রকি রোড সানডে (১১)

আগের কিস্তিপ্রথম কিস্তি

অগাস্ট ১৪, ২০১৫

দুপুরবেলা আমি মেয়রের অফিসের সামনে সবুজ ঘাসে বইসা আছি। আকাশ ভর্তি ঘোলা ঘোলা স্লেট আর কালো রঙের মেঘ, যে কোনো সময় বৃষ্টি হবে।

অফিসে আজকে প্রচুর কাজের চাপ। নতুন তিনটা কেইস আসছে, তিনটাই হাই প্রোফাইল। দুপুরে লান্চে আমরা সবাই সাধারণতঃ একসাথে লিভারপুল স্ট্রিটে যাই, স্টেশানের বাইরে পাবে বইসা বিয়ার আর ফিশ অ্যান্ড চিপস খাই।

মার্ক খান পাবের অখাদ্য চিকেন ভিন্দালু আর সাদা সাদা রঙের ভাত। উনার ঝাল এবং ভারতীয় মশলাওয়ালা সব ফালতু খাবার পছন্দ।

আজকে অবশ্য কেউ বাইর হন নাই, সবাই অফিসের সামনের ক্যাফে নিরো থিকা প্যাকড স্যান্ডুইচ আর গ্রানোলা বা চকোলেট বার আর ক্রিস্প বা আপেল জাতীয় খাবার কিনা ল্যাবেই লান্চ সারতেছেন।

শুধু আমি কাজ ফালায় রাইখা টাওয়ার ব্রিজ আর লন্ডন ব্রিজের মাঝখানের সমান কইরা কাটা ভিজা ঘাসে বইসা আছি। আমার পঞ্চাশ গজ সামনে রাস্তার রেলিং-এর উপর ভর দিয়া দাঁড়ায় আছেন টকটকা লাল লিপস্টিক আর গলায় কালো আর রুপালি রঙের চোকার পরা আমার সমবয়সী একজন কোঁকড়া কালো চুলওয়ালা মেয়ে।

চুলগুলি ইয়োরোপিয়ানদের তুলনায় একটু বেশিই কালো।

আমি অন্যমনস্ক হইয়া উনার ডাই করা চুল এবং উনার সামনে থেমসের পানিতে দাঁড় করানো ব্রিটিশ নেভির এইচ-এম-এস বেলফাস্টের মাস্ট আর বফর মাউন্টিঙ্গের দিকে তাকাইয়া আছি, উনি ছোট ছোট পা ফালায়ে আগাইয়া আসলেন আমার দিকে।

এইচ এম এস বেলফাস্ট এবং কোঁকড়াচুলের মেয়ে

এইচ এম এস বেলফাস্ট এবং কোঁকড়া চুলের মেয়ে। অলঙ্করণ. নাদিয়া ইসলাম

উনার পায়ে কালো রঙের অ্যাংকেল বুট, তার গোড়ালির কাছে একটা চেইনের সাথে রুপালি রঙের ছোট ছোট কাঁটা লাগানো। হাঁটার সাথে সাথে তারা একে অপরের সাথে বারি খাইয়া ঝন ঝন ঝন ঝন আওয়াজ করতেছে।

আমি আকাশের দিকে তাকাইলাম, টিপ টিপ বৃষ্টি পড়া শুরু হইছে। মেয়েটার হাতে একটা ভাঁজ করা ছোট সবুজ রঙের ছাতা। সবুজ রঙটা খুব সুন্দর। গরমের দেশে বৃষ্টি হইলে বাচ্চা কলাগাছের পাতার এমন রঙ হয়।

উনি হাত বাড়াইয়া ছাতাটা আমার দিকে দিলেন, কইলেন, “মানুষের খুব অদ্ভুত কারণে মন খারাপ হয়, তাই না? নাও, ছাতাটা নাও, অগাস্ট মাসের বৃষ্টিতে ঠাণ্ডা লেগে যাবে!”

আমি হাত বাড়াইয়া ছাতা নিলাম, কিছুই বললাম না। ধন্যবাদও না।

আমার মন খারাপ না। আমার কোনো কিছুতে মন বসতেছে না। আমি ড্যানের কথা ভাবতেছি, ড্যানের চিঠির কথা ভাবতেছি, মানুষের মারা যাওয়া এবং মানুষের মারা না যাওয়ার কথা ভাবতেছি।

অনেক আগে টিভিতে একটা মুভি দেখছিলাম, নাম মনে নাই, তাতে একটা বারো-তেরো বছরের ছেলে হাসপাতালের প্লাস্টিকের নীল চেয়ারে বইসা ছিলেন, আর উনার বাপ আইসা উনারে খবর দিছিলেন উনার মা মারা গেছেন।

ছেলেটা একবার প্রশ্নবোধক চিহ্ন চোখে ঝুলাইয়া বাপের দিকে তাকাইয়া নিরুত্তাপ গলায় বললেন, ‘মাম?’—এরপর উনি হাসপাতালের ভেন্ডিং মেশিনের গায়ে কিল-ঘুষি মারতে থাকা একজন তিরিশ-পয়ত্রিশ বছরের মহিলা এবং উনার পায়ের কাছে হাঁটু গাইড়া বইসা মেশিনের ভিতর থিকা ক্যান্ডি বাইর হওয়ার অপেক্ষায় একজন বাচ্চা মেয়ের দিকে তাকাইয়া হাসছিলেন।

উনারা দুইজন ছেলেটার হাসি অবশ্য দেখেন নাই। কিন্তু আমি এই দৃশ্য দেইখা খুব কানছিলাম মনে আছে। কী কারণে, তা জানি না। হয়তো বয়স কম ছিল, তাই।

ড্যানিয়েল গ্যালাওয়ে গ্রিন বাঁইচা যাবেন হয়ত। কিন্তু মার্কের প্রশ্নটা আমার মাথায় ঘুরতেছে গতকাল থিকা, “কেউ যদি নিজ ইচ্ছায় মারা যাইতে চায়, তারে বাঁচানোর অধিকার কি মানুষের আছে?”

এই প্রশ্নের উত্তর আমি হয়ত বিভিন্ন পার্সপেকটিভ থিকা দিতে পারব। সায়েন্টিস্ট বা পোলিস হিসাবে এক রকম, বন্ধু হিসাবে আরেক রকম, সম্পূর্ণ সম্পর্কবিহীন হইয়া ফিলসফিক্যালি হয়ত আরেক রকম। কোন উত্তরটা ড্যানিয়েলের পছন্দ হবে, সেইটাই প্রশ্ন।

তিনটা কেইসের একটা রেইপ। চার বছরের বাচ্চা মেয়েরে সম্ভবতঃ উনার নিজের বাপে রেইপ করছেন। আমার কাজ ভিকটিমের বডি ফ্লুইড পরীক্ষা করা। ল্যাবে আজকে সকালে উনার রক্ত, হাই-ভ্যাজাইনাল ফ্লুইড এবং মিকি মাউসের ছবিওয়ালা গোলাপি রঙের বো-ওয়ালা সাদা রঙের ছোট ছোট আন্ডারওয়্যার আসছে।

আমি কোনো ভাবেই কেইসে ইমোশনালি ইনভলভ হব না প্রতিজ্ঞা কইরা গ্লাভস পরা হাতে আন্ডারওয়্যার ধইরা রঞ্জুরে ফোন দিলাম, বললাম, “শোনো, আমি কোনোদিন বাচ্চা জন্ম দিব না!”

রঞ্জু ফোন ধইরা খুব অবাক হইয়া কইলেন, “ঘটনা কী? বাচ্চার গল্প কোথা থেকে আসছে? তুমি কি প্রেগন্যান্ট? হ্যালো, হ্যালো?”

