(শুরুর কিস্তি)

এপ্রিল ৯, ২০১৪

সকাল দশটায় ট্রায়াল আজকে। হিয়ারিং শেষ, আজকে সেন্টেনসিং হবে। প্রসিকিউশানের প্রধান উইটনেসরে আধা ঘণ্টা যাবৎ প্রশ্ন করছেন ডিফেন্স ব্যারিস্টার। ঠিক কয়টার সময় উইটনেস ক্রাইম সিনে ছিলেন, কী কী দেখছেন এই নিয়া ঘুরায়ে প্যাঁচায়ে মোটামুটি সাড়ে তিনশ’ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করার পরে ব্যারিস্টার সাহেব আশ্চর্য শান্ত গলায় উনারে বললেন, যেইদিন ঘটনা ঘটছে সেইদিন আপনে কাজেই যান নাই। আমার কাছে আপনার কাজের রোটা আছে। সেইদিন আপনে সিক-কল করছেন, এবং সকাল এগারটা দশে আপনি আপনার জিপি (জেনারেল প্র্যাকটিশনার) অফিসে ছিলেন। ব্যারিস্টার সাহেব তার ফাইল থাইকে তিনটা কাগজ বাইর কইরা কোর্ট আশারের হাতে ধরায়ে দিলেন জাজরে দেওয়ার জন্যে, “আই হ্যাভ নো ফারদার কোয়েশ্চেন।”

তেমন কোনো ইন্টেরেস্টিং কেইস ছিলো না এইটা। হরিনারায়ণ হারশ প্যাটেল নামক এই ভারতীয় ভদ্রলোক ভিক্টোরিয়ার ম্যারিয়ট হোটেলরে স্যু’ করছিলেন। উনি ছিলেন হোটেলের স্যু শেফ। হোটেলের বিরুদ্ধে উনার অভিযোগ, উনারে ঠিকমত পয়সা দেয়া হয় নাই, উনি ইংরেজি বলতে পারেন না বইলা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে উনারে রেসিস্ট অপমান করা হইছে, এবং ক্রিসমাস, অর্থাৎ ব্যস্ত সময় শেষ হওয়ার পরে কোনো কারণ ছাড়াই তারে বাইর কইরা দেওয়া হইছে।

হোটেলও অবশ্য কম ধড়িবাজ না। তারা উলটা প্যাটেল সাহেবের নামে এ বি এইচ (এ্যাকচুয়াল বডিলি হার্ম) এর মামলা ঠুঁইকা দিছে। তাদের বক্তব্য, প্যাটেল ছিলেন প্রবেশান পিরিয়ডে। এই সময়ে উনি কোনো কাজই ঠিকমত করেন নাই। যখন তারে চইলা যাইতে বলা হইছে, তখন উনি ছুরি নিয়া হেড শেফরে তাড়া করছেন। তার গায়ে চপিং বোর্ড ছুইড়া মারছেন, ইত্যাদি।

আমি টিউবে উঠতে উঠতে ব্যারিস্টারের কথা ভাবতে ভাবতে নিজে নিজেই হাসলাম। আমার সামনের ভুড়িওয়ালা ভদ্রলোক একটা ভুরু উঁচা কইরা আমার দিকে তাকাইলেন। সকালবেলা লন্ডনের টিউব গম্ভীর আর বিরক্ত মানুষে ভর্তি থাকে। তারা মুখ গম্ভীর কইরা ফ্রি পত্রিকা পড়েন, গম্ভীর ভঙ্গীতে হেড-ফোনে গান শুনতে শুনতে ততোধিক গম্ভীর ভঙ্গীতে পা নাচান, গম্ভীর চোখে আই-প্যাড, আই-ফোন এবং কিন্ডেলে গেইম খেলেন, ভিডিও দেখেন ও বই পড়েন। কেউ কেউ গম্ভীর ভঙ্গীতে উলের কাঁটা নিয়া বাচ্চাদের নীল সোয়েটার বুনতে থাকেন, এবং সেইসময় কোনো অগম্ভীর বাচ্চা হঠাৎ কাইন্দা ফেললে তার দিকে গম্ভীর দৃষ্টিপাত করেন।

সকালের সেন্ট্রাল লাইন
সকালের সেন্ট্রাল লাইন

সকালের টিউব বাচ্চাদের জন্য না। সকালের টিউবে শব্দ হয় না কোনো, খালি লাইনের উপ্রে টিউবের চাক্কার ঘষা খাওয়ার কনটিনিউয়াস শব্দ, আর স্টেশানে স্টেশানে ভারি গলার মহিলার কম্পিউটারাইজড অ্যানাউন্সমেন্ট শুনা যায় কয়েক মিনিট পরপর।

