রকি রোড সানডে (৭)

উনার নাম ছিলো ছমিরন নেছা। প্রত্যেক ছেলে জন্মের সাথে সাথে এক হাত কইরা উনি খাঁটো হইছেন। উনি যখন মারা যান, তখন উনার উচ্চতা চার ফিট ছয় ইঞ্চি।

(আগের কিস্তি)

২৬ মার্চ, ২০১৫

লন্ডনে এপিং ফরেস্ট বইলা একটা জঙ্গলমত জায়গা আছে। লোকে বলে এইখানে নাকি ভূত দেখা যায়। গাড়ির গিয়ার নাকি বন্ধ কইরা হ্যান্ডব্রেকে দিয়া রাখলে ঢাল বাইয়া উপর দিকে উঠা শুরু করে।

ভূত বিষয়ে আমার বরাবর খুব আগ্রহ। ছোটবেলায় একবার সংসদ ভবনে ভিক্ষা করতে যাওয়ার অপরাধে আমার মাতাশ্রী আমারে বাসা থিকা বাইর কইরা দেন। সেই রাত্রেই আমি কানতে কানতে আমার ভিক্ষার্জিত ৮০ টাকা নিয়া মাদারীপুর পালায়ে চইলা আসি। মাদারীপুরে আমার ফুপুর শ্বশুড়বাড়ি। বাড়ির পিছনেই বিশাল বড় কবরস্থান। সেইখানেও নাকি ভূত-প্রেত থাকেন। তো আমি আমার ফুপাতো বোনের চাচাতো ভাই আলামিনের সাথে ১০০০ টাকা বাজি ধইরা সারারাত কবরস্থানে হাঁটাহাঁটি করলাম। ১০০০ টাকা সেই সময় আমার মত স্কুলপড়ুয়ার জন্য বিশাল অংকের টাকা।

ভূত দেখা হয় নাই, তবে কবরস্থানের ভিতরে নারিকেল গাছের তলা থিকা অনেকগুলা নারিকেল জোগাড় করা হইছিল সেই রাত্রে। পরে মাঝরাত্রে এলোমেলো শাড়ি পরা আলামিনের আম্মা চোখ কচলাইতে কচলাইতে পুকুর পাড়ে টিনের টয়লেটে ঢুকলে আমি আর আলামিন টয়লেটের টিনের দেওয়ালে সেই সব নারিকেল ছুইড়া মারছিলাম।

ভদ্রমহিলা ভূতের না কীসের ভয়ে কে জানে, তিন ঘণ্টা সেই টয়লেটে গিট্টু দিয়া বইসা ছিলেন। সকালের আজানের পরে উনি ঘামতে ঘামতে বাইর হইছিলেন সেই তিন ফিট বাই তিন ফিট ঘর থিকা।

আলামিনরে অবশ্য নিজের আম্মারে টয়লেটে আটকায় রাইখা ভূতের ভয় দেখাইতে মোটেও অনুতপ্ত হইতে দেখলাম না। ভদ্রমহিলা দৌড়াইতে দৌড়াইতে চীৎকার কইরা সবাইরে ডাকতে ডাকতে বাসায় ঢুকতে থাকলে আলামিন খুব ঘুম থিকা মাত্র উঠছেন এমন ভঙ্গি কইরা হাই তুলতে তুলতে উনারে হাঁসের মাংস এবং ডিমভাজি দিয়া পরোটা এবং দুধ-চা সহ সকালের নাস্তার অর্ডার দিলেন।

তো যাই হোক যা বলতেছিলাম, এপিং ফরেস্টে হ্যাং ম্যান হিল বইলা একটা বিশেষ তিন রাস্তার মোড়েই নাকি শুধু ঘটনাটা ঘটে! আপনি গাড়ি বন্ধ কইরা বইসা থাকবেন, গাড়ি উপরের দিকে ওঠা শুরু করবে।

sunday 1
“এপিং ফরেস্টে হ্যাং ম্যান হিল বইলা একটা বিশেষ তিন রাস্তার মোড়েই নাকি শুধু ঘটনাটা ঘটে!”

জিসাসের জন্মের ৫০০ বছর আগে থিকা এই ঘটনারে ভূতের কাণ্ড বইলা ব্যাখ্যা করছেন লোকাল মানুষেরা। তাদের ধারণা, এই রাস্তার শেষ মাথায় যেই ডাকাতরে ফাঁসিতে ঝুলায়ে মারা হইছিল, উনার ফাঁসির দড়ির টানেই নাকি গাড়ি উপর দিকে ওঠা শুরু করে! সেই সূত্রেই রাস্তার নাম হ্যাং ম্যান হিল।

কান পাইতা থাকলে নাকি এই এলাকায় কেটভেলনি ট্রাইবের মেয়েদের কান্নাও শোনা যায়, আকাশে চাঁদ না থাকলে তাদের অস্পষ্ট চেহারা দেখা যায় গাছের ফাঁকে ফাঁকে!

