লৌহিত্যের ধারে (৫)

প্রথম যখন নুডলস রান্ধা হইছে বাসায়, আমার দাদি জোবেদা খাতুন কইছিলেন, “এইগুলা হালালই না হারামই।”

(শুরুর কিস্তি)

৫.

শুয়োরের মাংস খাওয়া নিয়া মুসলমানদের অধিকাংশের ট্যাবু আছে, আমার নিজেরও আছে। কেন আমার কোনো দিন শুয়োর খাইতে ইচ্ছা করে নাই তা ভাবতে গিয়া মনে হইলো ধর্মীয় ট্যাবুই সম্ভবত এর কারণ। গরু বা ছাগল বইলাও মানুষেরে গালি দেওয়া হয়, তাদের নির্বুদ্ধিতার জন্যে, তাই বইলা গরু খাসি খাইতে তো আমার কোনো সমস্যা হয় নাই। ছোটকালে আমি শুয়োর দেখছি মেথরপট্টির সামনে, ড্রেন থাইকা উইঠা আসা কালো রঙের একপাল প্রাণিরে দেখলেই কেমন যেন ঘিনঘিনা অনুভূতি হইতো। পরে অই এলাকায় মেদিনী হাই টাওয়ার নামের এক দশতলা দালানের চারতলায় ভাড়া থাকছি ছয় মাস, তখন একদিনের জন্যেও শুয়োরের পাল দেখি নাই। হয়তো মেথরপট্টির লোকেরা এখন আর শুয়োর পালে না। মেথরপট্টিরে এখন অবশ্য হরিজন পল্লী বলে।

শুয়োরের মাংস খাইলে অন্ত্রে ক্যান্সার হয়, চোখের কৃমি হয় ইত্যাদি গুজব ছোটকাল থাইকা শুনছি বইলাও এহেন বিতৃষ্ণা তৈরি হইয়া থাকতে পারে। হাঙরের ব্যাপারে এসব কথা শুনি নাই, তাই হাঙরের পাখনার স্যুপ খাওনের খায়েশ রইয়া গেছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, হাঙর খাওয়াও হারাম, মাছ হইলেও ওইটা হিংস্র তাই ইসলামে সেইটা খাওয়া জায়েজ করা হয় নাই। অবশ্য অর্পণা আপু কোন একটা হাদিসের আলোকে বলছিল যে সমুদ্রের তলার সকল প্রাণী খাওয়াই নাকি হালাল। সেই হিসাবে কাঁকড়া, কচ্ছপ, অক্টোপাস এমনকি জেলিফিশ খাওয়াও হালাল হইবার কথা। হাঙরের পাখনার স্যুপের কথা আমি কই পড়ছি তা মনে পড়তেছে না। ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’তে হইতে পারে। কিন্তু যতদূর মনে হয় ওইখানে বুড়া সান্তিয়াগো হাঙরের চর্বি ফ্রিতে খাইতেন বইলা উল্লেখ আছে।পাখনার স্যুপ আইলো কই থাইক্যা?

louhitto-5-7
আমার মা মাসুদা বেগম।—লেখক

একবার অবশ্য আমি শুয়োরের মাংস খাইছিলাম, জাহাঙ্গীরনগরে থাকতে। পল জেমস গোমেজ নামে এক সিনিয়র বন্ধু ছিল আমাদের, তার বাসা থাইকা আনা স্যান্ডউইচে কামড় দেওনের পরে সে কইল, “এইটা কিন্তু পর্ক” তখন খিদাও লাগছিলো আর চাবায়াও ফেলছিলাম, তাই আর না ফালায়া খায়া নিছি। আগে জানলে হয়তো খাইতাম না। এমন না যে হালাল হারাম নিয়া আমার খুব মাথাব্যথা আছে। পূজার প্রসাদ খাওয়া হারাম, কিন্তু দূর্গাপূজা দেখতে গিয়া যে কোনো প্রসাদ পাইলেই আমি তা দিব্যি বিসমিল্লা বইলা খায়া নেই, হারাম জাইনাও।

খাওয়া শুরুর আগে আমি সশব্দে ‘বিসমিল্লা’ বলি দেইখা অনেকে আমারে বিদ্রূপ করেন। দুই এক জাহাঙ্গীরনগরের সিনিয়র বলছিলেন এইটা নাকি আমারে মানায় না। বই পইড়া গেলে উঠায়া সালাম করার মতন এইটাও একটা ছোটকালের অভ্যাস। এতে স্মার্টনেসের হানি হইতে পারে, কিন্তু আমার খুব একটা সমস্যা হয় না। আমি এমনিতেও মানুষ হিসাবে খুব একটা স্মার্ট না। উনাদের বক্তব্য হইল, এইটা মনে মনেও বলা যাইতে পারে। তা হয়তো পারে। কিন্তু অন্যের সংজ্ঞা অনুযায়ী স্মার্ট হওনের লাইগ্যা নিজের অভ্যাস পাল্টানির প্রয়োজন আমি বোধ করি নাই। এইটা ইগো বা ঘাড়ত্যাড়ামিও হইতে পারে, মমেনসিঙ্গাগর এমনিতেও ঘাড়ত্যাড়া হিসাবে সুনাম (পড়েন বদনাম) আছে।

পলের করল্লা দিয়া গরুর মাংস। তার ফেইসবুক থাইকা নেওয়া ছবি।—লেখক
পলের করল্লা দিয়া গরুর মাংস। তার ফেইসবুক থাইকা নেওয়া ছবি।—লেখক