আমার মানুষ দেখতে বরাবর ভালো লাগে। আমিও কানে হেড-ফোন লাগায়ে চোখের সামনে একটা কিন্ডেল ধইরা রাখি সবার মত। আমার মনোযোগ অবশ্য থাকে আশেপাশের মানুষের দিকে। কোনো মহিলার হাতে অরিজিনাল লুই ভিতনের ব্যাগ, কিন্তু ব্যাগ থাইকে বাইর করলেন জব-সিকার অ্যালাউয়েন্সের কাগজ। কেউ আশেপাশের সবাইরে দেইখা নিয়া ফট কইরা নাকের ময়লা টাইনা বাইর কইরা তার দিকে তাকায়ে থাকলেন অনেকক্ষণ। কেউ এক আঙুলের রঙ উইঠা যাওয়া নখটা ঢাইকা রাখতেছেন অন্য হাত দিয়া। কেউ পাশের মানুষের সাথে যাতে ঘষা না লাগে সেইজন্য সন্তর্পণে বসছেন নিজের হাঁটু ধইরা।

কত রকমের আজব মানুষ যে দুনিয়ায়! তবে, সকাল বেলার টিউবে তারা সবাই গম্ভীর এবং অসুখী। এবং বিরক্ত এবং যারপরনাই সভ্য। এই মানুষগুলাই রাতের টিউবে অবশ্য অন্যরকম হয়া যাবেন। তখন তারা চাক্কার আওয়াজের সাথে পাল্লা দিয়া চিল্লায়ে কথা বলবেন, আশে পাশের ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা দেইখা জ্যাকেটের পকেটে লুকায়ে রাখা চ্যাপ্টা মদের বোতল বাইর কইরা নিয়া আসবেন, মহিলারা চলন্ত ট্রেইনেই তাদের চোখে নিখুঁত সরু নীলরঙা আই লাইনার লাগাবেন, কেউ মাতাল হয়া হাসতে হাসতে বা হাসতে হাসতে মাতাল হয়া একে অন্যের গায়ে পড়তে থাকবেন একটু পরপর।

রাতের টিউব
রাতের টিউব—নো-প্যান্টস ডে অ্যাট ওয়ার্ক ২০১২

মাইল এন্ড স্টেশান থাইকে এক বুড়া ভদ্রমহিলা উঠলেন সেন্ট্রাল লাইনে। আমার পাশের মহিলা বইসা ছিলেন প্রায়োরিটি সিটে। বুড়া মহিলারে দেইখা উনি উইঠা দাঁড়াইলেন। বুড়া ভদ্রমহিলা আমার পাশে আইসা বসলেন। উনি বসার সাথে সাথেই কীসের যেন হালকা একটা গন্ধ পাইলাম আমি। আমার গন্ধের সেন্স খুব খারাপ, তাই পাত্তা দিলাম না বিশেষ। তবে আমার সামনে দাঁড়ানো মহিলারে দেখলাম নাক কুঁচকায়ে আরেক দিকে তাকায় আছেন। বুড়া মহিলাও মনে হয় সেইটা আঁচ করতে পারছেন। সামনের মহিলারে ডাইকা বললেন, উনি দুঃখিত, আন্ডারগ্রাউন্ডে কাজ করেন, কবুতর তাড়ান, সারা রাত কাজ করছেন, তাই এমন গন্ধ। আমি অভদ্রলোকের মত কান খাড়া কইরা শুনতে থাকলাম। কবুতর তাড়ান, মানে কী?

প্রায়োরিটি সিট
প্রায়োরিটি সিট

মহিলা গল্প কইতে থাকলেন। সামনের মহিলা নিরাসক্ত ভঙ্গিতে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে দাঁত দিয়া নখ খুঁটতে খুঁটতে মেট্রো পড়তেছেন এবং মাঝেমধ্যে বুড়ির দিকে তাকায়ে মাথা নাড়তেছেন।

“১৯৬৪ সালে আমি লন্ডন আসছি। ইউক্রেইন মানে তখনকার সোভিয়েট ইউনিয়ন থাইকে। আমার দাদার দাদা ছিলেন পোলিশ। উনার আব্বা কোজাক বিদ্রোহের সময় আমার দেড় মাসের দাদার দাদারে নিয়া লেফট ব্যাঙ্কে চইলা আসেন। তখন প্রায় পুরা ইউক্রেনই রাশা মানে সোভিয়েট ইউনিয়নের আন্ডারে ছিলো। রাইট ব্যাঙ্করে তো আলাদা কইরা ফেলা হইছিলো। পরে আবার জোড়াও লাগে। ঠিক বলতেছি কিনা শিওর না, মনে হয় ঠিকই বলছি, বুড়া হইছি তো, সব কিছু মনে থাকে না ঠিকমত।” এই বেলা আমার দিকে তাকাইলেন বুড়ি। “তোমরা পড় না এইগুলা স্কুলে? ঠিক বলছি?”