তার কয়েকশ’ বছর পরে কিংস ওক পাবের পিছনের পুকুরে একটা কমবয়সী মেয়ে পানিতে ডুইবা মারা যান। উনিও মরার পরে প্রতিরাত্রে এই এলাকায় ঘুরাঘুরি করেন বইলা শোনা যায়। উনার গায়ে ধাক্কা খাইয়া (!?) নাকি এই এলাকায় প্রচুর অ্যাক্সিডেন্টও হয় হরহামেশা।

আমি আর মার্ক গাড়ি নিয়া হ্যাং ম্যান হিল দেখতে গেছিলাম বেশ কয়েকবার। গাড়ি আসলেই উপরের দিকে উঠতে থাকে সেই বিষয়ে সন্দেহ নাই। তবে ভূত প্রেত কিছুই আমরা খুঁইজা পাই নাই। শুধুমাত্র বিশ্বাসীদের কাছে যেমন ঈশ্বর বা আল্লাহ আসেন, শুধুমাত্র বিশ্বাসীদেরকেই ভূতে ভয় দেখান নিশ্চয়!

হ্যাং ম্যান হিল, এপিং ফরেস্ট

হ্যাং ম্যান হিল এক ধরনের ম্যাগনেটিক বা গ্র্যাভিটি হিল। বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই বাইর করছেন, এই উপরে ওঠার ঘটনা একটা অপটিক্যাল ইলুশান ছাড়া আর কিছুই না। জঙ্গলের গাছপালা এমন ভাবে জন্মাইছে, যাতে রাস্তাসহ সবকিছু দেখলে মনে হবে, রাস্তা ঢাল বাইয়া উপরে উঠতেছে। আসলে রাস্তা নিচে নাইমা গেছে, যে কারণে গাড়িও নিচে নাইমা যায়।

ভূত দেখার আশায় আমি, মার্ক এবং লী ম্যাকব্রাইড লিভারপুলের ডোয়েইন রোড সেমেট্রিতে গত সপ্তায় রাত কাটাইছি দুইবার।

এই কবরস্থান মোটামুটি কুখ্যাত কবরস্থান। সতেরশ’ শতকের শুরুতে একবার পুরা কমিউনিটি ধরে ইহুদিদের মাইরা ফেলায়ে এইখানে কবর দেওয়া হইছিল বইলা গল্প চালু আছে। এরপর থিকা এই এলাকার চারদিকে রাত্রিবেলা নাকি বাচ্চার কান্না শোনা যায়, মহিলাদের রান্নার আর কাপড় ধোওয়ার আওয়াজ, রাত্রে ডিনারে বইসা স্বামী-স্ত্রী আলাপ করতেছেন এমন শব্দ, বাসনপত্র, ছুড়ি-চামচের ঝন ঝন, ভাইবোনের হাসাহাসি দৌড়াদৌড়ির আওয়াজ আসে কবরস্থানের ভিতর থিকা।

কবরস্থানের চারদিকে ইটের দেওয়ালের উপর মোটা তারের বেড়া। লী ম্যাকব্রাইডের সাথে কেনি অ্যাডামস বইলা আইরিশ এক ছেলের পরিচয় ছিল, যিনি টাকার বিনিময়ে বেড়া কাইটা আমাদের ভিতরে ঢুকায়ে দিছিলেন। কেনি অ্যাডামস ইংরেজি সাহিত্যে পড়ালেখা কইরা দিনের বেলা একটা কার্টে কইরা ফার্মার্স মার্কেটে ফুলকপি এবং ব্রকোলি বেচেন, রাত্রে করেন ভূত-প্রেতের বিজনেস। আমারে জানাইলেন, এই মারফত উনার আয়ও বেশ ভাল। হ্যালোউইন ছাড়াও সামারের সময় প্রচুর ছেলেমেয়েরা আসেন কবরস্থানে বইসা প্ল্যানচেট করতে। প্রেমিকরা প্রেমিকাদের নিয়া আসেন নিজের সাহস দেখাইতে। কেনি উনাদের বসার জন্য চাদর, লেপ, বালিশ জোগাড় কইরা দেন। মোমবাতি- টর্চ বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে ছাতা বা রেইনকোট, রাত্রে খাবার জন্য বিস্কিট, ক্রিস্প এবং পানির বোতল সেই সাথে কবরস্থানের সিকিউরিটি এড়াইয়া মানুষ ঢুকানো এবং বাইর কইরা দেওয়ার সার্ভিস তো আছেই।

আমরা সাথে কইরা ক্যাম্পিংয়ের জিনিস নিয়া গেছিলাম। লী ম্যাকব্রাইড তার সতের বছরের পুরানা ওইযা বোর্ড, কালো মোমবাতি ইত্যাদিও নিছিলেন। কেনি জানাইলেন, তার বিজনেসের শর্ত হইল, নিজস্ব জিনিস নিয়া আপনি কবরস্থানে ঢুকতে পারবেন না। শুধু বেড়া কাটায় উনার তেমন লাভ হয় না। সুতরাং আমাদের সমস্ত জিনিস গাড়িতে ফালায়ে কেনির চাদর, বালিশ, ক্রিম বিস্কিট আর ক্রিস্পের প্যাকেট, অরেঞ্জ জুসের কার্টন নিয়া ভিতরে ঢুকতে হইল।

এত কসরৎ কইরা ভিতরে ঢুকতে ঢুকতেই আমি আর মার্ক ক্লান্ত হইয়া দুই পাইন্ট অরেঞ্জ জুস খাইয়া লেপ কাঁথা বালিশ টাইনা নাক ডাকাইয়া ঘুমাইয়া গেছি। লী ম্যাকব্রাইড খালি চিজ অ্যান্ড অনিয়ন ফ্লেভারের ক্রিস্পের প্যাকেট আর কেনির টর্চসহ অফিসের কেইস ফাইল নিয়া নির্ঘুম বইসা ছিলেন সারারাত। আমি একটু পরপর ঘুম ভাইঙ্গা উনার ক্রিস্প খাওয়ার মচর মচর আওয়াজ শুনছি আর ভাবছি কতগুলা প্যাকেট নিয়া উনি ভূত দেখতে আসছেন?

