(আগের কিস্তি)

৬ অগাস্ট, ২০১৫

লী ম্যাকব্রাইড সকালবেলা ফোন দিয়া আমারে জানাইলেন, আজকে উনি কাজে আসতে পারবেন না—এই তথ্য আমি যেন গ্যারিরে জানাই, এবং ড্যানের কোনো খোঁজ পাওয়া যাইতেছে না।

প্রথম খবরে আমি একটু উত্তেজিত হইলাম। লী কাজে না যাওয়া মানে উনার কাজগুলি আমারে শেষ করতে হবে। কাজে ঢোকার পরে সারি রবিনসন অন্য মানুষ, উনারে হাজার বার পায়ে ধইরা কইলেও উনি নিজের কাজের বাইরে একটা কাজ করবেন না, তা যতই কাছের মানুষ উনারে অনুরোধ করুক না কেন।

দ্বিতীয় খবর আমার কাছে এখন ডাল-ভাত। ড্যান রেগুলার ইন্টারভ্যালে বাসা থিকা পালান।

উপন্যাস শুরু থেকে পড়তে  ছবিতে ক্লিক করুন 

rocky-rd-linkরকি রোড সানডে (১)

সকাল সাড়ে সাতটায় রেডব্রিজ টিউব স্টেশানে ঢুইকাই দেখলাম চারিদিকে প্রচণ্ড ভিড়।  পর পর কয়েকটা ট্রেইন ডিলে’ হইছে গত আধা ঘণ্টা যাবৎ, কে জানি ট্রেইনের নিচে ঝাঁপ দিছেন অক্সফোর্ড সার্কাসে।

লন্ডনের এই এক মহা সমস্যা। দুই তিন দিন পর পরই কেউ না কেউ আত্মহত্যা করার জন্য লন্ডন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেমরে বাইছা নেন, অফিশিয়ালরা আবার খুব সুন্দর কইরা ‘পারসন আন্ডার ট্রেইন’ নামে আত্মহত্যা শব্দ এড়াইয়া যান।

সেন্ট্রাল লাইন আমার সবচাইতে পছন্দের লাইন, সম্ভবতঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই লাইনের প্রায় দুই মাইল জুইড়া ফাইটার এয়ারক্রাফট ফ্যাক্টরি ছিল—এই রোমান্টিক তথ্য জানা থাকার কারণেই পছন্দ। তবে শুধু এই লাইনেই বছরে গড়ে ৫০ জন মানুষ আত্মহত্যা করেন এবং সেই সময় ডিলেইড বা সাসপেন্ডেড ট্রেইনের জন্য সবার সাথে আমিও সেন্ট্রাল লাইনরে ইচ্ছামত গালাগালি করি।

আজকেও গালাগালি দিয়া আমি স্টেশান থিকা বাইর হইয়া বিড়ি ধরাইয়া গ্যারিরে ফোন দিলাম। জানাইলাম, সেট্রাল লাইন আপাততঃ সাসপেন্ডেড। এবং লী অত্যন্ত অসুস্থ, তিনি কাজে যাইতে পারবেন না। আমি গ্যারির ঝাড়ি খাওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম, কী কারণে কে জানে, উনি আমারে দেখতেই পারেন না। উনি কইলেন, ‘ন্যাডস, ছুটি নাও আজকে। আমার শরীরটাও ভালো লাগছে না, সোমবারে একবারে দেখা হবে। গুড ডে!’

rocky-10-a
“পর পর কয়েকটা ট্রেইন ডিলে’ হইছে গত আধা ঘণ্টা যাবৎ, কে জানি ট্রেইনের নিচে ঝাঁপ দিছেন অক্সফোর্ড সার্কাসে।”

হঠাৎ ছুটি পাইয়া আমি বুঝলাম না কী করবো। নিজেরে মা-হীন বাছুরের মত লাগল অনেকক্ষণ। আগামীকাল শুক্রবার, সকালের ফ্লাইটে আমার ডেনমার্ক যাওয়ার কথা। কিন্তু আজকে সারাদিন আমি কী করবো? গ্যারিরে আবার ফোন দিয়া এই ছুটির আদেশ শুধু আমার জন্যই নাকি মার্ক এবং সারি রবিনসনও ছুটি পাবেন, এই প্রশ্ন করার সাহস হইল না। গ্যারিরে বিশ্বাস নাই, দেখা যাবে, দ্বিতীয়বার ফোন করায় আমার নিজের ছুটিই বাতিল হইয়া গেছে।

আমি বাসায় ফেরত গেলাম। রঞ্জু যথারীতি কাজে। বেড সাইড ড্রয়ার থিকা মেব্যেল হেলেন কলিংউডের ডায়েরিটা বাইর করলাম। মেব্যেল মারা গেছেন ২০১৪’র ১১ সেপ্টেম্বার। মারা যাওয়ার আগে উনি উনার ডায়েরিটা আমারে দিয়া যান। এই ডায়েরির পিছে আমি লাইগা ছিলাম প্রায় এক বছর সময়, কিন্তু উনি মারা যাওয়ার পরে ডায়েরি খুইলা হাত দিতেও মন চায় নাই। ডায়েরিটা ব্যাগে ভইরা আমি বাসার সামনে থিকা ১৪৫ নাম্বার লাল দোতলা বাসে চইড়া রওনা দিলাম লেইটনস্টোন। আজকে বাসে বাসে ঘুরবো প্ল্যান করছি। বাসে কইরা শেষ স্টপে নামবো, সেইখান থিকা নিবো আরেক বাস। সেই বাসের শেষ স্টপে গিয়া আরেক বাসে চড়বো। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত কোথায় যাই।

আমি দোতলার জানলার সামনের প্রথম সিটে বইসা ডায়েরি খুললাম। আর সাথে সাথেই কতগুলি চকোলেটের সোনালি রুপালি কাগজ, কয়েকটা চ্যাপ্টা ড্যানডেলিয়ান আর ডেইজির কংকাল, তিন চারটা সিকিউরিটি সিস্টেমের অ্যাডওয়ালা পেপার কাটিং, একটা সাত বছর আগের লেখা প্রায় নাই হইয়া যাওয়া কফির দোকানের রিসিট, একটা হাসপাতালের আইডেন্টিফিকেশান ট্যাগ, দুইটা লন্ডন ডে ট্রাভেল কার্ড আর কতগুলি সাদা লম্বা চুল আমার কোলে আইসা পড়লো।

আমি ভাবলাম, যেই মানুষটারে আমি এত বছর চিনতাম, তার জন্য আমার চোখ দিয়া এক ফোঁটা পানিও কেন বাইর হইল না? মেব্যেলের ফিউনারেলেও আমি কান্দি নাই। মনে আছে সেইদিন আমরা ফিউনারেলে কালো কাপড় কেন পরি সেই ইতিহাস নিয়া কথা কাটাকাটি করতেছিলাম। অথচ মেব্যেল আমার খুব আত্মার কাছের মানুষ ছিলেন। সব সময় মনে হইতো বুড়া হইলে আমার ঠিক উনার মত হওয়ার কথা। কিন্তু মেব্যেলের মারা যাওয়া আমারে কেন স্পর্শ করে নাই আমি ঠিক জানি না। আমার মাতাশ্রী বলেন, আমি লাশ দেখি অলমোস্ট প্রতিদিন, সেই জন্য আমার সব অনুভূতি নাকি ভোতা হইয়া গেছে। আমার অবশ্য তা মনে হয় না। মনে হয়, মারা যাওয়াটা ঠিক নাই বা উধাও হইয়া যাওয়ার মত কোনো ম্যাজিক না। মারা যাওয়াটা পানির বাষ্প হইয়া যাওয়ার মত ব্যাপার। যারা মারা গেছেন তাদের দেখা যায় না সত্যি, কিন্তু তারা নিশ্চয় আশেপাশে কোথাও আছেন। তাই বাতাসে হিউমিডিটি বাড়লেই আমার মনে হয়, মেব্যেল আমার আশেপাশে আছেন, ব্যাঁকা হইয়া হাঁটতে হাঁটতে পুরানা বাড়িঘরের হিসাব টুকতেছেন উনার ডায়েরিতে, ছমিরন্নেছা আমার পাশে আছেন, উর্ধ্বাঙ্গের কাপড় খুইলা শুধু পেটিকোট আর কালো সানগ্লাস পইরা ভূমধ্যসাগরের পাশে শুইয়া বুকে রসুনের তেল ঘষতেছেন, ইসাবেলা ডয়েল আমার পাশে বিছানায় আধশোয়া বইসা জোসেফ ও’হারার চিঠি পড়তেছেন, মাইকেল ম্যাকডাওয়েল তার ২৪১ কেজি ওজনের শরীর নিয়া হুইল চেয়ারে বইসা পিস্তল হাতে ছোট ভাইরে শাসাইতেছেন, আমার আর মন খারাপ হয় না!