আমি মাথা নাড়লাম, “না, এইগুলা জানি না। আমাদের এইসব পড়ায় নাই। আমাদের দেশের হিস্ট্রি পড়ছি। আর ওয়ার্ল্ড ওয়ার পড়ছি। কোল্ড ওয়ার জানি অল্প একটু। ও, হ্যাঁ, আর ভিয়েতনাম ওয়ার। আর কিছু না।”

মহিলা হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।

—তো যাই হোক, আমার আব্বা ছিলেন জুইশ। তারে মাইরে ফেলছিলো হিটলারের লোকেরা। কী খারাপ একটা লোক, চিন্তা করতে পারো?

—জ্বি জ্বি।

—জুইশদের দোষ কী? এই যে এখন মানুষ ইন্ডিয়ানদের দেখতে পারে না, তুমি তো ইন্ডিয়ান, নাকি? তো ইন্ডিয়ানদের দোষ কই বলো?

—জ্বি না, আমি বাংলাদেশ থাইকে আসছি।

—সেইটা কোথায়? মরিশাসে? তো যাই হোক, আমার আব্বা আম্মা পোল্যান্ডে বিয়ে করছিলেন। আমার একটা বড় ভাইও ছিলো। সে মারা গেছে অনেক আগে। ইনফেকশান হইছিলো পায়ে। তারপরে আরেকটা বাচ্চা মারা গেল আমার মায়ের। পেটের মধ্যেই। এখন কত রকমের চিকিৎসা, তাই না, তখন তো এইসব ছিলো না! সেই নিয়া আমার মায়ের সারাজীবন দুঃখ ছিলো। সবগুলা ছেলে মইরা গেল।

—পেটেরটা ছেলে, এইটা জানলেন ক্যামনে উনি?

—আমি তো জানি না, মা’রা বুঝে এইসব, বুঝছো? তোমার বাচ্চা হইলে তুমিও বুঝবা। বাচ্চা আছে নাকি তোমার? তোমরা ইন্ডিয়ানরা তো আগে আগে বিয়া কর।

—আমি ইন্ডিয়ান না তো।

—আচ্ছা, আচ্ছা। তো আমি আসলাম এই লন্ডনে। বিয়া করছিলাম একটা। টিকে নাই। আমার স্বামী ড্রাগ এডিক্ট ছিলো। কেমিস্টের চাকরি করতো চেরক্যাসিতে। চিনো?

আমি মাথা নাড়লাম।

—যুদ্ধের পরপর বানাইছিলো। এখন তো বিশাল বড় কোম্পানি। নাইট্রোজেন সার বানায় ওরা।

আমি মাথা কাৎ কইরা শুনলাম টিউবের কম্পিউটারাইজড মহিলা-গলা জানাইলো সামনের স্টপ সেইন্ট পল। বুড়িরে বললাম, আমার তো নাইমে যাইতে হবে। আপনার গল্পটা তো শুনা হইলো না। ঐ যে আন্ডারগ্রাউন্ডে কবুতর তাড়ানোর গল্পটা!

মহিলা মাছি (অথবা কবুতর) তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নাচাইয়া কইলেন, হবে, হবে নে, কোনো এক সময়।

আমি আবার ডিফেন্স ব্যারিস্টারের কথা ভাবতে ভাবতে হাসতে হাসতে টিউব থাইকে নামলাম। সামনে দাঁড়ানো মহিলা আমার দিকে ভুরু কুঁচকায়ে তাকাইলেন।

 

এপ্রিল ১১, ২০১৪

আজকে স্বপ্নে ইয়ান ইয়ানরে দেখলাম। দেখলাম আমি ঘরের মধ্যে হলুদ রঙ্গের শর্টস আর উলেন নীল মোজা পইরা ঘুরতেছি, আম্মা আইসা খবর দিলেন ইয়ান ইয়ান আসছেন। আমি আয়নার সামনে গিয়া তাড়াতাড়ি চুল-টুল আঁচরাইলাম–কিছুক্ষণ আগেই ঘুম থাইকে উঠছি কিনা, জামা-কাপড়ের কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই। লাল লাল রঙের একটা শাড়ি পইরা ইয়ান ইয়ান বাসায় ঢুকলেন। উনার এক হাতে ফুলের তোড়া আরেক হাতে ক্রিম-চিজওয়ালা ক্যারট কেক।