শেষরাত্রের দিকে যখন চারদিকে কুয়াশা পড়তেছে, আমার হঠাৎ কী একটা শব্দে ঘুম ভাঙল। তাকায়ে দেখি, আমার সামনে মার্ক কাৎ হইয়া সারা শরীর লেপে ঢাইকা মুখ হা কইরা তখনো ঘুমাইতেছেন। আমার ডানদিকে লী ম্যাকব্রাইড, উনার বামহাতের সোনালী আর নীল রঙা নেইল ভার্নিশ লাগানো নখ দিয়া আমারে খামচায়ে ধইরা আছেন। শব্দে না, উনার লম্বা লম্বা নখের খোঁচাতেই আমার ঘুম ভাঙছে।

ল্যাবে এই নখ রাখা নিয়া খুব ঝামেলা হয়। ফলস নখের খুইলা পড়ার চান্স থাকায় আমরা যারা সিরিয়াস কেইস এবং ট্রেইস এভিডেন্স (বুলেট, রক্ত, সিমেন, চুল এবং কাপড়ের ফাইবার, ধুলা, কাচ ইত্যাদি) নিয়া কাজ করি, তাদের কারোরই নখে রঙ লাগানোর নিয়ম নাই। লী ম্যাকব্রাইড গ্যে হওয়ার সুবাদে সব জায়গা থিকা ডাবল সুবিধা আদায় করেন। এই নিয়া উনার লজ্জাও নাই। উনার যুক্তি হইল, গত কয়েক শতাব্দী যাবৎ হেটারোসেক্সুয়াল মানুষেরা ধর্মের নামে হোমোসেক্সুয়ালদের যেই অত্যাচার করছেন, তার ভগ্নাংশের শোধ উনি এইভাবে অতিরিক্ত সুবিধা আদায়ের মাধ্যমে তুইলা নিতেছেন।

এইসব খোঁড়া যুক্তি দিয়া উনি ল্যাবের পলিটিক্যালি কারেক্ট হইতে চাওয়া সিনিয়ার সায়েন্টিস্টদের কাছে পার পান বটে কিন্তু আমি, মার্ক এবং সারি রবিনসন উনার সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশানরে পাত্তা দেই না মোটেও। ল্যাবের ভিতর উনি অষুধ খায়ে ঘুমাইয়া পড়লে সারি রবিনসন নেইল ক্লিপারস দিয়া উনার ম্যানিকিওর করা সাধের নখ এবড়ো-খেবড়ো কইরা ছোট কইরা কাইটা দেন।

তো আমি ঘুম ঘুম চোখে লী’র নখ আমার হাত থিকা সরাইতে সরাইতে সামনে তাকায়ে দেখি এক প্যাঁচ দিয়ে একটা হালকা খয়েরি রঙা শাড়ি পইরা আমার দাদি বইসা আছেন একটু সামনের একটা কবরের পাথরের উপর। উনার হাতভর্তি ছোট ছোট লিচু সাইজের কমলা। আমি লী ম্যাকব্রাইডের দিকে তাকাইলাম। উনিও কি আমার দাদিরে দেখতে পাইতেছেন?

আমার দাদি মারা গেছেন আজকে থিকা এগারো বছর আগে।

rocky-rd-1
“এক প্যাঁচ দিয়ে একটা হালকা খয়েরি রঙা শাড়ি পইরা আমার দাদি বইসা আছেন একটু সামনের একটা কবরের পাথরের উপর। উনার হাতভর্তি ছোট ছোট লিচু সাইজের কমলা।” – অলঙ্করণ: নাদিয়া ইসলাম

 

২৭ মার্চ ২০১৫

আজকে ম্যাকডাওয়েল কেইসের কোর্ট হিয়ারিং ছিল। হিয়ারিং-এর মত বিরক্তিকর জিনিস আর হইতেই পারে না। সুদর্শন ডিফেন্স ব্যারিস্টাররা তাদের স্বভাবসুলভ প্যাঁচমার্কা কথা কইতে কইতে শব্দ নিয়া কেরদানি করতেই থাকেন, আর আপনি প্রসিকিউশান ব্যারিস্টারের পিছে বইসা একটানা হাই তুলতে তুলতে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস লিখতে লিখতে একটানা ক্যান্ডি ক্রাশ খেলেন।

মাইকেল ম্যাকডাওয়েলের ছোট ভাই জেমস ম্যাকডাওয়েলরে আনা হইছে উইটনেস বক্সে। উইটনেস বক্সে দাঁড়ানো লোকজনরে বেশিরভাগ সময় আমি কাঁচুমাঁচু ভঙ্গিতে কথা কইতে দেখছি। জেমস ম্যাকডাওয়েলের মধ্যে অবশ্য সেইরকম কিছু নাই। উনি কিছুক্ষণ দাঁড়ায়া থাইকেই জাজরে জিগাইলেন, এইখানে বসার সিস্টেম আছে নাকি। কতক্ষণ উনারে প্রশ্ন করা হবে তা যেহেতু উনার জানা নাই, তাই উনি পা ব্যথা না কইরা বসতে চান।

