রোমানা

হায়দারের অনুরোধে আর নিজের গরজে লিজা তার পেশকার চাচারে বইলা কইয়া রুশোরে বাইরে আনার জোর চেষ্টা করতে থাকে।

রুশোর জেল জীবনটা সইয়া গেছে। রুশোর জেলে যাওয়াটা একদম তুচ্ছ একটা ঘটনা নিয়া।

রুশোর জন্য আত্মহত্যা চেষ্টা প্রায় আট দশ বছর ধইরা একটা রুটিন হইয়া গেছে। ও আসলে প্রেসার নিতে পারে না, একটু এদিক ওদিক হইলেই জীবন থিকা নিজেরে গুটায় নেয়। প্রথম প্রথম রুশোর আত্মহত্যার চেষ্টাগুলা আন্তরিক ছিল, পরের চেষ্টাগুলা অভ্যাসবশে। রুশোর মা নাসরিন মারা গেছেন এক বছরের একটু বেশি হয়, রুশো সাড়ে পাঁচ মাস হয় জেলে।

রুশোরে দেইখা ফেরার পথে হায়দার সিগারেটের দোকানে থামলেন। দোকানে কেউ নাই দেইখা তিনি এদিক ওদিক তাকাইতেছিলেন, ছেলেটা অদূরেই, ওভারব্রিজের নিচে বইসা হায়দাররে উদ্দেশ্য কইরা হাত নাড়তেছিল আর মুখভর্তি ভাত নিয়া  অবোধ্য আওয়াজ করতেছিল। হায়দার খুটায় খুটায় তার ভাত খাওয়া দেখতে লাগলেন।

বৃষ্টি হইছিল এইদিকে, খুব বেশি না, অথচ পানি আটকায় আছে রাস্তার ঢালু দিকটায়। সিগারেটের প্যাকেট পকেটে নিয়া হায়দার পানির মধ্যে বসানো লাল ইটের ব্রিজ পার হওয়ার লাইনে দাঁড়ানোর ধৈর্য্য পাইলেন না, প্যান্ট একহাতে একটু উঁচু কইরা ছোট্ট একটা লাফ দিলেন, তার বয়স ৬৫ হওয়ার জন্য মনে হয় লাফের হিসেবে এদিক ওদিক হইয়া গেল, চাইরদিকে পানি ছিটায় তিনি পানির মধ্যেই পড়লেন। ইটের লাইনে থাকা একজন কিছু একটা বলতে যাইয়া, হায়দারের বয়স দেইখা কথাটা শেষ করলেন না। সিনিয়র সিটিজেন ট্রিটমেন্ট পাইয়া তার যেন ভাল লাগল।

বড় রাস্তা থিকা তার বাড়ি বড়জোর পাঁচ মিনিটের রাস্তা। রিকশা নিবেন না হাঁইটা যাবেন সেইটা ভাবতে ভাবতে সিগারেট ধরাইলেন। ঠোঁট শুকায় ছিল, আলতো ভাবে সিগারেট দুই আঙুলের খাঁজে নিয়া নামাইতে কালে ফসকায় সিগারেটের আগুনের উপর দিয়া আঙুল চইলা গেলে আগুনের স্পর্শে খানিক চাঙা হইলেন—তার রোমানারে দেখতে ইচ্ছা হইল।

রোমানা নাসরিনের সম্পর্কের খালাত বোন হয়। হায়দার-নাসরিনের বাসা থেকে বিএ পরীক্ষা দিছিল, নকল করার সুবিধার জন্য—সেই সময় কুড়িগ্রাম নেহাতই একটা মফস্বল হইতে থাকা গ্রাম। রোমানা যতটা সুন্দর তার থিকা অনেক বেশি আকর্ষণীয়। এখন বরং একটু বেশিই, আবেদনময়ী। রোমানার সাথে, ঐ যে বিএ পরীক্ষা দিয়া রোমানা গেল, তারপর নাসরিনের মইরা যাওয়ার দিন দেখা। রোমানার পাছা দেইখাই  হায়দার পেছন থিকা তারে চিনতে পারছিলেন। রোমানা যখন হায়দারের বাসায় উঠছিলেন, তখন নাসরিনের অগোচরে তাদের ছোঁয়াছুঁয়ি হইছিল, চিরকুট চালাচালিও—নাসরিন যে একটুও আন্দাজ করেন নাই, ব্যাপারটা হায়দার অবিশ্বাস করতেন।

প্রায় ছয় মাসের অসুস্থতার সময় নাসরিন যতবার হায়দাররে ডাকছেন, হায়দারের মনে হইছে প্রায় ১৫ বছর আগের হায়দারের যে স্খলন তা নিয়া তারে কিছু বলবেন নাসরিন। নাসরিন অমন কিছু বলেন নাই। নাসরিন চাইপা গেছিলেন, নাকি আদৌ বোঝেন নাই?

