(শুরুর কিস্তি)

সেপ্টেম্বার ৯, ২০১৪

ড্যানিয়েল আবার হাসপাতাল থাইকে পালাইছেন।

হাসপাতাল থাইকে পালাইছেন কথাটা অতিশায়ন হইলো। হাসপাতালের দরজা খোলাই থাকে দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা, দরজাতেও কোন দারোয়ান নাই। মাঝেমধ্যে দারোয়ানের পোশাকে যাদের দেখা যায়, উনারা ক্যাফেতে চিনি ছাড়া ডাবল এসপ্রেসো মাকিয়াটোর কাগজের কাপ হাতে দুই রাত না ঘুমানো লাল চোখের নার্সদের সাথে হাসপাতালের এবং এন এইচ এসের এবং ডাক্তারদের চোদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করায় ব্যস্ত থাকেন।

ভাইয়ার চাবি, পিট আর্টিস্ট পেনে আমার আঁকা – লেখক
ভাইয়ার চাবি, পিট আর্টিস্ট পেনে আমার আঁকা – লেখক

ড্যানিয়েল সকাল বেলা ঘুম থাইকে উইঠা হাতে লাগানো যন্ত্রপাতি খুইলা দাঁত মুখ ধুইয়া হাসপাতালে চা নাস্তা কইরা বাথরুমে গিয়া জামা কাপড় পাল্টায়া ডাক্তার নার্সরে কিছু না জানায়া হাসপাতাল থাইকে বাইর হইয়া গেছেন।

আমি ছিলাম ব্রিস্টলে। আমার লাশ কাটার ল্যাব লন্ডন থাইকে ব্রিস্টলে নিয়া যাওয়া হইছে গত মাসে। ব্রিটেনের ফরেনসিক ল্যাবগুলা ব্লাড-প্যাটার্ন অ্যানালিসিসের জন্য দুনিয়া বিখ্যাত। এইখানে ছুরি-কাঁচি-করাত-বাগানের হেজ ট্রিমার-প্লায়ার্স-হাতুড়ি-বাটালি দিয়া যেই পরিমাণ খুন-জখম হয়, সেইরকম দুনিয়ার আর কোথাও হয় বইলা আমার মনে হয় না। আমেরিকার মত বাসায় বাসায় বন্দুক আর কাটা রাইফেল কিনার লাইসেন্স ব্রিটিশদের কাছে থাকলে এই হার কমত কিনা তা অবশ্য আমি জানি না।

দুপুর দুইটায় আমারে মার্ক ফোন দিলেন। ড্যানিয়েল নাকি আমাদের লন্ডন ব্রিজের ল্যাবের পাশে আরব শেখের বানানো শার্ডের তলায় বইসা আছেন। মার্ক লাঞ্চ করতে বাইর হইয়া উনারে আবিষ্কার করছেন। আমারে জিগাইলেন ড্যানিয়েলরে নিয়া উনি কী করবেন? হাসপাতালে রাইখা আসবেন নাকি নিজের বাসায় নিয়া যাবেন? বাসায় নিয়া গেলে উনার গার্লফ্রেন্ড উনারে ছাইড়ে চইলা যাওয়ার সম্ভাবনাও আছে। তবে গেলে উনি খুশিই হন, কারণ বান্ধবী উনারে গত তিনমাস যাবৎ চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়া যাওয়ার চেষ্টা করতেছেন।

—চোখে সমস্যা নাকি তোমার?

—না, তেমন না। একটু ঝাপসা দেখতেছি কয়েক মাস হইলো। আর মাথাব্যথাও করে!

—তো যাও না কেন ডাক্তারের কাছে?

আমি খুব অদ্ভুত এবং বুদ্ধিহীন কথা বলছি এমন ভঙ্গিতে হাইসা উঠলেন মার্ক। “মাথা খারাপ আমার? চোখের পাওয়ার মাপার জন্য যে মেশিন ওরা ইউজ করে, আমি নিশ্চিত ঐগুলা মানুষের বুদ্ধি মাপার যন্ত্র।”

আমি আর জিগাইলাম না, বুদ্ধি মাপলে সমস্যা কী।

ঢাকায় থাকতে আমি রেগুলার-ইন্টারভেলে বাসা থাইকে পালাইতাম।

আমার জন্ম হইছিলো লিবিয়ার সির্তের ইবনে সিনা হাসপাতালে। আমি হওয়ার আগে আগেই আমার বাপ মা ভালো ইংরেজি স্কুল নাই দেইখা আমার থাইকে ছয় বছরের বড় ভাইরে বাংলাদেশে আমার নানির কাছে পাঠায়ে দিছিলেন। আমার শৈশব কাটছে ভাই ছাড়া। বাপ মা আমার একলার এমনে ভাবতে ভাবতেই নিশ্চিন্তে মহা আনন্দে পাশের বাসার ক্লডিয়ার সাথে মারামারি করতে করতে বড় হইতেছিলাম আমি। এরপর হঠাৎ একদিন বাংলাদেশে আইসা দেখি শুকনা- লম্বা-কালোমত-কথা কম বলে এমন একজন “বড়-ভাই” নাম নিয়া আমার দুনিয়ায় উৎপাত আকারে জুইরা বইসা আমার বাপ মা’রে বাপ মা ডাকা শুরু কইরা দিছেন। এবং অসম্ভব তরিৎগতিতে বিছানা বালিশ চেয়ার টেবিল শুদ্ধা আমার বেডরুমের অর্ধেক দখল নিয়া নিছেন।

