(শুরুর কিস্তি)

অগাস্ট ২৯, ২০১৪

ড্যানিয়েন গ্যালাওয়ে গ্রিনের সাথে আমার দেখা হয় খুব অদ্ভুত অদ্ভুত সময়ে।

উনার সাথে পরিচয় পর্তুগালের ফারোতে।

পর্তুগাল গেছিলাম একটা প্র্যাকটিস বম্ব-স্কোয়াডের সাথে। ফারো এমনিতে টুরিস্টদের এলাকা, কিন্তু ঠাণ্ডার সময় একদমই খালি থাকে। আমরা একটা ক্লিফের মাথায় সি-ফোর ফুটায়ে ক্লিফের ঠিক নিচেই ক্রেইট ফেইট কাঁটা কম্পাস হাবিজাবি নিয়া সারা শরীরে পি.পি.ই. লাগায়া বালুতে হামাগুড়ি দিয়া সি-ফোরের ইমপ্যাক্ট পরীক্ষা করতেছিলাম।

আমাদের কোর্সের কোঅর্ডিনেটার ড. ক্লাইভ স্টিল বিশাল বিড়ি-খোর। পনেরো মিনিট পর পর উনার একবার কইরা বিড়ি ফুঁকতে হয়। সেই সুযোগে আমরাও কিছুক্ষণ পরপর বিড়ি-ফেইসবুক-টুইটার-সেলফি-ক্যান্ডিক্রাশ ইত্যাদি ইত্যাদি ব্রেক নিয়া নেই।

তখন দুইটা মত বাজে। আমাদের পনেরো মিনিট পর পর ব্রেকের সুবাদে কাজ আগায় নাই কিছুই। এক গ্রুপ শহরের দিকে গেছে, দুপুরে খাওয়ার কিছু কিনা আনতে। এত দেরি হবে কেউ আগে বোঝে নাই।

আমরা অকর্মা আরেক গ্রুপ নদীর পানিতে নাইমা গেছি। ফারোতে তখন বারো ডিগ্রী সেলসিয়াসের মত টেম্পারেচার। অথচ রোদের তাপে শরীর পুইড়া যাওয়ার অবস্থা। সাঁতার জানেন না বইলা চাইনিজ জেন ওয়ং নদীর কিনারে দাঁড়ায় ছিলেন, হঠাৎ দেখলাম বাংলা সিনেমা স্টাইলে উনি ঝপাৎ কইরা ব্যাঁকা হয়া পানিতে পইড়া গেলেন। তখনো বুঝি নাই কী হইতেছে। সালিনা কালিক্সোট পানিতে ভাসতে ভাসতে আমারে কইলেন, “মনে হয় ওর বেশি গরম লাগতেছে।”

এর মধ্যেই দেখি দূরে একটা সবুজ ডিঙিতে বিয়ারের বোতল হাতে আমেরিকার পতাকার ছাপ্পাওয়ালা শর্টস পইরা খালিগায়ে এতক্ষণ বইসা থাকা এক লম্বামত পোলা পানিতে ঝাঁপ দিয়া নাইমা খুব উত্তেজিত ভঙ্গিতে আমাদের দিকে তাকায়া পর্তুগিজে হরবর কইরা কী জানি কইতেছেন আর আঙুল দিয়া জেন ওয়ংরে দেখাইতেছেন।

আমাদের পর্তুগিজ-দৌড় অব্রিগাদো আর ’ওলা আর এনু ফালু পখতুগিজ’ (আই ডোন্ট স্পিক পর্টুগিজ) পর্যন্তই। তবে পোলার হাবভাবে মনে হইলো জেন ওয়ং-এর নিশ্চয়ই কিছু হইছে। আমরা সবাই তখন মাঝনদীতে। এলিয়েট আমাদের মধ্যে সবচে’ লম্বা, সবচে’ ভালো সাঁতারও জানেন। উনিই সবার আগে সাঁতরায় গেলেন তীরের দিকে।

জেন ওয়ং-রে তখন আর কোথাও দেখা যায় না!

আমি, সালিনা আর লুসি পাসকট পানি ঠেঙ্গাইতে ঠেঙ্গাইতে তীরে আসতে আসতেই দেখলাম আমেরিকান শর্টসওয়ালা পানির নিচ থাইকে বালুর বস্তা স্টাইলে জেন ওয়ং-রে ওঠায়ে নিয়া আসতেছেন। এলিয়েট উনার পিছে পিছে হাঁপাইতেছেন।

জেন ওয়ং-এর হিট-স্ট্রোক হওয়ার সুবাদে আমাদের সেইদিনের কাজ বাতিল ঘোষণা করলেন ড. স্টিল। শর্টসওয়ালারে আমরা শহরে নিয়া গিয়া গ্রিল্ড সারডিন আর বিয়ার খাওয়াইলাম।

