লৌহিত্যের ধারে (৬)

খালি ছেইড়াইন আর বেইট্টাইন লইয়াই যত আলাপ।

আগের কিস্তি । শুরুর কিস্তি

অধ্যায় ৬

দেখিয়া সুন্দরী কইন্যা হুমরা বাইদ্যার নারী
ভাইব্যা চিন্ত্যা নাম রাখিলো মহুয়া সুন্দরী

বাংলাদেশ আয়তনে অত্যন্ত ছোট হইলেও এই দেশের মানুষ পুরা দেশটারে এক এবং অবিভাজ্য ভাবতে পারে না। ছোটকাল থাইক্যা শুইন্যা আসতেছি, “অমক এলাকার মানুষ খুব কিপটা”, “তমক এলাকার লুকেরা মারদাঙ্গা”, “ওই জেলার মেয়েরা খুব স্বার্থপর”, “সেই জাগার মেয়েরা লুজ ক্যারেক্টার”—এমন বহু বহু জেনারেলাইজড মন্তব্য, যেন একেকটা থিওরি, এর কুনো ব্যতিক্রম সম্ভবই না।

আমি জাহাঙ্গীরনগরে পড়তে যাইবার আগে পর্যন্ত সারাজীবন মমেনসিং থাকছি। বাইরের জেলার লুকেরা যারা কাজের জন্য বা পড়ালেখা করতে এইখানে আসছেন তাদেরে দেখছি। স্বভাবচরিত্রে মানুষে মানুষে খুব বেশি ভেদাভেদ চোখে পড়ে নাই।

মমেনসিঙ্গের লুকেদের অতিথিপরায়ণতার জন্য সুনাম আছে, কিন্তু এমন অনেক বন্ধুবান্ধব আমগর আছিল যাগর বাড়ি গেলে চা খাইতেও কইত না, বাইরে খাড়া করায়া, “দাঁড়া, আম্মারে বইলা আসি” কইয়া বাইর হইয়া আসত।

এইখানের মানুষের মধ্যে প্রচুর কিপটাও আছে যারা ব্যাংকে প্রচুর টাকা রাইখ্যাও ফকিরের মতন জামাকাপড় পিন্দা ঘুরে।

এইসব কারণে আমি কুনোদিনও জেলাভেদে লোকের স্বভাবের বৈচিত্র হইতে পারে বইলা বিশ্বাস করি নাই।

কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর গিয়া দেখলাম মানুষ এইটা বিশ্বাস ত করেই সেই অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জেলার মানুষের সম্পর্কে প্রিকনসেপশন নিয়া তাদেরে জাজ করে।

সবচাইতে অবাক হইছি মোহাম্মদ রফিক স্যারের কথা শুইনা। স্যারও ভৌগোলিক কারণে মাইনষের চরিত্রে পার্থক্য হয় বইলা বিশ্বাস করেন।

বড় ক্ষেত্রে সেইটা সত্যিও। শীতের দেশের মানুষ কিংবা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষ পরিশ্রমী হয়, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকার আর সমতলের মানুষ অতটা পরিশ্রমী হয় না কিংবা সমুদ্রের পাড়ের লুকেগর আর তিব্বতের তুষারঢাকা অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার পার্থক্যের কারণে কিছু স্বভাবগত বৈপরীত্য থাকতেই পারে।

louhitto-61
রফিক স্যারের (মোহাম্মদ রফিক) সঙ্গে আমি প্রান্তিকে দাঁড়ায়া। তখন আমি অনার্স ফোর্থ ইয়ারে পড়তাম, স্যার আমাদেরে ওয়ার্ল্ড এপিকসের কোর্স পড়াইতেন।—লেখক

তাই বইলা বাংলাদেশের নাটোর জেলা আর গাজীপুর জেলার মানুষের মধ্যে ওই রকম পার্থক্য থাকবে নাকি?