২.
নাসরিন মারা যাওয়ার পর রুশোর সাথে হায়দারের কমিউনিকেশন গভীর হইতে থাকে। হায়দার পরে মনে করতে থাকেন নাসরিন খুব অকারণ রুশোর মানসিক অবস্থারে একজাযারেট করছিলেন।

রুশোর বয়স প্রায় তিরিশ। দেখলে কেবল কৈশোর পার হওয়া তরুণ লাগে। রুশোর আত্মহত্যাচেষ্টাগুলা নাসরিন খুব ব্যক্তিগত ব্যর্থতা মনে করতেন। হায়দারের দূর সম্পর্কের এক মামা পাগল ছিলেন—মৃত্যুর কয়দিন আগে নাসরিন রুশোর এই মানসিক অবস্থারে হায়দারের বংশগত রোগের জের হিসাবে দেখাইতে চাইছিলেন। হায়দার প্রথম প্রথম এর বিরোধিতা করছেন, পরে মানায় নিছেন।

রুশোর গোটা জীবনযাপন হায়দারের ভাল লাগত। রুশোর ভাল লাগা এবং না লাগাগুলা হায়দারের নিজের খুব অপরিচিত লাগে নাই।

আবার মেঘ ডাকতেছে, যেন আকাশ নিচু হইয়া আসতেছে, এক্ষুনি ভাইঙ্গা পড়বে, বড় বড় ফোঁটায়—রাস্তার গাছ বাতাসে ভেজা গায়ে দুলতেছে, মানুষ আর দোকান চঞ্চল হইতেছে, হায়দার কী করবেন তাই ভাবেন। অসহায়ের মত আশেপাশে তাকান, রিকশা নেয়ার আগে তার জানি কী করার কথা? রোমানার উপর রাগ হইল। “বালের বৃষ্টি”—হায়দার বিড়বিড়াইলেন। বৃষ্টির প্রতি এমন কোনো বিদ্বেষের কারণ নাই—এমন কোনো বড় কাজ বৃষ্টির জন্য হায়দারের থাইমাও নাই, অথচ তার ইদানীং প্রতিটা ঘটনা নিয়া ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া থাকে।

রুশোর ভবিষ্যৎ নিয়া ভাবছিলেন নাসরিন—সুন্দর দেইখা একটা মেয়ের সাথে বিয়া দিলে ন্যাটা সাফ—বাড়ি ভাড়ার টাকায় রুশো তার বউ নিয়া বেশ ভাল চালায় নিতে পারবে। হায়দারদের বাড়ি চাইর তলার পর পাঁচতলা হইতে না হইতেই নাসরিন মারা গেছেন।

৩.
রুশো জেলে গেছে একদম অকারণ। রুশোর আত্মহত্যাচেষ্টাগুলা মোটেই  ভায়োলেন্ট ছিল না। রুশো মরতে চাইত না—প্রথম দুই একটা ব্যর্থ অ্যাটেম্পট হয়ত সে মরার জন্যই করছিল, পরে অভ্যাসের বশে—এইটাই তার এক্সিট উইন্ডো হইয়া উঠছিল।

ঘুমের ওষুধ, ট্রেন লাইন ইত্যাদি সে এজতেমাল করতে চাইত। অবশ্য এসবের সাথে যেইটা খুবই ভয়াবহ ছিল তা হইল তার নার্ভাস ব্রেক ডাউন। খুব তুচ্ছ ব্যাপারে তার ব্রেকডাউন ঘটত, খিঁচুনি—তার কপালের দুই পাশের রগ লাফাইত অনবরত।

তার চাকরি বাকরি যোগার করা তেমন কঠিন হয় নাই, আবার সে চাকরিও ছাড়ত খুব ছোটখাট ঘটনায়।

কখনো বসের সাথে রাগ কইরা—চাকরি ছাইড়া ফেরত আসত লাল মুখ করে। তার উর্দিপরা লোকজনের ব্যাপারে ভয় ছিল। বাড়িগুলার সিকিউরিটি গার্ডরেও সে ভয় পাইত, আর তার যৌনতাবোধ একটু অন্যরকম।

নাসরিন তার ছেলেরে অযৌন ভাইবা গেছেন ছেলের ত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত—এইটা অবশ্যই জোর কইরা ভাবছেন, নাইলে ছেলের বিয়া দিয়া দিলে সব ঠিক হইয়া যাবে এমন সিদ্ধান্তে তিনি আসতেন না।

হায়দার নাসরিনের মৃত্যুর পর রুশোর ব্যাপারটা ভালভাবে ধরতে পারছিলেন। হায়দারের সাথে রুশো ব্যাপারগুলা শেয়ার করছিল, যেমন বেশ্যাপাড়ায় যাওয়া, পাশের বাড়ির মহিলার জানালা দিয়া শরীর দেখতে দেখতে হাত মারা, ফোন সেক্স, আর দশ টেরা পর্ন। রুশো যেটুকু বলছে হায়দার তার অভিজ্ঞতার বাটখাড়ায় ওজন কইরা দেখছেন এই খানিক অনিয়ন্ত্রণ খুব যে মারাত্মক, তা না।

হায়দার মাঝে মাঝেই আইসা রুশোরে বলতেন “ইউ শ্যুড অ্যাভয়েড মাস্টারবেশন”—হায়দার এমনই কোনো উপদেশ দিতে কালে ইংলিশ বইলা ফেলতেন। এই কথা শুইনা প্রথমে রুশো বিব্রত হইত, পরে সে জিনিসটা স্বাভাবিক ভাবে নিছিল।

রুশোর জেলে যাওয়ার  ঘটনাটা এমন, রুশোরে সাথে ফোন সেক্স হইত এমন একটা মেয়ে রুশোর সাথে সামনা-সামনি দেখা করতে চায়, ঐ মেয়ের বান্ধবীর বাসায়। মেয়েটা ঘরে ঢুইকাই কয়, “একহাজার টাকা দেও তো ইয়াবা আনি”—রুশো টাকা বাইর কইরা দেয়। টাকা লইয়া মেয়েটা পাশের রুমে কারে জানি টাকা দেয়।