লেইটনস্টোন স্টেশানে নাইমা আমার আর বাসে কইরা ঘুরতে মন চাইল না। এইখানে আট বছর আগে লেই রোডের বাসায় রঞ্জুর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়। বাসার সামনে একটা অ্যান্টিকের দোকানে আমরা প্রতিদিন যাইতাম পুরানো আমলের ক্যামেরা, বোর্ড গেইম, কাট গ্লাসের শো-পিস আর স্মৃতির গন্ধওয়ালা বই কিনতে।

 লেইটনস্টোন ও ডব্লিও-১৬ বাস
বৃষ্টির পরে লেইটনস্টোন ও ডব্লিও ১৬ বাস।—ছবি. লেখক

অ্যান্টিক শপের মালিক রবার্ট এল্ডওয়াইন ছিলেন গল্পের ফ্যাক্টরি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় উনার বয়স ছিল ২৭ বছর। আমরা দোকানে গেলেই উনি দুইটা বার স্টুল আগায়ে দিতেন বসার জন্য। রঞ্জু বসতেন না, গল্পে উনার আগ্রহ নাই, আমি স্টুলে বইসা বলতাম, “বব, তোমার যুদ্ধের গল্প বল!”

—কোন্‌ যুদ্ধের? জীবনে যুদ্ধ তো কম দেখি নাই ডার্লিং!

—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্প বল! ঐ যে সেইদিন তোমাদের রেশনিং-এর কথা বলতেছিলা?

—আচ্ছা, ঐ যে ’৪০ থিকা ’৪১-এর জুন পর্যন্ত লেইটনস্টোনের উপরেই একটানা হাই এক্সপ্লোসিভ বোমা পড়ল প্রায় ৩০ এর উপরে, এইটা বলছি তো? ঐ যে মিডল্যান্ড রেইল আর্চটা আছে না, ব্লিটসের আগে আমি ওর নিচে একটা রেডিওর দোকানে কাজ করতাম, এরপর তো জয়েন করলাম আর্মিতে। ঐখানে রেক্স সিনেমা ছিল, আমার বড়বোন তখন সাত মাসের প্রেগন্যান্ট, আর ওর বড় মেয়ের বয়স তখন দুই বা আড়াই। আমাদের সাথেই থাকতো ও।

—এলার গল্প শুনছি এর আগে।

—বলছিলাম? মনে নাই, এখন তো অনেক কিছুই মনে থাকে না, বয়স তো কম হয় নাই! আমি চোখের সামনে ওরে রাস্তায় পইড়া যাইতে দেখলাম বেল বেকারির সামনে, ঐখানেই প্রথম বোমাটা পড়ে তো। গাছ থিকা আপেল আর পেয়ার্স পইড়া ফাইটা যাইতে দেখছো না তুমি সামারে? (আমি উপর নিচ মাথা নাড়লাম) এলারে দেখলাম ঐরকম ভাবে ফাইটা যাইতে। ফাইটা যাওয়া একটা মানুষ, তার ভিতরে আরেকটা মানুষ। কী অদ্ভূত একটা দৃশ্য! চারদিকে ভি-২ রকেট পড়তেছে, আমি দাঁড়ায় আছি এলমস রোডের মাথায়, আমার চোখের সামনে আমি শুধু গাছ থিকা আপেল আর পেয়ার্স পড়ার ছবি দেখতেছি, যেইভাবে মানুষ ফিল্ম বা স্বপ্ন দেখে! হ্যারল্ড আইসা আমারে টাইনা রাস্তা থিকা সরায়, হ্যারল্ডরে দেখছো তো? (আমি উপর নিচ মাথা নাড়লাম) ও সেইদিন না থাকলে আজকে তোমারে কি এই গল্প শোনাইতে পারতাম, মাই লিটিল ডার্লিং?

rocky-10-f
“ফাইটা যাওয়া একটা মানুষ, তার ভিতরে আরেকটা মানুষ। কী অদ্ভূত একটা দৃশ্য!”—অলঙ্করণ. নাদিয়া ইসলাম

আমি হাসলাম। মাথা ঝাঁকায়ে দৃশ্যটা মাথা থিকা সরাইলাম, বললাম, “তোমাদের রেশনিং এর গল্পটা শোনাবা বলছিলা গতবার।”

—কীসের রেশনিং? আমি তো যুদ্ধেই চইলা গেলাম তখন। আমার ছোট ভাই পিটার তখন ১২, ও থাকতো আমার বাবা, মা আর দাদির সাথে এইখানে। যুদ্ধ ঘোষণা দেওয়ার ৫ দিন পর আমাদের একটা কইরা গ্যাস মাস্ক আর আইডি কার্ড আর রেশন বুক দেওয়া হইছিল। রেশন বুকের ভিতর ফুড কুপন থাকত। আমেরিকানরা টিনভর্তি ডিমের সাদা অংশের গুঁড়া আর পর্কের চর্বিওয়ালা একরকমের প্রসেসড মাংস পাঠাইত, ওরা লাইন ধইরা সেই খাবার নিয়া আসত প্রত্যেক সপ্তায়।

—আর কিছু খাইতা না তোমরা?

—আর কী? যুদ্ধের আগে আমরা ইমপোর্ট করতাম ৫০ মিলিয়ন টনের উপর খাবার, যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথে সেইটা ১০ মিলিয়নে গিয়া ঠেকলো—আর কী খাবো, বলো? তিন রঙের রেশন বুক ছিল সেই সময়, খয়েরি, সবুজ আর নীল। খয়েরি খয়েরি, বেইজ রঙেরটা পাইত বেশিরভাগ অ্যাডাল্ট সিভিলিয়ানরা। আর ছিল সবুজ রঙের একটা, প্রেগন্যান্ট মহিলা আর একদম ছোট বাচ্চাদের জন্য। আর ৫ থিকা ১৪ বা ১৬ বছরের বাচ্চাদের জন্য ছিল নীল রঙা বই। লর্ড ওউল্টন ছিল তখনকার মাথামোটা খাদ্যমন্ত্রী, পরে চার্চিল সাহেব আবার তারে রিকনস্ট্রাকশান মিনিস্টারও বানায় যুদ্ধের মাঝামাঝি। সে এক খাবার আবিষ্কার করল, মানে সে ঠিক আবিষ্কার করে নাই, কোন্‌ এক স্যাভয় হোটেলের কোন্‌ এক শেফ এক ‘পাই’ বানাইল, আর অউল্টন সেইটা নিয়া খুব লাফালাফি শুরু করল, বলা শুরু করল এর চাইতে পুষ্টিকর খাবার আর নাকি হইতেই পারে না! সেইটারে বলা হইত ওউল্টন পাই! মেয়েরা খুব বানাইত সেই সময়। আরে মাখন ছাড়া পাই হয় নাকি? আর মাখন তুমি সেই সময় কই পাবা?

—ওউল্টন পাই? নাম শুনি নাই তো? সেইটা কেমন জিনিস?

—আরে নাম না শোনাই ভাল! এইসব সবজি টবজি আর সবজি সিদ্ধের পানি দিয়া বানানো অখাদ্য এক জিনিস। আমার ঘাড়ের পিছে বন্দুক ঠেকাইলেও আমি ঐ জিনিস খাবো না!


