(আগের কিস্তি)

৪ অগাস্ট, ২০১৫

আজকে ম্যাকডাওয়েল কেইসের তৃতীয় হিয়ারিং। কেইস খুব আস্তে আস্তে আগাইতেছে। প্রসেকিউশানের কেইস খুব নড়বড়া টাইপ। সাক্ষীদের ঠিক-ঠিকানা নাই। কথাবার্তায় সামঞ্জস্য নাই। ডিফেন্স ব্যারিস্টার আমারে ডাকলেন উইটনেস বক্সে, এরপর আমার চুলের রঙ নীল কেন এই নিয়া আলতু-ফালতু প্রশ্ন জুইড়া দিলেন। ডিফেন্সের এই স্ট্র্যাটেজি পুরানা। উনারা ‘জুরো’র সামনে প্রমাণ করতে চান, প্রসেকিউশানের প্রধান সাক্ষী হিসাবে আমি খুব নড়বড়া টাইপ। আমার কথা আমলে না আনলেই ভালো।

ইউ-কে’র লিগ্যাল সিস্টেমের বেশ অনেকটা অংশই আমার কাছে হাস্যকর এবং অদরকারী মনে হয়। জুরো বা জুরি নির্বাচন তার মধ্যে অন্যতম। ইউ-কে’তে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধইরা বাস করেন এমন ১৮ থিকা ৭০ বছরের যে কেউ জুরি হিসাবে ক্রিমিনাল ট্রায়ালে কোর্টে আসতে পারেন। এই নির্বাচন হয় র‍্যাফেল ড্র টাইপ একটা জগাখিচুড়ি ব্যবস্থার মাধ্যমে।

আমার প্রথম কেইসে আমার ভাগ্যে যেই জুরো পড়ছিল, তাতে ছিলেন এক চোখ কানা একজন রিটায়ার্ড কাউন্সিল ঝাড়ুদার, ১৯ বছরের আফ্রিকান বংশোদ্ভূত একজন র‍্যাপার, বিয়ার সূত্রে ব্রিটিশ সিটিজেনশিপ পাওয়া ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ালেখা করা একজন মোটাসোটা আর্মেনিয়ান গৃহিনী, এক অক্ষর ইংরেজী না বোঝা একজন ভারতীয় মুদি দোকানদার (ও তার ইন্টারপ্রেটার), আপাদমস্তক কালো কাপড় পরা এবং দুনিয়াদারি সম্পর্কে দুই পয়সার ভ্রুক্ষেপ না করা অসম্ভব সুন্দরী ২১ বছরের ‘গথ’ তরুণী, একজন হোমিওপ্যাথ ডাক্তার, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত একজন ইহুদী ভদ্রমহিলা এবং আরো পাঁচজন আগরুম বাগরুম লোক, যাদেররে আমার প্রতিটা বাক্য তিনবার কইরা ভাইঙ্গা ব্যখ্যা করতে হইছিল।

গ্যারি স্যাডলার আমার জুরো-ভাগ্য দেইখা বলছিলেন, ‘ন্যাডস, তুমি যথাসময়ে জন্মাইলে তোমার অসাধারণ কপালের জন্য তোমারে ইদার ডাইনি আখ্যা দেওয়া হইত অথবা তোমারে নিয়া মহাকাব্য লেখা যাইত!’

কেইসের সায়েন্টেফিক অফিসার হিসাবে কাজ করলেও আমাদের জুরোর সুবিধার জন্য একদম ‘লে-ম্যান’স টার্ম’-এ সমস্ত সায়েন্টেফিক প্রসেস বর্ণনা করতে হয়।

আমার প্রথম কেইস খুব সোজা সাপ্টা ধরনের ছিল। পাবে গিয়া দুই বন্ধু মারামারি শুরু করেন। ঝগড়ার সূত্রপাত কমন এক বান্ধবীরে নিয়া, যারে তারা দুইজনেই ভালোবাসেন। মারামারির এক পর্যায়ে এক মাতাল বন্ধু অপর মাতাল বন্ধুর পেটে ভাঙা বিয়ারের কাচের বোতলের একাংশ ঢুকায়ে দেন। পরবর্তীতে হাসপাতাল নেওয়ার পথে সেই মাতাল বন্ধু মারা যান। এইদিকে ‘ডিফেন্ডেন্ট’ মাতাল বন্ধু কাহিনী কোন দিকে গড়াইতেছে বুঝতে পাইরা বোতল ফালাইয়া সিন থিকা পালাইয়া যান। ঘটনার একদিন পরে পোলিস উনারে উনার বাসা থিকা অ্যারেস্ট করেন। ঘটনার সাক্ষী দুই বন্ধুর কমন প্রেমিকা রাফায়েলা গিল ও পাবের আরো কিছু তৎকালীন আধা মাতাল কাস্টমার। যেহেতু ডিফেন্ডেন্টের (সাসপেক্ট) বয়স ১৭ এবং তিনি মাতাল ছিলেন, তাই শাস্তি লঘু হবে, এইটা আমরা সবাই জানতাম। ডিফেন্স ব্যারিস্টারও জানতেন তার মক্কেলের সাজা খুব বেশি হইলে কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে বছর দুয়েকের মত হবে। হিয়ারিং শুরু হওয়ার আগে ডিফেন্স এবং প্রসেকিউশান ব্যারিস্টাররা ফিস ফিস কইরা আলাপ আলোচনা কইরা ডিফেন্ডেন্টের সম্ভাব্য শাস্তি মোটামুটি ঠিক কইরা নিলেন।

এই কেইসে আমার কাজ ছিল বিয়ারের বোতলে পাওয়া রক্তের সাথে ডিফেন্ডেন্টের রক্ত ও তার ডি-এন-এ প্রোফাইল মিলানো বা না মিলানো। আমার কলিগ অলিভার উইক্স ডিফেন্ডেন্টের জামায় একই বিয়ারের বোতলের কাচের গুড়া শনাক্ত করছিলেন। লী ম্যাকব্রাইড করছিলেন হাতের ছাপ পরীক্ষা। তো যাই হোক—আমারে ডিফেন্স ব্যারিস্টার ক্রস এক্সামিনেশানে ডাকছেন:

—তুমি বলতেছ, তুমি বোতলে যেই ডি-এন-এ পাইছো, তা আমার ক্লায়েন্টের ডি-এন-এ?

—আমি তা বলতেছি না। আমি বলছি, যেই ডি-এন-এ আমি এক্সিবিট নাম্বার ‘এন-আই-০০২’ বিয়ারের বোতলে পাইছি, তার সাথে ডিফেন্ডেন্টের ডি-এন-এ’র ফুল প্রোফাইল মিলে যায়।

—তার মানে তুমি বলতেছ এই ডি-এন-এ আমার ক্লায়েন্টের ডি-এন-এ না?

