Pages Menu
TwitterRssFacebook
Categories Menu

Posted by on Aug 11, 2014 in গল্প | Comments

লিভিং উইদ আইটেম সং

লিভিং উইদ আইটেম সং


আমরা যাইয়া দেখলাম বার খোলা। আমরা মানে তিনজন; আমি, তারা দুইজন। তিনজনের মধ্যে আমার বয়স সবচেয়ে কম। আমাদের কার বয়স বায়োলজিক্যালি কত সেইটা এইখানে একরকম অপ্রাসঙ্গিক। তবে আমাদের বয়সের গড় ৩৫। ফিজিক্যাল এবং ইন্টেলেকচুয়াল দুই দিক দিয়াই ৩৫রে ব্যালেন্সড পজিশন বলব আমি।

এবং আমাদের বয়সের ভিন্নতা কখনোই আমাদের পারস্পরিক আচরণে প্রকাশ পায় নাই।

আমরা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় যিনি সবার বড় তিনি আমাকে বললেন, আপনার কথা ঠিক, দেখা যাচ্ছে খোলা।

আমি বলার মত কোনো কথা বা দেওয়ার মত কোনো এক্সপ্রেশন খুঁইজা পাইলাম না। বার খোলা থাকায় আমাদের মধ্যে কোনো বাড়তি আনন্দ ছিল না। এই যে আসলাম, খোলা না থাকলে কী করব, এমন প্রশ্নের উত্তর অবশেষে পাওয়া গেছে এই কারণে স্বস্তি কাজ করছিল আমাদের মধ্যে। আর খোলা থাকবে কি থাকবে না এই উত্তেজনা হঠাৎ শেষ হইয়া যাওয়ার অবসাদ ছিল।

আমরা ভিতরে ঢুকলাম। সামনের দূরবর্তী দেয়ালে বড় একটা স্ক্রিনে একজন নায়িকা নাচছিলেন। আর জোরে গান বাজছিল। আমার ভালো লাগতেছিল। আমি ভাবলাম অন্যদেরও ভালো লাগা উচিৎ। আমরা কোনো আলোচনা না করেই জানতাম, আমাদের প্রথম কাজ হলো, বসার জন্য ভালো একটা জায়গা খুঁজে বের করা। আমরা আলোচনা না করে এটাও জানতাম যে, জানালার পাশের একটা টেবিলে আমরা বসতে চাই। এটা এই কারণে না যে আমাদের তিনজনেরই চিন্তা বা রুচির খুব মিল অথবা আমদের ইনট্যুশন ভালো কাজ করে। এর কারণ, আমরা ভালোর স্ট্যান্ডার্ড বুঝতে পারি। এবং কোন কাজের প্রায়োরিটি কতটুকু দেওয়া উচিৎ তা আমরা বুঝতে পারি।

আমাদের মধ্যে যিনি দ্বিতীয় বড়, তিনি আমার সামনে ছিলেন। হঠাৎ কইরা দাঁড়াইয়া পড়ছেন। তিনি ডানে বামে তাকাচ্ছিলেন পছন্দসই টেবিলের জন্য। আর তার সামনে যিনি সবার বড়, তিনি সামনের দিকে হাঁটতেছিলেন। তার হাঁটার গতি একই রকম ছিল। যেন তিনি জানেন টেবিল নির্ধারিত। আমি বললাম, আমি ওয়াশরুম থিকা আসি।

ইউরিনালের সামনে দাঁড়াইয়া আমার মনে হইল, সামনের দেয়ালে একটা আয়না থাকার কথা ছিল না?


আমি ফিরা আইসা দেখলাম তারা একটা টেবিলে বসছেন। টেবিলের পজিশন জানালাগুলির পাশেই যে সারি, সেই সারির মাঝামাঝি। তারা বসছিলেন পাশাপাশি সিটে। আর অপর পাশের সিট দুইটা খালি ছিল। আমি বসলাম তাদের মুখোমুখি। বারের সেই বড় মনিটর ছিল আমার পিছনে। আমি বসামাত্রই আমাদের মধ্যে সবার বড় যিনি, বললেন, আমরা অর্ডার পরে করব; আপনার সাথে আগে প্রশ্নোত্তর সারি।

আমি আগ্রহী হইলাম। তিনি বললেন, প্রথম প্রশ্ন হইল, আপনি বলছিলেন আজকে শুক্রবার এবং বার খোলা। আজকে এটা খোলা কারণ আজ শনিবার। শুক্রবারে এটা থাকে বন্ধ।

আমি বললাম, কীভাবে জানলেন শনিবার?

