(আগের কিস্তি)

২০ জুন, ২০১৫
ড্যানিয়েল মাথা সামনে ঝুঁকায়ে আমারে জিগাইলেন, পাগল মানুষ কেন জন্ম নেয় ন্যাডস?

আমি, লী এবং সারি রবিনসন গত সপ্তাহে মার্কের বাসায় আসছি মদ খাইতে ও কার্ড খেলতে। ড্যানিয়েল প্রায় এক বছর হইল এই বাসাতেই থাকেন এখন, বলছিলাম মনে হয় আগেই। শনিবার রাত্রি হচ্ছে ‘কারি নাইট’। বাঙালী হিসাবে ইংলিশ মানুষের হাতে রান্না করা ‘কারি’ খাইতে আমার অদ্ভুত লাগার কথা। তা লাগে না। মার্ক উনার কারিতে ইচ্ছামত গুঁড়া হলুদ দেন, ইন্ডিয়ান শপ থিকা কিনা ‘শান টিক্কা মাসালা’র প্যাকেট শেষ করেন, লাল রঙের মরিচের পেটের মাঝখান থিকা কাইটা তার বিচি ফালান। গ্লাভস পরা হাতে সেইগুলারে কুঁচি কইরা কাইটা তার সাথে হাড়ছাড়া মুরগীর বুকের মাংস বা স্ক্যালোপস বা অক্টোপাসের টুকরা দিয়া লাল রঙের গোল একটা ননস্টিক কড়াইয়ে কড়া আঁচে ভাজেন। সবশেষে তাতে ফ্যাট ফ্রি দই এবং চিনি এবং ধইনা পাতা দেন।

আমরা কারি নামের সেই সো-কলড বাঙালী খাদ্য একই সঙ্গে ভাত এবং মোটা মোটা নানরুটি এবং হলুদ রঙের পাপাডম দিয়া খাই।

—আমি জানি না কেন জন্মায়। কেউ পাগল হিসাবেই জন্মায়, নাকি জন্মানোর পর পাগল হয়—তাও জানি না।

—কী কারণে মানুষ পাগল হয় তা জানো?

—না, জানি না। আমি দুনিয়ার বেশিরভাগ রহস্যই জানি না। আমারে জিগাও কেন?

—আমার মনে হয় আমি পাগল হয়ে যাইতেছি। মাথার ভিতর অনেকগুলি মানুষের গলা শুনি সারাদিন!

সারি রবিনসন বললেন, সেইটা আমিও শুনি। ধরো, আমি মিথ্যা কথা বললেই আমার মাথার ভিতর থাইকা আরেকটা গলা শুনতে থাকি, ঠিক হচ্ছে না ঠিক হচ্ছে না টাইপ কথাবার্তা।

লী কাগজের ন্যাপকিনে ঠোঁট মুছতে মুছতে কইলেন, হানি, তোমার মাথার ভিতর জেমিনি দ্যা ক্রিকেট আছে!

—কে আছে?

—জেমিনি, ঐ যে পিনোকিওর বিবেক ঝিঁঝি পোকা!

ড্যানিয়েল মাথা নাড়লেন। “ঐরকম না। মিথ্যা বলায় আমার কিছু যায় আসে না। সত্য মিথ্যা সব পার্সপেকটিভের জিনিস। আমি অনেকগুলা আলাদা আলাদা মানুষের গলা শুনি মাথার ভিতর। অনেকটা স্বপ্নের মতন। ইনফিনিট একটা স্বপ্নের মতন।”

মার্ক সবার হাত থিকা প্লেট নিয়া সিঙ্কে জড়ো করতে করতে কইলেন, “স্যানিটি আর ইনস্যানিটি মানুষের মধ্যে খুব র‍্যানডমলি দিয়ে দেওয়া হইছে বলে মনে হয় আমার।”

আমি সেইদিন রাত্রে বাসায় আসার সময় খালি ট্রেইনে বইসা স্যানিটি এবং ইনস্যানিটি নিয়া ভাবলাম। আমি যখন টিনএজার, তখন একদিন বাসায় কাজী শাহনূর হোসেনের প্রকাশনী থিকা মহাজাতক বইলা এক ভদ্রলোকের লেখা আর ধ্রুব এষের প্রচ্ছদ আঁকা একটা বই পাই, নাম হইল ‘কোয়ান্টাম মেথড’। আমার বড় ভাই সেই বই উল্টায়ে পাল্টায়ে দেইখা খুব বিরক্তি নিয়া বিছানায় ছুঁইড়া ফেইলা বললেন, “রাবিশ!” এরপর আমার দিকে ঘুইরা বললেন, “তোমার এইসব আজেবাজে জিনিস পড়া লাগবে না। বুঝছো?”

তাতে আমার মনে হইল এই বই নিশ্চয় খুব অমূল্য রত্ন টাইপের কিছু একটা হবে। বড় ভাই চইলা গেলে আমি সেই কোয়ান্টাম মেথডরে সযত্নে রঙিন ক্যালেন্ডারের পাতা এবং সেলোটেপ দিয়া মুড়াইয়া তার উপরে কালো মার্কার পেন দিয়া লিখলাম, ‘সমাজ বিজ্ঞান’। তারপর তারে খাটের ম্যাট্রেসের নিচে চাপা দিয়া রাইখা দিলাম। আমার বড় ভাইয়ের মধ্যে ‘বড়ভাই’-সুলভ খবরদারী সবসময়েই বেশি। উনি এবং আমার মাতৃদেব মাসুদ রানা   পড়তেছেন, আমি পড়তে পারবো না। সুনীল গঙ্গোপধ্যায়ের এলোকেশী আশ্রম   অথবা বুদ্ধদেব গুহর একটু উষ্ণতার জন্য   উনারা পড়তে পারবেন, আমি পারবো না। আমার মা’র অবশ্য আমি কী বই পড়ি তা নিয়া মাথাব্যথা ছিল না। ছিল আমার বড়ভাইয়ের।

quantummethod1
“বড় ভাই চইলা গেলে আমি সেই কোয়ান্টাম মেথডরে সযত্নে রঙিন ক্যালেন্ডারের পাতা এবং সেলোটেপ দিয়া মুড়াইয়া তার উপরে কালো মার্কার পেন দিয়া লিখলাম, ‘সমাজ বিজ্ঞান’।”

অবশ্য এইজন্য আমি ভাইয়ার কাছে কৃতজ্ঞ। উনি না আটকাইতে চাইলে আমি এইসব বই পড়তামও না, এবং না পড়লে থার্ডক্লাস সাহিত্য কী জিনিস তাও বুঝতাম না। তো যাই হোক, আমি ‘সমাজ বিজ্ঞান’ বই দেইখা কিছুদিন মেডিটেশান করলাম। তাতে আমার ঘুমের পরিমাণ বাড়া ছাড়া আর তেমন কিছুই হইল না। এর কিছুদিন পরে আমার পাশের বাসার লাকি আপার বুকশেলফে পাইলাম জেন মেডিটেশানের আধা নাই হইয়া যাওয়া একখান বই। লাকি আপা উনার বড়বোনের ছেলের ডায়াপার চেন্জ করতে করতে হাগামাখা হাত নাড়াইয়া আমারে কইলেন, “নিয়ে যাও, কোনো সমস্যা নেই। মা বুকশেলফটা বেঁচে দিবেন। উঁই পোকা তাকশুদ্ধ খেয়ে ফেলছে—।”