—আমি তা বলি নাই।

আর্মেনিয়ান জুরি হাত তুললেন। ডিফেন্স ব্যারিস্টার গিয়া উনার সাথে ফিস ফিস কইরা আলাপ কইরা আমার কাছে ফেরৎ আসলেন।

—আচ্ছা তুমি তার আগে ডি-এন-এ কী জিনিস ব্যাখ্যা করো মাননীয় জুরো’র জন্য।

আমি ব্যাখ্যা করলাম। যদিও ‘উইটনেস স্টেইটমেন্ট’-এর সাথে সাথে আমি ডি-এন-এ, ফিঙ্গারপ্রিন্টিং, ব্লাড গ্রুপ ইত্যাদি কী জিনিস তা সহজ ইংরেজি ভাষায় লিখা জুরোর হাতে হিয়ারিং শুরুর আগেই দিছিলাম। যাই হোক, এরপর ডি-এন-এ কেমনে পরীক্ষা করা হয় তা ব্যাখ্যা করলাম। এক্সট্রাকশান, কোয়ান্টিফিকেশান, অ্যাম্পলিফিকেশান, ইলেক্ট্রোফেরোসিস, অ্যানালাইসিস সব ব্যাখ্যা করলাম। এরপর ডি-এন-এ পরীক্ষার ইতিহাস কইলাম।

ভারতীয় মুদি দোকানদার ভদ্রলোক কী বুঝলেন জানি না, উনারে দেখলাম ইন্টারপ্রেটার উনারে টক-টক-টক শব্দে সবকিছু মারাঠিতে বুঝাইয়া দেওয়ার পরেও উনি প্রবল বেগে ডানে বামে মাথা নাড়তেছেন। একমাত্র গথ তরুণীরে দেখলাম উদাসীন হইয়া হাতের তালুর দিকে তাকাইয়া আছেন, বাকি সবার চোখে ভাষা না জানা ট্যুরিস্টের বিভ্রান্ত দৃষ্টি।

—মাননীয় বিচারপতি, আমরা প্রসঙ্গে ফেরত আসি। তো নাদিয়া ইসলাম, তুমি বলতেছ, এই যে ডি-এন-এ তুমি বিয়ারের বোতলে পাইছ, তা আমার ক্লায়েন্টের সাথে মিলে, তাই তো?

—হ্যাঁ, আমি তাই বলছি।

—তাইলে তুমি বলতে চাইছ আমার ক্লায়েন্ট এই খুন করছেন?

—আমি তা বলতে পারব না। আমার কাজ ডি-এন-এ প্রোফাইল করা। খুন কে করছেন তা বাইর করা আমার কাজ না।

—কিন্তু তুমি তো বললা আমার ক্লায়েন্টের ডি-এন-এ তুমি বোতলে পাইছো।

—আমি তা বলি নাই। আমি বলছি, বোতলের ডি-এন-এ ডিফেন্ডেন্টের ডি-এন-এ’র সাথে ফুল প্রোফাইল সহ মিলে যায়।

—তুমি আমারে কনফিউসড করতেছ। বোতলের ডি-এন-এ যদি ডিফেন্ডেন্টের ডি-এন-এ’র সাথে মিলে তাইলে তো সেইটা ডিফেন্ডেন্টেরই ডি-এন-এ, নাকি?

—আমি সেইটা বলতে পারব না।

—তাহলে তুমি কী বলতেছ?

—আমি বলতেছি, ক্রাইম স্যাম্পলে পাওয়া ডি-এন-এ যদি ডিফেন্ডেন্টের থিকা না আইসা এই কেইসের সাথে সম্পর্কহীন অন্য কারো থিকা আসে, সেইটা মিলার সম্ভাবনা বিশ মিলিয়নের মধ্যে একটা।

—এই অংক তুমি কই পাইছ?

—অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর পিটার ডনেলি এই অংক বাইর করছেন। এর নাম বায়াস থেরম। এই দিয়া ‘ম্যাচ প্রবাবিলিটি’ বাইর করা হয়।

—আচ্ছা, তাইলে তুমি বলতেছ, বিশ মিলিয়ন একজন মানুষের মধ্যে অন্য কারো সাথে বিয়ারের বোতলে পাওয়া ডি-এন-এ মিলা যাইতে পারে?

—হ্যাঁ, মিলতে পারে।

—তার মানে তুমি বলতেছ, আমার ক্লায়েন্ট খুন করেন নাই।

—আমার পক্ষে সেইটা বলা সম্ভব না। কে খুন করছে তা বাইর করা আমার কাজ না।

—কিন্তু তুমি বলছ বিশ মিলিয়ন একজন মানুষের ভিতর অন্য কোনো মানুষের সাথে বিয়ারের বোতলে পাওয়া ডি-এন-এ মিলা যাইতে পারে, যেইখানে ব্রিটেনের জনসংখ্যা প্রায় ৬০ মিলিয়ন, তার মানে দেশের ভিতরেই অন্ততঃ দুই থিকা তিনজনের সাথে এই প্রোফাইল মিলতে পারে, অর্থাৎ—তুমি নিশ্চিত না এই ডি-এন-এ আমার ক্লায়েন্ট থিকা আসছে কিনা।

এই বইলা উনি বিশ্বজয় কইরা ফেলছেন এমন একখানা হাসি দিয়া জুরোর দিকে ফিরলেন। আমি এইবার সালমান রুশদীর মত অসম্ভব সুন্দর চেহারার পেটমোটা জাজের দিকে তাকাইলাম। “ইয়োর অনার, আমি যদি এই প্রশ্নের উত্তর দেই, তাহলে টাহিনি-অ্যাডামস রুলিং অ্যাপ্লাই হবে এইখানে। আমি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবো না।”

জাজ সাহেব চশমার উপর দিয়া আমার দিকে তাকাইয়া মৃদু হাসলেন, আমি তাতেই গইলা গেলাম। উনি ডিফেন্সরে আদেশ দিলেন আমারে খামোখা উলটাপালটা প্রশ্ন না করতে। ‘টাহিনি-অ্যাডামস রুলিং’ হইলো এক ধরনের লিগ্যাল গাইডলাইন যেইখানে কোর্ট ‘কতদূর’ ডি-এন-এ প্রোফাইলিং এবং ম্যাচ প্রবাবিলিটির জটিল অংকে (আমার ক্ষেত্রে বেকুব ও উদাসীন) জুরি বোর্ডরে ইনভলভ করবে তার নির্দেশনা।