আমি কিছু না বইলা ফোন নামায়ে রাখলাম। ভাবলাম, ক্রেডল এবং হ্যান্ডসেটবিহীন মোবাইল ফোনের যুগেও আমরা ‘ফোন নামায়ে রাখা’ কেন বলি।

এরপর ভাবলাম আমার একটা ক্রেডল এবং হ্যান্ডসেটওয়ালা রোটারি ডায়ালের রেট্রো ফোন-সেট কিনতে হবে।

তারপর মনে হইল, বব বাঁইচা থাকলে উনার অ্যান্টিকের দোকানে একটা ঢুঁ দেওয়া যাইত আজকে কাজের পরে।

তারপর ভাবলাম, কিন্তু সব মানুষই তো কোনো না কোনোভাবে শেষ পর্যন্ত মারা যায়। সুতরাং আমার আর আর্ট-ডেকো জাংক দিয়া ঘর ভরানো হইল না। তারপর মনে হইল, আর্ট পিরিয়ডের মধ্যে কিউবিজম এবং ফ’ভিজম ইনফ্লুয়েন্সড বড়লোকি ভাব ধরা ‘আধুনিক হইতে চাওয়া অথচ আধুনিক না’ ‘আর্ট-ডেকো’ আমার সবচাইতে অপছন্দের পিরিয়ড।

তারপর ভাবলাম, ট্রেইন অফ থট কী জিনিস। তারপর ভাবলাম, লন্ডনের ট্রেইন। তারপর—সেন্ট্রাল লাইন।

তারপর ভাবলাম সেন্ট্রাল লাইনে মানুষের ভিড়। এরপর মানুষ। এরপর বাচ্চা মানুষ। এরপর আবার মারা যাওয়া।

আমার মনে হইতেছে আমি আজকে ‘গরু রচনা’র মত মারা যাওয়া থিকা আর বাইর হইতে পারব না। ঐ যে এক ছেলে শুধু গরু রচনা শিখা পরীক্ষা দিতে গেছেন। কিন্তু প্রশ্নপত্রে আসছে নদী রচনা। তো উনি লেখা শুরু করলেন, ‘আমাদের গ্রামের পাশ দিয়ে একটি নদী বয়ে গেছে। গ্রামের সাথে সেই নদীর সম্পর্ক যেন মায়ের সাথে সন্তানের মত! নদীতে স্বচ্ছ নীল রঙের পানি, সেই পানিতে সাঁতরে বেড়ায় হাজার রকম মাছ। নদীর কিনারে কাশবন, সেই কাশবনে চড়ে বেড়ায় অনেক জাতের গরু। গরু একটি গৃহপালিত উপকারী প্রাণী। গরুর চারটি পা, দুইটি কান, দুইটি চোখ ও একটি লেজ আছে। গরু দেখতে বিভিন্ন রকম হয়: সাদা গরু, কালো গরু, সাদা-কালো গরু ইত্যাদি…।

এয়ারপ্লেইন বা সাবমেরিনের রচনা আসলেও উনি এয়ারপ্লেইনরে কাশবনের পাশে ক্রাশ-ল্যান্ডিং করাইয়া বা সাবমেরিনের ভিতর গরুর মাংসের ঝোল রান্না কইরা গরুর রচনা লিখতে বইসা যাইতেন, সন্দেহ নাই।

আমি বাচ্চা কলাগাছ রঙের ভাঁজ করা ছাতা হাতে নিয়া অফিসের দিকে রওনা দিলাম।

এখন জোরেশোরে বৃষ্টি নামছে। লন্ডন ব্রিজের কোনায় বইসা বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা ছিড়া খয়েরি রঙের কোট পরা একজন এলোমেলো চুলের হোমলেস মানুষের দিকে ছাতাটা আগায়ে দিলাম আমি।

উনি ‘থ্যাঙ্কস’ বইলা আমার হাত থিকা ছাতাটা নিয়া নির্বিকার চেহারায় ক্রিকেট বলের মত ছুঁইড়া দিলেন সামনে, একটা লাল দোতলা বাসের সামনে দিয়া ব্রিজের অন্যপাশের রেলিং-এ একটা ড্রপ খায়ে নিচের থেমসের কালো পানিতে ঝপ কইরা পড়ল সেইটা। ভদ্রলোক আমার দিকে তাকায়ে শীতল গলায় বললেন, “আই ডোন্ট নিড ইয়োর ফাকিং সিম্প্যাথি!”

উনার গলার শীতলতা বৃষ্টির কারণেও হইতে পারে।

বাস ড্রাইভার আমাদের দিকে ঘুইরা দাঁত মুখ খিঁচাইয়া একটা গালি দিলেন। বাসের ভিতরে শব্দ আটকায় যাওয়ায় সেই গালি আমরা শুনতে পাইলাম না।

অগাস্ট ১৫, ২০১৫

ড্যান এখনো হাসপাতালে। উনারে দেখতে যাওয়ার আমার বিশেষ ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু সকালবেলা লুসি পাসকট ফোন কইরা কইলেন ড্যানের জন্য উনার খুব খারাপ লাগতেছে, কিন্তু উনি একলা যাইতে চান না, হাসপাতাল উনার ভয় লাগে।

আমি বিরক্ত এবং বাধ্য হইয়াই শনিবারের মত ছুটির দিনের লেপ ও টিভিতে রেকর্ডেড প্রোগ্রাম ‘মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া’ আর বিছানায় চাইনিজ টেকএ্যাওয়ের আরাম ফালায়ে বাইর হইলাম বৃষ্টির মধ্যে।

লুসির সাথে দেখা করার কথা সাউথ কেনসিংটন স্টেশানের বাইরে, ওল্ড ব্রম্পটন রোডের কারলুচিওতে। বরাবরের মত আমি সময়ের আগে পৌঁছায় গিয়া পোর্সেলিন কাপে আগুন গরম ডাবল এস্প্রেসো আর কা’লুয়া আর আ’মন্ডওয়ালা দলচে’ দি চকোলাতো আর নাগিব মাহফুজের লেখা ‘আখেনাতুন, দ্যা ডোয়েলার ইন ট্রুথ’ নিয়া জানলার পাশের এক টেবিলে বসছি, এক মধ্যবয়স্ক আমেরিকান ট্যুরিস্ট কাপল আইসা ক্ষমা চায়া আমার সামনের খালি চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত কইরা জিগাইলেন এইগুলা কারো জন্য রিজার্ভ করা কিনা।

উনাদের গায়ে ‘আই লাভ লন্ডন’ এবং ‘মাইন্ড দ্যা গ্যাপ’ লেখা রাস্তার সুভ্যেনিয়ারের দোকানের সস্তা টি-শার্ট।

একবার ভাবলাম, বলি, হ্যা, আমার বন্ধু আসতেছেন একটু পরে। কিন্তু বললাম না। টেক্সানদের চুইংগামের মত টাইনা লম্বা করা ইংরেজি উচ্চারণ শুনতে আমার খুব ভালো লাগে। উনারা আমার সামনে বসলে ওয়েটার আইসা উনাদের এক কাপ ল্যাটে আর সাদা ও বাদামি চিনির দুইটা কইরা স্যাশে আর একটা চামচ দিয়া গেলেন।

শুনতে পাইলাম ভদ্রলোক নিচু গলায় (সম্ভবতঃ) স্ত্রীরে কইতেছেন, এখন থিকা কৃচ্ছ্রতা সাধন প্র্যাকটিস করতে হবে। মানুষের সামনে খারাপ দিন আসতেছে। আমেরিকানদের খাদ্যাভ্যাস এবং বেশুমার খরচের স্বভাব পাল্টাইতে হবে ইত্যাদি। আমি বইয়ের পাতায় চোখ দিয়া অভদ্রলোকের মত কান খাড়া করলাম।

ভদ্রলোক নিজের হাতের বিয়ার আংটি ঘুরাইতে ঘুরাইতে কফির কাপে এক চুমুক দিয়া স্ত্রীর দিকে কাপ আগায় দিতে দিতে বলতেছেন, “আগামী বছরের মধ্যেই হবে, আমি নিশ্চিত। তুমি লিখে রাখো! নস্ট্রাডেমসের কথা ভুল প্রমাণ হয় নাই! বাইবেলের কথা ভুল প্রমাণ হয় নাই!”