—শুভ জন্মদিন, নাদিয়া।

ইয়ান ইয়ানের সাথে আমার পরিচয় হইছিলো ২০০৪ সালে। আমার এক বন্ধুর মারফত। আমার সেই বন্ধু উনারে বড় একটা সবুজ রঙ্গের লাউ হাতে শাহবাগের রাস্তা ধইরা প্রবল বেগে হাঁইটে যাইতে দেইখা উনার প্রেমে পইড়া গেছিলেন। ইয়ান আমারে ডাকেন নাদিয়া বইলা। আমার অন্য বন্ধুরা আমারে ডাকেন তিথি। আম্মা ডাকেন তিথং আর আমার বন্ধু তমা ডাকেন তিথ্যা। কোনোটার একটাও আমার ভালো লাগে না। আমার ডাক নাম ছিলো প্রতিতি, আমার বড় ভাই পান্থ’র সাথে মিল দিয়া। আমার বাপে কইলেন, এত বড় নাম কেউ ডাকতে পারবে না, তাই প্রতিতির মুসলমানি হইয়া তিথি হইয়া গেল। নামের ইসলামিফাইয়ের জন্য আমি আমার বাপরে জীবনেও কোনোদিন ক্ষমা করুম না।

আমি দেখলাম টেবিলের উপর আরো একটা কেক। সাদা ফ্রস্টিং-এর নিচে আধা খাওয়া একটা রেড ভেলভেট। বুঝলাম, গত কালকে জন্মদিন ছিল নিশ্চয়ই আমার।

—এই কেক, আপনি বানাইছেন?

—না, না, আব্বু আনছিলো।

—ও, আচ্ছা। তো আমি কিন্তু আপনারে আজকে রান্না কইরা খাওয়াবো। সবকিছু নিয়া আসছি।

আমি তাকায়ে দেখলাম, সত্যি সত্যি, উনার হাতভর্তি শাক সবজি: লাউ, অর্ধেকটা কুমড়া, দুইটা বেগুন, আরো কী কী জানি। বাজারের ব্যাগের ভিতর থাইকে শুয়োরের একটা মাথাও দেখা যায়।

ইয়ান ইয়ান ও রোস্ট শুয়োর
ইয়ান ইয়ান ও রোস্ট শুয়োর

উনি আমার বাসার পিছনের বাগানে গিয়া মাটি দিয়া একটা চুলাও বানায়ে ফেললেন খুব তাড়াতাড়ি। আমি একটা বেতের চেয়ার নিয়া বইসা উনার রান্না বান্না দেখতেছি। উনি যে হুট কইরা বিয়া কইরা ফেললেন, এইসব নিয়া আলাপ করতেছি, এমন সময় শুনি পানির শোঁ শোঁ আওয়াজ। ইয়ান ইয়ান বামে তাকায়া কইলেন, “এই রে, জোয়ার আসতেছে। সবকিছু সরাইতে হবে।”

কথা শেষ হইতে না হইতেই দেখি বাগানের ভাঙা দেয়াল দিয়া হুড়মুড় কইরা পানি ঢুইকা সবকিছু ভাসায়ে নিয়া যাওয়া শুরু করছে। আমি দৌড়ায়ে বাসায় ঢুকলাম, আমার উলেন মোজা পানিতে নষ্ট হয়া যাবে তো। ইয়ান ইয়ানের সঙ্গে তখন একটা পায়জামা পাঞ্জাবী পরা বাচ্চা পোলা, তারা দুইজনে মিলা টানাটানি কইরা আস্ত শুয়োরটারে বাসায় ঢুকাইতেছেন। পানির সাথে বটি ভাইসা যাইতেছে দেইখা পোলা হাউ হাউ কইরা কাইন্দা উঠলেন, এইটা তার নানির বটি। নানি তারে বটি দিয়া কুপায়ে মাইরে ফেলবেন বটি হারাইলে ইত্যাদি ইত্যাদি।

তারপরেই দেখলাম আমি আর ইয়ান ইয়ান পাহাড়ি একটা রাস্তা ধইরা হাঁটতেছি। তখন সন্ধ্যামত। চারদিকে ভালো অন্ধকার। কেবল একটা দুইটা টিমটিমা বাতিওয়ালা দোকান দেখা যায় দূরে দূরে। হাঁটতে হাঁটতেই ইয়ান একটা লুঙ্গিপরা মোছওয়ালা ভদ্রলোক হইয়া গেলেন। স্বপ্নে তারে খুব আপন আপন মনে হইলো। আমারে জিগাইলেন, “এইদিকে কী? সবকিছু তো অন্ধকার, কিছুই তো দেখা যায় না! কই নিয়া যাও আমারে?”

—এইখানে লাল মোহন গাঙ্গুলীর বাসা। আজকে অটোগ্রাফ নিয়া আসবো উনার।

—লাল মোহন গাঙ্গুলীটা আবার কে?