২০১০ সালে কোর্ট অফ এ্যাপিল ‘রুল’ দেয় এই মর্মে যে, ফরেনসিক এভিডেন্স বিচার করার সময় ‘বায়াস থেরম’ এবং ‘লাইকলিহুড রেশিও’ ইত্যাদি ‘প্রবাবিলিস্টিক রিজনিং’ এবং ‘ম্যাথমেটিকাল ডেফিনিশান’  কোর্টে টাইনা আনা যাবে না।

ডিফেন্স ব্যারিস্টার ভালোমত জানেন আমারে এই প্রশ্ন করা যাবে না, আমিও জানি যে ডিফেন্স জানেন আমারে কী প্রশ্ন উনি কতদূর করবেন, কিন্তু এইটা আসলে কোর্টরুমের একধরনের ইঁদুর-বিড়াল খেলা। উনি জুরি বোর্ডের সামনে দেখাইলেন, উনি এমন কিছু প্রশ্ন করতে পারেন, যার উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা ‘এক্সপার্ট উইটনেস’-এর নাই। সেই মারফত উনি ‘এক্সপার্ট’-এর ‘এক্সপার্টিজ’রে খারিজ করলেন মাত্র!

আজকে ম্যাকডাওয়েল কেইসও তার ব্যতিক্রম না। প্রশ্ন শুরু হইল আমার চুলের রঙ দিয়া, শেষ হইলো আমার বয়স সায়েন্টেফিক অফিসার হিসাবে কেন কম, তা জিগায়া। আমার অভিজ্ঞতা কয় দিনের, কয় কেইসে কী কী কাজ করছি, এই নিয়াও আমারে মিনিট পনেরো উত্যক্ত করা হইল। এই কয়েক বছরে আমি দুইশ’য়ের উপর রেইপ ও মার্ডার কেইসে কাজ করছি, বাইশটা কেইসে এক্সপার্ট উইটনেস হইছি, কিন্তু এখনো আমার ডিফেন্স ব্যারিস্টারের সামনে দাঁড়াইতে হবে শুনলে গায়ে জ্বর আসে। এবং সেইটা লিটেরালি।

হিয়ারিং ছিল সাদার্কে। আমি কোর্ট থিকা বাইর হইয়াই রাস্তার উল্টাপাশের ক্যাফেতে ঢুইকা কাপড় পাল্টায়ে ফেললাম। কোর্টে যাওয়ার জন্য আমার শরীরের সমস্ত পিয়ার্সিং ও হাবিজাবি গয়না খুলতে হয়, ট্যাটু ফ্যাটু ঢাইকা লম্বা শার্ট, হাঁটু ঢাকা স্কার্ট, ফরমাল জুতা, মোজা ইত্যাদি পরতে হয়। ওয়াশরুম থিকা যখন আমি ‘আমার’ কাপড়ে বাইর হইলাম, কোঁকড়া খয়েরি চুল আর সবুজ চোখের মিডিল ইস্টার্ন ওয়েটার ছেলেটা আমার দিকে তাকায়ে চোখ টিপা হাসলেন, যেন, কইতে চাইলেন, ডিয়ার সিস্টার, তোমার সিক্রেটস আর সেইফ উইথ মি!

এত সুন্দর হাসি আমি অনেকদিন দেখি না!

রাত্রে মার্কের বাসায় দাওয়াত ছিল আজকে। দাওয়াত ঠিক না, উনি কী জানি সব হাবিজাবি ইথিওপিয়ান রান্না-বান্না শিখছেন, এখন আমাদের গিনিপিগ বানাইয়া নিজের হাত পাকাইতেছেন মাত্র।

ইনজেরা ও অন্যান্য ইথিওপিয়ান সাইড ডিশ। ছবি. ইন্টারনেট
ইনজেরা ও অন্যান্য ইথিওপিয়ান সাইড ডিশ। ছবি. ইন্টারনেট

আমি রমফোর্ডে পোলিস স্টেশানে একটা নামকাওয়াস্তে হাজিরা দিয়া মার্কের কেনসিংটন ফ্ল্যাটে পৌঁছাইলাম রাত সাড়ে আটটার দিকে। গিয়া দেখি লিভিং রুমের মাঝখানে রাগের উপর মার্ক, ড্যান, সারি রবিনসন, লী আর একজন অচেনা কালো ভদ্রলোক গোল হইয়া বইসা কপালে চন্দনের ফোঁটা দিয়া ধ্যান করতেছেন। উনাদের মাঝখানে ধূপ জ্বলতেছে, পিছের সাউন্ড সিস্টেমে মৃদু গুম গুম টাইপ বাজনা বাজতেছে, ঘরের আলো ডিম করা। সাদা চামড়ার লোকদের এগজটিক্সের সন্ধানে ভারতীয় ধ্যান ফ্যান টাইপ ন্যাকামি করতে দেখলে আমার গা জ্বলে। আমি কিচেন থিকা প্লেইটে ইথিওপিয়ান অখাদ্য ‘ইনজেরা’ আর ল্যাম্ব স্টু নিয়া আইসা বললাম, ‘ধ্যান করতে চাইলে হিমালয় যাও। প্রতিদিন ধ্যান কর। চাকরি বাকরি ছাইড়া দাও, সাধু হও। এইসব কী নাটক?’

কালো ভদ্রলোক অমায়িক হাসি দিলেন চোখ খুইলা। হাসিতে আমার বিরক্তি হ্রাস পাইল না। বুঝলাম, এখনই ‘হে বৎস’ টাইপের ডায়ালগ আসতেছে। উনি সারি রবিনসনের হাতে হালকা চড় দিয়া কইলেন, “মার্কি, আজকের মত অধিবেশনের সমাপ্তি,” এরপর আমার দিকে ঘুইরা বললেন, “তোমার পোকারে আপত্তি নাই তো? আসো, পোকার খেলি!”

সাধুদের এই স্ট্র্যাটেজি ডিফেন্স ব্যারিস্টারদের উলটা স্ট্র্যাটেজি। উনারা শ্রেণিশত্রুদের বশে আনার জন্য শত্রুর লেভেলে ‘নাইমা’ যাবেন। এরপর যখন সেই শ্রেণিশত্রু উনার ‘ডাইভারসিটি’ ও জ্ঞান দেইখা মুগ্ধ, তখন উনাদের সাধু বচন বাইর হবে। আমি পোকার খেলার আমন্ত্রণেও সাড়া দিলাম না।

আমার আঁকা: ধ্যান
আমার আঁকা: ধ্যান—লেখক

লী ম্যাকব্রাইড কইলেন, “ন্যাডস, আসো, পরিচয় করায়ে দেই। উনি হচ্ছেন স্টিফেন জো। জো ভাগ্য বলতে পারেন। মারা যাওয়া লোকের আত্মা ডেকে আনতে পারেন। আর জো, এ হচ্ছে নাদিয়া। আমাদের ল্যাবের জুনিয়ার সায়েন্টিস্ট।”

সারি রবিনসন কইলেন, “ও ফ্যাশন ডিসাইনারও—”

জো উইঠা দাঁড়াইয়া হাত আগায়ে দিলেন, আমি হাত মিলাইলাম। উনি কইলেন, “ফ্যাশন ডিসাইনার? বাহ! আমি একসময় আলেকজান্দার ম্যাকুইনের সাথে কাজ করতাম। ডিসাইনাররা তো খুব পাগল হয়। তোমাকে অবশ্য পাগল মনে হচ্ছে না!”

