লৌহিত্যের ধারে (২)

মাইয়া মাইনষের বাপের বাড়ি থাকে কিংবা শ্বশুরবাড়ি, নিজের বাড়ি থাকে না।

(শুরুর কিস্তি)

২.

‘অয়োময়’ নাটকের শুটিং চলাকালে আমার খুব দুঃখ হইছিল এই জন্যে যে আব্বার বন্ধু শিল্প নির্দেশক হবার পরেও আমরা শুটিং দেখতে যাইতে পারলাম না। আসাদুজ্জামান নূর, সারা যাকের, আবুল হায়াত, সুবর্ণা মুস্তাফার মতন স্টারেরা কি আর রোজ রোজ ময়মনসিং আসেন?

নূর আমার বিশেষ প্রিয় অভিনেতা কারণ আমার আব্বার সঙ্গে উনার চেহারার বেশ মিল। সুবর্ণা মুস্তাফাও আমার খুব পছন্দের। ‘অয়োময়’ নাটকে উনার চরিত্র ছিল কাশেমরূপী আবুল হায়াতের দ্বিতীয় স্ত্রী। অ্যালেক্সান্ডার কাসলের দোতলায় উঠার ঘুরাইন্যা সিঁড়ি দিয়া সুবর্ণা মুস্তাফারে উঠতে দেখা গেছিল।পরে কলেজে উইঠা আমি যখন বাতিরকল নারায়ণ স্যারের বাসায় প্রাইভেট পড়তে যাইতাম, একবার নীলিমা নামের এক মেয়ের সঙ্গে ওই সিঁড়ি দিয়া দোতলায় উঠছিলাম, খুব সকালবেলায় গেছিলাম সেইদিন স্যারের বাসায়। শীতকাল ছিল, লোকজন তেমন ছিল না।

louhitya2b
লোহার কুঠির হাতভাঙা মূর্তি। আমি আর নীলিমা এই বারান্দাতেই উঠছিলাম। – লেখক। ছবি. কাজী রুবায়েত ইসলাম।

দোতলার বারান্দায় আমরা হাঁটাহাঁটি করতেছি। কই থাইক্যা এক লোক আয়া চিল্লায়া কইল নাইমা যাইতে। অইখানে উঠা নাকি নিষেধ। আরেক বার আমি আর নীলিমা ওই জায়গার একটা গাছ থাইকা ফুল পাড়ার চেষ্টা করলে এক লোক গাড়ি থামায়া গাড়ির জানালা দিয়া ডাইকা কইল, “তোমরা কারা? কোথা থেকে এসেছ?”

আমরা বললাম, “বেড়াইতে আসছি।”

“এই যে ফুল পাড়তে চাচ্ছ, জানো এটা কী ফুল?”

“জী না, জানি না।”

“এইটা অশোক ফুল, তোমরা জানো এটা কত রেয়ার?”

ফুলের নামই যারা জানে না তারা রেয়ার কিনা ক্যামনে জানবে?—“জী না, জানি না।”

“কক্ষনো এই গাছ থেকে ফুল পাড়বে না।”

“জী আচ্ছা।”

গাড়ি চইলা গেলে আমরা আরেক মড়া গাছের ডাল যোগাড় কইরা কুটা বানায়া দুইটা অশোক ফুল ছিঁড়া নিয়া আসলাম। কে জানে আসলেই ওইটা অশোক ফুল কিনা। হইতেও পারে, কারণ তখন মার্চ মাস, বসন্তকালেই অশোক ফোটার কথা। ভদ্রলোক কে ছিলেন সেটা জানি না, টিচার্স ট্রেইনিং কলেজের কোনো হর্তাকর্তা হবেন হয়তো।

‘অয়োময়’ নাটকে আসাদুজ্জামান নূর ছিলেন মির্জা সাহেব আর আর মির্জার বড় বউ লাকি ইনাম, ছোট বউ সারা যাকের। আমি অনেক পরে সারা যাকেরকে দেখছিলাম বলাকা সিনেমা হলে, মাটির ময়না দেখতে গিয়া। আমাদের পিছনের সারিতে এক বিদেশিনীর লগে বইয়া উনি ইংরেজিতে কথা বলতেছিলেন ইন্টারভ্যালের সময়। আমি জানতাম না যে ভদ্রমহিলা এত সুন্দরী। নিতান্ত অভদ্রতা হয় দেইখ্যা আমি ঘাড় ঘুরায়া দেখতে পারতেছিলাম না, তাই আমার আফসোসের সীমা ছিল না। টিভিতে উনারে এর ভগ্নাংশ সুন্দরও লাগে না! ‘অয়োময়’ নাটকের সেটিংও জমিদারি আমলেই। কিন্তু মির্জা সাহেবের চরিত্র একেবারে সাফ, উনার কোনো উপপত্নী নাই, উনি বাইজিও নাচান না। তবে ইঙ্গিত দেওয়া ছিল যে উনার পূর্বপুরুষেরা এইসব করতেন।