পল একজন বিশিষ্ট ভোজনরসিক, তার ফেইসবুকে খুবই চমকপ্রদ সব খাবারের ছবি দেখতে পাওয়া যায়। করল্লা দিয়া গরুর মাংসের একটা রেসিপির ছবি সে পোস্ট করছিল, ‘বিফ উইথ বিটার গোর্ড, আই’ম কলিং ইট বিটার বিফ’ লেখা ছিলো ছবির শিরোনামে, সেই ছবি দেইখা আমি খুবই বিস্মিত হইছি। করল্লা ভাজি, চিংড়ি মাছ দিয়া করল্লা, বড় মাছের ঝোলে অন্য তরকারির সঙ্গে দুই একটা করল্লা—এই সকল খাবার আমাদের বাসায় খুব কমন। এমনকি চ্যাপা শুটকির তরকারিতেও অন্য সব সবজির সঙ্গে আমরা করল্লা দেই। কিন্তু গরুর মাংস দিয়া করল্লা খাওয়া দূরে থাক, জীবনে শুনিও নাই। না শুনার কারণ হইলো আমগর আশেপাশের লুকেরা সাধারণত ট্র্যাডিশনালের বাইরে কিছু খাইতে চান না। খাদ্যের ব্যাপারে অন্তত আমগর পরিবারের অধিকাংশ মানুষই কট্টর।

আমার বোইন একবার আনারস দিয়া ইলিশ মাছ রানছিল, এক কাজিন তা খায়া কইছিলেন—“ইলিশ মাছটারে নষ্ট করছে।” অথচ ওইটা অত্যন্ত উপাদেয় খাদ্য। আমার আম্মা মসুর ডাইলে পাঁচফোড়ন দিয়া বাগাড় (সম্বর) দেন দেইখা আমার এক চাচা খুব বিরক্ত হইতেন। কইতেন, “ডাইলের মধ্যে অত গয়না পিন্দানের কাম কী।”

প্রথম যখন নুডলস রান্ধা হইছে বাসায়, আমার দাদি জোবেদা খাতুন কইছিলেন, “এইগুলা হালালই না হারামই।” পাঙ্গাস মাছে তরকারি দেওন যায় কি যায় না তাই নিয়া আম্মা আমার এক কাজিনের লগে তর্ক কইরা টেবিল ফাটায়া ফেলছিলেন প্রায়। আমি নিজেও প্রথমবার ইলিশ পাতুরি খাইতে গিয়া বিরক্ত হইয়া কইছিলাম, “মাছভাজিরে জামা পরাইছে কেন।” ঘাড়ত্যাড়া মমেনসিঙ্গারা গরুর গোশের লগে করল্লা শুনলেই উইঠ্যা দৌড় দিব, পাতে তুলা দূরে থাউক।

louhitto-5-4

louhitto-5-5
তন্ময়ের রান্না মুরগী আর পাস্তা।—লেখক

আমার শ্বশুরবাড়িতেও ননট্রাডিশনাল রান্নার খুব একটা কদর নাই। তবে মমেনসিঙ্গাগর লগে উনাগর পার্থক্য হইল পছন্দ না হইলেও উনারা খাবারটা খায়া নেন। আমি একবার প্রচুর সবজি দিয়া মাছের পাতলা ঝোল রানছিলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কেউ সেইটা পছন্দ করে নাই, আমার জা পাতেও তুলেন নাই। সেইখানে সবাই ভাজি বা কষানি মাছ খায়, ঝোল হইলেও সেইটা ঘন ঝোল, সবজি দিলেও শুধু আলু আর পটল কিংবা আলু আর বেগুন। আমি বেগুন থাইক্যা শুরু কইরা কাঁকরোল, চিচিঙ্গা, শশা এমনকি করল্লাও দেই, আসলে বাসায় যা যা সবজি থাকে সবই দিয়া অল্প মশলা দিয়া ট্যালট্যালা ঝোল বানাই।

পরীক্ষামূলক কিংবা ভিন্নধর্মী রান্না আমাদের বাড়ির অনেকেই পছন্দ না করলেও আমি আর তন্ময় প্রায়ই এমন রান্নার চেষ্টা করি যা আগে কোনো দিন করি নাই। তাই বইলা কাঁচামরিচ পিঁয়াজ দিয়া ঝাল সেমাই বা কোকোলা নুডলসের পায়েস রান্ধি নাই জীবনে।

তবে বিফ ভিন্দালুই আমার কাছে গরুর গোশত রান্ধার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি। ওইটাতে এক টেবিল চামচ সিরকার সঙ্গে হলুদ, জিরা, ধনিয়া আর শুকনা মরিচের গুড়া মিশায়া মাংসটারে মাখায়া রাখতে হবে। পেঁয়াজ, রসুন আর বেশি কইরা আদা দিয়া কষাইতে হবে। কষানো হইয়া গেলে সরিষা বাটা দিতে হবে। সরিষা বাটার পরিমাণ হইল এক কেজি মাংসে আধা চা চামচ সরিষা বাটা। আমি অবশ্য মাতব্বরি কইরা সরিষার তেলও দেই। গোলমরিচের গুড়াটা অপশনাল, চাইলে দিতে পারেন। নামানির আগে কাঁচা মরিচ দিতে হবে। ফক্স লাইফে যে মহিলা রানতেছিলেন উনি আবার এলাচ দারচিনি আর লবঙ্গও দিছিলেন, আমি দেই না কারণ আমি সিদ্দিকা কবীররে ওস্তাদ মানি। উনি যেহেতু গরম মশল্লা ছাড়া ভিন্দালু রান্ধা যায় কইছেন তাই আমার বিশ্বাস গরম মশল্লা ছাড়াও রেড মিট রান্ধা সম্ভব।