স্যার বলেন এইটা নাকি থাকে। স্যারের বাসায় মমেনসিং বাড়ি এমন এক বুয়া কাজ করত, স্যার বলতেন, “ময়মনসিংহ অঞ্চলের গৃহকর্মিনীরা অত্যন্ত পটু, তাদের রান্নার হাত খুব ভাল আর তারা মহা প্রেমিকা।”

আমি আর জিগাই নাই প্রেমের বিষয়টা স্যার কেমনে জানলেন, জিগাইলে স্যার নিশ্চয়ই আরেকটা তত্ত্ব ফাঁইদা বইতেন।

কর্মঠের ব্যাপারটা আমার বন্ধু সামিউন জাহান দোলাও বলে। তার মতে মমেনসিঙ্গের মাইয়া বিয়া করলে বউয়ের লগে বুয়া ফ্রি।

সে নিজে অত্যন্ত পরিশ্রমী বইলা তার মুখে কথাটা সত্যি শুনায়। অর বাড়ি অবশ্য কিশোরগঞ্জ জেলায়। বিভাগ ঘোষণার সময় টাঙ্গাইল আর কিশোরগঞ্জ মমেনসিঙ্গের লগে থাকতে না চাইলে কী হবে—আসলে ত জেলাগুলা বৃহত্তর মমেনসিঙ্গের অংশ।

louhitto-62
২০১০ এর কনভোকেশনে তোলা ছবি। বাম থাইকা দোলা মিথিলা আমি ও প্রকৃতি।—লেখক

কিন্তু অঞ্চলভেদে শ্রেণিকরণের সবচাইতে বিরক্তিকর ব্যাপার হইল, স্বভাবের পার্থক্যের ব্যাপারে বিশেষভাবে মেয়েদের চাল-চলন লইয়া কথাবার্তা হয়। দোলারেও মমেনসিঙ্গের ছেলেদের কোনো উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যের কথা কইতে শুনি নাই। হয়ত অর ভাই নাই দেইখ্যা জানে না।

মজার ব্যাপার হইল, শহরের ভিত্রেও পাড়াভেদে মাইয়াগর স্বভাবচরিত্রের শ্রেণিবিভাগ করা হয়।

আমার নানি সারা খাতুন প্রায়ই আমগর দুই বইনের সম্পর্কে কইতেন, “শ্যাওড়া গেরামের ছেইড়াইন না এইগুলা?”

পুরোহিতপাড়া ব্রাহ্মপল্লী চরপাড়া ধোপাখলা পুরাটাই সেহড়া অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত, শহর হইবার আগে একই গ্রাম ছিল, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে লেখনের সময় ‘সেহড়া’ লেখে আর কওনের সময় ‘শ্যাওড়া’ কওয়া হয়।

louhitto-67
“আমার ফুপাতো বোন হলির গায়ে হলুদে আমরা কয়েক শ্যাওড়া গেরামের ছেইড়াইন। প্রকৃতির গায়ে আমার ছোটকালের লেহেংগা।”—লেখক

আমার মায়ের বাড়ি রামকৃষ্ণ মিশন রোড, সেইটা সেহড়ার বাইরে। মমেনসিঙ্গে ‘মেয়ে’রে কয় ‘ছেড়ি’ আর বহুবচনে ‘ছেইড়াইন’। ‘ছ্যাড়া’র বহুবচন হইলো ‘ছ্যাড়াইন’। ‘ছ্যাড়াইন’ কিংবা ‘ব্যাডাইন’ (পুরুষের বহুবচন) লইয়া কেউ তত্ত্ব দেয় না কেন হেইডাই মাঝে-মইধ্যে ভাবি। খালি ছেইড়াইন আর বেইট্টাইন লইয়াই যত আলাপ।

মেয়েগর বৈশিষ্ট্য নিয়া, জাহাঙ্গীরনগরে থাকতে, একবার এক কথা শুইনা আমার মেজাজ চরম খারাপ হইছিল।

আমার বাড়ি মমেনসিং শুইন্যাই এক নতুন পরিচিত ব্যক্তি কইলেন, “ওরে বাবা, ময়মনসিংহ?”

আমি জিগাইলাম, “কেন? ময়মনসিংহ হইলে অসুবিধা কী?”

উনি জবাব দিলেন, “বাঘে ছুঁইলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁইলে ছত্রিশ ঘা আর মমেনসিঙ্গের মেয়ে ছুঁইলে ঘা গোনা যায় না।”

আমি কইলাম, “আপনারে ছুঁইছিল নাকি?”