তিনি বললেন, ডিজিটাল ক্লক। বইলা দেয়ালের দিকে ইঙ্গিত করলেন।

আমি বললাম, এইটা আমি ইচ্ছা করেই করছি। মানে আমি এই সপ্তাহ থেকে দিন একদিন পিছনে ধইরা নিতেছি। দ্বিতীয় সপ্তাহে দুইদিন পিছনে ধইরা নিব। তৃতীয় সপ্তাহে তিনদিন। আমি এই প্র্যাকটিসের মধ্যে আছি।

তিনি অবাক হইলেন না। আমি অবশ্য আশাও করি নাই তিনি অবাক হবেন। যদি তিনি অবাক হওয়ার এক্সপ্রেশন দিতেন তাইলে আমিই অল্প অবাক হইতাম।

তিনি বললেন, কেন করতেছেন এইটা?

আমি বললাম, আমার নিজের জন্য টাইমের গণ্ডগোল লাগানোর চেষ্টা করতেছি, একটা কাফকায়েস্ক গল্প লেখব, এই কারণে।

দ্বিতীয়জন বললেন, আপনার যখন হিসাব ঠিকই আছে, প্রথম সপ্তাহে একদিন, দ্বিতীয় সপ্তাহে দুইদিন… তখন আপনার তো আর টাইমের গণ্ডগোল লাগার কথা নাই। বরং আপনি মানুষরে ভুল ইনফরমেশন দিতেছেন। আমাদেরকে বলছেন শুক্রবার অথচ আপনি জানেন আজ শনিবার।

আমি চুপ থাকলাম। এরপর সামনের দিকে ঝুঁকে এসে বললাম, আপনি যেইটা বলছেন এইটা সাত সপ্তাহের জন্য ঠিক আছে। সাত সপ্তাহের পরে সংখ্যা যত বাড়বে গণ্ডগোল তৈরি হইতে পারে। ধরেন এইটা আমার প্র্যাকটিসের ২২ তম সপ্তাহ এবং আজ শুক্রবার, তাইলে আমি আমার হিসাব অনুযায়ী কী বারে থাকব? আমি এইবার মনিটর দেখার জন্য পিছন দিকে তাকাইলাম।

প্রথমজন বললেন, যদিও এইটা অগুরুত্বপূর্ণ, তবু জিজ্ঞেস করতেছি। আপনি সবসময়ই বইলা আসছেন… তিনি মনিটরের দিকে তাকাইলেন… তারপর বললেন… যে আপনি মদ খান না। আজকে আপনেই প্রস্তাব দিলেন এবং আসতে চাইলেন। এইটাও কি আপনার গল্পের খাতিরে কি না?

আমি বললাম, বাস্তবে তো খাই না, কিন্তু গল্পের ভিতরে খাই।

তিনি বললেন, সে আপনার ব্যাপার। গল্পে আমার নাম বলবেন না। ওনার আপত্তি আছে কি না এ ব্যাপারে ওনারেও জিজ্ঞাসা করেন।

আমি দ্বিতীয়জনের দিকে তাকাইলাম। বললাম, না, নাম আমি এমনিতেই বলব না। এমন কি আমার নামও না। না বলার কারণ টেকনিক্যাল এবং পলিটিক্যাল।

আমি ভাবলাম তাদের গল্পে p, q বইলা সম্বোধন করব কিনা। বা ১, ২। ভাবলাম থাক। এইটা খারাপ শোনায়। তাদেরকে আর এই কথা বললাম না।

প্রথমজন হাসলেন, বললেন, লেখেন আপনে।

আমি বললাম, দেখি।


দ্বিতীয়জন বললেন, কী খাইতে চান সাথে?

