কবি মৃদুল দাশগুপ্তের সঙ্গে আড্ডা

ইন্ডিয়ার পশ্চিমবাংলার কবি মৃদুল দাশগুপ্তের সঙ্গে এই আড্ডা সাধিত হয় ২০১০ সালে কবি সাজ্জাদ শরিফের ঢাকার বাড়িতে। স্মৃতি-বিস্মৃতি নিয়া আড্ডা শুরু হয়, পরে বরিশাল থেকে কবির পূর্বপুরুষদের পশ্চিমবঙ্গে যাওয়া ইত্যাদি নিয়া আড্ডা চলতে থাকে। দীর্ঘ আড্ডার প্রথম কিস্তি এইখানে গেল। সঙ্গে থাকতেছে ভিডিও।

বলা দরকার, মৃদুল দাশগুপ্ত এই বছর যখন ঢাকায় আসছিলেন তখন কবি ও তাঁর সমসাময়িক কবিদের কবিতা বিষয়ে একটা দীর্ঘ ইন্টারভিউ নেই আমি। আড্ডা শেষ হইলে যথা সময়ে সেই ইন্টারভিউ সাহিত্য ডটকমে প্রকাশিত হবে। – ব্রারা


মৃদুল দাশগুপ্তের সঙ্গে আড্ডায় ছিলেন সাজ্জাদ শরিফ, রাজু আলাউদ্দিন ও ব্রাত্য রাইসু

ব্রাত্য রাইসু

তো পরিচয় হইল, আপনি মুদুল দাশগুপ্ত?

সাজ্জাদ শরিফ

রবিশালের বৈদ্য বংশের কবি।

রাইসু

আপনার কবিতায় বা আপনার মধ্যে প্রায়ই ‘গইলা’ শব্দটা দেখা যায়। এটা কী জিনিস?

মৃদুল দাশগুপ্ত

প্রায় দেখা যায়?

রাইসু

হ্যাঁ গইলা নিয়ে আপনি অনেক কথাবার্তা বলেন। বললে আপনার মধ্যে এক ধরনের আবেগ আসে।

সাজ্জাদ

‘গইলা’ শব্দের কিন্তু বাঙ্গাল অর্থ কী জানো তো? মানে গলে যাওয়া। মানে, ভাতটা গইলা গেল।

রাজু আলাউদ্দিন

হুম! মানে আমাদের যে আঞ্চলিক রূপটা যদি বিবেচনা করি আর কি।

সাজ্জাদ

তোমাদের অঞ্চলের লোকদের একটুখানি গলা গলা ভাব আছে মনে হয়।

রাইসু

গইলাটা কী?

মৃদুল

আমার কবিতার ভিতরে গইলা শব্দটা…?

সাজ্জাদ

আছে।

রাইসু

আপনার লেখালেখি, কবিতা…

সাজ্জাদ

একটা, একটা…

mridul-d4

মৃদুল

গইলা একটা গ্রামের নাম। গইলা আপনাদের বরিশাল জেলায়, অবিভক্ত…

সাজ্জাদ

ওরে তুমি করেই বলো।

রাইসু

আমারে আপনি ‘তুমি’ করে বলতে পারেন। যেটা সচরাচর বলেন আর কি।

মৃদুল

তা হলে আপনার সঙ্গে আলাপ হল কথাটা তুমি এডিট করো।

রাইসু

হুম! করলাম।

মৃদুল

আপনাকে তো আমি চিনি, হ্যাঁ, এভাবে বলো। এবং, মানে দীর্ঘকাল জুড়ে, মানে, ছিয়াশি…

রাইসু

আপনার সঙ্গে তো আমার কয়েকদিন আগেও দেখা হইছে।

মৃদুল

ছিয়াশি সালেও দেখা হয়েছিল।

রাইসু

না, ছিয়াশি সনে হয় নি।

সাজ্জাদ

ছিয়াশির পরে তুমি যখন এসছো

মৃদুল

সাতাশি সালে তোমাদের

সাজ্জাদ

এইটি এইটের পরে

রাইসু

এইটটি নাইন বা নাইনটিতে দেখা হইছিল আমাদের। আমরা যে কুমিল্লা শহরে গেলাম মনে আছে? এক মা আর মেয়ে, প্রায় সমবয়সী? তারা আমাদেরকে খাতা নিয়ে আসলো…

