলাতেই বলল, কালকে ভর্তির ডেট দিলে সেটা জেনে তারপর সম্ভব হলে রাতেই যাব চট্টগ্রামে। ভর্তির তো নাকি আরো দুএকদিন লাগবে! কোন ডিপার্টমেন্ট নিব সেটাই সিদ্ধান্ত নিতে পারতেছি না। আমার তো সবই ভাল লাগে—পেইন্টিং, ডিজাইন, স্কাল্পচার, ওরিয়েন্টাল আর্ট, কনটেমপোরারি আর্ট…।

কাকলী বলল, পড়া তো সবই যাবে ইচ্ছা থাকলে, যেইটা তোর সবচেয়ে সহজ মনে হয় সেইটা নে।

উত্তম যেন কাকলীর কথা শুনলোই না। আমার সাথেই কিছুক্ষণ আর্ট, ব্যবসা, মার্কেট হাবিজাবি কথা বলে আবার চারুকলার পোলাপানের সাথে ব্যস্ত হয়ে গেল।

আমি আরো কিছুক্ষণ কাকলীর সাথে বসে রইলাম। অবসাদগ্রস্ততার কোনো লক্ষণ যদিও দেখা গেল না, কিন্তু কেন যেন আমার মনে হল, আত্মহত্যার বানানো গল্পটা ঠিক হলেও হতে পারে। ভবিষ্যতের ব্যাপারে একেবারে নিশ্চিত কোনো মানুষ ছাড়া আর কারো পক্ষেই এতটা শান্ত থাকা সম্ভব না।

বিকেলেই ফোন করলাম রাবেয়া ম্যাডামকে।

ফোন ধরেই বলল, আরে শোন, একটা সুখবর আছে। কিন্তু তুই প্রমিজ কর কাউকে বলবি না। কেউ জানলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। মাত্রই আমাদের মিটিং শেষ হল। এবার চারুকলার রেজাল্টে অনেক ভুল হয়ে গেছে। রেজিস্ট্রার বিল্ডিং এ কমপ্লেইন আর কমপ্লেইন। দুদিন পরে ঘোষণা দিয়ে আবার নতুন রেজাল্ট ঘোষণা করা হবে। দেখ হয়ত তোর বান্ধবী টিকেও যেতে পারে।

 

১০.

পরদিন আবার চারুকলায় গেলাম। কাকলী একা, বসে আছে একা। উত্তম ব্যস্ত, খুবই ব্যস্ত।

আমাকে দেখে এগিয়ে আসল উত্তম, বলল, দুপুরে খাবি?

চারুকলার দোকানের খাবার ভালোই লাগত আমার। মাথা নাড়লাম, বললাম, খাব। তোদের খবর কী?

উত্তম বলল, আজকেও ভর্তির ব্যাপারে কিছু বলল না রে। এই শালা কাকলীদের জন্যই এত দেরি করতাছে। ওয়েটিং ফোয়েটিং লিস্টেরগুলা কনফার্ম হইলে তারপর বোধহয় এইগুলার সাথে একসাথে ভর্তির ঘোষণা দিবে। আমি শালা যাব চিটাগাং। এটা কোনো কথা হইল! দেখা যাবে আমিও গেছি, আর এদিকে নোটিশ দিছে। আবার তাড়াহুড়া করে চলে আসতে হবে! কী যে ভেজাল!

আমি চুপচাপ কাকলীর পাশে বসে রইলাম। কাকলী উত্তমের অদ্ভুত উচ্চারণে ‘ওয়েটিং লিস্ট’ শব্দটা শুনে হাসছিল। সেটা কি উচ্চারণের বৈচিত্র্যে নাকি দুঃখে বোঝা গেল না। খুবই নিরব আর মৃদু সেই হাসি।

আমি ফিস ফিস করে বললাম, কাকলী, রেজাল্ট যদি আবার দেয়! আগের রেজাল্টে যদি ভুল ধরা পড়ে? যদি পুরা সিচুয়েশন বদলে যায়—কেমন হবে?