সিদ্দিকা কবীরের রেসিপি বই দেইখা অন্ধভাবে রানলেও তা খাইতে ভালই হয় বইলা আমার একটা অন্ধ বিশ্বাস আছে। রান্নার ব্যাপারে বিশ্বাসগুলা অন্ধই হয়। আমার খালাতো বোন রিতুর গায়ে হলুদে আমি পঞ্চাশজনের জন্যে গরুর মাংস রানছিলাম। আমার ছোটখালা লুৎফুন্নাহার বেগম একটু পরে পরে আইসা কইতেছিলেন, “জায়ফল জৈত্রী দিবি না?” উনার ধারণা অই দুই মশলা ছাড়া গরুর মাংস রান্ধা যায় না। তাই টেনশনে পইড়া গেছিলেন, জায়ফল জৈত্রী না দেওয়াতে না আবার গায়ে হলুদের খাওন নষ্ট হয়। আমি অবশ্য অইগুলা না দিয়া উলটা উনারেই ধমক লাগাইছিলাম। আমার খালারা দুইজনেও আমার মায়ের মতন রান্নায় ওস্তাদ। আমার বড় খালা খালেদা রহমানের রান্না খাইয়া আমরা কেউ যদি বলি, “বড়খালামনি, এটা খাইতে খুব মজা হইছে” উনি হাইসা বলেন, “আমি মজা কইরাই রান্ধি।” ইদানীং তন্ময়ও এই ডায়ালগ দিতাছে, বন্ধু ও আত্মীয়মহলে তার রান্নার বেশ সুনাম আছে।

বাম থাইকা আমার মা মাসুদা বেগম, বড়খালা খালেদা রহমান আর ছোটখালা লুৎফুন্নাহার বেগম।—লেখক
বাম থাইকা আমার মা মাসুদা বেগম, বড়খালা খালেদা রহমান আর ছোটখালা লুৎফুন্নাহার বেগম।—লেখক

আমার মা আর ছোটখালার নামের পিছনে বেগম থাকলেও বড়খালার নামে রহমান। সেইটা স্বামীর নামের শেষাংশ যুক্ত কইরা হইছে। তবে উনারে আমার আব্বা ডাকতেন ‘মোতির মা’ বইলা। এইটা নাকি উনার ছোটবেলার ‘পেট নেইম’। আব্বার ভাষ্যমতে গ্রামে সুন্দর দেখতে মেয়েদেরে কারো না কারো মা বইলা ডাকার প্রচলন ছিল। এতে লোকের কুনজর থাইকা বাচন যাইতো বইলা উনারা ভাবতেন। আমার নানি সারা খাতুনের ডাকনাম ছিল ‘নওশার মা’। বড়খালামনিরে ‘মোতির মা’ বইলা ডাকার সাহস আব্বা ছাড়া আর কারোই ছিল না। উনি ভাইবোনদের মধ্যে সবচাইতে বড় আবার শ্বশুরবাড়িতেও বড় বউ। নিয়ম অনুযায়ী আব্বারও উনাকে মশকরা কইরা কিছু ডাকার কথা না। স্ত্রীর বড় বইনের লগে ঠাট্টা ফাইজলামির সম্পর্ক হয় না, ছোট বইনেগর লগে হয়। আমার আব্বা অত নিয়ম মানতেন না। উনি উনার দুই জ্যাওয়াইশরেই তুমি বইলা সম্বোধন করতেন।

আমার বড়খালার হাতে এইরকমই জাদু যে উনি ভাজাকাঠিতে টমেটো গাইথা সেইটা গ্যাসের আগুনে পুড়াইয়া খাছত্যাল (সরিষার তেল),পিঁয়াজ আর কাঠখুলা ভাজা শুকনা মরিচ দিয়া মাখাইয়া দিলে সেইটা অমৃতের মতন লাগে। বড়খালামনি শুধু শুকনা মরিচের ভর্তাও করেন, পিঁয়াজ আর সরিষার তেল দিয়া, সেইটার মতন অসাধারণ খাদ্য আমি আর খাই নাই। পেটে গ্যাস্ট্রিক আলসার হইয়া যাইবার উপক্রম হইছে বইলা আমি সেই ভর্তা আর কোনো দিন খাই নাই, বানাবার চেষ্টাও করি নাই। তাছাড়া আমি নিশ্চিত ওই ভর্তা আমার হাতে অত মজা হবে না। একেক জনের হাতে একেক রান্নার স্পেশালিটি থাকে।

louhitto-5-11
নেশেস্তার হালুয়া ও গোলাপ পিঠা, দুইটার একটাও শাশুড়িরটার মতন হয় নাই।—লেখক

louhitto-5-12
আমার শাশুড়ি যেমন নেশেস্তার হালুয়া বানান, উনার ইন্সট্রাকশন হুবুহু ফলো কইরাও আমি সেইরকম বানাইতে পারি নাই। তন্ময় অবশ্য বলে এইটা প্র্যাকটিসের ব্যাপার। উনি জিনিসটা বানান তিরিশ বছর ধইরা। শুধু দুই ঈদে বানায়া থাকলেও অন্তত ষাইটবার বানাইছেন। আমি তিনবারেই সেইরকম বানাইতে পারবো এমনটা আশা করাও ভুল।

আমি এই কথার লগে পুরাপুরি একমত না। ‘যার না হয় নয়ে, তার না হয় নব্বইয়ে’ বইলা একটা কথা আছে। তিনবারে না হোক, পাঁচছয়বারে আমি যদি লোকের সামনে সার্ভ করার উপযোগী নেশেস্তার হালুয়া বানাইতে না পারি তাইলে ধইরা নিতে হবে সেইটা আমার দ্বারা কোনোদিনই সম্ভব হইবো না।

নেশেস্তার হালুয়া আমার খুব প্রিয় খাদ্য না, তন্ময়ের অত্যন্ত প্রিয় বইলা সেইটা শিখার চেষ্টা আমি করছিলাম। শেক্সপিয়ারের ‘ওথেলো’র একটা হিন্দি ভার্সন আছে ‘ওমকারা’। ডেসডিমোনার চরিত্রটার নাম কী ছিল তা মনে নাই, কারিনা কাপুর অ্যাক্টিং করছিলেন। উনি সেইখানে কী একটা হালুয়া রানতেছিলেন, উনারে কঙ্কনা সেন শর্মা (উনার পর্দার নামটাও মনে নাই) জিগাইলেন, তুমি অত রান্ধাবাটি শিখলা কেমনে?