—উনি একজন ডিফেন্স ব্যারিস্টার। খুব বিখ্যাত।

—হুঁ।

উনারে খুব একটা উৎসাহী লাগলো না। আমি পাত্তা না দিয়া রাস্তা দেখতে দেখতে হাঁটতে থাকলাম। হঠাৎ দেখি রাস্তার উপর একটা সোনার পয়সা পইড়া আছে। পাশের মোছওয়ালা ভদ্রলোকরে এখন সৌমিত্রের মত লাগতেছে। বেহুদা খাটো, কুঁচকানো একটা পাঞ্জাবী পরা। আর বাদামী রঙের ট্রাউযার্স। আমারে বললেন, “উঠাও, উঠাও না, দেখো না আসল সোনা কিনা!”

আমি পয়সাটা হাতে নিয়া ঘুরায়ে ফিরায়ে দেখতেছি, এরমধ্যেই আমার পাশে চার-পাঁচজন মধ্যবয়স্ক গুণ্ডামত ভদ্রমহিলা আইসা জড়ো হইলেন। একজন পান্না সবুজ রঙের সালওয়ার কামিজ পরা, ওড়নাটা নীল। আমার আম্মারও এই রঙের একটা জামা আছে। উনি আমার দিকে আঙুল উঁচায়ে উঁচায়ে কইলেন, “এই মেয়ে, তুমি আমার পয়সা মারার ধান্দায় আছো, না? দাও, ফেরত দাও আমার জিনিস!” পাঞ্জাবীওয়ালা সৌমিত্র তখন আবার ইয়ান ইয়ান হইয়া গেছেন। উনি আমার কানে কানে কইলেন, “মেনোপোজ হওয়া মহিলাদের থাইকে সাবধান।” বইলাই উনি দৌড় দিলেন একটা। কিছু না ভাইবা আমিও দৌড় দিলাম উনার পিছপিছ।

পাহাড়ি চিপা রাস্তা। দুইপাশে বড় বড় গাছ। আমি হাঁপাইতে হাঁপাইতে আয়তুল কুরসি পড়তে পড়তে দৌড়াইতেছি। হঠাৎ সামনে তাকায়ে দেখি পান্না সবুজ মহিলা আমার দিকে ছুইটা আসতেছেন সামনের অন্ধকার থেইকা। উনার হাতে ইয়ান ইয়ানের পোলার পানিতে ভাইসা যাওয়া বটি। আমি ঘুইরা আরেকদিকে দৌড় দিবো, দেখি, মেনোপোজ হওয়া বাকি মহিলারা হাত মাথার উপ্রে তুইলা ছুইটা আসতেছেন আমারে ধরতে। এরমধ্যেই পান্না সবুজ আমার চুলের ঝুঁটি ধইরা আমারে আটকায়ে ফেলছেন। আমি চুল ছাড়াইতে ছাড়াইতে উনার হাত থাইকে বটি ছুটায়ে নিছি। পিছনের মহিলারা আমারে ঘিরা ফেলছেন এরমধ্যেই। তারা মুখ দিয়া অদ্ভুত শব্দ করতেছেন কেমন জানি। আমি সব শক্তি এক কইরা পান্না সবুজের ডান হাতে বটির ব্লেড বসায়া দিলাম। কড়াৎ কইরা একটা শব্দ হইলো, তাকায়া দেখলাম, পান্না সবুজের গাঢ় লাল রক্তওয়ালা হাতের কব্জিটা আমার নীল চুল সহ রাস্তায় পইরা চকচকা চোখওয়ালা কই মাছের মত লাফাইতেছেন। উনিও চকচকা চোখ নিয়া অবাক হয়া তাকায়া আছেন হাতের দিকে। আমি সোনার পয়সা বুকের সাথে চাইপা ধইরা আবার দৌড় দিলাম। ইয়ান ইয়ানরে দেখলাম দূরে একটা ক্যাবল কারের তার ধইরা ঝুলতেছেন। উনি চিল্লায়ে আমারে কইলেন, সামনে একটা টানেল আছে, তার ভিতর দিয়া কাচ কাইটা আমারে এইখানে আসতে হবে।

আমি টানেলে ঢুকবো, আমার বিলাই আমার পা চাইটে ঘুমটা ভাঙায়ে দিলেন। সবাইরে শুভ সকাল!

