লৌহিত্যের ধারে (৪)

ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে একটা রক্তাক্ত ইতিহাস জড়াইয়া আছে।

(শুরুর কিস্তি)

৪.

হাঁস মারলাম কইতর মারলাম বাইছ্যা মারলাম টিয়া
বালা কইরা রাইন্ধ ব্যান্নন কালাজিরা দিয়া

জি বি শ নাকি কইছেন জগতে খাওয়াটাই মুখ্য কাজ, বাকি সব গৌণ। খাওয়া নিয়া আমার বহুত বাজে কথা শুনতে হয়। পাউরুটি কিংবা কর্ন ফ্লেক্স খাইয়া অফিসে যাইতে যাইতে আমার আবার খিদা পাইয়া যায়, ক্যাম্পাসে নাইমা সোজা কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়াতে (ক্যাফের নাম চক্রবাক) গিয়া আবার নাশতা করি পরোটা আর ডিমভাজি দিয়া। এই জন্যে আমার কলিগেরা আমারে পচায়। আমি কই, “কী করমু ভাই, মায়ে আমারে খাইয়া পেটে থুইছে, আর বাপেও খাওয়াইয়া বড় করছে, তাই আমার খাইতে হয়। হাভাইত্যা হইলে অত খাইতাম না।”

আজকেও (১৯ অক্টোবর, ২০১৫) প্রেসক্লাবের সামনে দিয়া আসার সময় প্রেসক্লাব ক্যান্টিনের কাটলেট খাইতে মন চাইছিল। প্রেসক্লাব ক্যান্টিন এক আজিব ক্যান্টিন, চা পাওয়া যায় না, কোনো সফট ড্রিংকও না। খালি কাটলেট আর মোরগ পোলাউ, তবে অইটারে কেউ মোরগ পোলাউ বলে না, বলে ‘বিরানি’। আমরা জিলা ইশকুলের মোজাফফর আলি স্যরের কাছে অংক পড়তাম, উনি বাসায় আইসা পড়াইতেন। স্যার ছিলেন ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্য। স্যার কোনো একদিন কোনো এক উপলক্ষ্যে আমাদের বাসায় প্রেসক্লাবের বিরানির প্যাকেট নিয়া আসছিলেন, তখনই জানতে পারছিলাম যে প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্যদের কাছ থাইকা বিরানির প্যাকেটের অর্ধেক দাম রাখা হয়। যখন ময়মনসিংহে পাক মুসলিম হোটেল ছাড়া আর তেমন কোনো রেস্টুরেন্ট ছিল না তখন প্রেস ক্লাবের বিরানিই ছিল একমাত্র জনপ্রিয় খাবার যা দিয়া কেউ কাউরে ট্রিট দিতে পারে।

আব্বার বন্ধু সিরাজ চাচা আর তাঁর স্ত্রী শেলি চাচি দুইজনেই ডাক্তার। ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে উনারা ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চাকরি করতেন, তখন পর্যন্ত তাদের কোনো সন্তানাদি হয় নাই। আমরা কলেজে যখন পড়ি, চাচি তাঁর ছোট ছেলে শাইখকে নিয়া ময়মনসিংহ আসছিলেন, কমিউনিটি বেজড মেডিক্যাল কলেজে ভাইবা নিতে, তিনি বাংলাদেশ মেডিক্যালের শিক্ষক। শাইখকে তিনি নিয়া গেলেন প্রেসক্লাব ক্যান্টিনে। ময়মনসিং থাকার সময় তারা ভালো খাইতে হইলে কোথায় যাইতেন তা দেখানোর জন্য। শাইখ জিজ্ঞাসা করল, “তোমরা কি ওখানে প্রায়ই খেতে যেতা?”

চাচি হাইসা বললেন, “না বাবা, আমাদের কাছে এত টাকা থাকতো না, মাঝে-মধ্যে যেতাম।”

press-club-cantin-mymensing
প্রেস ক্লাব ক্যান্টিনের ভেতরে সবসময় বাতি জ্বলে।

উনারা বের হইয়া গেলে আম্মা বললেন, “দ্যাখ, তর শেলি চাচি কি সরল মানুষ, প্রেসক্লাবের বিরানি কী এমন দাম, সেইটাও প্রায় প্রায়ই খাওয়ার টাকা তাদের থাকতো না, এই কথা কত সহজে বলতেছেন।”

এখন তাদের ঢাকা শহরে বাড়ি গাড়ি সব আছে। কিন্তু আগে ত তারা সরকারি চাকরি করতেন। সরকারি ডাক্তারেরা খুব বেশি বেতন পান না, প্রাইভেট প্র্যাকটিস না জমা পর্যন্ত তাদেরকেও হিসাব কইরাই চলতে হয়।

প্রেসক্লাব ক্যান্টিনের খাবার আমি প্রথম খাইছিলাম সম্ভবত আমার ছোট মামার ছেলের জন্মদিনে। তখন আমি ক্লাস ফাইভে পড়ি, বুঝিই নাই ক্যান খাবারটা অত জনপ্রিয়। পরে হাইস্কুলে উইঠা বন্ধুদের সঙ্গে গিয়া প্রেসক্লাবের বিরানি আর কাটলেট খাইছি কয়েকবার।

ততদিনে অবশ্য খন্দকার হোটেল হইয়া গেছিল। খন্দকার হোক আর মিনার, কোনো রেস্টুরেন্টকেই এইখানে রেস্টুরেন্ট বলে না, বলে হোটেল।