কাকলী হাসল। খুবই নিরব আর মৃদু সেই হাসি। সেটা কি দুঃখের নাকি সমর্থনের—বোঝা গেল না।

 

রাতের ট্রেনে উত্তম চিটাগাং গেল। পরদিন সকালে চারুকলার পরিবর্তিত রেজাল্ট দেওয়া হল। গল্পের মতন ফার্স্ট না হলেও, কাকলী চারুকলায় টিকে গেল। আর উত্তম থাকল প্রথম ওয়েটিং লিস্টে। প্রথম ওয়েটিং লিস্টের সবাই ভর্তি হতে পারবে বলে ধারণা করা হল।

কাকলীর সাথে দেখা হল, দেখলাম মুখ ভার। আমি বললাম, উত্তম তো টিকবেই! মুখ ভার কেন? দুজনেই পড়বি, আমাদের পার্টি দিবি আগে।

কাকলী বলল, আগেই ভাল ছিল। ছেলেটা চিটাগাং গেল খবরটা দিতে।

কথা সত্যি। আর সেটা ভেবেই উত্তমকে এ খবরটা দেওয়া হল না। আমি ভেবেছিলাম, কাকলী বা অন্যরা নিশ্চয়ই বলবে। তাই আমি বলতে যাই নি।

উত্তম একদিন পরেই ফিরে আসল। আর যখন পরিবর্তিত রেজাল্ট শুনল, তখন ওর চেহারা দেখার মত হল।

কাকলী সান্ত্বনা দিল, তুই তো টিকে গেছিসই। প্রথম লিস্টের সবাই অবশ্যই ঢুকবে।

আগে কাকলী ভর্তি হল। উত্তম তার তিন দিন পরে।  আর উত্তমের হামবড়াই ভাব একদমই কমে গেল। আবার দেখলাম কাকলীর সাথে গুরু টোন বাদ দিয়ে বন্ধু টোনে কথা বলছে।

দুজনের গাছতলার বাস কিন্তু বদলালো না। ক্লাস-ট্লাস করত কি না জানি না, প্রায়ই থাকত ওই গাছের নিচেই। গাঁজা- সিগারেট খেত। চা খেত। মানসীর আড্ডাও ভালই জমত। আর দুজনের মুখেই হাসি ঝলমল করত।

উত্তম  পার্টি না দিলেও  কাকলী ঠিকই পার্টি দিল। আর বরাবরের মতনই পার্টি শেষে মদ খেয়ে মাতাল হয়ে গেল উত্তম। পাছে আবার আগের ঘটনা ঘটে, তাই ভুলেও আমি মানসীর কথা তুললাম না।

কিন্তু নিজেই বলল উত্তম, মানসীর বিয়ে হয়ে গেছে।  ওই যে কোচিংয়ে যায় ছেলেটার সাথে।

আমি বললাম ,উত্তম তুই সব কথায় তোতলাস, মানসীর কথায় তোতলাস না কেন?

উত্তম বলল, কারণ সব কথায় আমি কনফিউজড থাকি। আমার বলতে ইচ্ছা করে না বলি। আবার হাফ সত্য হাফ মিথ্যা বলি, তাই প্যাঁচ লেগে যায়। কিন্তু মানসীর ব্যাপারে তো মিথ্যা বলার কিছু নাই। ও এখন চুল কেটে মেম সাহেব হয়ে গেছে। বব কাট। তোর মত, আমার দিকে আঙুল তাক করে বলল উত্তম।

আমি বললাম, এসব কবে হল?

উত্তম বলল, আমি গেলাম চিটাগাং। ও বাসায়ই নাই। থাকবে কীভাবে ও তো শ্বশুরবাড়ি। প্রেগন্যান্ট। বাচ্চা হবে। বড়লোক জামাই। বাচ্চা না নিয়ে পারল না। গাড়ি আছে, বাড়ি আছে, বাচ্চা আছে। চুল কেটে ফেলল!

আমাদের বন্ধুদের মধ্যে কারো কারো নিষ্ঠুরতার অভাব ছিল না।

কে যেন বলে উঠল, ছেলে হলে নাম রাখবে ‘বুড়া’, মেয়ে হলে ‘বুড়ি’।

উত্তম হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। সেটাই আমাদের শেষ পার্টি।

 

১১.