আমি বললাম, সালাদ।

তিনি বললেন, সালাদ তো আমরা খাবোই, অন্য কিছুর ব্যাপারে আপনার মতামত জানতে চাচ্ছি।

আমি বললাম, আপনারা পছন্দ করেন।

তিনি বললেন, দেখেন, আপনার ইচ্ছার দাম তো আমরা দিতে চাই। আপনার কি ইচ্ছা নাই?

আমি কাউন্টার অ্যাটাক না কইরাই বললাম, ইচ্ছা তো আছেই। আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম।

তিনি পরে বললেন, অর্ডার তো দিয়ে ফেলছি।

আমি বললাম, থ্যাঙ্কস।

তিনি বললেন, কেন! আপনার মতামত ছাড়াই দিছি বইলা?

আমি বললাম, হ্যাঁ। আমার মতামত জানাইতে ইচ্ছা না হওয়ার ইচ্ছাটার দাম দিলেন এই কারণে।

প্রথম জন হাসলেন, বললেন, ইচ্ছা তো অনেকটাই সচেতন সিদ্ধান্ত। ইচ্ছা যতটা না ভিতর থিকা তৈরি হয়, তার চাইয়া আপনেই নির্ধারণ করেন আপনার ইচ্ছা কী হবে।

আমরা বললাম, হ্যাঁ, সেরকমই ব্যাপারটা।

আমি বললাম, আমাদের ইচ্ছার কোনো গুরুত্ব নাই। কারণ ইচ্ছা এত অল্প সময় থাকে!

তারা কিছু বললেন না। বা সম্ভবত শুধু বললেন, হ্যাঁ।

আমি বললাম, লং টার্মের ইচ্ছা অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়জন বললেন, যেইটা লং টার্মের, সেইটা তো আপনার ইচ্ছা না। সেইটা আপনার প্রতিজ্ঞা। রোজা থাকার মত।

আমি বললাম, ইচ্ছা না থাকলে প্রতিজ্ঞা কীভাবে সম্ভব।

তিনি বললেন, আপনি আপনার এইরকম গুরুত্বপূর্ণ একটা ইচ্ছার কথা বলেন।

তিনি মনিটরের দিকে তাকাইলেন। ঘাড় ঘুরাইয়া আমিও তাকাইলাম। আমি হাসলাম।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, চিনেন ওনারে?

আমি বললাম, শমিতা শেঠি।

তিনি বললেন, আপনি তো দেখা যায় চিনেন।

আমি বললাম, আমি বেশি শুনি আইটেম সং। দেখি আসলে। একা একা।

তিনি বললেন, তাই নাকি!

shaon33আমি মনিটরের দিকে তাকাইয়া ছিলাম। শমিতা শেঠি নাচছিল। গাইতেছিল, বিজলী বানকে গিরতি হু, ম্যায় নাগিন বানকে ডাসতি হু, শারারা শারারা…।

আমি দেখতেছিলাম। তার প্যান্টের বোতামের ওপরে, নাভির নিচে কালো রঙের বেল্টের মত কিছু একটা। আমি বুঝতে পারতেছিলাম না, এইটা কি এক্সট্রা বেল্ট অথবা ভিতরের আন্ডারগার্মেন্টসের লেইসের ওপরের অংশ। আগেও বুঝতে পারি নাই। এইখানে বড় স্ক্রিনে শিওর হইতে চাইলাম।

প্রথমজন অল্প হাসতেছিলেন।

দ্বিতীয়জন বললেন, আপনার গুরুত্বপূর্ণ ইচ্ছা কী আপনি বলেন।

আমি বললাম, বাংলায় বলব না ইংরেজিতে?

তিনি বললেন, আপনার যেভাবে সুবিধা। ইংরেজিতে বললেই তো মনে হয় আপনার জন্য ভালো, এক্সট্রা রোমান্স ফিল করতে পারেন আপনে।

আমি বললাম, ডেকোরেটিভ হয় জিনিসটা। সেইক্ষেত্রে… ডেকোরেটিভ জেশ্চারস অ্যাড রোমান্স টু এ লাইফ।

তিনি বললেন, এই যে দেখছেন…! এই অল্প দার্শনিক কথাটা কি আপনার?