ফিইরা আইসা কয়, “ততক্ষণে আসো একটা কাজ কইরা ফেলি।”

আধা অন্ধকার রুমে বরিশালের ভাষায় কথা বলে, কাপড় খোলে, অথচ জানায় তার বাড়ি রাজশাহী।

রুশো মেয়েটারে লাগাইতে না লাগাইতে পুলিশ আইসা হাজির। রুশো এই রকম ফাঁদে পড়ার চিন্তা কইরা আসছিল, কিন্তু এমনে ঘইটা যাবে সেটা আন্দাজ করে নাই। পুলিশে ঢুইকাই জিগায়, “এই তোরা এইখানে কী করিস?”

রুশো ঘাবড়ায় যায়, তার ঘাবড়ানো দেইখা পুলিশ হাতকড়া পরাইতে লাগে, রুশো ভয় পাইয়া যায়। রুশো কয়, “আমরা এইখানে গল্প করতে ছিলাম।”

“তাইলে এইখানে কনডম পইড়া আছে কেন—কাপড় খুলায় চেক করব?”

তখন রুশো চুপ কইরা থাকে। মেয়েটা মাঝে বলা শুরু কইরা দেয়, “আমারে মাফ করেন—বাসায় জানলে আমার তালাক হইয়া যাবে, আমরা একবার কাজ করছি।”

তখন রুশো তোতলাইতে থাকে—এই রকম যৌন অভ্যাসের জন্য সে নিজের উপর বিরক্ত হয়, সে ইচ্ছা করলেই দালাল ধইরা মেয়ে মানুষ পাইতে পারত। নিজের বোকামির জন্য সে রাগতে থাকে—তার মুখ সাদা হইছিল, হাত পা কাঁপতেছিল।

পুলিশ তারে একটা  লেগুনায় নিয়া এদিক ঘোরে, অদিক ঘোরে, কিছু কয় না, খালি ধর্ষণ আর নারী পাচারের মামলার ভয় দেখায়, রুশো অস্বাভাবিক ভড়কায় যায়, পুলিশ একটা নেগোসিয়েশনে আসতে না আসতেই চলন্ত লেগুনা থিকা সে লাফ দেয়, আশেপাশে লোকজন জমে। পুলিশ বেকায়দায় পইড়া তারে থানায় নেয়।

থানায় একা যাইতে হায়দার অস্বস্তিবোধ করতেছিলেন, তাই এক উকিলরে নিয়া থানায় গেছেন। ব্যাপারটা মিটমাটের দিকে না নিয়া, কম বয়সের বালপাকনা উকিল বেশি কইয়া ফেলে—থানার ওসি কড়া লোক, উকিলরে তিনি পাত্তাই দিলেন না। কইলেন “আপনার ছেলের নামে অজামিনযোগ্য মামলা দিতেছি, কালকে কোর্টে চালান—আমারে আর কিছু বলবেন না, যত উঁচা থাইকা ফোন আসুক, আমি মানতেছি না।”

এইভাবেই রুশো আবার মামলা কোর্টে যাবে যাইতেছি কইরা সাড়ে পাঁচ মাস ধইরা জেলে রইছে।

হায়দার পুলিশের সামনে, উকিলের সামনে মেলা কান্দছিলেন, বারবার কইতেছিলেন “আমার ছেলেটা বাঁচবে না স্যার, আমার ছেলেটা বাঁচবে না ভাই, মা মরা ছেলে আমার।”

রুশো কিন্তু বাঁইচা যায়। বাপরে কয়, “আব্বা আপনি এদের হাতে পায়ে ধইরা এমন কইরেন না, আমি ভাল আছি, কয়দিন আপনারে দেইখা আমার লজ্জা লাগবে, আপনি এই সময়টায় আমারে জ্বালাইয়েন না—আমার কোনো সমস্যা হবে না, আপনি বাসায় যান, এমন কইরেন না, আমি লজ্জা পাইতেছি যে।”

পনের দিন পর জেলে দেখা করতে যাইয়া হায়দার রুশোরে প্রথমেই অনেক কথা বলতে লাগলেন, তিনি রুশোরে ছাইড়া আনার জন্য যা যা করছেন তা বলতে লাগলেন। এর মাঝে রোমানার সাথে দেখা হইছে সেইটা বললেন। রোমানারে যে তিনি চাইর তলার একটা ফ্ল্যাট ভাড়া দিছেন তাও বললেন।

রোমানারে রুশো চিনল না। হায়দার তারে মনে করার জন্য অনেক কিছু কইলেন। শেষে বললেন, “তোর মায়ের বিয়ের সময়” বইলা তিনি ভুল বুঝতে পারলেন, ঠিক কইরা বললেন, “মানে তোর মায়ের মারা যাওয়ার দিন, নেভি ব্লু পায়জামা পইরা আসছিল।”

রুশো অনেক ভাইবা ভাইবাও তেমন কাউরে মনে করতে পারল না। হায়দার স্বগতোক্তির সুরে বললেন, “মরার বাড়িতে এত কিছু মনে থাকেও না।” উচ্চারণের ভেতর একটা অপরাধবোধ কাজ করতেছিল হায়দারের। রুশো কিছু বলতে নিলে, পেছন থিকা এক কয়েদি কয়, “সিরাজ তোর শ্বশুর আইছে।”