কোর্ট আশার চেয়ার আইনা দিলেন উনারে। উনি চেয়ারে বইসা সিলিংয়ের এর দিকে তাকায়ে থাকলেন একটানা। প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময়েও উনার চোখ সিলিং থিকা নিচে নামল না। প্রশ্নের উত্তরও যে উনি খুব সদিচ্ছায় দিলেন, তা না। প্রত্যেকটা প্রশ্ন দুইবার শুনলেন, তারপর হাই তুললেন, পানি খাইলেন, এরপর সিলিংয়ের দিকে চাইয়া নিচু স্বরে ভেইগ কিছু কথা বললেন। উনার ভঙ্গি দেইখা আমার সন্দেহ হইল উনি আদৌ জানেন কিনা, উনার বিরুদ্ধে মার্ডার কেইসের চার্জ। যদি প্রসিকিউশান মাইকেল ম্যাকডাওয়েলের মারা যাওয়ারে মার্ডার হিসাবে প্রমাণ করতে পারে, তাইলে উনার যাবজ্জীবন জেল হয়ে যাবে। উনিই প্রাইম এবং একমাত্র সাসপেক্ট। এবং সেই যাবজ্জীবনও বিশ থিকা পঁচিশ বছরের নিচে না। প্লাস উনার এর আগেও ক্রিমিনাল রেকর্ড ছিল। এর আগেও দুইবার উনি মারামারি এবং হাতাহাতি কইরা জেলে গেছেন অল্প কিছুদিনের জন্য।

আমি উনাদের কথাবার্তা শুনতে শুনতে আমার স্যুট এবং ফুল স্লিভ শার্টের ভিতর ঘামতে ঘামতে দাদির কথা ভাবতেছিলাম। আমার দাদি খুবই অদ্ভুত একজন মহিলা ছিলেন। অদ্ভুত সব জিনিস খাইতে ভালোবাসতেন উনি।

একবার রোজার মাসে ডালপুরি বানানোর মাখানো ময়দার ভিতর শুকনা ডালের সাথে ডালিমের দানা ভইরা ডালপুরি (নাকি ডালিমপুরি) বানাইছিলেন উনি। আমার পিতৃদেব সেই অখাদ্য খাইয়া দাদিরে বলছিলেন, “মা শোনেন, আপনি আর কোনোদিন রান্নাঘরে যাবেন না। আপনি কষ্ট করে রান্না করেন, আমি সেইটা চাই না।”

দাদি রান্নাঘরে নিয়মিতই যাইতেন। উলটাপালটা সব খাবার রান্না করতেন। আমরা যখন লিবিয়াতে থাকতাম, উনি তখন শাড়ি এবং ব্লাউজ বাদ দিয়ে শুধু পেটিকোট পিন্দা ঘরের বাইরে একটা লাঠি নিয়া চোখে কালো চশমা দিয়া রৌদ্রে বইসা থাকতেন। উনার ঝুইলা পড়া কুঁচকানো বুকের দিকে আমি চোখ ছোট কইরা তাকাইতাম। উনি বুকে রসুন মিশানো সরিষার তেল মাখতে মাখতে আমারে হাত ইশারায় ডাকতেন, “বুবু, ধইরা দেখবা? একদিন তোমার বুকও এমন হবে।”

আমার কোনোদিন উনার বুক ধইরা দেখার সাহস হয় নাই। উনারে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ভয় হইত খুব আমার। উনার হাড্ডিসার হাত পা, একদা কালো ছিলো এমন চামড়ার ব্যাগের ভিতর জমাইয়া রাখা তিনবছরের পুরানা শুঁটকি হইয়া যাওয়া কমলা, ছত্রাক পরা গুড়ের নাড়ু, উনার চুলের জবা-কুসুম তেল আর গায়ের রসুনের গন্ধ, উনার গভীর রাত্রে নাঁকি গলায় সূরা আর-রহমান পড়ার আওয়াজ—সবকিছুই খুব অন্য জগতের কিছু বইলা ভাবতাম ছোটবেলায়।

উনার নাম ছিলো ছমিরন নেছা। এগারো বছর বয়সে আমার দাদার সাথে বিয়া হয় উনার। উনার ভাষ্য অনুযায়ী বিয়ের দিন আমার দাদার কানের এক আঙুল নিচ পর্যন্ত লম্বা ছিলেন উনি। দাদা ছিলেন ছয় ফিট দুই ইঞ্চি লম্বা। এরপর প্রত্যেক ছেলে জন্মের সাথে সাথে এক হাত কইরা উনি খাঁটো হইছেন। উনি যখন মারা যান, তখন উনার উচ্চতা চার ফিট ছয় ইঞ্চি। আমার বাবারা ছিলেন ছয় ভাই। সুতরাং উনার দাবির বিপক্ষে যুক্তি দেওয়ার মত সায়েন্টিফিক কোনো ব্যাখ্যা আমার ছিল না!