উঁই পোকাসুদ্ধা বুকশেলফ কার কাছে বেচবেন এই চিন্তা করতে করতে আমি মেডিটেশান শুরু করলাম। উঁই পোকারা নতুন বাসায় গিয়াও তাক খাবেন কিনা সেইটাও আমার জিজ্ঞাসা ছিল।

এর প্রায় মাসখানেক পর একদিন আমার হঠাৎ মনে হইল, আমার এইপাশের লাইফ খুব ডাল এবং বোরিং। অন্যদিকে আমার মাথার ভিতরের লাইফেই মজা অনেক। মেডিটেশান কইরা আমার মনের ভিতর ইচ্ছামত রাস্তা বানাইতে পারি, ইচ্ছামত বাপ এবং বড় ভাই বানাইতে পারি, ইচ্ছামত আমার ঘর সাজাইতে পারি, যেইখানে ঘরের মাঝখানে রেসলার স্টিভ অস্টিনের ছবি লাগাইলে বাপ চোখ গরম কইরা কন না, “এরকম বিকৃত রুচির হাফ নেকেড একটা মানুষের ছবি লাগাইছো কী হিসাবে?”

ইচ্ছামত নিজেরে বেস্ট ডিরেক্টর বেস্ট অ্যাক্ট্রেসের বেস্ট সিনেমাটোগ্রাফারের অস্কার দিতে পারি, পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দিতে পারি, ইচ্ছামত নিজেরে একদিন সাহিত্যিক, একদিন চিকিৎসক, একদিন সমাজসেবক, একদিন দুনিয়ার সবচাইতে বড়লোক বানাইতে পারি।

আমার ফ্যামিলির সবার অবশ্য ধারণা হইল আমি পাগল হইয়া গেছি। আমার বড় খালুরে জরুরি তলব দিয়া আনা হইল বাসায়। যেহেতু উনি বুয়েটের প্রো-ভিসি, সুতরাং উনার জ্ঞান সবচাইতে বেশি হবে এমনই নিশ্চয় সবাই ভাবছিলেন। উনি গম্ভীর চালে জুতা পিন্দা মচমচাইয়া আমার ঘরে ঢুইকা আমার দেয়ালের অর্ধনগ্ন পোস্টার দেখলেন, পড়ার টেবিলের পিছনে প্রিন্টারের কালি ভরার খালি সিরিন্জ আবিষ্কার করলেন এবং ‘এশিয়ান স্কাই শপ’ থিকা কিনা আমার এক্সারসাইজ মেশিনের কিছু গোলাপিরঙা ইলাস্টিক ব্যান্ড পাইলেন। এরপর উনি লিভিং রুমে গিয়া আমার বাপ এবং মা’রে কইলেন আমি ড্রাগ অ্যাডিক্ট হইয়া পাগল হইয়া গেছি। আমার ঘরে সিরিন্জ এবং রাবার ব্যান্ড পাওয়া গেছে। খাটের তলা সার্চ করলে ড্রাগও পাওয়া যাইতে পারে। (উনি যেহেতু মোটা মানুষ, তাই খাটের তলায় উঁকি দিতে পারেন নাই মনে হয়। খাটের তলায় ছিল আমার গোপন এবং নিষিদ্ধ বই অর্থাৎ মাসুদ রানার লাইব্রেরি। ঐ জিনিস ধরা পরলে কী হইত তা চিন্তা কইরা পাইতেছি না!)

এরপর বড় খালুর পরামর্শে উনার বাড়িতে ফোনবিহীন, কম্পিউটারবিহীন, বইবিহীন, গানবিহীন, মানুষবিহীন, বাইরে-যাওয়া-বিহীন আট ফিট বাই দশ ফিট একটা সাদা ঘরে আমারে আটকাইয়া রাখা হইল। তখন আমি সারাদিন মাথার ভিতর অনেক মানুষের উঁচু স্বর নিচু স্বরের কথা শুনতে পাইতাম। নিয়মিত মনে হইত আমি ইনসেইন হয়ে যাইতেছি। মেডিটেশান করলেও আমার আমারে আর তখন ‘আমি’ মনে হইত না। মনে হইত অন্য একটা মানুষের শরীরের ভিতর আমি কোনো এক ফুঁটাফাটি দিয়া ঢুইকা আটকায়ে গেছি এবং শরীরের মাঝখানে বড় সাইজের একটা গর্ত না করতে পারলে আমি আর সারাজীবন এইখান থিকা বাইর হইতে পারব না। তো আমার জেলখানায় ছুড়ি কাঁচির অ্যাক্সেস না থাকায় শরীরের মাঝখানে ফুটা করার উদ্দেশ্যে আমি একদিন বাথরুমে গিয়া আধা বোতল হারপিক খায়ে ফেললাম।

তাতে আমার মুখের ভিতরের, ইসোফেগাসের এবং স্টমাকের টিস্যুর দেয়াল অক্সিডাইজড হইয়া স্টমাক ওয়াশের মত জীবনের সবচাইতে জঘন্য এক্সপেরিয়েন্সের ভিতর দিয়া যাওয়া বাদে কাজের কাজ যা হইলো: তা হইল—আমার ফাদার সাহেব বড় খালুর কথাবার্তা শোনা বন্ধ কইরা আমারে ছল ছল চোখে তৎক্ষণাৎ নিজের বাড়িতে নিজের ঘরে ফেরত নিয়া গেলেন, এবং সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইটের পরিষ্কারের গুণে আমার মাথার ভিতরের মানুষরাও গায়েব হইয়া গেলেন।

আমি ভাবলাম, ড্যানিয়েলরে বাথরুম পরিষ্কারের ব্লিচ খাইতে বলা যাইতে পারে।

২১ জুন, ২০১৫
রবিবার আমার খুব প্রিয় দিন। আজকে ঘুম থিকা উইঠা দেখলাম রঞ্জু আমার জন্য এ্যামেরিকান প্যানকেক বানাইছেন। আমি ফেইসবুকে দেওয়ার জন্য প্যানকেকের ছবি তুললাম। এরপর মেপল সিরাপ সমেত প্যানকেক এবং ব্যানানা মিল্কশেক খায়ে আমরা দুইজন হাঁটতে বাইর হইলাম। আমার বাসার একটু সামনে ১৩০ একর জায়গা নিয়া ভ্যালেন্টাইন পার্ক। আমরা পার্কের লেকে হাঁসদের বাদাম খাওয়াইলাম বেশ কিছুক্ষণ। হাঁসরা খোসাসহই বাদাম খান। হাঁসদের দেখাদেখি আমিও খোসাসহ একটা বাদাম খাইতে গিয়া খোসা গলায় আটকাইয়া কাশাকাশি কইরা নাকের পানি চোখের পানি এক করলাম। রঞ্জু আমার থিকা দূরে গিয়া আমার গাধামি দেইখা হাসতেছিলেন। আমাদের সামনেই বেশ বয়স্ক ইন্ডিয়ান এক কাপল বেশ অনেকক্ষণ যাবৎ পলিথিনের ব্যাগ থিকা কতগুলি ফাঙ্গাস পড়া সবুজ আর ছাইরঙা পাউরুটি বাইর কইরা ছুঁইড়া দিতেছিলেন হাঁসদের দিকে । হাঁসরাও খারাপ ভালো বোঝেন। উনারা ইন্ডিয়ান ফাঙ্গাস এড়াইয়াই আমাদের বাদাম খাইলেন।