উনি খুব রসিকতা হইতেছে এমন একটা ভাব নিয়া হো হো কইরা হাসতে লাগলেন।

এই পর্যন্ত শেষ হইলে ঠিক ছিল, কিন্তু শেষ হইল না। উনি ফোন করতে থাকলেন, ব্যক্তিগত আলাপ ইনায়া বিনায়া করতে থাকলেন, যাদের সংস্পর্শে আসলে ‘ঘা গোনা যায় না’ তাদেরই একজনের লগে নৈকট্য তৈরি করার চেষ্টা চালায়া যাইতে থাকলেন।

সবশেষে গালিগালাজ কইরা, উনার বউয়েরে আমি চিনি এবং তার কাছে নালিশ করমু এই মর্মে ভয় দেখায়া নিষ্কৃতি পাইতে হইল।

পরে যখন স্যারের কাছে ‘মহা প্রেমিকা’ মন্তব্য শুনলাম তখন আমি দুইয়ে দুইয়ে চাইর মিলাইতে পারলাম। ওই ব্যক্তিও আমগর জেলার এক মেয়ের কাছ থাইকা ছ্যাঁকা খায়া ব্যাকা হইয়া গিয়া এহেন ধারণা পাইছিলেন আর ধইরা নিছিলেন যে আমি যেহেতু ওই এলাকার কাজেই উনি চাইলেই উনারে প্রেম দেওনের লাইগ্যা দুই পায়ে খাঁড়ায়া যামু, উনি বিবাহিত না অবিবাহিত, দেখতে ভাল না মন্দ, মেয়েদেরে আকর্ষণ করার মতন কোনো গুণ আদৌ উনার আছে কি না সেই সব কিছুই চিন্তা করতাম না। এহেন জেনারেলাইজড প্রিকনসেপশন নিয়া কোনো বিশেষ জাগার মেয়েদেরে ‘চালু’ কিংবা ‘অনৈতিক’ হিসাবে ধইরা নেওয়াটা যত না হাস্যকর তারচে’ বেশি গাধামি। ‘মহাপ্রেমিকা’ বা ‘বিশ্বপ্রেমিকা’ জাতীয় কথাগুলি পজিটিভ অর্থে কওয়া হয় না, বলাই বাহুল্য।

আর বুয়ার ব্যাপারটাও নিগেটিভ অর্থেই বলে। আমার এক সহকর্মী কইতেছিলেন উনাদের এলাকায় নাকি মমেনসিঙ্গের বুয়া আর রিকশাওয়ালায় ভরা। হইছে কী, পিওন থালায় উঁচা কইরা ভাত আইনা দিছে, আমরা ভাত কমায়া আনতে কইছি। তো উনি কইলেন, “এখানকার মানুষ ভাত বেশি খায় তো, তাই সেই অনুপাতে দিয়েছে।”

আমি কইলাম, “এখানের মানুষ ভাত পায় তাই খায়, এমন অনেক জেলা আছে যেখানে পর্যাপ্ত চাল উৎপন্ন হয় না, তাই তারা আধাপেটা খায়া অভ্যাস করছে।”

তখন উনি রিকশাচালক আর বুয়া সংক্রান্ত তত্ত্ব দিলেন। আমি কইলাম, “কাজ করার জন্যে আপনিও ত এইখানে আসছেন।”

উনি বললেন, “সেটা আলাদা কথা।”

আমি ত ঘাড় তেইড়া মমেনসিঙ্গা, একবার কইতে শুরু করছি, সহজে কি আর ছাড়বাম? আমি কইলাম, “আলাদা হবে কেন? আপনি সাইন কইরা স্যালারি নেন আর বুয়ারা পড়ালেখা জানে না সেই জন্যে? আপনার কাছে যেমন এইটা লাইভলিহুড অদের কাছেও অদের কাজটা রুটিরুজি।”

এরপরে উনি ক্ষান্ত দিলেন।

হুমায়ুন আহমেদের কোন একটা বইয়েও একবার পড়ছিলাম মমেনসিঙ্গারা যে কাজের বুয়া হিসাবে অতি উৎকৃষ্ট এই কথা কইয়া নায়িকার বাপ নায়কেরে মৃদু অপমান করতেছেন।