প্রসেকিউশান ব্যারিস্টার জেমস ম্যাকডাওয়েলের স্ত্রী লুইস পাওয়েল-কুক’রে উইটনেস বক্সে আনছেন। লুইস পাওয়েল-কুক উনার স্বামীর সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্র। বক্সে ঢুইকাই উনি কান্নাকাটি চিৎকার চেঁচামেচি শুরু কইরা দিছেন।

আমার পাশে বসা সারি রবিনসন আমার কানে কানে ফিস ফিস কইরা কইলেন, “আমি নিশ্চিত, ঐ রাত্রে তোমাদের হেলুসিনেশ্যান হইছিলো কোনো একরকম! তোমরা সবাই তো ঐ কেনি অ্যাডামসের দেওয়া জিনিসপত্র খাইছিলা, তাই না? নিশ্চয় তোমাদের খাবারে ঐ ছেলে এ্যাম্ফেটামিন বা কোক বা এল-এস-ডি জাতীয় কিছু মিশায়ে দিছিলো।”

আমি সারি রবিনসনরে কিছু বলার আগেই লুইস পাওয়েল-কুক চিৎকার দিয়া বইলা উঠলেন, “আমি জানি জিমি (জেমস ম্যাকডাওয়েল) খুন করছে। জিমি আমাকেও মেরে ফেলবে, জিমিই খুন করছে মাইককে, আমি জানি, আমি জানি, আমি জানি।”

সুদর্শন ডিফেন্স ব্যারিস্টার এই কথা শুইনা বসা থিকা তৎক্ষণাৎ লাফ দিয়া উইঠা দাঁড়াইলেন, দর্শকের সারিতে বসা আত্মীয় স্বজনের দল একে অন্যের সাথে ফিসফাস শুরু করলেন, জাজ সাউন্ড ব্লকে গ্যাভেল বাড়ি দিয়া ভারি স্বরে কইলেন, অর্ডার ইন দ্যা কোর্ট, অর্ডার ইন দ্যা কোর্ট!

আমি আমার সুট্যের ভাঁজ ঠিক কইরা সোজা হইয়া বসলাম।

লুইস পাওয়েল-কুকরে যা প্রশ্ন করা হচ্ছে তার বাইরে কথা না কইতে নির্দেশ দেওয়া হইল। আমি আমার সামনের এক্সপার্ট উইটনেস স্টেইটমেন্ট আর ড্রাফট ইনডাইকমেন্টের ফাইলের পিছনে পেন্সিল দিয়া লিখলাম, “হেলুসিনেশ্যান সবার আলাদা আলাদা ভাবে হইলে আমি আর লী ম্যাকব্রাইড একই জিনিস দেখলাম কীভাবে?”

সারি রবিনসন লেখাটার দিকে একবার তাকায়ে কিছু না বইলা প্রসেকিউশান ব্যারিস্টারের প্রশ্নে মনোযোগ দিলেন।

৬ মে, ২০১৫

ড্যানিয়েল গ্যালাওয়ে গ্রিন এখন মার্কের বাসায় পাকাপাকিভাবে থাকেন। মার্কের বান্ধবী মার্করে ছাইড়া চইলা গেছেন গত বছর সেপ্টেম্বার মাসের নয় তারিখ। যখন ড্যানিয়েল হাসপাতাল থিকা পালাইয়া অন অ্যান্ড অফ ভাবে মার্কের বাসায় থাকা শুরু করছেন। মার্করে এই নিয়া মন খারাপ করতে দেখা যায় না। মার্ক এবং ট্রেইসি একসাথে ছিলেন এগারো বছর। উনারা একসাথে বাচ্চা নিবেন এমন প্ল্যানও করছিলেন। বাচ্চার নাম ঠিক করছিলেন, মেয়ে হইলে এলা, ছেলে হইলে বোডি।

আমার মনে আছে ট্রেইসি যখন আমাকে বাচ্চার নাম বলছেন, তখন আমি আধা মাতাল হয়ে হাসতে হাসতে উনাকে বলছিলাম, “আমাদের দেশে এক ধরনের ছুড়ি পাওয়া যায়, চাঁদের মত গোল, তারে আমরা বলি বটি। কেউ কেউ ভালোবাইসা বলেন, বোডি!”

ট্রেইসি উনার বিয়ারের গ্লাস এক হাতে ধইরা আরেক হাতে নিজের মুখের উপরের চুল সরাইতে সরাইতে রাস্তার পাশে বমি করতে করতে কইলেন, “তোমরা ভারতীয়রা খুব অদ্ভুত।”

ড্যানিয়েল মালদ্বীপ হইয়া ভারত এবং নেপাল হইয়া বাংলাদেশ গেছিলেন। ফেরৎ আসছেন গত মাসে। আমি খুব আগ্রহ নিয়া দেশের ভাল ভাল গল্প শুনতে মার্কের বাসায় গেলাম। বিদেশীদের কাছে দেশের গল্প শোনার মধ্যে শ্লাঘা টাইপের একটা ব্যাপার হয়। বিদেশীরা দেশে গিয়া লুঙ্গি পরেন, তা নিয়াও আমরা খুব উত্তেজিত হই। হাত দিয়া প্রিমিটিভ স্টাইলে ভাত খান, আঙুলের ফাঁক গইলা সেই ভাত প্লেটে গড়াইয়া পড়ে, তা দেইখা আমরা আহ্লাদী হাসি দেই। শিশুরা কোনো কাজ ভুল ভাবে করলে যেমন হাসা হয়, তেমন হাসি।

— তোমরা ভারতীয়দের ধারণা, সব সাদা চামড়ারাই খুব বড়লোক এবং নোংরা এবং আমরা সবাই অনৈতিক জীবন কাটাচ্ছি।

আমি হাত তুইলা বললাম, “আমি ভারতীয় না!”