—ঠিকই বুঝছেন। আমার মাথা খুবই ঠাণ্ডা। এত ঠাণ্ডা যে কে ভণ্ড আর লোকদেখানো আর কে সত্যি বলেন, তা আমি খুব সহজেই বুঝি।

—ভাগ্য বলতে পারেন, এমন সব লোকই তো ভণ্ড। এমন কেউ কি সত্যি আছেন যিনি সত্যি সত্যি ভবিষ্যৎ দেখতে পান?

এইবার আমি একটু কনফিউসড হইলাম।

***

সেইটা ২০০০ সালের কথা। আমি সেইসময় বাংলাদেশে থাকি। আমার ফাদার সাহেব একসময় ছিলেন বাংলাদেশ নেভিতে। উনি নিজে এইসব এইসব খবরদারী শাসনের মধ্যে বেশিদিন থাকতে না পারলেও আর্মি স্কুলিং-এর প্রতি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে উনার ভরসা ছিল মারাত্মক। লিবিয়া থাইকে আসার পরে একদিন আমার বাপ এবং চাচায় ড্রইং রুমে আলো কমায়ে কী কী হিসাব কইরা মিলিটারি ক্যুয়ের কায়দায় আমারে ‘শহীদ বীরউত্তম লেঃ আনোয়ার গার্লস কলেজ’ নামক এই এই আর্মি স্কুলে ভর্তি করায়ে দিলেন কোনো রকম কোয়েশ্চেন করার স্কোপ না দিয়াই।

আমি স্কুলে গিয়া তাজ্জব।

তখনো আমি ফ্রেশি—তখনো আমি ঢাকার চালচলন কায়দাকানুন বুঝতেছি। স্কুলে গিয়া দেখলাম এইখানে চুল ফিতা দিয়া বাইন্ধা আসতে হয়, এইখানে নখ লম্বা রাখা যায় না, এইখানে টিচারদের সাথে কথা কইতে হইলে হাত তুইলা মুখ বন্ধ কইরা বইসা থাকতে হয় যতক্ষণ না পর্যন্ত অনুমতি পাওয়া যায়—এইখানে প্রতিদিন ক্লাসের নিয়ম অনুযায়ী বাস্কেটবল খেলতে হয়, এইখানে ব্যাগে গল্পের বই, ছবি আঁকার রঙ রাখা যায় না, এইখানে জুতা জামা ঝকঝকা পরিষ্কার থাকতে হয়, এইখানে কান্ধে রাইফেল নিয়া মাঠের একমাথা টু আরেক মাথা দৌড়াইতে হয়, এইখানে সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি চওড়া আর ষাইট ইঞ্চি লম্বা মাড় দেওয়া একটুকরা সাদা কাপড়রে ইউনিফর্মের বেল্ট এবং শোল্ডার লুপের মাঝখান দিয়া প্যাঁচায়ে পরতে হয়, এইটার নাম নাকি ওড়না—

যাই হোক, আমি আস্তে আস্তে ততদিনে ধাতস্থ হইতেছি। আমি বরাবর স্টুডিয়াস লোক—আমার রেজাল্ট ভালো—আমার খাতায় রিপোর্ট কার্ডে কোথাও কোনো লাল কালির দাগ নাই।

আমি ক্লাসের পড়া ক্লাসেই শেষ করি, হোমওয়ার্কে ফাঁকি দেই না, প্রতিদিন অ্যাসেম্বলিতে গলা লম্বা কইরা সোনার বাংলা গাই—টিচার আসার আগে বোর্ডে সাদা চক দিয়া আজকের পড়ানোর বিষয়, আজকের তারিখ এইগুলা লিখা আশেপাশে লাল-নীল চক দিয়া ফুল-পাতা আঁকি—টিচার বাংলা বা ইংরেজী বই থাইকা রিডিং পড়তে কইলে মাথা দুলায়ে রিডিং পড়ি, পিছন থাইকে বাকি ক্লাস নিরবে আমারে ভ্যাঙ্গাইতে থাকেন—আমি একবার মাথা ঘুরায়ে উনাদের দেইখা আমার মত আবার রিডিং শুরু করি—

তো এইরকমই একদিন দুপুরবেলা আমাদের ক্লাসে ইলা জাহান বইলা একজন আইসা হাজির হইলেন। মাথায় বাটি-ছাঁট দেওয়া চুল, পায়ে খয়েরি রঙের জুতা, চোখমুখভর্তি শয়তানি হাসি। ইউনুস আলি ছিলেন আমাদের ক্লাস টিচার।

ইলা জাহানরে স্কুলের নিয়ম কানুন বুঝাইয়া দিয়া কইলেন, কালকে থাইকে সাদা জুতা পইরা আসতে —এই স্কুলের নিয়ম সাদা জুতা।

ইলা জাহান উনার তিন বছরের শহীদ আনোয়ার লাইফে কোনোদিন সাদা জুতা পরেন নাই। উনারে প্রতিদিন শাস্তি হিসাবে বারান্দায় দাঁড় করায়ে রাখা হইত, উনি ঐখান থাইকে চিল্লাইতেন, স্যার, জোরে বলেন, শুনি না। অংকে ফেইল করব নাকি পরে?

উনি এবং উনার খয়েরি জুতা কিছুদিনের মধ্যেই আমার লাইফে একটা রেভোলুশ্যান তৈরি কইরা ফেললেন।

উনি আমারে শিখাইলেন ভাইস প্রিন্সিপ্যালের গাড়ির সাইলেন্সার বক্সে আলু ঢুকায়ে কেমনে গাড়ি জ্যাম করতে হয়, শিখাইলেন বাড়ি থাইকা পালানো, শিখাইলেন স্কুলের পিছে বেগম খালেদা জিয়ার বাড়িতে গার্ডদের মুখের সামনে টেনিস বল ছুইড়া ফেইলা নির্বিকার দেওয়ালে পা ঝুলায়ে বইসা স্কুলের ক্যান্টিনের চপ আর সিঙ্গাড়া খাওয়া, শিখাইলেন টিচার্স কোয়ার্টারে খান স্যারের লাগানো প্রিয় জাম গাছের জাম চুরি কইরা সেইটা উনার বাসার সামনেই ফালায়ে রাইখা আসা—(আমরা কেউ জাম খাই না, এতগুলা জাম নিয়া আমরা করবই বা কী?)

