লৌহিত্যের ধারে (৩)

অবশ্য লোহিত মানে লাল, লৌহিত্য কি লোহিত থাইকা আসছে কিনা কে জানে!

(শুরুর কিস্তি)

৩.

কোথায় পাবো কলসি কইন্যা কোথায় পাবো দড়ি?
তুমি হও গহীন গাং আমি ডুইব্যা মরি

ছোটকালে আমরা ইশকুলে অনেক রচনা লিখতে শিখছিলাম, তার মধ্যে ‘আমাদের শহর’ ছিল বইলা মনে পড়ে না। ইস্কুলের পড়ালেখাও এই রকমই যে ‘রচনা’ বইলা যে কোনো লেখ্য বস্তু নাই সেইটা আমরা জানতাম না, ‘রচনা’ শব্দের অর্থ ‘নির্মাণ’ বা ‘তৈরি’, বিষয়টা আসলে ‘প্রবন্ধ রচনা’—এটা বুঝতে আমাদের হাই ইশকুলে উঠতে হইছিলো। আমাদের শহর না থাকলেও ‘আমাদের স্কুল’ রচনা পড়তে হইতো, ইংরেজিতে ‘Our School’। সম্ভবত এই শিরোনামের প্রবন্ধ লিখতে গিয়াই শিখতে হইছিলো যে Mymensingh is situated beside the river Brahmaputra।

কালিবাড়ি প্রিক্যাডট ইশকুলটাও আছিলো নদীর পাড়ে। ব্রহ্মপুত্র নদী না, নদ, তবু কেউ নদের পাড় কয় না, নদীর পাড়ই কয়। আমার মেয়ে প্রকৃতি আনন্দময়ী তিন বছর বয়সে কইতো “নদীর পার্কে যাই”, কারণ সাহেব পার্ক নদীর পাড়ে বইলা অনেকে ওই জায়গাটারে শুধু ‘পার্ক’ বলে, প্রকৃতি দুইটা মিলায়া নিছিলো।

প্রকৃতি ও প্রভু; জয়নুল আবেদিন আর্ট গ্যালারির গেইটে। ছবি. কাজী রুবায়েত ইসলাম
প্রকৃতি ও প্রভু; জয়নুল আবেদিন আর্ট গ্যালারির গেইটে।—লেখক। ছবি. কাজী রুবায়েত ইসলাম।

আমরা স্কুলে কলেজে পড়ি সময় সাহেব পার্ক ছিল পোলাপানের ডেটিং মারার জাগা। ‘ডেটিং মারা’ শুনতে আড্ডা মারার চেয়ে অনেক বেশি অশ্লীল শুনায়, কিন্তু পোলাপান এমনেই কইতো। কলেজে পড়ার সময় আমি, আমার বোন উম্মে রায়হানা মুমু আর তিন বন্ধু এলমিনা আকন্দ, রিফাত বিনতে সিদ্দিকী রুপু আর ইশরাত জাহান তানিয়া মিল্লা কলেজ থাইকা পালায়া নদীর পাড় পার্কে বেড়াইতে গেছিলাম। মেঘলা দিনে চোখে সানগ্লাস লাগায়া এক জুটি হাঁইটা যাইতেছিলো। আমি তখন অদেরে পচানোর জন্য জোরে জোরে কইলাম, “উফ, আজকে কী রোদ!” তা শুইন্না বন্ধুদের মধ্যে কেউ একজন মন্তব্য করলো, “আরে না, মনে হয় চোখ উঠছে।”

আমাদের মধ্যে এলমিনা একটু ভালো মানুষ পদের ছিলো, এই কমেন্ট করাকরির ব্যাপারটা ওর পছন্দ হইতেছিলো না। ও বললো, “এইসব করিস না, ওরা তো ভাইবোনও হইতে পারে।” তখন রুপু চেইতা গিয়া বললো, “আজাইরা আলাপের আর জাগা পাস না, দুপুরবেলা ভাইবোনে নদীর পাড় বেড়াইতে আসবে?” একটা ছেলে আর একটা মেয়ে রিকশা দিয়া শহরের রাস্তা দিয়া গেলে তাদের মধ্যে যে কোনো সম্বন্ধ হইতে পারে, কিন্তু নদীর পাড়ে ঘুরলে শুধু প্রেম ছাড়া আর কিছু হইতে পারে না বইলাই ধইরা নেওয়া হইতো।

"আমার মেয়ে প্রকৃতি 'নদীর পার্কে' বেড়াইতে গেছে।"—লেখক
আমার মেয়ে প্রকৃতি ‘নদীর পার্কে’ বেড়াইতে গেছে।—লেখক

ইংরেজিতে নদ আর নদী আলাদা নাই, বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় নদীর জেন্ডার থাকে কি না তা আমার জানা নাই, সংস্কৃতে থাকতে পারে। ব্রহ্মপুত্র ছাড়া আর দুইটা নদের নাম আমি জানি যেগুলা বাংলাদেশে, একটা হইল ‘কপোতাক্ষ’ আরেকটা ‘আড়িয়াল খাঁ’। ‘কপোতাক্ষ নদ’ নামে মাইকেল মধুসূদন দত্তের একটা কবিতা আমাদের এসএসসিতে পাঠ্য ছিলো। তখন কবিতার প্রথম দশ লাইন মুখস্ত লিখতে হইতো না, তবু আমি কবিতাটা মুখস্ত করছিলাম, নিতান্তই শখের বশে। আমার এখনও মনে আছে পুরাটাই। ওইটা চতুর্দশপদী কবিতা বা সনেট। মজার জিনিস এই যে, পুরুষ নামের এই নদের ধারারে কবি মাতৃস্তন্যের সঙ্গে তুলনা করছিলেন, বলছিলেন, “দুগ্ধ স্রোতরূপী তুমি জন্মভূমি স্তনে।”

মিশরের নীলনদের নাম শুইনা বুঝা যাইতেছে যে এইটা নদ, মিসিসিপি মিসোউরি বা ইয়াংসিকিইয়াং বা হোয়াংহো নদ না নদী তা জানি না। ‘গাঙ’ শুনলে বুঝা যায় না যে এইটা নদ না নদী তাই ব্রহ্মপুত্ররে ‘গাঙ’ ডাকতে কুনোই সমস্যা নাই। তাতে জেন্ডার রক্ষা হয়। নদ-নদীর জেন্ডার কি তাদের আকার আকৃতির উপরে নির্ভর কইরা হয়? ছোট নাটক যেমন নাটিকা, নদী বেশি বড় হইয়া গেলে সেইটা নদ, এই রকম কি ব্যাপারটা? গাঙচিল বইলা যে পাখি আছে তার ইংরেজি হইল ‘সিগাল’। তাইলে কি সাগররেও গাঙ বলা যায়? নাকি বাংলাদেশের নদ-নদীতেও এই পাখি পাওয়া যায় দেইখা এর নাম গাঙচিল হইছে? আমি ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে গিয়া গাঙচিল দেখি নাই, আমার ধারণা ছিলো গাঙচিল হইল সামুদ্রিক পক্ষী। চাঁদপুরের মতলব থানায় তন্ময়ের এক বন্ধুর বিয়াতে যাবার সময় লঞ্চের ডেকে দাঁড়াইয়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গাঙচিল দেখছিলাম।