গ্রিল্ড সারডিন
গ্রিল্ড সারডিন

আমেরিকান শর্টসওয়ালার নাম ড্যানিয়েল গ্যালাওয়ে গ্রিন। বাপ মা আমেরিকান, জন্ম সিয়াটলে, কিন্তু থাকেন লন্ডনে। ফারো আসছেন তার ভারতীয় বান্ধবী কিনজেল পিল্লাইয়ের সাথে দেখা করতে। কিনজেলের বাপ শংকর পিল্লাই লন্ডনে রেস্টুরেন্টের ব্যবসা কইরা কোটিপতি হইছেন। উনার রেস্টুরেন্টের চিকেন টিকা মাসালা আর গোবি আলু আর পানির মাখানি বাকিংহাম প্যালেসে গেছিলো দুইবার। ফারোতে উনার হলিডে-ভিলা আছে দুইটা।

রেস্টুরেন্টে বইসা আমি ড্যানিয়েলরে ছুরি কাঁটাচামচ আগায়া দিতেছি, আমারে কইলেন, “হাতেই দিবা? টেবিলে রাখবা না?”

আমি অবাক হয়া তাকাইলাম, “মানে কী?”

তুমি তো ভারতীয়, তুমি জানো না?

আমি একটু শ্রাগ করলাম, “না, আমি ভারতীয় না, আমি বাংলাদেশ থাইকে আসছি।”

ড্যানিয়েল হাইসা সিলেটিদের মত মাথা ঝুঁকায়ে কইলেন, “ও, বালা নি?”

আমিও হাসলাম, “জ্বি অয়, বালা আছি।”

উনি ব্যাখ্যা করলেন, কিনজেল কখনো হাত বাড়ায়ে ছুরি কাঁচি নিবেন না, কাউরে দিবেনও না। কাউরে যদি ছুরি দিতেই হয়, তাইলে উনি টেবিলের উপর ছুরি রাখবেন, যাতে অন্যজন নিজের হাতে সেই ছুরি উঠায়ে নিতে পারেন। উনি এবং বেশিরভাগ গুজরাটি ভারতীয়রা বিশ্বাস করেন, হাত দিয়ে ছুরি দিলে তার সাথে নাকি আর সম্পর্ক থাকে না!

আমি হাসলাম। মানুষ এইগুলিরে কুসংস্কার বলে। আমার মনে হয় এইগুলা মানুষের মৌলিকত্বের অংশ। আমার কাছে খনার বচনের একটা বই ছিল। মানুষের ঘাড়ের উপর চুল দেইখা উনি তার পরের বাচ্চা ছেলে হবে না মেয়ে হবে তা বলতে পারতেন। আমি এখনো সেই থিওরি অ্যাপ্লাই করি মাঝে মাঝে। মিলে তো!

ড্যানিয়েলের সাথে আমার দ্বিতীয়বার দেখা বার্সেলোনায়। বার্সেলোনার যাতায়াত ব্যবস্থা খুব খারাপ। আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেইন দিয়া পুরা শহর কানেকটেড থাকার পরেও বাজে কানেকশান এবং লিস্ট-টুরিস্ট-ফ্রেন্ডলি এক্সিট সাইনের জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলগুলারে মেক্সিকো শহরের মাটির নিচে চাইরশ’ বছর আগের কাটা সিরিয়াল কিলারের কোল্ড-স্টোরেজের মত পেশাবের এবং অন্যান্য আবর্জনার ঝাঁজালো সালফারি গন্ধওয়ালা-বামপন্থী পোস্টারওয়ালা দেয়ালের অন্ধকার স্যাঁতসেতে সাফোকেটিভ ল্যাবেরিন্থের মত লাগে।

আমার বন্ধু লিন্ডা অস্টেনসন তখন সাত মাসের প্রেগন্যান্ট। নরওয়ে থাইকা আসার কারণে কিনা জানি না, উনার সবকিছুতেই ‘আরে ধুর, কী আর হবে’ টাইপের চিন্তাভাবনা। প্রেগন্যান্সির ছয় মাসের মাথায় উনি উনার বয়ফ্রেন্ডরে জুতা পইরা ঘরে হাঁটার কারণে বাসা থাইকা বাইর কইরা দিয়া এখন একা একা থাকেন। একা একা মানে মানুষ ছাড়া একা একা। উনার তিনটা বিলাই এবং একটা ঘোড়া সাইজের সেইন্ট বার্নার্ড কুকুর আছে। কুকুরের নাম কালি অস্টেনসন। উনার গায়ের রঙ সাদা ও খয়েরি। উনারা কেউ ঘরে জুতা পইরা হাঁটেন না।