আমি আম্মার সিলাইয়ের বাক্সের ফিতা দিয়া মাইপা দেখলাম উনার টেবিলের সাইজও আমার টেবিলের চায়ে বড়। এবং দেখলাম উনি প্রতিদিন সেই টেবিলে স্কুলে যাওয়ার আগে তালা দিয়া পেন্সিলের ব্যাগে কইরা চাবি নিয়া যান। চাবি ব্যাগে ঢুকায়া মাথা ঘুরায়ে ঘুরায়ে আশেপাশে দেইখা নেন টেবিলের ভিতর ঢুকাইতে না পারা বাকি জিনিসপত্র ঠিকঠাক আছে কিনা।

আমি দুই সপ্তা তালা ভাঙ্গার চেষ্টা করলাম। এরপর একদিন দুপুরবেলা যখন ভাই আর বাপ বাসায় নাই, আম্মা গোসলে ঢুইকা গলা মোটা কইরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেছেন, তখন আমি আর মনোয়ারা মিলা বড় ভাইয়ের তালা-মারা টেবিলের তলায় মাংস কাটার ছুড়ি দিয়া দুই আংগুল সমান ফুটা করলাম একটা।

মনোয়ারারে পাঠাইছেন আমার নানি। আমাদের বাসায় কাজ করার জন্যে। আমার আম্মা আব্বা কাজের মানুষ রাখতে চান না, কিন্তু মহাজ্ঞানী নানি কইলেন, “তোমরা এই দেশের হাল জানো না। কাজের লোক তোমাদের লাগবেই। এইটা তো আর গাদ্দাফি সাহেবের দেশ না।”

তো, মনোয়ারা থাইকা গেলেন আমাদের বাসায়। উনার কাজের মধ্যে অন্যতম প্রধান কাজ ছিলো আমার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সাহায্য ও উৎসাহ প্রদান করা। বিশেষতঃ যখন বাপ মা কেউ নাই। এবং আমারে বিভিন্ন কবিতা (উনার ভাষায় শিল্লুক) শিখানো। আমি আম্মার রান্নার বই দেইখা ময়দার হালুয়া বানাইতেছি, বইয়ে লেখা এক কাপ ঘিয়ের মধ্যে এক কাপ ময়দা দিয়া ভাজতে হবে। মনোয়ারা পিছে দাঁড়ায়ে কইলেন, “ঘি লাগতো না আফা, ত্যালো যা, ঘিও তা।”

মনোয়ারা আমার নানির মতই জ্ঞানী।

তো আমি এক কাপ তেলের মধ্যে এক কাপ ময়দা দিলাম। এবং তার সাথে সাথেই ময়দা পুইড়া কালো কালো হয়া গেলো, মনোয়ারা আমার দিকে তাকায়া বললেন, “দুদ দেও, আফা, দুদ দেও, এই বইয়ে টিক মত কিছু লেকা নাই।”

দুধ দেওয়া হইল। প্রায় এক লিটারের কাছাকাছি। ঠাণ্ডা  দুধ গরম তেল আর ময়দার উপর দেওয়া মাত্র কালো কুচকুচা ময়দা জইমা থকথকা হয়া গেল। সেইটারে আমি আর মনোয়ারা মিলা আধাঘণ্টা যাবৎ কাঠের চামচ দিয়া ঘুটাইলাম, ব্লেন্ডারে ঢাললাম, ছাঁকনি দিয়া ছাঁকলাম। তাতে গোলাপজল দিলাম। পেস্তা বাদাম দিলাম। পুরা এক বাক্স জাফরান দিলাম। তারপর মনোয়ারার বুদ্ধি অনুযায়ী রান্নাঘরের জানলা দিয়া চামচে কইরা নিচে ফালায়ে দিলাম আম্মা আসার আগেই। মাইর খাব নাকি আমরা?

আমাদের টেবিলের ফুটা আবিষ্কার হইল কিছুদিনের মধ্যেই। আমার বাপ লিভিং রুমের সোফায় বইসা বিচারসভা চালাইতেছেন। মনোয়ারার বিরুদ্ধে আমারে নোংরা কবিতা শিখানো ছাড়াও অভিযোগ অসংখ্য। আমারেও আমার ভাইয়ের টেবিলে ফুটা কইরা সেই ফুটায় চোখ দিয়া বইসা থাকার জন্য ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চাইতে হইল। মনোয়ারা পরের দিন ময়মনসিংহ চইলা যাবেন। নানির বাসা থাইকে মুন্সিরে খবর দেওয়া হইছে উনারে নিয়া যাওয়ার জন্য।

অপমান সহ্য করতে না পাইরা আমি বাথরুমে ঢুইকা কান্নাকাটি করলাম কলের ঠাণ্ডা পানি ছাইড়া।  কোনোভাবেই বুঝলাম না এই “আইলো দিয়া ফাকিস্তান / দ্যাশোত আইলো ইরি দান / ইরি দানের গন্দে / নয়া বাবি কান্দে” এই কবিতায় অশালীন লাইন কোনটা।

কবিতাটা আরো একটু বড়। পরের লাইনগুলায় শাড়ির ভিতর ইঁদুর ঢুকছে, ইঁদুর এইখানে ঐখানে দৌড়াদৌড়ি করতেছে এইরকম কিছু একটা ছিল। পুরাপুরি মনে নাই। তবে তার পরের লাইন মনে হয় ছিলো এইরকম: “হেই উন্দুরে কাইছে আমার নাতি-জামাইয়ের দান (ধান)।”