বিসিএসের প্রিলি পরীক্ষা প্রথমবার দিছিলাম সময় একটা প্রশ্ন আসছিল, বাংলাদেশের নদীকেন্দ্র কোথায়, সম্ভবত সেইটার উত্তর চাঁদপুর, আমি খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ‘ফরিদপুর’ দাগায়া আসছিলাম (নাকি উলটাটা? উত্তর ফরিদপুর, আমি চাঁদপুর দাগাইছি? মনে নাই। আগেই কইছি তথ্য মুখস্থ করা আমার আসে না)। আমি সারাজীবন যত ভুল করছি সবগুলাই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে করছি, কনফিউশন নিয়া করি নাই।

বাংলাদেশ বিষয়ে যে আমি তেমন কিছুই জানি না, বিসিএস দিতে গিয়াই সেইটা প্রথম টের পাই। আমার বিসিএসের সিট (প্রথমবারেরটা) পড়ছিল পোগোজ স্কুলে। স্কুলটা পুরান ঢাকায়, আমি চিনতাম না, বাস থাইকা নাইমা যারেই জিগাইছি, সকলেই জগন্নাথ কলেজ দেখায়া দিছে। জগন্নাথ তখনও ভার্সিটি হয় নাই মনে হয়, বা হইলেও সাধারণ লোকে জানে না, ২৯ বিসিএসের কথা বলতেছি, ২০০৯ সালে। আমার তখনও অনার্সের রেজাল্ট হইছিলো না, এপেয়ার্ড দিয়া ফরম ফিলাপ করছিলাম। পুরান ঢাকা জায়গাটা আমি ভাল চিনতাম না, এর আগে পুরান ঢাকায় মাত্র দুইতিনবার গেছি, একবার বংশাল, আর দুইবার আহসান মঞ্জিল। কয়েকবার নীরব রেস্টুরেন্টে খাইতে।

আহসান মঞ্জিল যে বুড়িগঙ্গার ধারে তা জানতাম, জাহাঙ্গীরনগরে ফার্স্ট ইয়ারে থাকতে গেছিলাম, তখন রেনোভেশন চলতেছিল দেইখা ভিতরে ঢুকতে পারি নাই। আঙ্গিনা থাইকা নদী দেইখা চইলা আসতে হইছে। বুড়িগঙ্গা নদীটাও ভালই লাগছিলো, কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের মতন না।

আমাদের এইখানের পুরান ব্রহ্মপুত্র অসাধারণ ছিলো। ছোটবেলা প্রথম ব্রহ্মপুত্র দেখছি ছোট মামার সাথে বেড়াইতে গিয়া। কই থাইকা নৌকায় উঠছিলাম তা এখন আর মনে নাই, নামছিলাম জয়নুল আবেদীন আর্ট গ্যালারির সামনে। তখন তো আর পাড়টা বান্ধানি আছিলো না। মাটির ঢাল বায়া উঠতে হইছিলো। উইঠা জয়নুল আবেদিন আর্ট গ্যালারির সামনের বাগানে ছবি টবি তুইল্যা চইলা আসছিলাম আমরা, গ্যালারি বন্ধ ছিলো।

berano-3

berano-1
“ছোটমামার সঙ্গে বেড়াইতে গেছিলাম, আমরা তিন ভাইবোন, বড় খালার ছোট দুই মেয়ে আর মেজোখালার বড় মেয়ে। জয়নুল আর্ট গ্যালারি বন্ধ ছিল।”—লেখক

অনেকক্ষণ বেড়াবার পর একটা চায়ের দোকানে বইসা আমি জিগাইছিলাম, “আমরা কি আরও কোথাও যাব?” ছোট মামা ক্রুর হাসি হাইসা বলছিলো, “ভণ্ডামি করো?” শুইনা অন্য সকলে হাসছিলো। আমি খুব অপমানিত বোধ করছিলাম, ভণ্ডামির কথা ক্যান উঠল বুঝিও নাই। ছোটকালে আমি বোকা হিসেবে সুপরিচিত ছিলাম। আমার বোকামির জন্যে আমার একটা ‘পেট নেইম’ও ছিল। সেই সব খুবই গ্লানি আর লজ্জার স্মৃতি, ভাবতে ভালো লাগে না, মন অযথা বিষণ্ন হইয়া যায়।

পরে ছোটমামার বিয়া উপলক্ষ্যেই নদীর ওই পাড়ে যাই, ফেরি দিয়া, ব্রিজ তখনও হয় নাই, ফেরি জিনিসটা খুব চমৎকার ছিলো। বড় বড় ট্রাক বাস শুদ্ধা কি সুন্দর রাজকীয় ভঙ্গিতে চলাচল করতো। আম্মা আমাদেরে বলছিলো ফেরিতে গাড়ি ওঠার পর গাড়ি থাইক্কা নাইম্মা যাইতে হয়, ফেরির উপরে গাড়িতে বইসা থাকা নাকি রিস্কি। আমরা নাইম্মাই যাইতাম। ছোট মামার বৌয়ের গায়ে হলুদে যাবার সময় আমরা প্রথম ফেরিতে উঠি, পরে বিয়ার দিন আগে থাইক্কা ঠিক কইরা যাই যে ফেরিতে ওঠার পর আমরা নদীর পানিতে আমড়ার আঁটি ফেলবো। আমরা তখন এতই ছোট যে নদীতে ময়লা ফেলা বিষয়ক কোনো অপরাধবোধ আমাদের মনে জন্ম হয় নাই।

অনেক পরে, ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেওনের আগে আগে ঢাকায় পরিচয় হওয়া পাবনার এক ছেলে আমার লগে দেখা করতে আইছিলো, লম্বা চুলঅলা এক বন্ধুরে নিয়া, ওদের সাথে নদীতে বেড়াইতে গেলে ওই ছেলে বলতেছিলো, “আমি ময়মনসিংহে থাকলে প্রতিদিন এইখানে আসতাম।” এই কথার উত্তরে আমি বলছিলাম, “এই কথাটার জন্যে তোমারে মাফ কইরা দিলাম।” ও অবাক হইয়া কইল, “কীসের জন্যে মাফ? আমি কী করছি?” আমি কইলাম, “এই যে একটু আগে পানিতে চুইংগাম ফেললা।” সেই ছেলে বেশ অবাক হইল, পানিতে চুইংগাম ফেলা যে কোনো অপরাধ হইতে পারে তা ও ভাবে নাই।