কারিনা জওয়াব দিলেন, আমার দাদির কাছ থাইক্যা। দাদি বলতেন, “পুরুষের দিল পর্যন্ত পৌঁছানের রাস্তা হইলো তাদের পেট।”

কঙ্কনা আবার কইলেন, আমি ত জানতাম পেটের একটু নিচে দিয়া।

বলা হইয়া থাকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ রাঁধুনি হইলেন দ্রৌপদী। উনার যেহেতু পাঁচজন স্বামী ছিলেন, সকলেরে দ্বিতীয় পন্থায় সন্তুষ্ট করা নিশ্চয়ই উনার পক্ষে সম্ভব হইতো না। উনি রাইন্ধ্যা বাইড়া খাওয়াইয়াই পঞ্চপাণ্ডবেরে তুষ্ট রাখতেন বইলা মনে হয়। সূর্যদেব (কিংবা অন্য কোনো দেবতা) নাকি দ্রৌপদীরে কী এক পাত্র দিছিলেন যেইটা থাইকা খাদ্য কখনো ফুরাইত না, যতক্ষণ না দ্রৌপদী নিজে ওই পাত্রের খাদ্যের শেষটুক খায়া পাত্র ধুইয়া রাখতেছেন। সেইজন্যে সকলের খাওয়া শেষ হইলে উনি খাইতেন। সেই থাইকা মনে হয় নিয়ম হইছে বাড়ির বউয়েরা সকলের খাওয়া শেষ হইলে পরে খাইবো।

বউরা যত ভালা রান্ধুক, দ্রৌপদীর মাপের রাঁধুনি না হইলে স্বামীর মন পাইবার আশা নাই। আব্বার বন্ধু নুরুল আমিন কাকার স্ত্রী মীরা কাকি অসম্ভব ভালো রান্না করেন, যা রান্ধেন তাই স্বাদ হয়। তবু নাকি কাকা কইতেন, “মায়া যে দুইটা চ্যাঁপা দিয়া অনেকগুলা তরকারি দিয়া রানতো, হেইরম আর খাইলাম না।”

নুরুল আমিন কাকা ও মীরা কাকী। উনারা শুধু মানুষ ভালো তাইনা, দুইজনেই দেখতেও অত্যন্ত সুন্দর ।—লেখক
নুরুল আমিন কাকা ও মীরা কাকী। উনারা শুধু মানুষ ভালো তাইনা, দুইজনেই দেখতেও অত্যন্ত সুন্দর।—লেখক

গ্রামের সম্বোধনে মারে মায়া ডাকতেন উনি। আর আমাদের ডাকতেন আম্মা। অত স্নেহশীল দম্পতি আমি আর দেখি নাই। কাকার এই গল্প আম্মার কাছে শুনছি। উনি আমার অত্যন্ত প্রিয় মানুষ বইলা আমি এইটারে উনার দোষ হিসাবে দেখতে পারি নাই। একটা ছেলে সারাজীবন তার মায়ের হাতের রান্না মনে রাখবে এইটাই স্বাভাবিক। আর তাছাড়া মীরা কাকির বাপের বাড়ি সম্ভবত ঢাকায়। উনি পোলাও কোর্মা কাবাব যতই ভালো রান্ধুক, হইতে পারে উনার হিদলের (চ্যাঁপা শুটকির অন্য নাম) তরকারি ঠিক মমেনসিঙ্গাগর মনমত হইতো না।

বউয়ের রান্না বিষয়ে একটা বুলগারিয়ান গল্প আছে। এক লোকের কিছুতেই বউয়ের রান্ধা পছন্দ হয় না। তার বউ নানান পদের রান্ধা শিখে কিন্তু কিছুতেই স্বামী খুশি না। খালি কয়, “তুমি আমার মায়ের মতন রান্না আর শিখতে পারলা না।” একদিন স্বামীর কয়েক বন্ধু আসবে, সে আগেভাগেই কইয়া দিলো, “খুব ভালোমত রান্না করবা কিন্তু।” বউ বেশি সাবধানে রানতে গিয়া মাংস পুড়ায়া ফালাইল। স্বামী বাসায় আসার পরে বউ খুব ভয়ে ভয়ে আছে, না জানি কী হয়। স্বামী মাংসের হাড়ির ঢাকনা তুইল্যাই খুশি হইয়া গেল, “এতদিনে তুমি আমার মায়ের মতন কইরা মাংস রানতে পারছো।”