রুশোর মুখ টকটকে লাল হইল, মনে হইতে পারে আকস্মিক তার গালের ভেতরের শিরা উপশিরা বিস্ফারিত হইছে।

জেলের ‘ভাই’ সম্পর্কগুলা অতিমাত্রায় শারীরিক। সিরাজ ছিঁচকা মাদক বিক্রেতা, থানা পর্যন্ত সে অনেকবার আসছিল, জেলে সে প্রথম।

যেহেতু জেলেও গাঁজা আর ইয়াবার চাহিদা রইছে সেহেতু এইখানেও সিরাজ সাপ্লাই দিতে শুরু করে। তার থিকা তার অর্ধেক বয়সের বউ লিজা শরীরের খাঁজে কইরা এইসব নিয়া আসে। সাপ্লাইয়ার হিসেবে তার জেলের ভেতরে অনেক রাঘব বোয়ালদের সাথে ভাল জানাশোনা হইয়া গেছে। রুশো যেদিন জেলে ঢুকছে সেদিন থিকাই সিরাজ তার ভাই।

রুশো জেলে আইসা বুঝতে পারছে জেলের খেলাটা উন্মুক্ত, এইখানে রাইট আর রং এর তেমন কোনো সীমানা নাই। সিরাজের ছায়ায় থাইকা সে অন্য কয়েদিদের কাছে বেশ সম্ভ্রম আদায় করতে পারছে। সিরাজের উপরেও তার প্রভাব আছে। ব্যবসার ক্ষেত্রে সিরাজ তার কাছে বুদ্ধি-টুদ্ধিও নেয়। পনের বিশদিনে এইটা রুশোর জন্য বড় অর্জন বলা যাইতে পারে।

হায়দারের এই ভয়টা কাইটা যায় যে তার ছেলে জেলের মধ্যে আত্মহত্যা-টত্যার চেষ্টা আর করতেছে না। পাঁচ মাসের মধ্যে রুশো লিজার সাথেও একটা সম্পর্ক পাতায় ফেলছে। কয়দিন পর পর পাঁচ ছয়দিন কইরা রুশো হাসপাতালে থাকে, সেই সময় হায়দার দেখতেন রুশো ঐ মেয়ের শরীর হাতাইতেছে আর মেয়েটাও আপত্তি করতেছে না।

লিজার শরীরগঠন তাকায় থাকার মত। বিশ বাইশ বছর হবে, উঁচা পাছা, বুক সেই তুলনায় কম সুগঠিত, চোখ নাক ঠোঁটে একটা সস্তা আমন্ত্রণ, সহজ এক্সেস পাওয়া যাইতে পারে বইলাই সে আরো সুন্দরী। লিজার চাচায় কোর্টের পেশকার। সিরাজরে প্রথম প্রথম লিজার বাইরে আনার চেষ্টা ছিল, পরে তার মনে হয় সিরাজরে বাইরে আনার কোনো মানে নাই। তারপরে রুশোর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকলে সে সিরাজরে পারলে আরও বেশিদিন ভিতরে রাখতে চায়।

সিরাজ রুশোর সাথে লিজার ভোল পালটানো নিয়া তার দুঃখের কথা বলে। রুশো তার সন্দেহরে আরও বাড়ায় দিতে থাকে। এমনকি জেল থিকা বাইর হইয়া দুইজন মিলা লিজারে ধর্ষণ কইরা মাইরা ফেলার আইডিয়াও দেয়।

সিরাজ দিনে দিনে রুশোরে একটু একটু শ্রদ্ধা করতেও লাগে। একদিন সে রুশোর কাছে মাফও চায়, রুশোরে সে ঐভাবে ব্যবহার করছে বইলা।

রুশো সিরাজরে সান্ত্বনা দেয়।—“ঐটা না হইলে তোর সাথে আমার বন্ধুত্ব হইত?”

সিরাজ আরো ভক্ত হইয়া যায় রুশোর। রুশো কাগজে হিসাব নিকাশ কইরা দেখায়, লিজার যদি আন্তরিকতা থাকত এই কয়মাসের ব্যবসার টাকায় সে সিরাজরে দুই বার বাইর করতে পারত।

পরে লিজা আসলে সিরাজ চেইতা অনেক কিছু কয়, “সাতভাতারি মাগি, খালি জেল থিকা বাইর হই না, তোর পেশকার চাচা বাল ফালাইতেছে?”

এইসব হায়দার আর রুশোর সামনে শুনতে হয় বইলা লিজা কাইন্দা ফেলে।

৪.
হায়দার প্রতিবার রুশোরে দেইখা আইসা রোমানারে লিজার গল্প শোনান। বেশিরভাগ সময় তিনি লিজাকে মোটা পাছার মেয়ে বইলা কথা শুরু করেন। বাক্যে অভব্য হইতে তিনি আনন্দ পান। রুশো যখন ছোট ছিল তারে চোখ কান ইত্যাদি দেখাইতে বললে, সে হাত দিয়া চোখ নাক দেখায় বাড়তি হিসেবে পিছনে হাত দিয়া বলত “আর এইটা পাছা।” হায়দার ব্যাপারটায় নিষ্পাপ সরলতাই দেখছিলেন। একদিন নাসরিনের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ অবস্থায় তিনি চোখ কান আর স্তনের প্রশংসা করতে করতে নাসরিনের নিতম্বে হাত রাইখা কন—“আর এইটা পাছা।” নাসরিন যেন শক খাইলেন, এমন ভাবে বিচ্ছিন্ন হইছিলেন হায়দারের স্পর্শ থিকা। নাসরিন এরপর অনেক দিন সহজ হন নাই আর।