লা রাম্বলাতে আমার আর লিন্ডার পকেটমার হইছে। দুইজনের একসাথে কেমনে পকেটমারি হইলো এই গবেষণা করতে করতে আমরা স্টেশানে ঢুকলাম। জিন্স নরম্যালি আমার প্রিয় পোশাক না, তবে সেইদিন জিন্স পরা থাকার কারণে ঐ যাত্রা রক্ষা পাইলাম আমরা। দুইজনেরই সাতদিনের ট্রেইনের টিকেট জিন্সের পকেটে ছিলো খুচরা-খাচরি আরো কিছু টাকা আর মোবাইল ফোনের সাথে। স্টেশানে ঢুকতেই লিন্ডা আমারে উনার কালো-সাদা আর্ট ডেকো মার্কা লম্বা লম্বা চারকোনা নখ দিয়া খামচায়ে ধইরা লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়া বললেন, “ন্যাডস, আমার ক্লস্ট্রোফোবিয়া আছে মনে হয়। আমার এমন লাগতেছে কেন? আমারে ধরো।” এই বলতে বলতেই উনি হুড়মুড় কইরা মেঝেতে পইড়া গেলেন।

লা রাম্বলা
লা রাম্বলা

আমি মানুষরে এত কাছে থাইকা অজ্ঞান হইতে আগে কখনো দেখি নাই। বইয়ে পড়ছি অজ্ঞান হওয়ার সময় চোখের মণি নাকি উল্টায়ে যায়। কই, এমন তো কিছু হইলো না! মনে হইলো, উনি দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে ঘুমায়ে গেছিলেন, এখন খালি ব্যালান্স হারায়ে পইড়া যাইতেছেন। সেই সূত্রে মনে পড়লো আমার বাপের কথা—

আমার বাপ আর বড় চাচাসহ আমরা সবাই গ্রামে গেছিলাম ইলেকশানের সময়। দুইজনের কেউই তার আগের দুই রাত্রে ঘুমান নাই। কী নিয়া আড্ডা হইতেছিলো এখন আর মনে নাই। তো সেইদিন সকাল বেলা উনারা দুইজন মিলা আমার আরেক চাচার ঝক্করমার্কা বাইকে কইরা হাঁটের দিকে যাইতেছিলেন কারো একজনের সাথে দেখা করার জন্য। দুইজনেই মাড় দেয়া চকচকা সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরছেন। শেইভ কইরা হিউগো বস আফটার শেইভ লোশান লাগাইছেন। বড়চাচি স্যুটকেইস খুইলা খয়েরি চামড়ার নতুন স্যান্ডেল বাইর কইরা দিছেন বাক্সো থাইকে। চাচি যেকোনো উপলক্ষ পাইলেই নতুন নতুন স্যান্ডেল বাইর করেন কোথা থাইকা জানি। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় উনার রাম্পালস্টিলস্কিনের মত দাঁড়িওয়ালা খাটো কোনো চাকর আছে মাটির তলায়। যিনি প্রত্যেকদিন উনারে চিকন সুতা দিয়া নতুন নতুন জুতা সিলাই কইরা দেন। তো আমি এবং আমার দুই চাচাতো বোন আমাদের দাদাবাড়ির চকচকা উঠানে বইসা আছি, আমার চাচাতো বোনের কাজের পোলা আমারে মেঝেতে দাগ কাঁইটা ষোল গুঁটি খেলার নিয়ম-কানুন শিখাইতেছেন এবং আমার নির্বুদ্ধি দেইখা একটু পরপর বিরক্ত হইতেছেন। হঠাৎ দেখি দূর থাইকে আগাপাশতলা কাঁদাপানিতে মাখামাখি দুই লোক খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে বাইক হাঁটাইতে হাঁটাইতে বাড়ির দিকে আসতেছেন। ঘটনা পুরাপুরি জানা যায় নাই। তবে যতদূর উদ্ধার করতে পারছিলাম তা হইলো, চাচা ও বাপ একযোগে বাইক চালাইতে চালাইতে ঘুমাইতে ঘুমাইতে ধানক্ষেতের মাঝখানে গিয়া পড়ছিলেন।

প্রেগন্যান্ট মহিলাদের প্রতি ইউরোপবাসীর ভদ্রতা-আদিখ্যেতা-টলারেন্স দেখার মত। লিন্ডা স্টেশানের নোংরা মেঝেতে পড়ার সাথে সাথেই দশ-বারোজন লোক ট্রেইন ফালায়ে আমাদের দিকে দৌড়ায়ে আসলেন। উপরতলা থাইকে অন্য কোনো সময় চোখে দেখা যায় না স্টেশানের প্যাসেনজার সার্ভিস অ্যাসিস্ট্যান্ট সাহেবও বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে, চোখের চশমা খুলতে খুলতে নাইমা আসলেন। আমি চোখের কোণা দিয়া দেখলাম স্টেশানের মোসাইকের দেয়ালে ব্যাঁকা হইয়া দাঁড়ায়ে ধূসর চুলওয়ালা ড্যানিয়েল গ্যালাওয়ে গ্রিন আমার দিকে তাকায়ে মুচকি মুচকি হাসতেছেন।