nadia_8a
আমি ও হাঁসগণ

আমার কাশাকাশি দেইখা ইন্ডিয়ান ভদ্রমহিলা আগায়ে আইসা আমারে উনার হাতের পানির বোতল আগাইয়া দিলেন।

—আর ইউ অলরাইট্ট, বেটা? ড্রিংক সাম ওয়াটার, নো? ইট্ট ইজ আ নিউ বট্টল—।

আমি “না, ধন্যবাদ” বইলা ভয়ে ভয়ে মাথা নাড়লাম। কী জানি বিশ্বাস নাই উনাদের, পরে দেখা যাবে এই পানি খাইয়া আমার জন্ডিস হইছে, হয়ত এই লেক থিকাই পানি জোগাড় করছেন উনারা।

পশুপাখিদের যারা নিজেরা খাবেন না এমন নষ্ট হওয়া রুটি খাওয়াইয়া জীবে দয়া কইরা পূণ্য অর্জনের চিন্তা করতে পারেন, তারা অনেক কিছুই পারেন নিশ্চয়।

আমার এর আগেও জন্ডিস হইছিল একবার। সেইবার জন্ডিস চলাকালীন আমার পিতৃদেবের চাচাতো বোনের বাসায় একটা আস্ত তরমুজ খায়ে আমি খুব বমি করছিলাম, তারপর আমি বাথরুমে গেলে আমার সেই ফুপু আমার মা’রে ফোন কইরা ফিস ফিস কইরা বলছিলেন, “মাসুম, তোমার মেয়ের কোনো বয়ফ্রেন্ড আছে, জানো? এত বমি করছে সেই কখন থেকে—প্রেগনেন্ট ফেগনেন্ট নাকি?”

আমার মা’র ডাক নাম মাসুম। আমার খালাদের নাম রুমি ঝুমি টাইপ। শুধু আমার মায়ের নাম মাসুম। আমার বাপ উনার বিয়ার আগে আমার নানাবাড়ি ফোন করতেন আমার মা’র সাথে কথা কওনের জন্য। সেইটা ১৯৭৬-৭৭ সালের কথা, যখন বাংলাদেশে ম্যানুয়াল টেলিফোন এক্সচেন্জ ছিল। এইরকম পাবলিক সুইচড টেলিফোন নেটওয়ার্কের প্রধান অংশ ছিল টেলিফোন সুইচবোর্ড। এবং এই সুইচবোর্ডের অপারেটররা একপাশ থিকা একজন ফোন নাম্বার ডায়াল করলে সুইচ বা কর্ডের কানেকশানের মাধ্যমে অন্যপাশে সংযোগ ঘটায়ে দিতেন। তো আমার পিতৃদেব যখন ফোনের অপারেটরের কাছে ‘মাসুমের’ নাম্বার দিছিলেন, অপারেটর লাইন বিযি পাইয়া আমার পিতৃদেবরে জানাইছিলেন মাসুম ‘সাহেব’-এর লাইন এখন ব্যস্ত আছেন, উনি যাতে পরে আবার ফোন করেন। এই কথায় আমার পিতার পৌরুষে একটু আঘাত লাগে নিশ্চয়, তাই পরবর্তীতে উনি রুমি ঝুমির লগে মিলাইয়া আমার মায়ের নাম ‘সুমি’ বানাইয়া দিছিলেন। আমার ‘সুমি’ নাম সহ্য হয় না।

রবিবার আমি কাজ করি না। ল্যাবের পাশাপাশি মেট্রপলিটান পোলিসের অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশান টিমের সাথে আমি একটা ভলান্টারি কাজ করি। ভলান্টিয়ার পাওয়ায় পোলিসের ইনভেস্টিগেটাররা আমারে ইচ্ছামত খাটায়ে নেন। কাজ শুরু করার প্রথম দুইমাস উনারা আমারে দিয়া চা এবং কফি বানাইছেন, দোকান থিকা চিনি এবং স্কিম মিল্ক কিনাইছেন এবং ফাইল গুছাইছেন। পরে আমি এই নিয়া চিল্লাচিল্লি (রিড: কান্নাকাটি) করায় আমারে দিছেন এভিডেন্স ব্যাগ প্যাকিং করতে। তারও প্রায় এক মাস পরে এক সিনিয়ার ইনভেস্টিগেটার আমারে দয়া কইরা ‘অ্যাক্সিডেন্ট সাইট’-এ নিয়া যান। আমার উপর নির্দেশ ছিল আমি যাতে কিছুই না ধরি এবং আমার মোটা মোটা ডক্টর মার্টিনের জুতা দিয়া যাতে ‘সাইটের’ ‘পবিত্রতা’ নষ্ট না করি।

আমি দূরে দাঁড়াইয়াই সাবধানে নিঃশ্বাস নিতে নিতে মাটিতে যথাসম্ভব কম পা ফেলায়ে উনাদের কর্মকাণ্ড দেখলাম এবং নোট নিলাম। আমারে দাঁড়ায়ে থাকতে দেইখা আরেক ইনভেস্টিগেটার আইসা ধমক দিলেন পয়সা নিয়া ‘দেশের’ এবং ‘মানুষের’ কাজ করার বদলে গায়ে বাতাস লাগাইয়া দাঁড়ায়ে আছি কেন। আমি আর উনারে বললাম না যে আমি ফ্রিতেই বনের মোষ তাড়াইতেছি এবং উনাদের লম্বা লেজে বেণী কইরা দিতেছি। তাড়াতাড়ি জিগাইলাম, আমি কী করতে পারি?

আমি এবং পি-পি-ই
আমি এবং পি-পি-ই

—যাও যাও, ডেব্রির খোঁজ করো গিয়া। যেইখানে যা পাবা, সেইগুলা মার্ক করবা। এরপর অ্যান্ড্রুরে (ফরেনসিক ফটোগ্রাফার) বলবা ছবি তুলতে। তারপর সেইগুলার তালিকা করো গিয়া। আর তোমার ওজন কত?

—আমার ওজন?

—হ্যাঁ, তোমার ওজন? আমার বৌয়ের ওজন তো তোমারে জিগাবো না, নাকি?