কিন্তু আমার বাপ মা সেইসময় এই কবিতা থাইকে কী অর্থ বাইর করতে চাইছিলেন, কী অর্থ বাইর করছিলেন সেই সব আমি তখনো বুঝি নাই, এখনো বুঝি না। আমরা সব জিনিসেই তো আমাদের ইচ্ছামত অর্থ আরোপ করি, তাই না? সেইটা আর্ট হোক, কবিতা হোক, বা যেকোনো মুভিই হোক না কেন। এবং সেইটারে বলি আর্টের ইন্টারপ্রিটেশান। এবং অন্য কেউ সেই ইন্টারপ্রিটেশান না বুঝলে বলি, “তুমি মূর্খ। তুমি চাষা। তুমি আনকুথ এবং আনকালচার্ড।”

সেই বিকালেই আমি ঠিক করলাম বাড়ি থাইকে আমার পালাইতে হবে। এই বাসায় আমারে কেউ চায় না। কেউ আমারে বুঝে না। এইখানে আমার আর থাকার প্রয়োজন নাই। আমার বাপ মা থাকুক উনাদের আদরের ধন কলিজার টুকরা চোখের মনি আমার বড় ভাইরে নিয়া।

প্রথমবার বাড়ি পালানো সাকসেসফুল হয় নাই আমার। বয়স কম হওয়ার কারণে আমার কাছে কোনো টাকা পয়সা থাকতো না। বাসা থাইকে বাইর হইয়েই বুঝলাম টাকা ছাড়া বাড়ি ছাড়াটা বিশাল বড় বোকামি হইছে। কিন্তু একবার যখন বাইর হইছি তখন আর ফেরৎ যাব না এইরকম আত্মসম্মানমূলক চিন্তা করতে করতেই বাসার সামনে থাইকে রিক্সা ভাড়া কইরা গুলশান এক নাম্বারে বড় চাচার বাসায় গিয়া উঠলাম। চাচিরে কইলাম রিক্সাভাড়া দিতে। এবং কইলাম এখন থেইকা আমারে পালতে। আমার বাপ মা কেউ আমারে ভালোবাসেন না। আমি আর আমার বাসায় থাকবো না। চাচি আমারে খাসির মাংস আর ডাল আর লেবু দিয়া ভাত মাখায়ে দিলেন। আমি বিটলবণ আছে কিনা জিগাইলাম। উনার বাসায় বিটলবণ নাই। খালি ঈদের সময় চটপটি রান্না হইলে উনি বিটলবণ কিনেন। বিটলবণহীন গন্ধওয়ালা খাসির মাংস অর্ধেক খায়েই আমার নিজের মায়ের জন্য এবং নিজের ছোট সাইজের টেবিলের জন্য এবং বিটলবণের জন্য পেট পুরতে শুরু করলো। ‘পেট পুরা’ আমি শিখছি মনোয়ারার কাছ থেইকা। এর সহজ বাংলা অর্থ হইলো কাউরে মিস করা।

দ্বিতীয়বার বাসা থাইকে পালায়ে গেলাম আমাদের প্রাক্তন দারোয়ানের বউ লিপির বাসায় মহাখালী সাত-তলা বস্তিতে। লিপি আর উনার আম্মা আরো দুইটা ছোট ভাইবোন নিয়া বস্তিতে থাকেন। উনাদের বাসা সুন্দর। দেয়ালে দেয়ালে বাংলা মুভির পোস্টার। একটা ওয়ারড্রোবের উপ্রে একটা প্রিন্টের চাদর দিয়া ঢাকা অ্যান্টেনাওয়ালা টিভি, তার মাথায় কাচের ফুলদানিতে প্লাস্টিকের হলুদ আর লাল রঙের ফুল। সবুজ রঙের পাতা। বাসার পিছনে একটা গরু আর দুইটা কুকুর থাকেন। লিপির আম্মা উনাদের টিনের থালায় কইরা ভাত তরকারি মাখায়ে দেন। আমি এর আগে গরুরে ভাত খাইতে দেখি নাই। হরলাল রায়ের রচনা বইয়ে পড়ছি গরু ঘাস খান।

লিপির আম্মার ধারণা আমার কারো সাথে প্রেম আছে। আমি তখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। ছেলেদেররে তখনো ভালো লাগা শুরু হয় নাই আমার। বড় ভাইরে দেইখা বাকি ছেলেদের আমার মনে হইত আকাট এবং অর্বাচীন এবং মূর্খ। আমি উনারে যাই বুঝাই না কেন, উনি আমারে ততই ছেলে বিষয়ক উচ্চমার্গীয় জ্ঞান দেন।

—আসো আম্মা, তোমারে শুত্যাইয়া শাত্যাইয়া দেই, ফুঁক দিয়া দেই।

—ফুঁক দিবেন ক্যানো?

—এই যে তুমি বেগানা মাইয়া চুল ছাইড়া ঘুরতেছো, তোমার উপ্রে বদ জ্বীনের আছর করছে। ফুঁক দিলে আল্লাতালার পাক কালামে তোমার জ্বীন ছাইড়া যাইব, এনশাল্লাহ।

—চুল ছাড়লে জ্বীন ধরবে ক্যানো? চুলের সাথে জ্বীনের কী?