ড্যানিয়েলের সাথে তৃতীয়বার দেখা হইলো ক্রয়ডন ইউনিভার্সিটি হসপিটালে ইসাবেলা ফিসবোর্ন (আগের ইসাবেলা ডয়েল)-এর সাথে দেখা করতে গিয়া। ইসাবেলার সাথে দেখা কইরা উনারে উনার চিঠি দিয়া আমি মার্ক আর ইসাবেলার কন্যা ক্যাথেরিন ফিসবোর্ন—তিনজন তিন কারণে বিমর্ষ মুখ নিয়া সিঁড়ি দিয়া নামতেছি—দেখি ‘আই অ্যাম নট আ ট্রি’ লেখা একটা পুরানা টি-শার্টের উপর একটা খোলশহীন লেপ গায়ে দিয়া উনি পকেটে ঘড়ি ঝুলানো এক নার্সরে জ্ঞান দিতেছেন গ্রিজলি বেয়ার ও পোলার বেয়ারের মধ্যে কী কী মৌলিক পার্থক্য আছে এই নিয়া।

হাসপাতালের অখাদ্য আপেল পাই ও কাস্টার্ড (কাস্টার্ডের আধিক্যে আপেল পাই দেখা যাইতেছে না)
হাসপাতালের অখাদ্য আপেল পাই ও কাস্টার্ড (কাস্টার্ডের আধিক্যে আপেল পাই দেখা যাইতেছে না)

ক্যাথেরিন ফিসবোর্ন চইলা গেলে আমি মার্ক আর ড্যানিয়েল সেইদিন হসপিটালের ক্যাফেতে অনেক রাত পর্যন্ত বইসা বইসা গল্প করলাম আর ক্যাফের অখাদ্য আপেল পাই আর গাঢ় হলুদ রঙের কাস্টার্ড খাইলাম হাসপাতালের গোল সাদা বাটিতে। ড্যানিয়েল এইখানেই—এই হাসপাতালেই—বাসা-হাসপাতাল-বাসা কইরাই কাটাইছেন গত বাইশ বছর। কিনজেলের সাথে পরিচয়ও উনার এইখানেই। ড্যানিয়েলের আমেরিকান মা উনারে চান নাই, তাই পেটেই উনারে মাইরে ফেলানোর বহু কায়দা কানুন করছিলেন উনি। নিয়মিত মদ ও সিগারেট খাইতেন—অ্যাবরশান করতে পারবেন না জাইনা বাচ্চা মারার জন্য বাথরুম পরিষ্কারের ব্লিচ খাইছিলেন। নিজেই নিজের পেটে বারি দিছিলেন ভারি চেয়ার দিয়া অনেকবার। এবং ভ্যাজাইনার ভিতর হাত ঢুকায়া টাইনা কর্ড ছিঁড়া বাইর কইরা নিয়া আসতে চাইছিলেন ড্যানিয়েলরে। এত কিছুর পরেও না মরায় উনি হার্টে এবং খাদ্যনালীতে ফুটাওয়ালা কিডনিবিহীন প্রিম্যাচিওর বাচ্চারে ফালায়ে গেছিলেন বাচ্চাহীন কপর্দকহীন ইংলিশ এক ভদ্রমহিলার কাছে। ভদ্রমহিলার মাতাল স্বামী স্পিটালফিল্ডের এক পুরানা কর্নার শপের মালিক ছিলেন। ঐ রাস্তার শেষ মাথার ভিক্টোরিয়ান টেন বেলস’ পাব—এখনকার টেন বেলস’ পাবলিক হাউসেই নাকি তার একশ’ বছর আগে জ্যাক দ্য রিপার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার পরে সাইজা গুইজা অপেক্ষা করতেন কমবয়সী মহিলা শিকার ধরার জন্যে।

ড্যানিয়েল আমারে আর মার্করে উনার বাসায় গিয়া উনার মায়ের বানানো আপেল পাই আর কাস্টার্ড খাওয়ার দাওয়াত দিলেন। আমি আর মার্ক টেন বেলস’-এ যাওয়ার প্ল্যান করলাম।

অগাস্ট ৩০, ২০১৪

হাসপাতালের খাওয়া নিয়া অনেক ক্লিশে আছে। আমি নিজে একটানা দেড় বছর হাসপাতালে ছিলাম। আমার হাসপাতালের খাওয়া নিয়া কোনো অভিযোগ ছিল না। বরং সারাদিন বিছানায় শুইয়া আগরুম বাগরুম খায়ে খায়ে আমার শীতকালের পাতিহাঁসের মত গায়ে তেল জমছিলো অনেক। আমার ভাইয়ের বন্ধু ইফতেখার আমারে তখন দেখলে নিশ্চয়ই ডাকরোস্ট বানানোর রেসিপি ঠিক করতেন মনে মনে। রয়্যাল প্রেরোগেটিভ অনুযায়ী ব্রিটেনের রানি সব পাতি হাঁস রাজ হাঁস মোটা হাঁস শুকনা হাঁসের মালিক, তাই ইফতেখার সাহেবের মনের ইচ্ছা মনেই আছে এখনো। হাঁস খায়ে জেলে যাবেন নাকি উনি?