আসল ব্যাপার হইল, যে যেটা খায়া অভ্যস্ত তার কাছে সেইটাই ভালো খাবার।

রান্ধাবাড়া লইয়া আমার কোনো বাড়াবাড়ি নাই। তরকারিতে বাটা মশলা না দিয়া পাতলা ঝোল রান্ধি দেইখ্যা আমার মা আমার রান্না খাইতে চান না। রোজ রানতে আমার ভালোও লাগে না। মাঝে-মইধ্যেই আমি দোকানের খাবার খাইয়া চালাইয়া দেই। সুধীর ঘোষের পাশেই জানকী নাগ নামে আরেক মিষ্টির দোকান আছে। অই দোকানে সন্ধ্যায় আটার রুটি পাওয়া যায়, প্রায়ই সেই আটার রুটি দিয়া আমরা ডিনার সাইরা ফেলি।

louhitto-5-a
সুধীর ঘোষ, একটা অসাধারণ দোকান, এখানের সকল খাদ্যই সুস্বাদু।—লেখক

সুধীর ঘোষ আমার সবচাইতে প্রিয় মিষ্টির দোকান। সেইখানে শীতকালে খেজুর গুড়ের সন্দেশ বানায়। আর টক দই যেইটা পাওয়া যায় তা অল্প চিনি ছিটাইয়া খাইলে তা রীতিমত বেহেশতি একটা খাবারে পরিণত হয়। আঠারো বাড়ি মোড়ে আরো একটা দোকান ছিলো ‘শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’, সেই দোকানের আমৃত্তি ছিলো এরকম বেহেশতি। আমরা যখন ছোট ক্লাসে পড়ি তখন সেই আমৃত্তি পাঁচ টাকা পিস আর চমচম বা মালাইকারি তিন টাকা। বড় ক্লাসে উঠতে উঠতে ওইটার দাম একটু বাড়ছিল কিন্তু শেষমেশ দোকানটাই উইঠা গেল।

আমি খুবই দুঃখ পাইছি শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের বিলুপ্তি দেইখা। ওইটা অনেক পুরানা দোকান ছিল। আব্বা যখন মৃত্যুঞ্জয় ইশকুলের ছাত্র ছিলেন, পাকিস্তান আমলে, ওই সময়েও ওই দোকান প্রসিদ্ধ ছিল, তখন অবশ্য মুসলমানগরে দোকানের ভিতরে ঢুকতে দিত না, বাইরে দাঁড়াইয়া জিনিস কিনতে হইত। প্রথমে যখন শ্রীকৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডাররে ভাঙতে দেখলাম, আমি ভাবছিলাম হয়তো দোকান রেনোভেট করবে, পরে দেখি না, ওইখানে একটা পাঁচতালা দালান উঠছে, নিচের তালায় যেইখানে শ্রীকৃষ্ণ ছিল সেইখানে একটা ওষুধের দোকান, আমি এত কষ্ট পাইছি যে বইলা বুঝাইবার পারতাম না।

কয়দিন আগে দেখি আদর্শ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের দোকানও ভাঙতেছে, উনারা অবশ্য দোকান উঠায়া দিতেছেন না, পাকা করতেছেন। আগের একচালা টিনের দোকানের বদলে এখন টাইলস মারা ঝকঝকা চকমকা দোকানঘর হইব। দেখা যাইব দোকানের ভিতরেও বাথরুমের দেওয়ালের মতন টাইলস মারা, মাঝে-মইধ্যে দুই একটা টাইলসে রাধাকৃষ্ণের ছবি, মুসলমান দোকানে যেমন কাবাঘরের ছবিওয়ালা টাইলস থাকে (মিনার হোটেলে বা অন্য কোনো দোকানে দেখছি আমি কাবাঘরের ছবিঅলা টাইলস)।

রাজুঘোষে এই বছর এপ্রিল, মানে বৈশাখের আগে পর্যন্ত সিঙ্গারার দাম ছিলো ২ টাকা।—লেখক
রাজুঘোষে এই বছর এপ্রিল, মানে বৈশাখের আগে পর্যন্ত সিঙ্গারার দাম ছিলো ২ টাকা।—লেখক

ইদানিং রাজু ঘোষ নামের সিঙ্গারার দোকানে এই রকম আধুনিকীকরণ হইছে। আদর্শ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারও আমার অতি প্রিয় দোকান। ওইখানে একটা পরোটা পাওয়া যায়, সকালের পরোটা সারাদিন রাইখা দিলেও শক্ত হয় না, সন্ধ্যাবেলাও খাওন যায়, এক্কেরে বাসার পরোটার মতন। বড়কালিবাড়ির গেইটের পাশের তিনটা খাবারের দোকানের মাঝেরটা হইল আদর্শ, বাকি দুইটার নাম মনে নাই। লোকনাথ বা জয়কালী ধরনের কিছু হইব, উল্টাদিকেই লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবার আশ্রম।

ছোটবেলা কালিবাড়ি প্রিক্যাডেটে পড়ার পরে ওই এলাকার দোকানে খাই নাই। বড় বয়সে বহুদিন পরে গেছি আমাদের পাশের বাসার কণিকাদিদি আর তার বর সমীর দাদাদের সঙ্গে বাসন্তী দূর্গাপূজা দেখতে গিয়া। মমেনসিং অল্প কয়েকটা জাগায় বাসন্তী দূর্গাপূজা হয়। কণিকাদিদির কাছে সেইদিন জানতে পারছিলাম যে আসলে দূর্গাপূজা নাকি বসন্তকালেই হইত। রামচন্দ্র লঙ্কায় যুদ্ধে যাইবার আগে দেবীর কাছে শক্তির জন্যে প্রার্থনা কইরা শরৎকালে দূর্গাপূজা করছিলেন, অসুর বধের মতন রাবণকেও যাতে পরাভূত করা যায়। সেই থাইকা শারদীয়া পূজার প্রচলন হইছে। তাই এরে অকালবোধনও বলে।