বাংলাদেশীদের সিভিক সেন্স বইলা কিছু নাই। এই বিষয়ে আমার রুমমেট শর্মি আপুর অবজারভেশন খুব মজার। কেউ কাউরে ‘আনকালচার্ড’ কইয়া গালি দিলে সে কইতো, “কালচার অনেক পরের বিষয়, আগে হইল সভ্যতা বা সিভিলাইজেশন, এরা ‘আনকালচার্ড’ না, এরা হইল ‘আনসিভিল’।” নদীর পানিতে ময়লা ফেলা নিশ্চয়ই আনসিভিল আচরণের মধ্যে পড়ে। মানুষের সভ্যতা জিনিসটা খুব উন্নত মানের বস্তু কিনা তা নিয়া অবশ্য তর্ক চলতেই পারে। কিন্তু মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তাই নিজের স্বার্থেই এরে পরিষ্কার রাখাটা জরুরী।

ফেরি দিয়া যখন ওই পাড়ে যাইতে হইত নদীর এই পাড় থাইকা অপর পাড় তখন দেখা যাইত না, ব্রহ্মপুত্রের এত শীর্ণ দশা তহনো হয় নাই। অবশ্য নদীর সকল পাড়ই অপর পাড়। কেমনে জানেন না? যখন আপনে এই পাড়ে আছেন তখন অন্য পাড়টা ‘অপর পাড়’, যখন নদী পার হইয়া ওই পাড়ে গেলেন তখন এই পাড়টা, মানে আগে আপনে যে পাড়ে ছিলেন, এখন যেইটাতে নাই, সেইটা আপনের কাছে ‘অপর পাড়’, কিন্তু আপনি এখন যেই পাড়ে আছেন সেইটাও, আগেই স্বীকার কইরা নিছেন আপনে, ‘অপর পাড়’। কাজেই নদীর সকল পাড়ই ‘অপর পাড়’।

এই হিসাবটা দিছিল ‘রবিনহুড’ গল্পের ডাকাইত পাদ্রি ‘ফ্রায়ার টাক’। ছোটকালে আমার পড়া সবচে উপভোগ্য বইগুলার একটা হইল কাজী আনোয়ার হোসেনের অনুবাদ করা ‘রবিনহুড’। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থাইকা এই বই পড়তে দিত, আমি অবশ্য আমার খালাতো বোন রিনি আপার কাছ থাইকা ধার নিয়া পড়ছিলাম। ওর কপিটা সম্ভবত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থাইকাই মারা।

শম্ভুগঞ্জ ব্রীজ
শুকায়া যাওনের পরে কালিবাড়ি প্রি ক্যাডেট ইশকুলের সামনের দিক থাইকা ব্রহ্মপুত্রের একাংশ , দূরে যে ব্রীজ দেখা যাইতেছে সেইটা শম্ভুগঞ্জ ব্রীজ, মানে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সেতু-২।—লেখক। ছবি. কাজী রুবায়েত ইসলাম।

বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সেতু, মানে শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ হবার আগে অপর পাড়ে, মানে যে পাড়ে ময়মনসিং শহর নাই, শম্ভুগঞ্জ আছে আর আমার ছোটমামার শ্বশুরবাড়ি ঈশ্বরগঞ্জ আছে সেইটাতে যাবার জন্যে ফেরি লাগত, নৌকায়ও নিশ্চয়ই পারাপার করা যাইত কিন্তু আমি কোনো দিন করি নাই। তখন নদী আরও অনেক চওড়া ছিল, ব্রিজ বলতে ছিল রেইল ব্রিজ, যেইটা এখনও আছে, ডেইট নাকি এক্সপায়ার্ড হইয়া গেছে। কোন এক ফিল্মের শুটিং নাকি হইছিল ওই ব্রিজে, ববিতা আসছিলেন, তারে দেখতে নাকি ময়মনসিংহের মানুষ ভিড় জমাইছিল কেওয়াটখালিতে। তখন আমাদের জন্ম হয় নাই, ছোটকাল থাইক্কা শুধু ববিতা আসার গল্পই শুনছি। আমাদের কাছে সৌন্দর্যের মাপকাঠিই ছিল ববিতা। আমার ছোটখালার বড় মেয়ে রিমি আপা খুব ছোটবেলা একবার কোথাও বেড়াইতে যাবার সময় সাইজাগুইজা আসলে আমার খালা বললেন, “আরে, আমার মেয়েরে ত খুব সুন্দর লাগতেছে।” রিমি আপা বলল, “এক্কেরে ববিতা?”

ববিতার অভিনীত দুইটা ছবির দুইটা গান বিরাট হিট ছিলো, একটা হইলো, ‘চুরি করেছো আমার মনটা’ আরেকটা ‘দুশমনি করো না প্রিয়তম’। দুইটার ভিজুয়ালই আমার মনে আছে।আমরা এই গান দুইটা দেখছিলাম বিটিভির ‘ছায়াছন্দ’ অনুষ্ঠানে, তখন বিটিভিতে না দেখাইলে কোনো ছবি দেখা যাইত না, হলে গিয়া ছবি দেখার সময় বড়রা চেষ্টা করতেন ছোটদেরে বিভিন্ন টালবাহানা কইরা বাদ দিতে।

brahmmaputra-12
“ব্রহ্মপুত্রের চরে আমার নাইকন এফ এম টেনে তোলা বহু আগের ছবি।”—লেখক

একটু বড় হইয়া যখন ছোটখালার সঙ্গে নদীর পাড় বেড়াইতে গেছি খালাতো বোনেরা মিল্লা, দেখছি অন্য পাড়, তখন জানতাম না যে ওইটা আসলে অন্য পাড় না, ওইটা চর, শরৎ কালে ভাসে, কাশফুল হয়, শীতে শুকনা থাকে, আবার বর্ষায় ডুইব্বা যায়।কোনো এক সময় জিলা ইশকুলে পড়া এক বাচ্চা ছেলের লাশ পাওয়া গেছিল ওই চরে, ক্লাসমেটরা মিল্লা তারে পিটাইয়া মাইরা ফালাইছিল। ওই ক্লাসমেটদের দুই একজনের বাপ ছিলেন বড় ডাক্তার, ছেলের পোস্টমর্টেম রিপোর্টে মারামারির কথা লেখা হয় নাই, অন্য কিছু, সম্ভবত ডুইবা মরছে কওয়া হইছিল। ডাক্তারের পোলাই প্রথম জানাইছিল যে তাদের বন্ধু মারা গেছে কিংবা মইরা চরে পইড়া আছে। মনে হয় মাইর দিয়া ফালায়া আসছিলো, ভাবে নাই মইরা যাবে, পরে বিবেক দংশনের চোটে বাপ মারে কইয়া দিছে, এরা ত আর প্রফেশনাল ক্রিমিনাল না যে খুন কইরা হজম করবে।