পুরানা ডায়েরি পড়তেছি আজকে। ডায়েরির একটা পাতা অ্যাড করলাম এইখানে। একদিন যদি অনেক বিখ্যাত হই—তাইলে আমার নামে আমি সব ভুল ইনফরমেশানওয়ালা একটা অটোবায়োগ্রাফি লিখবো। শুধু ভুল তথ্য দেয়ার জন্যই বিখ্যাত হওয়া যাইতে পারে।


ফেব্রুয়ারি ১১, ২০০৮

আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়া আছি। আজকে সম্ভবতঃ ফেব্রুয়ারীর এগার তারিখ। একটানা শুয়া আছি তো আছিই—সময়ের কোনো হিসাব নাই আমার! একশ’ ঘণ্টা পর পর নার্সেরা একবার আইসা ই সি জি করেন। ই সি জি হইলো ইকো কার্ডিওগ্রাফি। সহজ অর্থে হার্টের ট্রেসিং। বুকের ডানদিকে চাইরটা, বামদিকে দুইটা, দুই কব্জিতে দুইটা, দুই পায়ের গোড়ালীর উপর অংশে (যেইটার নাম জানি না) দুইটা—(মোট দশটা আরকি) নীল রঙের গোল গোল স্টিকার লাগান। তার ভিতর স্ক্রু’র মত একটা কইরা প্লাগ ঢুকান, পরে চ্যাপ্টামত একটা বাক্সো থাইকে একটা লম্বা গোলাপী কাগজ বাইর হয়। যার মধ্যে এমন ছবি প্রিন্ট করা থাকে—

nadia4g

এরপর করেন এক্স-রে। এক্স-রে আমি আগেও করছি, তাই নতুন কইরা আর লিখলাম না। আমি যেই ঘরে আছি সেই ঘরের রঙ বেগুনী, মেঝের রঙ ছাই, ছাদের রঙ সাদা। দুইটা চেয়ারের রঙ এমারেল্ড সবুজ, একটা চেয়ার এবং পর্দার রঙ আকাশী নীল, টেবিল বিছানা আর বিছানার স্ট্যান্ডগুলার রঙ আইভরি। বিছানায় সাদা চাদর ও অফ হোয়াইট কুইল্ট। হাসপাতালে নিশ্চয়ই অকর্মা সব ডিজাইনাররা কাজ করেন। এবং নিশ্চয়ই উনারা কালার ব্লাইন্ড। আমার ঘরে একটা কম্পিউটার স্ক্রিনের মত একটা স্ক্রিন আছে, যেইখানে লেখা—

nadia4h

এই ঘরে একটা জানলা আছে, যেইটা দিয়া হাসপাতালের আরেকটা অংশ ও লাল রঙের ইটের বাসার উপর সাদা (কিছু অংশ ছাই) গোল গোল ডোম দেখা যায়। ডোমের মাথা ইউজ্যুয়ালি একটা পয়েন্টি এন্ডে গিয়া শেষ হয়। কিন্তু এই ডোমের মাথা দুইটা। আগে এমন দেখি নাই। এই জিনিসের সাইড ভিউ হবে এইরকম—

nadia4i

আমার ঘরের টিভিতে ফ্রেঞ্চ উচ্চারনের এক লোকরে দেখাইতেছেন। উনি EVERYDAY NOVELLI বইলা একটা বইয়ের লেখক। উনি কড়াইয়ে জলপাই তেলের ভিতর চামড়া উঠানো টমেটো, এ্যাভোকাডো আর মিষ্টি আলু আর চোরিৎজো দিয়া কি কি জানি একটা রান্না করতেছেন। উনার পাশের সোনালী চুলের ভদ্রমহিলা কইতেছেন www.itv.com/receipy তে এই রান্নার রেসিপি পাওয়া যাবে।

এখন বাজে এগারোটা। এখন গাঢ় নীল জামা পড়া একজন কালো নার্স আমার ব্লাড প্রেশার ও টেম্পারেচার নিতে আসবেন। কালো হইলেও উনার মেজাজ খুব খারাপ। যদি বলি আমার গরম লাগতেছে, উনি বলবেন, ক্যানো, ধাক্কা দিলেই তো জানলা খুইলা যাবে। যাও, নিজে খুলো গিয়া। গাঢ় নীল জামার অর্থ হইলো উনার তিন বছরের নার্সিং-এর ট্রেইনিং আছে। সাদা জামা- এখনো ট্রেইনিং চলতেছে। গোলাপী (fuchsia pink) জামা মানে ছয় বছরের ট্রেইনিং।