হুমায়ূন আহমেদের লেখায় অনেক ভিক্টোরিয়ান প্রুডারি পাওয়া যায়। নাটকের জন্যে লেখা গল্পে উনারে আরো বেশি সাবধানি হইতে হইছে, তখন বিটিভি অনেক রক্ষণশীল ছিল। বিটিভির দর্শকেরা নরনারীর আলিঙ্গনের দৃশ্যও স্বাভাবিকভাবে নিতে পারত না। মির্জার ছোট বউ এলাচিরূপী সারা যাকের মির্জাকে সন্তান সম্ভাবনার খবর দিলে মির্জারূপী নূর উচ্ছ্বসিত হইয়া উনারে প্রায় জড়াইয়া ধরেন, তাইতেই আমাদের মা খালা ফুফু চাচিদের মধ্যে আলোড়ন পইড়া গেছিল। উনারা ত আর জানতেন না যে আর মাত্র বছরখানেকের মধ্যে ঘরে ঘরে ‘চোলি কে পিছে ক্যায়া হ্যাঁয়’ চইলা আসবে আর ঘরগুষ্টিসুদ্ধা সবাই মাধুরী দীক্ষিতের ব্লাউজের ভিতরে কী তা জানার জন্যে চোখ বড় বড় কইরা টিভি সেটের সামনে বইসা থাকবে।

আমাদের ছোটকালে হিন্দী ছবি দেখাটা প্রায় নিষিদ্ধ কাজ ছিল, বড়রা ভিসিআর ভাড়া কইরা দেখত, অমিতাভ বচ্চন রেখার সিলসিলা, ছোটরা ঘুমায়া গেলে পরে। আমি ছোটকালে আব্বার বন্ধু মনোরঞ্জন কাকার বাসায় গিয়া দেখছিলাম ‘নাস্তিক’ নামের একটা ফিল্ম, অইখানে অমিতাভ বচ্চনের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করছিল ময়ূর নামের এক কিশোর, সে এক দেবী প্রতিমার সামনে খাড়ায়া কইতেছিল, “তু তো পাত্থর হ্যাঁয়, পাত্থর।” এই ডায়লগ মনে থাকবার কারণ হইল, আমরাও ছোটকালে পাথররে ‘পাত্থর’ কইতাম, কবর না কইয়া কইতাম কব্বর। মনোরঞ্জন কাকার বাসাটাও ছিল কালিবাড়ি কব্বরখানার পাশেই। অই রাস্তাটাতে গেলে নোনা ইলিশের গন্ধ পাওয়া যাইত। আমরা বলতাম ‘নুনা ইলশা’, যারা একটু ‘শুদ্ধ’ কইরা কইতে চাইত তারা কইত ‘লবণদা ইলিশ’।

louhitya2a
রাজবাড়ির (শশী লজ) আঙিনায় রোদে পিঠ দিয়া বসা মহিলা অপ্রকৃতস্থ । ছবি তোলার অনুমতি নিতে গিয়া শুনলাম সে নিজের মনেই বিড় বিড় কইরা বলতেছে, “তুমার খাওন তুমি খাইবা, তুমার না খাইলে চলব বইন? তুমার প্যাডো বাচ্চা।” – লেখক

কালিবাড়ি কব্বরখানার পাশের গলিতে আমার বড়খালার ছোটবেলার বান্ধবী রোকেয়া বেগম এডভোকেটের পৈতৃক বাড়ি ছিল, ‘জঙ্গলবাড়ি হাউজ’। অই বাড়ির মতন চমৎকার বাড়ি আমি আর দেখি নাই। সামনে একটা বাগানে সারা বছর বিভিন্ন ফুল ফুইটা থাকত। বটল ব্রাশ ছিল, সাদা জবা ছিল। বাড়ির সামনের অংশ আর পিছনের অংশের সংযোগ হিসাবে একটা পাকা আইল ছিল, আইলের দুই পাশেও জবাফুলের ঝাড় ছিল। অই বাড়িতেই আমি প্রথম রকিং চেয়ার দেখছিলাম। এমনিতে রকিং চেয়ার জিনিসটা দেখতাম সিনামায়। ক্লাইমেক্সের সময় কিংবা গানটানে নায়িকারে দেখাইত রকিং চেয়ারে বইসা দোল খাইতে। অই বাড়িতে আর অনেক সুন্দর সুন্দর জিনিস ছিল। দেওয়ালে লাগান বিশাল বড় শিং, সম্ভবত সম্বর হরিণের।