কিছুদিন পরেই আমার ফাইনাল শুরু হল। শেষ হতে না হতেই স্কলারশিপের জন্য পড়াশোনা। পড়াশোনার জন্যই আমি হল ছেড়ে দিলাম। এসবের গ্যাড়াকলে প্রায় সাত আট মাস সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ।

একদিন ঝুম বৃষ্টির দিনে হাতিরপুল বাজারে হঠাৎ কাকলী আর উত্তমের সাথে দেখা হয়ে গেল। তার পাশেই আমার বাসা। দুজনকেই ধরে নিয়ে আসলাম বাসায়।

চা বিস্কিট পর্ব শেষে উত্তম বলল, আমি একটু ঘুমাব। এখানে ঘুমাব নাকি তোর রুমে যাব?

আমি বললাম, আমার রুমেই ঘুমা। আমি বরং এখানে বসি।

আমি ভাবলাম, ও ঘুমাক, আমি আর কাকলী বরং গল্প করি।

কিন্তু উত্তমের সাথে সাথে কাকলীও রুমে চলে গেল। সেই মুহূর্তে প্রথম আমি ওদের দুজনের সম্পর্কের ব্যাপারটা আঁচ করতে পারলাম।

এবং খুবই হতাশ হলাম। এতদিন ধরে সবাই বলে আসছিল, অথচ আমি স্বীকার করি নি। স্বীকার করি নি কারণ আমার কখনো মনেই হয় নি যে এদের সম্পর্ক অন্য রকম। এত বছর সাইকোলজি পড়ে দুজন গভীর প্রেমে পড়া মানুষকেই চিনতে পারলাম না? নিজের ভবিষ্যত নিয়ে দ্বিধায় পড়ে গেলাম।

ওরা বিদায় নেয়ার সময় বললাম, তোদের রেস্ট নেবার ইচ্ছা হলে, এখানে চলে আসিস। বাসা খালিই থাকে।

ইঙ্গিতটা স্পষ্ট ছিল। কাকলী হাসল। আর উত্তম বলল, ট্যাংক (থ্যাংক) ইউ।

আমি ভাবলাম আমার বন্ধুটার বোধহয় একটা গতি হল।

তবে কোনো গতি হল না আমার। এক বছর ধরে খুব চেষ্টার পরেও স্কলারশিপটা হল না। আমি একটা চাকরিতে জয়েন করলাম।  ঢাকার এক বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্টের অ্যাসিসট্যান্ট হিসেবে। অন্য বন্ধুরা মোটামুটি চাকরি-বাকরি শুরু করে দিয়েছে। উত্তম কাকলীর পড়াশোনা তখনও শেষ হয় নি। ওরা প্রায়ই আসত বাসায়। বাসা বদল করে ততদিনে তিনরুমের বাসা আমার। অতিরিক্ত রুম খালিই থাকত। আর উত্তম কাকলীও কোনো ডিস্টার্ব করত না।

কাকলী খুব চেষ্টা করছিল কোথাও একটা চাকরি-বাকরি করার। আমাকে বেশ কয়েকবার ফোনে বলত। কিন্তু উত্তমের সামনে কখনোই এ বিষয়ে আলোচনা করত না। আমি নিজেই একদিন ওকে বারান্দায় ডেকে নিলাম। জিজ্ঞাসা করলাম, ব্যাপারটা কী?

ও বলল, বাসায় জেনে গেছে উত্তমের ব্যাপারে। হিন্দু ছেলের সাথে সম্পর্ক ওরা মেনে নেবে না। নানাভাবে চাপ দিচ্ছে। বাসায় আর থাকা যাচ্ছে না।

জিজ্ঞাসা করলাম, উত্তম জানে কিছু?

কাকলী মাথা নিচু করে খুব আস্তে বলল, না।

বললাম, বলো নি কেন কিছু?

কাকলী বলল, ও তো থাকে ওর দুনিয়ায়। মানসীর বোধহয় বাচ্চা হইছে। আর ওইটার নাম সত্যি সত্যিই ‘উত্তম’ রাখছে। ও খুব আপসেট। তাই আমি আর ডিস্টার্ব করি না।

 

১২.