ওই কাশফুল ফোটা চর এখন রীতিমত মানুষের ঘর বানায়া থাকার উপযোগী শক্ত জমি। আমার নানি সারা খাতুনের বাড়ি জামালপুর জেলার নান্দিনা উপজেলার গারামারা গেরামে। আমার মা কইতেন তার মামুরা নাকি চউর‍্যা, মানে চরের মানুষ। টিভির নাটকে দেখছি নদীর পাড় ভাইঙ্গা নাকি আরেক দিকে চর গজায়, ওই চরের দখল নিয়া বহুত মারামারি কাটাকাটি হয়। তাই চউর‍্যা মানুষ মানে হইল মারদাঙ্গা ধরনের লোকজন। বর্শা লইয়া ঘুরা টাইপ। আমার মায়ের মামুদেরে অবশ্য মারদাঙ্গা মনে হইত না আমার। যার নাম আকরাম উনি তো খুবই চমৎকার ছিলেন। কিন্তু আম্মার এক মামা ছিলেন পেডোফিলিক। আমরা যখন ৫/৬ বছরের, তখন থাইক্কাই আমাদেরে সেক্সুয়ালি অ্যাবিউজ করতেন। আমরা তারে দেখলেই পলাইতাম।

এইখানে অতীতকালের ব্যবহার সমীচিন হইতেছে না, কারণআম্মার মামুরা অনেকেই এখনও জীবিত। সেই চউর‍্যা মামুরা এবং তাদের বোন আমার নানি সারা খাতুন ময়মনসিঙ্গের শহরের লোকের ভাষাটা বলতেন না। শহরে ‘আসবো’ কে বলা হয় ‘আইবাম’ উনারা বলতেন ‘আমু’, ‘যাবো’কে শহরের লোকেরা কইতেন ‘যাইবাম’, উনারা কইতেন যামু। আমি মাষকলাইয়ের ডাইল খাইতে ভালোবাসি দেইক্খা আম্মার বাসায় কাজ করতো একটা মেয়ে, মুক্তা, আমারে ডাকতো ‘চউর‍্যা আফা’। চরের লোক নাকি এই ডাইল বেশি খায়। বর্ষা শেষ হইয়া যাওনের পরে পলিমাটিওয়ালা জমিতে এইসব রবিশস্য খুব ভাল হয় দেইকখা নদীর ধারের লোকেরা এইসব জিনিস খাইতে ভালোবাসে। এই ‘ভালোবাসা’টাও আমি নানির কাছ থাইক্কা পাইছি। উনি এমনেই কথা কইতেন, কোনো কিছু খাইতে পছন্দ না হইলে ‘পছন্দ করি না’ বলতেন না, বলতেন, “আমি এইটা ভালবাসি না।”

আম্মাদের নানির বাড়ি জামালপুরে আমি কোনো দিন যাই নাই। কিন্তু আম্মার খালার বাড়ি বৈলর গেছি ছোটকালে। অইখানে নদীতে গিয়া আম্মার খালাত ভাইদের সঙ্গে মাছও ধরছি। পরে ত্রিশাল চাকরি নেওনের পরে দেখলাম ওই অঞ্চলে যে নদী আছে সেইটার নাম সুতিয়া নদী। সুতিয়া নদীর উপরের ব্রিজটা ভাঙ্গা ছিলো দেইক্খা একটা সাঁকো দিয়া নদী পাড় হইয়া ভার্সিটিতে যাওন লাগতো, তখনও ভার্সিটির নিজস্ব রাস্তা তৈরি হয় নাই। ওই সাঁকোটা দেইক্খাই অমিতাভ ঘোষের ‘গ্লাস প্যালেস’-এর কাভারটা মনে পড়ছিল আমার। আমার কাছে গ্লাস প্যালেসের যে কপিটা আছে সেইটার প্রচ্ছদে এমন সাঁকোর ছবি।

এই ছোট ছোট শাখানদী কিংবা উপনদীগুলা সব নিশ্চয়ই ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গেই সম্পৃক্ত, কাউরে না জিগায়াই আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইছিলাম। যমুনা নদীও, আমি যতদূর জানি, ব্রহ্মপুত্রের লগে কোনো ভাবে যুক্ত। নাকি মেঘনা নদী ব্রহ্মপুত্র থাইকা হইছে? আমার ঠিক মনে নাই। ছোটবেলা আমাদের দেশের নদ নদী নিয়া প্রবন্ধ লেখতে সময় এই সকল তথ্য পড়ছিলাম।

যমুনা খুবই বিখ্যাত নদী হইলেও আমি আগে কোনো দিন দেখি নাই। ভার্সিটিতে মাস্টারির চাকরি নেওনের পরে পুলাপানের লগে পিকনিকে গিয়া দেখছি। যমুনারে মিস্টিক রিভার লেখে অনেকখানে দেখছি, রাধাকৃষ্ণের কারণে কি এই খ্যাতি বা মিস্টিসিজম? যমুনার অপর নাম জাহ্নবী, আর একটা নাম আছে কালিন্দী। আমার বেয়াই ইন্দ্রনীল চট্টোপাধ্যায়ের লেখা একটা গান আছে, গাইছেন তানভির আলম সজীব, গানের কথাগুলা এইরকম—

“জল নিতে সই যাব না আর ঘাটেতে
শ্যাম হাসিতে হাসিতে আসে জীবন নিতে
কাল কালিন্দীর জলে পড়ে কালার ছায়া
ভরা কলসির ঢেউয়ে ভাঙে নিঠুর মায়া
আমি জোয়ারে যাব না যাব ভেসে ভাটিতে
জল নিতে সই যাব না আর ওই ঘাটেতে”

ইন্দ্রনীল চট্টোপাধ্যায়, মানে দাদাভাইকে আমি একদিন জিগাইছিলাম উনার লেখায় এত পানির ছড়াছড়ি কেন। উনি কইছিলেন, “এটার উত্তর খুব সিম্পল, আমি পানির দেশের লোক।” উনাদের বাড়ি সাতক্ষীরা। উপকূলীয় অঞ্চল। উনার আর কয়েকটা কবিতা আর গানের কথা এইরকম:

“বৃষ্টি ধরতে গেলাম আমি দিগন্ত অবধি
দেখি চুপচাপ শুয়ে আছে আকাশভরা নদী”

কিছু গান আর কবিতা লইয়া একটা অ্যালবাম বের হইছিল, এই কবিতার পরে যে গানটা ছিল সেইটাতেও নদী বিষয়ক মেটাফোর আছে:

“তোর বুকের গন্ধে আটকে খেলে যায় কালো রেখা
এসব কিছু দূর থেকে দেখে কাদাজলে ভালোবাসা রেখে মুখ থুবড়ে থাকা”

