লৌহিত্যের ধারে (১)

‘ওঁ ব্রহ্মপুত্র মহাভাগ শান্তনো : কুলনন্দন। অমোঘাগর্ভসম্ভূত পাপং লৌহিত্য মে হর।”

(হে মহাভাগ ব্রহ্মণপুত্র! তুমি শান্তনু মুণির কুলতিলক, তুমি অমোঘা দেবীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছ। হে লৌহিত্য, তুমি আমার পাপ হরণ করো।)

১.

নয়া বাড়ি লইয়া রে বাইদ্যা লাগাইল বাইঙ্গন
সেই বাইঙ্গন তুলতে কইন্যা জুড়িল কান্দন

ব্রাহ্মপল্লী রোডের ১৮ নম্বর গলির এফ নম্বর বাড়িটা আমার বাবার বাড়ি। এই বাড়ির জমি আব্বা কিনছিলেন সম্ভবত বাংলাদেশ হবার পর, থাকবার মতন বাড়ি বানানো ছিল ‘৮৭ সাল পর্যন্ত, ‘৮৮ তে বর্তমান বাড়িটা তৈরি হয়। ‘৮৭ সালে আমি নার্সারিতে ভর্তি হইছিলাম কালিবাড়ি প্রি ক্যাডেট ইশকুলে, ‘৮৮ তে পড়তাম কেজিতে।

সালটা যে ওই জন্যে মনে আছে তা না। ‘৮৮ তে বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা হইছিল, মমেনসিং শহর উঁচা দেইখ্যা ডুবে নাই। ‘৮৯ থাইকা আমরা এই বাড়িতে থাকি। বন্যার কথা আমার তেমন মনে নাই, খালি প্রি ক্যাডেট ইশকুলের তিনতলার বারিন্দা থাইকা দেখতাম নদীর ওই পাড় থাইকা লোকজন রিলিফ নিতে আইতেছে।

ছোটবেলা থাইকাই দেখতেছি যে আমাদের এলাকার নামটা অনেকেই ভুলভাবে লেখেন, ব্রাহ্ম শব্দটাকে লেখেন ব্রাক্ষ, আর উচ্চারণ করবার সময় অনেকেই ব্রাহ্মণপল্লী বলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রাহ্ম ছিলেন এই তথ্য উনারা সম্ভবত জানেন না, ব্রাহ্ম শব্দটাই উনাদের কাছে অপরিচিত। আমরা অবশ্য ব্রাহ্মণ আর ব্রাহ্মর মধ্যে পার্থক্য জানতাম। ডিডি সেভেনে দেখা ছবি ‘গৃহদাহ’তে অচলারূপী সুচিত্রা সেন ব্রাহ্ম ছিলেন। আমার মা ছোটকালে শরতচন্দ্রের লেখা অনেক উপন্যাস পড়ছিলেন। ‘বিরাজ বউ’ নাকি ‘দেবদাস’ কোনটা জানি পইড়া কানতে কানতে চোখ ফুলায়া ফেলছিলেন। তাই এইসকল উপন্যাসের উপরে বানানো সিনেমা আব্বা-আম্মার খুব প্রিয় ছিল। আব্বা প্রায়ই পাহাড়ী স্যান্নালের ডায়লগের নকল কইরা কইতেন, “মহিম, সুরেশ, অচলা।”

আব্বা মাঝে মধ্যে মজা কইরা আরেকটা ডায়লগ বইলা চিল্লায়া উঠতেন, ডায়লগটা হইল, “মোঘলের শক্তি রোধ করতে আমরা সক্ষম।” এইটা ঈশা খাঁরে নিয়া বানানো একটা যাত্রার ডায়লগ।

আমি সারাজীবন ব্রাহ্মপল্লীর এই বাসায় থাকছি, এই বাসা বানাবার আগে আমরা থাকতাম সেহড়া ডিবি রোডের একটা ভাড়া বাসায়, পূরবী সিনেমা হলের পাশের গলিতে। তিন তলা বাসার এক তলায় থাকতাম আমরা, বাসাটার বারিন্দা দিয়া সিনামা হলের পিছন দিকটা দেহা যাইত। বিদ্যুৎ চইলা গেলে একটা মৃদু যান্ত্রিক আওয়াজ আসত, আম্মা বলতেন “ডায়নামা চলতেছে।” পরে নবম শ্রেণির পদার্থবিদ্যা বইয়ে আমি জেনারেটরের গঠন পড়ছিলাম, কিন্তু জেনারেটর আর ডায়নামা একই বস্তু কিনা তা এখন আর কইতে পারমু না। ইংরেজি শব্দ, বিশেষত টেকনিক্যাল টার্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত শুদ্ধ-অশুদ্ধর ধার ধারতাম না। বিদ্যুতরে ইলেক্ট্রিসিটি না কইয়া কইতাম কারেন্ট। লোডশেডিং হইলে কইতাম “কারেন্ট গেছে গা।”

রাজবাড়ির পিছনের দেয়াল ভেঙ্গে গেছে, বিএনপি অফিসের সামনে থাইকা পুকুর ঘাট দেখা যাইতেছে। ছবি. কাজী রুবায়েত ইসলাম

রাজবাড়ির পিছনের দেয়াল ভেঙ্গে গেছে, বিএনপি অফিসের সামনে থাইকা পুকুর ঘাট দেখা যাইতেছে। ছবি. কাজী রুবায়েত ইসলাম

ডিবি রোডের বাসায় প্রায়ই কারেন্ট যাইত গা। মাঝে-মধ্যে দুই ইউনিটের বাসার দক্ষিণ ইউনিটে কারেন্ট গিয়া উত্তরের ইউনিটে থাকত। আমাদের উপরের ফ্ল্যাটে যে পরিবার থাকত তাদের এক ছেলে তিন মেয়ে। ছেলের নাম ছিল তান্না। আমাদের দক্ষিণের ইউনিটে কারেন্ট গিয়া উত্তরে থাকলে তান্না সিঁড়িঘর দিয়া আসা আলোয় জোরে জোরে ইশকুলের পড়া মুখস্থ করতে থাকত।