মৃদুল

সেবার দেখা তোমার সঙ্গে প্রথম দেখা নয়।

রাইসু

সেবারই প্রথম।

মৃদুল

ভুল। তোমার স্মৃতি প্রতারণা করছে। তোমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিলো সাতাশি

সাজ্জাদ

নাহ ওর সঙ্গে আমার দেখা হইছে আটাশি সালে।

মৃদুল

আমারও দেখা হয়েছিল সাতাশি

রাইসু

না না

মৃদুল

আমার ও দেখা হয়

সাজ্জাদ

না না ওর সঙ্গে আমার আটাশি সালে দেখা হইছে।

মৃদুল

শোনো, আমি তোমাদের ঢাকা বইমেলায় একবারই এসেছি। ঢাকা বইমেলায় একবারই আমি এসেছি, সেটা অষ্টআশি সালে। আমার সঙ্গে রণজিৎ দা এসেছিলেন, আমার স্ত্রী এসেছিল। তখন রাইসু অত্যন্ত অল্পবয়সী। তোমাদের বইমেলায় রাইসুর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। এরপর রাইসুর সঙ্গে আমার দেখা হয় শিলাইদহে, রাইসু গেছিল, রাইসু এগুলো ভুলে গেছে।

শোনো, আমি তোমাদের ঢাকা বইমেলায় একবারই এসেছি। ঢাকা বইমেলায় একবারই আমি এসেছি, সেটা অষ্টআশি সালে। আমার সঙ্গে রণজিৎ দা এসেছিলেন, আমার স্ত্রী এসেছিল। তখন রাইসু অত্যন্ত অল্পবয়সী।

সাজ্জাদ

এটা আরো পরে, শিলাইদহেরটা।

রাইসু

শিলাইদহেরটা ভুলি নাই। কিন্তু যেটা আপনি দেখছেন জাতিস্মর হিসেবে দেখছেন!

সাজ্জাদ

তবে বিভ্রান্ত স্মৃতি বিশ্বাস করা কবির জন্যে ভালো।

মৃদুল

না, কিন্তু আমার সঙ্গে রাইসুর বইমেলায় দেখা হইছে, বইমেলায় আমি…

রাইসু

সেটা বোধহয় আদিত্যর সঙ্গে দেখা হইছে আপনার?

মৃদুল

না, রাইসুর সঙ্গেই দেখা হয়েছে।

সাজ্জাদ

না, ওর সঙ্গে আমার আটাশি সালে পরিচয়।

রাইসু

সাজ্জাদ ভাইদের সঙ্গে আমার আটাশি সনে পরিচয়।

মৃদুল

তোমার সঙ্গে রাইসুর আটাশি সালে পরিচয় হলে কি আমার সঙ্গে সাতাশি সালে পরিচয় হতে পারে না?

সাজ্জাদ

কোনোই কারণ নেই।

মৃদুল

রাইসুর সঙ্গে তুমি আলাপ করিয়ে দাও নি।

সাজ্জাদ

না, আমি আলাপ করিয়ে দিয়েছি।

"উঠে গেলে কী রকম ভাবে বলব আমি!" - মৃদুল দাশগুপ্ত

“উঠে গেলে কী রকম ভাবে বলব আমি!” – মৃদুল দাশগুপ্ত

মৃদুল

রাইসুর সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিয়েছিল সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এবং রিফাত চৌধুরী।

সাজ্জাদ

সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ তখন দিগন্তের ওপারে।

রাইসু

শোনেন, সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ এবং রিফাত চৌধুরীর সঙ্গে আমারই পরিচয় হচ্ছে নব্বইয়ের পরে।

সাজ্জাদ

কারণ সুব্রত তখনও কবি হিসেবে — কবি হিসেবে না, ব্যক্তি এবং কবি হিসেবেই — দিগন্তের ওপারে।

মৃদুল

নাহ, কিন্তু আমি রাইসুকে সাতাশি সালের বইমেলায় দেখেছি।

রাইসু

সেটা আপনি কেমনে দেখলেন?