—এই যে মাগরেবের অকতে আযান হয়, তহন তো শয়তান জ্বীনেরা পাগলপান দোড়াইতে থাহে, তহন বেগানা মাইয়ামাইনষের আলোনি চুল দেকলে হেরা চুল ধইরা ঝুইলা পড়ে।

এই বইলা উনি গান ধরলেন, “সাবদানে তাকিও গো নারী, পর্দার আড়ালে / কি জবাব দিবা তুমি আইশরের কালে-এ-এ-এ…”

আমি গান থামায় দিয়া উনারে কইলাম, “তো, চুল কাইটা ফেললেই তো হয়। ন্যাড়ামাথাওয়ালাদের সাথে তাইলে কোন জ্বীন নাই, নাকি?”

লিপির আম্মা আমার বেয়াদবি দেইখা বিরক্ত হন। কিন্তু আমারেও টিনের থালায় ডিম ভাজি দিয়া ভাত মাখায়ে খাওয়ায়ে দেন। ডিম ভাজির সাথে লাল রঙের সিমের বিচির ভর্তা। আমার ধারণা এইটা শুঁটকি ভর্তা ছিলো। আমি শুঁটকি খাই না শুইনা সিমের বিচি কইছেন। খাইতে অবশ্য ভালোই।

লিপির আম্মা ছিলেন অসম্ভব বুদ্ধিমান মানুষ। কেমনে কেমনে আমার বাসার ফোন নাম্বার জোগাড় কইরা আমার বাপ মা’রে ফোন দিয়া জানাইলেন আমি উনাদের বাসায় আছি। এইদিকে আমারে সেইদিন সকালবেলাই কইছেন আমারে গারমেন্টসে চাকরি যোগাড় কইরা দিবেন উনি। মাসে দুই হাজার টাকা। ওভারটাইম করলে টাকা আরো বেশি। প্লাস দুই ঈদে বোনাস। একসপ্তা ট্রেইনিংয়ের পরেই আমি নাকি কাজ শুরু করতে পারব। এর মাঝেই আবার জিগাইলেন আমি পেট বান্ধায়ে আসছি কিনা। চাকরি নেয়ার পরে কিন্তু আমি আর ছুটি পাবো না!

তো সেই সন্ধ্যাবেলা আমি বাসার পিছনে কাঠের চেয়ারে বইসা সরিষার তেল আর কাঁচা মরিচ ধইনাপাতা দিয়া মাখানো চাল ভাজা খাইতেছি আর লিপির আম্মার নাকি গলায় সূরা ইয়াসিন পড়া শুনতেছি, হঠাৎ দেখি আমার বাপ চিপা গলির মধ্যে দিয়া গাড়ি ঢুকানোর চেষ্টা করতে করতে গলদঘর্ম হইতেছেন আর জানলা দিয়া মাথা বাইর কইরা কইরা একটু পর পর দেখতেছেন গাড়ির মসৃণ গায়ে খসখসা দেয়ালের কোথাও কোনো ঘষা লাগতেছে কিনা।

বাপরে দেখার সাথে সাথেই আমার গারমেন্টসের চাকরি, বস্তিতে বাসা বানায়ে থাকার রোমান্টিক সব স্বপ্ন একে একে দ্রুত উইড়া যাইতে থাকল। আশ্চর্য হয়া খেয়াল করতে থাকলাম কোনো এক অদ্ভুত কারণে পেটের কাছাকাছি কোনো একটা জায়গা থাইকে বালতি বালতি পানি গলা টলা পার হয়া উপ্রের দিকে আমার চোখের কাছাকাছি উইঠা আসতেছে প্রবল বেগে। আমি হাউ হাউ কইরা কান্না জুইড়া দিলাম। লিপির আম্মা উনার মাথার ওড়না আর মলাটবিহীন সূরার বই আর আমার বাপ গাড়ি ফালায়ে আমার দিকে দৌড়ায়ে আসলেন। নিজেরে তখন খুব ভালোবাসার পাত্র মনে হইল আমার।

লিপির আম্মা আমার বাপরে দেইখা খুব আশ্চর্য হইতেছেন এমন আচরণ করলেন। উনারে কাঠের চেয়ারে বসাইয়া চাল ভাজা আর লাল প্লাস্টিকের মগে কইরা চা খাওয়াইলেন। আমার বাপে উনাদের সবাইরে কুশল জিগাইলেন। বস্তির বাচ্চা কাচ্চা গাড়িতে উইঠা যাইতেছে আড়চোখে দেইখাও কাউরে কিছু কইলেন না। আমি তখনো জানতাম না এই পুরা ঘটনাই সাজানো। জানলে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য লিপির আম্মারে মাফ করতাম না কোনোদিন। এবং অবশ্যই অসাধারণ অভিনয়ের জন্য বাপরে একটা পুরস্কার দিতাম। বাপে আমারে গাড়িতে উঠায়ে আমার মাথায় হাত দিয়া ছলছল চোখে কইলেন, “বলো যে, আর কোনোদিন এইসব করবা না। কী, কথা দিচ্ছো?”