এইটা স্থায়ী অংশ। পরের স্ট্যানজা বা অন্তরাগুলাতেও ‘চর পড়ে পলিমাটি’, ‘অবাধ নৌকা বাওয়া’-এর মতন মেটাফোর আছে। উনার লেখায় ‘নিঠুর মায়া’ বা ‘প্রেমের কাম’-এর মতন কনসিটের ব্যবহার আমারে খুব মুগ্ধ করে। ‘বৃষ্টিতে ওই ফাগুন পুড়ে আগুন হয়ে নাচে’ অসংখ্যবার শুনার পরে আমি খেয়াল করছি যে পুড়ানের জন্যে এইখানে আগুন নাই, আছে বৃষ্টি। দাদাভাই-ই আমার দেখা প্রথম কবি বলতে গেলে। আব্বার বন্ধু রেজাউল করিম কাকাও কবিতা লিখতেন কিন্তু তার বড় পরিচয় তিনি শিল্পী। দাদাভাইও শিল্পী, কিন্তু তার আঁকা একটা মাত্র ছবি আমি দেখছি, তাই তার শিল্পী পরিচয়টা আমার মনেই থাকে না। দাদাভাই নিজেরে কবি বইলা স্বীকারও করেন না, কবিতাগুলারেও বলেন “লেখা”, “মৌ আমার একটা লেখা পড়বা?”—এই ভাবে বলেন। তবু আমার দেখা প্রথম কবি উনিই।

সাদী তাঈফ আর মোহাম্মদ রফিকের সঙ্গে আমার পরে আলাপ হইছে। রফিক স্যারও বাগেরহাটের মানুষ বইলা তার কবিতায়ও অনেক পানি জল কাদা চর পাওয়া যায়। যদিও তার ‘গাওদিয়া’ সম্ভবত খুলনার কোনো গেরাম না, কিশোরগঞ্জের গেরাম হইতে পারে। আমি স্যারকে জিজ্ঞেস করছিলাম, “আপনি কোনো দিন ‘গাওদিয়া’ গেছেন?” স্যার বললেন, “যাই নি, কিন্তু যেতে হবেই বা কেন?” আমি কেন তারে ওই কথা জিজ্ঞেস করছিলাম তা অবশ্য এখন আর মনে নাই। বিভূতিভূষণও ‘চাঁদের পাহাড়’ লিখছেন আফ্রিকা না গিয়া, তাতে কী হইছে?

আমি কবিতা অত পড়ি না। হুমায়রা, আমার জাহাঙ্গীরনগরের বন্ধু, একবার স্যারকে বলতেছিল, “মৌ অনেক পড়ে, ওদের বাসায় গল্প উপন্যাস পড়ার চল ছিল, আমার বাসায় ছিল না, আমি ছোটবেলা অত বই পড়ি নাই।” শুইনা স্যার বললেন, “মৌ উপন্যাস পড়ে, কবিতা পড়ে না।” হুমায়রা বলল, “পড়ে তো, আমাকে যে কবিতা এসএমএস করে?” স্যার বললেন, “ও তো শুধু সুনীলদা’র কবিতা পড়ে।” এটা বলবার কারণ হইল স্যারের কবিতা আমি তেমন পড়ি নাই। কবিরা বেশ হিংসুইট্টা হয় সেইটা আমি স্যারেরে দেইখা বুঝছি। কিংবা এইটা হয়ত সুনীলের ওভাররেটেড হইয়া যাওয়া নিয়া বিরক্তিও হইতে পারে। দাদাভাইও সুনীলের বিষয়ে একবার বলছিলেন, “সুনীল গাঙ্গুলির কবিতা আবার কবিতা হয় নাকি? ওর চেয়ে ভাল আমি লিখতে পারি।” কিন্তু তার জুলফিকার নামের এক বন্ধুর প্রসঙ্গে বলছিলেন, “আহা, আমি যদি ওর মতন লিখতে পারতাম।” উনি এই কথা মুগ্ধতা নিয়া কইছিলেন, হিংসা কইরা না।

১৮/এফ ব্রাহ্মপল্লী আমার বাপের বানানি বাড়ি।—লেখক
১৮/এফ ব্রাহ্মপল্লী আমার বাপের বানানি বাড়ি।—লেখক

তবে কবি সাদী তাঈফ হিংসুইট্টা ও ঝগড়াইট্টা। সে নিজেও শিল্পী এবং কবি দুইই, তবু তার কবি পরিচয়টা আগে আসে। সাদী তাঈফের সঙ্গে আমার সব সময় ঝগড়া লাগতো। আমি কবিতা তেমন বুঝি-টুঝি না, ঝগড়া লাগতো অন্যান্য অনেক বিষয়ে। সে আমার বইনরে বলছিলো, “মৌয়ের কথা শুনলে মনে হয় ইংরেজি সাহিত্যের কবি-সাহিত্যিকরা সকলেই ওর বন্ধুমানুষ।” এইটা সে মজা কইরা বলছে আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু ইংরেজি ভাষার নিয়মই তো এমন যে আপনি অন্তরঙ্গ সম্পর্ক না থাকলে তারে সারনেম বা নামের শেষ অংশ ধইরা ডাকবেন, ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকলে তবেই না প্রথম নামে ডাকবেন। ‘উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস’কে আমি যতই ভালোবাসি, ভালোবাসার চোটে তারে ত আমি ‘বিল’ কইয়া উল্লেখ পারি না। হুইটম্যানরেও ‘ওয়াল্ট’ কইতে পারি না। আর উইলিয়াম শেক্সপিয়রের পুরা নাম ধইরা ডাকবার চার্জ কি সবসময় থাকে নাকি? ওদের নামের অনেক সময় তিনটা অংশ থাকে, গিভেন নেইম, ক্রিশ্চান নেইম, ফ্যামিলি নেইম ইত্যাদি। সবসময় ফরমালি পুরা নাম ধইরা ডাকা যায় না।

আমাদের মমেনসিঙ্গে একটা জাগা আছে ‘সানকিপাড়া’, ওই জাগারে অন্য পাড়ার ছেলেরা অনেক সময় মজা কইরা ‘খানকিপাড়া’ বলে, এই কথা বলবার সময় আমি হাসছিলাম দেইখা সাদী তাঈফ আমারে অপমান করলো। কইলো, আমি কেন মেয়ে হইয়া এই ফাইজলামিতে হাসলাম, ছেলেরা করতেই পারে ঠাট্টা, আসলে বেশ্যাবৃত্তি কিংবা বেশ্যারা হাসি-তামাশার বিষয় না। তার কথা শুইনা মনে হইল যে পুরুষেরা বেশ্যাবৃত্তির ভোক্তা বইলা এই নিয়া ফাইজলামি তারা করবে আর মেয়েরা সারাক্ষণ বেশ্যাদেরে সহানুভূতি দেখায়া যাবে—এইটাই দস্তুর হইবার কথা। আমি অবশ্য সেইবার ঝগড়া করি নাই, লজ্জিত হইয়া ভাবতেছিলাম, আমারই ভুল হইছে।