দূর্গার তৃতীয় নয়নের ব্যাপারটাও রামচন্দ্রের পূজার সঙ্গে জড়িত। ১০৮টা নীলপদ্ম দিয়া নাকি পূজা করার কথা ছিল, রামচন্দ্র বিশ্বসংসার তন্ন তন্ন কইরা ১০৭টা নীলপদ্ম ম্যানেজ করতে পারছিলেন, একটা কম পড়ছিল, তখন রামচন্দ্র তার নিজের চোখ উপড়াইয়া দিয়া একটা পদ্মের অভাব পূরণ করতে যান। দূর্গা রামের এহেন ভক্তিতে তুষ্ট হইয়া যান এবং রামের উৎসর্গকৃত চোখ নিজের কপালে লাগাইয়া নেন, কিন্তু রামচন্দ্রের চোখ তাই বইলা অন্ধ হইয়া যায় না, দেবীর কৃপায় তাও অক্ষত থাকে। এই গল্প আমি কোথাও পড়ি নাই,আমার বন্ধু ও একসময়ের সহকর্মী  লুবনা জেবিন লোপার কাছ থাইকা শুনছি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কেউ কথা রাখেনি’ কবিতায় ১০৮টা নীলপদ্মের কথা সারাজীবনই শুইনা আসছি, ইতিহাসটা জানতাম না। দূর্গা কেন ১০৮টা নীলপদ্মই চাইছিলেন তা অবশ্য লোপা বলে নাই। রামচন্দ্র নিঃসন্দেহে আর্য ছিলেন, সম্ভবত উনার চোখের রঙও নীল ছিল, তাই নীলপদ্মের অভাব পূরণ করার জন্যে চোখ দিতে চাইছিলেন। অবশ্য চোখ অনেক সুন্দর হইলে এমনিতেই পদ্মের লগে তুলনা করা হয়। রামের চোখ তো পদ্মের মতনই ছিল নিশ্চয়ই, চোখের মনির রঙ কালোই হোক বা নীলই হোক।

আদর্শ মিষ্টান্ন ভান্ডারে মিঠুর বড় ভাই
আদর্শ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে মিঠুর বড় ভাই প্যাড়া বানাইতেছেন। নাদিয়া ইসলামের ময়মনসিংহ গীতিকা অ্যালবাম থাইকা নেওয়া ছবি।—লেখক

কণিকাদিদি আর সমীরদাদার একটা মেয়ে ছিল যার ডাকনাম তুলতুল। আমি প্রকৃতি আর আমার ফুপাতো বোন সাবা তুলতুল আর তার মাবাবার সঙ্গে এক মার্চ মাসে বাসন্তী দূর্গাপূজা দেখতে গিয়া আদর্শতে পরোটা আর আলুর দম খাইছিলাম। সেই থাইকা আদর্শর পরোটার রীতিমত ভক্ত হইয়া গেছি আমি। পনের পনের তিরিশ টাকা আপডাউন রিকশাভাড়া খরচ কইরা ওই পরোটা নিয়া আইসা বাসায় নাশতা খাইছি বহুদিন। তন্ময় যখন প্রথমবার ময়মনসিং আসলো আমার সঙ্গে দেখা করতে, আমি তারে আদর্শতে পরোটা খাওয়াইতে নিয়া গেলাম। তন্ময় ওইখানেও এক মামারে বাইর কইরা ফালাইল, যার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

আদর্শতে রসমালাইও ভালো পাওয়া যায়, দোকানের কারিগরের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া হওনের লাইগ্যাই হয়তো। এখন অই দোকানের মামারা তন্ময়রে খুব খাতির করে, পারলে আমারেই মামি ডাকে। দোকানের এক মালিক মিঠুও আমাদেরে খুব খাতির করে, মিঠুর কথা শুনলে অবশ্য মনে হয় না তার আদি বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কিংবা মমেনসিং, মনে হয় তার বাড়ি কইলকাতা। আমরা একবার গরমের সময় মালাইকারি কিন্যা নিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাইতাছি, নষ্ট হইয়া যাইব কিনা সেই সন্দেহ করাতে মিঠু কইল, “কদ্দূর অব্দি যাবেন দাদা?” পুরাই ক্যালকেশিয়ান ভাষা, বাংলাদেশের মানুষ ‘অব্দি’ কয় না।

আমার নানির বাড়ি রামকৃষ্ণ মিশন রোডের যে জায়গায় সেইখানের প্রতিবেশিরা অনেকেই হিন্দু। দেশভাগের সময় উনাদের অনেকের আত্মীয়স্বজন মাইগ্রেট করছেন। তাই পাড়ার অনেক পুলাপানের কাকার বাড়ি, পিসির বাড়ি কইলকাতা। অইসকল পুলাপানেগরে খেপানের লাইগ্যা মুসলমান বাইচ্চারা গপ্প বানাইছে, গপ্প মানে অ্যানেকডট, সত্যির মতন কইরা কওয়া হয়। হয়তো এক বাচ্চার নাম পুলক, কইতে হইবো এমনে—পুলক কলিকাতা থাইক্যা আয়া কী কয় হুনছস? “গঙ্গার জলে নাইতে গিয়েছিলুম, নাইম্যা দেহি গ্যাদগ্যাদা প্যাঁক।”

শুনতে সাম্প্রদায়িক শুনাইলেও মিঠুর মুখে ‘অব্দি’ শুইনা আমার ওই গপ্পের কথা মনে পড়াতে আমি হাইস্যা ফালাইছিলাম। দাদারা কী খাইতে কইলকাতার ভাষা নকল করেন তা আমার মাথাত হান্দায় না।