তখন জুন মাস। ঝড় বাদলের দিন। একদিন ভীষণ ঝড়ের রাতে কাকলী আমার বাসায় এসে হাজির। কাঁধে একটা ব্যাগ। কাপড় দেখেই বোঝা যাচ্ছে বাসা থেকে চলে এসেছে।

বাইরে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি আর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। কাকলীর সমস্ত শরীর ভেজা। চুল থেকে এমনভাবে পানি ঝরছে যে বোঝা মুশকিল ও কাঁদছে কিনা।

পরদিন সকালে ও নিজেই বলল, বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। এবার একটা চাকরি না করলেই না।

আমি উত্তমকে ফোন করে ডেকে আনলাম।

বললাম, আমার আগের বাসাটা খালি আছে শুনলাম। বাড়িওয়ালা আমার পরিচিত। তোরা ওখানে উঠে পড়। আর তুইও টুকটাক কিছু একটা করার চেষ্টা কর।  কাকলী তো করছেই।

উত্তম বলল, আমার তো কোথাও মন দেয়াই সম্ভব না। পর পর দুই সেমিস্টার মিস দিলাম। মানসীর বাচ্চা হইছে। ওর (কাকলীর) কী দরকার ছিল বাসা থেকে বের হয়ে আসার? বাসায় বলারই বা কী দরকার ছিল এখন?

কাকলী পাশেই বসে ছিল। গভীর ধ্যানে মগ্ন। কী যেন ভাবছিল। উত্তমের কথায় ওর এতটুকু প্রতিক্রিয়া হল না। আর আমার খুবই রাগ হল।

পাঁচদিন পর ওরা নতুন বাসায় উঠল। আর আমি এদিকের বাসা ছেড়ে গুলশান রওনা হলাম। অফিসের কাছে তাই ওদিকেই আমার থাকার সুবিধা ছিল।

কাকলী একটা স্কুলে আর্ট টিচার হিসেবে জয়েন করল। মাঝে মাঝে ওর সাথে ফোনে কথা হত। বেশিরভাগ সময়ই ওর স্কুলের বাচ্চাদের কথা বলত। তাদের মজার মজার আঁকা নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে গল্প করতাম আমরা। উত্তমও তখন নাকি একটু একটু সেট ডিজাইনের কাজ করে। শুনে ভালোই লাগত। কিন্তু কখনো টোনাটুনির সংসারে যাওয়া হয় নি। দেখতে দেখতে কাকলীর সাথে যোগাযোগও ক্ষীণ হয়ে আসল। যার যার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলাম সবাই।

 

১৩.

তারপর একদিন সুখবর এলো। আমার ফুল ব্রাইট স্কলারশিপ হয়ে গেল হার্ভাডে। যাওয়ার সব প্রস্তুতি শেষ। ঢাকায় থাকার শেষ সপ্তাহে সব বন্ধুবান্ধবকে ফোন করলাম। জানালাম। কেউ কেউ আমার বাসায় দেখা করতেও এল। কাকলীকে ফোন করেছিলাম। ও ধরে নি।

যাবার আগের দিন সন্ধ্যায় ভীষণ মাতাল বাতাস বইতে শুরু করল ঢাকায়। বৃষ্টি নেই, ঝড় নেই, ভীষণ বাতাস। ভাদ্র মাসের প্রথম পূর্ণিমা সেদিন।

কাকলী ফোন করল, বলল দেখা করতে চাই।

আমি ধরেই নিলাম, ও জানে আমি চলে যাচ্ছি। বন্ধুরা বলেছে হয়ত।

আমি তখন রাস্তায় হাঁটছিলাম। ওকে হাতিরঝিলে আসতে বললাম। আমিও ওদিকে রওনা হলাম।

কত বছর পরে দেখা? দেড় দুই বছর তো হবেই। একটু মোটা হয়ে গেছে মনে হল কাকলী।

ও বলল, আমি খুব বিপদে। তোর সাহায্য দরকার।

আমি চমকে গেলাম। বুঝলাম ও আমার ব্যাপারটা জানে না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, কী হইছে?

বলল, আমি প্রেগন্যান্ট। সাত মাস প্রায়।

আমি বললাম, কীরে! বলিস কী! এটা তো সুখবর! তুই চেহারাটা এ রকম করে বললি কেন? বুড়া কই, ওরে নিয়া আসবি না?