তান্নাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন দীলিপবাবু আর তার স্ত্রী, তাদের ছেলেটি খুবই ছোট, নাম দীপেন। দীপেনের মায়ের নাম জানতাম না। উনি নাকি অন্যান্য ফ্ল্যাটের মহিলারা গেলেই কিছুক্ষণ পর পর সুর কইরা বলতেন, “বৌদি, চায়ের জল চাপাই?” সকলেই যথারীতি “না” “না” কইরা উঠতেন। তবে দারোগা শহীদুল্লা সাহেবের স্ত্রী, ফ্লোরার আম্মা, যারা দীলিপবাবুদের উপরের তলায় থাকতেন, তিনি একদিন আমার আম্মারে কইছিলেন, “ভাবি, দীপেনের মা এরপর এইরকম কইলে আমরা কমু চাপান, বইসা থাকুম, উঠুম না।”

ডিবি রোডের নামের লগে কিন্তু পুলিশের কোনো সম্পর্ক নাই। ডেঙ্গু ব্যাপারি নামের এক ব্যবসায়ীর নামে ওই রোডের নাম হইছে। ‘৮৮/’৯০ এর দিকে ডেঙ্গু জ্বরের নাম শুনা যায় নাই। তাই ডেঙ্গু ব্যাপারি নামটা আমাদের কাছে হাস্যকর লাগত না।

ওই বাড়ির মালিকের নাম ছিল ফজল। আমরা বলতাম ফজল কাকা। ফজল কাকার বাসার বারান্দার গ্রিল ছিল চাইরকুনা রডের মধ্যে একটা কইরা পাপড়ির মতন, অনেকটা রঙ্গন ফুলের মতন, অনেকগুলা রঙ্গন ফুলের পাপড়ি পাশাপাশি সাজানো থাকলে যেমন লাগবে সেই রকম লাগত দেখতে। একটা চাইরকুনার মধ্যে একটা পাপড়ি মিসিং ছিল।

আমরা গ্রিল বাইয়া উইঠা ওই চারকোণা খোপটার মধ্যে দিয়া বাঁইকা-চুইড়া বাইর হইয়া যাইতে পারতাম। আরেকটা খোপে একটা পাপড়ির একটা ব্যাকা রড ছিল, আরেকটা ছিল না। আমি একবার কেরদানি দেখায়া ওইটা দিয়া বাইর হইতে গিয়া কোমরের কাছে আটকায়া গেছিলাম।

ওই বাসায় থাকার সময় একবার রমজান মাসে ইফতারের পরে একটা খুন হইছিল। পৌরসভা নির্বাচনে কমিশনার পদপ্রার্থী সেলিম, যিনি বালতি মার্কায় ইলেকশন করছিলেন, তার মা সন্ধ্যার একটু পরে দৌড়াইতে দৌড়াইতে আমাদের বাসায় আইসা হাউমাউ কইরা কইতে লাগলেন, “বাচ্চু মামা, সেলিমরে কুবায়া ফালা ফালা কইরা হালাইছে।” আব্বা হাসপাতালে যাইতে চাইলে উনি কইলেন, “আফনে তাড়াতাড়ি থানাত যাইন।”

আমার আব্বার ডাকনাম বাচ্চু। আমার দাদি জোবেদা খাতুনের মায়ের বাড়ি পুরোহিত পাড়ায় হওয়াতে এলাকার সকলেই আব্বার আত্মীয়। সেলিমের মা বুলিখালাও আব্বার গ্রাম সম্পর্কীয় ভাগ্নি হইতেন। ব্রাহ্মপল্লী, পুরোহিত পাড়া, মুন্সিবাড়ি সবই সেহড়া গ্রামের অন্তর্ভুক্ত। আম্মা-আব্বা উনারে খালা ডাকতেন কারণ উনার সন্তানরাই আব্বার ভাইবোনেদের সমবয়সী। সেলিম মারা যাওনের অনেক পর পর্যন্ত সেহড়া এলাকার দেওয়ালে দেওয়ালে সেলিমের নাম আর হাতে আঁকা বালতির ছবিগুলা রইয়া গেছিল। ওই বালতিগুলা দেখলে আমার খুব কষ্ট লাগত।

ব্রাহ্মপল্লী এলাকাতেও খুন হইতে দেখছি আমরা, ছোটকালেই, ক্লাস টুতে পড়ি তখন। ‘৯০ এর ইলেকশনে, যেইবার বিএনপি ক্ষমতায় গেল, সেই ইলেকশনের পরদিন আরেক কমিশনার আর তার ভাইয়েরা মিল্লা আইউব আলী নামের এক ব্যবসায়ীরে কুবায়া মাইরা ফালাইল, আমাদের বাসার গলির কয়েক গজ সামনে। উনারে আমাদের চাচা-ফুপুরা এবং আম্মা ডাকতেন ‘আইবালি বাই’, উনি আমার আব্বার বন্ধুস্থানীয় ছিলেন। অই দিন আমি আমার আব্বারে প্রথম কানতে দেখছিলাম। আমার এখনও মনে আছে, আব্বা এক হাতে মাথার চুল খামচায়া ধইরা ডুকরাইয়া কানতে কানতে বাসার গলি দিয়া বাইর হইতেছেন।

আইবালি কাকার খুনিরাও আমাদের আত্মীয়। আমাদের বাসার টেরাস থাইক্যা চাইলে যে বাড়িগুলার চালে উইঠা যাওন যাইব সেইগুলার একটা হইল ওই খুনি ভাইদের মায়ের বাড়ি, ওই বাড়ির উঠানে আমাদের বাসার দিকের দেওয়াল ঘেইষা একটা অর্জুন গাছ ছিল। খুন হইবার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উত্তেজিত জনতা ওই বাড়িটারে আক্রমণ করে আর লাঠিসোটা দিয়া বাইড়ায়া বারিন্দার টিনের চালগুলা ভাইঙ্গা ফেলে।

আমরা ছোটরা ছাদ থাইক্যা এই ঘটনা দেখছিলাম। আমার চাইর নম্বর চাচা, যার নাম খসরু, উনারেও দেখছি ওই বাড়ির মহিলাদেরে নিরাপদ জাগায় সইরা যাইতে সাহায্য করতেছিলেন। কিন্তু ওরা ভাঙচুরের মামলা করবার সময় আমার আব্বা এবং তার বাকি পাঁচ ভাইয়ের নামও আসামী তালিকায় দিয়া দিছিল।