আমি মাথা নাড়লাম। করবো না।

কথা আমি রাখছিলাম।

চার মাসের জন্য।

ড্যানিয়েলের সাথে উনার বান্ধবী কিনজেল পিল্লাইয়ের ছাড়াছাড়ি হয়া গেছে। কিনজেল পিল্লাইয়ের বাপ শংকর পিল্লাই দরিদ্র এবং হার্টে ফুটাওয়ালা খ্রিশ্চানের সাথে মেয়ের বিয়ে দিবেন না। কিনজেল পাঁচ তারিখ হাসপাতালে আইসা ড্যানিয়েলরে উনার বিয়া আর এনগেইজমেন্টের কার্ড দিয়া গেছেন। মালদ্বীপের রিটি রা রিসোর্টে বিয়া। আর নর্থ ইয়র্কশায়ারের কাসেল হাওয়ার্ডে এনগেইজমেন্ট। ড্যানিয়েল আমারে জিগাইলেন মালদ্বীপ যাইতে কত খরচ হয়।

—তুমি মালদ্বীপ গেছো?

—উঁহু, আমি এত বড়লোক না।

—মালদ্বীপে খালি বড়লোকরা যায় নাকি?

—তা জানি না, তবে যাইতে তো তিন চার হাজার পাউন্ড খরচ হয় নিশ্চয়ই। আর তুমি যে এত মালদ্বীপ মালদ্বীপ করতেছো, তোমার পাসপোর্ট তো হাসপাতালে আটকা। যাবা ক্যামনে?

—তোমার পরিচিত লোক নাই জাল পাসপোর্ট বানায়? তোমরা ভারতীয় পাকিস্তানি বাংলাদেশীরা তো সব দুই নাম্বার কাজে আছো! বেথনাল গ্রীনে তোমরা সব রকমের ড্রাগস বেচো।

—আমার সাথে ভারতীয় পাকিস্তানিদের তুলনা দিতেছো ক্যান? আমরা আলাদা হইছি অনেক আগে। তোমার সাথে আইরিশদের তুলনা দেই?

—দেও, কে নিষেধ করছে? আমার অত জাতীয়তাবাদ নাই। আর তোমরা উপরে উপরে যতই ঝগড়াঝাটি কর, তলে তলে তোমরা তো সব একই জিনিস।

মালদ্বীপের রিটি রা রিসোর্ট
মালদ্বীপের রিটি রা রিসোর্ট

সেপ্টেম্বার ১১, ২০১৪

আজকে মেব্যেল হেলেন কলিংউড মারা গেছেন।

মেব্যেলের সাথে আমার পরিচয় সেভেন কিংসের জোকার পাবের সামনে। সেভেন কিংস স্টেশানের বাইরেই কতগুলা চ্যারিটি শপ আছে।

কত কিছু যে পাওয়া যায় এই দোকানগুলায়! সুতা উইঠা যাওয়া পুরানা চাদর, কোণা ভাঙ্গা সিরামিকের বাসন, কাঠের উপর নক্সা করা রাশান পুতুল, মাটির গয়না, নাম লেখা-পাতা ছিড়া-ভিতরে অরিগ্যামি হাঁসওয়ালা পুরানা বাসি গন্ধওয়ালা বই, রিল প্যাঁচায়ে যাওয়া গানের ক্যাসেট, লাল নীল পাথর বসানো রুপার আয়না, হাতির দাঁতের চিরুনি, আরো কত হাবিজাবি!

আমি দোকান থাইকে বাইর হয়া বাসার দিকে হাঁটতেছি, দেখি বুড়া মতন এক মহিলা জোকার পাবের সামনে ব্যাগ থাইকে একটা খাতা আর পেন্সিল বাইর কইরা উপরের দিকে তাকায়া কী কী জানি টুকতেছেন। সেইদিন বাসায় যাওয়ার তাড়া ছিলো, কী কারণে মনে নাই, সেইদিন আর উনারে জিগানো হয় নাই কী করতেছেন ঐখানে।

এক সপ্তা পরে ঐ একই জায়গায় উনারে আবার দেখলাম।

—হ্যালো, গুড আফটারনূন।

—হ্যালো!

মহিলা মৃদু হাইসা আমার দিকে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকায় থাকলেন।

—কী করেন এইখানে? আপনারে আগেও দেখছি, ঐ যে, ঐ বিল্ডিংটার সামনে।

—আচ্ছা, আচ্ছা—হুঁ, তেমন কিছু না। এই তো—তালিকা করতেছিলাম একটা।

স্পষ্ট বুঝলাম আমারে এড়াইতে চাইতেছেন। খাতা-টাতা ভাঁজ কইরা আরেক দিকে তাকায় হাঁটা শুরু করছেন উনি। আমিও মোটামুটি নির্লজ্জের মত উনার পিছ পিছ হাঁটা শুরু করলাম।

—কীসের তালিকা করেন?

—এই তো, বিল্ডিং-এর। তুমি কী? সাংবাদিক?

—জ্বি না আমি সাংবাদিক না।

—সরকারের লোক?

—না আমি সরকারের লোক না। সরকার আপনার পিছে লোক লাগায় নাকি?

আমার প্রশ্ন এইবার মনে হয় মনে ধরলো উনার। হাতের লাঠি মাটিতে ঠুইকা খাতা নাচায়ে কইলেন, “সরকার কী কী করে আমি জানি না মনে করছো? আমি বুড়া হইছি দেইখা কি আমার চোখ অন্ধ হয়া গেছে? কত বড় সাহস তুমি চিন্তা করো! গত সপ্তায় আমার বাসায় লোক পাঠাইছে, আমারে নাকি টিভি লাইসেন্স রিনিউ করতে হবে। আমার টিভি সাদাকালো, আমার কেন লাইসেন্স লাগবে? আমি কি আইন জানি না মনে করছে ওরা? আমার বাসায় ঢুকতে চায়, আমার ন্যাশনাল ইনশুরেন্স নাম্বার চায়। আমি কি পাগল হইছি?”