স্টেশন রোডের মোড়ে যে তাজমহল নামের হোটেল আছে, সেইটা মোটামুটি বিখ্যাত। কিন্তু সেইটা এখন সত্যিকার অর্থেই হোটেল, আবাসিক শুধু, আগে ছিল রেস্টুরেন্ট, কিন্তু তখনও অইটাকে হোটেলই বলত।

তাজমহল বিখ্যাত কেন জানি না। সম্ভবত প্রেসক্লাব যে কারণে সেই একই কারণে। তরুণ বা যুবকদের হ্যাং আউটের জাগা বলতে অইটাই একমাত্র ছিল বইলাই হয়ত। পরে তসলিমা নাসরিনের লেখার দৌলতে আরেকটু বিখ্যাত হইছে ওই হোটেল বা রেস্টুরেন্ট।

ঢাকায় একজন আমারে ওই রেস্টুরেন্টের কথা জিগাইছিল। ওইটা ঠিক রেস্টুরেন্ট ছিল না ক্যাফে তা আমি জানি না।

আমি আর আমার বন্ধু তানভীর আহমেদ পাপ্পু একবার পরিকল্পনা করছিলাম শহরে একটা ভাতের হোটেল (মানে ভাতের রেস্টুরেন্ট আর কি!) খুলবো। তখন আমি অনার্স ফাইনাল দিয়া ফেলছি,মাস্টার্স শেষ পরীক্ষা দিবো বা দিতেছি। আমাদের এই প্ল্যান শুইনা আম্মা বলছিলেন, “তরে কি আমি ইংরেজিতে মাস্টার্স পাশ করাইছি ভাতের হোটেল দেওনের লাইগ্যা?”

পাপ্পু আর আমি আম্মারে বুঝাইয়া উঠতে পারলাম না যে ব্যবসা করা চাকরি করার চাইতে কম সম্মানের না। ব্যবসায়ী মানেই অশিক্ষিত মানুষ এমনও না, ব্যবসায় প্রশাসনে মানুষ পড়ালেখাও করে।

কিন্তু আম্মা এইসব কিছু মানতেই রাজি না। আম্মার কথা হইল বিশ্ববিদ্যালয় থাইকা উচ্চশিক্ষা নিছ, এখন বিসিএস দিয়া ফার্স্ট ক্লাস গ্যাজেটেড অফিসার হও, কিংবা ব্যাংকে চাকরি করো বা মাস্টারি করো। ভাতের হোটেল কেন?

আমি অবশ্য ভাতের হোটেল দেওনের পরিকল্পনা এখনও বিসর্জন দেই নাই। ক্যাপিটাল জোগাড় করতে পারলেই আমি ভাতের হোটেলের ব্যবসা শুরু করমু। মনে মনে একটা ইচ্ছা আছে যে ভালা মত রেস্টুরেন্ট চালাইতে পারলে আমি চাকরি ছাইড়া দিমু। ভাতের হোটেল চালানি যে শুধু লাভজনক ব্যবসা তাই না, এতে একটা আনন্দের ব্যাপারও আছে। মানুষরে পেট ভইরা খাওয়ানের মতন তৃপ্তি আর কীসে আছে? পয়সার বিনিময়ে খাইয়াও কাস্টমার যদি মনে করে তার পয়সাটা উসুল হইছে, তাইলেই ত আলহামদুলিল্লাহ।

ময়মনসিং এতই একটা ক্ষ্যাত জাগা যে এইখানে রেস্টুরেন্টে যাওয়া বা রেস্টুরেন্টে গিয়া খাওনের কালচারটাই ঠিকমত জমে নাই। নিজের বাড়িতে দাওয়াত দিয়া খাওয়ানোই এখনো আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। হয়ত ছোট শহরে এই রকমই হবার কথা। কিন্তু তাই বইলা রেস্টুরেন্টের বয়-বেয়ারাররা মুখে মুখে তর্ক করবে সেইটাও জানি কেমন লাগে।

ময়মনসিংহে সকল খাবারের দোকানরেই 'হোটেল' বলে, রেস্টুরেন্ট বলে না।
ময়মনসিংহে সকল খাবারের দোকানরেই ‘হোটেল’ বলে, রেস্টুরেন্ট বলে না।

আমি একবার  এক স্বনামধন্য রেস্টুরেন্টে খাইতে গেছি (ইদানিংকার এসি লাগানো আধুনিক রেস্টুরেন্টওয়ালারা আবার নিজেদেরে হোটেল বলে না, রেস্টুরেন্টই বলে) বোটি কাবাব অর্ডার দিছি, আইনা দিছে শিক কাবাব। দেইখা কইলাম, “ভাই, শিক কাবাব তো চাই নাই, এইটা মনে হয় ভুলে আইনা ফেলছেন, নিয়া যান, বোটি নিয়া আসেন।”

ওয়েটার বলল, “ম্যাডাম, এইটাই বোটি কাবাব।”

আমি বললাম, “তাইলে শিক কাবাব কোনটা?”

সে বলল, “এইটাই শিক কাবাব।”

আমি বললাম, “বোটি আর শিক একই?”

সে বলল, “জ্বি।”

আমি রাইগা জিজ্ঞেস করলাম, “তাইলে দুইটা নাম হইছে কেন? না থাকলে বলেন বোটি নাই, হবে না, একই বলতেছেন কেন?”