এডভোকেট রোকেয়া বেগম ছিলেন ময়মনসিংহ মহিলা সমিতির প্রধান ব্যক্তি। কিন্তু ছোটকালে আমরা সেটা জানতাম না। তারে আমরা ডাকতাম ‘রুকু খালামণি’ কারণ আমার মা-খালারা তারে ‘রুকু আপা’ বইলা ডাকতেন। রুকু খালামনি অদ্ভুত মজার সব খাবার রান্না করতেন। উনার বাসায়ই প্রথম আমি পেয়ারার জেলি খাইছিলাম। এর আগে আমার ধারণা ছিল জেলি-টেলি দোকান থাইকা কিনতে হয়, বাসায় বানানো যায় না।

একদিন আমাদের ব্রাহ্মপল্লীর বাসায় রুকু খালামনি আসছেন। তখন আমি বেশ বড়ই, হাইস্কুলে পড়ি। বাইরের ঘরে আইসা খালামণিরে দেইখা হাইসা দিয়া বললাম, “ভাল আছেন?” আব্বা আমারে বললেন, “খালামণিকে সালাম দাও।” রুকু খালামনি আব্বারে থামায়া দিয়া বললেন, “সালাম দিতে হবে না। ও যে হাসিটা দিল সেটা সালামের চেয়ে অনেক ভাল।” আমি তখন বুঝতে পারছিলাম যে উনি অন্য ধরনের মানুষ। আব্বা-আম্মা আমাদেরে সালাম কদমবুসি ইত্যাদি কমবেশি শিখাইছেন, কিন্তু বড় হইতে হইতে আমি এসব ব্যাপারে একটু উদাসীন হইয়া গেছি।

রুকুখালার বাড়ির মতন আরেক বনেদি বাড়ি ছিল ঈদগাহ মাঠের উলটা দিকের গলি দিয়া ঢুকলে আব্বার বন্ধু নূরুল আমিন কাকার বাড়ি। সেইটাতে মাঝখানের হল রুমটাতে ছিল দশটা দরজা। পূর্ব আর পশ্চিমে দুইটা দুইটা কইরা চাইরটা আর উত্তরে দক্ষিণে তিনটা কইরা। অই হলরুমটাতে একদিকে দেওয়ালে ঝুলানো ছিল একটা ছবি। একটা পেইন্টিংয়ের বাধানো পোস্টার। একটা ফিনফিনা জামা পরা মেয়ে আর একটা নেংটি পরা ছেলে, চাঁদের আলোয় মাটির রাস্তা দিয়া যাইতেছে, ছেলেটা মেয়েটার মুখের দিকে চায়া রইছে। জাহাঙ্গীরনগরে পড়বার সময় হলে আমার প্রথম যে রুমমেট ছিল শর্মি আপু, সে বলছিল অই ছবিটার নাম নাকি ‘ইলোপ ফ্রম হেভেন’ বা ‘স্বর্গ হতে পলায়ন’। আমি তার কথা বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোনোটাই করি নাই। আমি চিত্রকলা সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না, হইতেও পারে ওইটা কোনো বিখ্যাত রেনেসাঁস শিল্পীর আঁকা ছবি। রেনেসাঁস শিল্পীদের আঁকা ছবির পোস্টার এমনিতে জনপ্রিয় ছিল। আমার বৌমা, মানে মেজ চাচির রুমে ছিল মোনালিসার একটা পোস্টার। কিন্তু নুরুল আমিন কাকার বাড়ির ছবিটা আমার অন্য রকম লাগত, পরে বড় হইয়া জানছি অই অনুভূতিটারে অনেক সময় এগজটিক বলা হয়। রুমটার বিশালতার একটা ভূমিকা এইখানে থাকতে পারে। আমরা থাকতাম ফজল কাকার বাসার তিন রুমের ফ্ল্যাটে, সেই তুলনায় নুরুল আমিন কাকার বাসাটা রীতিমত আলিশান।