তারা অনেকগুলা ভাই, সকলেই খুনের সময় ছিল না অবশ্য। তাদের মধ্যে প্রধান যে, বড় ভাই, তার বাড়ি বাঘমারা। বাঘমারা হইল ব্রাহ্মপল্লীর পূর্ব দিকের পাড়া, আর পুরোহিতপাড়া পশ্চিমদিকে। ওরা আইবালি কাকারে মারছিল তার ভাইগ্নার লগে শত্রুতা থাইকা, ভাইগ্নার নাম সাদেক। সাদেকের মতন সুপুরুষ কাউরে আমি সিনামার পর্দা ছাড়া দেখি নাই তখন পর্যন্ত, সাদেকের একটা হাতের বুড়া আঙ্গুল ছিল না। সাদেকের মায়ের নাম মেহেরুন, কিন্তু সবাই ডাকত ‘মেহানি’, আমার ফুফুচাচারা ডাকত মেহানিবু। মেহানির বোন খায়রুন আমাদের বাসার পিছনের বাসায় থাকত। তাদের অবস্থা খারাপ ছিল, আমার দাদির বাসার কাজ কইরা দিত। খায়রুন ফুফুর ভাই আইবালি কাকা খুন হবার সময়ও খুনির নামে ‘ভোট দিন’ লেখা পোস্টার লাগানো ছিল দুই এক দেওয়ালে। আমরা, গলির কয়েক বাচ্চা মিল্লা অইসব পোস্টারের উপরেই লেখা পালটাইয়া পেন্সিল দিয়া কমিশনারের নামের নিচে লেইখা দিলাম “খুনিকে ধরিয়ে দিন।” ওই কমিশনারের ভাইয়েরা অনেকেই বাড়িঘর বেইচা দিছিল। আমাদের পাশের বাসা, যেটাতে অর্জুন গাছ ছিল সেইটাও বিক্রি হইল, যারা কিনল তারা অর্জুন গাছটা কাইটা ফেলল।

আমি যখন প্রথম ব্রাহ্মপল্লীর বাসা ছাইড়া ভাড়া বাসায় উঠলাম, আশেপাশে খুঁইজা পাইতে বাঘমারা এলাকায়ই নিছিলাম। বহুদিন নিজের বাড়িতে থাকবার পর মমেনসিং শহরে ভাড়া বাড়িতে উঠতে কেমন জানি আজব অনুভূতি হইতেছিল। নিজেরে আগন্তুক মনে হইতে থাকল। তন্ময় আর আমি ৩৯/১ বাঘমারা রোডের যে বাসাটায় উঠলাম সেইটারে আস্ত বাসা বলা যাবে না। দুইটা মাত্র রুম, একটা বাথরুম, বারান্দাটাতে পা ছড়াইয়া বসা সম্ভব না আর রান্নার জায়গাটারে রান্নাঘর কইলে বাড়াইয়া বলা হবে। গ্যাসের লাইন নাই, ইন্ডাকশন কুকার কিনতে হইল। তবু ওইটার ভাড়া ছিল ৫০০০ টাকা। শহরে যে বাসা ভাড়া বেশি তা আমি জানতাম, এত বেশি সেইটা জানতাম না কারণ আমার বাবার বানায়া যাওয়া বাসার ভাড়া বাড়ে না।

বাঘমারা প্রাইমারি ইশকুলের মাঠের পাশের বাসাটা খুব ছোট্ট আর পাঁচতলায় উঠতে হাঁপ ধইরা গেলেও ওই বাসাটায় থাকতে খুব আরাম ছিল। পুব দিকটা পুরাটা খোলা, দক্ষিণ দিকে আরেকটা বাড়ি একদম লাগানো হইলেও দক্ষিণ পূর্ব কোনা দিয়া মেডিক্যাল কলেজের ছেলেদের হোস্টেলের পুকুর দেখা যাইত। সকালের রোদ আইসা পড়ত বিছনার উপর। সারাদিন চড়ুই আর বুলবুলিরা বসতো বারান্দার গ্রিলে।

আমরা উঠছিলাম মার্চ মাসে, সেইটা বসন্তকাল। এপ্রিল গিয়া মে মাস চইলা আসা পর্যন্ত একটা কোকিল সারাদিন ডাইকা যাইত আশেপাশের কোনো একটা গাছে। রাত্রে এক ভ্যানওয়ালা বাঁশি বাজাইত।

তন্ময় কইছিল, ওই লোক নাকি গাঞ্জা বেচে আর পুলিশের ইনফর্মার হিসাবে কাজ করে। দিনের বেলা প্রাইমারি ইশকুলের ঘণ্টা পড়ার আওয়াজ ছাড়া তেমন কোনো আওয়াজ আসত না। মাঠে বাচ্চাদের খেলাধুলার আওয়াজ সামান্য আসত, পাঁচতলায় পৌঁছাইতে পৌঁছাইতে তা হালকা হইয়া যাইত। বাচ্চারা এখন নাকি খালি কম্পিউটারে গেমস খেলে। কিন্তু অরা আসলে মধ্যবিত্তের বাচ্চা। আমার বাসার পাশে যারা খেলত তারাও নিম্নমধ্যবিত্ত। একেবারে নিম্নবিত্তের বাচ্চাদের খেলার সময় নাই, তারা কাজ করে। মাঠ থাইকা ওদের খেলার আওয়াজ শুইনা আমার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ত। ওরাও খেলার আগে কইত, “ডাক ডাক বেলি, আস ভাই খেলি”। নিয়মটা হইল দুই দলের খেলা হইলে একদল ডাকবে “ডাক ডাক বেলি” আর আরেকদল বলবে “আস ভাই খেলি”।