 

আমার বিলাই গায়া লিকোরিশ পিগম্যালিয়ন
আমার বিলাই গায়া লিকোরিশ পিগম্যালিয়ন

আমি একটা উপন্যাস লিখবো ভাবতেছি। উপন্যাসের নাম এখনো ঠিক করি নাই। তবে নায়িকার নাম ঠিক করছি। বেলেছা। নামটা আসছে আম্মার কাছ থেইকা। আম্মা ঢাকায় একটা অটিস্টিক বাচ্চাদের স্কুলে কাজ করেন। সেইখানে বাথরুম পরিষ্কারের কাজ করেন এক মহিলা, উনার প্রাক্তন নাম বেলেছা। ঢাকায় আইসে বেলেছা নাম পাল্টায়ে বিউটি হইছেন। আম্মা জানাইলেন, উনি দেখতেও বিউটিফুল।

আম্মার বেশিরভাগ কথা আমি অবশ্য পাত্তা দেই না। উনার অতিরঞ্জনের সমস্যা আছে। উনার মাথাও অল্প বিস্তর খারাপ। দেড় দুইমাস আগে উনি সাতশ’ টাকা দিয়া একটা প্লাস্টিকের ডিম কিনছিলেন। দেখতে ও ওজনেও নাকি আসল মুরগীর ডিমের মত। সেই ডিম নিয়া উনি উনার স্বামী (আমার বাপ), উনার ছেলে (আমার ভাই) ও উনার ছেলের বউ (অর্থাৎ আমার বৌদি) এবং বাসায় যারা যারা আসছেন, তাদের কইছেন সিদ্ধ ডিমটা একটু ছিলায়ে দিতে। উনার আঙুলে সমস্যা। (আসলেই সমস্যা, বেশি পানি ধরার কারণে উনার আঙুলের চামড়া খুইলা খুইলা আসতেছেন।) এর কিছুদিন পরে উনি উত্তরার মাসকট প্লাজা থাইকা কিনছেন একটা খেলনা ইঁদুর। যথারীতি এই ইঁদুরও আসল ইঁদুরের মত দেখতে। ভেলভেটের চামড়া, লোমওয়ালা লেজ, চোখগুলাও নড়ে। উনার ইচ্ছা কয়জন পারা দিয়া এই ইঁদুর মারতে কত সময় নেন, এইটা আবিষ্কার করা।

তো যাই হোক, ঘটনার শুরুটা হবে এমন: বেলেছা বিয়া কইরা লন্ডন আসছেন। উনার স্বামীর নামটা এখনো ঠিক করি নাই। ধরা গেলো উনার নাম ১। তো ১ আর বেলেছা সেভেন কিংসে একটা বাড়ি ভাড়া করছেন। বাড়িওয়ালির নাম মিসেস ক’ফিল্ড।


আজকে আমি আর ১ বাইরে খাইতে যাবো ভাবতেছি। বাসায় কোনো খাওয়া নাই। তিন দিনের পুরানা দুই টুকরা পাউরুটি আছে, তার এক কোণা কোণা দিয়া সবুজ আর ছাইরঙা ফাঙ্গাস পরছে। ১ জানে না, এখনো রুটিগুলারে ফালায়ে দেই নাই আমি। সবুজ রঙটা যে কী সুন্দর! ও, আর ফ্রিজে আছে পিঁয়াজের গন্ধওয়ালা আধাবাটি মাখন। ১রে আমি অনেকদিন না করছি তরকারির চামচ দিয়া মাখন উঠাইতে। বইলা লাভ নাই। উনার স্মৃতিশক্তির সমস্যা আছে। কাজের অর্ধেক কইরা চিন্তা শুরু করেন, কী করতেছিলেন। উনি নিজেই বলেন উনার মেমরি নাকি গোল্ডফিশের থাইকেও খারাপ। আমার একটা গোল্ডফিশ ছিলো ছোটবেলায়। নানা কিনা দিছিলেন। তিনদিন এ্যাকুরিয়ামে থাকার পর এক শনিবার পেট ফুলায়ে মইরা গেলেন উনি। আমি কান্দি নাই, আমার ছোট বোন এক সপ্তা কানছিলেন। আমার নানা আমার নাম দিছিলেন বেলেছা। সেই নাম আমার আর নানা ছাড়া কারো ভালো লাগে নাই। আমার আসল নাম রুবনা হোসেন। আমার বিয়ের রাত্রে আমি ১রে বলছি আমারে যদি বেলেছা নামে না ডাকেন, তাইলে আমি এখনই বিয়ে ভাইংগা দিয়া চইলা যাবো। উনি খুব করুণ মুখে বলছেন, বেলেছা ডাকবেন না ক্যানো? বেলেছা তো খুব সুন্দর নাম, ইত্যাদি।

আমি হাঁটু সমান একটা জিন্সের স্কার্টের উপ্রে হাতা কাটা লাল রঙের গেঞ্জি পরলাম। লালের উপর সাদা সাদা পোলকা ডট। ১ আমার দিকে তাকায়া বললেন, “এইটা কী পরছো? বাইরে যে বাতাস, একটা জ্যাকেট নিবা না সাথে? আর চুলটাও তো দেখি আঁচরাও নাই!”