সাজ্জাদ

আচ্ছা ঠিক আছে।

রাইসু

সেটা আলাপের বিষয় না।

সাজ্জাদ

হ্যাঁ। সেটা কোনো বিষয় না। গইলাতে আসি।

রাজু

হ্যাঁ।

রাইসু

গইলা?

মৃদুল

গইলা একটি গ্রামের নাম।

রাজু

বরিশালের…

মৃদুল

সেটি অবিভক্ত বরিশাল জেলায়। সেই গ্রামটি তৎকালের একটি বড় গ্রাম। তার অন্দরে আগৈলঝরা, ফুল্লশ্রী এসব নামের আরও কয়েকটি গ্রাম আছে। মানে একটি বড় গ্রামের ভিতরে কয়েকটি ছোট গ্রাম হিসেবে। সেই ফুল্লশ্রী গ্রামে আমাদের মানে আমার পিতৃপুরুষের ভিটা। এই জায়গা থেকেই আমরা এসেছি। এটিই আমাদের উৎস। আর আমি শিশুকাল থেকে আমাদের পরিবারের [ক্যামেরা ঠিক করতে উঠলাম আমি – ব্রাত্য রাইসু] উঠে গেলে কী রকম ভাবে বলব আমি!

রাইসু

না না বলেন বলেন বলেন।

রাজু

আমরা আছি, আপনি বলতে থাকেন।

মৃদুল

হ্যাঁ? সেই গ্রামটি থেকেই, এটাই আমাদের উৎস। আমি শিশুকাল থেকেই বাড়ির যারা মানে বলা যায় প্রগাঢ় মাতামহী পিতামহী এদের কাছ থেকে ওই গ্রামটির বিষয়ে আমি জানতে পেরেছিলাম। এবং ছিয়াশি সালে আমি যখন এই সাজ্জাদকে নিয়ে যাই, সাজ্জাদের মনে আছে হয়তো…

সাজ্জাদ

অব্যশ্যই

মৃদুল

যে আমি বলতে বলতে গেছি, এরপর একটি পোস্টাপিস পড়বে, এরপর একটি রাস্তার মোড় পড়বে, এইখানে বাজার পড়বে, এইগুলো সব মিলে যেতে থাকে। তাই তো সাজ্জাদ?

সাজ্জাদ

হুম।

রাজু

তাই নাকি! তার মানে খুব একটা বদলায় নি?

সাজ্জাদ

না না, ওর বাবার কাছ থেকে ও এত ভিভিড…

মৃদুল

এই গ্রামটি আমি এত ভিভিড বর্ণনা নিয়ে এসেছি।

সাজ্জাদ

বাবার কাছ থেকে নিয়ে আসছিলো।

mridul-d5

মৃদুল

বাবার কাছ থেকে বা আমার ঠাকুমাদের কাছ থেকে আমি সেই গ্রাম সম্পর্কে এত বার বার শুনেছি, এখানে একটি মজার ঘটনা আছে, এত বার বার শুনেছি গ্রামটির একটি চেহারা, গ্রামটির একটি চেহারা, আমার কাছে ছবির মত পরিষ্কার ছিল। এবং আমি তো কখনো সে গ্রামে যাই নি। আমি জন্মাইও নি সেখানে। কিন্তু আমার কাছে সেই বিবরণটি যেহেতু ছবির মত ছিল আমি সাজ্জাদকে বলতে বলতে যাই, দেখো এই রাস্তার পাশ দিয়ে খাল, ওইখানে একটি পোস্টাপিস পড়বে। সেটি গইলা পোস্টাপিস। এমনকি আমি বলি, একটি নাপিতের দোকান পড়বে…

সাজ্জাদ

তুমি এগুলো বলছো কিন্তু আসল ঘটনাটা বলো নাই। সেটা হচ্ছে…

মৃদুল

না আমি বলে দিই, বলে দিই।

সাজ্জাদ

হ্যাঁ বলো, বলো।

মৃদুল

এই বলতে বলতে যখন আমি হাটঁছি, আমি সাজ্জাদকে বললাম এবার পথ ঘুরলেই বিশাল একটি বটগাছ দেখা যাবে।

রাইসু

এটা কত সালে?