—কিন্তু বাইবেলে আছে মিস্ট্রি ব্যাবিলনের কথা! আমেরিকার কথা তো বলা হয় নাই কোথাও!

—কতবার বলব তোমাকে? প্রাচীন ব্যাবিলন আর আধুনিক আমেরিকার মধ্যে যে প্রচুর মিল সেটা তুমি দেখতে পাও না?

আমি একটু খুক কইরা কাশলাম। উনাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য না, আমার গতকালকের ও আজকের বৃষ্টিতে ভিজা সর্দি ও কাশি হইছে।

তবে উনারা ঘুইরা আমার দিকে তাকাইলেন। ভদ্রমহিলা আমার দিকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য দৃষ্টিপাত কইরা চোখ ফিরাইয়া ভদ্রলোকরে কইলেন, “আমি তো ওল্ড আর নিউ টেস্টামেন্ট সবই পড়েছি! ড্যানিয়েল, আইসায়াহ, জেরেমায়াহ আর এ্যাপোস্‌ল্‌ জন সবাই অ্যান্টাই ক্রাইস্টের কথা বলেছে, কিন্তু মিস্ট্রি ব্যাবিলনের কোনো কিছু তো আমেরিকার দিকে আঙুল তুলছে না! অ্যান্টাই ক্রাইস্ট হলে হতে পারে বিন লাডেন বা সাডাম হুসেইনের মত কেউ, মিস্টার ওবামা কেন হবে? অ্যান্টাই ক্রাইস্টের আসার কথা ইরাক থেকে, অ্যামেরিকা থেকে না!”

আমি আবার খুক কইরা কাশলাম। এইবারও ঠাণ্ডার কারণে। ভদ্রলোক এইবার আমার দিকে তাকায়া কইলেন, “সরি ইয়াং লেডি, আমরা কি তোমাকে বিরক্ত করছি?”

আমি একটু লজ্জা পাইয়া মাথা দোলাইয়া এক চামচ চকোলেট পুডিং মুখে ঢুকাইয়া চাবাইতে চাবাইতে বললাম, “না, না, আমার বৃষ্টিতে ভিজা ঠাণ্ডা লাগছে! আপনারা আলাপ করেন!”

—তোমাদের এইখানে খুব বৃষ্টি হয়, তাই না?

—খুব না, তবে এখন তো বৃষ্টির মাস! আপনারা কয়দিনের জন্য আসছেন?

ভদ্রমহিলা স্বামীর দিকে তাকাইলেন, “তিন সপ্তার প্ল্যান নিয়ে এসেছিলাম। হয়ত এতদিন থাকব না! তোমাদের এখানে যা খরচ!”

—হ্যাঁ, তা একটু খরচ তো আছেই। তবে খরচ ইচ্ছা করলেই অনেকটা কমানো যায়! ট্যুরিস্ট কোম্পানি আর ওয়েবসাইটগুলি গলা কাটবে সেইটাই তো স্বাভাবিক!

ভদ্রলোক আমার কথায় একটু সামনে আগাইয়া আসলেন, “ঠিক এই কথাটাই আমি শ্যারনকে বোঝানোর চেষ্টা করছি!” উনি হাত আগাইয়া দিলেন, “আমার নাম উইলিয়াম জ্যাকসন, এ আমার স্ত্রী শ্যারন! উই আর ফ্রম টেক্সাস! অ্যামেরিকা!”

আমি উনাদের “হাই” এবং নিজের নাম বইলা হাত মিলাইলাম। বললাম, “একটা কথা বলি কিছু মনে করবেন না?” ভদ্রলোক একটু অবাক হইয়া মাথা ঝাঁকাইলেন, “শিওর, বলো!”

—আমি অনিচ্ছাকৃতভাবে আপনাদের কয়েকটা কথা শুইনা ফেলছি! (মিছা কথা, মোটেও অনিচ্ছাকৃতভাবে না!) আপনারা যদি কিছু মনে না করেন, তাইলে আমি একটা কথা বলতে চাই!

—হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলো!

—ঐ যে আপনি মিস্ট্রি ব্যাবিলনের কথা বলতেছিলেন না? আমি যতদূর জানি, ওল্ড টেস্টামেন্ট আর নিউ টেস্টামেন্টের চার নবী প্রাচীন জেরুসালেমের মানুষ ছিলেন। ব্যাবিলনের না। ব্যাবিলনিয়ান অ্যাম্পায়ারের আন্ডারে জেরুসালেম আর জুডাহ সহ মিশর ফিশর সব আসছে জিসাসের জন্মের মাত্র ৬০০ বছর আগে! তার আগ পর্যন্ত ব্যাবিলন আর জেরুসালেম—মানে, এখনকার ইরাক আর ইজরায়েল আলাদা আলাদা অঞ্চল ছিল! ড্যানিয়েল, ইসায়াহ আর জেরেমায়াহ এই তিনজনেই তাদের রেভেলিশান লিখছিলেন পারশিয়ানদের হাতে জেরুসালেমের পতনের আগেই, জুডাহ, মানে বর্তমান ইজরায়েলে। সুতরাং উনারা যদি ‘মিস্ট্রি ব্যাবিলন’ নাম দিয়া কোনো ভবিষ্যৎবাণী কইরা থাকেন, তাইলে সেইটা ব্যাবিলনের সাথে মিল দিয়া ইজরায়েল বা ইজরায়েলের সাথে তুলনীয় অন্য কোনো দেশের কথা বইলা থাকবেন। আক্ষরিক অর্থে ইরাকের কথা না।

ভদ্রলোক আমার কথায় আশ্চর্য হইলেন মনে হয়, কইলেন, “আমি ঠিক তাই শ্যারনকে বলছি! কিন্তু তুমি এইসব জানো কীভাবে? তোমার ঐ বইয়ে এসব লেখা আছে?”

আমি বইয়ের ফ্ল্যাপে নাগিব মাহফুজের রাগি রাগি ছবির দিকে তাকাইয়া বললাম, “না, না, এইটা অন্য বিষয়! তবে আপনি খেয়াল কইরা দেখেন, যেই সময় রেভেলিশানগুলি লেখা হইতেছে, সেই সময় ব্যাবিলনে নেবুক্যাডনেজার শূন্যোদ্যান বানাইতেছেন। স্বভাবতই আজকে যেমনে আফ্রিকা আর এশিয়ার মানুষ আমেরিকারে দেখেন, ঐভাবে ঐসময় অন্য অঞ্চলের মানুষরা ব্যাবিলনরে দেখছেন। সুতরাং ইসায়াহ বা জেরেমায়াহ মিস্ট্রি ব্যাবিলন বলতে আক্ষরিক অর্থে ইরাকের কথা না, বরং—এই সময়ের সবচাইতে উন্নত সভ্যতার কথাই বইলা থাকবেন।”

শ্যারন আমার ফোনের দিকে ইঙ্গিত কইরা কইলেন, “তোমার ফোন আসতেছে! কিন্তু তুমি কি স্ববিরোধী কথা বলতেছো না?”

আমি ফোনে লুসির টেক্সট দেইখা উত্তর দিলাম, “স্ববিরোধী নিশ্চয় না! আপনি বর্তমান ইরাকের দিকে তাকান। এখনকার ইরাকরে আপনার রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বা কোনোভাবেই পৃথিবীর সবচাইতে শক্তিশালী দেশ মনে হয়?”

ভদ্রমহিলা ডানে বামে মাথা নাড়লেন, আমি কইলাম, “কিন্তু প্রাচীন ইরাকের কথা চিন্তা করেন, ঐ অঞ্চলে ব্যাবিলনিয়া ছিলো সবচাইতে উন্নত।”

উইলিয়াম কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়া কাপ নামায়ে রাখতে রাখতে উত্তেজিত স্বরে কইলেন, “ওল্ড টেস্টামেন্টে মিস্ট্রি ব্যাবিলন বলতে ‘হ্যামার অফ দ্যা হোল আর্থ’ বলা হয়েছে! ইরাক কী করে এই যুগের হ্যামার হয়?”

আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়লাম।

শ্যারন কইলেন, “আচ্ছা, বুঝলাম, ইরাকের উদাহরণ দিয়ে অ্যামেরিকার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু তাহলে ইজরায়েলের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক কোথায়?”

উইলিয়াম স্ত্রীর দিকে বিষদৃষ্টি দিয়া কইলেন, “তোমার মত মূর্খের সাথে কথা বলাই বৃথা! ইহুদিরা যে এই মূহুর্তে সবচাইতে বড় শক্তি সেটা রাস্তার পাগলেও জানে!”

অগ্নিযুগ হইলে উনার দৃষ্টিতে স্ত্রী ভষ্ম হইয়া যাইতেন। শ্যারন এইবার ঝন ঝন কইরা উঠলেন, “হ্যাঁ, আমি রাস্তার পাগল না হলে তোমার সাথে থেকে এক কাপ কফি খাওয়ার আগে তিনবার চিন্তা করি?”

আমি কী করবো না বুইঝা তাড়াতাড়ি খালি হইয়া যাওয়া কফির কাপ হাতে নিয়া বইয়ের পাতা উল্টাইলাম।

উইলিয়াম কইতে থাকলেন, “চলে যাও! কে আটকে রাখছে তোমাকে? তুমি চলে গেলে ভালোই হবে! ২০১৭ তেই অ্যাপোক্যেলিপ্‌স্‌ আসছে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হচ্ছে কয়েকদিন পর, তুমি চলে গেলে আমার এত চিন্তা করতে হবে না! নস্ট্রাডেমস বলে গেছে, বাইবেল বলে গেছে, তাতেও তুমি বুঝতে পারো না, তুমি আছো তোমার কফি খাওয়া নিয়ে!”

আমি আড়চোখে তাকাইয়া দেখলাম শ্যারন রাগে ফোঁস ফোঁস করতেছেন। আমি ভদ্রলোকরে জিগাইলাম, “নস্ট্রাডেমসরে মানলে তৃতীয় অ্যান্টি ক্রাইস্টের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, তাই না? প্রথমজন নেপোলিয়ান আর দ্বিতীয়জন হিটলার হইলে তৃতীয়জনকে হিটলারের চাইতেও বড় জেনোসাইড করতে হয়। আপনি কি মনে করেন ওবামা থার্ড অ্যান্টি ক্রাইস্ট?”

—তো আর কে?

—না, আমি জানি না! জানি না বইলাই জিগাইলাম।

—ওবামারই অ্যান্টাই ক্রাইস্ট হওয়ার সমস্ত লক্ষণ। সে এমনকি জর্জ বুশের চাইতেও ভয়ঙ্কর! আর সমস্ত হিসাবও তাই বলছে! ওয়েপন অফ মাস ডেস্ট্রাকশান আর মিলিটারি হার্ডওয়্যার থেকে আসা পয়সা, তাবৎ দুনিয়া থেকে চুরি করে এনে ফেডেরাল রিজার্ভ বোর্ড ভরে ফেলা, ব্যাংক বেইল-আউট আর হেজ ফান্ড দিয়ে ওয়ার্ল্ড মার্কেট ম্যানিপিউলেট করা—আর কে ‘হ্যামার অফ দ্যা হোল আর্থ’ এই মুহূর্তে?

—হুঁ।

—তুমি কি জানো ওল্ড টেস্টামেন্টে কাকে ‘ব্যাবিলনের বেশ্যা’ বলা হয়েছে?

—না! কাকে?

ভদ্রলোক তার স্ত্রীর দিকে টিস্যু পেপার আগাইয়া দিতে দিতে আমার দিকে ফিরা কইলেন, “স্ট্যাচু অফ লিবার্টিকে! স্ট্যাচু অফ লিবার্টি হলো ব্যাবিলনের দেবী ইশথার আর মিশরিয় দেবী আইসিসের রেপ্লিকা! তুমি চিন্তা করতে পারো?”

ভদ্রমহিলা তখনো টিস্যু হাতে চোখ মুছতে মুছতে ফোঁস ফোঁস করতেছেন।

আমি মাথা নাড়লাম। না, চিন্তা করতে পারি না।

—লেডি লিবার্টির মাথায় সূর্য দেবতার সিম্বল! পুরা অ্যামেরিকা এখন প্যাগান ওয়ারশিপারে পরিণত হয়েছে! কী ভয়ঙ্কর, চিন্তা করো! অ্যাপোক্যালিপ্‌স্‌ সামনেই আসছে, নাদিয়া! আমরা এখনই ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সমর্পণ না করলে মহাবিপদ নেমে আসবে আমাদের উপর! আমাদের এখনই শিখতে হবে ইলেক্ট্রিসিটি আর ইন্টারনেট ছাড়া কীভাবে সারভাইভ করতে হয়, শিখতে হবে এক টুকরা রুটি দিয়ে কীভাবে এক সপ্তাহ একটা পরিবারের পেট ভরাতে হয়! আমাদের রুটি বানানো শিখতে হবে, আমাদের শিখতে হবে গম চাষ করতে! প্রাচীন মানুষরা যেমন সাধারণ জীবন কাটাতেন, আমাদেরও তাই শিখতে হবে! আমরা ভয়ঙ্কর পাপ করে ফেলেছি নাদিয়া, আমরা উন্নতির নামে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনছি, আমরা কেউ বুঝতেও পারছি না খুব সামনেই কী ভয়ঙ্কর বিপদ আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে।

আমি বুঝলাম আমার ওঠার সময় হইছে। আর কিছুক্ষণ এইখানে থাকলে আমারে কন্সপিরেসি থিওরির উপর ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়া ‘খুব শীঘ্রই যীশু খ্রিস্ট আসছেন’ এই গল্প শুনতে শুনতে আলোর পথে আসার জন্য ‘হে মহাপ্রভু আমাকে রক্ষা করো’ জপতে জপতে বাইবেল এবং ক্রুসিফিকশান হাতে নিয়া নিজের ফোন নাম্বার এবং ই-মেইল অ্যাড্রেস ইনারে টিস্যু পেপারে লিখা দিয়া বাড়ি ফিরতে ফিরতে চিন্তা করতে হবে রঞ্জু টের পাওয়ার আগেই ফোন নাম্বার এবং ই-মেইল অ্যাড্রেস কত দ্রুত পালটানো যায়।

কইলাম, “হুঁ, আসলেই ভয়ঙ্কর ব্যাপার। কিন্তু আমারে যে যাইতে হবে এখন! তোমরা ভালো থাকো, অ্যাপোক্যালিপ্‌স্‌ এড়াইতে পারলে তোমাদের সাথে দেখা হবে নিশ্চয়! বাই! ইনজয় ইয়োর স্টে ইন লন্ডন!”

বিকালে হাসপাতাল থিকা বাইর হইয়া আমি, মার্ক, এরিকা, সারি রবিনসন আর লুসি আসছি আমাদের লোকাল ‘কুইন’স আর্মস’-এ মদ খাইতে। লন্ডনের পাবগুলির বেশিরভাগেরই একটা কইরা ‘হাত’ আছে, তাদের নামগুলি সাধারণতঃ হয়—বেকার’স আর্মস, বিল্ডার’স আর্মস, কিং’স আর্মস, পটার’স আর্মস, ফ্যাট লেডি’স আর্মস, কেনসিংটন আর্মস ইত্যাদি মতন।

মার্ক কইলেন, “মেডিভ্যাল সময় থেকেই হেরেলডিক এমব্লেমওয়ালা পুরানো ট্রেড গিল্ডের সাথে সম্পর্কের কারণে নামগুলি এসেছে।”

আমি কিছু না বুইঝাই মাথা নাড়লাম। শনিবার রাতে হিস্ট্রি লেসন চাই না।

আমাদের পাশে দেওয়াল ঘেঁইষা দাঁড়ানো একজন ভদ্রলোক জ্যেমেইকান অ্যাকসেন্টে ওয়াইনের গ্লাস ঘুরাইতে ঘুরাইতে বললেন, “আর্মস শব্দটা আসছে ‘আল্‌ম্‌স্‌’ থেকে, আল্‌ম্‌স্‌ মানে হচ্ছে দান করে দেওয়া সম্পত্তি। কুইন’স আর্মস হলো কুইনের দান করা পাবলিক সম্পত্তি!”