আব্বার অনেক বন্ধুরাই বেশ বড় মানুষ ছিলেন। আমিন খান কাকা ছিলেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আর সালেহুজ্জামান খান হইলেন বড় ব্যবসায়ী, জামান স্টিম লন্ড্রি আর জামান প্রিন্টিং প্রেসের মালিক। উনার আরেকটা পরিচয় হইল উনি পাকিস্তান আমলের গভর্নর মোনায়েম খানের ভাইস্তা।

খান থাকলেই নামগুলারে খান্দানি লাগে। নূরুল আমিন কাকার নামের পিছে খান ছিল না কিন্তু তার চেহারাটাই ছিল খান্দানি।উনি আমাদেরে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। নাম ধইরা না ডাইকা ডাকতেন ‘আম্মা’, আর ‘আপনি’ কইরা সম্বোধন করতেন। মীরা কাকি, মানে উনার স্ত্রীর চেহারাও অত্যন্ত অভিজাত।

এই রকম খান্দানি অনেক বাড়ি আছে ময়মনসিংহ শহরে। বিশেষ দ্রষ্টব্য বাড়ি হইল আমলাপাড়ায় তসলিমা নাসরিনদের বাড়ি। ময়মনসিং নতুন আসছেন এইরকম অনেকেই আমারে ওই বাড়ির কথা জিগান। বাড়িটা বেশ সুন্দর। একতলাই, কিন্তু সামনে অনেকখানি জাগা, গাছপালা আছে, পাশে গ্যারাজ আছে। ছাদের রেলিংয়ে বিভিন্ন ডিজাইনের শেপের ফাঁক ফাঁকও আছে। ইদানিংকার বাড়িগুলার মতন সমস্ত জাগা জুইড়া বাড়ি বানায় রাখে নাই। তাদের বাড়িটার নামও সুন্দর—‘অবকাশ’। ওই বাড়িতে এখন কে কে থাকেন আমি জানি না। আমরা ইশকুলে পড়ার সময় পর্যন্ত তসলিমা নাসরিনের ভাইয়ের পরিবার, বাবা মাও থাকতেন। পচাপুকুরপাড়েও দুইটা বাড়ি আছে যেইগুলা তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ‘আমার মেয়েবেলা’ বইতে উনি লিখছিলেন উনার বাবা ডক্টর রজব আলির মিসট্রেস, যাকে উনার মা ‘চাকলাদারের বউ’ বইলা উল্লেখ করতেন, সেই রাজিয়া বেগমের বাড়ি পচাপুকুরপাড়।

পচাপুকুরপাড় দিয়া যাইবার সময় আমার অবধারিতভাবেই সেই চাকলাদারের বউয়ের কথা মনে পড়ে আর ভাবি ঠিক কোন বাড়িটা রাজিয়া বেগমের স্বামীর বাড়ি হইতে পারে। ঠিক পচাপুকুরের উল্টা দিকেই দুইটা বাড়ি, মোটা মোটা খাম্বাঅলা বারান্দাগুলায় কাউরে কোনোদিন দাঁড়াইয়া বা বইসা থাকতে দেখি নাই, কিন্তু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, দেখলেই বুঝা যায় মানুষ থাকে। ক্যান জানি ওই দুইটার একটারেই আমার রাজিয়া বেগমের বাড়ি বইলা মনে হয়।

আমরা নতুন বাজার মেথর পট্টির উল্টা দিকের মেদিনি হাই টাওয়ার নামের দশতলা বাড়ির চার তলায় ছয় মাস থাকছি। তখন প্রায়ই পচাপুষ্কুনির পাড় দিয়া যাতায়াত করতে হইত।

louhitya2e
সবুজ জানালাওয়ালা হলুদ বাড়ি। আমলাপাড়ার এডভোকেট শ্রী মনোরঞ্জন ধরের এই বাড়িটা দেখলেই আমার এতে থাকতে ইচ্ছা করে। – লেখক। ছবি. নাদিয়া ইসলাম