মৃদুল

এটা ছিয়াশি সালে।

রাইসু

আচ্ছা আচ্ছা।

মৃদুল

বিশাল একটি বটগাছ দেখা যাবে। কিন্তু আমি স্তভিত হয়ে যাই, একটু আহতও বোধ করতে থাকি, পথ ঘুরতে কোথায় সেই বটগাছ? বটগাছ তো নেই!

তখন আমার মনে হতে থাকে যে আমার ঠাকুমা আর তার উর্ধ্বতন যারা মানে অতীব বয়সী লোকজন বেঁচে ছিলেন আমার শিশুকালে তারা যে আমাকে বলেছিলেন একটি বটগাছ আছে! তারা কি ভুল করেছেন?

আমি আহত বোধ করতে থাকি, কেন সেই বটগাছ নেই! কিন্তু দু’পা এগিয়েই দেখতে পাই বিরাট একটি গর্তের মত জায়গা। সেখানে বেশকিছু লোক করাত দিয়ে একটি গাছ কাটছে। তারা আমাদের বলে এই তো কয়েকদিনের ঝড়ে এত বছরের গাছটা…

তখন আমার মনে হতে থাকে যে আমার ঠাকুমা আর তার উর্ধ্বতন যারা মানে অতীব বয়সী লোকজন বেঁচে ছিলেন আমার শিশুকালে তারা যে আমাকে বলেছিলেন একটি বটগাছ আছে! তারা কি ভুল করেছেন?

রাজু

পড়ে গেছে…

মৃদুল

পড়ে গেছে। মানে সেই বটগাছটা পড়ে গেছে বলে দূর থেকে আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম না। তখন আমি খুব ইয়ে হই।

সাজ্জাদ

আবেগ আক্রান্ত বোধ করো…

মৃদুল

আবেগাক্রান্ত বোধ করি।…

সাজ্জাদ

অত সুস্থ্য ছিল না বিষয়টা। আমরা তে যাচ্ছি। তো মৃদুলদা তো তার স্বভাবসিদ্ধ ভাবে অর্ধেক কথা বোঝা যায় অর্ধেক কথা বোঝা যায় না এভাবে কী বলছে একের পর এক, তারপর যখন নাকি আমরা নামলাম — একটা রিকশায় আমরা উঠেছি এবং ওখানে গিয়ে যখন আমরা পড়লাম — নানান কথা বলছেন মৃদুলদা। তারপরে যেই গইলার কাছে গিয়ে হাজির হলাম, বাজারের মত একটা জায়গা, বাজারের মত একটা জায়গায় গিয়ে হাজির হলাম। হওয়ার পরে, হঠাৎ করে, অনেক লোক, নানা লোক এসছে বাজারে। আমি তো রিকশায় বসে আছি, দাদা দাঁড়িয়ে পড়ল, বলল, ভাইসব, আমি গইলার ছেলে, আমি গইলাতে এসেছি, কলকাতায় হয়ে।

রাজু

আচ্ছা।

সাজ্জাদ

তারপরে সে করলো কী, গইলার মাটি ধরবে। রিকশার উপরে। মাটি তো আর ধরা যায় না। তাই না?

রাজু

না।

সাজ্জাদ

প্রায় পড়ে যায় অবস্থা? তো নিচু হয়ে মাটি তুলে “এই গইলার মাটি!” হাঃ হাঃ, তোমার মনে আছে?

মৃদুল

হ্যাঁ! যাই হোক, এই ঘটনা আর কি।

সাজ্জাদ

খুব ইন্টারেস্টিং।

রাজু

তো আপনার তো জন্ম তো ওইখানে হয় নি। গইলাতে জন্ম না। আপনার পিতৃপুরুষের ভিটে আর কি।

মৃদুল

আমার জন্ম হচ্ছে শ্রীরামপুর শহরে। শ্রীরামপুর শহরে, হুগলি জেলায়। কলকাতার কাছাকাছি একটি জেলা শহর।

রাজু

আচ্ছা। কত সালে জন্ম আপনার?

মৃদুল

আমার ১৯৫৫ সালে। শ্রীরামপুর ওয়ালশ হসপিটালে আমার জন্ম।

রাজু

আচ্ছা, এই শ্রীরামপুর কি সেই ঊনিশ শতকের?