আমি উত্তর দিতে যাবো, শুনি দরজার উপর টকটক টকটক অধৈর্য্য আওয়াজ।

এই সময় কে আসছে? পোস্টম্যানরা তো বিকাল পাঁচটার পরে আসেন না! এখন সাড়ে সাতটা বাজে।

১ জুতার ফিতা বান্ধতে বান্ধতে আমারে কইলেন, “দেখতে পারতেছো না, কে? দেখ না কে আসছে!”

পাশের বাসার মহিলা নাকি এই ভাবতে ভাবতে আমি দরজা খুললাম। মহিলা উনার চাইল্ড মাইন্ডার না আসলে মাঝেমাঝেই মেয়েরে আমার কাছে রাইখা যান। আমার বাচ্চা কাচ্চা ভালো লাগে না, কিন্তু মিথ্যা কথাও বলতে পারি না। আসলেই তো আমার করার কিছুই নাই।

বাড়িওয়ালি। মিসেস ক’ফিল্ড। “হ্যালো! গুড আফটারনূন মিসেস ক’ফিল্ড!” আমি হাসলাম একটু। মহিলার বয়স নব্বইয়েরও উপরে। সামনের তিনটা দাঁত নাই। ঘাড় পর্যন্ত লম্বা ফিনফিনা কটন ক্যান্ডির মত সাদা সাদা চুল। আমার বাসার লাইনের চারটা বাসা উনার। মার্গারেট থ্যাচারের সময় পানির দামে কিনছিলেন সবগুলা। উনি থাকেন আমার পাশেরটায়। বাকি তিনটা ভাড়া দিছেন। উনি মনে হয় আমার হাসিরে দেখতে পাইলেন না। আমার দিকে না তাকায়েই কইলেন, “তোমার লিভিং রুমের পর্দা কই?” উনার চোখ আমার ঘরের ভিতর।

– এক্সকিউস মি? কী কই?

– পর্দা, পর্দা, জানালার পর্দা!

“ও, হ্যাঁ, পর্দা?” আমি ১এর দিকে তাকাইলাম একটু। এখনো ফিতা বানতেছেন উনি। “ঘরে আলো ঢুকে না, তাই আমি খুলে ভাঁজ করে আলমারিতে ঢুকায়ে রাখছি। কেন?”

আমি চাই কালকেই তুমি জানালায় পর্দা লাগাও। বাইরে থেকে সব দেখা যায়। আমার বাড়িতে আমি কোনো ছোটলোক ভাড়া দিব না।

“ছোটলোক মানে?” আমার গলা একটু উপরে উঠল।

“ছোটলোক মানে তোমরা। এশিয়ানরা। আজকে পর্দা খুলে ফেলবা, কালকে জানালায় তোমাদের লম্বা লম্বা শাড়ি আর ছেলেদের স্কার্ট শুকাইতে দিবা! আমার বাসায় এইসব চলবে না!” এই বলতে বলতে উনি কার্পেটের মেঝেতে পা ঠুঁকলেন দুইবার।

এতক্ষণে ১ উইঠা আসলেন। আমি তাকায়ে দেখলাম উনার দুই পায়ের দুই জুতাতেই নিখুঁত সমান দুইটা বো। স্কেল দিয়া মাইপা ফিতা বান্ধছেন নাকি উনি?


আজকে আর লিখবো না। মিসেস ক’ফিল্ডের ক্যারেক্টারটা নিয়া চিন্তা করতে হবে। বাসায় আসলেই খাওয়ার কিছু নাই। একবছর আগে এক্সপায়ারি ডেইট ওভার হয়ে যাওয়া কিছু কর্নফ্লেক্স আছে। ফালায় দিব দিব কইরাও ফেলানো হয় না। আমার জিনিসপত্র জমানোর রোগ আছে।

 এপ্রিল ১৫, ২০১৪

বেলেছার গল্পটা লিখব না ঠিক করছি। উনার গল্পে বারবার আমার গল্প চইলা আসতেছে। মিসেস ক’ফিল্ড ছিলেন আমার বাড়িওয়ালি। রাত্রেবেলা আমার আর উনার বাগানের দেয়ালের গর্ত দিয়া ঢুইকা আমার বেডরুমের জানালার পিছে ঘাপটি মাইরে উনি বইসা থাকতেন আমি কী কী করি দেখার জন্য। উনার ধারণা ছিলো আমি ঘরের মধ্যে হাতুড়ি পেরেক দিয়া দেয়াল ফুটা করি, বেআইনি ড্রাগের চাষ করি এবং কুকুর বিলাই পালি। বিলাই কুকুরের গুয়ের গন্ধ শুঁকার জন্য প্রায়ই উনি আমার বাসার পিছনে নাক টানতে টানতে হাঁটতেন। আমি কেন ঘরে পর্দা টাঙ্গাই না, ঘরে আন্ডারওয়্যার পইরা হাঁটি এই নিয়াও উনার বিশাল সমস্যা ছিল। আমি মাঝেমধ্যেই ভাবতাম কাউন্সিলরে ফোন দিব বা পুলিশ ডাকব। কী কী কারণে ডাকা হয় নাই তা এখন আর মনে নাই।