তো সেইদিন ছিল স্কুলের লাস্ট ডে, সেইদিন ইলা জাহানের বুদ্ধিতে উনি, আমি আর মঞ্জরি সংসদ ভবনে ভিক্ষা করতে গিয়া পার পারসন ৮০ টাকা ইনকাম করছিলাম (তার আগে ট্যাক্সি ভাড়া বাবদ ৮০ টাকা ও কোয়ালিটি ফাস্ট ফুডে ৫৫ টাকা খরচ হইছিল। ফাস্ট ফুডওয়ালারা ফকিরনিদের দোকানে খাইতে দিবে না এমন বলায় ইলা জাহান উনাদের শেখ সাদির গল্পও শুনাইছিলেন, তাতে লাভ হয় নাই। দোকানের বাইরে দাঁড়ায় আমাদের ভিক্ষার্জিত চিকেন প্যাটিস খাইতে হইছিল।)

কোয়ালিটি ফাস্ট ফুডে বাম থিকা ইলা জাহান, আমি ও মঞ্জরি—লেখক
কোয়ালিটি ফাস্ট ফুডে বাম থিকা ইলা জাহান, আমি ও মঞ্জরি—লেখক

সেইদিন রাত্রেই আবার আমার মহাগর্বে বলা এই গল্প শুইনা আমার মাতাশ্রী আমারে বাসা থাইকে বাইর কইরা দিছিলেন। (এই গল্প আগেও বলছিলাম বইলা মনে হয়।) তো—আমি তখন তখনই আমার ৮০ টাকা নিয়া বাসা থাইকে কানতে কানতে বাইর হইয়া একলা একলা বাসে চইড়া মাদারিপুর চইলা গেছিলাম।

মাদারিপুরে গিয়া আমি বহু কষ্টে আমার এক ফুপুর সন্ধান করলাম। তখন আমার কাছে মোবাইল ফোন নাই, কারো নাম্বারও আমার জানা নাই। সেইটা অন্য গল্প, অন্য কোনো সময় বলা যাবে! তো, ফুপুর বাসায় ধাতস্থ হওনের পর আমার ফুপাতো বোনের চাচাতো ভাই আলামিন আমারে কইলেন, এইখানে নানক বইলা এক ভদ্রলোক আছেন, যিনি নাকী ‘সুবহে সাদিক’-এর ‘আগে’ এক ঘণ্টা ও ‘পরে’ এক ঘণ্টা হাত দেখেন।

আমার আসার খবরে ও নানকের গল্প শুইনা ফরিদপুর মেডিকেলের থার্ড ইয়ারে পড়া আমার চাচাতো বোন সোমাও অতি উৎসাহী হইয়া সেই রাত্রেই মাদারিপুর চইলা আসলেন। পরদিন ভোর তিনটায় আমরা রওনা হইলাম চরমুগুরিয়া বইলা এক জায়গার উদ্দেশ্যে।

গাড়ি চালাইতেছেন আলামিন, তার পাশের প্যাসেন্জার সিটে আমি, পিছে বসছেন আমার ফুপাতো বোন লুনা আর চাচাতো বোন সোমা। সোমার ব্যাপারে আলামিনের বিশাল প্রেম বোঝা গেল উনার বেপরোয়া ভঙ্গিতে গাড়ি চালানো দেইখা। সোমা আপু যতই বলেন, “আলামিন ভাই আস্তে গাড়ি চালান!”, উনি ততই জোরে গাড়ি চালান। তখন কাছেই কোথাও ফজরের আজান হইতেছে, রাস্তায় সাদা জামা পরা মুসল্লিদের দেখা যাইতেছে। আলামিন সেই সময় নিচু হইয়া নতুন কেনা কাস্টমাইজড হোন্ডা সিভিক গাড়ির নতুন সিডি প্লেয়ারে মাইলসের গান ‘ধ্বিকি ধ্বিকি আগুন জ্বলে’ বদলাইয়া ‘নিঃস্ব করেছো তুমি’ বাজাইতেছেন এবং ব্যাখ্যা করতেছেন কেন মাইলসের বেশিরভাগ গানের অ্যালবামের নাম প্রত্যাশা প্রতিশ্রুতি প্রত্যয় প্রবাহ প্রয়াস টাইপ—আর তখন গাড়ি উইঠা আসল একটা স্লোপের মাথায়। উনি তখন সোজা হইয়া বসছেন, আমি স্পিডোমিটারে দেখলাম গাড়ির গতি ঘন্টায় ১২০ থিকা ১৪০ কিলোমিটারে উঠল। গাড়ি তখন স্লোপ বাইয়া নামতেছে, স্পিডোমিটারের কাঁটাও উপরের দিকে উঠতেছে। লুনা হঠাৎ পিছন থিকা আমার সিট খামচায় ধরলেন, চিৎকার দিয়া উঠলেন, “ভাইয়া, সামনে দেখো!”

আমি পিছনে ফিরা সোমার সাথে গল্প করতেছিলাম। লুনার চিৎকারে সিট বেল্টের ভিতর দিয়া ঘুইরা সামনে তাকাইলাম। ততক্ষণে আলামিন ব্রেইক পেডাল চাপতেছেন, এক ধাক্কায় আমরা সবাই সামনের দিকে ঝুঁইকা যাইতেছি, এবং আমি এরমধ্যেই প্লেয়ারের শাফিন আহমেদের ‘ফিরিয়ে দাও, আমার এ প্রেম তুমি ফিরিয়ে দাও’ চিৎকারের মাঝে রাস্তায় টায়ারের ঘষা খাওয়ার চড় চড় আওয়াজ পরিষ্কার শুনতে পাইলাম। আরেকটা আওয়াজ হইলো ধপ কইরা। দেখলাম, আলামিনের পাশ দিয়া একটা সাদা জামা পরা তিন চার বছরের বাচ্চা মেয়ে গাড়ির বনেটের উপর দিয়া লাফাইয়া উইঠা আমার সামনের উইন্ডশিল্ডে বাড়ি খাইয়া আমার পাশ দিয়া গড়াইয়া রাস্তায় পইড়া যাইতেছেন। দুই তিন সেকেন্ড পরেই পিছন থিকা মুসল্লি মবের “ধর ধর ধর” আর পায়ের আওয়াজ শোনা গেল, আলামিন ফ্যাকাশে মুখে নিচু গলায় কইলেন, “এখন থামলে ওরা আমাদের মেরে ফেলবে!” সোমা হিস্টিরিয়া রোগীর মত ফোঁপাইতে ফোঁপাইতে কইলেন, “চলেন চলেন, এখন তাড়াতাড়ি গাড়ি চালান! তাড়াতাড়ি চালান এখন! চলেন এখান থেকে—”