সে ঘাওড়ামি করল, “আমাদের এইখানে দুইটা একই।”

আমি একটু গলা চড়াইলাম, “ভাই শুনেন, শিক কাবাব কাঠ কয়লায় পুড়ায়া বানায় আর বোটি কাবাব তাওয়ার উপরে তেল দিয়া ভাজে, দুইটার মধ্যে পার্থক্য আছে।”

ওয়েটার বলল, “অর্ডার কি ক্যানসেল করবেন?”

আমি বুঝলাম অপাত্রে জ্ঞান জাহির করতেছি। ক্ষিদা ভালই লাগছিল, শিক দিয়াই নান রুটি খায়া আইসা পড়লাম।

কাস্টমার যেমন, রেস্টুরেন্টও তেমন, তার আদব-কায়দাও তেমনই। আসবার সময় কাউন্টারে কমপ্লেইন কইরা আসছিলাম পুরা বিষয়টা নিয়া, তাতে তেমন কোনো লাভ হইছে বইলা মনে হয় না। এই ঘটনার মাধ্যমে আমি এইটুক বুঝতে পারছি যে এই শহরের খাবারের দোকানে যতই এসি লাগাক আর ক্রেডিট কার্ডে বিল নেওনের মেশিন বসাক, আসলে রেস্টুরেন্ট বিষয়টাই শহরের লোকের মানসিকতার লগে বেমানান, সেইটা মালিকের দিক থাইক্যা হোক আর খদ্দেরের দিক থাইক্যা।

আমার ধারণা মেডিক্যাল কলেজ বা এগ্রিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা, হলের খাওন খাইতে খাইতে যাগর পেটে চড়া পইড়া গেছে তারাই এই সকল রেস্টুরেন্টের মূল টার্গেট কাস্টমার। তারা মোটামুটি খাইতে পাইলেই খুশি, ওয়েটার তক্ক করলেও সেইখানে তারা খাবেই, তাদের কাছে আর কোনো অপশন নাই।

আমার জাহাঙ্গীরনগরের বন্ধু হুমায়রা প্রথমবার মমেনসিং আমাদের বাসায় বেড়াইতে আইসা ভাত খায়া উইঠ্যা বলছিল, “এখন বুঝতে পারতেছি তুই কেন হলের খাবার খাইতে পারিস না।”

আমি বললাম, “কেন পারি না আবার কী? হলের খাবার কেউই খাইতে পারে না।”

হুমায়রা বলল, “আমি পারি, কারণ আমাদের বাসার রান্না এত মজা না, আন্টি অনেক ভাল রান্না করেন, তুই ছোটকাল থাইকা এই রান্না খায়া অভ্যস্ত, তাই হলের খাবার তোর গলা দিয়া নামে না।”

আমার মায়ের রান্না শুধু না, ময়মনসিংহের অধিকাংশ বাড়ির রান্নাই ভাল।

জগন্নাথ নিরামিষ ভোজনালয়।
জগন্নাথ নিরামিষ ভোজনালয়।

ক্লাস নাইনে যখন পড়ি, মুক্তা পাল নামের এক মেয়ে, ডাকনাম পপি, তাদের বাড়িতে পূজার সময় দাওয়াত দিছিল, হরেক রকম নাড়ু খাইয়া আমাদের পেট যখন ভইরা গেছে তখন মাসিমা আইন্যা দিলেন লুচি আর সবজি। জগতের যাবতীয় সবজি দিয়া একটা ঘ্যাঁট মার্কা তরকারি, সেই তরকারির স্বাদ আমার মুখে এখনও লাইগ্যা আছে। আর লুচিগুলাও খুব নরম আর ফুলা ফুলা। আমার আম্মা যে লুচি বানান তা মচমচা হয়, ভাঁজ করা যায় না। অত ভাল লুচি সবজি আমি ওর আগে বা পরে আর খাই নাই।

দূর্গাবাড়িতে ‘জগন্নাথ নিরামিষ ভোজনালয়’ নামে একটা খাবারের দোকান আছে। ওইটাতেও লুচি সবজি পাওয়া যায়। কিন্তু পপির মায়ের লুচির মতন হয় না। অই রকম নরম ভাঁজ কইরা ফেলা যায় লুচি আমি আগে খাইছি কালিবাড়ি প্রিক্যাডেট ইশকুলের পাশের এক দোকানে। ওই লুচির মাঝখানে সুজির হালুয়া দেওয়া থাকত। লুচির মধ্যে হালুয়া দিয়া একটা খবরের কাগজের টুকরার মধ্যে ভাঁজ কইরা দিয়া দিতো। খাবারটা তখনের হিসাবে দামি ছিল, পাঁচ টাকা। তখন এক দুই টাকায় সিঙ্গারা ডাইলপুরি পাওয়া যাইত আর তিন টাকা রিকশা ভাড়া দিয়া ব্রাহ্মপল্লী থাইকা কালিবাড়ি যাওয়া যাইত।