নাসরিন ছিলেন প্রার্থনালয়ের মত নীরব আর দাম্ভিক। হায়দারের বউ ভাগ্য ভালো—এমনই বলছে লোকজন। এমনকি হায়দারের মা, তিনিও তার বেটার বউ ভাগ্য নিয়া  উচ্ছ্বসিত ছিলেন। হায়দার তার এত ভাগ্য নিয়া কাহিল হইয়া ছিলেন, নাসরিনের বিরুদ্ধে তিনি কোনো অভিযোগ করতে পারতেন না—এইটাই নাসরিনের বিরুদ্ধে তার একমাত্র অভিযোগ ছিল। এটা যে কত বড় চাপ দাম্পত্য জীবনে হায়দার কখনো কাউরে বলতে পারেন নাই।

এই যে ঢাকা শহরের মিরপুর দশে যে বাড়িটায় তিনি থাকতেছেন, সে জমিটাও নাসরিন কিনছেন তার জমানো টাকা থিকা, হায়দাররে অল্প কিছু টাকা যোগ করতে হইছে। নাসরিন দেখতেও সুন্দরী ছিলেন। তিন ছেলেমেয়েরে অনেক ভদ্রতা শিখায় বড় করছেন, বড় ছেলে-মেয়েরা সেই ভদ্রতাবোধ রপ্ত কইরা এখনো চর্চা করে। রুশোও করছে, কিন্তু রুশো জিনিসটা উপভোগ করে নাই, তার ভদ্রতায় একটু তাড়াহুড়া আছে।

৫.
রুশো রোমানারে খুব ভাল করেই চেনে, রোমানা পনের বছর বয়সের রুশোরে মাঝে মাঝে এমন কইরা জড়ায় ধরতেন, রিক্সায় চলার সময় রুশো ইচ্ছা কইরা রোমানার কৌতূহল উদ্রেক করা পেলবতারে চটকাইছে।

রুশো কিন্তু তার বাপের সাথে রোমানার চিরকূট চালাচালির ব্যাপারটা দেখছিল, রোমানার রুশোর প্রতি এই সহৃদয় আচরণরে রুশো ঘুষ হিসেবেই ফিল করছে, সেটা আহতও করছে পনের বছরের ভাবুকরে। নাসরিন রোমানার সাথে রুশোরে বের হইতে দেন নাই কিছুদিন পর। রোমানা নিয়া বাইর হইতে চাইলে নাসরিন কইতেন, “ওর তো কালকে পরীক্ষা”, “এখনই স্যার আসবে।”

মায়ের সবকিছু এমন কোমলভাবে না বলার বিরুদ্ধে রুশো মোটেই রাগ হইতে পারত না। এইখানেই হায়দারের সাথে তার ছোট ছেলের মিল। নাসরিন তাদের থিকা উঁচা নৈতিকতার মানুষ ছিলেন।

রোমানার সাথে কয় মাস আগে রুশোর দেখা হইছিল বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে, দুইটা বাচ্চা নিয়া তিনি ছিলেন, তার স্বামী একজন দশাসই পুরুষ। রোমানা পরিচয় কইরা দিছিল, “আমার ভাইগ্না, তোমারে নাসরিন আপার কথা বলছি না, তার ছোট ছেলে।”

রুশোর সেই কৈশোরের অভিমানটা আমার ফেরত আসছিল। নাসরিনের মৃত্যু হইছে শুইনা রোমানা কষ্ট পাইলেন যেন, মাথায় হাত বুলানোর জন্য কাছে আসছিলেন, বুকে জড়ায় ধইরা চোখের পানি ফেললেন রুশোর কাঁধে—রুশো সেই ভেজা উষ্ণ আলিঙ্গনে তৃপ্ত হইছিল। রুশোর ভাই-বোনরা কোথায়, রুশো বিয়া করে নাই কেন এখনো তা নিয়া প্রশ্ন করলেন, তার ভাই-বোনেরা নাসরিনের মৃত্যুতে দেশে আসছিলেন কি না, এইসব জিগাইলেন।

রোমানারা অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। এই তো পরশুদিন তাদের ফ্লাইট, বাচ্চাগুলা খুব ফটাফট ইংলিশ কয়। পাকনামি বেশি বেশি।

হায়দার রোমানার কথা যখন রুশোরে বললেন, রুশোর ক্লান্তি লাগছিল বইলা সে আর তার সাথে দেখা হওয়ার কথা বলল না। অথবা রুশো ঠিক বুইঝা সারতে পারে না, তার দেখা সত্য নাকি বাপের কথা সত্য। সে তখন এইসব না ভাইবা বরং লিজার কথা ভাবতে থাকে।