আমি কবিতা না বুঝলেও সাদী তাঈফের কবিতা আমার ভালো লাগে। তার পাখিশাস্ত্রের এক কবিতায় ‘জাহানারা ইমাম’ এবং ‘প্রীতিলতা’ দুই সাহসী নারীর নামে করা হলে মেয়েদের খাঁচায় বদ্ধ হওয়া পাখির মতন জীবনযাপনের কী একটা বিষয় ছিলো, সেইটা ইনটারেস্টিং লাগছিলো, কারণ আমি তখন ‘জাহানারা ইমাম’ হলে থাকতাম। রাত দশটায় হলের গেইট বন্ধ হইয়া যাওয়ার পর ওইটা আসলে খাঁচাই।

রফিক স্যারের কবিতা দুই-একটা পইড়া আমার যা মনে হইছে তা হইল, সুনীলের কবিতায় যেমন ঘটনা থাকে, চরিত্র থাকে, স্যারের কবিতায় তেমন থাকে না, একটা পোয়েটিক রিয়্যালিটি তৈরি হয়, কিন্তু সেইটা অনুভূতিগত। কাহিনী কম। আবার এইটাও ঠিক না যে চরিত্রচিত্রণ না করলেই আমি সেই কবিতা পড়ব না, দাদাভাইয়ের কবিতাতেও কিন্তু চরিত্ররা মূর্ত হইয়া ওঠে না, তবু ভালো লাগে। আমার বন্ধু নৃপ অনুপ আর আমার বোনের বন্ধু মুয়ীয মাফফুজও কবি, তাদের কবিতার বইও আছে। কিন্তু অদেরে কেন জানি আমার কবিদের দলে ফেলাইতে ইচ্ছা করে না, অ্যাজ ইফ কবিরা বিশেষ কোনো প্রজাতি, সাধারণের চেয়ে আলাদা।

কবিদের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক খুব গভীর হয়, সবসময়। আল মাহমুদ তিতাস পাড়ের লোক হইলেও অন্যান্য নদীও তার কবিতায় থাকে। একটা ছোটদের কবিতার শেষ দুই লাইন ছিল:

“কোথায় পাবো লঙ্কাবাটা কোথায় আতপ চাল?
কর্ণফুলির ব্যাঙ ডাকছে হাঁড়িতে আজকাল”

আরেকটা কবিতায় ছিল—“মেঘনা নদী বুবুর শাড়ির নকশা হয়ে উঠছে”।

কিন্তু নদীর রোমান্টিসাইজড রূপ ছাড়া অন্য রূপও আছে, তা নিয়া কবিতাও আছে। নদীর ভয়ঙ্করী মূর্তি নিয়া একটা কবিতা আমার নানি সারা খাতুনের মুখে শুনছিলাম, কে লিখছেন তা জানি না। কবিতাটার কাহিনী হইল, এক নারী নদীর ধারে বইয়া কানতেছিলো। একজন লোক তারে জিগাইল কী হইছে, নারী কইলো যে তার ছেলে এই নদীতে ভাইসা গেছে। লোকটা তখন বলল, “তিন পুত্র চারি কন্যা গিয়েছে এ নীরে/ মোর কথা ভেবে মাগো বাড়ি যাও ফিরে।” আমার নানির শত শত কবিতা মুখস্থ ছিল। তিনি কথায় কথায় কবিতা কইতেন। তার মুখে শুইন্না শুইন্না আমরাও অনেক কবিতা শিক্খা গেছিলাম।

(নীর মানে যে পানি তাও আমরা তখন নানির কাছ থাইক্কা জানতে পারছিলাম। ইশকুলে যাবার পরে শিখছি নীড় হইল বাসা, খালি অন্তস্থ র আর ড এ শূন্য ড়-এর তফাৎ। পানি আর নদী প্রায়ই সমার্থক হইয়া যায়। ছোটকালে আমরা এক কথায় প্রকাশ পড়ছিলাম, পঞ্চ নদীর দেশ = পাঞ্জাব। আরবী ভাষায় আব হইলো পানি। পঞ্চ নদীর দেশের পাঁচখান নদীর নামও আমরা ছোটকালেই শিখছি—বিপাশা, শতদ্রু, বিতস্তা, ইরাবতী আর চন্দ্রভাগা। এর মধ্যে কেন জানি শেষের নামটাই আমার কাছে সবচেয়ে শ্রুতিকটু লাগে। ভাগা শুনলেই ভাইগ্যা যাওয়ার কথা মনে পড়ে)।

“শোন মা আমিনা রেখে দেরে কাজ” এই কবিতার শিরোনাম মনে নাই কিন্তু একটা মেয়ের ভাইসা যাওয়ার বিষয় ছিল সেইটা মনে আছে। কবির নাম যতদূর মনে পড়ে হুমায়ূন কবির। এই কবিতাটা যে ‘স্যান্ডস অফ ডি’ কবিতার দ্বারা অনুপ্রাণিত হইয়া লেখা সেইটা আমি আমার আম্মার কাছ থাইকা শুনছিলাম। কয়েকটা লাইন আম্মার মুখস্থও ছিল, “কল দ্য ক্যাটল হোম, অ্যাক্রস দ্য স্যান্ডস অফ ডী” টুকুই আমার মনে আছে। হাইস্কুলে উইঠা এই কবিতা সিলেবাসে পাইছিলাম, কিন্তু কেন জানি না কবিতাটা আমার ভাল লাগে নাই। মেরি নামের মেয়েটা নদীতে ডুইবা যায় দেইক্খাই বোধ হয়।

ব্রহ্মপুত্র নিয়া তসলিমা নাসরিনের কবিতা আছে। খুব সুন্দর সুন্দর। একটার প্রথম লাইন ছিল, “আমি কাঁদলে ব্রহ্মপুত্রও কাঁদে” আর শেষ লাইন সম্ভবত, “জল কই যে কাঁদবে?”—বা এই রকম একটা কিছু। উনার কবিতায় ব্রহ্মপুত্র নিজেই একটা চরিত্র। যদিও নদের পারসনিফিকেশন নাই। সরাসরি ব্রহ্মপুত্ররে নিয়া লেখাও না কবিতাগুলা। কিন্তু তার অনেক কবিতায়ই, শিশুকাল বিষয়ক হোক, কিংবা প্রেম বিষয়ক, প্রায় প্রায়ই ব্রহ্মপুত্র ঘুইরা ফিরা আসে। নদীর সরাসরি পারসনিফিকেশন অবশ্য আমি আমার শিশুকালের প্রিয় কবি আল মাহমুদের কবিতায়ই পাইছি প্রথম। “বলল কেঁদে তিতাস নদী হরিণ বেড়ের বাঁকে”—এই লাইন পইড়া আমি খুব অবাক হইছিলাম, আমার বয়স তখন সাত বা আট, একটা নদী কথা কইতেছে এই ব্যাপারটাই চমকপ্রদ লাগছিলো।