ওউল্টন পাই’এর রেসিপি 

পাই’এর উপকরণ:

২ কেজি পরিমাণ টুকরা করা আলু, ফুলকপি, গাজর এবং ওলকপি

৩/৪টা বড় পেঁয়াজ

১ চা চামচ সবজি সিদ্ধ পানি

১ চা চামচ ওটমিল

পাই ক্রাস্টের উপকরণ:

১ কেজি আলু, সিদ্ধ করা

প্রণালী:

  • পাইয়ের সব উপকরণ একসাথে অল্প পানিতে ১০ মিনিট সিদ্ধ কইরা নিবেন।
  • মাঝেমধ্যে একটু ঘাঁটাঘুটি করবেন, যাতে সবজিগুলা ভাইঙ্গা যায় অল্প অল্প এবং পানিও শুকাইয়া আসে।
  • এরপর এরে ঠাণ্ডা কইরা পাই ডিসে ঢালেন।
  • ক্রাস্টের জন্য সিদ্ধ করা আলু চটকাইয়া ভর্তা বানাইয়া সিদ্ধ সবজির উপর ঢাকনামত দেন।
  • এরপর এই জিনিসরে মাঝারি আঁচের অভেনে ৪০ মিনিট ধইরা বেইক করেন। মানে, আদৌ যদি এই জিনিস আপনি বানাইতে চান এবং কোনো শত্রুরে খাওয়াইতে চান, আর কি। এরপর ব্রাউন গ্রেভির সাথে পরিবেশন করুন মহামতি ওউল্টন পাই বা ভিক্টরি পাই!
pai-7u
ওউল্টন পাই

লেইটনস্টোন নাইমা আমি ডব্লিউ-১৬ নাম্বার বাস ধরলাম। নামলাম লেই রোডের সামনে। অ্যান্টিকের দোকানটা তখন বন্ধ। আমি জানি ববের বাড়ি দোকানের ঠিক পিছেই। ঘুইরা দোকানের পিছনে যাইতেই দেখা হইল ববের ছোট ভাই পিটার এল্ডওয়াইনের সাথে। পিটার তার বড় ভাইয়ের একদম উলটা দেখতে, বেঁটে, মোটা, বিয়ার খাওয়া চর্বি জইমা আছে চোখের নিচে, চোখের সামনে নাকের উপর হাই পাওয়ার্ড চশমা, গালগুলি স্নো হোয়াইটের বামনদের মত লাল।

—হাই পিট!

—হেলো মেইট! লং টাইম, নো সি!

—আই নো, বিন বিযি উইথ সো মেনি আননেসেসারি স্টাফ! হাউ আর ইউ, বাই দ্যা ওয়ে?

—আ’য়াম গুড আই গেস, চিয়ার্স! বাট লুক অ্যাট দ্যা হরিবল ওয়েদার! দ্যা ডে সাক্স!

আমি আকাশের দিকে তাকাইলাম। বৃষ্টি আসবে। অগাস্ট বৃষ্টির মাস। ব্যাগেই ছাতা আছে আমার, উদ্বিগ্ন হইলাম না। তবে লন্ডনে বাজে ওয়েদার নিয়া কথা বলা ফরজ কাজ। মুখ ব্যাঁকাইয়া বললাম, “সিরিয়াসলি, আবার? আচ্ছা, ববি কই? আজকে দোকান খুলে নাই?”

—তুমি খবর পাও নাই? তোমারে আমি টেক্সট পাঠাইছিলাম তো! তোমার নাম্বার আগেরটাই আছে তো?

—কীসের খবর?

—বব মারা গেছে জুনে, তুমি জানো না? হঠাৎ কইরা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। সকালে দোকানে গিয়া বসল, আমরা দুই রাউন্ড ব্যাকগ্যামন খেললাম, তোমার কথা হইল, বললো, বিয়ে করার পর তুমি এইদিক আসা ছাইড়াই দিছো এক রকম, এরপর চারটার দিকে একবার বললো, বুকটা একটু ব্যাথা করতেছে—আমি বললাম, একটা প্রেশারের অষুধ খাও। তা ও কি আর কারো কথা শুনতো? ডাক্তার ফাক্তার তো জীবনে দেখায় নাই! তো সেই বিকালেই সব শেষ! অলি গেছে ওর চাচারে ডাকতে বিকালের চা’র জন্য, গিয়া দেখে…! আমরা সবাই বুড়া হচ্ছি জানো তো? আমার দিনকালও প্রায় শেষ, মেইট! যে পরিমাণ মদ আর রোল আপ’স খাই।

আমি আকাশের দিকে তাকাইলাম। বৃষ্টি এখনো নামে নাই। বাতাসে হাই হিউমিডিটি। আমি ভাঁজ করা ছাতা আবার ব্যাগে ভইরা বাস স্টপের দিকে হাঁটা দিলাম। দেখা যাক, আজকে আর কই যাওয়া যায়।

৮ অগাস্ট, ২০১৫

আমি এখন ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে। এইখানে ইউনিভার্সিটি অফ কোপেনহেগেনে আমার আধা ব্রিটিশ আধা ডেনিশ বন্ধু রিস মিডেল্টন ফরেনসিক মেডিসিনে পি-এইচ-ডি করতেছেন। উনি ছুটির দিনে আমাদের উনার ল্যাব ও কাজের জায়গা ঘুরায়ে দেখাবেন বইলা কথা দিছেন। মার্কের অবশ্য ল্যাব দেখার বিশেষ আগ্রহ নাই, উনার ধারণা লন্ডনে আমাদের ল্যাবই দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ল্যাব। ডেনমার্কের তাপমাত্রা এখন দিনের বেলা ২৪-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, সন্ধ্যা ও রাতে তা ১০-১২ ডিগ্রিতে নামে। মোটামুটি পারফেক্ট সামার ওয়েদার বলতে যা বোঝায়, এখন তাই। আজকে রিসের জন্মদিন, উনি ৩০ এ পা দিবেন আজকে, রাতে বন-ফায়ার পার্টি হবে। আস্ত শুয়োর রোস্ট করা হবে, মদ খাওয়া হবে, রিসরে গোলমরিচের গুঁড়ায় গোসল করানো হবে—মার্কের তাতেই আগ্রহ।

গোলমরিচের গুঁড়ায় গোসল করানো নিয়া আমারো আগ্রহ আছে অবশ্য। এই অনুষ্ঠানের ডেনিশ নাম ‘পিওয়াসভ্যেইন’ (Pebersvend)। এর আক্ষরিক অর্থ ‘অবিবাহিত ছেলে’ বা ‘গোলমরিচ-মানব’, এবং ভাবার্থ হইল ‘অবিবাহিত ছেলেদের মানুষের সামনে অপমান করার উৎসব’!

rocky-10-k
‘চোখে গোলমরিচওয়ালা রিস।’—লেখক

১৬ শতকের শুরুতে মশলা ব্যবসায়ী ছেলেরা যারা ব্যাবসার প্রয়োজনে দেশ-বিদেশ ঘুইরা বেড়াইতেন এবং ৩০ হইয়া যাওয়ার পরেও বিয়ে করতে পারতেন না, তাদের মারফত এই ট্র্যাডিশান শুরু হইছে বইলা মনে করা হয়। যেইসব ছেলেরা ২৫ বছর বয়সে অবিবাহিত, তাদের জন্মদিনে করা হয় ‘কান্নেইসভ্যেইন’ (Kanelsvend) অর্থাৎ দারচিনি গুঁড়ায় গোসল। রিস ২৫ বছর বয়সে একবার দারচিনি খাইছেন, এইবার উনার কপালে আছে গোলমরিচ। আমি রিসরে বললাম, ‘গোসল মানে তো নিশ্চয় এক দুই চামচ গুঁড়া গোসলের পানিতে মিশায়ে দিবে, নাকি?’

—জ্বি না বেইব, গোসল মানে হইল আজকে রাতে আমার বাসার সামনে বড় একটা ২৫ লিটারের তেলের ড্রাম ভর্তি শুকনা গোলমরিচ গুঁড়া থাকবে। সেইটার পুরাটা আমার মাথার উপর ঢালা হবে বারোটা এক মিনিটে!

—কী কও এইসব? মারা যাবা তো তুমি! ২৫ লিটার তেলের ড্রামভর্তি গোলমরিচ? এত এত গোলমরিচের অপচয়!

—সেইটা আর বলতে! গতবার দারচিনি গুঁড়ার সময় ভাবছিলাম এইটা এমন আর কী জিনিস, কত দারচিনি খাইছি আপেল পাইয়ে! কিন্তু শুকনা দারচিনি গুঁড়া কেউ এক চা-চামচ নাকে মুখে খায়ে দেইখো কেমন মজা! তিনদিন একটানা কাশছিলাম সেইবার! এইবার তো আরো ভয়াবহ ব্যাপার—আমার গোলমরিচে অ্যালার্জি আছে! আমার মা অলরেডি অ্যাম্বুলেন্স এবং হাসপাতালে খবর দিয়া রাখছেন!