মৃদুও না, মোটামুটি স্থূল অপমানই, কারন পরে উনি কইলেন, “খোঁজ নিয়ে দেখো, তোমার আত্মীয়দের মধ্যেও কাউকে না কাউকে পেয়ে যাবে যারা ঢাকাতে বুয়ার কাজ করে” কিংবা এই জাতীয় একটা কথা। মজার ব্যাপার হইল, কর্মঠ হওয়া খুব প্রশংসনীয় ব্যাপার হইলেও বেশি কর্মঠ হইলে তাদেরে নিম্নশ্রেণির মানুষ ধইরা নেওয়া হইতেছে। আমার চাচিদের মধ্যে যিনি সবচাইতে পরিশ্রমী তার আদি বাড়ি পাবনা আর মামিদের মধ্যে যিনি সবচাইতে কর্মঠ ও কষ্টসহিষ্ণু তার বাড়ি বরিশাল। কিন্তু আমাদের বাড়িতে উনাদেরে কেউ বুয়া শ্রেণির বইলা অপমান করে না।

মাইনষের মধ্যে শ্রেণিসচেতনতা থাকে, হয়ত থাকাটা স্বাভাবিকও। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে এই শ্রেণিসচেতনতা আমারে খুব বিরক্ত করে। যেমন সূচ রাজকুমারের কাহিনীতে রাজকন্যারে দাসী সাজায়া কঙ্কণ দাসী রাজকন্যা সাইজা বইলে পরে রাজকুমার দুইজনেরেই রান্না করতে কইছিল। তখন নকল রাজকন্যা, মানে আসলে যে দাসী, সে রানছিলো ডেউয়ার টক আর কচুর শাক। সত্যিকারের রাজকন্যা রানছিল কবুতরের মাংস আর পায়েস। কচুশাক সহজলভ্য খাবার বইলা কি সেইটা খাইতে স্বাদ না? নাকি ধনীরা সবসময় মাছেগুসতে খায়, শাকসব্জি খায় না? শ্রেণিপার্থক্য বুঝায়া দাসীরে ছোটলোক প্রমাণ করনের লাইগ্যা হেরে দিয়া সস্তা খাদ্য রান্ধানি হইলো—এই ব্যাপারটায় আমি দুঃখ পাইছি।

দাসী মানুষ হিসাবে খারাপ তাই সে অ্যান্টি হিরোইন, তার দারিদ্র আর মানবিক গুণের অভাবরে এক কইরা দেখাটা কেমন জানি। তার শঠতা আর ধূর্ততারে তার শ্রেণিপরিচয়ের লাইগ্যা স্বাভাবিক ধইরা নেওয়া হইল।

রামায়ণেও এই ব্যাপারটা আছিল। ভরতের মা কৈকেয়ী রামচন্দ্ররে বনবাসে পাঠানের বুদ্ধি নিজে বাইর করে নাই, কুঁজিদাসী তারে কুমন্ত্রণা দিয়া এই কাম করাইছে এমন কথা বলা হয়। যেন রাজার ঘরে জন্মাইলে আর কেউ কুটনি হইতে পারে না, খালি দাসীবান্দিরাই কুটনি হয়।

কুটনামির লগে শুধু মাইয়া মাইনষেরে জড়ানের প্রবণতাটাও খুব বাজে। ইতিহাসের সবচাইতে বড় কুটনা কোনো নারী না, পুরুষ এবং নিচা শ্রেণির পুরুষও না, রাজপুরুষ। ধৃতরাষ্ট্রের শ্যালক গান্ধাররাজপুত্র যারে শকুনি বইলা ডাকা হয়। ইংরেজি সাহিত্যেও কুখ্যাত কুটনা হইলো ইয়াগো, সেও পুরুষ।

বিদ্যাময়ী ইশকুলে যখন পড়ি, শহরের নামিদামি এক ব্যবসায়ীর মেয়ে আমাগর লগে পড়ত। হের এক কাছের বান্ধবী হের আড়ালে একদিন কইতেছিল, “অমুকরা বড়লোক হইলেও অদের মন খুব ছোট।” তখন আরেকজন তারে শুধরায়া দিয়া কইল, “বড়লোক কী, ধনী বল।” বড়লোকের বিপরীত শব্দ যেহেতু ছোটলোক, তাই অদেরে বড়লোক কইলে আমরা ব্যাকরণের নিয়মে ছোটলোক হইয়া যাই। তাই সে বড়লোক শব্দ ব্যবহারের বিপক্ষে ছিল মনে হয়। আমরা অবশ্য তখন খুবই ছোট, ফাইভ কিংবা সিক্সে পড়ি, অত জটিলভাবে ভাবার বয়স ওইটা না। হয়ত তার বাপমা তারে শিখাইছেন টাকাপয়সা যাদের বেশি আছে তাদেরে ‘ধনী’ বলতে হয়।