উনার পাশে দাঁড়ানো একজন কমবয়স্ক ছেলে সিগারেটে শেষ টান দিয়া রাস্তায় তার বাট ফালায়ে জুতা দিয়া আগুন নিভায়া খ্যাঁক খ্যাঁক কইরা হাসতে হাসতে কইলেন, “তাহলে বেয়ার’স আর্মস কি ভালুকের দান করা সম্পত্তি থেকে এসেছে?”

ছেলেটা দেখতে খুব সুন্দর, খ্যাঁক খ্যাঁক শব্দ হইলেও উনার হাসিও দেখতে সুন্দর। উনার বাম হাতে কালো কালি দিয়া একটা নটরাজ ট্যাটু করা। নটরাজের নিচে কী কী জানি লেখা।

মার্ক পাবের ভিতর থিকা ভাইসা আসা গানের আওয়াজের উপর গলা উঠায়ে কইলেন, “না, আল্‌ম্‌স্‌ শব্দ থেকে আসে নাই, ট্রেড গিল্ড আর আর্মসের হেরেলডিক কোট থেকেই আর্মস নামটা এসেছে! আল্‌ম্‌স্‌ থেকে আসলে কোনো প্রাইভেট প্রপার্টির নামে আর্মস থাকত না!”

আমি উনাদের ‘এক্সকিউয মি’ বইলা লাল বাতি জ্বালানো ‘ইউনাইটেড উই আর স্ট্রং’ লেখা বিপ্লবের পোস্টারওয়ালা পাবের টয়লেটে আসলাম। মেয়েদের টয়লেটের ভিতর দুইটা কিউবিকল। দুইটাই ভিতর থিকা বন্ধ। একটার প্রচণ্ড ভাবে দুলতে থাকা দরজার ভিতর থিকা “ফাক্‌ মি, ফাক্‌ মি হার্ড!” বইলা একজন মেয়ে চিল্লাইতেছেন, অন্যটার ভিতর থিকা একজনের কান্নার ও বমি করার আওয়াজ শোনা যাইতেছে।

আমি ওয়াশ বেসিনের উপর আমার বিয়ারের গ্লাস নামায়ে রাইখা স্কার্টের পকেট থিকা মোবাইল ফোন বাইর কইরা ‘ক্যান্ডি ক্রাশ’ খেলতে খেলতে আমারে আর কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে ভাবলাম। নড়তে থাকা দরজার ভিতর এখন দুইজন মানুষের শ্বাসের আওয়াজ দ্রুতলয়ে বাইরা যাইতেছে, বুঝলাম তিন মিনিটের মধ্যে আমার টয়লেট খালি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে, কিন্তু আমি নিজে সম্ভবতঃ তিন মিনিট অপেক্ষা করতে পারব না। ফোন পকেটে ঢুকাইয়া ব্যাগ ও গ্লাস হাতে নিয়া পাব থিকা ২০ সেকেন্ডে বাইর হইয়া পাবের পাশের প্রায় অন্ধকার গলিতে বইসা দেওয়ালের গায়ে মাথা ও পিঠ ঠেকাইয়া এক নিঃশ্বাসে স্কার্টের নিচের নিকার্স ও লেগিংস নামায়ে দিলাম আমি।

এই গলি রাত্রিবেলা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মদ্যপান পরবর্তী মূত্রত্যাগের জন্য বিখ্যাত। দেখলাম, আমার পাশেই একজন কুকুর আমার দিকে তাকায়ে দেওয়ালের গায়ে ‘আই অ্যাম নো ইউরিনাল’ লেখা সাইনবোর্ডের নিচে দাঁড়ায়ে মুততেছেন। আশ্চর্যজনকভাবে উনার গলায় কোনো কলার নাই। এইদিকে কোথাও স্ট্রে ডগ থাকার কথা না।

প্রথমে ভাবলাম, হেলুসিনেশান হইতেছে না তো আমার? তারপর পুরা ব্যাপারটায় আমাদের লজ্জা পাওয়া উচিৎ কিনা ভাবতে ভাবতে দুইজনেই প্রায় একই সময়ে মুইতা শেষ করলাম এবং আশেপাশে দেইখা কাপড় ঠিক কইরা আগায়ে গিয়া রাস্তার শেষমাথায় ফুটপাথের উপর বসলাম। উনিও আইসা আমার পাশে বসলেন।

কুকুর বিড়ালদের সাথে আমার অদ্ভুত ব্যাপার আছে। আমার সবসময়ই মনে হয় আমি উনাদের সাথে মাথার ভিতর দিয়া কথা বলতে পারি। উনারাও আমার কথা বুঝতে পারেন।

ব্যাগ হাতড়ায়ে দেখলাম তিনদিন আগের খালি হওয়া লান্চবক্স আছে এখনো, ধোয়া হয় নাই, স্যান্ডুইচের গুড়া পইড়া আছে ভিতরে। ফুটপাথের উপর সেইগুলি ঝাইড়া আমার বিয়ারের গ্লাস থিকা আধা গ্লাস বিয়ার উনারে লান্চবক্সে ঢাইলা দিয়া সিগারেট ধরাইলাম আমি। নরওয়ের লংইয়েরবিনে এক বুড়া মানুষের পোষা বান্দররে খুব আয়েশ কইরা সিগারেট খাইতে দেখছিলাম আমি। তবে কুকুররা সিগারেট খান না। সিগারেট খাওয়ার জন্য বুড়া আঙুল থাকা জরুরি। তবে, হ্যাভিং সেড দ্যাট—ভিয়েতনাম যুদ্ধে কাটা পড়া দুই হাতের কোথাও বুড়া আঙুল নাই এমন একজনরেও সিগারেট খাইতে দেখছিলাম আমি। সেইটা একটা অদ্ভুত দৃশ্য ছিল।

লংইয়েরবিন, নরওয়ে।

লংইয়েরবিন, নরওয়ে।

লংইয়েরবিন খুব মজার একটা শহর। এই শহরে মারা যাওয়া নিষেধ। মানে আপনি যদি টের পান আপনি মারা যাইতেছেন, তাইলে সাথে সাথে আপনারে প্লেনে কইরা নরওয়ের অন্য শহরে নিয়া যাওয়া হবে। আপনি যদি হঠাৎ মারা যাওয়ার মত ভুল কইরা ফেলান, তাইলে আপনারে শাস্তি হিসাবে ঐখানে কবর দেওয়া হবে না। ঐ শহরে বিড়াল পালাও নিষেধ। তবে সিগারেট খোর বান্দরে সমস্যা নাই।

নটরাজের ট্যাটুওয়ালা আইসা আমার পাশে দাঁড়াইলেন, আবার খ্যাঁক খ্যাঁক কইরা হাইসা আমার পাশে বসা কুকুর সাহেবের দিকে ইঙ্গিত কইরা বললেন, “তুমি চার্লিকে মাতাল বানিয়ে ফেলবে তো!”

আমি চার্লির দিকে ঘুইরা দেখলাম উনি লান্চবক্সের বিয়ার শেষ কইরা আমার হাতের গ্লাসের দিকে জুল জুল তাকায়া আছেন। আমি জিগাইলাম, “উনার গলায় কলার নাই কেন ?”

—চার্লি আমার অল্টার ইগো। নিজের গলায় নিজে কলার লাগাব মানে?