মার্ক কইলেন, “তুমি হাসপাতালে যাও, তোমার হিসাব। আমার মদ খাওয়ায় কেউ বাধ না সাধলেই আমি খুশি!”

রিস আমাদের উনার ল্যাব দেখাইতে দেখাইতে দুর্বলভাবে মাথা নাইড়া হাসলেন। আমি বললাম, “আজকের মধ্যে তোমার একটা গার্লফ্রেন্ড জোগাড় করলে হয় না? আমি যাই তোমার গার্লফ্রেন্ড সাইজা? তাইলে এইটা বাদ দেওয়া হবে?”

—মিথ্যা বইলা ধরা খাইলে আরেক ড্রাম আনা হবে। একটা ড্রাম সবসময়েই ব্যাক-আপ হিসাবে রাখা হয়। সেই ড্রামের গায়ে লেখা থাকে “জীবনে আর কারো সাথে তোমার শোয়ার সম্ভাবনা নাই!”

—তাইলে আর কী? তোমাদের দেশ দেখি খুবই খারাপ একটা দেশ!

মার্ক সাথে সাথে বইলা উঠলেন, “সেই বিষয়ে সন্দেহ নাই। ল্যাবের অবস্থাও তো খারাপ দেখতেছি। তোমরা কনফার্মেট্রি আর কোয়ান্টিটিটিভ অ্যানালিসিসের জন্য কী কী টেকনিক ইউজ করো? এল-এ আই-সি-পি এম-এস (লেজার এ্যাবলেশান ইন্ডাকটিভলি কাপল্‌ড্‌ প্লাজমা মাস-স্পেকট্রোমেট্রি) এর ব্যবস্থা আছে?’

রিস কিছু বলার আগে আমি মার্করে আঙুল দিয়া পারকিন এলমারের ইউ-পি-এল-সি টি-ও-এফ এম-এস (আল্ট্রা হাই পারফরম্যান্স লিকুইড ক্রোমাটোগ্রাফি টাইম অফ ফ্লাইট হাই রেজোলিউশান মাস স্পেকট্রোমেট্রি) টেকনিকের বিশালদেহী ইন্সট্রুমেন্ট দেখাইলাম।

রিস কইলেন, “আমরা বায়ো-ফ্লুইডের জন্য আল্ট্রা পারফরম্যান্স লিকুইড ক্রোমাটোগ্রাফির সাথে টাইম অফ ফ্লাইট মাস স্পেকট্রোমেট্রি এবং অরবিট্র্যাপ টেকনোলজি জোড়া দিছি। তার সাথে আছে ট্যানডেম মাস স্পেকট্রোমেট্রি। তাতে পিউটেটিভ বায়োমার্কারের এক্সাক্ট লোকালাইজেশান আর ডিকনভালশান করা যায়, এই টেকনিক অনেক হাই-রেজ প্রোফাইল আর লং গ্রেডিয়েন্ট দেয়, খুব ভালো টেকনিক, এমন হাই প্রোফাইল ইন্সট্রুমেন্ট হাতে গোনা মাত্র এক দুইটা দেশে আছে! ব্রিটেনে নাই আমি জানি!’

আমি দুইজনের বৈজ্ঞানিক জাতীয়তাবাদী আলাপ থামাইলাম। বললাম, “রিস, তোমার পার্টি শুরু হইতেছে কখন? রাতে? তাইলে চলো এখন একটু কোপেনহেগেন দেইখা আসি!”

মার্ক এবং রিস তখন প্রায় সমস্বরে বইলা উঠলেন, “এইখানে দেখার কী আছে, ধুর!”

আমি খেয়াল কইরা দেখলাম যেই মানুষ যেই দেশে থাকেন সেইখানে তারা দেখার কিছু খুঁইজা পান না। আমার দেশের সব বন্ধুবান্ধব আমারে বাংলাদেশে দেখার কিছু নাই বইলা নিরুৎসাহিত করেন রেগুলার। দেশে থাকতে আমার পতেঙ্গা ছাড়া আর কিছু দেখাও হয় নাই সত্য। বাড়ি থিকা পালায়ে মাদারিপুর, ফরিদপুর, সিরাজগঞ্জ গেছিলাম ছোটকালে, কিন্তু সেইটা ঠিক ‘দেখার’ উদ্দেশ্যে না। পতেঙ্গা যখন গেলাম তখন আমি হাই স্কুল পাশ করছি মাত্র। আমার মা আমারে দিনে দুইবেলা কইরা বাসা থিকা বাইর কইরা দেন আর আমি মহানন্দে এইদিক সেইদিক ঘুইরা বেড়াই। টাকা ফুরায়ে গেলে আবার বাসায় ফেরত আসি। তো একদিন আমার বন্ধু তুষার আর শিবলীর সাথে আড্ডা দিতে দিতে রাত এগারোটায় মনে হইল আমাদের এখনই পতেঙ্গা যাইতে হবে। কারণ আমরা কেউ বঙ্গোপসাগর দেখি নাই। তো সেই রাতেই ট্রেইনে চইড়া আমরা রওনা দিলাম চট্টগ্রাম। সেইখান থিকা হলুদ আর কালো রঙের বেবিট্যাক্সি নিয়া পতেঙ্গা।

ভোরবেলা পতেঙ্গায় যখন নামলাম তখন সমুদ্রের উপর সূর্য উঠতেছে, চারদিকে খুব নরম ধরনের কাব্য টাইপ বিষণ্ন আলো। আমি বড় হইছি ভূমধ্যসাগরের পাশে, সমুদ্রের ঘ্যানর ঘ্যানর ডাকাডাকিতে আমি অভ্যস্ত, সমুদ্রে সূর্য ওঠা নামা সকাল বিকাল দেখছি আমি, কিন্তু এই দৃশ্য কী ভয়ঙ্কর ভাবে আলাদা! সারা দুনিয়ার সমস্ত সাগরে সমস্ত নদীতে যদি ঘুইরা ঘুইরা ঘুইরা একই পানি আসে, তাইলে সব পানি সব সূর্যের তো দেখতে একই রকম হওয়ার কথা! কিন্তু কী আশ্চর্য ভাবে এমনকি একেক দেশের একেক সূর্য আলাদা হইয়া যায়! যেন একেক জায়গায় একই সূর্যের অস্তিত্বও একেক রকম! সেইদিন পতেঙ্গার ছাই রঙা পানি আর ততধিক ছাই রঙা সূর্য দেইখা মনে হইছিল আমি শুধু দেশ ঘুইরা জীবন কাটায়া দিতে পারবো। মনে হইল আমার চাকরি বাকরি ঘর বাড়ি ডিগ্রি ফিগ্রি জামা জুতা প্রেম ভালোবাসা সংসার ফংসার জামাই বাচ্চাকাচ্চা কোনো কিছুতে আগ্রহ নাই, আমি খালি ঘুরবো সারা দুনিয়ায়। আর একেক রকম সূর্যের ছবি তুলবো একেক দেশে।

পড়ুন: নাদিয়া ইসলামের গোয়েন্দা উপন্যাস ‘লকড ডোর ডেথ’, সাম্প্রতিক ডটকমে

কোপেনহেগেনে সূর্যের আজকে অসম্ভব তেজ। তীব্র বাতাসের জন্য খুব একটা গরম লাগতেছে না, কিন্তু তারপরেও আমি, মার্ক আর রিস ঘাইমা উঠতেছি আমাদের পাতলা সুতির জামার নিচে। আমরা নোও ভোলগ্যো (Nørre Voldgade) থিকা হাঁইটা তাইঘোস্তের (Teglgårdsstræde) দিকে যাইতেছি, হঠাৎ রাস্তার একপাশে বইসা থাকা একজন বুড়া লোক লাফ দিয়া উইঠা আইসা আমার বাম হাত খামচায়ে ধরলেন পাশ থিকা।