আম্মার কাছে শুনছি, আমার নানা আতাউর রহমান কইতেন, “হাউসে বিদ্যা, কৃপণে ধন”। মানে হইল লেখাপড়া করার খায়েশ না থাকলে লেখাপড়া হয় না আর কিপটামি না করলে ধনদৌলত হয় না। সেই হিসাবে ধনীদের ছোটলোক হইতেই হইব, কাউরে না ঠকায়া, কিপটামি না কইরা, অনৈতিক কোনো কিছু না কইরা শুধু পরিশ্রমের জোরে অনেকখানি উপরে উঠা যাইতে পারে কিন্তু বিশাল ধনী হইবার উদাহরণ জগতে বেশি নাই। গুপ্তধন পাইলে অন্য কথা।

যত যাই হোক, শ্রেণিবিদ্বেষ এবং শ্রেণিসচেতনতার বাইরে কেউ না। ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’র গীতিকারেরাও না। সূচ রাজকুমারের নায়িকা রাজকন্যা কিন্তু মহুয়া পালার নায়িকা বাইদ্যানি—এইডা দেইখ্যাও খুশি হওনের কিছু নাই। হুমরা বাইদ্যার ঔরসজাত কন্যা না মহুয়া। বাইদ্যা হেরে টুকায়া পাইছিল, নিজের মাইয়ার মতন পালছে তাই সে বাইদ্যানি হইছে।

আমরা যহন খুব ছোট ছিলাম, ঢাকার একটা ছবি খুব হিট করল, ছবির নাম ‘বেদের মেয়ে জোসনা’। বড়রা কেউ আমগরে ওই ছবি দেখতে নিয়া গেল না। আমগর বাসায় অবশ্য বড় বলতে আম্মা আর আব্বা, উনারা নিজেরাও সিনামাহলে ছবি দেখতে যাইতেন না। কিন্তু বিটিভিতে ছবির বিজ্ঞাপন দেখতে দেখতে আমগর দীর্ঘশ্বাস বড় হইতে থাকল। একদিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে, আমগর বাসার সামনের গলিতে খেলতে খেলতে এক বাচ্চা গান গাইতেছিল, “বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে/ হাসি হাসি বলে জোসনা ফাঁকি দিয়েছে”। কথাটা যে আসলে হইব ‘আসি আসি’ সেইটা পুলাপান মানুষ বুঝতে পারে নাই। কিন্তু তার গান শুইন্যা আবার হগলেই হাসতাছিল।

এর মধ্যে একদিন দেখি তন্ময় নিজের মনে হাসতেছে। জিগাইলাম কী হইছে। সে কইল এক পিচ্চি ছ্যাড়ারে গান গাইতে শুনছে, সেই গান মনে পইড়া হাসতেছে। আইয়ুব বাচ্চুর এক পুরানা গান “তুমি কেন ‘বুঝনা’, ‘তুমাকে’ ছাড়া আমি অসহায়…।”

মমেনসিঙ্গের লুকেরা ও কার কইতে পারে না দেইখ্যা তাদেরে নিয়া অনেকে হাসে। কিন্তু আমার শাশুড়িও ‘দোলা’কে বলেন ‘দুলা’। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ট্যাংকের পাড়ে একটা রাস্তা আছে, ‘মূক ও বধির বিদ্যালয়’ না লেইখ্যা হেইহানো লেখা থাহে ‘বুবা স্কুল রোড’। এই কথা আমার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সহকর্মী রায়হানা আপু মানতে চান নাই দেইখ্যা ছবিশুদ্ধা একটা পোস্ট দিছিলাম একবার ফেইসবুকে, ঐশী বিউটি পারলারের বিজ্ঞাপনের নিচে ঠিকানা লেহা আছিল ব এ হ্রস্ব উ কার দিয়া বুবা। আমি হেই কথা মনে করায়া দিয়া আরেকটা অহেতুক কাইজ্যা শুরু না কইরা নিজেও হাসলাম।