সুজির হালুয়া ছোটকালে আমার বেশ প্রিয় খাদ্য ছিল। বাসায় আম্মা এত বেশি সুজির হালুয়া বানাইতেন যে হাই স্কুলে উঠতে উঠতে এই খাদ্যের উপরে তিতিবিরক্ত হইয়া গেছিলাম। যদিও আম্মার সুজির হালুয়া শুধু চিনি আর সয়াবিন তেলের হালুয়া না। আম্মা হালুয়া বানাইতেন সুজিটা ঘি দিয়া ভাইজা, দারচিনি এলাচি তেজপাতা আর ঘন দুধ দিয়া ফুটায়া। সেইটা তখন হালুয়া না হইয়া ‘মোহনভোগ’ হইয়া যাইতো। ‘মোহনভোগ’ নাম কেন হইছে তা মুসলমান ছেলেমেয়েরা অনেকেই জানে না। বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীরা, যারা রাধাকৃষ্ণের পূজা করেন তারা শ্রীকৃষ্ণকে এই খাদ্য ভোগ হিসাবে অফার করেন। শ্রীকৃষ্ণের অপর নাম মোহন নাকি শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির নাম মোহন সেইটা আমি নিশ্চিত জানি না। সম্ভবত শ্রীকৃষ্ণেরই নাম। ‘মীরা কা মোহন’ নামে একটা হিন্দি ফিল্ম ছোটকালে দেখছিলাম, মোহন মানে কৃষ্ণ হইবারই কথা। ‘মোহন’ শব্দের অর্থ মনে হয় সুন্দর। রবি ঠাকুরের গানে আছে, “তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে।” তার মানে বুঝা যাইতেছে যে কালো আর সুন্দর মোটামুটি সমার্থক ছিল বাংলা ভাষায়। এই রবি ঠাকুরই আবার লিখছেন, “কালো? তা সে যতই কালো হোক”, তার মানে দাঁড়াইতেছে কালো মানে সুন্দর না, কালো হরিণ চোখ দেইখা মাইয়ার রূপে মুগ্ধ হইতেছেন বক্তা। এইটা সম্ভবত আর্যদের প্রভাবে হইছে। গোবিন্দও শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম। (শ্রীকৃষ্ণের নাকি ১১৮টা নাম! আমার বাংলা বিভাগের সহকর্মী শিলা আপার কাছ থাইক্যা জানতে পাইছি) স্বদেশীবাজারে একটা দোকান আছে রাধাগোবিন্দ স্টোর। আমার ছোটখালা ওই দোকানের মিক্সচার জর্দা ছাড়া পান খাইতেন না।

radha-govinda-store
স্বদেশীবাজারে একটা দোকান আছে রাধাগোবিন্দ স্টোর। আমার ছোটখালা ওই দোকানের মিক্সচার জর্দা ছাড়া পান খাইতেন না।

আম্মার ওই সুজিরে মোহনভোগ না বইলা শুধু সুজির হালুয়া বললে খাদ্যটারে অপমান করাই হয়। মোহনভোগ নামটা আমি আম্মার কাছ থাইকাই শিখছিলাম সম্ভবত। নামের ইতিহাসটা বোধহয় বাণী বসুর ‘রাধানগর’ উপন্যাসের মাধ্যমে জানতে পারছি, অথবা আম্মাই বলছিলেন।

আম্মা হিন্দু মিথোলজির অনেক গল্পই জানেন। কিছুদিন আগে আমার ছেলে আমার হাতে কামড় মারলে আম্মা অরে জিজ্ঞেস করতেছিলেন, “তুই কি পরশুরাম?” প্রকৃতি পরশুরামের বিষয়টা কী তা জানতে চাইলে মাতৃহত্যার পাপে পরশুরামের হাতে কুঠার লাইগা গেছিল সেই গল্প আম্মা তারে তখন বললেন।প্রকৃতি জিজ্ঞেস করল, “মাকে মাইরা ফেলছিল কেন?” মাতৃতান্ত্রিক থাইকা পিতৃতান্ত্রিক বা নারীতান্ত্রিক থাইক্যা পুরুষতান্ত্রিকের দিকে সমাজ যখন রূপান্তরিত হইতেছে তখন এই সকল ঘটনা ঘটছে। ক্লাইতেমেনেস্ত্রার ছেলে অরেস্তেসও বোন ইলেকত্রার প্ররোচনায় মাকে হত্যা করছিল। সমাজের রূপান্তরের প্রতিফলন সাহিত্যে এই ভাবেই আসে, দুই ক্ষেত্রেই ওই নারীদের পরকীয়া সম্পর্করে দায়ী করা হইছে। আমার মেয়ে প্রকৃতির বয়স মাত্র সাড়ে আট, তাকে অত ব্যাখ্যা দিলে সে বুঝবে না। তাই সেই অপচেষ্টা আর করলাম না।