আমি বিরক্ত হইয়া ঘুরলাম, হ, ইনিও ইয়োরোপের একজন শৌখিন ভিক্ষুক। এই প্রচণ্ড গরমেও উনার গায়ে তিন প্রস্থ উলেন সোয়েটার, একটার নিচ দিয়া আরেকটা বাইর হইয়া আছে, তার উপরে বিভিন্ন ব্যাজ আর ফিতা লাগানো কালো রঙের নতুন একটা ওভারকোট, গলায় লাল-কালো চেক স্কার্ফ, নিচে নীলচে বাদামি বেশ ঢিল ঢিলা ট্রাউজার্স কোমড়ের কাছে কুঁচকায়ে আছে, পায়ে স্ট্রাইপড মোজা আর একপাশে ফুটাওয়ালা বেগুনি রঙের কনভার্স। তাতে কালো মার্কার দিয়া কিছু হাবিজাবি লেখা ইংরেজিতে, ঠিক বোঝা গেলো না কী।

rocky-s
কোপেনহেগেনের রাস্তা।

রিস ধমকের সুরে হড় বড় কইরা ডেনিশে কিছু একটা বললেন উনারে, সম্ভবতঃ আমার কাছে ভিক্ষা পাওয়া যাবে না মার্কা কোনো কথা। উনি তার উত্তরে কিছুটা লিভারপুলের অ্যাকসেন্টে পরিষ্কার ইংরেজিতে বইলা উঠলেন, “সবাইরে নিজের মত ছোট ভাবো কেন? আমি তোমাদের কাছে পয়সা চাইছি?” তারপর ঘুইরা আমার দিকে তাকায়ে বললেন, “আছে তোমার কাছে পয়সা?” উনার কোমড়ে ঝোলানো চামড়ার স্যাডল ব্যাগ থিকা বাচ্চা সাইজের ক্যাভেলিয়ার কিং চার্লস স্প্যানিয়েল জাতের একটা বাদামি কুকুর মুখ বাইর কইরা আমার দিকে বড় বড় চোখে তাকাইলেন। উনি আবার জিগাইলেন, “আছে?”

—আছে। কিন্তু সেইটা আপনারে কেন দিবো?

—তুমি নেবুক্যাডনেজারের নাম শুনছো? ব্যাবিলনের ঐ যে অহঙ্কারী রাজা?

—না। কেন? আপনি সেই রাজা?

মার্ক খুবই বিরক্ত হইলেন। নেবুক্যাডনেজারের উপর না, আমার উপর। উনি সবাইরে শুনাইয়া রিসরে বললেন, “ন্যাডসরে নিয়া কোথাও হাঁটা মুশকিল। ওর সাথে সব সময় তিন ডজন পাগল ঘোরে। কেমনে যে এদের ও অ্যাট্রাক্ট করে, জিসাস জানেন!”

আমরা রাস্তার পাশের একটা পাবে ঢুকলাম। পাবের সামনেই চেয়ার টেবিল আর তার উপরে লাল সাদা স্ট্রাইপ ছাতা ফেলা হইছে, আমরা তার নিচে গিয়া বসলাম। আমি নেবুক্যাডনেজাররেও আমাদের সাথে বসতে বললাম। রিস খুব ঝাঁজওয়ালা গলায় পনিটেইল বান্ধা সোনালি চুল কম বয়স্ক ওয়েটাররে বললেন, “আমি আমাদের তিনজনের বিল দিবো। উনারটা আপনি উনার কাছ থিকা বুইঝা নিবেন।” নেবুক্যাডনেজার এই কথায় শ্রাগ কইরা চোখ নাচাইয়া ওয়েটাররে ইংরেজিতে বললেন, “আডিয়া ডার্লিং আজকে আমারে ঠাণ্ডা এক পাইন্ট বিয়ার দিও। হুইস্কি না!”

আডিয়া নিচু হইয়া ঝুঁইকা খুশি খুশি গলায় ডেনিশে কিছু একটা বইলা উঠলেন, তাতে ক্যাভেলিয়ার কিং চার্লস স্প্যানিয়েল জাতের বাদামি কুকুর আবার মুখ বাইর কইরা আমার দিকে বড় বড় চোখে তাকাইলেন। নেবু্ক্যাডনেজার নিজের জিহ্বায় ডান হাতের তর্জনী ভিজায়ে সেই আঙুল নিয়া রাখলেন আডিয়ার লো-কাট টপ পরা সাদা বুকের উপর। আডিয়া খিল খিল কইরা হাইসা উঠলেন। রিস এবং মার্ক মহাবিরক্ত হইয়া আমার দিকে তাকাইলেন যেন আমার কারণেই এইসব ঘটতেছে!

—আমি রাজা হবো কেন? আমি একজন সামান্য মানুষ। কিন্তু তুমি আমার সাথে মিথ্যা কথা বলতেছ কেন? তুমি নেবুক্যাডনেজাররে চিনো না? তাইলে কি নাবু কুদুরি উসুররে চিনো?

—আমি শুধু জানি দ্বিতীয় নেবুক্যাডনেজার ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যান বানাইছিলেন। আর কিছু জানি না। তার সাথে আপনার টাকা চাওয়ার কী সম্পর্ক? আমারে এইসব বলতেছেন কেন?

ওয়েটার আডিয়া আইসা আমাদের ড্রিঙ্ক আর ছোট একটা গোল সাদা বাটি দিয়া গেলেন। রিস আর মার্ক আমাদের অগ্রাহ্য কইরা গল্প শুরু করলেন, নেবুক্যাডনেজার গোল বাটিটায় অল্প একটু বিয়ার ঢাইলা ক্যাভেলিয়ার কিং চার্লস স্প্যানিয়েল জাতের বাদামি কুকুররে ব্যাগ থিকা  বাইর কইরা খাইতে দিলেন।

আমি মার্করে বললাম, “একটু অলিভ অর্ডার দাও।”

—আসো পরিচিত হই। আমার নাম কেসিয়ান অ্যালেক্সান্ডার বেনারম্যান। তুমি?

—আমার নাম নাদিয়া ইসলাম।

—নাদিয়া, তুমি কি আসলেই নেবুক্যাডনেজাররে চিনো না? নাবোপোলাৎসারের প্রথম পুত্র নাবু কুদুরি উসুর?

আমি এইবার একটু বিরক্ত হইলাম। বললাম, “না চিনি না। কেন আমি কি আগের জন্মে নাবু কুদুরির মা ছিলাম যে আমার উনারে চিনতে হবে?”

রিস এবং মার্ক আমার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকাইলেন। আমি ভাবলাম, উনারা দুইজন একই রকম ভাবে রাগা ও হাসা ও কথা বলা শুরু করছেন কীভাবে? অন্য একজন ওয়েটার আইসা আমাদের এক প্লেট অলিভ এবং ছোট ছোট কিছু ককটেইল স্টিক দিয়া গেলেন। আডিয়া দূরের একটা টেবিল মুছতে মুছতে এখনকার ওয়েটারের দিকে তাকাইয়া ধন্যবাদসূচক চুমা দেওয়ার ভঙ্গি করলেন। বেনারম্যান আমার দিকে আগাইয়া আইসা ঠাণ্ডা গলায় বললেন, “আমারে তোমার বিশ্বাস করার প্রয়োজন নাই। কিন্তু আমি মিথ্যা বলি না। আমি ভিক্ষা করি না, এইখানের মানুষদের জিগায়ে দেখতে পারো। তবে আমি তোমারে কিছু কথা বলতে চাই। সেইগুলি তুমি মনে রাইখো। তুমি পূনর্জন্ম বিশ্বাস করো?”

—জ্বি না।

—ভালো। আমিও করি না। কিন্তু আমি প্রায়ই অদ্ভূত অদ্ভূত স্বপ্ন দেখি। সেই স্বপ্নগুলিরে ঠিক স্বপ্ন মনে হয় না। বাস্তব স্বপ্নের চাইতেও অদ্ভূত, তুমি মানো?

—আমার অনেক স্বপ্নই বাস্তবে ঘটছে। অনেক স্বপ্ন দেখছি যেইগুলির ঠিক ব্যাখ্যা আমার কাছে নাই। বাস্তব অদ্ভূত, হ্যাঁ, সেই বিষয়ে সন্দেহ নাই।

বেনারম্যান আমার হাতগুলি উনার সামনে টাইনা নিলেন। বললেন, “তোমারে আমি স্বপ্নে দেখছি। দেখছি তুমি নেবুক্যাডনেজারের প্রাসাদে একটা কচ্ছপ ছিলা!”

রিস উনার হাত সামনে আগায়া দিয়া বললেন, “আমি কী ছিলাম? ভেড়া?”