‘সুতিয়াখালি হাউজ’ নামে আরেকটা বাড়ি আছে আমলাপাড়ায়, টানা বারান্দাওলা বাড়িটা তেমন বনেদি চেহারা না হইলেও খুব সুন্দর লাগত আমার কাছে। খাটো দেওয়াল হওয়াতে সামনে মৌসুমি ফুলের বেড আর সারা বছর সবুজ থাকে এমন মোটা ঘাসে ঢাকা লন দেখা যাইত। বাড়িটার অর্ধেক এখনো আছে, অর্ধেকের শরিক সম্ভবত নিজের অংশ ডেভেলপারকে দিয়া দিছেন, ওইটাতে ছয়তালা উঠতেছে। ওইটা দেখলেই আমার মন খারাপ হইয়া যায়। আমলাপাড়া ঢুকার মুখেই এইরকম আরও দুইটা দোতলা বাড়ি আছে আরও পুরানা আমলের। একটার ছাদের সামনের অংশে জোড়া সিংহ। এডভোকেট শ্রী মনোরঞ্জন ধরের নাম লেখা আছে গেইটে।

ছোটবাজারে ডাচবাংলা ব্যাংকের পাশের সবুজ জানলাওলা হলুদ বাড়িটা আর কংগ্রেস জুবিলি রোডের প্রেসক্লাব কেন্টিনের মালিকের বাড়িটাও অনেক পুরাতন, দেওয়াল হলুদ আর লাল, জানালাগুলা সবুজ খড়খড়িওলা। হলুদ রঙের এই বাড়িগুলা দেখলেই আমার ঢুকতে ইচ্ছা করে। ছোটবেলা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা কিশোর উপন্যাস পড়ছিলাম, ‘হলদে বাড়ির রহস্য’। ওই বইয়ের ঘটনা আমার কিছুই মনে নাই, কিন্তু এইরকম হলুদ বাড়ি দেখলেই আমার ওই বইটার নাম মনে পড়ে আর এক ধরনের আকর্ষণ বোধ করি।

আমার সহকর্মী অর্পনা আপু, যে জাহাঙ্গীরনগরে আমার বিভাগের বড় আপু ছিল আর ত্রিশালে চাকরি নেওয়ার পর আমার খুব বন্ধুও হইছে, ময়মনসিংহের পুরানা স্থাপনার উপরে একটা ফটো স্টোরি করতে চাইছিল, তখন আমি আর সে জুবিলি রোডের অই বাড়িটাতে ঢুকছিলাম। ওই বাড়ির উল্টা দিকের হিন্দু ধর্মশালার ছাদ থাইকাও ছবি তুলার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু আপুর ক্যামেরাটা প্রাইম লেন্সের হওয়াতে তেমন একটা যুইৎ করতে পারি নাই।

কংগ্রেস জুবিলি রোড থাইকা পশ্চিমে গেলে সোনালি ব্যাংকের মেইন ব্রাঞ্চ যে বাড়িটা, সিদ্ধেশ্বরী দেবী রোডে, সেইটাও অসাধারণ একটা বাড়ি। দোতলা, উপরে ঢালু ছাদ। তন্ময় বলছিল দক্ষিণ ভারতে নাকি ভারতের কোন এক প্রদেশে, যেসব এলাকায় বৃষ্টিপাত বেশি হয় সেইসব এলাকার বাড়ির ডিজাইনে নাকি এইরকম ঢালু ছাদের বাড়ি বানানো হয়, সিলেটেও নাকি এই ধরনের বাড়ি অনেক আছে।

‘দ্য শ্যাডো লাইনসে’র নামবিহীন ন্যারেটর যেমন শ্রীলংকার বাড়িগুলাতে ছাদ নাই শুইনা অবাক হইয়া ভাবছিল তাইলে বাচ্চারা ঘুড়ি উড়ায় কেমনে, কিংবা পাশের বাড়ির বন্ধুরে ডাক দেয় কই দাঁড়াইয়া, আমিও তেমন ভাবতেছিলাম দক্ষিণ ভারতের ওই অঞ্চলের মেয়েরা তাইলে বিকালে হাঁটাহাঁটি করে কই। কে জানে, হয়ত অইসব এলাকার মেয়েদের জীবন আমাদের দেশের মফস্বলের মেয়েদের জীবনের মতন বদ্ধ না, ওদের হয়ত ছাদে হাঁটার দরকার পড়ে না। আমার মেয়ে প্রকৃতিরে নিয়া একদিন আম্মার একটা কাজে সোনালি ব্যাংকের প্রধান শাখায় গেছিলাম। প্রকৃতি বলতেছিল, “আম্মু, এই বাড়িটাতে থাকতে পারলে কি মজা হইত না?”