বাঘমারাতেই আরেকটা বাসার দোতলায় অর্ধেক পাকা আর অর্ধেক টিনের চালওলা বাসা আমরা ভাড়া নিছিলাম, অইটার ভাড়া ছিল ৬ হাজার টাকা। আমরা ৩ হাজার টাকা অ্যাডভান্সও দিছিলাম, কিন্তু উঠতে দেরি হওয়ায় বাড়িওলা ভ্যান্তারা শুরু করল। হাফ বিল্ডিং বাসাটার প্রতি আমার আর তন্ময়ের যে মুগ্ধতা তৈরি হইছিল তা নিতান্তই বাস্তবতাহীন একটা ব্যাপার। পুরান আমলের বাড়িতে থাকার প্রতি রোমান্টিক আগ্রহ আর কি।

ওইখানে একটা এজমালি উঠানের ভিতর দিয়া বাসায় ঢুকতে হইত, দোতলায় উঠার সিঁড়ি একেকটা এক ফুট কইরা উঁচা। কিন্তু বাসাটার দরজা খুললেই একটা আস্ত ছাদ, কারণ পুরানা বাড়িটার মূল ডিজাইন নষ্ট কইরা ছাদে হাফ পাকা হাফ টিনের বাসা বানায়া ভাড়া দেওয়া হইছে। মূল বাড়ির একতলা অনেক বড়, দোতলা অত বড় না। আর ওভাল শেপের ফাঁক ফাঁক মোটা রেলিংওয়ালা ওই ছাদে দাঁড়াইলেই ট্রেইন দেখা যায়। এই লোভেই আমরা অত অসুবিধা আর বেশি ভাড়া কবুল কইরা ওই বাসা নিতে চাইছিলাম।

সাহেব পার্ক থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ। ছবি. নাদিয়া ইসলাম।

সাহেব পার্ক থেকে ব্রহ্মপুত্র নদ। ছবি. নাদিয়া ইসলাম

বাড়িওলার আচরণের জন্যে নেওয়া গেল না। বাড়িওলা যে খারুস তা অবশ্য আগেই বুঝা গেছিল। ভাড়া নিতে গেছি সময়ই জিগাইছে আমরা হিন্দু কি না। সম্ভবত হিন্দু হইলে ভাড়া দিত না। এমন অনেক বাড়িওলাই আছেন যারা হিন্দুদের ভাড়া দিতে চান না। আবার হিন্দু বাড়িওলারাও নোটিস ঝুলাইয়া রাখেন—”বাসা ভাড়া দেওয়া হবে হিন্দু পরিবার।”

অই রকম নোটিস আমি প্রথম দেখছিলাম সারদা ঘোষ রোডের একটা বাসায়। গরু খোঁয়াড়ের মোড়ের জ্যামে আটকাইয়া থাকলে একতলা বাসাটা দেখা যায়। মালিকের নাম সম্ভবত মিহিরকান্তি। বাড়ির গেইটে মাধবীলতার ধূলিধূসরিত ঝাড়। গ্রিলের বারান্দার বাইরে থাইকা দেখলেই মনে হয় ভিতরে অন্ধকার হবে। আসতে যাইতে ওই বাসাটা দেইখা আমি ভাবতাম, এঁরা এখনও হিন্দু ভাড়াটিয়া পাইলেন না?

পরে নিজে বাসা খুঁজতে বাইর হইয়া দেখলাম, এমন অনেক বাড়িই আছে যেখানে এই ধরনের নোটিস ঝুলে। বিদ্যাময়ী ইশকুলের পাশের গলি, গিরিশ চক্রবর্তী রোডে ‘নিখিল নিবাস’ নামের একটা বাড়ি আছে, ওইটাতে ইংরেজিতে লেখা—’টু লেট হিন্দু’।

আমলাপাড়াতেও দেখছি অনেক বাড়িতে নোটিসে লেখা থাকে ‘হিন্দু পরিবার’। আমার সহকর্মী নগরবাসী বর্মণ ওরফে পার্থ দাদা এই প্রসঙ্গে কইছিলেন, “মুসলমানদের নোটিসে লেখা থাকে না, এই আর কি।” উনি উত্তরবঙ্গের লোক, মমেনসিং আইসাই বাসা ভাড়া নিতে হইছে, ভাড়া চাইতে গিয়া উনি নিশ্চয়ই এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হইছেন, বাড়িওলা হিন্দু শুইনাই বেইকা বসছে। হিন্দু বাড়িওয়ালাদের মুসলমান-বিদ্বেষের কারণ আমি জানি না। অনেকে বলেন মুসলমানেরা গরু খায় দেইক্খা উনারা রান্নাঘর অপবিত্র করতে চান না।

এইটা একটা যৌক্তিক কারণ হইতে পারে। আমাদের বাসায় অনেক বার হিন্দু ভাড়াটিয়া ছিলেন। উনারা শুয়োর কাছিম রানতেন কিনা তা আমার আম্মা খোঁজ নেন নাই। আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে তনু নামের একটা মেয়ে থাকত। তনুর ফুফু আইসা আম্মারে জিজ্ঞেস করছিলেন, “হিন্দু ভাড়া দিবাইন?” আম্মা যখন পান্নালাল কর্মকার নামের কৃষি ব্যাংকের অফিসারকে বাসা ভাড়া দিতেছিলেন। পরেও সমীর আর কণিকা বিশ্বাস নামের এক ডাক্তার দম্পতি আম্মার বাসার আরেক ফ্ল্যাটে থাকছেন। তনুর ফুপুর প্রশ্নে আমি খুব অবাক হইছিলাম। কেউ হিন্দু দেইখা উনাদেরে ভাড়া না দেওয়া যাইতে পারে এইটা আমার মাথায় তখনও আসে নাই।