১৯৯২ সালে আমেরিকার টেনেসিতে টমাস ডি হাস্কি বইলা একজন রেপিস্ট এবং সিরিয়াল কিলার ধরা পড়ছিলেন। উনার ট্রায়াল চলার সময় উনি খুনের কথা স্বীকার কইরা বলছিলেন, উনার অল্টার ইগো ‘কাইল’ নাকি এই খুনগুলি করছেন। সুতরাং কাইলের শাস্তি উনার পাওয়ার কথা না। মাথামোটা জুরিরা এইসব কথায় কনফিউসড হইয়া গেছিলেন, এবং জাজ ‘মিসট্রায়াল’ ঘোষণা দিয়া উনারে ছাইড়া দিছিলেন।

দুনিয়া যে একটা বিশাল বড় পাগলাগারদ সেইটা কোর্টে না গেলে কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব না। আমি চার্লিরে আমার গ্লাসের বাকি বিয়ার লাঞ্চবক্সে ঢাইলা দিলাম।

rocky-rd-11-d

লেখক আর চার্লি। অলঙ্করণ. নাদিয়া ইসলাম

অগাস্ট ২৬, ২০১৫

আমি টি-ই-এম ল্যাবের সামনে দাঁড়ায়ে মাথা নিচু কইরা গ্যারির ঝাড়ি খাইতেছি। ক্রোমিয়াম এ্যাবলেশানের সময় কেউ একজন আর্গন ফ্লো ৩০ থিকা ১৮ সেন্টিমিটার-কিউব পার সেকেন্ডে নামায়ে আনছেন, এবং সেইটা কে করছেন তা জানা যায় নাই।

সমস্যা যেইটা হইছে সেইটা হইলো ফ্লো রেট কমার কারণে বাফার লেয়ারের মাইক্রোস্ট্রাকচার ন্যানো-ক্রিস্টালাইন হইয়া গেছে। আমাদের আবার সবকিছু নতুন কইরা শুরু করতে হবে।

দোষটা আমারই। নিজের কাজ আমি বিভিন্ন লোকের সাথে গছায়ে দিয়া যাইতেছিলাম গত তিন দিন। বেশ কয়েকদিন ধইরাই আমার মাথা আউলা আউলা লাগতেছে। পি-এইচ-ডি প্রপোসাল নিয়া সেকেন্ড সুপাইভাইজার ডক্টর ভিক্টোরিয়া হিলবোর্নের সাথে ফাটাফাটি ঝগড়া হইছে। এরপর আছে অফিসের কাজ।

চার বছরের যেই মেয়েটা কথা কইতে ও কানে শুনতে পারেন না, ধরা যাক উনার নাম এমিলিয়া, উনার আন্ডারওয়্যারে পুরুষের (বাপের কীনা এখনো শণাক্ত করা সম্ভব হয় নাই) সেমিনাল ফ্লুইড পাওয়া গেছে। প্রথমে অপটিমাম ওয়েভলেংথ ফিল্টারে লাইট টেস্টে নেগেটিভ, এরপর এ্যাসিড ফসফেটেইজ টেস্টেও নেগেটিভ রেজাল্ট পায়ে আর-এস-আই-ডি, এরপর এরপর মাল্টিপ্লেক্স কিউ-আর-টি পি-সি-আর প্রোব দিয়া শেষমেশ সেমিনাল ফ্লুইড শণাক্ত করা গেছে।

সমস্যা হইতেছে, এমিলিয়ার ভ্যাজাইনার ফিজিক্যাল একজামিনেশানে নিজের রক্ত এবং এক্সট্রা-জেনিটাল এবং জেনিটাল ইনজুরি পাওয়া গেলেও তা দিয়া সম্ভাব্য এসেইল্যান্টের সাথে যোগাযোগ তৈরি সম্ভব হইতেছে না।

আন্ডারওয়্যারে পাওয়া সিমেনে কোনো স্পার্মহেড পাওয়া যায় নাই, এবং তা অন্ততঃ পনেরো দিনের পুরানো, এবং এ থিকা ডি-এন-এ অ্যানালিসিস সম্ভব না। এমিলিয়ারে গোসল করানো হইছিল, উনার হাই-ভ্যাজাইনাল সোয়াবেও তাই শুধু কনডমের লুব্রিকেন্ট পাওয়া গেছে। ক্রাইম সিনের আশেপাশে কোথাও কনডম পাওয়া যায় নাই। (অন্ততঃ এখনো না)।

এলিমিয়ার মা একটা সুপারস্টোরে কাজ করেন। বাপ বিল্ডার। এমিলিয়ার বয়স দেড় বছর পর্যন্ত উনার আইরিশ মা (ধরা যাক উনার নাম জোয়ান) বাড়িতেই থাকতেন।

ঐ সময়টার পরে উনার পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বাপ (ধরা যাক উনার নাম আরিফ) এবং আরিফের ১৬ বছরের ছোটবোন পালা কইরা এমিলিয়ারে দেখতেন।

ঘটনার দিন জোয়ানের খুব পেট ব্যথা হওয়ার কারণে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই উনি কাজ থিকা বাড়ি ফিরেন। বাড়িতে ঢুকতেই উনি শুনতে পান এমিলিয়া চিৎকার কইরা কানতেছেন (কথা না বলতে পারলেও উনি মুখ দিয়া বিভিন্ন শব্দ করতে পারেন)।

জোয়ান দৌড়ায়ে বাথরুমে ঢুকলে দেখতে পান, উনার স্বামী আরিফ বাথটাবের মধ্যে এমিলিয়ারে শোয়াইয়া সাবান ও শ্যাম্পু দিয়া বাচ্চারে গোসল করাইতেছেন। এমিলিয়ার পা বায়ে নামা রক্ত পানিতে মিশা যাইতেছে।

আরিফ জোয়ানরে বলেন, এমিলিয়া খেলতে গিয়া পইড়া ব্যথা পাইছেন।

স্বভাবতইঃ জোয়ানের ঘটনা বিশ্বাস হয় নাই, উনি মেয়েরে তখন তখনই হাসপাতালের এমার্জেন্সিতে নিয়া যাইতে চাইলেন।

আরিফ প্রথমে উনারে বাধা দিলেও এবং ‘বাচ্চারা এমন ব্যথা রেগুলার পায়’ ও ‘একদিন বাসায় শুয়ে থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে’ এমন বললেও শেষপর্যন্ত গাড়ি চালায়ে স্ত্রী এবং বাচ্চারে হাসপাতালে নিয়া আসেন।

তখনও এমিলিয়ার ভ্যাজাইনা থিকা রক্ত পড়তেছিল। মেডিক্যাল এক্সামিনার এমিলিয়ারে দেখার সাথে সাথেই জোয়ানরে আলাদা ডাইকা নিয়া এইটা রেইপ বইলা ডিক্লেয়ার দিয়া পোলিস কল করেন।

আরিফ নিজের স্টেইটমেন্টে বলছেন, ঘটনার দিন উনি এমিলিয়ারে একলা বাসায় রাইখা সিগারেট খাইতে বাইর হইছিলেন, পরে লাইটার খুঁইজা না পাওয়ায় ঘরে তালা না দিয়াই উনি লোকাল কর্নার শপে গেছিলেন মিনিট পনেরোর জন্য। এরপর ঐখান থিকা এলাকার লোকাল পার্কে আরো কিছুক্ষণ বইসা থাকার পরে যখন বাড়িতে গেছেন, তখন উনি শুনতে পান এমিলিয়া কানতেছেন। এমিলিয়ার পা থিকা রক্ত পড়তেছে দেখলে উনি ‘ভাবেন’ উনি খেলতে গিয়া ব্যথা পাইছেন। পোলিসরা স্বভাবতই এইরকম ভুজুং ভাজুং গল্প বিশ্বাস করেন নাই।

আমাদের কাজ অবশ্য বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের উপর ভিত্তি কইরা হয় না। এমিলিয়া রেইপড হইছেন এইটা নিশ্চিত, এখন আমাদের কাজ রেইপটা কে করছেন সেইটা খুঁইজা বাইর করতে সাহায্য করা।

আরিফ আমাদের সম্ভাব্য একজন এসেইল্যান্ট, তিনি সত্য না মিথ্যা বলতেছেন সেইটা দেখবেন পোলিস এবং আদালত, আমি এবং আমরা শুধু উনাদের সামনে সায়েন্টিফিক তথ্য উপস্থাপন করব মাত্র!