আমি দেখলাম উইন্ডশিল্ডে মাকড়শার জালের মত সূক্ষ্ণ গোল একটা নকশায় সকালের সাদা আলো রিফ্লেক্ট করতেছে। তার ভিতর থিকা লাল রঙের রক্ত গড়ায়ে নামতেছে হোন্ডা সিভিকের সাদা বনেটের উপর। গাড়ির ভিতর ঘুইরা বেড়াইতেছে রংধনুর রঙ।

আমার আঁকা: অ্যাকসিডেন্ট —লেখক
আমার আঁকা: অ্যাকসিডেন্ট —লেখক

নানকের বাসায় আমরা যথাসময়েই পৌঁছাইলাম। অনেকক্ষণ দরজা ধাক্কাধাক্কির পরে হাতাকাটা গেঞ্জি, মানে বাংলাদেশে যা কোনো এক অজ্ঞাত কারণে স্যান্ডো গেঞ্জি নামে পরিচিত, আর লাল নীল সবুজ হলুদ রঙ্গের লুঙ্গি পরা বিশালদেহী একজন মানুষ বাইর হইয়া আসলেন। আমি এত রংচঙ্গা লুঙ্গি জীবনেও দেখি নাই। উনি উনার বিশাল সাইজের লোমশ হাতের উপর বান্ধা ততধিক বিশাল সাইজের সোনালি ঘড়ির উপর চোখ বুলাইয়া মাটির দিকে তাকাইয়া কইলেন, “আসসালামু আলাইকুম, নমস্কার, আমি সুবহে সাদিকের পর শুদুমাত্র এক ঘণ্টা বেগানা মাইয়া মাইনষের চেহারা দেহি। এখন এক ঘণ্টা পার হইয়া তিন মিনিট গেছে। আমনেরা আইতে পারেন।”

আলামিন বেসুরা গলায় কইলেন, “কিন্তু আমরা খুব দূর থেকে আসছি।” এরপর সোমার দিকে ইঙ্গিত কইরা কইলেন, “ও এসেছে ফরিদপুর থেকে, আজকেই চলে যাবে। কাল আবার ক্লাস আছে ওর। আপনার কথা শুনেই এসেছে!”

—আজকে দিন ভালা না। আইজকে প্রেতের বাইর হওনের দিন।

—কীসের বের হওয়ার দিন?

—প্রেত। জ্বিন। আত্মা। আমি শরীরবন্ধন দিব আজকে। আমনেরা আসেন। আসসালামু আলাইকুম, নমস্কার।

লুনা পিছন থিকা ফস কইরা বইলা উঠলেন, “আমি তো জানতাম প্রেত-ট্রেত রাত্রে বের হয়। ওরা দিনেও ঘোরাঘুরি করে এখন?”

আলামিন চোখ গরম কইরা লুনার দিকে তাকাইলেন। নানক সাহেব কিছু না বইলা দরজা বন্ধ কইরা দিলেন খটাশ কইরা। ফেরৎ আসার পথে সোমা নিচু গলায় একবার কইলেন, “মেয়েটার একটা খোঁজ করা দরকার। ব্যাপারটা অমানবিক হলো।”

আলামিন উত্তর দিলেন, “হুঁ, আর গাড়িটাও পরিষ্কার করতে হবে।”

আমরা ফেরৎ আসলাম ফুপুর বাড়িতে। আলামিন দুপুর বেলা একলাই বাইর হইলেন বাচ্চা মেয়েটার সন্ধানে। বেশ সন্ধ্যায় উনি যখন বাসায় ঢুকতেছেন, তখন উনার চেহারা ঘূর্নিঝড়ের মাঝখানে পড়া টিনের চালের মত দেখাইল। আমি জিগাইলাম, “পাইছেন? বাঁইচা আছে এখনো? কী অবস্থা মেয়েটার?”

উনি কইলেন, “ঘরের বাইরে আসো। বলছি। এখানে অন্যরা শুনতে পাবে।”

আমি, লুনা আর সোমা বাইরে বাইর হইয়া পুকুরের পাড়ে আইসা বসলাম। লুনা, উত্তেজনা ধইরা না রাখতে পাইরা প্রায় চিৎকার দিয়া বইলা উঠলেন, “এত নাটক করছো ক্যানো? কী হয়েছে বলো! মারা গেছে?”

—না।

—তো ইনজুরড হয়েছে?

—না।

“না মানে?” সোমা খড়খড়া গলায় বললেন, “মারা যায় নাই, ইনজুরডও হয় নাই। ফাজলামি করছেন নাকি আলামিন ভাই?”

আলামিন বেসুরা গলায় কইলেন, “মেয়েটার কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নাই। আমি আশেপাশের পুরা এলাকা চষে ফেলেছি। মসজিদে খোঁজ নিয়েছি, সকালে যারা প্রতিদিন নামাজে যায়, তাদের চারপাঁচজনের সাথে কথা বলেছি। আশেপাশের সবগুলি হাসপাতালে খবর নিয়েছি। ঐ যে যেখানে অ্যাকসিডেন্টটা হলো, ওখানেও গেছি। কোথাও রক্তের দাগ নাই, কেউ এমন কিছু দেখে নাই, শোনেও নাই।”

আমি বললাম, “কথা বানাইতেছেন না তো আলামিন ভাই? আমি তো, আমি তো—চোখের সামনে দেখলাম।”

—তুমি যা দেখেছো, তিথি, আমিও তাই দেখেছি। কথা বানাবো কেন? তুমি চল আমার সাথে কালকে। আমি একবার ভাবলাম হিন্দু মেয়ে নাকি। এখানে হিন্দু মানুষ তো অনেক! ভাবলাম লাশ এর মধ্যেই পুড়িয়ে-টুরিয়ে ফেলল নাকি। তাজ্জব ব্যাপার! এরকম কিছু নাকি হয়ই নাই, উলটা মসজিদের ইমাম আমাকে বললেন, আমার মাথা-টাথা সুস্থ আছে কিনা! বললেন, কোন্‌ মুসল্লি সাতসকালে ‘মেয়ে’ বাচ্চা নিয়ে নামাজ পড়তে বের হয়, বলেন! বললেন, আর বাপ মা কেনইবা হাইওয়েতে অত সকালে বাচ্চা নিয়ে হাওয়া খেতে বের হবে? তারপর ঐ যে—যেখানে ব্যাপারটা হল, আমি সেখানের এক চায়ের দোকানের মালিকের সাথে কথা বললাম। সে এরকম কিছু দেখেই নাই। অথচ তার দোকানটা ঠিক রাস্তার পাশে। সে বলল, এত হৈচৈ হবে, আমি শুনব না, দেখব না, তা কীভাবে হয়?