আমার নানার বাড়ি নওমহলে, ১২৭/ডি রামকৃষ্ণ মিশন রোড। সেইখানে ছোটমামার বাসায় প্রায়ই হিন্দু ভাড়াটিয়া থাকতেন। আমার নানি খুব ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু হিন্দু ভাড়াটিয়া নিয়া কোনো দিন আপত্তি করছেন বইলা শুনি নাই। আমার ছোটমামা ইচ্ছা কইরাই হিন্দুদের ভাড়া দিতেন। অবশ্য এই জন্যে না যে উনি খুব অসাম্প্রদায়িক ছিলেন। পরে বুঝছি, উনি দিতেন কারণ হিন্দুরা সহজে বাসা পালটায় না। হিন্দু পরিবার যেহেতু সব জায়গায় বাসা ভাড়া পাবেন না, তাই যতই অত্যাচার করা হোক, উনারা রইয়া যাবেন, বাড়িওলা হিসাবে পাওয়ার প্র্যাকটিস করা যাবে তাইলে। হিন্দু বাড়িওলাদের মুসলমান ভাড়া দিতে না চাইবার কারণও এইটা হইতে পারে। যেহেতু মুসলমানেরা সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় হিসাবে এক পদের দেমাগে থাকেন, ভাড়াটিয়া হইলেও দেমাগেই থাকবেন, বাড়িওলারে সমীহ করবেন না, হিন্দু ভাড়াটিয়ার কাছ থাইকা সেই সমীহ পাওয়া যাইব। এইটা মুখ্য কারণ আর গরুর গোশতটা গৌণ কারণ হইতে পারে। মমেনসিং শহরের নাম নাসিরাবাদ কবে ছিল তা আমি জানি না, তবে মমিনশাহী বা মোমেনশাহী বানায়া এরে মুসলমানি করনের চেষ্টাটা নিতান্তই মাঠে মারা গেছে। এই শহরের পরতে পরতে এখনও হিন্দু গন্ধ লাইগা আছে।

আমি জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি হইবার অনেক আগে জাহাঙ্গীরনগর থাইকা নৃবিজ্ঞানে পড়ালেখা করছিলেন এমন এক হিন্দু বড়ভাই বলতেছিলেন, ক্যাম্পাসের কোন এক মেয়ে নাকি সে হিন্দু শুইনা খুব বিস্মিত হইছে। সেই বড়ভাই খুব প্রমিত ভাষায় কথা কয়, মমেনসিঙ্গা টান তো নাইই , উচ্চারণও খুব ভাল। খুব তিক্ত স্বরে সে বলতেছিল, “আমার হিন্দু হওয়া নিয়ে এমন একজন কথা বলছে যার রোজগারের সিংহভাগ আসে কোনো না কোন পুরুষের সঙ্গে শুয়ে। এই পেশায় থাকার পর একজন নারী নিশ্চয়ই মুসলমান থাকে না? আমি তখন আরেক ব্যক্তির মাধ্যমে তাকে প্রস্তাব পাঠালাম আর জিজ্ঞেস করতে বললাম যদি আমি যথেষ্ট অর্থ দিয়ে থাকি তবে কি সে আমি হিন্দু বলে আমার সঙ্গে শয্যায় যাবে না?”

আমি এই কথা শুইনা বেশ অবাক হইছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীসমাজের এক অংশ বেশ্যাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত হইতে পারে এই তথ্য আমার মফস্বলী কিশোরী মন হজম করতে পারতেছিল না । আমার আর বড় বোনেরা জাহাঙ্গীরনগরে পড়ছে। তার মধ্যে একজন, আমার চাইতে প্রায় দশ বছরের বড়, সেও বলছিল ক্যাম্পাসে নাকি এমন মেয়েও আছে যারা লেখাপড়ার খরচ যোগাড় করবার জন্যে বেশ্যাবৃত্তিও কইরা থাকে। তখন আমার মনে হইছিল, ভার্সিটির লেখাপড়া কী এমন মহার্ঘ্য বস্তু যে তা অর্জন করবার জন্যে নিজেরে অত নিচে নামাইতে হইব। এমন না যে সতীত্বরে আমি খুব অমূল্য সম্পদ ভাবি। কিন্তু শুধু পয়সার লাইগা কারো লগে শোয়া বিষয়টা গ্লানিকর হওনের কথা।

আমি অবশ্য আনন্দমোহন কলেজের ছাত্রীদের কয়েকজনের সম্পর্কেও এইরকম কথা শুনছি। আনন্দমোহনে পড়ে এমন ব্যক্তির কাছ থাইকা। বিশ্বাস অবিশ্বাস কোনোটাই করি নাই। আমার মনে হইছে কাউরে অপছন্দ করলে তার নামে এই রকম কথা তার রেপুটেশন খারাপ করার জন্যে ইচ্ছাকৃতভাবে বলা হয়, ‘ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট’ ভয়েসে, যেন বদনামের মতন না শোনায়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক ছানোয়ার হোসেন সানির বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠাইয়া ছাত্র-ছাত্রীরা তার অপসারণের জন্য আন্দোলন করতেছিল যখন, অন্য এক বিভাগের এক ছাত্রী ক্যান্টিনে বইসা মিছিলে যাইতে অস্বীকৃতি জানাইতেছিল এই বইলা যে নাটক বিভাগের মেয়েরাই তো সব বেশ্যা, ওরা আবার যৌন নিপীড়ণের অভিযোগ আনে কেমনে। শুইনা আমি মজা পাইছিলাম কারণ ওই তথাকথিত প্রগতিশীল আপুটি একটি বামপন্থী রাজনৈতিক দল করলেও এইটুক বুঝার মতন আক্কল তার নাই যে ঢালাওভাবে বিশেষ কোনো বিভাগের সকল ছাত্রীর বেশ্যা হওয়াটা অসম্ভব এবং অন্যান্য সকল বিভাগের মেয়েরা ধোয়া তুলসীপাতা হওয়াটাও অযৌক্তিক। দ্বিতীয় কারণ হইল কেউ বেশ্যা হইলেও তারে সেক্সুয়ালি হ্যারাস করবার অধিকার কোনো পুরুষের জন্মায়া যায় না এইটা তত্ত্ব হিসাবে জানলেও নিজস্ব বিচার-বিবেচনায় আনতে ব্যর্থ হইছে সে, যদিও বলার সময় অনেক বড় বড় কথাই সে বলে। নৃবিজ্ঞান বিভাগের সেই বড় ভাইয়ের ক্ষেত্রেও মনে হয় এইটাই কারণ। মেয়েটা তার ধর্মীয় পরিচয়রে কোনোভাবে খাটো কইরা দেখছিল বইলাই সে মেয়েটার চরিত্র নিয়া বাজে কথা বইলা এক ভাবে শোধ তুলছে, যদিও তার টার্গেটের কান পর্যন্ত কথাটা পৌঁছাইতেছে না।