আরও বেশি বিরক্ত লাগে ওইপার থাইকা আসা মাইগ্রেটেড মুসলমানেগর ভাষা লইয়া মাতব্বরি দেখলে। আঠারোবাড়িতে একটা দোকান আছে ‘দি নদীয়া শাল রিপেয়ারিং হাউজ’। বহুত পুরানা দোকান তাই ‘ড্রাই ক্লিনার্স’ না কইয়া শাল রিপেয়ারিং নাম দিছে। ওই দোকানের সামনে এক অতি সুন্দরী বৃদ্ধা মহিলা শান্তিনিকেতনি ব্যাগ লইয়া বাটার চপ্পল পায়ে সাদা খোলের তাঁতের শাড়ি পিন্দা বইয়া বইয়া মুকুলের দোকানের চা খান, উনারে দেখলে হঠাৎ কইরা মনে হয় সুচিত্রা মিত্র। উনি বর্তমানে মমেনসিঙ্গা ভাষায় খাইছস, করছস, যাইবাম, খাইবাম বলেন কিন্তু আসলে উনার আদি ভাষার তুলনায় এই ভাষাটারে তুচ্ছ জ্ঞান করেন। অবশ্য মাইগ্রেটেড কিংবা সেটেলারদের নিয়মই হইল নতুন জাগায় আইসা হয় অ্যাসিমিলেশনের মধ্যে দিয়া যাইব নাইলে নিজের আদি নিবাস বা তার কোনো না কোনো কিছু নিয়া গপ্প মাইরা নিজেগরে লোকালগর তুলনায় বেটার প্রমাণ করনের চেষ্টা করব। আমগর এক প্রতিবেশি কৃষ্ণা কেবিনের মিষ্টি খাইতেন না, কারণ কৃষ্ণা কেবিনের উলটা দিকে ব্রথেলে ঢোকার রাস্তা। কৃষ্ণা কেবিনের পানি যেই কল থাইকা আনে ব্রথেলের মেয়েরাও নাকি একই কল ব্যবহার করে। সেই ঘিন্নায় উনি ওই দোকানের ঘোর বিরোধী ছিলেন। মজার ব্যাপার হইল উনার বাড়ি নারায়ণগঞ্জ এবং যে সময়ের কথা বলতেছি তখন টানবাজার উচ্ছেদ হইয়া সেইখানকার বাসিন্দারা শহরে ছড়াইয়া পড়ছে। নিজের এলাকার প্রতি টান থাকা ভালা, তাই বইলা অন্যরে তুচ্ছ করা কামের কথা না। উনি উনার দেড় বছরের ছেলেরে শীতলক্ষ্যার ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিউশনে বিষাক্ত পানিতে চুবায়া আইনা স্কিন ডিজিজ বান্ধ্যাইয়া আনছিলেন, কিন্তু বদনাম করনের সময় এমন ভাব করেন যে মমেনসিঙ্গের থাইকা নোংরা ময়লা আর কোনো জাগা নাই।

আমার অনেক সহকর্মীও মমেনসিঙ্গের সবকিছুতে নাক সিটকান, “আপনাদের রাস্তা এত চিপা কেন, খুলনার রাস্তা কত চওড়া”, “আপনাদের এখানে বাসা ভাড়া এত বেশি কেন, রাজশাহীতে বাসা ভাড়া কত কম”—ইত্যাদি নানা অভিযোগ উনারা আমার কাছেই করেন।

আমার তেঁতুল দেওয়া আলুর দম, দেখতে ভালো না হইলেও খাইতে খারাপ না।—লেখক
আমার তেঁতুল দেওয়া আলুর দম, দেখতে ভালো না হইলেও খাইতে খারাপ না।—লেখক

আমি লোকাল কিন্তু শহরের মেয়র ত আর না! শহরের রাস্তাত গরু বইয়া থাকে, রেস্টুরেন্টের বয়রা সার্ভিস খারাপ দেয়, আড়ং এর শোরুম নাই ইত্যাদি সকল বিষয়ে উনাগর অভিযোগের অন্ত নাই। খুলনার ভাড়া কম বলার সময় উনাদের মনে থাকে না যে ওইখানে গ্যাসের সিলিন্ডার কিনতে হয় আর এইখানে নির্দিষ্ট বিলে আনলিমিটেড গ্যাস ব্যবহার করতেছেন। রাজশাহীর প্রশস্ত রাস্তার কথা বলার সময় ওইখানের চান্দিফাটা গরম আর হাড্ডিকাঁপাইন্যা শীতের তুলনায় মমেনসিঙ্গের নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুর কথা ভুইল্যা যান।

আমার বলতে ইচ্ছা করে “ভাই এত ভালো জাগা রাইখা বিশ্রী মমেনসিং শহরে আইছেন কেন মরতে? আমার বাড়ি অত ভালা জাগায় হইলে তো আমি নিজের শহরের চওড়া রাস্তাত বইয়া ভিক্ষা করতাম, মমেনসিং যাইতাম না।” কিন্তু আমরা কিনা অতিথিপরায়ণ, তাই অত রুক্ষ কথা না কইয়া কই, “আসলে আপনেরা আসার আগে রাস্তায় অত ভিড়ও ছিল না আর বাসাভাড়াও সস্তা ছিল, বাইরের লোক আসাতে ডিমান্ড আর সাপ্লাইয়ে গরমিল হইয়া সবকিছুর দাম বাইড়া গেছে।”