আমি বললাম, নাহ। ডন ডেলিলোর। দর্শনে আমার পার্টিসিপেশন কম। আমাদের মদ খাওয়া মনে হয় মাত্রা ছাড়ায় নাই, না?

তিনি বললেন, এইরকম কেন মনে হইল আপনার?

আমি বললাম, এই যে আমি ঠিকভাবে ‘দর্শন’ উচ্চারণ করতে পারলাম। সিলেবল ডিসপ্লেসড হয় নাই!

তিনি বললেন, তা হয় নাই।

আমি বললাম, আচ্ছা আমি আমার ইচ্ছার কথাটা বাংলা-ইংরেজি মিশাইয়া বলি?

তিনি মাথা নাড়লেন, হুম।

আমি বললাম, আমার ইচ্ছা হইল… টু ডাই অ্যাজ এ কিস-লেস ভার্জিন।


তিনি আমারে জিজ্ঞাসা করলেন, কীভাবে মরবেন সেই ব্যাপারেও কোনো ইচ্ছা বা সিদ্ধান্ত আছে আপনার?

আমি বললাম, না, সেরকম নাই। তবে এ নিয়া আমার হাইপোথেটিক্যাল চিন্তা আছে।

তিনি বললেন, যেমন…?

আমি প্রথমজনের দিকে তাকাইলাম। তিনি বললেন, বলুন।

আমি নার্ভাস ভঙ্গিতে বলা শুরু করলাম, যিনি আমারে মারবেন, রাতের বেলা, তিনি সিঁড়ি দিয়া উপরে আসলেন। আমার পিছনে পিছনে।

প্রথম জন গ্লাস হাতে নিলেন, ছোট এক সিপ হেইগ মুখে নিয়া জানালা দিয়া নিচে তাকাইলেন। নিচের রাস্তায় অন্ধকার, অসংখ্য গাড়ি যাইতেছে। এক সেকেন্ডে কতগুলি গাড়ি ওভারব্রিজের নিচ দিয়ে পাস করতেছে আন্দাজ করা কঠিন। এখন নিচে রাস্তার গাড়ির দিকে তাকাইয়া থাকলে আরো বেশি ইমপালসিভ লাগার কথা হয়তো। তিনি নিচ থিকা দৃষ্টি উপরে আনলেন, আর আমি উলটা দিকে বসে ছিলাম, তার চোখ পড়ল আমার চোখে। অল্প হাসলেন, চোখেও পড়ে না এমনভাবে।

দ্বিতীয় জনের সাথে আমার কথা চলতেছিল। তিনি বললেন, হ্যাঁ বলেন… সে উপরে আসলো… আপনার পিছন পিছন…।

আমি বললাম, হুম। ছাদে আসল। আমি আসার দুই তিন সেকেন্ডের মধ্যেই। আমি তখন ছাদের কিনারে। আমার দিকে একটা রিভলবার তাক করলো।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, অন্ধকারে বুঝলেন কেমনে যে রিভলবার! অন্য কিছুও তো হইতে পারে।

আমি বললাম, না, রিভলবার। অন্য কোনো অপশন নাই। আমি বড় একটা চুমুক দিলাম গ্লাসে।

দ্বিতীয় জন কথা বলতে বলতেই সালাদের প্লেট থিকা কাঁটা চামচ হাতে নিলেন। আর প্রথম জন আগের মতই, তিনি আগ্রহী কিন্তু অংশগ্রহণ নাই আলাপে।

দ্বিতীয় জন জিজ্ঞাসা করলেন, রিভলবার ওনার পকেটে ছিল? না কোমরে ছিল?

আমি বললাম, না, সে হাতে নিয়াই সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠছে। আমার দিকে রিভলবার ধইরা বললো, আই উইল কিল ইউ। আমি উপরে তাকাইলাম একবার, তার মাথার উপরে পিছনে। তারপর তার দিকে তাকাইয়া বললাম, ফর সেক অব ইয়োর প্রিটিয়েস্ট ওয়াইফ। সে তখন উত্তেজিত। নার্ভাসও মনে হয় একটু। সে আমারে জিজ্ঞাসা করলো, হু আর ইউ। প্রায় চিৎকার কইরা। আমি বললাম, দ্য সন অব পাপা হেমিংওয়ে। তারপর সে গুলি করলো।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কেন গুলি করলেন আপনারে?