শশী লজের দক্ষিণ দিকের এক অংশ। ছবি. উম্মে ফারহানা

শশী লজের দক্ষিণ দিকের এক অংশ। ছবি. উম্মে ফারহানা

সেই বড়ভাই তাদের গলিতে হিন্দুদের বেইচা যাওয়া বাড়ি কিন্না নেওয়া অন্য জেলার লোকেদের বাচ্চাদের বিষয়েও প্রবল বিষোদগার করছিল। সে তার রিকশা গলিতে ঢুকাইব, বাচ্চারা স্ট্যাম্প লাগায়া ক্রিকেট খেলতেছিল। সে সরাইতে কইলে সরায় নাই, তখন সে একটা বাচ্চার চুলের মুঠি ধইরা বলছে, “ধুর ছিড়া ফালায়াম।” পরে চইলা যাওনের সময় শুনতে পাইছে যে ওই বাচ্চা আরেক বাচ্চারে কইতেছে, “ধুর কী রে?” মমেনসিঙ্গের ভাষায় ‘ধুর’ মানে আলজিহবা। আমার নানি মিষ্টি জিনিস খাইতেন কড়া মিষ্টি কইরা, উনার পরিমাণের চেয়ে কম চিনি বা গুড় দেওয়া হইলে বলতেন, “ধুর লাগাত মিডা অয় নাই।” ধুর ছিড়া ফালাইতে চাওয়ার কারণ হইল তার ধারণা হইছে সে হিন্দু বইলা বাচ্চাগুলা পাড়ায় নতুন আইসাও মাস্তানি ফলাইতেছিল। উনি যে এলাকার আদি বাসিন্দা, ‘লুকাল’, এইটা বুঝায় দেওনের লাইগ্গাই প্রমিত ভাষা ছাইড়া ধুর ছিঁড়া ফালানের হুমকি দিছিলেন।

ওই বড় ভাইয়ের কাছে এই কথা শুইন্না আমার ধারণা হইছে যে মমেনসিঙ্গের বাইরে হিন্দুরা সম্ভবত এক ধরনের অ্যাসিমিলেশনের মধ্যে দিয়া যায়। তাই কেউ হিন্দু শুনলে মুসলমানেরা অবাক হয়। আমার কাছে এই অবাক হওয়াটাই নতুন ঘটনা। কারণ আমরা ছোটকাল থাইকাই হিন্দুদেরে প্রতিবেশী, ক্লাসমেইট,বন্ধু, শিক্ষক ইত্যাদি হিসাবে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ কইরা আসছি।

বিদ্যাময়ী স্কুলে পড়বার সময় একবার এক হিন্দু মেয়ে, স্মিতা সাহা, ডাকনাম শ্রাবণী, আমারে কোন একটা বিষয়ে কিরা কাটতে কইছিল, “বল, সত্যি।”

আমি কইলাম, “সত্যি।”

“বল, বিদ্যা।”

“বিদ্যা।”

“বল, মা কালী।”

“মা কালী বলব কেন? আমরা বলি সত্যি বিদ্যা কোরান।”

“না না, মা কালী ত বলতে হবে।”

সেই বয়সে আমি তারে বুঝাইতে পারি নাই যে ‘মা কালী’র নামে দিব্যি করা আমার কাছে কোনো অর্থ বহন করে না আর সেও এইটা বুঝে নাই যে ‘কোরান’ বলার পরে মিথ্যা কওয়া আমার জন্য কঠিন হইত, ‘মা কালী’ না বইলা আমি আসলে দিব্যি কইরা সত্যি বলা থাইকা নিস্তার পাইতে চাইতেছিলাম না। সেও আমারে বুঝাইতে পারে নাই যে ‘মা কালী’ না বললে সে কেন আমার কিরা-কসমরে সিরিয়াসলি নিবে না।

আমাদের বাঘমারা বাসার বাড়িওলা অবশ্য সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। বাড়িওলার ভাইগ্না মুনিম ধইরাই নিছিল আমরা হিন্দু। সে বাসাভাড়া আদায়ের রশিদে তন্ময়ের নাম লিখত ‘তন্ময় পাল’। দুই তিন মাস এইভাবে রসিদ পাওয়ার পরেও আমি কিছু কইনাই, রসিদ দেইখা তন্ময় পরের বার কইল, তখন মুনিম জানাইল সে আমাদেরে হিন্দু ভাবছিল। এই ভাবনার পিছনে আমার বড় টিপ পরার একটা ভূমিকা থাকতে পারে।

বাঘমারার বাসার উত্তর পূর্ব দিকে একটা আখাম্বা দালান আছে, এলিট হাউজ। ওই বাড়িটাতে নাকি লাকি আখন্দ থাকতেন। আমি অবশ্য জানি না এই তথ্য ঠিক না ভুল। তবে লাকি আখন্দরে আমি বিপিন পার্কে দুই একবার দেখছি। গিয়া কথা কই নাই কারণ বিখ্যাত লোকেদের সঙ্গে কথা কইতে আমি পারি না। কইলেই কী আর কইতাম, “ভাই, আপনের ‘নীল মনিহার’ গানটা খুব সুন্দর” বা “আমায় ডেকো না আমার খুব প্রিয় গান”? উনি নিশ্চয়ই জীবনে অসংখ্য বার এইসব শুনছেন, বিরক্তই হইতেন।

যখন উনারে দেখছিলাম তখনও বিপিন পার্কের রাস্টিক চেহারাটা ছিল। মমেনসিঙ্গের মেয়র ইকরামুল হক টিটু উন্নয়নের নামে সকল প্রাচীন স্থাপনার গায়ে বাথরুমের টাইলস মাইরা ভক্কর-চক্কর করা শুরু করে নাই। নদীর দিকে মুখ কইরা বইসা চা খাইতে ভাল লাগত। অইদিকে গরাদ দেওয়াও ছিল না। এখন পার্কের মাঝখানে ডলফিনওয়ালা ফোয়ারা আর চকচকা স্টিলের রেইলিং দিয়া কী এক কাহিনী করছে। আমার বাল্যবন্ধু তানভীর আহমেদ পাপ্পু অবশ্য এই নিয়া ব্যাপক মুগ্ধ। কইতেছিল, “এর মধ্যে বিপিন পার্কে গেছ? সুন্দর করছে কিন্তু।” আমি যখন প্রাচ্যনাট স্কুল অফ অ্যাক্টিং এন্ড ডিজাইনের ছাত্র ছিলাম, নন্দনতত্ত্বের উপর এক লেকচারে বলা হইছিল যে মানুষের নান্দনিকতার বোধ তার মূল্যবোধের উপর নির্ভর করে। তখন আমি কথাটার আগামাথা কিছুই বুঝি নাই। পাপ্পুর মতন অনেকেরই ধারণা পুরান জিনিস মেরামত কইরা চকচকা কইরা ফালাইলে সৌন্দর্য বর্ধিত হয়।