—আমার ওজন ৬১ কেজি।

—সেইটা স্টোনে কত? আমি মেট্রিক সিস্টেম বুঝি না।

—৯ স্টোন ৭-৮ পাউন্ডের কাছাকাছি।

—এত? আচ্ছা যা হোক, তুমি এইসব ভারি জুতা পইরা আর আসবা না। এমনিতেই ওজন বেশি, তারপর এই জুতায় মাটিতে এভিডেন্স সব হারায় যাবে। যাও বুট কাভার পইরা নাও।

আমি আগেই ডিসপোসেবল ওভারঅল পরা ছিলাম। এইটারে আমরা বলি পি-পি-ই। পারসোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্টস। অর্থাৎ কাপড়ের উপর মাথা এবং চুল ঢাকা সাদা ওভারঅল, লেটেক্স গ্লাভস, ফেইস মাস্ক এবং চশমার উপর দিয়া প্রটেকটিভ গগলস। এখন জুতার উপরেও কাভার লাগাইলাম। আমারে নিজেরে নিজের একটা বড় সাইজের আইসক্রিম মনে হইল।

টেলিভিশনে ফরেনসিক ইনভেস্টিগেটারদের খুব মহামান্বিত কইরা দেখানো হয়। উনারা চেহারায় মেকাপসমেত ফিটফাট সাইটে ঢুকেন, একটা দুইটা জিনিস মাটি থিকা টোকাইয়া বিশ্বজয় কইরা ফেলছেন এমন একটা হাসি দেন, এরপর সেই টোকাইন্না জিনিস ল্যাবে নিয়া গিয়া এক ঘণ্টার মধ্যে বাইর কইরা ফেলেন খুন কে করছিলেন।

আমার ধারণা ফরেনসিক সায়েন্টিস্টরা পৃথিবীর সবচাইতে আন্ডাররেটেড সায়েন্টিস্ট। এইসব ফালতু টিভি-সিরিজের কল্যাণে সবাই ভাবেন সবাই ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশান বুঝেন এবং (থ্যাঙ্কস টু জিলিয়ান অ্যান্ডারসন ওরফে ডেইনা স্কালি) ভাবেন, এর চাইতে গ্ল্যামারাস এবং অ্যাডভেন্চারাস কাজ বুঝি দুনিয়াতে আর একটাও নাই।

csi-crime-scene-1
সিএসআই সিরিজে ক্রাইম সিন—”টেলিভিশনে ফরেনসিক ইনভেস্টিগেটারদের খুব মহামান্বিত কইরা দেখানো হয়।”

বাস্তবে, ফরেনসিক ইনভেস্টিগেশানের মত থার্ডক্লাস জিনিস আর দুইটা হয় না। যেহেতু পুরা সায়েন্টিফিক কাজের সময় লিগ্যাল সিস্টেমের কথা মাথায় রাখতে হয়, তাই আমাদের প্রত্যেকটা হাঁচি কাশি থুতু ফেলানোরও কন্টেমপোরেনিয়াস নোট রাখতে হয়। আমি আমার ওভারঅলের ভিতর ঘামতে ঘামতে নোট নিতে থাকলাম।

দিনে একুশ কাপ চা খাওয়া আমার সুপারভাইজার কাম রিপোর্টিং অফিসার সেইদিন আমার কাজে খুব খুশি হইছিলেন। আমারে ‘রুট কজ’ এবং ‘মর্ট’ (ম্যানেজমেন্ট ওভারসাইট অ্যান্ড রিস্ক ট্রি) নিয়া অনেক কিছু জিগাইলেন, কইলেন, আমার ডিটেইলিং-এর কাজ ভালো।

এরপর থিকা উনি দিন নাই রাত নাই আমারে ফোন করে সাইটে যাইতে কন। উনি থাকেন আমার বাসার রাস্তাতেই, সুতরাং মিথ্যা কথা বইলা পাড় পাওয়ারও উপায় নাই। আমার বাসায় বাত্তি জ্বালাইলেও উনার বাসায় সেইটা দেখা যায়। উনার ভয়ে আমি লিভিং রুমের আলো নিভাইয়া টিভির উপর চাদর দিয়া টিভি দেখি। দেখা গেল, আমি ল্যাবের রিপোর্ট শেষ কইরা বাসায় ঢুকছি রাত এগারোটার সময়, বারোটার মধ্যে আমি খায়ে দায়ে গোসল কইরা ঘুমাইতে যাওয়ার প্ল্যান করতেছি, এমন সময় ডেইভের ফোন, টেক্সট এবং ভয়েসমেইল, “নাদিয়া, রেডি থাকো, আজকে এ-৪০৭ এ, আমি দশ মিনিটের মধ্যে তোমাকে উঠায়ে নিচ্ছি।”

উলটাপালটা কথা বইলা লাভ নাই। উনার হাড় জিরজিরা স্ত্রী সারাদিন জানালার পাশে ততধিক হাড় জিরজিরা একটা কালচে বাদামি ইয়র্কশায়ার টেরিয়ার কুকুর নিয়া বইসা রাস্তা দেখেন এবং সম্ভবতঃ আমি কখন বাসায় আসি যাই তার কন্টেমপোরেনিয়াস নোট নিতে থাকেন।

nadia_8c
আমার টিভি দেখা, অ্যাক্রিলিকে আমার আঁকা ছবি

আজকে রবিবারেও ডেইভের ফোন। আমি উনারে বারবার বলছি রবিবারে আমারে ফোন দিতে না। সপ্তাহে একদিন আমি মারামারি কাটাকাটি রক্তারক্তি ভাঙাভাঙি থিকা দূরে থাকতে চাই। আমার মা’ও একই সময় ঢাকা থিকা ফোন দিচ্ছিলেন, তাই ভুল কইরা ডেইভের কল ধইরা ফেললাম।

—নাদিয়া, আমি জানি আজকে রবিবার। কিন্তু ইউ উড লাভ দিস।

—হোয়াট উড আই লাভ?

—আগে আসো, আসলেই বুঝতে পারবা। তাড়াতাড়ি চইলা আসো।

রঞ্জু আমার দিকে তাকায়ে হতাশভাবে মাথা নাড়লেন। অ্যাক্সিডেন্ট সাইটে কী এমন হইতে পারে যে মানুষের তা ভালো লাগবে?