আমরা সেই রাত্রে ঘুমাই নাই। মানে ঘুম আসে নাই। গাড়ির মাকড়শার জালের মত উইন্ডশিল্ডে হাত দিয়া বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক-অবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে সারা রাত কাটল আমাদের। পরদিন সুবহে সাদিকের আগেই আমরা তিনজন নানকের বাড়ি গেলাম আবার। সোমা সকালে ক্লাস ধরতে ফরিদপুর চইলা যাবেন তাই আসেন নাই। আমি গিয়া বসলাম নানকের বাসার বারান্দার অন্ধকারে। সেইখানে চটের বস্তা আর কালো কাপড় দিয়া চারদিক ঘেরা। নানক আইসা বসলেন আমার সামনে। আজকেও উনার পরনে বহুরঙা লুঙ্গি আর সোনালি ঘড়ি। তবে আজকে ঊর্ধ্বাংশ খালি। আমি কলম দিয়া দাগানো জীর্ণ অয়েলক্লথ ঢাকা একটা টেবিলে আমার দুই হাত মেইলা বসলাম। উনি আমার হাত ধইরাও দেখলেন না। একটা কাগজ উনার সামনে টেবিলে, সেইখানে উনি মাকড়শার জালের মত বৃত্তের ভিতর বৃত্ত আঁকতে থাকলেন মিনিট দশেক সময় নিয়া। আমি ততক্ষণে বিরক্ত হওয়া শুরু করছি। ততদিনে আমি জানি, দুনিয়াতে অসৎ এবং ভণ্ড মানুষের সংখ্যা প্রচুর। উনি কাগজে মাকড়শার জাল আঁকতেছেন, আমি গুনতেছি উনার শরীরে কয়টা তিল আছে। একত্রিশটা পর্যন্ত গুনলাম, উনি কথা কওয়া শুরু করলেন। “কাগজ আছে আমনের কাছে? আমি যা বলব, তা তো লিখা নিতে হবে, মুনে থাকবে না আমনের।”

—মনে থাকবে। আমার মেমরি খুব শার্প। আপনি বলেন। বলেন তো আমার কয়টা বিয়ে?

—মুনে থাকবে না মামুনি। আমনের স্মৃতিভ্রংশ হবে একদিন। আমনে লেইখা নেন। কাগজ না থাকলে অসুবিদা নাই। আমার কাগজ কলম আছে। অ্যাই, শরিইইইইইইইফ!

শরিফ বইলা একটা বাচ্চামত ছেলে হাতে কাগজ কলম নিয়াই বারান্দায় আসলেন। উনার দৃষ্টিও মাটির দিকে। উনিও সুবহে সাদিকের এক ঘণ্টা আগে পরেই শুধু বেগানা মহিলা দেখেন কিনা জিগাইতে মন চাইল। উনি টেবিলের উপর কাগজ কলম রাইখা নিঃশব্দে আবার ঘরের ভিতর চইলা গেলেন। বোঝা গেলো, এইখানে কোনো মহিলাই কাগজ কলম নিয়া হাত দেখাইতে আসেন না। নানক আমারে বললেন, “লেকেন—”

আমার আঁকা: হাত দেখা —লেখক
আমার আঁকা: হাত দেখা —লেখক

আমি লেখা শুরু করলাম। অত্যন্ত বিরক্তি নিয়াই করলাম। উনি আমারে অনেকগুলা সংখ্যা দিলেন, অনেকগুলা তারিখ দিলেন। বললেন, “আমি না দেইখা কারো কথা বলি না বিদায় (বিধায়) আমনের বিবাহ বা সন্তান-সন্ততি পিতা-মাতা নিয়া কিছু বলব না। আমনের শইল সাস্ত, আমনের চাকরি-বাকরি, ব্যাবসা-বাণিজ্য, আয় উপার্জন, পড়ালেখা ইত্যাদি বিবিদ জিনিস আমি তারিক সহ বলতেছি। আমনে টুইকা নেন। কিছু প্রইশ্ন থাকলে আমার বলা শেষ হইলে করবেন।”

আমি টুইকা নিলাম। এক পৃষ্ঠা শেষ হইয়া দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় গেলাম। উনি বলতেছেন, আমি লিখতেছি, “আমনের প্রতম ক্যান্সার রোগ দরা পড়বে ২৩ বছছর বয়সে।” আমি চমকায়ে গেলাম, প্রথম ক্যান্সার মানে? উনি বলতেছেন, “মারা যাবেন না। দ্বিতীয় ক্যান্সার রোগ দরা পড়বে ২৬ বছর বয়সে। সেইটা ডেন্জারাস হবে, কিন্তু মরবেন না। সেইটা আবার ফিরত আসবে—” আমি একটানা লিখলাম। একমাস পরে বাড়ি ফিইরা আমার ডায়েরিতে সবকিছু নোট কইরা রাখলাম এবং বেমালুম ভুইলা গেলাম যতদিন না পর্যন্ত প্রথম ঘটনাটা ঘটল।

***

একটা অতি সাধারণ ঘটনা।

নিউ ইয়র্কের পারসন’স স্কুল অফ ডিজাইন থিকা আমি ফ্যাশন ডিসাইন পড়ার জন্য একটা ফুল স্কলারশিপের অফার পাইছি। কিন্তু আমার পিতৃদেব আমারে কিছুতেই একলা একলা এ্যামেরিকা যাইতে দিবেন না। বাপের সাথে রাগ কইরা আমি ঘরের দরজা বন্ধ কইরা ৫৩টা ঘুমের অষুধ খাইয়া ফেললাম। বিছানার পাশে বেড সাইড টেবিলে খুব আবেগঘন একটা সুইসায়েড নোট লিখা রাখলাম। সমস্ত গোপন জিনিস একটা ‘রেড কাউ’-এর খালি কৌটায় ঢুকায়া আগুন ধরাইলাম, তারপর ছাইগুলি বাথরুমে ফ্লাশ কইরা দিলাম। ডায়েরির বেশিরভাগ পাতা ছিড়া ফেললাম। এরপর ঘরের এ-সি অন কইরা গায়ে কাঁথা দিয়া বিছানায় মরার উদ্দেশ্যে শুইয়া পড়লাম।