আমি বললাম, সে হাইপোথিসিস এখনো রেডি হয় নাই।

তিনি বললেন, আপনার এই হাইপোথেটিক্যাল চিন্তা কি সান্ত্বনামূলক?

আমি বললাম, না। সুবিধাজনক।

তারপর আমরা কিছু বললাম না।

আমি বললাম, সেদিন একটা সুন্দর ব্যাপার ঘটছে।

প্রথমজন আমার দিকে তাকালেন। তারপরে ঘড়ির দিকে। তার দেখাদেখি আমিও তাকাইলাম ঘড়ির দিকে। রাত বাড়ছে।

আমি আবার বলা শুরু করলাম, সেদিন আমি হাইপোথেটিক্যালি, মানে অ-বাস্তবে ওর বাসায় গেছিলাম।

দ্বিতীয়জন বললেন, ‘ও’ কে? নাম বলেন।

আমি বললাম, আমি বলব না।

তিনি বললেন, আচ্ছা, ঘটনাই বলেন।

আমি বললাম, আমি ওর বাসায় গেছি। ও ছিল না। কেউ ছিল না। ওর বিছানায় আমি শুয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। ২০-২৫ মিনিট পরে চলে আসছি। আসার সময় ওর একটা কানের রিং নিয়া আসছি, আর ওর ভ্যানিটি ব্যাগে আমার ঘড়ি রাইখা আসছি। ও যখন আইসা দেখবে ওর একটা রিং নাই এবং আমার ঘড়ি, তখন বুঝতে পারবে না এইটা কই থিকা আসলো। ঝামেলাও হইতে পারে।

তারা দুইজন আধেক মনোযোগ আর আধেক রিল্যাক্সড মুডে আমার কথা শুনছিলেন।

আমি বললাম, আমি যখন আমার বাসায় আসলাম তখন দেখি, আমার বিছানায় ওর অন্য একটা কানের রিং। তার মানে, সে-ও অ-বাস্তবে আমার বাসায় আসছিল। বাস্তবে তো হয়-ই না। হাইপোথেটিক্যালিও আমাদের দেখা হইল না। আমার খারাপ লাগছে।

প্রথমজন বললেন, আপনি কি কানছেন?

আমি উত্তর দিলাম না। অন্য দিকে তাকাইলাম।

আমি বললাম, এইগুলি নিয়া কথা বইলাও গল্প অসাধারণ হইতেছে না। যেমন এখন যেইটা বললাম এইরকম ঘটনা পুরা না হইলেও প্রায়-ক্লিশে। ফলোয়িং ছবিতে আছে এইরকম ঘটনা। কিন্তু আমি তো অসাধারণ গল্প লেখতেই পারি।

প্রথমজন বললেন, পারেন হয়তো। কিন্তু লেখেন তো নাই।

আমি জানালার বাইরে তাকাইলাম।


আমাদের টেবিলে ওয়েটার আইসা ঘুরে গেল। জিজ্ঞেস করলো কিছু লাগবে কিনা। সাদা শার্টপরা ওয়েটারকে আমাদের তিনজনের পক্ষ থেকে যিনি সবার বড় তিনি বললেন, কিছু লাগলে আমরা আপনাকে ডাকব।

আমার মনে হইল আমি জানালার বাইরে, অল্প দূরের ওই ওভারব্রিজের ওপর দাঁড়াইয়া আছি। ওর সাথে দেখা হইছে। আমি বললাম, আমি চাইছিলাম আরো পরে দেখা হবে।

ও বললো, কেন?

আমি অন্যমনস্কভাবে বললাম, জানি না।

ও বললো, দেখা হলেই কী আর না হলেই কী! কী আসে যায়!

হঠাৎ দ্বিতীয়জন বললো, আপনি আছেন কি এখনো এইখানে? আমাদের মাঝে?