আমি রঞ্জুরে বাসায় রাইখা একলাই ওয়াটফোর্ড গেলাম। ঘটনা ঘটছে মোটরওয়ে এম-৪ এবং ট্রাংক রোড এ-৪১ যেইখানে এক হইছে।

ইংল্যান্ডের রাস্তার নামের কিছু কাহিনী আছে। ১৯১৩ সালের শুরুতে রাস্তার নাম্বার দেওয়া শুরু হয় ম্যাপ আঁকার সুবিধার্থে। সেই সময় লন্ডনরে কেন্দ্র রাইখা বাকি এলাকাগুলারে রেডিয়াল প্যাটার্নে বিভিন্ন জোনে ভাগ করা হয়। সেইসময় সব রাস্তার নাম্বার শুরু হইতো ‘এ’ দিয়া। ‘এ’র পরে যেই নাম্বার বসবে, তাতে বোঝা যাবে ঐ রাস্তা কোন জোনে পড়বে। যেমন ধরা যাক, এ-৭ নামের রাস্তা সলওয়ে ফার্থের উত্তর দিক থিকা শুরু হইয়া ডামফ্রাইস এবং গ্যালাওয়ের পশ্চিমে গিয়া শেষ হইছে। এই এলাকা জোন ৭ এ পড়ে। অর্থাৎ রাস্তার নাম্বার দিয়াই জোনের সীমারেখা বোঝা যাবে। শুধুমাত্র জোন ১ এবং ২ এর ক্ষেত্রে এই নিয়ম খাটে না। ‘এ’ রোড নাম্বারিং-এর প্রায় তিন দশক পরে মোটরওয়ে নাম্বারিং শুরু হয়। তুলনামূলকভাবে এই রাস্তাগুলাও নতুন। হাস্যকরভাবেই ‘এ’ রোডগুলার বেশিরভাগ দায়িত্ব সেন্ট্রাল গভর্মেন্টের হাতে আটকায় আছে, যেইখানে মোটরওয়েগুলির দায়িত্ব পড়ে লোকাল গভর্মেন্টের হইয়া ‘হাইওয়েস ইংল্যান্ড’ নামক এক লিমিটেড কোম্পানির উপরে। তাই দেখা যায় মোটরওয়েগুলিরে বিলিয়ন বিলিয়ন পাউন্ড খরচ কইরা ঝকঝকা তকতকা আধুনিক কইরা রাখা হইলেও ‘এ’ রোডগুলির বেহাল রদ্দিমার্কা অবস্থা। এই রাস্তাগুলির অনেক জায়গায় ঠিকমত ট্রাফিক সিগনাল বসানো নাই বা থাকলেও তা ইচ্ছামত বসানো হইছে। আজকে যেই জায়গায় অ্যাকসিডেন্ট হইছে, সেইখানে নিয়মিতই ছোটখাট অ্যাকসিডেন্ট হয়। মোটরওয়েওয়ালারা নিয়মমাফিক সিগন্যালই বসাইছেন, কিন্তু ‘এ’ রোডের উলটাপালটা সিগন্যালের কারণে এই দুই রাস্তার জাংশানে মানুষও মরেন নিয়মিত। বিভিন্ন দেনদরবার কইরাও বিশেষ লাভ হয় নাই কোনো।

আমি সাইটে গিয়া পৌঁছাইলাম বিকাল চারটায়। তখনো হলুদ কালোরঙা সিকিউরিটি কর্ডন টাঙানো চারদিকে। পোলিস, এ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস এবং খুব আশ্চর্যজনকভাবে এনিমেল কন্ট্রোলের গাড়ি গিজ গিজ করতেছে পুরা এলাকা জুইড়া। আমি ভাবলাম কুকুর বিড়াল কেউ ইনজুরড হইলেন নাকি? কিন্তু তা হইলে তো আর-এস-পি-সি-এ আসার কথা, এনিমেল কন্ট্রোল না!

আমি আমার আইডি দেখায়ে কর্ডনের ভিতরে ঢুকলাম। আমারে দেখতে পাইয়া ডেইভ এবং চিফ সুপারিনটেন্ডেন্ট পিটার হাত নাড়লেন।

ডেইভ আমারে ঘটনার সারমর্ম শুনাইলেন।

পিওত্রেক মিলোচেভিক নামের পোলিশ বংশোদ্ভূত এই ভদ্রলোক বিলুপ্তপ্রায় সাপ এবং অ্যাম্ফিবিয়ান চোরাচালানের সাথে যুক্ত বইলা সন্দেহ করা হইতেছে। উনি এবং উনার পুত্র—ছয় বছরের মারিয়ুশ আজকে ভোরে নর্থহ্যাম্পটন থিকা উনাদের ব্রান্ড নিউ অডি আর-৮ চালাইয়া লন্ডন আসতেছিলেন। পোলিসরে দেওয়া সংক্ষিপ্ত স্টেইটমেন্টে উনি ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জানান, উনারে উনার এক স্বল্পপরিচিত বন্ধু বাক্সবন্দি একটা সাপ দিছিলেন লন্ডনের কেনসিংটনের এক ফ্ল্যাটে দিয়া আসতে। উনি সাপের স্পিশিস বা অন্য কিছু সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন না। উনি পেশায় একজন বিল্ডার। ওয়াটফোর্ডের কাছাকাছি হিলফিল্ড এলাকায় আসার সময় উনি হঠাৎ গাড়ির ভিতর মৃদু হিস হিস আওয়াজ পান। রেডিওর সাউন্ড কমাইয়া রিয়ার ভিউ মিররে তাকাইয়া উনি দেখেন পিছের সিটের বসা উনার ঘুমন্ত পুত্রের গায়ের উপর দিয়া অন্ততঃ বিশ-পচিঁশটা বিশাল আকারের সাপ ঘোরাঘুরি করতেছে। সেইসময়েই অ্যাকসিডেন্টটা হয়।

উনি পাগলের মত ব্রেইক পেডাল এবং একসেলেরেটারে একসাথে চাপ দিয়া স্টিয়ারিং হুইল ঘুরাইতে থাকলে এম-৪ এ ঢুকা চিনির লরির সাথে ধাক্কা খাইয়া উনারা পেইভমেন্টে উইঠা যান। এবং সেইসময়েই উনি জ্ঞান হারান।

বাচ্চাটা মারা গেছেন। লরি চালক এবং পিওত্রেকের তেমন কিছু হয় নাই। এয়ার ব্যাগ ডিপ্লয় হইছিল গাড়ি পেইভমেন্টে উঠার সাথে সাথে। মজার ব্যাপার হইতেছে গাড়ির পিছের ছিদ্রবিহীন বুটে বাক্সবন্দি একটা সাপ আসলেই পাওয়া গেছে। বাক্সর গায়ে আধা সেন্টিমিটারের চাইতেও ছোট ছোট সাইজের ফুটা আছে, যেইটা দিয়া সাপের কোনোমতেই বাইর হইতে পারার উপায় নাই—বাক্সর গায়ে ভালো মত সেলোটেপ এবং নাইলনের দড়ি প্যাঁচানো, সাপ সাহেবেরও কিছু হয় নাই। এনিমেল কন্ট্রোলের একজন বলছেন, উনার দেইখা মনে হইছে, সাপটা সেন্ট্রাল আফ্রিকার দুর্লভ ভাইপার, এবং সম্ভবতঃ এর নাম ‘ফেদারড ট্রি (Atheris hispida)’। তবে উনি এই ব্যাপারে নিশ্চিত না। উনারা ঠিকমত সাপের স্পিশিস বাইর করার জন্য উনারে উনাদের ল্যাবে নিয়া গেছেন।

nadia_8d
ফেদারড ট্রি (Atheris hispida)