ছোটবেলা আব্বা আমাদেরে গান শিখানের জন্য খুব উইঠা-পইড়া লাগছিলেন। সংগীত বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ কইরা বাসায় গানের শিক্ষক রাইখা দিছিলেন। আমি ক্লাস থ্রিতে পড়বার সময় প্রিক্যাডেট স্কুলের একটা গানের প্রতিযোগিতায় হারমোনিয়াম বাজায়া গাইছিলাম ‘এই পদ্মা, এই মেঘনা’ গানটা। গানের একটা লাইন ছিল, “এখানে রমণীগুলো নদীর মত, নদীও নারীর মত কথা কয়।” তখন আমি লাইনটার মানে বুঝি নাই। নদী কথা কয় এইটা না হয় নদীর কল কল শব্দরে বুঝাইলো, রমণীগুলো নদীর মত হয় আবার কেমনে? নদীর পারসনিফিকেশন ও নারীর অবজেক্টিফিকেশন এক লগে হইতেছে এইখানে।

অনেক শিল্পীও ছবি আঁকেন আর নাম দেন ‘নদী ও নারী’। নারীরে ক্লীব বা মনুষ্যেতর বা প্রকৃতির অংশ হিসাবে ধইরা নেওয়ার এই প্রবণতাটার জন্যে হয়ত বাংলা ভাষায় নদীর জেন্ডার থাকাটাই দায়ী। পরে যখন আমি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিতেছি, ফাইনালে ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ থাইকা প্রশ্ন আইলো যে এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র কে, আমি ফাটায়া লিকখা দিয়া আইলাম, এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হইল পদ্মা নদী হারসেলফ। যুক্তি দেওনের লাইগ্গা উপন্যাস থাইকা উদ্ধৃতিও দিছিলাম, “প্রেয়সী নারীর যৌবন শুকাইয়া যায়, পদ্মা তো চিরযৌবনা।”

এইচএসসি তে আমি সায়েন্স গ্রুপে ছিলাম। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, জীববিদ্যা এইসব পইড়া বাংলা-ইংরেজি পড়নের সময় পাইতাম না। অনার্সে সাহিত্য নিয়া তাই বড় ধরনের ফাঁপড়ে পড়ছিলাম। বিভাগের বড়ভাই বাপনদা আমার এইচএসসিতে এই ধরনের উত্তর লেখার কথা শুইন্না কইছিলেন, “তুমি মনে হয় উপন্যাসের নামকরণের সার্থকতা পইড়া গেছিলা।” আমি যে জনমে প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ কইরা পরীক্ষা দিতে যাই নাই তা তো আর উনি জানতেন না। যারা মুখস্থ করত তারা হোসেন মিয়া বা কুবেরের নাম লিকখা তা প্রমাণ কইরা দিয়া আসছিলো।

যমুনা নদী দেইখা আমি মুগ্ধ হইলাম, হতাশও হইছি। মুগ্ধ হইছিলাম কারণ অইরকম স্বচ্ছ উজ্জ্বল অবস্থা আমি ব্রহ্মপুত্রের কোনো দিন দেখি নাই। ফেব্রুয়ারির বাসন্তী আলোতে ঝলমল করতেছিল যমুনা। বিখ্যাত মিস্টিক এই নদীরে আমার কাছে নীল নীল লাগছে। অনেক গান-টানে কয় “আমার যমুনার জল দেখতে কাল, সান করিতে লাগে ভাল”, তাই আশা করছিলাম নদীর পানিরে কালো দেখব। কালিন্দী নামের লগে কি নদীর পানির কালো হবার কোনো সম্পর্ক আছে? ব্রহ্মপুত্রের অপর নাম লৌহিত্য, তাইলে কি ধইরা নিতে হবে কোনো কালে ব্রহ্মপুত্র লাল আছিল? অবশ্য লোহিত মানে লাল, লৌহিত্য কি লোহিত থাইকা আসছে কিনা কে জানে! কিন্তু নদীর (বা নদের) নাম কি তার জলের নাম না তার গর্ভের? (সুনীল গাঙ্গুলিও এই প্রশ্নের উত্তর জানেন না, আমি ত কোন ছার!) এখন যে ব্রহ্মপুত্রে পানি নাই, এখনও ত তার নাম ব্রহ্মপুত্রই থাকবে। কিশোর কুমার বুড়া হইয়া গেলে ত আর তার নাম বৃদ্ধ কুমার হইয়া যায় না।

যমুনা নদী
“ছাত্রছাত্রীদের সাথে পিকনিকে গিয়া যমুনা নদী দেখছিলাম।”—লেখক। ছবি. কাজী রুবায়েত ইসলাম।

যমুনা দেইখা হতাশ হইছি কারণ চর পড়া শুরু হইছে ততদিনে। যে কোনো নদীতে ব্রিজ বানাবার পর তার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়। এইটা এড়াইবার জন্যে ব্রিজে অনেক উন্নত টেকনলজি ব্যবহার করতে হয়, বেশি সংখ্যক খাম্বা দিয়া সোজা না বানায়া ব্যাকা কইরা বানানো লাগে, যেইটা আমাদের দেশে করে না। খুশবন্ত সিং-এর একটা জোক আছে এইরকম—

এক বিদেশী আইসা ভারতের এক মন্ত্রীরে কইল, তোমাদের দেশ গরীব, তোমরা এতো বড়লোক কেমনে।

মন্ত্রী তারে গাড়িতে কইরা এক নদীর পাশে নিয়া গিয়া দেখাইলো, “ওই যে ওইখানে একটা ব্রিজ দেখতে পাচ্ছো?”

“হ্যাঁ, পাচ্ছি।”

“ওই ব্রিজ তৈরির জন্য বরাদ্দ টাকার অর্ধেকটাই আমার পকেটে এসেছে।”

তারপর আরেকটা নদীর সামনে নিয়া গিয়া একটা জায়গার দিকে আঙ্গুল তুইল্যা কইলো, “ওই যে ওইখানে একটা ব্রিজ দেখতে পাচ্ছো?”

“না তো, কোথায় ব্রিজ?”