অর্পনা আপুর কাছে শুনছি নেপালে এই রকম পুরান বাড়ি থাকলে সেইগুলা নাকি ন্যাশনাল হেরিটেজ হিসাবে রক্ষা করে, প্রাইভেট প্রপার্টি হইলেও ভাঙতে দেয় না। আমাদের এইখানে বানায় কলেজ, ব্যাংক কিংবা ডায়াবেটিক সমিতি।

গোলপুকুরপাড়ে সংগীত বিদ্যালয় ছিল যেখানে সেই রাস্তায় ‘মডাস’ বা ময়মনসিংহ ডায়াবেটিক সমিতির বাড়িটাও প্রায় প্রাসাদের মতন। সংগীত বিদ্যালয়ের বাড়ির অধিকাংশটা সম্ভবত ভাইঙ্গা ফেলছে। গেইট এখনো আছে, গেইটে সংগীত বিদ্যালয় লেখাও আছে। আমার আব্বার খুব শখ ছিল আমরা গান শিখি। ছোটবেলা আমাদের হারমোনিয়াম তবলা কিন্যা দিয়া সংগীত বিদ্যালয়ে ভর্তি করায়া দেওয়া হইছিল। আব্বা ওই স্কুলে আমাদেরে পাঠানো বন্ধ করছিলেন কারণ তার ধারণা হইছিল যে ওই বাড়ি ভূমিকম্প হইলে ভাইঙ্গা পড়ব, আর ওইটার চিপায়-চাপায় প্রচুর সাপখোপ আছে।

এই বাড়ি কে বানাইছিল তা জানি না, এখন এইটা 'ময়মনসিংহ দায়াবেটিক সমিতি' বা মডাস ছবি নাদিয়া ইসলাম
এই বাড়ি কে বানাইছিল তা জানি না, এখন এইটা ‘ময়মনসিংহ ডায়াবেটিক সমিতি’ বা মডাস। – লেখক। ছবি. নাদিয়া ইসলাম।

সংগীত বিদ্যালয়ের বাড়িটা ছিল অনেকটা আগের দিনের সেটিংয়ে বানানো নাটক বা সিনেমা যেরকম বাড়িঘরে শুটিং করে সেই রকম। যারা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘দূরবীণ’ পড়ছেন তাদের হয়ত মনে আছে, হেমকান্তের অংশে ব্রিটিশ আমলের ময়মনসিংহ শহরের বর্ণনা ছিল কিছুটা। সংগীত বিদ্যালয়ের বাড়িটা দেখলে সেই সময়টার গন্ধ পাওয়া যায়। ‘নষ্টনীড়’ বা ‘হৈমন্তী’ গল্পের উপরে নাটক হইলে এই ধরনের বাড়ি দেখতে পাওয়া যাইত আগে বিটিভিতে। শীর্ষেন্দু আমার খুব একটা পছন্দের লেখক নন। তার ছোট উপন্যাস অনেকগুলা পড়লেও বড় উপন্যাসের মধ্যে একমাত্র ‘দূরবীণ’ই আমার পড়া আছে। দূরবীণে ময়মনসিং শহরের অংশটা পড়তে বেশ মজা লাগছে। দুর্গাবাড়িতে ‘দশভূজা বাড়ি’ নামে একটা বাড়িতে মালিক দুর্গার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করছিলেন তখন, সেই তথ্য উপন্যাসে দেওয়া আছে। সাধারণত বাড়িতে কেউ দুর্গাদেবীর পূজা করেন না, সেইটা খুব ঝামেলা এবং খরচ সাপেক্ষ ব্যাপার। কিন্তু দশভূজা বাড়িতে নিয়মিত দুর্গাপূজা হয় এখনও, সন্ধ্যাবেলা ওই রাস্তা দিয়া হাঁইটা গেলে সেই পূজার আওয়াজ পাওয়া যায়।

মদন বাবু রোডে আমার ফেইসবুক ফ্রেন্ড নাদিয়া ইসলামের নানার বাড়ি খুঁজতে গিয়া দেখলাম এম এ কাহহার সাহেবের বাড়িটার দুইটা ফটক, একটা দুর্গাবাড়ির দিকে আরেকটা মদন বাবু রোডের দিকে। সামনে অনেক বড় বাগান। নাদিয়ার নানার বাড়িটাও বনেদি, নাম ‘আকন্দ লজ’, বাড়ির বাইরে নাদিয়ার নানার নাম ‘নওয়াব আলি আকন্দ’ লেখা আছে। বাড়িটার নাম সহজেই ‘নওয়াব বাড়ি’ হইতে পারত কারণ ওইটাও একটা আলিশান বাড়ি, প্যালেস টাইপের। সামনে পপি ফুলের ঝাড়।

louhitya2f
জয়নুল গ্যালারির পাশের অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনারের বাড়ি – লেখক।