৬.
হায়দার বাড়ির থিকা ঠিক চাইর পাঁচ পা দূরে, তখনই বৃষ্টি শুরু। রোমানারে গিল্টে ফেলতে হায়দার চিন্তা করতেছেন বৃষ্টিতে ভিইজা যাবেন কিনা। পকেটে মোবাইল আর সিগারেটের প্যাকেট থাকায় তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন, অবশ্য দারোয়ানের রুমে এইসব রাখা যায়। বাড়ি পুড়া কমপ্লিট হয় নাই, দারোয়ান না—বাড়ির কাজ দেখার জন্য সুপারভাইজার আছে, হায়দারের  গ্রামের একটা ছেলে এইসব বালছাল তদারক করে—বিশ্বাসী। রোমানা ওঠার পর থিকা হায়দার ভাবছেন সেই সুপারভাইজাররে তাড়ানো উচিৎ। কিন্তু রোমানা কিংবা হায়দারের ব্যাপারে তার কৌতূহল কম। হায়দার ঢুকতেই তার সাথে দেখা—লিফট লাগানো নিয়া কিছু বলল, কবে জানি কে আসবে এমন একটা কথা শুনলেন।

সিমেন্ট গোলান হইতেছে, হায়দার ভেজা কাঁচা সিমেন্টের গন্ধের সাথে পুরুষ বীর্যের গন্ধের মিল পান।

আর একটা সিগারেট ধরান হায়দার, রোমানার লগে কথোপকথন কেমন হইতে পারে, তার একটা স্ক্রিপ্ট আওরান যেন।

—আসতে দেরি করলেন যে?

—বৃষ্টি হইতেছে।

—ও ছাদের কাপড় আনতে যাই।

তার সামন দিয়া যাইতে কালে হায়দার তারে জড়ায় ধরবেন, দেয়ালে ঠাইসা ধরবেন। কপট ছাড়ায় নেয়ার চেষ্টা কইরা কবুতরের মত বেহুদা ছটফট করবে রোমানা। হায়দার রোমানার গালে লালা ভরা চুমু দিলে রোমানা অভিযোগ করবে, “আজকেও এতো সিগারেট খাইছেন!”

তড়িঘড়ি কইরা রোমানার পায়জামার গিঁট খুলতে যাইয়া আরো গিঁট লাগায় ফেলবেন, রোমানা খিল খিল হাসবে। এইসব ভাবতে ভাবতে সিগারেটে দুইটা জোরে টান দিয়া, সিঁড়ি ভাঙতে লাগলেন।

৭.
রুশোর সিরাজের প্রতি সহানুভূতি করতে ইচ্ছা হয়, সিরাজ শুধু শরীরেই দামড়া হইছে, একদম মোটামাথা অথচ ভীতু। শিক্ষার প্রতি তার পৌত্তলিক আনুগত্য আছে। রুশো ভার্সিটি পড়ছে শুইনা সে আরো আপ্লুত হয়। যে কোনো বিষয়ে তার কাছে পরামর্শ নিতে আসে।

রুশো আরও চাইর পাঁচজন চ্যালা বানায় ফেলতে পারছে, তার মধ্যে একজন আছে সাদ্দাম। খুনের আসামি, খুনটা আসলেই সে করছে, বয়স বড়জোর বাইশ। মাথাভর্তি চুল আর বাম চোখের নিচে সেলাইয়ের দাগ—ক্রস চিহ্নের মত।

সাদ্দামরে সিরাজ বেশ ভয় পায়—সাদ্দাম আবার রুশোরে খুব মানে।

রুশোর সাথে লিজার সম্পর্কটা সাদ্দাম বোঝে, বার কয়েক সে রুশোরে বলছিল সে বললে সিরাজরে এইখানেই মাইরা ফেলতে পারে। রুশো কথাটারে আলগা ভাবে নেয় নাই। সাদ্দামের কোনো কিছুই আলগা না—রুশোর এতে হিংসা হয়।

সাদ্দাম খুন করছিল তার চাচারে। চাচাত বোনরে সে যে মাঝে মাঝে লাগাইত সেইটা নিয়া চাচায় আইসা তার মায়েরে বিচার দিতেছিল, সাদ্দামের বাপ নাই—মায়ে চাচার বেটির সাথে বিয়ার কথা পারলে, মায়েরে চাচায় বহু কিছু শুনায়। তার দুইদিন পর চাচারে সে খুব ঠাণ্ডা মাথায় মাইরা ফেলায়। রুশো ছাড়া সবাই জানে যে তারে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হইছে।

চাচার মেয়ে দুই একবার আসছিল জেলে সাদ্দামরে দেখতে। সাদ্দাম মেয়েটার সামনে খুব কান্দছে। বলছে তার সাথে ঝগড়া হইছে জাইনাই কে জানি এইটা করছে, সে জেল থাইকা বাইর হইয়া তারে মারবে।

সাদ্দামের জামিন যখন তখন হইয়া যাইতে পারে, রুশোরও। তারা দুইজন মিইলা সিরাজের কানে বিষ ঢালে লিজার নামে। তারে বুঝাইতে থাকে, সিরাজের বাইর হওয়ার আশা নাই একদম।

লিজা রুশোর প্রেমে পইরা যায়। রুশো কয়দিন পর পর হাসপাতালে যায়, তারে দেখতে হায়দার আর লিজা দুইজনেই যায়। রুশো যে সুযোগ পাইলে লিজার শরীর হাতায়, লিজার খুব ভাল লাগে। লিজা কেন জানি হায়দাররে খুব একটা পছন্দ কইরা উঠতে পারে না। হায়দারের অনুরোধে আর নিজের গরজে লিজা তার পেশকার চাচারে বইলা কইয়া রুশোরে বাইরে আনার জোর চেষ্টা করতে থাকে। লিজা আবার ভয় পায় সিরাজের বাইরে আসা নিয়া—রুশো জানায়, সে সিরাজের ব্যাপারটা সামলায় নিতে পারবে।