6B গ্রাফাইট পেন্সিল, লিকুইটেক্স অ্যাক্রিলিক ইঙ্ক এবং ওয়াটারকালার পেন্সিলে আমার আঁকা ও ফটোশপে এডিট করা মিসেস ক'ফিল্ড
6B গ্রাফাইট পেন্সিল, লিকুইটেক্স অ্যাক্রিলিক ইঙ্ক এবং ওয়াটারকালার পেন্সিলে আমার আঁকা ও ফটোশপে এডিট করা মিসেস ক’ফিল্ড

মানুষের কী কী মনে থাকে না বা কী কী মনে থাকে এইটা একটা আশ্চর্যজনক বিষয়। আজকে কোর্টে যাইতে যাইতে মনে হইল, এই যে একটানা দেড় বছর আমি হাসপাতালে ছিলাম, তার কোন কিছুই আমার মনে নাই। যা যা মনে আছে তা সব আশেপাশের মানুষদের কাছ থাইকা ধারকরা স্মৃতি।

তিন মাস আগে আমার একটা ব্লাড টেস্ট ছিল কিং জর্জ হাসপাতালে। হাসপাতাল থাইকা বাইর হওয়ার পর এখন প্রত্যেক তিন মাস অন্তর অন্তর আমার ব্লাড দিয়া আসতে হয়। তো আমি আর রঞ্জু টিকেট হাতে বইসা আছি লাউঞ্জে। আমার নাম্বার ৯৭। এখন চলতেছে ৬১। রক্ত নেয়ার নার্সরা সবাই খুব ফুর্তিতে আছেন–কাজের তেমন কোন আগ্রহ দেখা যাইতেছে না উনাদের মধ্যে। উনাদের একজনের সম্ভবত বাচ্চা বা বিয়া হবে সামনে। সবাই কিছুক্ষণ পরপর উনারে কংগ্রাচুলেট করতেছেন, উনার টেবিলে ফুল, চকোলেট আর কার্ড দিয়া আসতেছেন, ব্লাড দিতে আসা রোগীর হাতে ইলাস্টিক ব্যান্ড বাইন্ধা রাইখা হাসতে হাসতে হবু মা বা হবু বউরে প্লাস্টিকের কাপে পানি আগায়া দিতেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি বইসা বইসা বেন গোল্ডএকরের ব্যাড সায়েন্স পরতেছি—আমার সামনে দিয়া লম্বা মতন খুব সুন্দর দেখতে কোবাল্ট নীল স্যুট পরা এক দাড়িওয়ালা ভদ্রলোক হাঁইটে গেলেন। যাওয়ার সময় আমার দিকে তাকায়ে মাথাটা সামান্য নামায়ে হাসলেন অল্প একটু।

bad-science

আমি রঞ্জুর দিকে তাকাইলাম। ইনারে কি আমি চিনি?

রঞ্জু মনে হইল একটু অবাক হইলেন, “তুমি আসলেই চিনতে পারতেছ না উনারে?”

আমি মাথা নাড়লাম, “চিনার কথা নাকি?”

অত্যন্ত আশ্চর্য হয়া রঞ্জু জানাইলেন এই ভদ্রলোক আমার হেমাটোলজিস্ট ছিলেন দেড় বছর। আড়াইদিন যাবৎ আমারে কাটাকাটি করার পরে আমারে ও আমার ভাইরে উনিই প্রথম খবর দেন যে আমার দুই ধরনের ক্যান্সার ধরা পড়ছে একসাথে। উনি তখনো বিশ্বাস করতে পারেন নাই যে এই ডাক্তাররে আমার মনে নাই।

আমি বইটার মলাট দেখতে দেখতে নিজের স্মৃতিশক্তির কথা ভাইবা ভাইবা আশ্চর্য হইলাম। অনেক আগে কোথাও পড়ছিলাম, নরম্যাল ডেলিভারির পরে মহিলাদের ব্রেইন নিজের সারভাইভালের জন্য লেবার পেইনের স্মৃতিটা নাকি পুরাপুরি মুইছা ফেলেন ব্রেইন থাইকে। আমার ক্ষেত্রেও কি তাই হইছে?

(কিস্তি ৩)