গাঙ্গিনার পাড় মোড়ে যে পানির ট্যাংকিটা আছে সেইটারেও প্লাস্টিকের ফুল লতাপাতা লাগায়া ডিজিটাল ঘড়ি আর “নিয়মিত পৌরকর পরিশোধ করুন” নোটিশ টানায়া উৎকট এক চেহারা দিছে। এনসিসি ব্যাংকের আর্থিক সহায়তা নেওয়া হইছে, কারণ সরকারি ওই জাগায় ব্যাংক তার এটিএম বুথ বসাইছে। এনসিসি ব্যাংকের লগে পৌরসভার কোনো লেনদেন আছে, ইদানিং তারা পৌরকর ওই ব্যাংকের মাধ্যমে নেয়।

শহরের মেয়র টিটু ভাইয়ের নিজের পিতৃপ্রদত্ত নামখানা এতই পছন্দ যে সে শহরের সব জাগায় পাইকারি হারে নিজের নাম খোদাই করতেছে। ছেলেদের টিচার্স ট্রেইনিং কলেজ আর সরকারি ল্যাবরেটরি স্কুলের মিলিত কম্পাউন্ডের যে পুরান বাড়িটার নাম অ্যালেক্সান্ডার কাসল, সেইখানের ফোয়ারাগুলির গায়েও সে নিজের নাম লাগাইছে। সেইটা শশীকান্ত জমিদার বা তার বাপ সূর্যকান্তর আমলে করা একটা সুন্দর বাড়ি। স্থানীয় নাম লোহার কুঠি।

মেয়েদের টিচার্স ট্রেইনিং কলেজের বাড়িটার নাম সম্ভবত ‘শশী লজ’। কিন্তু ওইটারে সবাই রাজবাড়ি বলে। ওই বাড়ির পিছনের রাস্তার নাম কালিশংকর গুহ রোড আর পাড়াটার নাম পণ্ডিতবাড়ী। কিন্তু যাইতে হইলে রিকশাওলারে বলতে হবে রাজবাড়ীর পিছনে বা বিএনপি অফিসের সামনে।

শশী লজের সামনে বিরাট বাগানের মাঝখানে একটি অর্ধনগ্ন ভেনাসের মূর্তি আছে। এই মূর্তি দেইখা ধারণা করা যায় যে এইটার নামে ‘লজ’ শব্দটা থাকলেও এইটা আসলে বসতবাড়ি না, শশী জমিদারের বাগান বাড়ি। মুক্তাগাছায় জমিদার বাড়ি বইলা খ্যাত যে ভাঙ্গাচোরা বাড়িটা আছে সেইটার সামনে কোনো নগ্নিকা মূর্তি নাই। তবে সেইটার ভিতরে ঘূর্ণায়মান ড্যান্স ফ্লোর ছিল এককালে।

আমি কাউরে না জিগায়া নিজে থাইকা ধারণা করছি যে মমেনসিঙ্গের বাড়িটা শশী জমিদারের প্রমোদভবন ছিল। যতদূর জানি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথায় যারা জমিদার হইছিল তাদের তেমন কোনো কাজকাম থাকত না। ব্রিটিশ রাজরে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাজনা দিয়া তারা আজীবন জমিদার থাকতে পারত। তাদের নায়েব গোমস্তারা কর আদায় সংক্রান্ত কাজগুলি করত। কাজেই তারা বাইজী নাচানো, পায়রা উড়ানো ধরনের বিলাস-ব্যসনে দিন কাটাইত। আমার শিক্ষক রফিক স্যার কইছিলেন, যে সকল জায়গায় জমিদারদের আবাস থাকত বা ছিল সেই সকল জায়গায় দুইটা জিনিস খুব ডেভেলপ করছে। একটা হইল মিষ্টি আরেকটা হইল প্রস্টিটিউশন। মমেনসিংহের মিষ্টিও খাইতে ভাল। মুক্তাগাছার মণ্ডা ত খুবই বিখ্যাত।

louhitter-dhare-5

“শশীলজের বাগানে ভেনাসের পেছন দিক, সব দিক থাইকাই সুন্দর লাগে এই ভাস্কর্য।” – লেখক। ছবি. উম্মে ফারহানা

আমার বন্ধু আরিফুল ইসলাম লস্কর শশীলজ দেইখা কইছিল, “এইখানে কলেজ না বানায়া অন্য কিছু বানাইলে পারত।”

আমি কইলাম, “তা পারত, কিন্তু মিউজিয়াম বানাইলে রাখত কি? পুরানা জিনিস ত আর তেমন কিছু নাই দেখানোর মতন, যদিও বাড়িটা ইটসেলফ দর্শনীয়।”

আরিফ কইল, “ভাব, এই রকম একটা স্কাল্পচার বাংলাদেশের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় বানাইতে পারবে? চিন্তা করতে পারস?”