“তোরা সব এক এক কইরা বাইর হইয়া যাইতেছিস, আমার আর কী হবে” বইলা সে অনেকক্ষণ গালি পারে লিজারে, নিজের কপালরে।

রুশো তখন জেল পালানোর গল্প শুনায় সিরাজরে, “আমার ভাইরে ছাড়া আমি বেহেশতও যাব না”—এমন ভারি কথা শুনায়। জেল পালানোর মত দুঃসাহসিক কাজ সিরাজের মত ভীতু এক কয়েদি করতে রাজি হয়—রুশোর উপর অনেক আস্থা নিয়া। খুঁটিনাটি ইত্যাদি রুশো যা ভুংভাং বলে সিরাজ তাতেই কনভিন্স হয়।

জেল কোয়ার্টারের কিছু মেরামত চলতেছিল, ঐ পাশটা অন্ধকার, রুশো মিস্ত্রীদের সাথে ফিসফাস কথা কইত, ফিইরা আইসা সাদ্দাম আর সিরাজরে নিয়া মিটিং করত। জেলের গার্ডদের সাথেও রুশোর খাতির ছিল, তাদের সাথেও ফিসফাস কথা হইত তার। দেয়াল পার হইলেই ঐ পাশে একটা ড্রেন, ঐ পাশের ঢাকনা খোলা থাকবে। যেমন হঠাৎই দেয়ালের কাজ শুরু হইছিল হঠাৎই থাইমা যায়। বড় বড় কংক্রিটের চাঁই, ইট বালু পইরা থাকে একদিকে। নগ্ন ইটের দেয়াল খুব মজবুত না। রুশোর আর সিরাজের হইয়া জেল গার্ডরা ইট আলগা করতে থাকে—এই বাবদ গার্ড দুইজন বিশ হাজার টাকাও নেয়। সিরাজ ঠিক বিশ্বাস করতে পারে না ব্যাপারটা এমন সোজা, আবার রুশোর কথা সে অবিশ্বাস করতে পারে না।

৮.
রোমানার ব্যবহারে আজকে কেমন জানি, রুশোর জেলের বাইরে আসার সম্ভাবনা যত বাড়তেছে, রোমানার ব্যবহার যেন তত খারাপ হইতে লাগছে, রোমানারে তার লোভী মনে হইতে থাকে, নিজেরে হায়দারের রক্ষিতা আর হায়দাররে তার নাগর বইলা সে হাউকাউ বাঁধায়।

হায়দার স্ক্রিপ্টের বাইরে রোমানার প্রতিক্রিয়া দেইখা প্রথম প্রথম একটু হোঁচট খান। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে রুশোর সাথে কথা বইলা তিনি রোমানারে বিয়া করবেন, সে সেই কথা বললে, রোমানা আরও কিছু কথা শুনায় দেন।

পরের দিন হায়দার অনেক সিঁড়ি ভাইঙ্গা, চিলেকোঠার ঘরে যাইয়া দেখেন, রোমানা নাই। গত কালকের ব্যবহারের জন্যই রোমানা রাগ কইরা কোথাও গেছে ভাইবা তিনি দুঃখ পান। ঘরে অনেকক্ষণ বইসা থাইকা রোমানা আসার প্রতীক্ষা করতে থাকেন। রোমানা পরের দিনও না আসায় তিনি টেনশন করতে থাকেন।

রুশোর মামাদের ফোন দিয়া তিনি রোমানার হদিস করতে থাকেন, শোনেন যে রোমানা ঠাকুরগাঁও প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করে, তার বিয়া হইছে অনেক আগে, তিনটা বাচ্চাও আছে। ব্যাপারটা হজম করতে পারতেছিলেন না তিনি।

নিচে নাইমা সুপারভাইজাররে বলেন চাইরতলার ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়া মহিলাটারে সে বাইর হইতে দেখছে কি না? কোনও ফ্ল্যাটই এখন পর্যন্ত ভাড়া হয় নাই, সুপারভাইজার তা জানায়।

৯.
পেপারে ছোট্ট একটা জায়গায় লেখা “জেল পালাতে গিয়ে দেয়াল ধসে দুই কয়েদির মৃত্যু”—হায়দারের বুক ধর ফর করে, রুশো কি না কয়েদিটা। পেপারে কয়েদির নাম দেয়া নাই। তিনি দুইটা পালস মিস করেন। অনেক চিন্তা কইরা তিনি লিজারে ফোন দেন, লিজা ফোন তোলে না।

তিনি উকিলরে ফোন দেন, কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে তিনি জানতে চান, দুই কয়েদির নাম, উকিল জাইনা বলবেন এমনই জানান। এক ঘণ্টা পর তিনি জানতে পারেন কয়েদির নাম সিরাজ—মাদক মামলায় আটক, আর সাদ্দাম—চাচার খুনের আসামি। জেল কর্তৃপক্ষ “জেল পালাতে গিয়ে” ব্যাপারটায় বরং বেশি জোর দেয়।

গার্ড সেলের দরজা খুইলা দিলে  সিরাজ বলে “ভয় লাগতেছে আমার”—গার্ড রুশোর দিকে তাকায় চোখে চোখে হাসে।