পরশুরামের ঘটনা আমি যতটুক জানি তা হইলো, বাপ জমদগ্নির আদেশে মা রেনুকা আর বড় চাইর ভাইরে খুন করার পরে মাতৃহত্যার দায়ে পরশুরামের হাতে কুঠার আটকাইয়া গেল। উনি বহু তীর্থে তীর্থে ঘুরলেন পাপমোচনের জন্যে কিন্তু তার প্রায়শ্চিত্ত হইলো না। অবশেষে হিমালয়ের কৈলাস শৃঙ্গের মানস সরোবরে গিয়া তার পাপ কাটা গেল। ওইখান থাইকা ব্রহ্মপুত্র নদের উৎপত্তি হইলো, পরশুরামের কুঠারখানা লাঙ্গল হইয়া গেল এবং উনি লাঙ্গল দিয়া কাইট্যা ওই পবিত্র পানিরে সমতলের মানুষের জন্যে প্রবাহিত করার মহান ব্রত সাধন করলেন, যাতে পাপীতাপীরা ওই ধারায় স্নান কইরা পাপ কাটাইতে পারে। যেইখানে আইসা লাঙ্গল চালানো শেষ হইলো সেই জাগার নাম লাঙ্গলবন্দ। এর পরে ব্রহ্মপুত্র নিজের মতন কইরা চলতে পারলো। কিন্তু তার যেইটা মূল কাজ ছিলো, জগতের পাপীদের পরিত্রাণ করা, সেইটা না কইরা সে যমুনা নদীর লগে লটরপটর করা শুরু করলো। যেহেতু সে পুরুষ আর যমুনা নারী, এই নারীসঙ্গ করবার দোষে পরশুরাম তারে শাপ দিলেন যে ব্রহ্মপুত্রের পানি কুত্তার মুতের লাহান অপবিত্র হইয়া যাইবো, শুধুমাত্র বচ্ছরের একটা দিন তা পবিত্র হইবো। পরশুরাম নিজে রামের মতন বিষ্ণুর আরেকজন অবতার, কাজেই তার দেওয়া অভিশাপ ফলতে বাধ্য। যে একদিন ব্রহ্মপুত্রের পানি পবিত্র থাকে সেইদিনই তাতে স্নান কইরা পাপস্খালন করা সম্ভব।

বিভিন্ন পুরাণে এই ঘটনার বিভিন্ন বর্ণনা আছে। অরুণাচল প্রদেশের ‘পরশুরাম কুণ্ড’ নামের এক হ্রদ থাইকা ওই রক্তমাখা কুঠার হইতে পরশুরাম মুক্ত হইছিলেন এমন কথাও জানা যায়। এই জন্যে আসামে ব্রহ্মপুত্র নদেরে ‘লোহিত’ বা ‘লৌহিত্য’ বলা হয়। পরশুরাম বহু ক্ষত্রিয়েরে হত্যা করছিলেন, ২১টা পুকুরের সমান রক্ত হইছিল। হিন্দিতে অনেক সময় রক্তকে ‘লহু’ বলে। ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে একটা রক্তাক্ত ইতিহাস জড়াইয়া আছে। মিথোলজির মজা হইলো এর অনেকগুলা ভার্সন থাকে। আমি এই ভার্সন শুনছি আমার তালুই জয়ন্ত কাকুর কাছ থাইকা। ব্রহ্মপুত্র নামের আক্ষরিক অর্থ হইলো ব্রহ্মার পুত্র। উনি ব্রাহ্মণ বইলাই যে এত কিছু জানেন তেমন না। অনেক ব্রাহ্মণরে আমি চিনি যারা তেমন কিছুই জানেন না, হুদাই ব্রাহ্মণ রক্তের বড়াই করেন।

আবার অনেকে মনে করেন ব্রাহ্মণদের উপরে অনেক অভিশাপ থাকে কারণ উনারা এক সময় নিচা জাতেরে বহু অত্যাচার করছেন। আমাদের অফিস সহকারি দেবশ্রী ব্রাহ্মণের মেয়ে। অভিশাপ সংক্রান্ত তত্ত্বটা আমি তার কাছেই প্রথম শুনছি। পপির মার তরকারির মতন না হইলেও মোটামুটি ভালো তরকারি আমিও রান্না করতে পারি, দেবশ্রী ব্যানার্জির কাছ থাইকা শিখছি। বাংলাদেশের হিন্দুরা সাধারণত ব্যানার্জি চ্যাটার্জি মুখার্জি ব্যবহার না কইরা বন্দ্যোপাধ্যায় চট্টোপাধ্যায় মুখোপাধ্যায় ব্যবহার করেন, সংক্ষেপ করার চলটা পশ্চিমবঙ্গের। আমি অনেকবার ভাবছি দেবশ্রীকে জিজ্ঞেস করবো তার সারনেমের এই সংক্ষিপ্তকরণের পিছনে জি বাংলা বা স্টার জলসার কোনো ভূমিকা আছে কিনা। অফেন্ডেড হইতে পারে ভাইবা আর জিগাই নাই।

তরকারির রেসিপি খুবই সহজ। তেলে তেজপাতা আর পাঁচফোঁড়ন দিয়া সব কাটা সবজি দিয়া ভাজতে হবে। জিরাগুঁড়া, আদাবাটা, হলুদগুঁড়া আর লবণ দিতে হবে। কেউ ঝাল খাইতে চাইলে শুকনা মরিচ দিতে পারে ফোঁড়নে, হজমের সমস্যা থাকলে শুধু কাঁচা মরিচ দেওয়া যাইতে পারে। পিঁয়াজ রসুন কিচ্ছু দেওয়া লাগবে না। পটল, ধুন্দল, চিচিঙ্গা বা এই ধরনের পাইন্যা সবজি থাকলে পানি না দিয়া কিংবা অল্প পানি দিয়া ঢাইক্যা রান্না করতে হবে। নামানের আগে চিনি ছিটাইয়া দিতে হবে। সবজি ঘ্যাতা না কইরা আস্ত আস্ত রাখতে চাইলে না ঢাইকা রানতে হবে আর যাতে লাইগা না ধরে সেইটা লক্ষ্য রাইখা বুইঝা বুইঝা পানি দিতে হবে।