সাজ্জাদ

হ্যাঁ, সেই প্রথম যে ছাপাখানা যে ছিল।

রাজু

আপনি যে লেখালেখি করছেন এখন তার পিছনে ওই জায়গায় জন্মগ্রহণ করাটাও একটা বড় ভূমিকা রাখছে।

রাইসু

না না ওইখানে যারা জন্মগ্রহণ করে নাই তারাও লেখালেখি করছে।

রোচিষ্ণু সান্যালের স্কেচে মৃদুল দাশগুপ্ত, ২০১২

মৃদুল

না না আমার তা মনে হয় না।

রাজু

না না ওই যে মুদ্রণ-টুদ্রণ…

মৃদুল

না না তার সঙ্গে কোন…

রাইসু

আপনার বাবা কি এইখান থেকে গেছিলো কত সালে?

মৃদুল

আমার দাদু মানে আমার বাবার বাবা, তিনি ঢাকায় চাকরি করতেন। ঢাকার ডিসট্রিক্ট স্কুল ইন্সপেক্টর ছিলেন তিনি। তিনি ঢাকায় চাকরি করতেন এবং ওয়ারিতে যুগীনগর লেনে একটি ভাড়াবাড়িতে তারা বাস করতেন।

আমার বাবা লেখাপড়া শেখার জন্য দাদুর কাছে থাকতেন। আমার বাবার যখন চোদ্দ বছর বয়েস তখন আমার দাদু এই ঢাকা শহরেই ভাড়া থাকতেন। সেবার ঢাকায় বসন্ত রোগের মহামারী হয়েছিলো। দাদু যখন মারা যান তখন তার মানে মিড থার্টি, বত্রিশ-চৌত্রিশ বছর বয়স। এবং বাবা চোদ্দ বছর বয়সেই পিতৃহারা হলেন। আমার দাদুর কোনো সহোদর ভাই ছিল না।


মৃদুল দাশগুপ্তের সঙ্গে আড্ডা, পর্ব ১ – ইউটিউব ভিডিও

রাজু

আচ্ছা।

মৃদুল

এই চোদ্দ পনের ষোল বছর বয়সে আমার বাবা পড়াশুনো এবং জীবিকা নির্বাহ দুটি, তাকে তার পরিবারের জন্য, মানে আমার বাবার বোনেরা ছিলেন, আমার ঠাকুমা ছিলেন, আমার কাকা ছিলেন… সেই পরিবারটিকে ভরণ-পোষণের জন্যে বাবাকে কলকাতা যেতে হয়। চল্লিশের দশকের গোড়ার দিকে। তখন তার পনের-ষোল বছর বয়স। সেখানে বাবা নানারকম ছোটখাট কাজকর্ম করতে থাকেন এবং পড়াশুনো করতে থাকেন। এইসময় বিশ্বযুদ্ধ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। বাবা আর্মহাস্ট স্ট্রিট অঞ্চলে কলেজ স্ট্রিটের কাছে, মহাত্মা গান্ধী রোড এখন, সেখানে একটি মেসে থাকতেন।

এবং বাবাকে কলকাতা নিয়ে যাওয়ার পেছনে বাবার এক কাকার ভূমিকা ছিল। কাকা মানে আমার দাদুর খুড়তুতো এক ভাই। তিনি বাবার থেকে দশ বছরের বড় ছিলেন, বছর দশেকের বড় ছিলেন। তার কাছে বাবা থাকতেন আর কি ওই আর্মহাস্ট স্ট্রিটের মেসে। তো তিনি বাবার বন্ধুর মত হয়ে গেছিলেন। দু জন একসঙ্গে থাকে তো। এবার তারা দু’জন যখন যুদ্ধ বাঁধে তখন সেনাবাহিনী — এই এমিরিক্যান সৈন্যবাহিনী কলকাতায় আসে, মিত্রশক্তি আর কি। সেনাবাহিনীতে নানা রকম কাজের সুযোগ ঘটেছিল। এবং পূর্ববাংলার এই যে ছেলেরা ওই তেতাল্লিশ চুয়াল্লিশ সালে কলকাতায় এইভাবে থাকত তাতে ওই তারা মিলিটারিতে নানারকম চাকরির সুযোগ পায়, মানে বা সেই মিলিটারিতে কাজের জন্যে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে। এবং মিলিটারি তাদের — যুদ্ধের সেনাকাজ নয়, যেমন কেউ টাইপিস্ট, কেউ হিসেব কষা…

সাজ্জাদ

আনুষঙ্গিক কাজগুলো—

মৃদুল

আনুষঙ্গিক কাজে, বাবা সে রকম চাকরি পান এবং আমার বাবার কাকাও চাকরি পান। তাকে আমরা বলতাম টুককা দাদু…

রাইসু

কী দাদু?