কিন্তু কাজ করতে গিয়া দেখলাম বারবার বায়াসড হইয়া যাইতেছি আমি, আমার বার বার মনে হইতেছে আরিফই কাজটা করছেন, এবং সেইটা মনে হইতেই আমার বার বার বমি আসতেছে। একবার সত্যি সত্যি ল্যাবের টয়লেটে গিয়া বমিও কইরা আসলাম।

ডক্টর ক্লাইভ স্টিল আমার পি-এইচ-ডি’র মেইন সুপারভাইজার, উনারে সব কিছু বলার পরে উনি কইলেন আমারে ল্যাবের সাইকোথেরাপিস্টের সাথে কথা কইতে।

সাইকোথেরাপিস্ট ডক্টর কিম্বার্লি এম ডাল্টন পোনে ছয় ফিট লম্বা, মাথায় ড্রেড-লক করা একজন বিশালদেহী রাগি রাগি শরদিন্দু বন্দ্যোপধ্যায়ের ভূতেশ্বর বাগের মত দেখতে আফ্রিকান ভদ্রমহিলা।

উনার সাথে কোনোদিন কথা হয় নাই, আসা যাওয়ার পথে বা লিফ্‌টে যখনই দেখা হইছে, মনে হইছে উনি আমারে তখন তখনই থাপ্পড় দিয়া মাটিতে শুয়ায়ে ফেলবেন।

উনার সাথে কথা বলতে হবে শুইনাই আমি মিন মিন কইরা ক্লাইভরে বললাম, আমার আসলে তেমন কোনো সমস্যা নাই, দুই দিন ছুটি পাইলেই আমি ঠিক হয়া যাব।

ক্লাইভ আমার কথা পাত্তা না দিয়া ততক্ষণে ডক্টর ডাল্টনের অফিসে ফোন কইরা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক কইরা ফেলছেন।

তো গেলাম আমি ডক্টর ডাল্টনের অফিসে। উনি আমারে কইলেন উনারে কিম্বার্লি বইলা ডাকতে।

আমি আশ্চর্য হইয়া খেয়াল করলাম উনার গলার স্বর অবিকল গিরিজা দেবীর মত, একটু নাঁকি কিন্তু পাওয়ারফুল, একটু পর পর ইফোর্টলেসলি স্বর উপরে উঠতেছে আবার নিচে নাইমা যাইতেছে। আমার উনার গলা শুইনাই ঘুম চইলা আসল। গিরিজা দেবী নাকি খেলনা পুতুল জমাইতেন।

আমি কইলাম, “কিম্বার্লি, তুমি কি পুতুল জমাও?”

কিম্বার্লি তার অফিসের লেদারের কালো চেয়ারে ব্যাঁকা হইয়া বইসা ছিলেন। উনি সোজা হইয়া বইসা আমার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকাইলেন, ঘুম ঘুম চোখেই আমার মনে হইল, এইবার মনে হয় উনি আমারে থাপ্পড় মাইরা ফালায় দিবেন।

কইলেন, “আমার মেয়ে মারা গিয়েছিল চৌদ্দ বছর বয়সে, পানিতে পড়ে। ও পুতুল জমাতো। ও মারা যাওয়ার পরে আমি জমাই। আমাদের কালেকশানে এখন ১১৭টা পোর্সেলিনের পুতুল আছে। কেন ?”

—না, এমনি, হঠাৎ মনে হইল!

—এমনি কিছুই মনে হয় না, নাদিয়া! আচ্ছা, তুমি কি মারা যাবে বলে ভাবছো?

—সেইটা তো তুমি আমারে বলবা! তুমিই না আমার সাইকো অ্যানালিসিস করতেছো!

—হা হা, তুমি বুদ্ধিমান মেয়ে! তবে সাইকোথেরাপিস্টরা জ্যোত্যিষ ফোতিশ টাইপের কেউ তো না, যে তোমাকে দেখেই হড় বড় করে তোমার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ বলে দেবে! আমার কাজ তোমার কথা শোনা, তোমাকে একটা থার্ড পারসন পার্সপেকটিভ দেওয়া, আর কিছু না!

আমি চোখ বন্ধ কইরা বললাম, “আমার মনে হয় আমি কয়েক দিন পর মারা যাইতেছি। আমি ঘুমাইলেই অনেকগুলি বাচ্চা মানুষ স্বপ্ন দেখি। সবগুলি বাচ্চাই আমি। সেই বাচ্চা আমিগুলি আবার আমারে খুন করতেছেন বিভিন্ন ভাবে। কখনো পিয়ানোর তার দিয়া, কখনো পানিতে ডুবাইয়া, কখনো আমার ঘরে আগুন ধরাইয়া। তবে আমার মা’র ধারণা, এইগুলি সব হরর থ্রিলার টাইপের মুভি দেখার এবং মাসুদ রানা পড়ার ফলাফল। ঘটনা হচ্ছে হরর থ্রিলার বা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার মার্কা মুভি দেখেন আমার মা, মাসুদ রানা পড়েন আমার মা, আমি না!”

—মাসুদ রানা কী?

—জেমস বন্ড টাইপের একটা বাংলাদেশি সিরিজ। টু বি অনেস্ট, জেমস বন্ড নকল করতে করতেই মাসুদ রানা লেখা শুরু হইছিল।

—তোমার মা’র সাথে তোমার সম্পর্ক কেমন?

আমি চোখ খুইলা কিম্বার্লিরে দেখলাম, “আমার মা আমার সবচাইতে কাছের লোক। আমার মা আমারে খুব ভালোবাসেন, আমিও আমার মা’রে প্রচণ্ড ভালোবাসি। আমাদের মতের পার্থক্য প্রচুর, কিন্তু আমাদের কোনো ঝামেলা নাই। কিম্বার্লি, তুমি পূনর্জন্ম বিশ্বাস করো?”

কিম্বার্লি সিগারেট হাতে উনার চেয়ার ছাইড়া আমার সামনে জানলার পাশে আইসা দাঁড়াইলেন। জানালার বাইরে অগাস্ট মাসের মেলাঙ্কলিক দুপুর। উনি আমার সামনে অ্যাশট্রেতে ছাই ঝাড়লেন, আমার মনে হইল সাদা অ্যাশট্রের ভিতর একজন বুড়া মানুষ তার স্মৃতি-ফৃতি শুদ্ধা ‘দ’র মত কইরা ভাঁজ হইয়া শুইয়া আছেন।

মানুষের এই টেনডেন্সিরে বলা হয়, ‘পেরেইডলিয়া’, যেইখানে যেই ছবি নাই সেইখানে সেই ছবি দেখার ক্ষমতা।

আমি বাইরে তাকাইলাম। ব্রিজের উপর দিয়া সত্যিকারের মানুষরা তাদের স্মৃতি-ফৃতি সুদ্ধা কেউ কাউরে না দেইখা ছাতা মাথায় হাঁইটা যাইতেছেন একলা একলা।

‘ভদ্রতাবোধ’ লন্ডনের মানুষরে না দেখার এক অসীম ক্ষমতা দিছে। উনারা তাকান, কিন্তু দেখেন না। নিজেরে গ্রহণযোগ্য করার ভদ্রতা দিয়া উনারা নিজেরে এক একজন অদৃশ্য মানুষে পরিণত করছেন। জামা জুতা পরা ছাতা হাতের বিয়া করা বাচ্চা পয়দা করা ডিগ্রিধারী সর্দি হওয়া কাশতে থাকা এক একজন অদৃশ্য মানুষ। ব্রিজভর্তি অদৃশ্য মানুষদের দৃশ্যমান হাঁটা দেখলাম আমি, ভাবলাম, জানলা না থাকলে লন্ডন কী করত আজকে? এইসব জানলা না থাকলে উনারা কীসের ভিতর দিয়া মহাশূন্যে ঘুরতে থাকা বাচ্চা কুকুর লাইকার মত বাইরে তাকায়ে নিজেদের ভদ্রতাবোধ ফালায়া দিয়া কাচের গায়ে এবং অন্যের গায়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতেন? প্রতিবিম্ব, প্রতিমূর্তি আর জ্ঞান, সবই নিজেরে জানার একটা ‘টুল’ মাত্র, কিন্তু শেষমেশ মানুষ তাই দেখেন, যেইটা তিনি দেখতে চান। অ্যাশট্রের ভিতর ‘দ’ আকারের মানুষ শুইয়া থাকেন না, আমি চাই বইলাই উনি শুইয়া থাকেন। কিন্তু আমি কেন চাই? আমি কেন চাই?