শুক্তো রান্নাও আমি দেবশ্রীর কাছ থাইকা শিখছি। শুক্তো এক পদের সবজিই। কিন্তু ওইটাতে সব সহজপাচ্য সবজি থাকে, বেগুন মিষ্টি কুমড়া এগুলা থাকে না বরং পেঁপে কাঁচাকলা এইসব থাকে। আর যেইটা মাস্ট থাকবে সেইটা হইল তিতা জিনিস। করল্লা বা নিম পাতা। করল্লাটা সব সবজির লগে কাইট্টা দেওয়া যায় আবার আলাদা ভাইজাও দেওয়া যায়। নিম পাতা দিতে চাইলে আলাদা ভাইজা উপরে ছিটাইয়া দিতে হবে। গরমের দিনে এই খাদ্য খাইলে যে কারো পেটের সকল সমস্যা ঠিক হইয়া যাইতে বাধ্য। শুক্তো মুসলমান পরিবারগুলাতে রান্না করে না। আমি এই খাদ্যের নাম শুনছি অন্তরা চৌধুরীর গানে। ছোটবেলা আমাদের বাসায় বাচ্চাদের গানের এই ক্যাসেট ছিল। গানটা ছিল এই রকম, “কেউ কখনও ঠিক দুপুরে রায়পুরেতে যেও না/ যদি বা যাও ক্ষ্যান্ত পিসির রান্না শুক্তো খেও না।”

ক্ষ্যান্ত পিসির ব্যাপারটা কী তা আমি আমার বোনের ভাসুর, ইন্দ্রনীল চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থাইকা জানতে পারছিলাম। সতীদাহ প্রথা বন্ধ হবার পরেও বাল্যবিবাহ বন্ধ হয় নাই, আর বিধবা বিবাহের আইন হইলেও সমাজে তা প্রচলিত ছিল না। বাপের মান-ইজ্জত রক্ষা করার জন্যে বাচ্চা বাচ্চা মেয়েদেরকেই বুড়া কূলীন ব্রাহ্মণের কাছে বিয়া দেওয়া হইতো। ব্রাহ্মণ বাদে অন্যান্য জাতেও বাল্যবিবাহ হইতো, বরের সঙ্গে কনের বয়সের অনেক গ্যাপে। বুড়াগুলা মইরা গেলে বিধবাগুলারে বাপের বাড়ি পাঠায়া দেওয়া হইতো কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিধবা মেয়েগুলা এতই ছোট থাকত যে তাদের সন্তানাদি হইতো না। বাপের বাড়ি আইসা অরা সাধারণত ভাইয়ের বাচ্চাদেরে পালতো, বাড়ির ঠাকুরঘর সামলাইতো আর যেহেতু মাছ মাংস খাওয়া বিধবাগর নিষেধ, তারা আউলা চাইলের ভাত আর শুক্তো রাইন্ধা খাইত। বঞ্চনা অবহেলা যৌন অবদমনের ফলে বুড়া বয়সে পৌঁছাইতে পৌঁছাইতে তাদের মেজাজ খ্যাটখেইট্টা হইয়া যাইতো। এই জন্যেই তাদেরে ক্ষ্যান্ত পিসি বলা হইতো।

মুসলমান বাড়িগুলাতে সবজি ভাল রানতে পারে না। পেঁয়াজ রসুন দিয়া রান্ধে, যাতে কইরা সবজির সেই টেস্ট পাওয়া যায় না। কোনো কিছু রান্ধা ভাল না হইয়া উলটাপালটা হইলে আম্মা বলেন, “মিয়ার বউয়ের অম্বল।”

মুসলমানেরা শুক্তো বা অম্বল ভাল রানতে পারবে না এইটাই স্বাভাবিক ধইরা নেওয়া হয়। মুসলমানের বাড়িতে এই রকম ইউনিক কোনো কিছু রান্না হয় কিনা যা হিন্দুরা রানতে পারে না ভাবতে গিয়া আমি কোনো খাদ্যের নাম মনে করতে পারি নাই। মুরগ মুসাল্লাম বা বুরহানি ফালুদার মতন কিছু নওয়াবি খাদ্য যা পুরান ঢাকার লোকেরা খায়া থাকে এমন জিনিস হয়ত হিন্দুরা খান, কিন্তু রান্ধেন না। পাকিস্তানি সেমাইয়ের রেসিপি আছে একটা, নাম ‘শির কোরমা’, সেইটা কোনো হিন্দু বাড়িতে না বানানো স্বাভাবিক।

আমি বহু আগে একবার শির কোরমা বানাইছিলাম ঈদের সময়। বাদাম, পেশতা , কিসমিস দিয়া একটা হুলুস্থুল কারবার, আসলে সেমাইই, কিন্তু ওই মোহনভোগের মতন বড়লোকি একটা ব্যাপার আর কি। আমার দাদি জোবেদা খাতুন রান্নার ব্যাপারে একটা বচন বলতেন, “বজ্জাতেও রানবার জানে, মুদ্দাই হইল ত্যাল।” রান্নার উপকরণের কিপটামি করলে বা কোয়ালিটি রক্ষা করতে না পারলে খাদ্য সুস্বাদু হবে না সেইটা বুঝানর জন্যে কথাটা বলা হয়। কিন্তু আমার মেজ মামা আমিনুল আহসান এই কথা মানতে নারাজ। উনি শবে বরাতের সময় আমাদের বাসায় আসেন শুধুমাত্র আমার আম্মার হাতের বুটের ডালের হালুয়া খাওয়ার জন্যে। সব বাসায়ই বুটের হালুয়া বানানি হয়, উনার নিজের বাসায়ও হয়, কিন্তু উনার কাছে আম্মার হালুয়াটাই শ্রেষ্ঠ।

munna-piaju-halim
মুন্না পিঁয়াজু ঘরের হালিম, এখন ৩০ টাকা বাটি।

এই প্রসঙ্গে আমার ছোট খালা একদিন বলছিলেন, “মিলন (আমার আম্মার ডাকনাম) বেশি বেশি ঘি চিনি দেয় দেইখ্যা অরটা মজা হয়।” আমার মামা রাগ হইয়া কইলেন, “তরে এক মন চিনি আর এক মন ছানা আইন্যা দিলে তুই মুক্তাগাছার মণ্ডা বানাইবার পাইবি?”