মৃত মারিয়ুশরে যখন গাড়ি থিকা বাইর করা হয়, তখন উনার গায়ে সাপের ম্যাক্সিলারি আর পেলাটিন-টেরিগয়েড দাঁতের দাগ দেখা গেছে অন্ততঃ আট দশ জায়গায়। গলা এবং ঘাড়ের কাছে লাল হইয়া ছিল, সম্ভবতঃ সাপের কয়েলের চাপে তা হইছে। উনার হাতের এবং কনুইয়ের কাছ থিকা প্রচুর রক্ত বাইর হইছে কিন্তু কোথাও মাংস ছিঁড়ে নাই। আরো মজার ব্যাপার হইতেছে, পোলিস এবং অ্যাম্বুলেন্স আইসা যখন পিওত্রেক এবং মারিয়ুশরে গাড়ি থিকা টাইনা বাইর করছেন, তখন গাড়ির দরজা এবং জানালা ভিতর থিকা ‘চাইল্ড লক’ দিয়া বন্ধ ছিল এবং গাড়ির ভিতরেও কোনো সাপ পাওয়া যায় নাই। কেউ আশেপাশের এলাকাতেও কোনো সাপের চিহ্ন পান নাই। তবে খোঁজ এখনো চলতেছে এবং লোকাল মানুষদের সতর্ক করা হইছে।

ওয়াটফোর্ড এলাকা ডেইভ কাভার করেন না, উনার জুরিসডিকশানও নাই এই ইনভেস্টিগেশানের সাথে থাকার। পিটার সরাসরি মেট্রপলিটান পোলিসে কাজ করেন, র‍্যাংকিংয়েও উনি ডেইভের চাইতে উপরে। উনি এবং ডেইভ পুরানা বন্ধু হওয়ায় উনি ডেইভরে ডাকছিলেন কাহিনী নিজের চোখে দেইখা যাইতে। আমার এই প্রথম সাইটে আরো আগে না আসার জন্য খুব দুঃখ হইল।

আমি কিছুক্ষণ লোকজন থিকা ‘ওয়াইল্ড লাইফ এবং কান্ট্রিসাইড অ্যাক্ট’ এবং ‘সাইটিস (কনভেনশান অন ইনটারন্যাশনাল ট্রেইড ইন এনডেইনজারড স্পিশিস)’ সম্পর্কে জ্ঞান নিয়া ভূত-প্রেত এবং হিপনোটিজম সম্পর্কে হুশহাশ কথা শুইনা গাড়িতে উঠলাম।

পোলিসরাও যে আজগুবি জিনিস বিশ্বাস করেন তা আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। গাড়িতে উইঠা ডেইভ আমারে ফিস ফিস কইরা বললেন, “আমি নিশ্চিত এইটা খুন। ঐ ব্যাটা বদমাইশ, ছোট বাচ্চা ছেলের গায়ের উপর সাপ ছাইড়া দিছে! এরপর একটা অ্যাকসিডেন্টের নাটক সাজাইছে!”

—ডেইভ, কোনো কিছু প্রমাণ হওয়ার আগে তুমি এইসব কী কথা বলো? তোমার তো চাকরি যাবে!

—আরে, কেউ তো শুনতেছে না। কিন্তু আমি নিশ্চিত, বুঝলা নাদিয়া? হারামজাদারে তো আমি সামনে থিকা দেখলাম। ছেলে মারা গেছে, চোখ দিয়া এক ফোঁটা পানি বাইর হইল না!

—শকে আছেন নিশ্চয় বেচারা! এত ছোট একটা বাচ্চা ছেলে! আর তাছাড়া বাচ্চা মারার জন্য এত কাহিনী করেন নাকি মানুষ? ধাক্কা দিয়া দোতলা থিকা ফালায় দিলেই তো হয়। তাও নাকি আবার রেয়ার প্রজাতির সাপ! ট্রেইস ব্যাক কইরা এই সাপ কোথা থিকা আসছেন, উনি সত্যি কথা বলতেছেন কিনা, তা বাইর করা তো পানির মত সোজা! আমার ধারণা উনি সত্যিই বলছেন। শকে ছিলেন, তাই হয়তো তোমার কাছে ইমোশনলেস মনে হইছে।

—রাখো তোমার শক! আমি মানুষ চিনি না? তবে, সাপ দিয়া কেন, সেই প্রশ্ন আমারও। লরেন বলতেছিল এই লোকের সাথে স্মাগলিং রিং-এর যোগাযোগ আছে কিনা দেখবে—।

—হু, লরেন আমারেও বলছেন। সাপ ব্যাঙ এইসব স্মাগলিং-এর সাথে থাকলে উনার কিন্তু একটা রেয়ার সাপ গাড়ির বুটে বাক্সবন্দি রাইখা, নিজের ছেলেরে সাপ দিয়া খুন করাইয়া—আগ বাড়াইয়া অ্যাকসিডেন্টের নাটক করার কথা না!

—তা ঠিক। আমার কী ধারণা জানো, স্মাগলাররা তো বেজন্মা। একজন আরেকজনরে ফাঁসাইতে ওস্তাদ একেকটা! আমার ধারণা কাউরে ফাঁসাইতেই আর নিজের ছেলেরে খুন করতে গাড়ির ভিতর সাপটারে ছাইড়া দিয়া সে বাইরে বইসা ছিল। সাপের কাজ শেষ হইতে সে আবার সাপরে বাক্সবন্দি কইরা অ্যাকসিডেন্টের নাটক সাজাইছে! জানে, এমন নতুন একটা গাড়ি, নিজের কোনো ক্ষতি হবে না! এয়ার ব্যাগ তো ডিপ্লয় হবেই! আহা গাড়িটা খুব সুন্দর ছিল, তাই না? ইনসুরেন্সেও তো প্রচুর টাকা পাবে!

—জানি না। আমার অডি ভালো লাগে না।

ডেইভ আমার দিকে চোখ বড় বড় কইরা তাকাইলেন। আমার মনে হইল অডি আর-৮ পছন্দ না কইরা আমি যেন বিশাল একটা অপরাধ কইরা ফেলছি!

আমার প্রিয় গাড়ি লন্ডনের রাস্তার জন্য অনুপযুক্ত এ্যামেরিকান মাসল কার—ডজ চার্জার ১৯৭১। গাড়ির জন্ম-সালের সাথে দেশাত্মবোধের কোনো সম্পর্ক নাই।

ডজ চার্জার ১৯৭১ আর-টি
ডজ চার্জার ১৯৭১ আর-টি

৯ জুলাই, ২০১৫
গত সপ্তাহের উইকএন্ডে আমরা গেছিলাম লেক ডিস্ট্রিক্ট। ইংল্যান্ডের উত্তর পশ্চিম দিকে কাম্ব্রিয়া কাউন্টির পুরা এলাকা নিয়া এই ন্যাশনাল পার্ক। সি-লেভেলের থিকা প্রায় ১০০০ ফিট উঁচু, এইখানেই আছে ইংল্যান্ডের সবচাইতে উঁচু পাহাড়, স্কাফেল পাইক এবং সবচাইতে গভীর নীল পানির লেক, লেক ওয়াস্টওয়াটার এবং সবচাইতে বড় সরু ফিতার মত লেক, লেক উইন্ডারমেয়ার। মেয়ার শব্দের অর্থ লেক। উইন্ডার শব্দটা আসছে জার্মান পুরুষের নাম উইনান্ড থিকা। এর সাথে যুক্ত হইছে প্রাচীন নর্স প্রত্যয় ‘আর’। কোন্‌ জার্মান ভদ্রলোকের নামে এই নাম আসছে তা অবশ্য কেউ কইতে পারেন না। উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়র্থ সাহেবের কবিতায়ও উইনান্ড নামটা আসছিল, উনি অবশ্য এই এলাকারই লোক ছিলেন। উনি লিখছিলেন,
There was a boy,
ye knew him well
ye cliffs and islands of Winander!