তো পরদিন সকালে আমি মহানন্দে যখন মইরা যাওয়ার পরে নিজের ঘরেই জাইগা উঠলাম, তখন বুঝতে পারলাম, আমি আসলে মরি নাই। বিছানার পাশে ‘রেড কাউ’ ভর্তি এখন বমি এবং অসুধের অবশিষ্টাংশ, বুঝলাম ঘুমের মধ্যেই আমি বমি কইরা সব অসুধ বাইর কইরা দিছি। আশেপাশে উঁকিঝুঁকি দিয়া বুঝলাম, কোথাও কোনো কান্নাকাটি হইতেছে না, আমার বাপ মা মহানন্দে ডায়নিং টেবিলে বইসা খাস্তা পরোটা ও গরুর মাংসের ঝোল খাইতেছেন। নতুন কইরা আবার একই নাটক করার ইচ্ছাও আমার ততক্ষণে শেষ, বমি-টমি গোপনে বাথরুমে পরিষ্কার কইরা, সুইসায়েড নোট বারান্দা দিয়া নিচে ফালায়া আমি সুবোধ বাচ্চার মত বাপ মায়ের সাথে টেবিলে গিয়া বসলাম। মা আমারে বললেন, আমার জন্য চিনি দিয়া পরোটা ভাজা হইছে। আমার নিজেরে হঠাৎ খুব সুখী সুখী মনে হইল। তবে কী কারণে এখন আর মনে নাই, সেইদিন বিকাল বেলাতেই আমি আমার তিন বছরের পুরানা ডায়েরি খুঁইজা বাইর করলাম আমার আলমারির লেপ ও কম্বলের তলদেশ থিকা। নানকের কাছ থিকা পাওয়া হাবিজাবি টুকরা টাকরা তথ্য ও তারিখ ও সংখ্যা বহুল ঐ পাতাটা বাইর করতেই দেখি সেইদিনের তারিখের পাশে ৫৩ সংখ্যাটা এবং ছোট একটা নোট লিখা। বেশ কিছুক্ষণ তাজ্জব হইয়া বইসা থাইকা ইন্টারনেট সার্চ কইরা ‘প্লাসিবো ইফেক্ট’-এর উপর জ্ঞানার্জন কইরা ফেললাম সারারাত ধইরা।

প্লাসিবো ইফেক্ট হইলো এক ধরনের ফেইক ট্রিটমেন্ট, যেইখানে রোগীরে চিনি, পড়া পানি, হোমিওপ্যাথ অষুধ, সেইলাইন ওয়াটার জাতীয় হাবিজাবি জিনিস খাওয়ায়ে বুঝ দেওয়া হয় তিনি ভালো হইয়া যাবেন, এবং রোগীও অষুধের বা ডাক্তারের বা ঈশ্বরের প্রতি অন্ধবিশ্বাসে রোগ থিকা ভালো হইয়া ওঠেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পর, নুমেরবার্গ ট্রায়ালের সময় প্রচুর থাইরয়েড ক্যান্সার আক্রান্ত ‘টার্মিনালি ইল’ রোগীদের উপর প্লাসিবো ইফেক্ট নিয়া ‘গবেষণা’ হয়, তখন দেখা যায়, মানুষের ‘অবচেতনে’ ঢুইকা যাওয়া তথ্য দিয়া মানুষ এমনকি নিজের ভাগ্য ও মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেছেন।

বুঝলাম, কোনো না কোনোভাবে আমার অবচেতনে এই সংখ্যা আর তারিখগুলি ঢুইকা গেছে তিন বছর আগে, এবং আমি সেই অনুসারেই আমার লাইফ কাটাইতেছি। এবং এইখান থিকা না বাইর হইতে পারলে হয়ত সারাজীবনই কাটাব!

পাতাটা ছিঁড়া টুকরা টুকরা করলাম, কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ফালাইতে পারলাম না। এরপরে আরো বহুবার সেই একই ছিঁড়া পাতা আরও আরও আরও ছোট কইরা ছিঁড়া হইছে, সেইগুলারে আবার সেলোটেইপ দিয়া জোরাও লাগানো হইছে, কিন্তু তারে মাথা থিকা বাইর করা আমার সম্ভব হয় নাই।

যেইদিন দ্বিতীয়বারের মত ডাক্তার খুব মমতা নিয়া আমারে জানান, আমার এক বছরের বেশি আয়ু নাই, তখন আমি অত্যন্ত কনফিডেন্সের সাথে ডাক্তারের হাত আমার হাতের পাশে টাইনা আইনা উনার আয়ু রেখার দিকে আঙুল তাক কইরা বললাম, “এক বছর মানে? দেখেন, আপনার আয়ু রেখার চাইতে আমার আয়ু রেখা লম্বা। আমি এখন অবশ্যই মারা যাচ্ছি না!”

তখন আমার শরীর ‘কিমো’ রিজেক্ট করতেছেন, আমার শরীর কোনো খাবার, কোনো সেইলাইন নিতে পারতেছেন না, ডায়ালিসিসে কাজ হইতেছে না, অর্গ্যান ফেইল করতেছেন একের পর এক, গাছ থিকা কালবৈশাখীর ঝড়ে আম পড়া স্টাইলে মাথা থিকা চুল পড়তেছেন টপাটপ, কিন্তু আমি তখনো জানতাম, আমি মারা যাইতেছি না। এবং মারা গেলামও না।

***

আমি জো’রে বললাম, “আমি জানি না। আপনি সত্যি সত্যি ভবিষ্যৎ দেখতে পান?”

—নাহ! আমি একসময় খুব অসুস্থ ছিলাম। তখন খুব হেলুসিনেশান হতো। এরপর আমি সুস্থ হয়েছি ঠিক, কিন্তু চোখ বন্ধ করলে এখনো বিভিন্ন জিনিস, বিভিন্ন ঘটনা, বিভিন্ন মানুষ দেখতে পাই।

—আমি এইসব ভুংভাং জিনিসে বিশ্বাস করি না।

—বিশ্বাস না করাই ভালো। আমি একজন স্কিৎজোফ্রেনিক রোগীই মাত্র। আমার কথা না শোনাই স্বাস্থ্যকর, হাহা! আর অ্যাট দ্যা এন্ড অফ দ্যা ডে, সমস্ত অতিপ্রাকৃত জিনিসেরই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে! পোকার খেলবে না? টেক্সাস হোল্ডেম পোকার, সেটা তো সবাই পারে, তুমি পারো না?

আমরা রাত দেড়টা পর্যন্ত পোকার খেললাম। সারি রবিনসন চোরামিতে এক নাম্বার, উনিই সবসময় এইসব খেলায় জিতেন, কিন্তু খেলা শেষ হওয়ার আগে কেউ তার চোরামি ধরতে পারেন না। ধরা পড়ার পর উনি অম্লানবদনে বলেন, “প্রেম ও যুদ্ধে সবকিছু অ্যালাউড!”

(কিস্তি ১০)