আমি আসলেই চিন্তা করি নাই। এইটারে টিচার্স ট্রেইনিং কলেজ হিসাবেই দেইখা আসছি। এইটা যে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে যে শইল থাইকা কাপড় খুইলা পইড়া যাইতেছে এমন নারীমূর্তি অন্তত এই দেশে থাকে না ত আমি আগে ভাইবা দেখি নাই।

আমরা যখন অনেক ছোট, এই বাড়িতে আর অ্যালেক্সান্ডার ক্যাসলে হুমায়ূন আহমেদের লেখা ‘অয়োময়’ নাটকের শুটিং হইছিল। ওই নাটকের শিল্প-নির্দেশক ছিলেন আমার আব্বার বাল্যবন্ধু রেজাউল করিম কাকা। উনি বিটিভির শিল্প-নির্দেশক। উনি একজন আর্টিস্ট; তখন পর্যন্ত আমার দেখা একমাত্র আর্টিস্ট।

তখন কাকার পায়ে কী যেন হইছিল, উনি ক্রাচ নিয়া হাঁটতেছিলেন। আমার দেখা তখন পর্যন্ত একমাত্র শিল্পী একজন কবিও। উনার লেখা কবিতার বই ‘রোদেরা মরে যায়’ এর একাধিক কপি আমাদের বাসায় ছিল। সেই ক্লাস টু বা থ্রিতে পড়া বয়সে ওই বই পইড়া আমি কিছুই বুঝি নাই। তখন আমার প্রিয় কবি ছিলেন আল মাহমুদ। ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ নামের বইটার প্রায় সব কবিতা আমার মুখস্থ ছিল, চেষ্টা করলে এখনও দুই-চাইরটা মনে করতে পারব। ‘মেঘনা নদীর শান্ত মেয়ে তিতাসে, মেঘের মতন পাল উড়িয়ে কি ভাসে’ সম্ভবত ওই বইয়ের প্রথম কবিতা ছিল। অনেক পরে আমি জানতে পারছি যে আল মাহমুদের বাড়ি তিতাস নদীর পাড়ে, ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে।

তিতাস নদীর পাড়ে আরেক মহারথী সাহিত্যিকের বাড়ি, উনার নাম অদ্বৈত মল্লবর্মন। উনার ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ আমি পড়ি নাই বইলা তন্ময় আমারে খুব লা’নত দিছিল। কথা হইতেছিল ঋত্বিক ঘটকের ছবিটা নিয়া। আমি কইছিলাম যে আমি ছবিটা দেখি নাই। তন্ময় কইল, “বইটা ত পড়ছিস?”

“না, বইটাও পড়ি নাই, ইন্টারে আমাদের পাঠ্য ছিল ‘পদ্মা নদীর মাঝি’।”

এমন না যে কোনো বই সিলেবাসে না থাকলে আমি পড়ি না, এই কথা কইছি কারণ বোর্ড থাইকা দেওয়া অপশনে দুইটাই ছিল, আমগর কলেজে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ নেওয়া হইছিল।

“কী কইলি? তুই ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ পড়ছ নাই?”

“এতে অবাক হওয়ার কী আছে? অনেক ভাল বই আছে জগতে, সব কি আমি পড়ছি নাকি?”

“তাইলে তুই সাহিত্য নিয়া কথা কছ ক্যামনে?”

louhitter-dhare-6

যে ঘাটে মির্জা সাহেব রূপী আসাদুজ্জামান নূর কাগজ ছিঁড়া ছিঁড়া ফালাইছিলেন সেইখানে এক লোক কাপড় ধুইতেছে। মার্বেল পাথরের স্ল্যাবগুলা নাই, শুধু মাঝেরটা আছে। ছবি. উম্মে ফারহানা

“শখ কইরা কই নাকি? পেটের দায়ে কই”—আমি ফাইজলামি করলাম। সাহিত্যের শিক্ষক হইয়া যাওয়াটা আমার জন্যে ভবিতব্য হইতে পারে, আমি শিক্ষক হইতে চাই নাই কোনো জনমে, কিন্তু সাহিত্য পড়াটার লগে পেশার কোনো সম্পর্ক নাই, যেইটুক অল্পবিস্তর সাহিত্য পড়ছি তা মনের আনন্দেই পড়ছি।

তন্ময়ের হতাশ চেহারা দেইখা লজ্জিত হইলাম আর লজ্জা ঢাকতে গ্যাড় দেখাইলাম, “অদ্বৈত মল্লবর্মনের বাড়ি তগর এলাকায় দেইক্খা কী হইছে, তগর শহরে ত একটা সিনামা হলও নাই যে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ দেখব এলাকার লোকে।”

তন্ময় তখন সিনামা হল ভাইঙ্গা শপিং মল বানানেওয়ালাদের বাপমা তুইল্লা গালি দিল।

শুরুতে আমি খুব বিস্মিত হইতাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ার লোকেদের কথায় কথায় গালিগালাজ করার অভ্যাস দেইখা। আমাদের ব্রাহ্মপল্লীর বাসার পিছনের পুরাটা বস্তি ধরনের এলাকা। অইখানেও কাইজ্যা লাগলে সবাই যা তা গাইল পাড়ে। কিন্তু আমাদের বাড়ির কোনো জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিরে আমি দেখি নাই বাচ্চাদের সামনে কাউরে মুখ করতে, রাইগা গেলে আমার চাচারা ‘হারামজাদা, শোউরের বাইচ্চা’ কইয়া মুখ করত, আমরা আশপাশ থাইকা শুনছি। কিন্তু কারো মা বা বইনের লগে যৌনসম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ কইরা গালি যে কেউ পারিবারিক পরিবেশেও দিতে পারে সেইটা আমার জ্ঞানের অগোচরে ছিল। আমি ভাবতাম অইগুলা গালি খালি ইস্টিশনের মাতাল পাগল আর বেশ্যারা দিয়া থাকে। এইখানে ভৌগলিক একটা ব্যাপার জড়িত থাকতে পারে। এই এলাকার লোকেরা মূলত শান্তিপ্রিয়। যদিও ত্যাগদা বা ঘাড়ত্যাড়া, কিন্তু উগ্র ধরনের না। ভাষা নিশ্চয়ই মানুষের স্বভাবের উপরে নির্ভর করে আর স্বভাব নির্ভর করে এলাকার ভূ প্রকৃতির উপর। উর্বর এলাকার মানুষের স্বভাব নরমই হইবার কথা।

(কিস্তি ২)

About Author

উম্মে ফারহানা
উম্মে ফারহানা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ইংরেজি সাহিত্য পড়ান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত। জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, ৬ অক্টোবর ১৯৮২। প্রকাশিত গল্পগ্রস্থ: দীপাবলি।