—তোমার কচ্ছপের মত শক্ত একটা ‘শেল’ আছে বাইরে, কিন্তু ভিতরে নরম। তুমি কচ্ছপের মতই একজন ট্রাভেলার। তোমার চোখ বিষণ্ন কারণ তুমি দীর্ঘ জীবনে অনেক কিছু দেখছো! তুমি সব পরিস্থিতিতে নিজেরে মানাইয়া নিতে পারো।

মার্ক কইলেন, “তাইলে তো ও তেলাপোকাও হইতে পারে। তেলাপোকারও খোলস আছে। তেলাপোকারও দীর্ঘ জীবন! তেলাপোকার চোখ কেমন তা অবশ্য দেখা হয় নাই!”

—তুমি খুব তাড়াতাড়ি তোমার খুব কাছের একজন বন্ধু হারাইতে যাইতেছো। তুমি তোমার নিজের দেশে ফেরত যাবা লম্বা সময়ের জন্য। সেইখানে ‘অন্ধকারে’ তুমি তোমার নিজেরে খুঁইজা পাবা।

—অন্ধকারে মানে?

—কচ্ছপরা অন্ধকারে ভালো দেখে।

রিস হাসতে হাসতে কইলেন, “কচ্ছপদের রেটিনাতে রড সেল থাকায় তারা অন্ধকারে ভালো দেখে। তোমার রেটিনাতে রড সেল আছে কিনা পরীক্ষা করায়ে নিও, ন্যাডস।” মার্ক কইলেন, “সাথে মাথাটাও!”

—কিন্তু আমি তো আলোতেও ভালো দেখি না। আমার এইখান থিকা দশ ফিট দূরের জিনিস দেখতেও চশমা লাগে।

“তুমি বুঝবা আমি কী বলছি। সবার সব কিছু বোঝার নির্দিষ্ট সময় আছে।” এই বইলা উনি উনার স্যাডল ব্যাগ থিকা একটা ছোট মুখবন্ধ মরিচা পড়া কৌটা বাইর করলেন। কৌটার ভিতরে প্লাস্টিকের ব্যাগ আর ছোট সাইজের একটা চামচ। উনি ব্যাগ খুইলা চামচ দিয়া গাঢ় লাল-বাদামি পাউডারের মত কী একটা জিনিস বাইর কইরা উনার বিয়ারের গ্লাসে ঢাললেন। সাথে সাথেই সোনালি রঙের বিয়ার রক্তের মত লাল হইয়া উঠলো। আমাদের পাশের টেবিলে বসা দুইজন মেয়ে একটা ‘ইয়াক’ সূচক শব্দ কইরা আরেকদিকে চোখ ফিরায়ে নিলেন। মার্ক বেনারম্যানরে বললেন, “আপনি থিয়েটার করলে ভালো করতেন!”

—এইটা আমার অষুধ। এইটা সেইন্ট থমাস আ ব্যেকেটের শুকনা রক্ত। এইটা নিয়মিত খাওয়ার জন্য আমি এখন রাস্তাঘাটে চলাফেরা করতে পারি। আগে তো আমি মানসিক হাসপাতালে ছিলাম।

rocky-10-u
“এইটা আমার অষুধ। এইটা সেইন্ট থমাস আ ব্যেকেটের শুকনা রক্ত।”—অলঙ্করণ. নাদিয়া ইসলাম

রিস বিড় বিড় কইরা কইলেন, “যে আপনারে ছাইড়া দিছে, তারেই মানসিক হাসপাতালে রাখা উচিৎ!” আমি কইলাম, “সেইন্ট? এই যুগে সেইন্ট আছে নাকি?”

—উনি ক্যান্টারবারির আর্চবিশপ ছিলেন। ১১ শতকের দিকে। উনারে জবাই কইরা মারা হইছিল উনার ডেমনিক পজেশানের কারণে।

—তার রক্ত আপনি এখনো পান কই?

—রক্ত খুব অল্প পরিমাণ লাগে। এইটা শুকায়ে বিভিন্ন লতাপাতার গুঁড়ার সাথে মিশানো হইছে। শেষ হওয়ার আগেই আবার হার্বাল সেই পাউডার এইটার সাথে মিশায়ে নেই।

—হ্যাঁ, মুসলিমরাও এইভাবে জমজমের পানির সাথে সাধারণ পানি মিশাইয়া অনেক দিন ধইরা খান।

—তোমারেও একটু এই জিনিস দেই। নিবা? তোমার বন্ধুরে খাওয়ায়ে দেখতে পারো!

—কোন্‌ বন্ধু?

—ঐ যে, যার সাথে তোমার সম্পর্ক খারাপ হইতে যাইতেছে। ওর উপরেও তো ডেমনিক প্রভাব আছে।

আমি টেবিল থিকা ন্যাপকিন উঠায়ে তাতে জবাই হওয়া মাথাখারাপ আর্চবিশপের এক চামচ রক্তের গুঁড়া প্যাঁচায়ে নিলাম। মার্ক এবং রিস আমার দিকে একযোগে চোখ গরম কইরা তাকাইলেন।

এইটা অস্বীকার করবো না আমার মাথাখারাপ লোকদের ভালো লাগে। বিজ্ঞান যেইভাবে ইনস্যানিটিরে শুধুমাত্র বায়োলজি দিয়া ব্যাখ্যা করে, সেইটা আমার পছন্দ হয় না। ঐভাবে দেখতে গেলে পাগলামির সামাজিক আর সাংস্কৃতিক প্রভাবরে কিছুটা উপেক্ষা করা হয়। বাংলাদেশের বেশিরভাগ পাগল ন্যাংটা হইয়া ঘুরেন। ইয়োরোপে আমি ন্যাংটা পাগল দেখি নাই। সেইটা হয়তো ঠাণ্ডার কারণেই, কে জানে? আমার সাথে এই যাবৎকালে ইয়োরোপে যত পাগলদের পরিচয় হইছে, তারা বেশিরভাগই ভাবতেন তাদের পুনর্জন্ম হইছে। তারা ভাবেন আগের জন্মে তারা বিভিন্ন পশুপাখি ছিলেন। একজন ভাবতেন উনি আগের জন্মে উনার প্রেমিকার বাসার সামনের পাথর ছিলেন। উনি ভাবতেন ব্রেইনের সাইজের উপর পাগলামি নির্ভর করে। তাই নিজের পাগলামি সারানোর জন্য উনি মাথার ক্র্যানিয়াল হাড় বড় করতে নিজের মাথায় নিজেই ড্রিলমেশিন দিয়া ফুটা করছিলেন। মাথার চুল সরায়ে আমারে সেই দাগও দেখাইলেন।

১০ অগাস্ট, ২০১৫

আজকে ল্যাবে ঢুইকাই গ্যারি স্যাডলারের ঝাড়ি খাইলাম বৃহস্পতিবার কাজে না যাওয়ার জন্য। একবার মিন মিন কইরা কইলাম, “আপনিই তো আমারে ঐদিন সকালে ছুটি দিছিলেন!”

তাতে লাভ হইল না। আমি কাজে না আসাতে কী কী ক্ষতি হইয়া গেছে তার ফিরিস্তি শুনতে হইলো আধা ঘণ্টা ধইরা। চোখের কোনা দিয়া দেখলাম আমার দুর্দশা দেইখা লী ম্যাকব্রাইড গোলাপি রঙের নখওয়ালা হাতের আড়ালে ফিক ফিক কইরা হাসতেছেন।

লী একটু পরে কোর্টে যাবেন, আমার আজকে কোর্ট নাই। সুতরাং বৃহস্পতিবার না আসার শাস্তি স্বরূপ আমারে নিজের কাজ শেষ কইরা লী’র কাজ শেষ করতে হবে। আমি কাগজপত্র গোছাইতে গোছাইতে মনে মনে গ্যারির চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতেছি, এমন সময় মাইকেল ম্যাকডাওয়েল কেইসের প্রসেকিউশান ব্যারিস্টার অ্যালেক ব্রুস্টার ফোন দিয়া জানাইলেন আগামিকাল সেনটেন্সিং। আমি যেন অবশ্যই কোর্টে থাকি। আমি জিগাইলাম, “কী মনে হয় তোমার? জেমস ম্যাকডাওয়েল যাবজ্জীবন পাইতেছেন?”