আমি মাথা নাড়লাম। নিশ্চয়ই হন নাই।

“তুমি জানো আমার বাসায় সেইদিনই আমি লকস্মিথ ডাকায়ে ডাবল লক লাগাইছি। উপ্রে একটা, নিচে দুইটা। ওরা আমার মরার জন্য ওয়েট করতেছে। আমি মরলেই তো আমার সম্পত্তি…” এই বইলাই উনি আবার আমার দিকে সন্দেহের ছোট ছোট চোখে তাকাইলেন। “তো, তুমি কী চাও?”

—আপনে কীসের তালিকা করেন এইটাই জানতে চাইছি। আর কিছু না।

—ও আচ্ছা। তেমন কিছু না, বললামই তো। বিল্ডিং-এর তালিকা।

উনারে বিশ্বাস করাইতে আমার বেশ বেগ পাইতে হইছে যে আমি সরকারের বা অন্য কোনো পক্ষের লোক না। পরিচয় হওয়ার প্রায় দেড় মাস পরে আমার আই ডি টাই ডি চেক টেক কইরা উনি অবশেষে সিদ্ধান্তে আসছেন যে আমারে নিয়া উনার চিন্তার তেমন কোনো কারণ নাই।

আমার অবস্থা তখন পাগলা দাশুর স্কুলের বন্ধুদের মত। দাশু স্কুলে বগলে কইরা একটা বাক্স নিয়া আসছেন, সেই বাক্স প্রতিদিন উনি চাবি দিয়া খুইলা একটু ফাঁক কইরা দেখেন, আবার বন্ধ কইরা রাইখা দেন। কেউ হিসাব কইরা বাইর করতে পারেন না বাক্সর মধ্যে কি এমন আছে! তো একদিন যখন দাশু সেই চাবি লেখকের কাছে জমা রাইখা বাক্স দারোয়ানের জিম্মায় রাইখা স্কুলের বাইরে ঘুরতে গেলেন, তখন সবাই মিলা অসম্ভব উৎসাহে বাক্স খুইলা আবিষ্কার করলেন পুরা বাক্সই আসলে খালি। ভিতরে খালি একটা কাগজের মধ্যে লেখা “কাঁচকলা খাও”… এবং আমি পুরাপুরি নিশ্চিত, এই যে দেড় মাস যাবৎ ঘুরাঘুরি, এই যে দেড় মাস ধইরা ক্যাফেতে বইসা ইংলিশ টি আর কাঠের মত শক্ত আ’মন্ড বিসকটি খাওয়া, এই যে কীসের তালিকা-কীসের তালিকা এই নিয়া আমার বিভিন্ন জল্পনা-কল্পনা, খাতা হাতে পাইলে এই সমস্তই আমার মাঠে মারা যাবে এবং আক্ষরিক অর্থেই তখন আমার কাঁচকলা খাইতে হবে।

কাঁচকলা আমার খুব অপছন্দ।

আমার মাতা আমারে কাঁচকলা দিয়া ফ্রিটার বানায়ে কইলেন, “নাও, মুরগীর মাংসের ফ্রিটার। খাও।” আমি আম্মার তাকানোর স্টাইল দেইখাই বুঝলাম এইখানে ঝামেলা আছে।

আম্মা আমার হাত থাইকে তৎক্ষনাৎ ফ্রিটার ফেরৎ নিয়া কইলেন, “থাক খাওয়া লাগবে না তোমার। এইখানে কাঁচা কলা আছে, পরে এই জিনিস খাওয়াইছি বলে বাসা ছেড়ে চলে যাবা।”

কাঁচা কলা ও কাঁচা কলা-পাকা কলার গাছ এবং বান্দর – লেখক
কাঁচা কলা ও কাঁচা কলা-পাকা কলার গাছ এবং বান্দর – লেখক

কাঁচা কলার ফ্রিটারের রেসিপি

উপকরণ

কাঁচা কলা ৪টা

বুটের ডাল ২ কাপ

ডিম ১টা

পেঁয়াজ কুঁচি ১টা

আদা কুঁচি ১ চা চামচ

রসুন কুঁচি ২ চা চামচ

গরম মশলা গুঁড়া ১ চা চামচ

শুকনা মরিচ গুঁড়া স্বাদমত

জিরা বাটা ১/২ চা চামচ

ধনে বাটা ১/২ চা চামচ

লেবুর খোসা কুঁচি ১/২ চা চামচ

ধনে পাতা কুঁচি ১ চা চামচ

পুদিনা পাতা কুঁচি ১ চা চামচ

লেবুর রস ১ টেবিল চামচ

চিনি ১ চিমটি

লবণ স্বাদমত

ব্রেডক্রাম্ব যতদূর লাগে

তেল ভাজার জন্য

প্রণালী

বুটের ডাল ও কাঁচা কলা একসাথে সিদ্ধ কইরা নিবেন।
এরপর সিদ্ধ ডাল অ্যান্ড কলা একসাথে চটকায়ে মাখাইতে হবে। ফুড প্রসেসার বা ম্যাশার বা ব্লেন্ডারে দিয়াও ভর্তা বানানো যায়।
এরপর তেল আর ডিম আর ব্রেডক্রাম্ব বাদে বাকি জিনিসপত্র দিয়া একসাথে মাখায়ে ছোট ছোট বল বানায়ে ডিমে ডুবায়ে ব্রেডক্রাম্বে গড়ায়ে তেলে ভাজবেন।
মুরগীর মাংসের ফ্রিটার বইলা দাবি করবেন না।