অবশ্য বসতবাড়ি হিসাবে আমার সবচে’ ভাল লাগে জয়নুল আর্ট গ্যালারির পাশের বাড়িটা। অ্যাডিশনাল ডেপুটি কমিশনারের বাসভবন সম্ভবত ওইটা। বুড়া বয়সে হইলেও ওই রকম একটা বাড়িতে থাকা যাবে এই আশায় আমি বিসিএস পরীক্ষা দিছিলাম পর পর তিন বার। একবারও প্রিলিমিনারিতেই টিকি নাই (তথ্য মুখস্থ করা আমার অসম্ভব কঠিন লাগে)।

সাহেব কোয়ার্টারে নিশ্চয়ই আমলাদের থাকার জন্যে আর অনেক সুন্দর সুন্দর বাড়ি আছে। কিন্তু উঁচা দেওয়ালে ঢাকা সেইসব বাড়িতে আমি কোনোদিনও ঢুকি নাই। বাইরে থাইকা এডিসি সাহেবের ওই হালকা হলদেটে বাড়িটা দেইখাই আমি মুগ্ধ। বাড়ির সামনে গাছপালা আছে, কিন্তু কোনো সাজানো বাগান নাই। সম্ভবত এই ব্যাপারটাই বাড়িটারে ইউনিক কইরা তুলছে।

ইদানীং বাড়িগুলাতে খালি থাই এলুমিনিয়ামের জানলা লাগায়, কাঠের জানলা উইঠ্যা গেছে। এমনকি জয়নুল আবেদিন আর্ট গ্যালারির জানলাগুলাতেও থাই লাগাইছে। দেইখ্যা আমি দুঃখে একেবারে চোদনা হইয়া গেলাম। আমাদের বাঘমারার পাঁচতলা বাসাটা থাইকা একটা শিব মন্দিরের চূড়া দেখা যাইত, রেলির মোড়ের ওই মন্দিরটা থানাঘাটেরটার মতন অত প্রাচীন না আর বিগ্রহটাও এক সুদর্শন দেবতার, কৃত্তিবাস, নীলকণ্ঠ মহাদেব, শুধু তার লিঙ্গ না। ওই মন্দিরের চূড়াটাতেও বাথরুমের টাইলস মাইরা বিচ্ছিরি বানায়া ফেলছে।

ইদানীং বানানো হইতেছে এমন সকল মন্দির মসজিদের চূড়াতেই এই সকল টাইলস দেওয়া হয়, কী যে কুৎসিত লাগে দেখতে! বাঘমারায় একটা মসজিদ আছে, শাহী মসজিদ। আমরা প্রিক্যাডেট ইশকুলে যাইতে সময় দেখতাম পিচ্চি পোলাপান কায়দা সিপারা পড়তেছে মসজিদের টানা বারান্দায় বইসা। ওই মসজিদের বারান্দার ড্রপ ওয়ালগুলাতে কী সুন্দর রঙিন ফুল লতাপাতার নকশা ছিল, এখন আর সেইগুলা নাই। পুরা মসজিদে শুধু টাইলস আর থাই এলুমিনিয়াম। ভিতরে এসি। আমি যখন প্রথম বড় বয়সে ঢাকা গেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া উপলক্ষ্যে, কারওয়ান বাজারের কয়েকটা বড় বাণিজ্যিক ভবনের গায়ে এসির মেশিনগুলি লাগানো দেইক্খা আমার মনে হইত দালানের গায়ে ফোঁড়া হইয়া আছে। কেন এমন মনে হইত তা জানি না। সম্ভবত পাশাপাশি দুইটা গোল ফ্যানের মতন জিনিস থাকে দেইখা। এসি বিষয়টাই আমার কাছে কেমন জানি দমবন্ধ লাগে আর এসির মেশিন দেখতে লাগে বদখত। হইতে পারে আমার অনুচ্চাভিলাষী অস্তিত্ব এই জন্যে দায়ী।