ব্লাড প্রেশার মাপার যন্ত্রটার রঙ নীল। প্রতিদিন প্রেশার মাপার সময় আমার খুব ভালো লাগে। হাতের উপর ক্যামন একটা ভারী চাপ পড়ে, তখন ঘুম ঘুম লাগতে থাকে অনেক। আঙ্গুলের মাথায় কাপড় শুকাইতে দেয়ার পেগের মত সাদা একটা ক্লিপ লাগান উনি, তাতে আঙ্গুলের মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। এরপর আমার পায়ের কাছে রাখা হলুদ রঙের লোহার বাক্সের ভিতর রাখা কাগজে লাল রঙের কলমে উনি আমার সিস্টোলিক আর ডায়াস্টোলিক প্রেশার টুকেন। একটা গ্রাফও আঁকেন। সেইটা কালো রঙের কলমে। আর টেম্পারেচার নীল কালিতে। সব নার্সের বুক-পকেটে সবসময় তিন রঙের তিনটা কলম থাকে। লোহার বাক্সো বুঝছি আমার পায়ের ধাক্কায় যখন নিচে পড়ছিলো তখন ঝনঝন আওয়াজ হইছিলো।

আমার হাসপাতালের নাম হুইপস ক্রস ইউনিভার্সিটি হসপিটাল। গতকালকে আমার লিমফনোড বায়োপ্সি করা হইছে। আমি ডক্টর ডয়েইটরে বলছি একটা লিমফনোড আমি সুভ্যেনিয়ার হিসাবে বাসায় নিয়া যাইতে পারবো কিনা। উনি হাসছেন, কিছু বলেন নাই। বুড়া এবং বুদ্ধিমান এবং ক্ষমতাওয়ালা লোকেরা দেখছি বেশিরভাগ প্রশ্নের উত্তর দেন হাসি দিয়া। আমি বুঝার চেষ্টা করতেছি দুনিয়াতে কত ধরনের হাসি আছে ও তারা কি কি বুঝান। সব ধরনের কান্নায় হয়তো কমন একটা দুঃখবোধ থাকে অন্যান্য আরো অনেক ফিলিংসের সাথে, কিন্তু সব হাসিতে তো কমন আনন্দ থাকে না!

ফেব্রুয়ারি ১২, ২০০৮

(যদি গতকালকে ১১ ফেব্রুয়ারি হয়ে থাকে)

আমার নাকে এখন একটা অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। অক্সিজেনের অদ্ভুত প্লাস্টিক প্লাস্টিক গন্ধ। আর ক্যামন আশ্চর্য ঠাণ্ডা! আমার মাথার কাছে উলটা করা টেস্ট টিউবের মতন দুইটা বোতল, যার মধ্যে লেখা—pressure range—350-500 kpa. USE NO OIL. এই বোতলগুলার ভিতর দিয়াই মনে হয় অক্সিজেন আসে। আমার ডান হাতের কনুইয়ের কাছে ভেইন ফুটা কইরা দুইটা ক্যানোলা লাগানো। একটায় সবুজ চাবি দেওয়া, অন্যটায় চাবি নাই, সেইটা দিয়া প্যারেন্টেরাল নিউট্রিশান (পি এন) আসতেছে। এই ক্যানোলার আরেক মাথা পি আই সি সি লাইন দিয়া বুকের মাঝখানের ভেইনে ঢুকছে। যখন পি এন দেওয়া শেষ হয়া যায় তখন এই লাইন স্যালাইন ওয়াটার বা অন্য কোনো এন্টি-ক্লটিং সলিউশান দিয়া ফ্লাশ করা হয়।

আমি ডোলারে জিগাইলাম স্যালাইন বানান কি। উনি বললেন SALINEও হইতে পারে, SALYNEও হইতে পারে। স্যালাইন হইলো পানিতে গুলানো সোডিয়াম ক্লোরাইড। যার রাসায়নিক সংকেত NaCl. যেহেতু সোডিয়ামের ল্যাটিন নাম ন্যাট্রিয়াম, তাই SoCl না হয়া রাসায়নিক নাম হইছে NaCl.

আমার গার্লিক চিয়াবাটা খাইতে ইচ্ছা করতেছে। তবে আমার বাটার ও চিজ খাওয়া নিষেধ। কোনো রকম আস্ত খাবার খাওয়াই আমার নিষেধ!


 

সেপ্টেম্বার ১, ২০১৪

মারা যাওয়া নিয়া আমার ভয় হয় না। অনেকবার মারা যাইতে যাইতেও শেষ মুহূর্তে যাওয়া হয় নাই বইলাই হয়তো মারা যাওয়ার জার্নি আমার কাছে ফ্রাঙ্কফুর্ত বা টিম্বাকটু বা মন্টিভিডো যাওয়ার জার্নির মতই মনে হয়।

টিম্বাকটু অবশ্য যাওয়া হয় নাই এখনো।

প্রথমবার যখন একলা একলা ফ্রাঙ্কফুর্ত যাইতেছি, তখন বেশ কিছু জার্মান শব্দ শিখছিলাম। তানিয়া আপু আমারে কইলেন, “মনে রাখিস, ফ্রলিন মানে হইলো মেয়ে।”

ফ্রলিন জাইনা আমার লাভটা কী? রাস্তায় হারায়ে গেলে চৌরাস্তার মোড়ে গিয়া বলবো, “হ্যালো, আমি একজন ফ্রলিন?”