মেব্যেল হেলেন কলিংউড, নব্বইতম জন্মদিনে
মেব্যেল হেলেন কলিংউড, নব্বইতম জন্মদিনে

সেপ্টেম্বার ১৪, ২০১৪

আমি-মার্ক-লী-ড্যানিয়েল আর সারি রবিনসন আজকে মেব্যেলের ফিউনারেলে গেছিলাম। ড্যানিয়েল নয় তারিখ থাইকে মার্কের বাসায় আছেন। মার্কের বান্ধবী রাগ কইরা তারপরেই বাসা ছাইড়া চইলা গেছেন। তবে মার্করে সেই নিয়া তেমন চিন্তিত মনে হইলো না। চোখের ডাক্তারের কাছে যাইতে হবে না দেইখা বোধহয় কিছুটা খুশিও। আজকে ফিউনারেল শেষে উনি আর ড্যানিয়েল আর্গস যাবেন, বাসার জন্য পুল টেবিল কিনতে।

লেইটোনস্টোনের সেইন্ট প্যাট্রিক রোমান ক্যাথলিক সেমেট্রিতে মেব্যেলরে কবর দেওয়া হইছে। রীতি অনুযায়ী আমরা সবাই কালো কাপড় পরছি। খালি ড্যানিয়েল মার্কের ধবধবা সাদা রঙের পুলওভার পইরা আসছেন। তার সাথে খাটো গ্রে ট্রাউজারের নিচে লাল-নীল স্ট্রাইপওয়ালা মোজা। মোজাগুলাও মার্কের। সারি রবিনসন জিগাইলেন সাদা পুলওভারের রহস্য কী। ড্যান উলটা উনারে জিগাইলেন:

—কালো রঙের সাথে মৃত্যুর সম্পর্ক কী?

সারি রবিনসন থতমত খায়ে কইলেন, “আমি জানি না, সবাই কালো কাপড় পরে, তাই আমিও পরছি।”

আমি কইলাম, “রোমান এম্পায়ার থাইকেই ব্রিটেন সহ বাকি ইয়োরোপেই মারা যাওয়ার বা শোক প্রকাশের সাথে কালো রঙ ছিল। আর সম্ভবতঃ সেইন্ট বার্থেলমো’র ম্যাসাকারের পরেই সেইটা ট্র্যাডিশানে পরিণত হইছে। প্লাস, তারপর প্রিন্স অ্যালবার্ট মরার পরে রানি ভিক্টোরিয়া ছয় মাস একটানা কালো কাপড় পইরা এই কালো কাপড়রে ব্রিটিশ ফ্যাশনে একদম পাকাপাকি ঢুকায় দিয়া গেছেন। এখন বিয়া বাদে সব অকেশনেই তো কালো পরা হয়।”

লী ম্যাকব্রাইড কইলেন, “হ্যাঁ, আমিও পড়ছি ভিক্টোরিয়ার কথা। কিন্তু মেডিইভাল ইয়োরোপে শোকের রঙ কিন্তু সাদা ছিল। ফিফটিন্থ সেঞ্চুরির আগে রানিরা সবাই কেউ মারা গেলে সাদা কাপড় পরতেন। কী জানি নাম ছিলো উনার, ঐ যে স্কটল্যান্ডের রানি। মা, শ্বশুর, হাজব্যান্ড, ছেলে সবাই এক সাথে মারা গেলেন?”

—কুইন ফ্যাবিওলা?

মার্ক জিগাইলেন। লী মাথা নাড়লেন, “উঁহু, ফ্যাবিওলা তো বেলজিয়ামের রানি ছিলো। আমি স্কটল্যান্ডের কথা কইতেছি।”

হিস্টরি লেসন শেষ হওয়ার আগেই আমাদের কথা বন্ধ করতে হইল। সেমেট্রির টাকমাথা পেটমোটা প্রিস্ট মাথা নিচু কইরা বলা শুরু করছেন, “‘আই অ্যাম দ্য রেসারেকশান অ্যান্ড দ্য লাইফ’, সেইথ দ্য লর্ড; ‘হি দ্যাট বিলিভেথ ইন মে, দো হি ওয়ের ডেড, ইয়েট শ্যাল হি লিভ, অ্যান্ড হুজএভার লিভেথ অ্যান্ড বিলিভেথ ইন মি শ্যাল নেভার ডাই।’”

মেব্যেল হেলেন কলিংউড জন্মাইছিলেন ১৯২১ সালের ১১ ডিসেম্বার সাফোকের অল্ডবার্গ বইলা সমুদ্রতীরের এক খামারবাড়িতে। উনার আব্বা শুয়োর আর হাঁসমুরগী আর ঘোড়া পালতেন, বেকন আর মুরগীর ডিম বেঁচতেন রোববার হাটের দিন। উনার দাদা আর চাচারা ছিলেন বংশপরম্পরায় জেলে। আব্বা আম্মার বিয়ার সময় দাদার কাছ থাইকে একটা ডিঙ্গি নৌকা আর মাছ ধরার জাল উপহার পাইছিলেন নববিবাহিত কাপল। সেই নৌকা পানিতে নামে নাই কোনোদিন। মেব্যেলের আব্বার পানি-ভীতি ছিলো প্রচণ্ড। ছেলে-মেয়েদের কাউরেই পানির কাছে যাইতে দিতেন না উনি। বাড়ির পিছে আস্তাবলে খড়ের গাঁদার নিচে পইড়া থাকা ঘুনে ধরা সেই কাঠের নৌকায় শৈশব কাটছে মেব্যেলের।