পরে বড় হইয়াও ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ ছবিডা দেখার কোনো সুযোগ না পায়া অবশেষে আমি ভিসিডির দোকান থাইকা সিডি ভাড়া কইরা আইন্যা ছবিটা দেখলাম। ২০০০/২০০১ সালের দিকে আমাদের বাসায় একটা ডেস্কটপ কম্পিউটার কেনা হইছিল, মহাকালি ইশকুলের উল্টাদিকের জব্বার আলি কমপ্লেক্স নামের মার্কেটে ভিসিডি ভাড়া পাওয়া যাইত, আমরা কলেজে যাওয়া আসার পথে অইখান থাইকা ভিসিডি নিয়া আইসা ছবি দেখতাম। ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ দেইখ্যা আমার মনে হইল ছবির কাহিনীকার আসলে একটা চালাকি করছেন। রাজার পুতে বাইদ্যানির লগে প্রেম করে দেইখ্যা আপামর জনসাধারণ, বিশেষত নিম্নশ্রেণির মানুষ খুব খুশি হইয়া গেল। কিন্তু আসলে অঞ্জু ঘোষ মানে জোসনা হইল গিয়া প্রবীর মিত্র মানে কাজীর মাইয়া। কাজেই রাজার পুতের লগে জোসনার বিয়া হইলেও দুনিয়া উল্টায়া যাইব না। প্রেম যে কত মহান তা প্রমাণ হইল, আবার অভিজাত শ্রেণির বেজার হওনের কোনো কারণ থাকল না। কাজী সাব রাজা না হইলেও উঁচা শ্রেণির লোক তো বটে। উনার মাইয়া বিয়া করাইলে জাত যাওনের ডর নাই।

কথায় আছে, “বিয়া দিবা ভাত দেইখ্যা আর বিয়া করাইবা জাত দেইখ্যা।” মানে মাইয়ার বিয়া দেওনের সময় আর্থিক সচ্ছলতা দেখলেই চলে, কিন্তু পুলা বিয়া করানের সময় ভালা জাতের মাইয়া আনা লাগব। নাইলে জাতের মধ্যে ভেজাল ঢুইক্যা যাইব। জার্মান আর জাপানিগরে মানুষ হুদাই দুষে। আমরা  অগর চাইতেও অনেক বেশি এথনোসেন্ট্রিক, একই এথনিক আইডেন্টিটির মধ্যেও আমরা জাতভেদ করি। এমনকি এক ধর্মের মধ্যেও করি।

পাকিস্তানে বেজাতে প্রেম করলে নাকি মাইয়ারে মাইরা ফেলা হয়, ‘অনার কিলিং’-এর কোনো শাস্তি নাকি অই দেশে হয় না। অথচ সেইখানে ত অধিকাংশই মুসলমান, অল্প কিছু খ্রিষ্টান। বইনেরা ত বংশ না, তাইলে তারা অজাতে বেজাতে বিয়া করলেই কী? আমার চাচাত ভাইয়ের কন্যাসন্তান জন্মানের পরে সে কইতেছিল, “আমার পরে এই ফ্যামিলিতে আর ছেলে নাই।”

louhitto-686
“আমি আর আমার যমজ বোন মুমু (বামে)। ২০০১/২০০২ এ ব্রহ্মপুত্রের ধারে।”—লেখক

আমি কইলাম, “ক্যান, মুমুর (আমার বোন) ছেলে আছে, হলির (আমার ফুপাতো বোন) ছেলে হইছে।” তহন আমার চাচিদের মধ্যে কেউ একজন মনে করায়া দিতেছিল যে আমরা আসলে ‘ফ্যামিলি’র অংশ না, আমাদের বাচ্চারাও এই ‘ফ্যামিলির বাচ্চা’ না। সেই হিসাবে হলি নিজেও এই ‘ফ্যামিলি’র না। তাইলে মাইয়ারা যুদি ফ্যামিলির অংশই না, তাইলে হেগর কার্যকলাপে ফ্যামিলির মানইজ্জত যাওনের কী আছে?