কাকলী বলল, আমি ওকে ডিভোর্স দিচ্ছি। আর সম্ভব না।

আমি হতবাক হয়ে গেলাম। কাকলী সেই আগের মতনই শান্ত, স্থির, শুধু ঝলমলে হাসিটা আর নেই।

কাকলী বলল, মেয়ের নাম রাখতে চায় মানসী। আমার পক্ষে তো সম্ভব না।

মুহূর্তেই আমি হাসিতে ফেটে পড়লাম। বললাম, ওটা তো গাধা। ওটা তো ওরকমই। তুই তো প্রথম থেকেই জানিস ওকে। মানসী নাম রাখতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। তুই এটা নিয়ে এত রাগ করলি কেন রে বাবা! এটা কি ডিভোর্স দেওয়ার মত কিছু?

ও যেন ভেঙে পড়ল, বলল, মানসী… মানসী… মানসী… সারাক্ষণ এই এক নাম। ওর মিথ্যা অনেক সহ্য করছি। এভাবে সম্ভব না রে। ওর ভালো চিকিৎসা দরকার। তুই ওকে সাহায্য কর। আমি আসলে আর পারতেছি না।

আমি বললাম, দেখ, ও একটু অবসেসড, মানসী প্রথম প্রেম বলে কথা। মেয়েটা হোক দেখবি ঠিক হয়ে যাবে। প্রথম প্রেমের প্রতি দুর্বলতা সবার থাকে।

কাকলী অবিশ্বাস নিয়ে আমার দিকে তাকালো। বলল, প্রথম প্রেম মানে? তুই কি মনে করিস মানসী বলে আসলে কেউ আছে?

আমি অবাক হয়ে বললাম, মানে?

ও বলল, কে মানসী? কোথায় মানসী? তার ঠিকানা কী? তার ফোন নাম্বার কই? জানে কেউ? জানে? আজ পর্যন্ত কেউ মানসীকে দেখছে? এত বন্ধু চিটাগাং এর, কেউ দেখছে? কেউ জানে কোন এলাকার মেয়ে? কোন কোচিংয়ে পড়ত ওরা? চারুকলা ছাড়া কোনো দিন কোনো কোচিং করে নাই উত্তম। ওর বাসায় জিজ্ঞেস করে দেখ। আজ পাঁচ বছর ধরে উত্তমকে দেখতেছি, কোনো দিন কোনো ফোন আসে নাই মানসীর। কোনো মেসেজ না। কেউ ওকে বলে না মানসীর কথা। ও নিজে নিজেই বলে। মানসীর বিয়ে, মানসীর বাচ্চা—কে বলল ওকে? আমি ২৪ ঘণ্টা ওর সাথে থেকে দেখছি, কারো সাথে কোনো যোগাযোগ ছাড়াই ও মানসীর আপডেট বলতে থাকে। মানসী বলে কেউ নাই, সবই ওর ফাজলামো, ওর একটা ভড়ং, নিজের দুনিয়ায় পড়ে থাকার একটা তামাশা।

কাকলীর কথাগুলো বন বন করে আমার মাথায় ঘুরতে থাকল। সত্যিই তো, আমরা কেউই কখনো মানসীকে দেখি নি। মানসী কোন এলাকার কেউ জানে না। মানসীর জন্মদিন… প্রতি বছর পার্টি… মানসীর লম্বা চুল… মানসীর প্রেমিক… কীভাবে জানত উত্তম? মানসী… মানসীর কুকুরের বাচ্চা… মানসীর মাথাব্যথা… মানসীর নিষ্ঠুর পরিবার… বিয়ে… উত্তম… উত্তম এত বছর ধরে… সব কল্পনা… উত্তম সিজোফ্রেনিক, এত বছরেও সেটা আমি ধরতে পারি নি!