— ঐ একই কথা। তোমরা নিজেদের মনে কর, তোমরাই সব জানো, জ্ঞান বিজ্ঞান তোমাদের আবিষ্কার। আমরা খালি বাণিজ্যের নামে তোমাদের দেশ থিকা সেইসব চুরি ডাকাতি কইরা নিয়া আসছি।

— তা তো কিছুটা সত্যিই। তোমাদের টাওয়ার অব লন্ডনে ভারতের কোহিনূর হীরা আইনা সাজায়ে রাখছো। সেই কোহিনূর আবার রাণীর সম্পত্তি এই ভাইবা বিদেশ থিকা লোকজন টাকা দিয়া তা দেইখাও যায়।

— সাদা চামড়া মানেই কি ধর্মহীন অনৈতিক জীবন?

— আমারে জিগাও ক্যান? আমি কি তোমার ধর্ম নিয়া প্রশ্ন করছি? তবে, নোংরা তো তোমরা অবশ্যই। হাইগা পানি নাও না, দূর থিকা তোমাদের গায়ে গুয়ের গন্ধ পাওয়া যায়।

সারি রবিনসন এতক্ষণ রান্নাঘরে ছিলেন। উনি কাগজের ডিসপোসেবল প্লেটে কইরা মাইক্রোওয়েভ পিৎজা আর মোৎজারেল্লা বাইট আইনা ড্যানরে জিগাইলেন, “বাংলাদেশের কী খাইতে তোমার সবচায়ে ভালো লাগছে?”

— মুড়ি নামের রাইস ক্রিস্পি। খাইতে ঝাল, এবং তার সাথে আরো অনেক জিনিস থাকে, এই যেমন পিঁয়াজ, গ্রিন চিলি, তারপর একরকমের ম্যাশ, ধনে পাতা, তেল, ব্ল্যাক সল্ট এইসব। রাস্তায় রাস্তায় বিক্রি হয়।

আমি বললাম, “ঐটা আলুর ম্যাশ না। একধরনের ডালের ম্যাশ। কেউ বলে ছোলা। কেউ বলে ঘুগনি।”

সারি রবিনসন জিগাইলেন, “আর কী?”

— আর শুধু বিকালবেলা পাওয়া যায়, এক ধরনের গোল প্যাস্টি, ভিতরে খুব অল্প ম্যাশ পটাটো থাকে, নাম পুরি। ফিলিশ মাছ ভাজা আর কমলা রঙের মিষ্টি ইয়োগার্ট দিয়া এই পুরি খাইতে খুব মজা।

আমি বললাম, “ফিলিশ না, ইলিশ মাছ।” ভাবলাম, দাদি বাঁইচা থাকলে ড্যানিয়েল গ্যালাওয়ে গ্রিনের সাথে উনার খুব বন্ধুত্ব হইতে পারত। উনারা একসঙ্গে উর্ধাঙ্গের কাপড় খুইলা চোখে কালা চশমা দিয়া রৌদ্রে বইসা থাকতে পারতেন।

মার্কের বাসা থিকা বাইর হইয়া আজকে পেটিকোট লেনের মার্কেটে গেছিলাম। আমরা মোৎজারেল্লা বাইট খাইতে খাইতে ‘রোমান হলিডে’ দেখতেছিলাম। সবাই এই মুভিরে এত ভাল বলে কেন তা অনেক চিন্তা কইরাও আমি বাইর করতে পারলাম না। রাজকুমারী একদিনের জন্য রাজপ্রাসাদ থিকা বাইর হইয়া সাধারণের সাথে মিশতেছেন, এই নিওরিয়ালিস্টিক ফ্যানটাসি গল্পটায় অড্রে হেপবার্ন আর গ্রেগরি পেক শেষমেশ আর সব বস্তাপঁচা রোমান্টিক কমেডি মুভির মত এক না হয়েও ডার্ক চকোলেটের মত বিটার-সুইট এক ধরনের এন্ড-নোট রাইখা যান, তাই হয়ত সবাই এরে ক্লাসিক বলেন। আমার কাছে ক্লাসিক ফ্লাসিক ভাল লাগে না। ক্লাসিকের সাথেই ক্লিশে শব্দটা পাশাপাশি হাঁটে নিশ্চয়!

sunday-2
“পেটিকোট লেনের মার্কেটে যে কত রকম জিনিস পাওয়া যায়! পুরানা ক্যামেরা, অদ্ভুত আকারের বেগুন, লেটিস, বুড়া মানুষের মুখের মত দেখতে কুমড়া…।”

পেটিকোট লেনের মার্কেটে যে কত রকম জিনিস পাওয়া যায়! পুরানা ক্যামেরা, অদ্ভুত আকারের বেগুন, লেটিস, বুড়া মানুষের মুখের মত দেখতে কুমড়া, পেঁয়াজের আঁচার, ভিনিগারের বোতলে সিদ্ধ ডিম, ভাগ্য বদলানোর চকমকা ক্রিস্টাল, গাঢ় হলুদ আর খয়েরী রঙের আফ্রিকান বিছানার চাদরের গায়ে কালো সুতা দিয়া সিলাই করা চোখের মত জ্বলজ্বলা কাচের পুঁতি—দেইখা আপনি ভাববেন, এর উপ্রে মানুষ ঘুমায় ক্যামনে—তারপর—প্লাস্টিকের মতো চকচকা পাঁকা কলা এক বোলে, যতগুলাই থাকুক না কেন দাম এক পাউন্ড—তারপর—চাইনিজ শুঁটকি, মেব্যেল হেলেন কলিংউডের চুলের মত প্যাকেট করা কিড়ি কিড়ি সাদা নুডলস, আর কত কত কাপড়! কত রকম ডিসাইন, কত রকম ছাঁট, কত রকম রঙ! শরীরের কত অংশের জন্য কত বিভিন্ন রকম কাপড়! কুকুরের জন্য কাপড়, বিড়ালের জন্য কাপড়, শোয়ার জন্য, সোফায় বসার জন্য, ঘরের পর্দা দেওয়ার জন্য, পায়ের জন্য, হাতের জন্য, মাথার জন্য, গলার জন্য কাপড়! আমি ঘুরি আর ভাবি, দুনিয়াতে কত হাজার বিলিয়ন গজ কাপড় আছে! এতশ’ কাপড় দিয়া পৃথিবীরেও আর সূর্যরেও আর চাঁদরেও নিশ্চয় দুই তিনবার প্যাঁচায়ে ফেলা সম্ভব হবে।