“ব্রিজ নেই, কারণ ওই ব্রিজের জন্য বরাদ্দ টাকার পুরোটাই আমার পকেটে এসেছে।”

আমাদের দেশেও তাই হয়, সবাই জানে কেন নদীগুলা মইরা যাইতেছে, কিন্তু কারো কিছু করার নাই। আমলা-মন্ত্রীরা টেকা খাইয়া ব্রিজ একেবারে না বানাইলেও ভালো হইতো, নদীগুলা বাঁচতো। এখন টেকাও খায়, ব্রিজও বানায়। ব্রহ্মপুত্রের উপরে বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সেতুর তেমন কোনো কাজ নাই, শুকনা জাগার উপরে একটা পাকা রাস্তার মতন হইয়া গেছে এই ব্রিজ। ভরা বর্ষায় পানি একটু হয়, কিন্তু শরৎ আসতে আসতে সেই চর।

দূর্গাপূজার সময় প্রতিমা বিসর্জন দিতে পারে না এখন জুবিলি ঘাটে, পানি কই যে প্রতিমা ডুবাবে? অনেক ছোটকাল থাইক্কাই আমার মনে হইতো, এই যে শত শত প্রতিমা নদীতে ফালায়, নদীর নাব্যতা নষ্ট হয় না? এই প্রশ্ন ব্রহ্মপুত্র শুকায়া যাবার আগে বা পরে আমি কোনো বিশেষজ্ঞরে করি নাই, এমন কোনো বিশেষজ্ঞরে আমি চিনিও না। আর এই দেশে এখন যে সংকট চলতেছে তাতে হিন্দুদের অনুভূতির বিপক্ষে যায় এমন কিছু কইলেই আপনে জঙ্গি বা ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ হিসাবে লেবেলড হইয়া যাবেন। আবার যুদি কুরবানি ঈদে পরিবেশ দূষণ বা রোজার সময় সংযমের বদলে খাদ্য উৎসব নিয়া কিছু বলেন তাইলে হইবেন ‘নাস্তিক’। এই দুইটার অভিজ্ঞতাই আমার আছে। মানুষ লেবেল করার ব্যাপারে বেশ চরমপন্থী।

শরতের মাঝামাঝি পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের বান্ধানি পাড়ের উপরের লেবেল পর্যন্ত পানি চইলা আসতো আমরা যখন কলেজে পড়ি তখনও। এসএসসি পরীক্ষার প্রিটেস্ট যখন দিতেছিলাম, ১৯৯৮-এর সেপ্টেম্বর মাসে, তখন আমাদের বিদ্যাময়ী স্কুলের এক মেয়ে, নাম মুক্তি, শম্ভুগঞ্জ ব্রীজ থাইকা লাফায়া পইড়া আত্মহত্যা করছিলো। ঢেউয়ের তোড়ে তার লাশ গিয়া ঠেকছিলো জামালপুর। আমরা শুরুতে শুনছি যে সে নিখোঁজ। তারপরে গসিপ শুরু হইল, মফঃস্বল শহরে ১৫/১৬ বছরের কোনো মেয়ে হারায়া গেলে যেইটা হয়, সে কোন ছেড়ার লগে ভাইগা গেছে কিনা সেই জল্পনা-কল্পনা।

তারপর শুনলাম সে প্রিটেস্টে যে দুইটা পরীক্ষা দিছিলো কোনোটাতেই কিছু লেখে নাই। সাদা খাতা জমা দিছে। ডে শিফটে থাকলেও তারে আমরা চিনতাম, আমাদের উপরের তলার কাকলীও ডে শিফটে পড়ত, কাকলীর জন্মদিনে সে আসছিলো, তার বাসাও ব্রাহ্মপল্লীতেই। বাসা মানে খালার বাসা, তার মা ছিল না, বাবা থাকত ঢাকায়, সৎ মা আর সৎ ভাইবোনেদের সঙ্গে। লাশ পাওয়ার পর জানা গেল ইশকুলের স্যারেরা তার সাদা খাতা ধইরা ফেলার পর তারে খুব বকাঝকা করছিলেন, সেইদিনই সে আত্মহত্যা করতে ব্রিজে যায়। পরীক্ষা না দেওয়ার কারণ হইলো যে সে চিঠি লিকখা তার বাপেরে মমেনসিং আইতে কইছিলো, বাপে আইছে না। সেই অভিমানে সে পরীক্ষা দিতে ইশকুলে গেছে ঠিকই, কিন্তু লেখে নাই কিছুই। মমেনসিঙের কোনো ইমাম তার জানাজা পড়াইতে রাজি হইলো না দেইক্খা তারে গেরামের বাড়ি নিয়া গিয়া দাফন করা হইছিলো।

পরে কলেজে উইট্ঠা যখন এই বিষয়ে কথা হয়, কলেজে আমাদের সঙ্গে বিদ্যাময়ীর ডে শিফটের মেয়েরাও পড়ত, তাদের কয়েকজনের লগে আমাদের সখ্য হইছিলো, ওদের মধ্যে একজন বলতেছিলো যে মুক্তি প্রেগন্যান্ট ছিলো। শুইন্না  আমি টাশকি খায়া গেছিলাম। যে বলতেছিলো তারে জিগাইছিলাম যে সে কেমনে জানলো। সে বললো আসলে হয়ত ছিলো না বা ছিলো, তা প্রমাণের কোনো উপায় আর নাই এখন, কিন্তু কথাটা যে উঠছিলো সেইটাই আসল কথা, সে এই জন্যেই বলছে। মুক্তির লাশ দেখতে আমি গেছিলাম, কিন্তু দেখার সাহস পাই নাই। তিনদিন পরে পাওয়া লাশ তখন ফুইলা বিকৃত হইয়া গেছে। আমি ওর খালার বাড়ির উঠানে দাঁড়াইয়া কানতেছিলাম, কাকলী আর কাকলীর খালা দেইকখা আসছিলো। আইসা বলছিল যে না দেইক্খা ভালো করছি।

পরে যখন কলেজে উইঠা প্রেগন্যান্সি সংক্রান্ত গুজব শুনলাম তখন ভাইবা দেখলাম, সুইসাইড জিনিসটা কত জটিল। বাপের উপরে রাগ কইরা আত্মহত্যা করলেও রক্ষা নাই, কলঙ্ক হইবোই। লাশ দাফন করতে গিয়া ঝামেলা পোহাইয়া ওর বাপ বা খালাও হয়ত ওর উপরে বিরক্ত হইয়া গেছিলেন, দুঃখ বা অপরাধবোধকে ঢাকা দেওয়ার জন্যে রাগ বা বিরক্তি বেশ কাজে দেয়।

সাহিত্যে ডুইবা মরার মেটাফোর যতটা রোমান্টিক, বাস্তবে ডুইবা মরাটা ততটাই কেলেঙ্কারির। গানে কওয়া হয়, “প্রেমের মড়া জলে ডোবে না”। আসলে কুনো মড়াই জলে ডুবে না, লাশ ফুইল্যা পইচা গইলা ভাইসাই উঠবো। নারীরে নদীর লগে মিলায়া তারে গহীন গাঙ হইবার অনুরোধ কইরা তাতে ডুইবা মরাটা অত্যন্ত কাম্য হইতেই পারে, কিন্তু বাস্তব নদীর বাস্তব জলে ডুইবা মরা খুবই বীভৎস একটা ব্যাপার।

(কিস্তি ৪)

More from উম্মে ফারহানা

লৌহিত্যের ধারে (৪)

ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে একটা রক্তাক্ত ইতিহাস জড়াইয়া আছে।
Read More