সুচিত্রা মিত্রের মতন দেখতে ফর্সা আর সাদা বয়কাট চুলের ভদ্রমহিলার স্নবারি কেমনে টের পাইলাম বলি, একবার অর্পণা আপু আর আমি গেছি নদীয়াতে শাড়ি ড্রাই ক্লিন করাইতে। অর্পণা আপু জিগাইল, “এই দোকানের নাম নদীয়া কেন?” আমি অনুমানে কইলাম, “উনাদের বাড়ি আগে ওইখানে ছিল দেইখা।” অর্পণা আপু বলল, “নদীয়া জায়গাটা কোথায়?” আমি কইলাম, “কলকাতার আশেপাশে কোথাও হবে।” তখন দোকানের সামনে চেয়ারে বসা মহিলা কইলেন, “নদীয়া কলকাতার আশেপাশে না, ওটা আলাদা একটা জেলা, যে জায়গার ভাষা সবচে’ শুদ্ধ আর সুন্দর সেটাই নদীয়া।”

louhitto-5-9
আমার বড়খালা খালেদা রহমান।—লেখক

আমার কাছে পশ্চিমবঙ্গ হইল পশ্চিমবঙ্গ, জেলা বর্ধমান হইলেই কী, বীরভূম হইলেই কী আর হুগলী হইলেই কী? সবই আমার কাছে কলকাতার আশেপাশের জাগা। নদীয়া ইন্ডিয়ার একটা জেলা যে কইনাই এই না বলে বেশি! ভদ্রমহিলার কথা শুইনা কইতে ইচ্ছা করল, “ম্যাডাম, ভাষাবিদ ব্লুমফিল্ড কইছেন কোনো ভাষা অন্য ভাষার তুলনায় বেশি সুন্দর বা কম সুন্দর হয় না, যে এলাকার লোক যে ভাষায় কথা বলে সেই লোকেদের জন্যে সেইটাই মোস্ট অ্যাপ্রোপ্রিয়েট ভাষা, আর নদীয়ারে স্ট্যান্ডার্ড ধইরা অন্যান্য ভাষারে অশুদ্ধ বলাটাও উপনিবেশিক আচরণ।” কিন্তু অত স্মার্ট অত সুন্দরী আর অত বয়স্ক মহিলার সামনে গুছায়া কথাগুলি কইতে পারলাম না। ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়া চইলা আসলাম।

আবার মনে করুইননা য্যা কইলকাতার লুকেদের প্রতি আমার কুনো রাগ আছে কিংবা তাগরে আমি অপছন্দ করি, বরং উলটা এক পদের আগ্রহই বরাবর ছিল। ছোটকালে কফিহাউজের আড্ডার গান শুইনা ওই জাগায় যাওনের খুব ইচ্ছা হইছে। পশ্চিমবাংলার মানুষের মধ্যে ‘তুমি’ ডাকার প্রবণতা বেশি, এইটাও আমার ভালা লাগে। সুবীর মজুমদার নামে কলকাতার এক ছেলে আমার ফেইসবুকে আছে, একদিন ইনবক্সে সে দুই একটা কথা ইংরাজিতে লিখ্যাই পরে ইংরাজি হরফে লিখলো’, “বাংলায় বলো না দিদি।” আমার নিজের তুই/তুমি বলার অভ্যাস বেশি ছিল। একবার এক আত্মীয়ের বাচ্চারে ‘তুই’ বলাতে উনাদের মধ্যে একজন আপত্তি করলেন, যুক্তি হিসাবে কইলেন তাইলে নাকি বাইচ্চাও মাইনষেরে তুই ডাকা শিখবে।

উনারা ধইরা নিছেন তুই আসলে তুচ্ছার্থে ডাকা হয়। আমি এরপর থাইকা শিশুদেরে ডাকার আগে সাবধান হইয়া বুইঝা লই সেই পরিবারের মনোভাবটা কী রকম। দাদাগিরিতে সৌরভ গাঙ্গুলি বাচ্চাদেরে ‘তুই’ বলেন আর বাচ্চারা উনারে তুমি বলে, এইটা আমার ভালা লাগে।

কনের পাশে বসা বৃদ্ধা আমার নানী সারা খাতুন
কনের পাশে বসা বৃদ্ধা আমার নানি সারা খাতুন। উনি ছবি তুলতে চাইতেন না। পুরানা অ্যালবামে দুই একটা পাওয়া গেছে।—লেখক

বাচ্চাগর মুখে অতি ফর্মাল ডাক আমার কানে কৃত্রিম শুনায়। গরীবলোকের বাচ্চাগরে অনায়াসে ‘তুই’ ডাকা যায়, যেহেতু অগর মাবাপেরা মাইন্ড করল কিনা তাতে তেমন কিছু আয়া যায় না, কিন্তু মধ্যবিত্তের বাচ্চাগরে ডাকনের সময় কত কিছুই ভাবা লাগে। ব্যাপারটা মজারই।

ওই বাংলার খাবারগুলার নামও খুব সুন্দর, ছানার ডালনা, পটলের দোলমা, হিঙের কচুরি। এই তিন খাদ্যের মধ্যে পটলের দোলমাই আমি খাইছি। আম্মা একবার বানাইছিলেন, পটলের ভিতরে মাছের কিমা দেওয়া থাকে।

কইলকাতার আরও বহু কিছু আমি ভালা পাই। যেমন মহীনের ঘোড়াগুলির গান। উনারা ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’ নামে একটা গান করছিলেন, মহুয়াপালার “নয়াবাড়ি লইয়ারে বাইদ্যা লাগাইলো বাইঙ্গন” অংশটা সুর কইরা গাইছিলেন। উনাদের উচ্চারণে যদিও গানটা খুবই অদ্ভুত শুনাইছে। ইনফ্যাক্ট ময়মনসিংহ গীতিকার মূল টেক্সটেও ভাষাটা ঠিক মমেনসিঙ্গের হয় নাই। “হাঁস মারলাম, কইতর মারলাম, বাইছ্যা মারলাম টিয়া” শুনলেই এইডা বুঝা যায়। মমেনসিঙ্গারা জীবনেও আসরে ‘হাঁস’ কয় না।

(চলবে)

More from উম্মে ফারহানা

লৌহিত্যের ধারে (৩)

অবশ্য লোহিত মানে লাল, লৌহিত্য কি লোহিত থাইকা আসছে কিনা কে জানে!
Read More