তার কথায় আমি বরফের পাত্রের দিকে তাকাইলাম। বরফ অনেকটাই গলে গেছে। অবশিষ্ট বরফের টুকরা পানিতে ভাসতেছে।

আমি তাকালাম দ্বিতীয়জনের দিকে। বললাম, হ্যাঁ, আছি।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি তো চাইলেই দেখা করতে পারেন। বাস্তবে না পারলেও হাইপোথেটিক্যালি পারেন।

প্রথমজন আমার দিকে তাকাইয়া বললেন, আপনি মনে হয় চান না দেখা হোক। বা দেখা হইতেছে না এইরকম দুঃখ আপনার ভাল্লাগে।

আমি চুপ থাকলাম কিছুক্ষণ। তারপর বললাম, আমার অ-বাস্তব জগৎ মোটামুটি ফিক্সড। এইখানে বদলায় না কিছু। আমার হাইপোথেটিক্যাল জগতের ভিতর ও স্বাধীন। ও ওর হাইপোথেটিক্যাল জগতে পজিশন চেঞ্জ করে বারবার। আমি ওর অবস্থান অনুযায়ী যখন ওর সামনে যাব, ও দেখা করতে চায় না বলে ততক্ষণে অন্য জায়গায় চলে যায়।

দ্বিতীয়জন বললেন, যেমন?

আমি বললাম, আমি যে সময়ের হিসাব করি ওর কাছে পৌঁছানোর জন্য, ওই জায়গায় পৌঁছতে সময় বেশি লাগে। ওর হাইপোথেটিক্যাল জগৎ তো স্থির না এই কারণে। সময় বাইড়া যায়। টাইম ডাইলেশন হয়।
প্রথমজন বললেন, আপনি বেশ প্যাঁচ লাগাইতেছেন। এত প্যাঁচ লাগানোর দরকার আছে কি?

আমি বললাম, উপায় নাই, আমি সাইকোলজিক্যালি ট্রমাটাইজড ছিলাম। আমি ওর জন্য ওভার-ডেসপারেট।

আমি আরেকটু রিল্যাক্সড হইয়া বসলাম। প্রথমজন বললেন, মদ খাওয়ার কারণে আপনার অসুবিধা হচ্ছে? খারাপ লাগতেছে কি?

আমি হাসলাম। বললাম, না। আমার নেশা হয় না তো। আমার মনে হইল আমি হাসতে চাই নাই। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে হেসে ফেলেছি। আমি তখন একটু গম্ভীর হইলাম। রিল্যাক্সড অবস্থা থেকে পিঠ টান করে বসলাম। হাল্কা গম্ভীর হয়ে বললাম, আমরা আরেকটা কইরা নেই।

প্রথমজন বললেন, হুম।

দ্বিতীয়জন বললেন, বেশি খাইলে অবশ্য আমি আর কোনো কাজ করতে পারি না পরে। সমস্যা নাই, নেন আপনে।


দ্বিতীয়জন একটা সিগারেট হাতে নিয়া মনিটরের দিকে তাকাইলেন। আমি তখন গানের দিকে মনোযোগ দিলাম। আমি ওইদিকে তাকাই নাই। আমি শুনলাম, গান চলতেছিল, ইক তারাফ ইশক হ্যায় তানহা তানহা, ইক তারাফ হুসনে হ্যায় রুসভা রুসভা।

দ্বিতীয় জন আমার দিকে তাকাইলেন। জিজ্ঞেস করলেন, সিগারেট নিবেন একটা?

আমি বললাম, আছে আমার কাছে।

একটু পরে বললাম, গান ভালো। তবে ওই ভদ্রমহিলারে ভালো লাগে না আমার।

খেয়াল করলাম প্রথমজন মনিটরের দিকে তাকাইয়া আছেন। উনি বললেন, ওনারে চিনি না। ওনার এক্সপ্রেশন ভালো না। টানে না।

আমি বললাম, একটু আগে একটা ছিল না, ইয়ে মেরা দিল না কী জানি। ওইটা… নাইস টু ওয়াচ।

দ্বিতীয়জন বললেন, কেমন মেয়েদের ভালো লাগে আপনার?

আমি বললাম, মানে!

তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।

আমি বললাম, ফিজিক্যালি সুন্দর মেয়েদের ভাল্লাগে।

তিনি বললেন, ভাল্লাগে আপনার?

আমি বললাম, ভাল্লাগে বলতে… তাদের প্রতি ফিজিক্যাল রিঅ্যাকশন বা স্টিমুলেশন আছে। কিন্তু আগ্রহ বা আকর্ষণ নাই।

আমি দেখলাম, প্রথমজন হাসছেন অল্প অল্প।

দ্বিতীয়জন জিজ্ঞেস করলেন, কাদেরকে সুন্দর মনে হয় আপনার?

আমি ভ্রু কুঞ্চিত করলাম। বললাম, একটু ভারি গড়নের, বা যারা অনেক স্লিম, ফর্সা, বা এক্সপ্রেশন ভালো, চোখের এক্সপ্রেশন ভালো, বা… তলপেটে হালকা মেদ আছে বা হিপস একটু ভারি, মিডিয়াম বুক।

আমি অস্থিরভাবে সামনে ঝুঁকে বসলাম, আমার কণ্ঠস্বর সিরিয়াস হয়ে গেছে খেয়াল করলাম। বললাম, দেখেন, কেমনে বলব আপনারে, এই টেস্ট আসলে মুড, ওয়েদার, টাইম, সাইকোলজি, ডিপ্রেশন… অনেক কিছুর উপর ডিপেন্ড করে। আমার খারাপই লাগে বেশিরভাগ।

দ্বিতীয়জন তাকাইয়া ছিলেন আমার দিকে। তিনি আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেছিলেন নাকি অন্য কিছু ভাবতেছিলেন, আমি নিশ্চিত হইতে পারতেছিলাম না।

আমি আবার বললাম, খারাপই লাগে বেশিরভাগ। যাদের এক্সপ্রেশন আর্টিফিশিয়াল, তাদেরকে বেশি বিরক্ত লাগে। ছেলেদের ক্ষেত্রেও আমার একটা জাজমেন্ট আছে। যেমন যারা সেক্সুয়াল পারফরম্যান্সের সময় দেখতে সুন্দর না, ভিজ্যুয়ালি অড তাদের ব্যক্তিত্ব দুর্বল মনে হয় আমার। মানে বডি স্ট্রাকচার খারাপ যাদের। স্থূল পুরুষদের নিচুভাবে দেখি আমি। অবশ্য যাদের ইন্টেলেকচুয়াল সামর্থ্য বেশি তাদের ব্যাপার একটু আলাদা।

দ্বিতীয়জন জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার কী অবস্থা? স্ট্রাকচারের?

আমি বললাম, পারফেক্ট।


প্রথমজন জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি চিন্তিত?

আমি বললাম, না। ওই চিন্তাটা বারবার মাথায় আসতেছে। আমারে মারবে আর তখন আমি বলতেছি, ফর সেক অব ইয়োর প্রিটিয়েস্ট ওয়াইফ। ব্যাপারটা অনেক জটিল। এইটার আগে পরের অনেক ঘটনা আছে। আমি সেগুলি এভয়েড করি।

দ্বিতীয়জন বললেন, আপনার মৃত্যুভয় বেশি। নিজের মৃত্যুর ব্যাপারে আপনার যে বিষণ্নতা, যে শোক সেইটা এড়ানোর জন্যই আপনে এরকম মৃত্যু কল্পনা করছেন। অ্যাডভেঞ্চার নিয়া আসছেন।

প্রথমজন বললেন, সেরকম হয়ত না। কারো প্রতি ওনার অবসেশন আছে এরকম মনে হইতেছে।

আমি বললাম, ডেসপারেশন।

আমাদের তিনজনের গ্লাসেই অল্প তলানি পইড়া ছিল। আমরা ততক্ষণে সিদ্ধান্ত নিছি আমরা আর নিব না।

প্রথমজন অন্যমনস্কভাবে টেবিলের ওপর গ্লাস ঘোরাচ্ছিলেন।

বয়সের দিক থেকে যিনি মাঝামাঝি, অর্থাৎ দ্বিতীয়, তিনি বললেন, মৃত্যুর ব্যাপারে আপনার যে বিষণ্ণতা সেইটার কাউন্টার স্টেটমেন্ট দেন। বলেন যে, আপনার মৃত্যুভয় নাই। অথবা থাকলেও কম আছে।