ভাইয়েরা যহন বইনেরে মাইরা ফেলে তখন তাদের কোনো অপরাধবোধ কেন হয় না? ‘দ্য ডাচেস অফ মালফি’ পড়ানের সময় আমি ক্লাসে এই কথা জিগাইছিলাম। ভাইয়েরা যহন বইনেগর সেক্সুয়ালিটি নিয়া অত বেশি কনসার্নড থাকে যে বইন হারা জীবন বিধবা হইয়া থাকব নাকি কাউরে বিয়া করব বা গোপনে প্রেম করব হেইডাও ভাইয়েগর মাথাব্যথা হইয়া দাঁড়ায় তখন পুরা ব্যাপারটা কদর্য এবং অজাচার ধরনের হইয়া যায়।

থার্ড ইয়ারের পুলাপান অবশ্য ওই লেভেলে চিন্তা করে না। হেরা ধইরা নিছে ডাচেসের সম্পত্তির লাইগ্যাই ভাইয়েরা হেরে বিধবা থাকার পরামর্শ দিছিল।

কুটনামি বা অসততার লাইগ্যা মাইয়া মাইনষের চরিত্র নিয়া কথা উঠেও না। উঠে তার যৌন আচরণের লাইগ্যা। কোনো মাইয়া কঙ্কণ দাসীর মতন পরের মাথাত কাঁঠাল ভাইঙ্গা খাইলে বা কুঁজি দাসীর মতন হিংসুইট্যা হইলেও তত দুর্নাম হয় না যত হয় তার যৌন আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ হইলে।

এইটা সমাজের বা সংসারের নিয়ম, যদিও অত্যন্ত বাজে নিয়ম। মমেনসিঙ্গা মাইয়াগরে যহন ‘বিশ্বপ্রেমিকা’ বা এই জাতীয় উপাধিতে ভূষিত করা হয়, আমার মনে হয় সেইগুলা আসলে ইউফেমিজম। সারকথা যেইটা কইতে চান তা হইল যে মমেনসিঙ্গা মেয়েরা লজ্জাবতী লতা না, এরা উচ্চভাষী এবং প্রেম করতে ডরায় না, সুতরাং, অতএব, অর্থাৎ কিনা আসলে অরা…।

louhitto-63
“হুমায়রা, প্রকৃতি আর আমি। আমাদের ব্রাহ্মপল্লীর বাসায় ছবি তুলছিল দোলা।”—লেখক

তসলিমা নাসরিনের বাড়ি মমেনসিং দেইখ্যা এই এলাকার সব মেয়ে উনার মতন প্রতিবাদী হইব বা প্রেমের ব্যাপারে উদার হইব এমন ধারণা নিয়া রাইখ্যা কথা কওয়া শুধু ওভার সিম্পলিফিকেশন বা ওভার জেনারেলাইজেশনের জন্যে হয় না। আমার ধারণা এইখানে আরেকটা রাজনীতি আছে। যেহেতু লেখক বা কবি হিসাবে উনার ভূমিকা ও অবস্থান বিতর্কিত আর উনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়াও বহু জল্পনা কল্পনা চলতে থাকে তাই তসলিমা সংশ্লিষ্ট কথা কইয়া মমেনসিঙ্গের কন্যাকূলেরে একটু বাজায়া দেখতে চান পুরুষেরা। কেমনে রিঅ্যাক্ট  করলে কী ধইরা নিতে হইব সেই সম্পর্কে উনাদের নিজস্ব ছক আছে। মেয়েরা উনারে সাপোর্ট দিলে একরকম হিসাব, নিন্দা করলে আরেক রকম হিসাব, উনারে নিয়া তর্ক করলে আরেক পদের হিসাব।

জেলা ধইরা টিপিক্যাল কথাবার্তা নিন্দার্থে কওয়া হইলেও সব সময় সব কথা যে নিন্দার্থেই কওয়া হয় তাও কিন্তু না। আমার বন্ধু হুমায়রার ধারণা মমেনসিঙ্গের মেয়েরা অত্যন্ত মেধাবী। সামিনা লুৎফা নিত্রা আপুরে দেইখা তার এই ধারণা হইছে সম্ভবত। আমারে দেইখা যে হয় নাই সেইটা বলাই বাহুল্য, আমি মোটেও মেধাবী না এবং টিপিক্যাল মমেনসিঙ্গাগর মতন আমিও চরম আইলসা আর ঘাড়ত্যাড়া। কিন্তু অর মুখে ওই কথা শুইন্যা আমি বেজায় খুশি হইছি, যারে জেফ্রি বয়কটের ভাষায় কওয়া যায় ‘আবসোলিউটলি ডিলাইঠেড’।