জুলাই মাসে ইংল্যান্ডে এইবার প্রচণ্ড গরম। বাংলাদেশে থাকলে বলা যাইত, তালপাকা গরম। এইদেশে তাল না থাকায় কী পাকা গরম, তা বলা যাইতেছে না। মানুষ যদি ফলমূল হইত, তাইলে আমরাই পাইকা গাছ থিকা টুপ টাপ পড়তাম, সন্দেহ নাই। লন্ডন থিকা একটানা ছয় ঘণ্টা ড্রাইভ কইরা শেষমেশ আর্নসাইড পৌঁছাইলাম আমরা দুপুর বারোটায়। আমাদের হলিডে হোমের ঠিক পিছেই মোরিকাম্বি বে, সেইখান থিকা ডাইনি বুড়ির আঙুলের মত সরু কেন্ট চ্যানেল মোচড়ামুচড়ি কইরা স্যান্ডসাইডের দিকে ঢুকছে। গরমে পানির উচ্চতা নাইমা গেছে, চ্যানেলের দুইপাশে এত চকচকা সাদা বালি যে রোদ্রের জন্য একটানা তাকানো যায় না—এবং তাতে কয়েকজন কুকুর মনের সুখে লাফাইতেছেন।

আমরা চ্যানেলের পাশে শেইলা’স হ্যারন ক্যাফেতে বইসা সানডে’ রোস্ট এবং লোকাল এইল খাইলাম। সানডে’ রোস্ট শুধু সানডে’তে পাওয়া যায় না, প্রতিদিনই পাওয়া যায়। ট্র্যাডিশনালি রোস্টের সাথে দেওয়া হয় মাশরুম বা রেড ওয়াইন গ্রেভি, ম্যাশ, সিদ্ধ মটরশুঁটি, মাখনে ভাজা গাজর এবং ইয়র্কশায়ার পুডিং। ইয়র্কশায়ার পুডিং নামে পুডিং হইলেও আসলে একধরনের লবণাক্ত গোল রুটিমত জিনিস। এর আকৃতি অনেকটাই ছোট্ট একটা বাটির মত, এবং এতে ইচ্ছামত ঝোল ঢুকায়ে খাওয়া যায়।

nadia_8f

সানডে রোস্ট


ইয়র্কশায়ার পুডিং রেসিপি

উপকরণ
১৪০ গ্রাম প্লেইন ফ্লাওয়ার যাহাকে সোজা বাংলায় বলা হয় ময়দা
৪টা মাঝারি আকারের ডিম
২০০ মিলিলিটার ফুল ফ্যাট দুধ
লবণ এবং গোলমরিচ গুঁড়া
সূর্যমুখী তেল (না থাকলে সয়-বিন বা গ্রাউন্ড নাট তেলও চলবে)

প্রণালী
• কাজ শুরুর আগে ওভেন প্রি-হিট করতে হবে। গ্যাস ওভেন হইলে ২৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, ফ্যান অ্যাসিস্ট ওভেন হইলে ২১০ বা গ্যাস মার্ক ৮। পুডিং বানানোর জন্য আপনার দরকার মাফিন বা কাপকেইক টিন। একটা ১২ গর্তের মাফিন টিনের গর্তে ভালোমত সূর্যমুখী তেল দেন, সাধারণতঃ কেইক বানানোর সময় যেই পরিমাণ মাখন বা তেল দেওয়া হয় টিনে, তার চাইতে পরিমাণে বেশি। গর্তের ভিতর তেল ভাসার কথা। তারপর একটা বেকিং শিটের উপরে এই তেলওয়ালা খালি মাফিন টিন বসায়ে ওভেনে দেন।

• পুডিং-এর ব্যাটার বানানোর জন্য একটা পাত্রে ময়দা নেন। এতে ফেটানো ডিম দিয়া ভালোমত মিশান। সবশেষে দুধ দিবেন। খেয়াল রাখতে হবে যাতে এই ব্যাটারে কোনো লাম্পস না থাকে। ইচ্ছামত লবণ এবং গোলমরিচের গুড়া অ্যাড করবেন এই স্টেজে। ব্যাটারের ভিসকোসিটি অনেক পাতলা হবে। অর্থাৎ—কেইকের ব্যাটারের মত এত ঘন না। এখন মাফিন টিনে ঢালার সুবিধার জন্য একটা জাগ মত পাত্রে আপনার ব্যাটার ঢাইলা নেন।

• ওভেন ঠিকমত গরম হইলে বেকিং শিট সহ তেলওয়ালা মাফিন টিন ওভেন থিকা বাইর কইরা নিয়া আসবেন। মাফিনের গর্তে খুব সাবধানে ফুটন্ত তেলের উপর ব্যাটার ঢালতে হবে। এইসময় তেল এবং পানি এক হইয়া চারদিকে গরম তেল ছুটতে থাকে, সুতরাং ফুলস্লিভ ওয়ালা জামা পরা থাকলে ভালো। না হইলে আমার মত হাতের বিভিন্ন জায়গায় ফোসকা এবং পোড়া দাগ নিয়া ঘুরতে হবে। তাতে অবশ্য আপনি আপনার ইয়র্কশায়ার পুডিং বানানোর বীরত্বের গল্প লোকজনরে শুনাইতে পারবেন।

• ব্যাটার ঢালা শেষ হইলে বেকিং শিট সহ মাফিন টিন আবার ওভেনে চালান করবেন। বেইক করবেন ২০-২৫ মিনিট ধইরা। এরমধ্যে কোনো অবস্থাতেই ওভেনের দরজা খোলা যাবে না। এমনকি ভূমিকম্প হইলেও না। তবে এই অবস্থায় যদি আপনি ওভেনের ভিতর ছোট সাইজের ড্যাবডেবা চোখের একজন জীবন্ত মানুষ আবিষ্কার করেন, তাইলে ভিন্ন কথা।