পেটিকোট লেন মার্কেট

— গুড আফটারনুন মিস! উড ইউ লাইক সাম হেল্প?

আমি কাপড় দিয়া সূর্য প্যাঁচানোর দৃশ্য কল্পনা করতে করতে নিজেই হাসতে হাসতে দাঁড়ায়ে গেছিলাম একটা ফুলের দোকানের সামনে। দোকানের কাঠের সিঁড়িমত ডিসপ্লেতে টিনের জারের ভিতর পানিতে নানা রকমের ডাণ্ডাওয়ালা পাতাওয়ালা কাঁটাওয়ালা কাঁটাহীন নানা রঙের ফুল। জারের পাশে লাল রঙের প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়া আট-নয়-দশ বছরের কোঁকড়ানো কালচে বাদামী চুলওয়ালা একজন মিডিল ইস্টার্ন বাচ্চা ছেলে বইসা আছেন।

বাচ্চা ছেলেদের বয়স বুঝা খুবই কঠিন কাজ। আমি হাসলাম।

— আইয়্যাম ফাইন, থ্যাঙ্ক ইউ!

— কুল! উড উই লাইক সাম ডেইজি’স দেন? দে আর দ্যা মোস্ট ফ্রেন্ডলিয়েস্ট ফ্লাওয়ার এভার!

— ইউ কান্ট ইউজ ‘মোস্ট’ অ্যান্ড ‘ফ্রেন্ডলিয়েস্ট’ অন আ সেইম সেন্টেন্স! দে আর সুপারলেটিভ এ্যা’জেকটিভস! অ্যান্ড—ডু আই লুক লাইক আ পারসন ইন নিড অভ আ ফ্রেন্ড?

— আই ডোন্ট নো! এভরিবডি নিডস আ ফ্রেন্ড, আই গেস! থ্যাঙ্কস ফর দ্যা গ্রামার টিপ!

— ডু ইউ হ্যাভ আ ফ্রেন্ড?

— ইয়েস, আই হ্যাভ আ রিভার।

nadia-234
“এভরিবডি নিডস আ ফ্রেন্ড, আই গেস! থ্যাঙ্কস ফর দ্যা গ্রামার টিপ!” – অলঙ্করণ: নাদিয়া ইসলাম

দোকানের পিছন থিকা বাচ্চা ছেলের পেটমোটা বাপ উদয় হইলেন সেই মুহূর্তে। উনি ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে আমারে জিগাইলেন, উনার পোলা আমারে ডিস্টার্ব দিচ্ছেন কিনা কোনো। আমি কইলাম, “জ্বী না!” তবে উনি যেন পোলারে দিয়া ফ্রি চাইল্ড লেবার না করাইয়া কবি বা লেখক বানানোর কোর্সে ভর্তি করায়ে দেন সেই বিনামূল্য পরামর্শও দিলাম উনারে। দোকানদার ভদ্রলোক ছেলের দিকে একবার তাকাইয়া আমার দিকে আরেকবার তাকাইয়া বিরস হাসি দিলেন। আমি ডেইজি না কিনা দোকানের সামনে থিকা সইরা গেলাম।

আমার একজন পাগল কবি বন্ধু ছিলেন। মানে কবিদের যেমন পাগল হওয়ার রোমান্টিক বাসনা থাকে, তেমন পাগল না। উনি আসল পাগল, অর্থাৎ স্কিৎজোফ্রেনিক ছিলেন। উনি ভাবতেন উনি এম-আই-সিক্সে কাজ করেন। লিভারপুল স্ট্রিটের বাইরে করনিশ প্যাস্টির দোকানের বাইরে বড় বড় মোটা তাজা বেয়াদব কবুতরদের আলু ভাজা খাওয়াইতে খাওয়াইতে আমারে ফিস ফিস কইরা বলছিলেন, এই দেশে আন্ডারগ্রাউন্ডে শুধু ট্রেন চলে না। তার তলা দিয়া সরকারী কাজ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও আগে ব্রিটিশ সরকার লন্ডনের মাটির তলায় গোপন সুড়ঙ্গ বানায়ে রাখছেন নিউক্লিয়ার অ্যাটাকের ভয়ে।

— তুমি একদিন অলডগেইট স্টেশানে আমার সাথে দেখা করো! রাত সাড়ে এগারটার দিকে। ট্রেন চলা বন্ধ হয়ে গেলে আমি তোমারে টানেলের ভিতর নিয়া যাব।

— সব স্টেশানেই তো সিকিউরিটি গার্ড থাকেন। আর চারদিকে সি-সি-ক্যামেরা!