সত্যি হোক আর না হোক, নিজেগরে লইয়া ভালা কথা শুনতে কার না ভালা লাগে? হুমায়রার বাড়ি বরিশাল। অর লগে আমার দুই দিন পর পর কাইজ্যা লাগলেও ও আমার খুবই ভাল বন্ধু। আমার আরেক বন্ধু মিথিলার বাড়ি কুমিল্লা। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের বারীণদা কইতেন, “কুমিল্লার লোক ভাল হইব কেমনে? অগর নামেই ত চরিত্র বুঝা যায়। কু মিল্লা, মানে জগতের সকল কু মিল্যাঝিল্যা হয় হইল কুমিল্লা।” কিন্তু আমার বন্ধু মারুফা ভুঁইয়া মিথিলার মধ্যে আমি কোনো কু দেহি নাই।

louhitto-64
২০১০ এর কনভোকেশনে জাহাঙ্গীরনগরে জোয়েনি আর আমি। আমার কাছে ক্যমেরা ছিল না, ছবি তুলে দিয়েছিল তৃষা।—লেখক

আমার আরেক বন্ধু জোয়েনির বাড়ি বগুড়া। আমি মমেনসিঙ্গা বেইট্টাইনগর মুহো হুনছি বগুড়ার মাইয়ারা নাকি খুব ‘ফাস্ট’। মনে হয় উনারা ফাস্ট বলতে স্মার্ট বুঝাইতে চাইছেন। নাইলে দ্রুততার লগে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য মিলানের কী আছে? দ্রুত কাজ করতে পারা কারো অভ্যাস হইতে পারে, সেইটা নিশ্চয়ই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য না। আমার বন্ধু জোয়েনি সত্যই খুব স্মার্ট, আমার বন্ধুদের মধ্যে ও-ই প্রথম গাড়ি কিনছে। কিন্তু তাই বইলা অর জেলার সব মেয়ে ওর লেভেলের স্মার্ট কিংবা সাকসেসফুল হইব তেমন কথা হলপ কইরা কওন যায় না। আমার বন্ধু দোলা বগুড়ার না হইয়াও মেলা কামের। বিলাত ঘুইরা আইছে, এহন নিজের লেখা নাটকে নিজেই অভিনয় করে। আমি যেহেতু দেশের বাইরে যাই নাই কুনোদিন, কার্যসূত্রে কেউ বিদেশে গেলে সেইটা আমার কাছে খুব সাফল্য বইলা মনে হয়। নিজের গাঁইটের ট্যাকা খরচ কইরা বিদেশ যাইবার সামর্থ অনেকেরই আছে, কিন্তু কাজে বিদেশ যাওয়ার সৌভাগ্য কয়জনের হয়?

আমি নৃবিজ্ঞানের ছাত্র না। কাজেই কী কারণে মানুষের কোন স্বভাব হয়, কোন এলাকার লুকে দাঙ্গাবাজ, কুনহানের মাইনষে মামলাবাজ, কুন এলাকার শাশুড়িরা দজ্জাল, কুন জাগার বউয়েরা কাইজ্যাখুন্নি এইসকল তথ্য বা তত্ত্বের আদৌ কুনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কি নাই তা আমি জানি না আর জানতে চাইও না।

এলাকাভেদে যদি স্বভাবচরিত্রে পার্থক্য থাইক্যাও থাকে তাইলে সেইটাই আসলে ভাল, সব মানুষ এক রহম হইলে জগতে বৈচিত্র থাকত না হইলে।

মহুয়া, মলুয়া, মদীনা সবাই এক এলাকার বইলাই কি আর এক রহম?জগতের হগল ছেইড়াইন আর বেইট্টাইন এক পদের হইলে কবি বেডাইনের কপালে খারাবিই আছিলো, হেরা ব্যাহেই একই পদের প্রেমের কবিতা লেখত হইলে।

(কিস্তি ৭)

More from উম্মে ফারহানা

লৌহিত্যের ধারে (১)

বহুদিন নিজের বাড়িতে থাকবার পর মমেনসিং শহরে ভাড়া বাড়িতে উঠতে কেমন জানি...
Read More