কাকলীর কাছে ক্ষমা চাইলাম। বললাম, কাকলী, উত্তমের মা সিজোফ্রেনিক সেটা আমি জানতাম। কিন্তু কখনো কেন যেন উত্তমের ক্ষেত্রে… বুঝতে পারি নাই… ভাবিই নাই এই ভাবে… তোর অনেক কষ্ট হইছে… হওয়ারই কথা… এখন ওর চিকিৎসা দরকার… ডিভোর্স করিস নারে… একা থাকলে তো আরো পাগল…।

কাকলী চিৎকার করে উঠল, জীবনে প্রথম ওকে এত জোরে কথা বলতে শুনলাম, বলল, ও সবাইকে ঠকাচ্ছে, ও সিজোফ্রেনিক না। কিচ্ছু না। এটা ওর একটা ভান। এসব বলে ও সব দায়িত্ব এড়ায়ে চলে। ও জানে ওর মনগড়া মানসী। মিথ্যা বলতে বলতে এখন ও মিথ্যার দুনিয়াতেই বাস করে। ওকে আর এই দুনিয়াতে আনা যায় না। এটা ওর ভড়ং। যাবতীয় দায়িত্ব এড়ানোর ভড়ং। ওর কোনো অসুস্থতা নাই। ও একেবারে সুস্থ মস্তিষ্কে সবার সাথে এই নাটক করে যাচ্ছে। তুই আমাকে বিশ্বাস কর। ওর একমাত্র অসুস্থতা ও ক্লিনিক্যাল মিথ্যুক। এবং এ মিথ্যা হল নিজের দুনিয়াতে থেকে যাওয়ার একটা চাল। অন্যের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার একটা অজুহাত।

ওর মুখের দিকে তাকিয়ে পাঁচ বছর আগের সেই কাকলীর কথা মনে পড়ল। সময় কেন এত নিষ্ঠুর হয়! বুড়াটা কোথায় কে জানে! এ মেয়েটার ওপরও নিশ্চয়ই এতটাই ঝড় বয়ে গেছে যে এখন ও উত্তমের অসুস্থতাটাও বিশ্বাস করতে পারছে না। আমার হার্ভাডের আনন্দ শেষ হয়ে গেল। এতটা বছর, এত কাছের বন্ধুটা, ফ্যামিলিতে্‌ও ও রোগী আছে জানার পরেও…।

পরদিন ফ্লাইটের আগেই আমার বসের সাথে কথা বলে উত্তমের কেইস হিস্টোরিটা রেডি করে পাঠালাম। উনি কথা দিলেন, ওর জন্য সবচেয়ে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থাই করবেন। কাকলীকে যোগাযোগ করিয়ে দিলাম। যদিও কাকলী মানতে নারাজ যে উত্তম সিজোফ্রেনিক, কাকলীর নিজেরও একটু রিলাক্স করা দরকার। এ সময় অনেক হরমোনাল চেন্জ হয় যার ফলে মুডের পরিবর্তন হয়। সব বন্ধুবান্ধবকে জানালাম। বললাম, যেন ওর পাশে থাকে।

সেই শেষ কথা। উত্তম বা কাকলীর সাথে আর কথা হয় নি। আমার বসের সাথে যোগাযোগ হত। উত্তমের অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলেই শুনেছি। আর কাকলী নাকি কখনোই উত্তমের অসুস্থতা বিশ্বাস করে নি। মাঝে মাঝে ইচ্ছা হত, ওদের সাথে কথা বলি। বলা হয়ে ওঠে নি। আমি আর কখনো দেশে ফিরি নি।

 

১৪.

পাঁচ বছর পর। ইটালি এলাম ঘুরতে। পিসায় যাবার জন্য ট্রেনে উঠেছি। আমার সহযাত্রী এক বিশাল লম্বা চুলের মেয়ে, সাথে বেশ সুন্দর একটা আট নয় বছর বয়েসী ছেলে। মেয়েটা হঠাৎ ফোনে বাংলা বলে ওঠায় আমি তার সাথে কথা বললাম, আরে! আপনি বাংলাদেশী? বাড়ি কোথায়?

মেয়েটা হেসে বলল, হ্যাঁ, আমার বাড়ি বাংলাদেশের চট্টগ্রামে। আমার নাম মানসী। ও আমার ছেলে উত্তম। আন্টিকে হ্যালো বলো উত্তম!

মেয়েটার বুকে তার কর্মস্থলের আইডি কার্ড ঝুলছে। নীল অক্ষরে সেখানে বড় বড় করে লেখা, ‘মানসী আহমেদ স্বর্ণা’।

গল্প

About Author

পারমিতা হিম
পারমিতা হিম

লেখক ও সাংবাদিক; এখন সময় টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশে কর্মরত।