• ইয়র্কশায়ার পুডিং বিভিন্নভাবে খাওয়া যায়। সাধারণতঃ ইংল্যান্ডে ক্রিসমাস ডিনারে বা সানডে রোস্টের সাথে এরে গরম অবস্থায় পরিবেশন করা হয়। তবে আমি রেগুলার মাংসের ঝোলে এই পুডিং চুবাইয়া খাই। রুটি বা পরোটা দিয়া যা খাবার দেওয়া হয়, অর্থাৎ কাবাব বা ঝোলের তরকারি বা ভাজি—তার সবকিছুর সাথেই ইয়র্কশায়ার পুডিং যাইতে পারে বইলা আমার ধারণা। যেহেতু এর মাঝখানে গর্ত মতন থাকে, তাই এই গর্তে ফ্রেশ ক্রিম এবং চকোলেট বা বিভিন্ন ধরনের ফল ও আইসক্রিম দিয়াও খাওয়া যাইতে পারে।


প্রথমদিন আমরা গেছিলাম ওয়াটারহেড। একটা ভাইঙ্গা পইড়া যাইতেছে এমন চার্চের সামনে গাড়ি রাইখা সেইখান থিকা পাহাড়ি চিপা আঁকাবাঁকা রাস্তা ধইরা ট্রেকিং কইরা হকসহেড। রাস্তাগুলি ১৯ শতকের শুরুতে বানানো। এখনো সেইগুলি একইরকম ভাবেই আছে। পুরানা ছাইরঙা পাথর, তাতে কালো আর সবুজ রঙের ছোপ। আশেপাশের বাড়িগুলি—বেশিরভাগই পাথরের তৈরি খামার বাড়ি, ১৭ এবং ১৮ শতকের দিকে বানানো। বাড়ির আশেপাশে বাড়ির মালিকের মোটা মোটা ভেড়াগণ ঘুর ঘুর করতেছেন। ভেড়ারা একসাথে থাকতে পছন্দ করেন। উনারা দলের নেতার আদেশও বিনা দ্বিধায় মাইনা যান। একবার কার কাছে জানি শুনছিলাম, ইস্টার্ন টার্কিতে একসাথে ৪০০ ভেড়া মারা গেছিলেন যখন উনাদের দলনেতা ১৫ মিটার গভীর একটা গর্ত পার হইতেছিলেন। দলনেতা গর্তে পইড়া গেলে বাকি ভেড়ারাও গর্তে লাফ দেন। এইটা নাকি উনাদের ‘ফ্লকিং এবং ফলোয়িং’ ইন্সটিংক্ট-এর অংশ।

বাইরে তখন ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। খাড়া পাহাড়ের রাস্তায় রোদ্রের তাপ থিকা বাঁচার কোনো ছায়াও নাই। চারদিকের বাতাস ভেড়ার গুয়ের গন্ধে ভারি হইয়া আছে। এই দুপুরবেলা আমরা ছাড়া চারদিকে আর একজন মানুষও নাই। সবকিছু এতই ভৌতিক নিস্তব্ধ যে হঠাৎ একটা বাচ্চা ভেড়া তারঃস্বরে ডাইকা উঠলে চমকায় আমি হাত থিকা আমার পানির বোতল ফালায় দিলাম। পানির বোতল গড়াইতে গড়াইতে নিচের খাদে গিয়া পড়ল। আমরা ঠিক করলাম সেইদিন আর ট্রেকিং করব না।

nadia_8g
ওয়াটারহেড যাওয়ার রাস্তায়

ওয়াটারহেড থিকা আমাদের পরের গন্তব্য ছিল কনিস্টন। তখন রোদ পইড়া আসতেছিল। জেকোবিয়ান আমল অর্থাৎ সেই কপার মাইনের সময় থিকাই এই ছোট্ট শহর একই রকম আছে। বিশাল বিশাল চিমনিওয়ালা ১৬ শতকের ফার্মহাউস কনিস্টন হল, ১৮ শতকের শেষের দিকে বানানো সেইন্ট অ্যান্ড্রু’র চার্চ, ৪০০ বছর বয়সের ব্ল্যাক বুল ইন আর পুরানা মদ চোলাইয়ের কারখানার ঠিক পিছেই মা মুরগীর মত সামনে বাচ্চা শহর নিয়া খাড়া পাহাড় ‘ওল্ড ম্যান অফ কনিস্টন’ দাঁড়ায়ে রইছে।

কনিস্টনেই আছে আমার ছোটবেলার প্রিয় লেখক বিয়েট্রিক্স পটারের বাড়ি—বাড়ি মানে ৪০০ একর জায়গা নিয়া বিশাল মংক কনিস্টন স্টেইট। বিয়েট্রিক্সের জন্ম লন্ডনে, কিন্তু উনি উনার সারাজীবনই কাটাইছিলেন লেক ডিস্ট্রিক্টে। উনার লেখা ও আঁকা প্রথম বই, দ্যা টেইল অফ পিটার র‍্যাবিট আমারে ছোটবেলায় আমার মা এবং বাপ ঘুমের সময় পইড়া শুনাইতেন। সম্ভবতঃ বিয়েট্রিক্সের কারণেই, আমার নিজেরও ছোটবেলা থিকা ছোট পশুপাখির একটা বিশাল চিড়িয়াখানা ছিল বাসায়। ছোটবেলা থিকা এই পর্যন্ত আমি ৭টা কুকুর এবং ২৯টা বিড়াল ছাড়াও সাপ, মাকড়শা, বাদুর, খরগোস, বানর, সজারু, ইঁদুর, ব্যাং, ঝিঁঝি পোকা, ছোট সাইজের মাছ, এবং একটা ময়না পাখি পালছি। সেই ময়না পাখি আবার আমার মত গলায় ডাকতেন, ‘আম্মু, আম্মু!’ এবং তা শুইনা আমার মা’র নিয়মিত অজ্ঞান হওয়ার দশা হইত। ও, কয়েকটা বাচ্চা মুরগীও ছিল আমার। বাসার মধ্যে হাগু কইরা ভরানোর পরে আমার মা ছোট ছোট তিনকোনা কাপড় কাইটা উনাদের জন্য ডায়াপার বানায় দিছিলেন। এরপর থিকা উনারা এক পা উঠায়ে ব্যাঁকা ব্যাঁকা হইয়া হাঁটতেন। আমার বাপের যন্ত্রণায় অবশ্য বেশিদিন মুরগী পালা সম্ভব হয় নাই।

nadia_8h
বিয়েট্রিক্স পটারের আঁকা পিটার র‍্যাবিট

পশুপাখি পালার কারণে আমার আত্মীয় স্বজন আমারে পাগল ডাকতেন। উনারা নিশ্চয় এমন মানুষের কথা শুনেন নাই যিনি আদালতে ঈশ্বরের বিরূদ্ধে মামলা ঠুঁইকা দিছিলেন। অথবা কার কাছে জানি শুনছিলাম, এক ভদ্রলোক নাকি নিজেরে নিজেই আসামী বানাইয়া জেলে গিয়া হাজির হইছিলেন। আমার পরিচিত এক হোমলেস ভদ্রলোক আছেন, যার প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকে, ‘চেহারা খারাপ তাই প্রস্টিটিউশানে নামতে পারছি না, পয়সা দিলে চুল কাটাইতে এবং দাঁত মাজতে যাবো।’

(কিস্তি ৯)