— আমার ঐসব জানা আছে। অলডগেইট স্টেশানের তলাতেই চারটা পাঁচটা দরজা আছে। ওরা গার্ড দিয়া বন্ধ কইরা রাখে। কী আছে ওদের এত গোপন করার?

— একটা দেশের সরকার তার সব তথ্য নিশ্চয়ই বাইরে লিফলেট আকারে বিলি করবে না। সরকারের ইন্টিমেট তথ্য থাকা তো স্বাভাবিক।

— হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি তো সরকারের হয়েই কাজ করি। এইসব আমি জানি। কিন্তু স্টেশানের তলায় কী? ঐখানে ওদের কী ব্যবসা? তুমি একটা কবিতা শুনবা?

কবিতা-টবিতা আমার সহ্য হয় না। মাথা ব্যাঁকা কইরা চোখ বন্ধ কইরা খুব আবেগ নিয়া কেউ কিছু বলা শুরু করলেই আমার হাসি আসতে থাকে।

নিকোলাস পাওয়ারের সাথে আমার এই অলডগেইট স্টেশানের বাইরেই পরিচয়। আমি গেছিলাম রয়্যাল লন্ডন হাসপাতালে আমার এক বাঙালী বন্ধুর বাচ্চা হওয়া উপলক্ষ্যে। সেই সময় আমি বিড়ি খাইতাম। বাঙালীরা মেয়েদের বিড়ি খাওয়ার দৃশ্য সহ্য করতে পারেন না বইলা হাসপাতাল থিকা বাইর হইয়া স্টেশানের বাইরে আইসা বিড়ি ধরাইছি। নিকোলাস পাওয়ার আমার ঠিক পাশেই উনার কালো রঙের কুকুর ‘জাফা কেক’রে একটা কম্বল জড়াইয়া বইসা ছিলেন।

উনি নিজের হাত বাড়াইয়া পরিচয় দিলেন। কুকুরের সাথেও পরিচয় করাইয়া দিলেন। আমিও নিজের নাম বললাম। উনি জিগাইলেন, আমি কবিতা শুনতে চাই কিনা।

— কিছুক্ষণ আগেই একটা লিখছি! ওয়ান্স আই কিস ইউ, সিমস লাইক ইউ মিসড দ্যা লাস্ট ওয়ান ইউ ডিজার্ভ, ওয়ান্স আই…

— জ্বী না ধন্যবাদ। আজকে না। আরেক দিন। আমার খুব তাড়া আছে আজকে।

— ওকে, তাহলে তোমার ফোন নাম্বার দাও। তোমারে আমি কবিতাটা লিখে টেক্সট করব।

আমি রাস্তাঘাটে কাউরে ফোন নাম্বার দেই না। রাস্তায় বইসা কুকুর নিয়া ভিক্ষা করতেছেন এমন কবিরে তো অবশ্যই দেই না। কিন্তু কী ভাইবা জানি উনারে নাম্বার দিলাম। উনি সবুজ চেক শার্টের পকেট থিকা এক টুকরা কাগজ এবং কম্বলের কোন এক ভাঁজ থিকা একটা মাথাভাঙা পেন্সিল দিলেন আমারে। আমি হাতের উপর সেই কাগজ রাইখা শিষবিহীন পেন্সিল দিয়া নাম্বার লিখা উনার শার্টের পকেটে ঢুকায়ে দিলাম। উনি জানাইলেন, আমারে কবিতা টেক্সট করবেন।

কবিতা বা অতিরিক্ত আবেগওয়ালা কোনো কিছুই আমার ভালো লাগে না। তবে অনেক আগে উৎপলকুমার বসুর একটা কবিতা পড়ছিলাম। ডায়েরিতেও লিখা রাখছিলাম সেই কবিতা।

মন মানে না বৃষ্টি হলো এত
সমস্ত রাত ডুবো-নদীর পারে
আমি তোমার স্বপ্নে-পাওয়া আঙুল
স্পর্শ করি জলের অধিকারে।

নিকোলাস পাওয়ারের কবিতার অপেক্ষায় ছিলাম তিন বছর। উনার নাম্বার আমার কাছে ছিল না। অলডগেইট স্টেশানের বাইরেও উনারে খুঁইজা পাই না। বছর তিন পর ব্রিস্টলে গেছিলাম আমার ঢাকার বন্ধু রিয়াজের সাথে দেখা করতে। রিয়াজ তখন ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটিতে পড়তেন। সকাল বেলা কোচ স্টেশান থিকা চোখ কচলাইতে কচলাইতে বাইর হওয়ার পথে আবার দেখলাম নিকোলাস সাহেবরে। একই ভঙ্গিতে ‘জাফা কেক’রে পাশে নিয়া বইসা আছেন। একই সবুজ চেক শার্ট গায়ে। একই রকম চুল, একই রকম দাড়ি। একই কম্বল।

যেন তিন বছর গত সপ্তায় পার হইছে, এমন ভঙ্গিতে উনি হাত বাড়ায়ে বললেন, “গুড টু সি ইউ নাদিয়া। আসো একটা কবিতা শুনাই।”

(কিস্তি ৮)

More from নাদিয়া ইসলাম

রকি রোড সানডে (২)

বুড়িরে বললাম, আমার তো নাইমে যাইতে হবে। আপনার গল্পটা তো শুনা হইলো...
Read More