জার্মানরা জাতি হিসাবে খুব নাকউঁচু। উনারা ইংরেজি জানলেও রাস্তাঘাটে কোনোদিন নিজের ভাষা ছাড়া অন্য কিছুতে কথা কইবেন না। লন্ডন হয়া ফ্রাঙ্কফুর্ত হান(য) এয়ারপোর্টে ঢুকতেছি, ইমিগ্রেশান অফিসার ও আমার নিম্নোক্ত কথোপকথন হইলো:

হালো, গুতেন টাগ! উই গেটস দিয়া (হ্যালো, গুড মর্নিং, ক্যামন আছো)?

হ্যালো, গুতেন টাগ। ইশ কান্ন নিশট স্পেরশেন দয়েশ (আমি জার্মান বলতে পারি না)

অফিসার, অত্যন্ত বিরক্ত হয়া, (ভাঙা ইংরেজিতে)—“তো কী করতে আসছো ফ্রাঙ্কফুর্তে? তোমার চুলের রঙ নীল কেন?”

আমি প্রশ্ন শুইনা কী উত্তর দিবো না বুইঝা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া দাঁড়ায় থাকলাম। অফিসার অবশ্য আমার উত্তরের আশায় বইসা ছিলেন এমন মনে হইলো না। আমার পাসপোর্টের পাতা উল্টাইতে উল্টাইতে কইলেন, “আচ্ছা, তুমি দয়েশল্যান্ড (জার্মানি) সম্পর্কে যা জানো তা তিন লাইনে বলো।”

তিন লাইনে বলতে হবে?

আচ্ছা আরেক লাইন বেশি নাও। চার লাইনে বল।

হু, আচ্ছা, দাঁড়াও মনে করি। তোমাদের রাজধানীর নাম বার্লিন। (অফিসার আঙুলে লাইন গুনতেছেন) তোমাদের জি ডি পি ওয়ার্ল্ডের চার নাম্বার আছে র‌্যাঙ্কিং-এ এবং ইউরোপের মধ্যে তোমাদের ইকোনমি সবচায়ে স্ট্রং। (দুই. আমি মনে করার চেষ্টা করলাম আর কী কী জানি হিটলার আর বিশ্বযুদ্ধ আর হোলি রোমান এম্পায়ার ছাড়া) আচ্ছা, তারপর, ম্যাক্স প্লাঙ্ক ও অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তোমাদের দেশের লোক। (তিন.) এবং বেথোফেন, মোৎজার্ট এবং বাখ সবাই তোমাদের মিউজিশিয়ান। (অফিসার হাসি হাসি মুখে এক হাতে চার আঙুল আর অন্য হাতের বুড়া আঙুলে দেখাইলেন, হইছে, আর লাগবে না।)

ম্যাক্স প্লাঙ্কটা কে?

থিওরেটিক্যাল ফিজিসিস্ট।

ফিজিসিস্ট কী? ডাক্তার? ফিজিও থেরাপিস্ট?

জ্বী না, ডাক্তার না, উনি বিজ্ঞানী। নোবেল প্রাইজ পাইছিলেন কোয়ান্টাম থিওরি লেখার জন্য। সাল মনে নাই।

কোয়ান্টাম থিওরি কী জিনিস? কী কাজে লাগে?

আমি কোয়ান্টাম ফিজিক্স কেমনে ব্যাখ্যা করবো ভাইবা কিছুক্ষণ উনার দিকে তাকায় কইলাম, “আমারে এত কিছু জিগাইতেছো ক্যানো, পিছের লোকরে জিগাও না।” আমি ঘুইরা পিছে দেখলাম, চেক শার্টের উপর ডাফল কোট পরা একজন পেটমোটা বয়স্ক ভদ্রলোক নাকের ডগায় চশমা ঠেকায়ে এক হাতে বিভিন্ন দিকে তাপ্পিমারা হ্যান্ড-লাগেজের হাতল ধইরা মোটা একটা বই পড়তে পড়তে কিছুক্ষণ পর পর আমাদের দিকে বিষদৃষ্টিপাত করিতেছেন।

অফিসার (ব্যাঁকা হইয়া পিছনে তাকায়া), “হ্যাঁ, ভালো কথা বলছো, ওরে কোয়ান্টাম থিওরি ব্যাখ্যা করতে বলবো, বই পড়তেছে অনেকক্ষণ ধইরা, অনেক জ্ঞানী মনে হয়—আচ্ছা তুমি যাও” বইলা আমার পাসপোর্টে স্ট্যাম্প মাইরা আমারে বিদায় দিলেন।