—আনঅফিশিয়ালি বলবো? হ্যাঁ, করি। তীব্র দুঃখ মানুষকে অদৃশ্যে বিশ্বাস করতে শেখায়।

আমি আমার ব্যাগ থিকা সিগারেটের প্যাকেট বাইর কইরা অনুমতি নিয়া সিগারেট ধরাইলাম। জিগাইলাম, “তুমি কি লোনলি, কিম্বার্লি?”

উনি উপর নিচ মাথা ঝাঁকাইলেন, হাইসা কইলেন, “ক্লাইভ আমাকে তোমার ব্যাপারে সাবধান করেছিল। দেখো, আমার তোমাকে প্রশ্ন করার কথা, কিন্তু তুমিই আমাকে আয়নার সামনে নিয়ে আসছো!”

আমি বললাম, “আমার বন্ধু ড্যান দুই সপ্তাহ আগে আত্মহত্যার চেষ্টা করছিলেন। আমার উনার সুইসায়েড নোট পইড়া মনে হইল এই নোট আমিও লিখতে পারতাম। আমার প্রচুর বন্ধু, কিম্বার্লি! কিন্তু লোনলিনেস তো আশেপাশের বা মাথার ভিতরের মানুষের সংখ্যা দিয়া ঠিক হয় না, তাই না? আমি, ধরো, বস্তুরে বস্তু আর আইডিয়ারে আইডিয়ার মত কইরাই দেখলাম এবং তাতে আমি বস্তুর আইডিয়া হওয়ার আর আইডিয়ার বস্তু হওয়াটা কি বাদ দিয়া দিলাম? আমার ধারণা আইন কইরা আমরা সাইকাডেলিক ড্রাগ নিষিদ্ধ করছি, তার কারণ আমাদের শরীরে ড্রাগের ‘হাফ-লাইফ’ না, কারণ এইসব ড্রাগ আমাদের তিন-চার রকমের পার্সপেকটিভে দুনিয়া দেখতে শিখায়। আর পার্সপেকটিভ যদি তুমি দুনিয়া থিকা উঠায়ে নাও, তাইলে দুনিয়া তো আর দুনিয়া থাকে না! তখন আইডিয়া কী, আর বস্তু কী সেই নিয়া প্রশ্নও থাকে না! তখন লোনলিনেস বইলা কিছু থাকে না! তখন মারা যাওয়ার মত কনসেপ্ট থাকে না, তখন তুমি অ্যালিসের মত একটা আয়না দিয়া ঢুইকা আরেক আয়না দিয়া বাইর হইয়া আবার অন্য একটা দুনিয়ায় চইলা গিয়া মদ খায়ে সংসার টংসার কইরা কিংবা মাউন্টেন ক্লাইম্বিং কইরা কবিতা লিখা মাথার ভিতর অন্য আরেক আয়নার ভিতরের দুনিয়া দেখতে দেখতে ঘুমাইতে ঘুমাইতে ভাবতে পারো একটাই চাঁদ, একটাই সূর্যওয়ালা দুনিয়ার কথা, ভাবতে পারো সবুজ রঙের বাচ্চা কলাগাছের কথা, বাথরুমে লাল রঙের বিপ্লবের পোস্টারের কথা, রবার্ট এল্ডওয়াইনের কথা, মেব্যেল হেলেন কলিংউডের কথা, পিনাট বাটার খাওয়া নিয়া তোমার গোপন ভয়ের কথা—।”

—কীসের ভয়?

—পিনাট বাটার। আমার সব সময় ভয় হয় পিনাট বাটার খাইলেই আমার জিহ্বার সাথে আমার মুখের ভিতরের তালু জোড়া লাইগা যাবে!

কিম্বার্লি হাইসা ফেললেন। আমি গম্ভীরভাবে বললাম, “হাইসো না, এইটার একটা মেডিক্যাল টার্মও আছে, পিনাট বাটার খাওয়ার ভয়রে বলা হয় ‘এ্যারাকিবিউটিরোফোবিয়া (Arachibutyrophobia)’!”


পিনাট বাটারের রেসিপি

উপকরণ

২ কাপ খোসা ছাড়ানো কাঁচা চিনাবাদাম

১/২ চা চামচ কোশার সল্ট (না থাকলে সাধারণ লবণ, এবং সেইক্ষেত্রে ১ চা চামচ পরিমাণ)

২ টেবিল চামচ বাদামতেল (না থাকলে ভেজটেবল অয়েল)

১ টেবিল চামচ মধু বা কর্ন সিরাপ বা ম্যেপল সিরাপ

pinut-butter-1

প্রণালী

  • অভেনে ১৮০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেইডে একটা বেকিং শিটের উপর চিনাবাদামগুলি সোনালি বাদামি কইরা ১০ মিনিট ভাইজা নিবেন।
  • এখন বাদামগুলি গরম থাকতে থাকতেই ফুড প্রসেসারে দিয়া বেশ কয়েকবার পাল্‌স্‌ করায়ে নিতে হবে, পাল্‌স্‌ মানে জোরে ঝাঁকি দিয়া ঘুটা দিতে হবে। একটানা ১ মিনিট পাল্‌স্‌ করানোর পর চামচ দিয়া ফুড প্রসেসারের তলায় কিছু লাইগা আছে কিনা দেখবেন। এইভাবে বেশ কয়েকবার ঘুটা দেওয়া লাগবে, অন্ততঃ যতক্ষণ না পর্যন্ত বাদামগুলি ভাইঙ্গা গুড়া গুড়া হইয়া যাইতেছে। কয়েকবার পাল্‌স্‌ করার মধ্যেই খেয়াল করবেন গুড়া গুড়া বাদামগুলি জমাট বাইন্ধা আসতেছে। অর্থাৎ আপনার বাটার তৈরি হইতে আর বেশি দেরি নাই!
  • এখন লবণ, তেল আর মধু অ্যাড কইরা আরো ১ থিকা দেড় মিনিট ঘুটা দিবেন।
  • আপনার অখাদ্য পিনাট বাটার এখন রেডি। এরে বোতলে ভইরা ফ্রিজে কয়েক সপ্তাহ রাখতে পারেন।

এ্যারাকিবিউটিরোফোবিয়া আছে এমন কারো সাথে আপনার শত্রুতা থাকলে কাপকেইকের মধ্যে বা স্যান্ডুইচের ভিতরে জ্যামের সাথে এরে গোপনে মিশায়ে খাওয়ায়ে দিতে পারেন। তবে বাদামের অ্যালার্জি আছে এমন কাউরে খাওয়ায়েন না, খুনের মামলায় আটকায় যাবেন।


(চলবে)

About Author

নাদিয়া ইসলাম
নাদিয়া ইসলাম

ফ্যাশন ডিজাইনার। লন্ডন সাউথ ব্যাংক ইউনিভার্সিটির ফরেনসিক সাইন্স থেকে পাশ করে এখন রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসাবে কাজ করেন। ২০০৭ থেকে ইংল্যান্ডে আছেন। এর আগে বাংলাদেশে বসবাস করেছেন। জন্ম লিবিয়ার সির্তে। মিছুরাতায় থাকতেন। ১১ বছর বয়সে লিবিয়া ত্যাগ করেন।