অ্যালেক একটু ফিশ ফিশ কইরা বললেন, “আনঅফিশিয়ালি বলবো? আমার মনে হয় ছাড়া পায়ে যাচ্ছে সে!” আমি শোনার সাথে সাথে খুশিতে একটা চিৎকার দিয়া উঠলাম প্রায়! সাথে সাথেই আবার চারদিক দেইখা গলা নামায়ে বললাম, “এইটা হইলে গ্যারি স্যাডলার আমারে চাকরি থিকা বাইর কইরা দিবে নিশ্চিত!”

—তাতে তো তোমার খুশি হওয়ার কারণ দেখতেছি না!

—সেইটা তুমি বুঝবা না! আমি আর লী, লী’রে চিনো তো, তাই না? ও আর একমাত্র আমি বলছি জেমস এই খুন করেন নাই। গ্যারি মোটেও বিশ্বাস করেন নাই আমাদের কথা! আমরা বইলা গেছি এইটা আত্মহত্যা ছিল! মাইকেলের ওজন দেইখাই আমাদের মনে হইছে আত্মহত্যা!

—এখনই এত খুশি হয়ো না। কালকে দেখা যাক কী হয়। আমার মনে হচ্ছে জেমস ম্যাকডয়েল ছাড়া পাচ্ছে। কাউকে বইলো না আমি তোমারে এইসব বলছি।

আমি খুশিতে আমার ড্রয়ার থিকা একটা স্নিকার্স বার বাইর কইরা খায়ে ফেললাম। এবং তারপরেই খুব অদ্ভূতভাবে এস-ই-এম (স্ক্যানিং ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ) এর রুমে ঢুইকা স্ক্যান চালু কইরা ঘুমায়ে গেলাম। ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে দেখলাম একটা ছোট সাইজের বানর একটা কালো রঙের লোমশ কুকুরের ঘাড়ে উইঠা একটা স্টিলের ব্যাট দিয়া কুকুরটার নাকে মুখে প্রচণ্ড মারতেছেন, ঠক্‌ ঠক্‌ ঠক্‌ কইরা বিভৎস শব্দ হইতেছে। চারদিক থিকা ছিটকায়ে মাংসের টুকরা, চামড়া আর রক্ত পড়তেছে। আর তার মাঝখানে বেনারম্যান একটা সবুজ রঙের বোতলে মালার মত কইরা সুতায় গাঁথা ছোট সাইজের ফুটবলের মত গোল গোল রক্তের টুকরাগুলি গুইনা গুইনা ঢুকাইতেছেন। বেনারম্যানের কোমড়ের চারদিকে প্রটোপ্ল্যানেটরি ডিস্কের মত গোল গোল পানি ঘুরতেছে তীব্র বেগে। বেনারম্যানরে দেখাইতেছে বৃহস্পতি গ্রহের মত। তার মাথায় তখন লম্বা লম্বা চুল, সেই চুলগুলাও পানির সাথে সাথে মাথার চারদিকে ঘুরতেছে। আমি বেশ দূরে পানির উপর একটা উলটা করা কালো পিরামিডমত তিনকোণা জিনিসের উপর বইসা আছি, আমার চারপাশে তিন-চার বছরের ছোট ছোট বাচ্চা মেয়েরা হাত ধরাধরি কইরা গোল হইয়া ‘লন্ডন ব্রিজ ইজ ফলিং ডাউন, ফলিং ডাউন, ফলিং ডাউন’ গান গাইতেছেন আর একটু পর পর হাসতে হাসতে মাটিতে গড়ায়ে পড়তেছেন। এর মধ্যে একটা বাচ্চা মেয়ে আমার দিকে আগায়ে আসলেন। উনার গায়ে সাদা হাতকাটা ফ্রক, মাথার চুলগুলিতে আফ্রিকানদের মত চিকন চিকন হাজারখানেক বেণি বান্ধা, বেণির মাথায় কমলা হলুদ রঙের ফিতা। উনি উনার ডান হাত আগায়ে দিলেন আমার দিকে, হাতের মুঠির ভিতর ছোট সাইজের একটা বাচ্চা কচ্ছপ। কচ্ছপটা খোলস থিকা মুখ বাইর কইরা আমার দিকে তাকাইলেন। খোলসের ভিতরে উনার মুখটা ক্যাভেলিয়ার কিং চার্লস স্প্যানিয়েল জাতের বাদামি কুকু্রের। আমি উনারে নিজের হাতে নিয়া আকাশের দিকে তাকাইতে দেখি আকাশ থিকা বড় বড় ফোঁটায় রক্ত পড়তেছে, এবং বেনারম্যান উনার মুখ হা কইরা জিহ্বা বাইর কইরা আকাশের দিকে চোখ বন্ধ কইরা তাকাইয়া আছেন। আমার ঘুম ভাইঙ্গা গেল। দেখলাম আমার মাথার কাছে উদ্বিগ্ন চোখে গ্যারি দাঁড়াইয়া আছেন। উনি উনার একটা হাত আমার মাথায় রাইখা নরম গলায় বললেন, “খুব টায়ার্ড? রাতে ঘুম হয় নি? আজকে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যেও তুমি!”

আমি খক খক কইরা কাইশা মাথা ঝাড়া দিয়া উইঠা বসলাম। মনে মনে বললাম, “হ, এরপর কালকে তুমি আমারে তিন ডাবল কাজ করাও আর কি!”

১৩ অগাস্ট, ২০১৫

ড্যানরে আজকে স্টমাক ওয়াশ দেওয়া হইছে।

গতকাল রাতে উনি প্রায় সত্তরটা বেনজোডায়াজেপিন খাইছেন। প্রায় ৬ দিন নিখোঁজ থাকার পরে গতকাল রাতে উনি মার্কের ফ্ল্যাটে ফেরত আসছিলেন। রাতে মার্কের সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলছেন, লোকাল টেকএ্যাওয়ে থিকা আনা চাইনিজ স্টিমড রাইস, সল্ট অ্যান্ড পেপার কিং প্রন, সুইট অ্যান্ড সাওয়ার চিকেন, ক্রিস্পি শ্রেডেড পর্ক এবং প্রন ক্র্যাকার্স খাইছেন। এরপর ফরচুন কুকি খুইলা তার ভবিষ্যতবাণী নিয়া হাসাহাসি করতে করতে উনারা টিভিতে রেকর্ড করা ‘ফ্যামিলি গাই’ দেখছেন। রাতে ঘুমানোর আগে মার্ক দেখেন উনি তখনো জ্বলন্ত সিগারেট হাতে লিভিং রুমের কাউচে শুইয়া পিটার গ্রিফিনের কথায় হাসতে হাসতে সাদা ওয়াইন খাইতেছেন। মার্ক হাতমুখ ধুইয়া দাঁত মাইজা রাতের কাপড় পইরা উনারে ‘শুভরাত্রি’ জানাইয়া নিজের বেডরুমে ঘুমাইতে চইলা যান রাত দেড়টার দিকে। প্রায় আড়াইটা পর্যন্ত মার্ক নিজের ঘরে পিটার, স্টিউয়ি, মেগ আর লুইসের গলা শুনছেন টিভিতে। মার্কের ইনসমনিয়া আছে। পৌনে চারটায় ঘুম চোখে নিয়া পেশাব করতে উঠলে ঘরের দরজার নিচ দিয়া আলো দেখলে উনি ড্যানের ঘরে ঢোকেন বাতি নিভাইতে। এমন প্রায়ই হয়। ড্যান বই পড়তে পড়তে বা গান শুনতে শুনতে বা ডায়েরি লিখতে লিখতে ঘুমাইয়া যান। মার্ক রাতে আইসা বাতি নিভায়ে নিজের ঘরে ফেরত যান। এইবার অবশ্য বাতির সুইচে হাত দেওয়ার আগে দরজা খোলার সাথে সাথেই উনি অবশ্য বুইঝা ফেলেন কী হইতেছে এবং কী হইতে যাইতেছে।

rocky-family-guy1
“এরপর ফরচুন কুকি খুইলা তার ভবিষ্যতবাণী নিয়া হাসাহাসি করতে করতে উনারা টিভিতে রেকর্ড করা ‘ফ্যামিলি গাই’ দেখছেন।”