আমি হাসলাম, বললাম, আমার মৃত্যুভয় কম। কেন, সে ব্যাখ্যায় যাব না আমি। কোট করি, এভরিথিং ইজ এ স্ক্যান্ডাল। ডাইং ইজ এ স্ক্যান্ডাল।

তিনি বললেন, বাহ! আপনার এই কোট করার পদ্ধতি তো নিরাপদ। ব্যাখ্যা করার হাত থিকা বাঁচতে পারেন আপনে।

আমি বললাম, রোমান্স ফিল করি আমি।

প্রথমজন হাসতেছিলেন অল্প। সামনের দিকে ঝুঁকে বসছেন তিনি। তখন আর গ্লাস ঘোরাচ্ছিলেন না। তবে গ্লাসটা ধরে ছিলেন।

mridul-11aug2014c14

 


আমরা উঠলাম। বেশ রাত হইছে। বারে মাঝারি ভিড় ছিল। গান আসতেছিল কানে, পানি কে চাদর তলে, দম মেরা জ্বাল যাতা হ্যায়। এইটার কাব্যিকতার কারণে আমার গোসল করতে ইচ্ছা হইল। আমি ফিসিফিস কইরা কিছু বললাম। দ্বিতীয়জন আমারে বললেন, কী বলেন?

আমি বললাম, কিছু না। এরা শুধু বলিউডের গান ছাড়ে।

তিনি বললেন, আপনার আপত্তি আছে এতে? বলিউডের গান তো ভালো!

আমি বললাম, হাঁ।

তিনি বললেন, এটারে কি আপনি আইটেম সং বলবেন?

আমি বললাম, নাহ!

প্রথমজন দরজার কাছে থিকা আমাদের বের হওয়ার তাড়া দিলেন।

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় প্রথমজন বললেন আমারে, আমার মনে হয় আপনার ব্যাপার ঠিকই আছে।

আমি বললাম, হুম। যতক্ষণ আমি এইটা কারো কাছে না বলি। যতক্ষণ প্রাইভেট ততক্ষণ প্রিসাইজ।

আমাদের কথাবার্তায় অ্যালকোহলের সামান্য প্রভাব ছিল।

নিচে আসার পর প্রথমজন চইলা গেলেন।

দ্বিতীয়জন আর আমি একই দিকে যাব। কিছুদূর যাওয়ার পর তারে রাইখা আমি আরো সামনে যাব।

আমার মনে হইল ও আমারে বলতেছে, …আর এখন আইসা তুমি বলতেছ তুমি আমার জন্য ডেসপারেট।

আমি বললাম, সবসময়ই ছিলাম।

ও বললো, তোমার এইসব কথা…

আমার পাশ থেকে হঠাৎ দ্বিতীয়জন বললেন, আপনি কি আপনার হাইপোথেটিক্যাল জগতে ঢুকলেন নাকি?

আমি বললাম, না, স্মৃতিতে। মেমোরি।

আমরা হাঁটছিলাম। তিনি বললেন, আমার মনে হয় আপনে আপনার হাইপোথেটিক্যাল চিন্তা নিয়া যা বললেন তাতে অসততা থাকতে পারে।

আমি বললাম, হুম।

আমার কথা বলতে ভালো লাগতেছিল না। আমি একদম কথা বন্ধ করতে চাইলাম।

আমি বললাম, এইটা নিয়া আগে আমার মধ্যে হীনম্মন্যতা ছিল, এখন নাই।

তিনি আর কোনো কথা বললেন না।

আমি ভাবলাম, আমার মদ খাওয়া শো-অফ করার জন্য ওরে ফোন দেই। ওরে বলি, আমি ডেসপারেট, উইদ অল মাই হার্ট। পরে ভাবলাম দরকার নাই। এইটা ভাবার সাথে আমার মধ্যে অভিমান কাজ করলো। অল্প দমবন্ধ লাগতেছিল।

Flag Counter