সাদ্দাম কয়, “সিরাজ ভাই তাইলে জেলে পইচা মরেন, আমাদের আর কোন ঠ্যাকা—চলেন ঘুমাই।”

রুশো সাদ্দামের কথায় হালকা হাইসা সম্মতি দেয়, সিরাজ রুশোর চোখে ভরসা দেখতে চায়, পাক্কা প্ল্যান, রুশো করছে, মোবাইলে তার আর সাদ্দামের বন্ধুদের কথা হইছিল বইলা রুশো জানাইছিল, আবার জানায়, গার্ডরে সাক্ষী মানে।

বৃষ্টি হইছিল, সেইজন্য রুশো চিন্তায় পড়ে পায়ের ছাপ নিয়া, এখনো মেঘ ডাকতেছে, আবার বৃষ্টি হইতে পারে, রুশো আর সাদ্দাম বৃষ্টির উপর ভরসা করে।

রুশোর কেন জানি রোমানার কথা মনে হইতে থাকে। সিরাজ বিসমিল্লাহ বইলা দেয়ালের গর্ত দিয়া  মাথা গলাইতে না গলাইতে মাথায় আঘাত পায়, সে চিল্লাইতে যাইয়া ঘর্ঘর আওয়াজ করে, সাদ্দাম আবার একটা ইট নিয়া তার মাথায় মারে, আবার মারে, বার বার মারে। দেয়াল যে ধইসা গেছে এমন কইরা আশপাশ সাজাইতে থাকে সাদ্দাম যেমন ঘর গুছাইতেছে এমন দক্ষ হাতে, এমন মনোযোগে, মোটামুটি সাজাইতে থাকে সাদ্দাম। পেছনে রুশো—রোমানা হইয়া লিজা এর পর বিদ্যুৎ চমকের মত সাদ্দামের চাচাত বোন, যার নাম শোনা হয় নাই, তার নাম জিজ্ঞাস করতে যাইয়া, রুশো হাতে একটা ইট তুইলা নেয়, উবু হইয়া তখনও খুনের চিহ্ন লুকাইতে থাকা সাদ্দাম মনোযোগে সিরাজরে একমনে গাইলাইতে থাকে—রুশো ইট দিয়া উবু হইয়া থাকা সাদ্দামের ঘাড়ে মারে, সাদ্দাম ঘোঁৎ কইরা একটা শব্দ করে, তখনও যেন সে সিরাজরে গাইলাইতে ছিল।

রুশোর কাজ বাইরা যাওয়ার জন্য রুশোর বিরক্ত লাগে, সাদ্দামরে মারাটা রুশোর প্ল্যানে ছিল না, কিন্তু ঘইটা যাওয়ার পর তার হালকা লাগে, রুশো আবিষ্কার করে তার মোটেই ভয় লাগতেছে না, নিপুণভাবে সে সব কিছু করতে থাকে। তার ধরা পড়া যাবে না এমন ইচ্ছা থিকা সে আরও সুচারু হইতে থাকে।

ফেরার সময় গার্ডের কাছে সিগারেট নিয়া ধরায়, গার্ড বলে, “দুইজনরেই?”

রুশো সিগারেটে টান দিতে দিতে মাথা ঝাঁকায়। গার্ড জানায় তারে সাসপেন্ড করবে, রুশো জানায় সে পোষায় দিবে।

এবার লিজা ফোন দেয়, ফোনে কথা না বইলা হায়দার সামনাসামনি কথা বলতে চান। লিজা আসে, তারে হায়দার জিগান রুশোরে বাইর করতে কত টাকা লাগতে পারে, একদম শর্তহীন মুক্তির ব্যাপারে। লিজা কয় পাঁচ, হায়দার কন তিন, তখন লিজা বলে সিরাজের আর সাদ্দামের মাথা একদম থ্যাতলায় গেছে—তাৎপর্যপূর্ণ। হায়দার কন সাড়ে তিন, লিজা রাজি হইতে চায় না, হায়দার চোয়াল শক্ত কইরা কন, রুশো জেলে থাকলে, এই বাড়িতে একাই তিনি, লিজা চাইলে তার সাথে থাকতে পারে। এইবার কাজ হয়। সাড়ে তিনে রাজি হয় লিজা। লিজা চইলা গেলে, হায়দার সিগারেট ধরাইতে ধরাইতে রোমানার উপর এত রাইগা যান যে রোমানারে তার খুন করতে ইচ্ছায়।

রুশো মোটামুটি এক মাসের মধ্যে বাইরে চইলা আসে, সে ফ্যাকাশে হইছে, পাতলা ঠোঁটে হায়দারের বাড়ায় দেয়া সিগারেট চাইপা ধরে সে বাপের শরীর স্বাস্থ্য নিয়া প্রশ্ন করে। হায়দার রুশোর পাশে হাঁটতে হাঁটতে হালকা গলায় বলেন, “রোমানার ব্যাপারে আমাদের মীমাংসা হয়া আছে না।” রুশোর ঠোঁটে প্রথমে হাসির মত অভিব্যক্তি ফুইটা পরে পুরাপুরি হাসি হয়। “আপনে ধরতে পারছেন, না?” তারপরে আবার দুইজন হাইসা ওঠে।

বৃষ্টি শুরু হয়, ছাতার কথা স্মরণ না করায় দুইজনেরই রোমানার উপর রাগ হয়।

More from ফারুক আব্দুল্লাহ