১৯৩৯ সালে আঠার বছর বয়সী মেব্যেল আর উনার এক বছরের বড় বোন এলিজাবেথ চেস্টারফিল্ডের রয়্যাল হাসপাতালে নার্সিংয়ের ট্রেইনিং নেয়ার জন্য ভর্তি হন। তখন অলরেডি যুদ্ধ ঘোষণা হয়া গেছে। উনারা দিনের বেলায় ক্লাসের পাশাপাশি ওয়ার্ডে কাজ করতেন, রাতের বেলা  ব্ল্যাক আউট আর এয়ার রেইডের সময় অন্ধকারে রোগীদের মুখে বালিশ চাইপা বইসা থাকতেন।

১৯৪৩ সালে স্টেট  রেজিস্টার্ড এক্সামিনেশান পাশ কইরা দুই বোন কুইন অ্যালেকজান্ড্রার ইম্পেরিয়াল মিলিটারি নার্সিং সার্ভিসে নার্সিং সিস্টার হিসাবে যোগ দেন। এই নার্সিং সার্ভিস ছিলো রয়্যাল নেভাল সার্ভিসের অংশ। যদিও নেভাল সার্ভিস সরাসরি উনাদের কমিশন করছিল, কিন্তু উনাদের উইমেন্স রয়্যাল নেভালের কাপড় পরতে হইত এবং রয়্যাল নেভির নীল রঙা ইনসিগনিয়া ঝুলাইতে হইতো বুকে। ছেলেরা ঝুলাইতেন সোনালি ইনসিগনিয়া। সেই বছরেই মেব্যেলের কাছে নির্দেশ আসে তাদের সবাইরে ডেরবিশায়ারের স্টেশান ছাইড়া যাইতে হবে। এলিজাবেথরে পাঠানো হয় অক্সফোর্ডে। রাতের অন্ধকারে জাহাজে কইরা নার্সিং সিস্টাররা বমি করতে করতে ট্রানজিট ক্যাম্প হয়া নিঃশব্দে বোট-ড্রিল করতে করতে বোম্বে পৌছান ১৯৪৪ এর ফেব্রুয়ারি মাসে।

মেব্যেল গুজরাটে ছিলেন এক মাস। সেইখান থাইকে ঝক্করমার্কা ট্রেইনে কইরে ম্যালেরিয়া ও ডিসেন্ট্রি আক্রান্ত হাত পা কাটা গুলি খাওয়া গ্যাংগ্রিনে পঁচা বিভিন্ন দেশী সোলজারদের সাথে ব্যাঙ্গালোর পৌঁছান উনি। যেইদিন পৌঁছাইছেন, সেইদিন বিকাল থাইকেই কাজ শুরু করার কথা। ব্যাঙ্গালোরের সেই মিলিটারি হাসপাতালে উনি সকাল ছয়টা থাইকে রাত দুইটা পর্যন্ত ওয়ার্ডে রোগী দেখতেন প্রতিদিন। রোগীদের কাউরেই প্রচণ্ড গরম এবং জ্ঞান না ফিরার ভয়ে অ্যানেসথেশিয়া দেয়া যাইতো না, তাই সারাদিন-সারারাতই হাসপাতালের দেড় দুই মাইল দূর থাইকে তাদের মাথা খারাপ করা চিৎকার আর কান্নাকাটি শুনা যাইতো একটানা। হাসপাতাল বিল্ডিং-এর পাশেই শিয়াল আর কুকুর আর বানররা আইসা বইসা থাকতেন খাওয়া দাওয়ার আর মানুষ মরার আশায়। চোর ডাকাতও ছিল অনেক। সুযোগ পাইলেই উনারা আইসা বেডের চাদর, বালিশ, তাপ্পিমারা মশারি, রোগীদের ব্যাগ, অষুদপত্র-গজ-ব্যান্ডেজ এইসব হাতায় নিয়া যাইতেন।

৮ মে ১৯৪৫-এ ইয়োরোপের সাথে যুদ্ধ শেষ হইলেও মেব্যেলদের তখনো ভারত ছাড়ার নির্দেশ আসে নাই জি এইচ কিউ-এর কাছ থাইকে। ভারতের পানিতে তখনো নাকি জার্মান ইউ-বোট ঘুরতেছে। মেব্যেল জাহাজে কইরা বাড়ি আসেন ৪৬ এর জুন মাসে। বড় বোন এলিজাবেথরে পাঠানো হইছিল সাউথ রোডেশিয়ায়। উনি আর কোনোদিন ফিরেন নাই।

মারা যাওয়ার আগে মেব্যেল হেলেন কলিংউড উনার খাতা আমারে দিয়া গেছেন। আমি এখনো খুইলা দেখি নাই। তবে মরার পর উনার সম্পত্তি কে পাইছে তা জানতে ইচ্ছা করে।

(কিস্তি ৬)