ড্যানের পরনে তখন ছিল ‘হোয়েন নাথিং গো’স রাইট, গো লেফট’ লেখা সাদা টি-শার্ট, গ্রে আর কালো রঙের বক্সার শর্টস, উনার হাঁটুগুলি নীল সবুজ সাদা লেপের নিচে ঢাকা। ডানহাতে একটা কাগজ। বামহাত গলার কাছে। বেডসাইড টেবিলে ল্যাম্পের পায়ের কাছে সত্তরটা সেডেটিভের খালি প্যাকেট, আধা খাওয়া মার্লবোরো লাইট, ওয়াইনের গ্লাস, ‘গানস এ্যান্ড রোসেস’ খোদাই করা জিপ্পো আর চার্জ হইতে থাকা মোবাইল ফোন। পাশে কিন্জেলের দেওয়া চামড়ার ওয়ালেট।

ভোররাতে আমি অ্যাক্সিডেন্ট সাইট কাভার কইরা চিগওয়েল রোড ধইরা বাসায় ফিরতেছি। মার্কের ফোন যখন পাই, তখন আমি নর্থ সার্কুলার রোডে, গাড়িতে। আমার সাথে ডি-সি-আই (ডিটেকটিভ চিফ ইনসপেক্টর) ব্রায়ান টমাস উইলসন। উনারে স্নিয়ার্সব্রুকে সিলভান রোডে নামাইয়া আমি বাড়ি যাবো। উনার গাড়ি চালাইতেছেন কনস্টেবল গর্ডন। সেইটা নিঃশব্দে আমাদের পিছ পিছ আসতেছে।

আজকের অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন চারজন মানুষ। মাল্টিপল ভেয়িক্যেল কলিশান। প্রথম গাড়িটা মাজদা-৫ কমপ্যাক্ট এম-পি-ভি। দ্বিতীয়টা ভক্সহল ভিভারো ভ্যান এবং তৃতীয়টা দেইখা আমার চোখে পানি চইলা আসছিল। তৃতীয়টা হইলো কালো ও লাল রঙের ১৯৯৬ এর এক্স-জে সিরিজের জিপ, চেরোকি ‘স্পোর্ট’। জিপ আমার প্রিয় গাড়িগুলির মধ্যে একটা। এক্স-জে সিরিজের ক্ল্যাসিকগুলি বাদ দিয়া বাকি সবগুলির জন্য আমি নিজের একটা পা কাইটা দিতে রাজি। মানে, কেউ যদি গাড়ির বদলে আমার পা কিনতে চান আর কি।

সম্ভবতঃ দ্বিতীয় গাড়ির ২১-২২ বছরের ড্রাইভার বিন্জ ড্রিঙ্কিং করতেছিলেন। গাড়ির ভিতরেই বিয়ারের খালি ক্যান্‌ ও ভদকার ভাঙা বোতল পাওয়া গেছে। তিনি সিট বেল্টও লাগান নাই। উনার শরীর নিজের গাড়ির কাচ ভাইঙ্গা উইড়া গিয়া চেরোকির উইন্ডশিল্ডের ভিতরে স্টেয়ারিং হুইলের উপর আটকায়ে গেছে। বীভৎস দৃশ্য। আমরা গিয়া যখন পৌঁছাইছি, তখন পোলিস এবং ফায়ার ব্রিগেডের লোকজন বাচ্চা ছেলেটারে কাইটা বাইর করতেছেন গাড়ির জানলা থিকা। উনার চোখগুলি তখনো খোলা, হালকা সবুজ রঙের ঘোলা ঘোলা চোখ। মুখভর্তি রক্তে ভাইসা যাওয়া ফ্র্যাকেল্‌স্‌, গাঢ় বাদামি রঙের চুল, রক্ত লাইগা কালো দেখাইতেছে। ইন্সপেক্টর এমি হ্যারিস আমাদের ‘সিন’ বুঝায়ে দিলেন। ব্রায়ান আমারে নোট নিতে কইলেন, আমি রুল টানা কাগজে একটানা বিভিন্ন সংখ্যা লিখা গেলাম। খেয়াল করলাম এই ঠাণ্ডা রাতেও আমার পিঠ বাইয়া ঘাম নামতেছে। আমার হাতে ধরা কলম কাঁপতেছে একটু একটু।

মার্কের ফোন ধইরা আমি প্রথম দুই মিনিট বুঝতেই পারলাম না উনি কী বলতে চাইতেছেন। বললাম, “মার্কি, মার্কি, স্লো ডাউন ম্যান। মার্কি—স্লো দ্যা ফাক ডাউন!”

শুনতে পাইলাম মার্ক ফোঁপাইতেছেন। বললেন, “ন্যাডস, কেউ যদি নিজ ইচ্ছায় মারা যাইতে চায়, তারে বাঁচানোর অধিকার কি মানুষের আছে?”

আমার হাত সাথে সাথে স্টিয়ারিং হুইল থিকা সইরা গেল, ভিজা রাস্তায় স্কিড কইরা গাড়ি বামে ব্যাঁকা হইয়া গেল বেশ অনেকটা। ব্রায়ান আমার হাতের উপর নিজের ডান হাত রাখলেন। উনার হাতগুলি সাপের চামড়ার মত ঠাণ্ডা আর খসখসা। আর শক্ত। আমি গাড়ি সোজা করলাম। পিছ থিকা কনস্টেবল গর্ডন জোরে জোরে হংক করলেন দুইবার। আমি এমার্জেন্সি লাইট জ্বালায়ে গাড়ি পার্ক করলাম রাস্তার পাশে। আমার কানে লাগানো ব্লু-টুথ হেড সেটে মার্ক তখনো ফোঁপাইতেছেন।

আজকে চেলসি অ্যান্ড ওয়েস্টমিন্সটার হসপিটালের বাথরুমে বইসা ড্যানের লেখা চিঠিটা পড়লাম। তাতে লেখা:

“আমার জীবনের সবচাইতে বড় গোপন সত্য হলো আমার কোনো কিছু গোপন না। সবাই আমাকে জানে, সবাই আমার চারপাশের বাতাসে যেসব গল্প ঘুরে বেড়ায় তা শুনতে পায়, আমার তুচ্ছতাকে দেখতে পায়, আমার না বলা চিন্তাগুলি লেখকরা লিখে ফেলে, আমার মাথার ভিতরের দুঃখগুলি দিয়ে কে জানি এক “গ্যারি মোর” গান লিখে ফেলে, লেখে—’আই স্টিল গট দ্যা ব্লুজ ফর ইউ!’— সবই কি আমাকে নিয়ে না? অসাবধানী চিন্তা হলে যা হয়, ফাঁকে ফোঁকড়ে কোন্‌ দিক দিয়ে তোমার শরীরের কোন্‌ ছিদ্রপথে সে বের হয়ে যাবে তুমি জানো না! সেই পালিয়ে যাওয়া চিন্তা তোমার শরীরকে খালি করে দিয়ে যায়, তোমার নিজেকে ভরহীন পেন্ডুলামের মত লাগে, খালি হয়ে যাওয়া ফ্রিজের ভ্যাপসা শীতল দুর্গন্ধের মত লাগে—তোমার গল্পগুলি তাই তুমি আরেকজনের মুখে শোনো, তোমার যুদ্ধে তুমি আরেকজনকে মরতে দেখো, তোমার রাস্তায় তুমি আরেকজনকে হাঁটতে দেখো। ভাবো, রাস্তাটা আদৌ তোমার ছিলো কিনা।

আমি আমার একাকীত্ব উপভোগ করি। আমি আমার চোখের পানি উপভোগ করি। আমার চামড়ার নিচে খালি হয়ে যাওয়া, শূন্য হয়ে যাওয়া, নাই হয়ে যাওয়া পেটের ভিতরের নির্জনতাকে উপভোগ করি। সব গল্প সব গোপন আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়াকে উপভোগ করি। মানুষ কি তার সবচাইতে কষ্টের মুহূর্তে আনন্দ পেতে পারে না? মানুষ কি তার অক্ষমতাকে শক্তি হিসাবে দেখতে পারে না? মানুষ কি তার হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিতে কাতর হতে পারে না? মানুষ কি মরে গিয়ে বেঁচে উঠতে পারে না? মানুষ কি কখনো তার স্বপ্নে সুখী হয় না?

আমি অসুখী না। আমি শুধু আমার হারিয়ে যাওয়া গল্পগুলি খুঁজছি। যেই গল্পগুলি এখনো কেউ কাউকে বলে নাই।

আমি শুধু আরেকটা জীবনে আমার গল্পগুলি খুঁজে পেতে চাইছি।

(কিস্তি ১১)