আমার কোনোদিন বড় শহরে গিয়া বিরাট বিল্ডিংয়ে থাকতে ইচ্ছা করে নাই। আমার পিতামহ ‘গোলাম নবী’ সার্কাসে কাজ করতেন আর আব্বার মাতামহ ছিলেন বাবুর্চি, এই জিনিসটা আমি জানি এবং টের পাই যে এইটা বড় গলায় জানাবার মতন তথ্য না, তবু জানাই। কারো বাপদাদার পেশা ও সামাজিক অবস্থান নিয়া ফুটানি করতে দেখলে আরও বেশি কইরা জানাই। নিম্নমধ্যবিত্তের উচ্চবিত্ত হবার আকাঙ্ক্ষা আমার মনে সুপ্ত অবস্থায় নাই তা না, কিন্তু আমার ইচ্ছা করে গোলাম নবীর মতন সার্কাসের দলের লগে দেশে-বিদেশে ঘুরতে। বাইদ্যাগর পলিথিন লাগানো তাম্বু দেখলেই মনে হয়, অগর জীবন কত সুন্দর, একই জায়গায় সারা জীবন থাকার একঘেয়েমি অদেরে আক্রান্ত করে না।

আমার আব্বার বাড়িটা, এই পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনুযায়ী, আমার বাড়ি না, মাইয়া মাইনষের বাপের বাড়ি থাকে কিংবা শ্বশুরবাড়ি, নিজের বাড়ি থাকে না। আমার হয়ত নিজের বাড়ি বানাবার যোগ্যতা হইলেও হইতে পারে, কিন্তু বাড়ি বানাইতে আমার খুব বেশি ইচ্ছা করে না। হুমরা বাইদ্যা নয়া বাড়ি লইয়া বাইগুন গাছ লাগাইছিল, আমি যতবার কোনো না কোনো ফ্ল্যাটে নিজের সংসার পাতছি, প্রতিবারই টবে নাইন ও ক্লক আর অপরাজিতা লাগাইছিলাম, কিন্তু সারাক্ষণই মনে হইছে এইখানে ত আমি সারাজীবন থাকমু না। কেউ যখন নিজের বাড়ি বানায়, সে হয়ত সারাজীবন থাকার চিন্তায়ই বানায়, কিংবা অন্তত শেষ বয়সে থাকার পরিকল্পনা করে। যে ভাড়া বাসায় থাকে সেও সেইখানে অন্তত বছর খানেক থাকার চিন্তা ত করেই।

রফিক স্যার একবার বলছিলেন,“পিপল কাম ব্যাক হোম টু ডাই।” দুই বিঘা জমির উপেনও বলছিলেন, “মরিবার মত ঠাঁই।” আমার চাকরিটা এইরকম যে এর কোনো বদলি নাই, ময়মনসিংয়ে আমার রুজির ব্যবস্থা আছে আরো অন্তত ৩৫ বছর, এই চিন্তা কইরা সহকর্মীদের সঙ্গে শেয়ারে জমি কিনার জন্য লোন নিতে চাইছিলাম, পরে নানা কারণে সেইটা হইয়া উঠে নাই। আমি তাতে বেশ খুশিই হইছি। আমার মনে হইছে বাড়ি থাকলেই শিকড় জালায় যাইত, আম্মার বাসায় থাকি বা ভাড়া বাসায়, শিকড় ত নাই। টবের গাছের মতন অন্য কোথাও নিয়া রাইখা দেওয়া যাইব পুরা জীবনটারে, সংসার, জিনিসপত্র, মানে কিছু বই, কয়েকটা বাসনকোসন আর শাড়িকাপড়রে।

আমার মাঝে-মধ্যে মনে হয় গোলাম নবীর আগে উনার বংশে কেউ বাইদ্যা ছিল, যার ঘরে মন টিঁকত না। কিংবা পূর্বপুরুষদের মাঝে কেউ বাইদ্যানি বিয়া করছিলেন। আমি জন্মের পর থাইকা এত বছর এই একটা শহরেই জীবন কাটায়া দিলাম, কিন্তু আমার এখনও খালি মনে হয় যে কোনো দিন সব গুটায়া কোন দিকে ভাইগ্যা যামু। বাইঙ্গন বেইচ্যা গলার হার বানানের দরকার আমার নাইকা। আর মরবার লাইগ্গাই বা ঠাঁইয়ের দরকার কী? মইরা গেলে ত মইরাই গেলাম।

(কিস্তি ৩)

More from উম্মে ফারহানা

লৌহিত্যের ধারে (৬)

খালি ছেইড়াইন আর বেইট্টাইন লইয়াই যত আলাপ।
Read More