ইমিগ্রেশান অফিসারদের সাথে আমার যা যা কথা হইছে তাতে আমার ধারণা ছিল এইগুলাই উনারা নিশ্চয়ই জিগান সবাইরে। তারপর আমার বন্ধুদের এবং আত্মীয়দের মারফত জানলাম, না, উনাদের জিগানো হয়, কয়দিন উনারা এই দেশে থাকবেন, কোথায় কোন হোটেলে উঠবেন, কী কী কারণে এই দেশে আসছেন, ডিক্লেয়ার করার মত কোনো ক্যাশ বা অন্যান্য জিনিস আছে কিনা উনাদের সাথে ইত্যাদি। গত কয়েক বছরে ইমিগ্রেশান অফিসাররা আমার স্টকিং-এ ফুটা কেন, আমার হাতের ট্যাটু কোন ভাষায় লিখা, কপালের ফুটা করার সময় ব্যাথা লাগছিলো কিনা, নাকের নোলক সহ আমি নাক ঝাড়ি ক্যামনে, হাঁচি দেই কেমনে ইত্যাদি পারসোনাল প্রশ্ন ছাড়া আমারে আর যা যা জিগাইছেন তার একটা অসম্পূর্ণ তালিকা করলাম এইখানে।

  • তোমার বিড়াল ভালো লাগে না কুকুর ভালো লাগে?
  • পুরা এয়ারপোর্ট নন-স্মোকিং জোন হওয়ার পরেও এয়ারক্রাফটে নো-স্মোকিং সাইন কেন দেখায় বইলা তুমি মনে কর?
  • প্রযুক্তি যেইভাবে আগাইতেছে তাতে বাসার ইঙ্ক-জেট ও লেসার প্রিন্টার ভবিষ্যতে কেমন হবে বইলা তোমার ধারণা?
  • তুমি নিজেরে কোন প্রাণী হিসাবে বর্ণনা করো?
  • পৃথিবীতে মোট বইয়ের সংখ্যা কত?
  • মানুষ গয়না কেন পরে? গয়নার প্রচলন কবে এবং কেমনে হইলো?
  • পৃথিবীতে ফুলের চায়ে ফলের প্রয়োজন বেশি হওয়ার পরেও মানুষ ফুল ভালোবাসে কেন? ফুলের সাথে মানুষের কোন কোন ইমোশান কাজ করে?
  • সৌন্দর্যের সংজ্ঞা কী?
  • মানুষ নিজের অবস্থান ও পরিস্থিতি বদলাইতে না চাইলেও পোশাক এবং খাবারের ধরন প্রতিদিন বদলায় কেন?
  • তুমি আই-ফোন ইউজার না স্যামসাং ইউজার?
আমার বন্ধুরা উনারে এই গেঞ্জি গিফট করছেন। টি প্লাস কে মানে হইলো তিথি প্লাস করিম।
আমার বন্ধুরা উনারে এই গেঞ্জি গিফট করছেন। টি প্লাস কে মানে হইলো তিথি প্লাস করিম।

আমি এখন এয়ারপোর্ট যাওয়ার আগে সাধারণ জ্ঞানের একটা বই সাথে কইরা নিয়া যাই। কখন কোন জিনিস কাজে লাগে বলা যায় না।

আমার সাথে লোকজন উলটাপালটা কথা কেন বলে তার বিভিন্ন ব্যাখ্যা বিভিন্ন ভাবে বিশ্লেষণ করছি। কোনো ব্যাখ্যাই মনঃপূত হয় নাই।

ঢাকায় থাকতে আমরা বন্ধুরা দাদনের চায়ের দোকানে প্রতিদিন বিকালে আড্ডা দিতাম। দোকানের সামনেই আধা পাগল করিম কোমড়ে একটা শার্ট বাইন্ধা বইসা থাকতেন মাথায় হাত দিয়া।

অন্য সবার সাথে করিম খুব ভদ্র। হাসিমুখে মানুষরে উনারে এক কাপ চা ও একটা রুটি ও একটা কলা কিনা দিতে কইতেছেন, তারপর সেই কলা ও চা দাদনের কুকুর টাইগাররে খাওয়াইতেছেন—কোথাও কোনো সমস্যা নাই। খালি আমারে দেখলেই উনি লাফায়ে উঠতেন বসা থাইকে, হাত ঘুরায়ে ঘুরায়ে কইতেন, “পাত্থর, আছে, পাত্থর! পাত্থর বেইচা বিয়া করুম, ঐ তোরে পাত্থর বেইচা বিয়া করুম” তারপর হা হা কইরা হাসতে হাসতে দোকানের সামনে একটানা গোল গোল হইয়া ঘুরতে থাকতেন।

(কিস্তি ৫)