মৃদুল

তার ডাকনাম টুককা, সরোজ তার নাম ছিল। তো সেই বাবা এবং বাবার কাকা মিলিটারিতে খাতা দেখাশুনোর চাকরি পান।

রাইসু

কোন জায়গায়, উনারা চাকরিটা কোথায় করতেছেন?

মৃদুল

কলকাতায় এটা। কলকাতায় খিদিরপুরে। আমেরিকান, স্পেনিশ এবং ভারতীয় মিত্রশক্তির যে ব্লক তৈরি হয়েছিল এবং তারা কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের আরও অনেক জায়গায় ঘাটি করেছিল। বিভিন্ন জায়গায়, ছোট ছোট।

তো তারা ওখানে চাকরি করতেন যখন তখন খিদিরপুর ডকে, খিদিরপুর বন্দরে আর হাতিবাগান বাজারে জাপানিদের বোমা মারে। এবং কলকাতা থেকে বহু মানুষ জাপানি আক্রমণের ভয়ে পালিয়ে যায়। বুঝতে পেরেছেন? পালিয়ে যায় এবং বাবা সেই সময় শ্রীরামপুরে একটা বাড়ি ভাড়া নেন আর ওই টুককা দাদু তিনিও অন্যত্র কলকাতায় বাড়ি ভাড়া নেন। বাবা শ্রীরামপুরে ওই যে এলেন একটি ভাড়া বাড়িতে। এবং ওই চাকরিও ছেড়ে দিলেন।

এবার যে শশীভূষণ দাশগুপ্ত উনি সম্পর্কে আমার বাবার অগ্রজ কোনো ক্লোজ আত্মীয় হতেন। তিনি তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগীয় প্রধান। শশীভূষণ দাশগুপ্ত, তিনি সুপারিশপত্র দেন, বাবা এবং আমার ওই দাদুর জন্যে। ওই নিয়ে তারা এরপর জীবনবীমা যে সংস্থা তখন ছিল, প্রাইভেট জীবনবীমা সংস্থা ছিল নিউ ইন্ডিয়া ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে তারা চাকরি পান। এইটা যুদ্ধশেষের ঘটনা।

এই আমাদের পরিবারের শ্রীরামপুরে যাওয়া। বুঝতে পেরেছেন? তো এইগুলো খুব লেখার বস্তু, কিন্তু এইগুলো লিখতে গেলে উপন্যাস লিখতে হয়, আমার অত সময় নেই।

এরপর দেশভাগ হয়। দেশভাগ হয়, তখন দেশভাগের সময় পাসপোর্ট-ভিসার দরকার পড়ত না। বাহান্ন চুয়ান্ন সাল পর্যন্ত যারা উদ্বাস্তু, যাদের পরিবারের অনেকে এখানে আছেন তারা যাতায়াত করতে পারতেন। এটা বাহান্ন-তিপ্পান্ন সালে বাবা তখন বীমাসংস্থায় চাকরি করেন। তিনি, আমার কাকা, আমার ঠাকমা এবং আমার দুই পিসিকে নিয়ে শ্রীরামপুরে ওই ভাড়াবাড়িতে, তিনি ভাড়া নিয়েছেন, সেই বাড়িতে নিয়ে চলে যান। এই আমাদের পরিবারের শ্রীরামপুরে যাওয়া। বুঝতে পেরেছেন? তো এইগুলো খুব লেখার বস্তু, কিন্তু এইগুলো লিখতে গেলে উপন্যাস লিখতে হয়, আমার অত সময় নেই।

রাজু

না, স্মৃতিকথা লিখবেন?

মৃদুল

না কিন্তু এইগুলো আমি লিখে উঠতে পারব কিনা জানি না।

(চলবে)

 

About Author

ব্রাত্য রাইসু