অবশ্যই রান্নাতে হাতযশের একটা ব্যাপার আছে। আমার স্কুলের বন্ধু শায়িকা করিম সুরমার আম্মা যে পায়েস বানাইতেন আর হালিম রান্না করতেন সেই রকম সুখাদ্য আমি খুব কম খাইছি। আমার ছেলে পেটে থাকার সময় চাকরির প্রমোশনের ব্যাপারে ঢাকা গেছিলাম, খালাশাশুড়ির বাসায় উঠছিলাম। আমার দেওর সুস্ময়, খালা শাশুড়ি আর তার মেয়ে মউরিন আমারে ‘মাজা’ নামের এক রেস্টুরেন্টে নিয়া গেল। অইখানে হালিম খায়া তারা বেশ তৃপ্ত। আমি দেখলাম রাঁধুনি হালিম মিক্সের হালিমটাই রান্না কইরা দিছে, গোশটা একটু ভাল দিছে, অন্য হালিমের তুলনায় সেইটার ভালোত্ব অইটুকুই। আমি মনে মনে ভাবলাম, আহা, সুরমার আম্মারটা না হোক, আমার আম্মার হালিমটাও যদি এদেরে খাওয়াইতে পারতাম। ময়মনসিংহের স্টেশন রোডের ‘মুন্না পিঁয়াজু’ নামের দোকানের ৩০ টাকা দামের মেলামাইনের বাটিতে দেওয়া হালিমও মাজার পিতলের কড়াইতে পরিবেশন করা হালিমের চাইতে সুস্বাদু। আমার খালাশাশুড়ির রান্নাও খুব ভাল, কিন্তু উনি জোর কইরা খাওয়ান, অতিশয় উপাদেয় খাদ্যবস্তুও বেশি খাইতে হইলে হাঁসফাঁস লাগতে পারে তা উনি জানেন না বা মানেন না। উনার কথা হইল, “খাইয়া পরে দরকার লাগলে বমি কইরা ফেলবি।”

জোর কইরা খাওয়ানের অভ্যাস তন্ময়ের মধ্যেও খানিকটা আছে। অর্পনা আপু আমাদের বাসায় আসতে চাইত না শুধুমাত্র তন্ময় খাওয়া নিয়া জোরাজুরি করে দেইখ্যা। আমার শাশুড়ির কাছে গল্প শুনছি সুস্ময় যখন হইছে, আমার নানাশ্বশুর তন্ময়রে নিয়া হাসপাতালে গেছিলেন, তন্ময়ের বয়স তখন আড়াই বছর। তাকে ফ্রুট কেক খাইতে দেওয়া হইছে। আমার শাশুড়ি তার বাবার সঙ্গে কথা বলতেছিলেন, তন্ময় সেই ফাঁকে দুই দিনের বাচ্চারে “ভাইয়া খাও খাও” বইলা ফ্রুটকেক খাওয়াইয়া দিতে নিছিলো।

জোর কইরা খাওয়ানের ব্যাপারটা আমাদের বাসায় ছিল না কোনো দিন। যে যেইটা খাইতে চায় না তারে সেইটা নিয়া চাপাচাপি করা হয় না। এতে অবশ্য কোনো লাভ হয় নাই। বরং আমার আম্মার জন্যে বিরাট ক্ষতি হইয়া গেছে। আমার বড় ভাই এখনও ইলিশ আর চিংড়ি বাদে কোনো মাছ খায় না, মাংস বা ডিম না থাকলে শুধু ডাইল দিয়া ভাত খায়, সবজি পাতে তোলে না। আম্মার আবার মাছ না খাইলে তৃপ্তি হয় না। কাজেই তাকে কয়েক পদের রান্না করতে হয় প্রতিদিন।

রান্না বিষয়ে আমার আম্মা খুবই কট্টরপন্থী। আদা জিরা বাইটা নিপিস কইরা পরে উনি তরকারি রান্ধেন। মশল্লা পিষা যথেষ্ট নিপিস (মিহি) না হইলে উনি রানতে পারেন না। পিঁয়াজের স্লাইস একটার সঙ্গে আরেকটার পুরুত্ব না মিললে তার পছন্দ হয় না। বলেন, “কামলা বেইট্টাইনগর মতন কইরা কাটছস ক্যান?”

munna-alu-chop
মুন্না পিঁয়াজু ঘরের আলুর চপ।

আমি বলি, “আম্মা, পিঁয়াজ কাটা তো আমার পেশা না, আমারে ভার্সিটিতে গিয়া হ্যামলেট ইদিপাস কমপ্লেক্সে ভুগে কিনা তাই নিয়া লেকচার দিতে হয়।”

আম্মা নির্বিকারে বলেন, “যে রান্ধে সে চুলও বান্ধে।” বাসার গৃহকর্মিনীদেরে দিয়া তিনি রান্নাঘরের কাজ করান না, যদি করাইতেও হয়, সেই কাজ তার পছন্দ হয় না। কোনো কাজের মেয়ের প্রশংসা করতে হইলে তিনি বলেন, “পারভীন নামের মেয়েটা খুব ভাল ছিল, জিরা বাটতো চন্দনবাটার মতন কইরা।”

যে কোনো কাজে পারফেকশনিস্ট হওয়া ভাল। কিন্তু আমার আম্মা রান্নার ব্যাপারে পারফেকশনিস্ট হইতে গিয়া আর সকল বিষয়ে উদাসীন হইয়া পড়ছেন। বাসা গুছায়া রাখা বা পর্দা বিছানার চাদর বালিশের কাভার পাল্টানের দিকে তার মন নাই। সব বাসায় দেখতাম পর্দা কুশন কভার ঈদের সময় ব্যবহারের জন্যে  এক সেট আলাদা থাকে। আমাদের বাসায় ছিল না। খালি ঈদের আগে আগে সব সময়ের পর্দাগুলাই ধুইয়া নেওয়া হইত। অবশ্য রান্নার প্রতি এই প্যাশনের জন্যে তার নামডাক খুব হইছে আত্মীয় আর বন্ধুমহলে।

ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘ঊনিশে এপ্রিল’ ছবিতে এমন একটা দৃশ্য আছে যেখানে অপর্ণা সেনের মেয়েরূপী দেবশ্রী রায় কোন একটা রান্নায় একটা ইনগ্রেডিয়েন্টের বিষয়ে বলতেছেন সেই জিনিসটা না দিলে কিছু হয় না, অপর্ণা সেন রাইগা বলতেছেন, “হয়, যে কাজটা করবে, ভাল করে করবে।” ওইটা দেইখাই আমার আম্মার কথা মনে হইছে। ফুচকা বানানি শিখার পর আম্মা তালমাখনা কোথায় পাওয়া যায় সেইটা খোঁজ নিতে শুরু করছিলেন।

কোথায় কোন জিনিসটা দিতে হয় বা দিতে হয় না সেই তর্কের অবশ্য কোনো সমাধান নাই। একবার আমার সহকর্মী তৃপ্তি আর আমি পূজার আগে আগে ক্যাম্পাসে যাবার পথে বাসে বইসা ‘প্রথম আলো’র নকশা পাতা পড়তেছিলাম। অইখানে তেঁতুল দেওয়া আলুর দমের রেসিপি দিছিল। দেইখাই তৃপ্তি বলতেছিল, “আমরা আলুর দমে তেঁতুল দেই না, টক আলাদা রান্না করি।” কিন্তু যিনি রেসিপি দিছিলেন তিনিও হিন্দুই। গরুর নিহারি রান্নায় আমি তেঁতুল দেই না, আমার শাশুড়ি দেন। আমরা লেবু আলাদা চিপ্যা নিয়া নিহারি খাই।

গরুর নিহারি একটি অতি সুখাদ্য কিন্তু আমাদের বাসায় রান্না হইতো না। কারণ আব্বা খুব একটা পছন্দ করতেন না। গরুর ভুরিও খাইতে খুব ভাল কিন্তু তা পরিষ্কার করা খুব কষ্টসাধ্য ব্যাপার বইলা আম্মা সেইটাও রানতেন না। আমাদের এক ফ্যামিলি ফ্রেন্ড ছিলেন, ফরিদ আহমেদ। আমরা ফরিদ আংকেল ডাকতাম। উনি বলতেন, “গরুর সবটাই খেতে ভালো, খুর আর শিং ছাড়া”। মাংস বাদে গরুর যা যা খাওয়া যায় তা নিয়া কথা হইতেছিলো। কলিজা, মগজ, মাথার মাংস, ভুরি, এমনকি জিব্বা আর ল্যাজও যে খাওয়া যায় সেই প্রসঙ্গেই উনি এই কথা বলছিলেন।

সিদ্দিকা কবিরের রান্নার বই দেইখা আমি গরুর মাংস রান্নার একটা রেসিপি শিখছিলাম, প্রিপারেশনের নাম হইলো ‘বিফ ভিন্দালু’। বইয়ের মতন হুবুহু রান্না করছি, গরম মশলা ছাড়া। শুইনা সবাই অবাক হয়, রেড মিট কখনো গরম মশলা ছাড়া রান্ধা যায় তা কেউ ভাবতে পারে না সহজে। পরে আমি ফক্স চ্যানেলে দেখছি এই ভিন্দালুর রেসিপি আসলে একটা পর্তুগিজ রেসিপি। গোয়াতে পর্তুগিজ কলোনি ছিল। গোয়ানিজরা শুকরের মাংস দিয়া ভিন্দালু রান্ধে। ‘ভিনো’ মানে ভিনেগার আর পর্তুগিজ ভাষায় ‘আলু’ মানে আদা। আবার সিরকার বদলে ওয়াইন দিয়াও এইটা রান্ধা যায়। ‘ভিনো’ শব্দাংশটা ওয়াইন থাইকাও আইসা থাকতে পারে। সিদ্দিকা কবির বাংলাদেশের মানুষের জন্যে শুয়োরের বদলে গরু দিয়া রেসিপি লিখছেন আর কি।

(কিস্তি ৫)

More from উম্মে ফারহানা

লৌহিত্যের ধারে (৩)

অবশ্য লোহিত মানে লাল, লৌহিত্য কি লোহিত থাইকা আসছে কিনা কে জানে!
Read More