লৌহিত্যের ধারে (৭)

আমরাও আওয়াজ কইরাই পড়তাম। একদিন নানু আমারে জিগাইলেন, ‘অফ’ মানে কী।

আগের কিস্তি । শুরুর কিস্তি

অধ্যায় ৭

নির্ম্মাইয়া পাষাণশিলা বানাইলা মন্দির।
শিবপূজা করে কন্যা মন করি স্থির।।
অবসরকালে কন্যা লেখে রামায়ণ।
যাহারে পড়িলে হয় পাপ বিমোচন।।

মাইয়া মাইনষের ল্যাহাপড়া করার দরকারডাই বা কী? মাঝেমইদ্যে আমি এই বিষয়ডা লইয়া ভাবি। ল্যাহাপড়া কইরা যারা গৃহিণী হন, হেগর লাইগ্যা হেগর উচ্চশিক্ষা কোন কামে আসে?

আমগর বাসার দুই তালায় এক পরিবার থাকতেন, গৃহিণীর নাম বেলিনা, উনার বড় মেয়ে আমগর সমবয়সী ছিল, বিদ্যাময়ীতেই পড়ত।

বেলিনা চাচি ছিলেন মাস্টার্স পাশ। কিন্তু তাতে উনার গৃহিণী জীবনের গুণগত মানের কোনো উন্নতি কি হইছিল? আমার আম্মা মাস্টার্স পর্যন্ত পড়েন নাই, তাই বইলা তাঁর সম্মান বা অবস্থান কি ক্ষতিগ্রস্ত হইছিল?

উনারা দুইজনেই সাহিত্য পড়ছেন। শুধু সুনীল শীর্ষেন্দু না, মাক্সিম গোর্কি, তলস্তয় কিংবা মার্কেজও পড়ছেন। উনাদের দুইজনেরই সাহিত্যের জ্ঞান তুলনামূলক ভাল। তবু দুইজনেরই জীবনযাত্রাও আছিল আর দশটা বাড়ির কর্ত্রীর মতন মূলত স্বামী সন্তানদের জন্যে রান্ধাবাড়া ও অন্যান্য গিরস্তালি কামকাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

বিদ্যাময়ী স্কুলের হোস্টেল ভবন
বিদ্যাময়ী স্কুলের হোস্টেল ভবন এখন। আমগর সম্ময় শহীদ মিনার ছিলো না। – লেখক

কেউ কইতেই পারেন যে পড়ালেখা খালি চাকরি-বাকরি করবার লাইগ্যা না। কিন্তু যেই দেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এত কম সেইখানে ছ্যাড়াইনের ল্যাহাপড়া করা বেশি জরুরি না? যাগর কিনা রুজগার কইরা পরিবার পালতে হইব। যদিও এহন আর এই রকম অপরিবর্তনীয় জেন্ডার রোল দ্যাখা যায় না। মাইয়া মাইনষেও চাকরি কইরা সংসারের খরচ বহন কইরা থাকেন। স্বামী বাইচ্যা থাকলে সেইটা, আমার মনে হয়, আরও বেশি শোষণমূলক। তহন মহিলাগরে দুইডা চাকরি করতে হয়। একটা বাইরে, আরেকটা ঘরে। বিধবা মহিলাগর লাইগ্যা ব্যাপারটা ভিন্ন, খরচপাতি ভাগাভাগি করার জন্যে কেউ না থাকলেও, মাতব্বরি করার লাইগ্যা একটা পুরুষমানুষ যে নাই সংসারে এইডাই যথেষ্ট ফ্রিডম।

আমার মেজ চাচি আর আমার ছোট খালারে দেখছি চাকরি করতে, তুলনামূলক চিত্রটা উনাদেরে দেইখ্যাই পাওয়া। আমার মেজচাচা জীবিত আর আমার ছোটখালু রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছিলেন।

ইদানীং ছেইড়াইনের পড়ার দরকার বাড়ছে বালা বিয়া হইবার লাইগ্যা। ডাক্তার ইন্জিনিয়ার পাত্রেরা আবার অনার্স মাস্টার্স পড়া কইন্যা চায়। কুনো মাইয়া যুদি মনে করে বিয়ার পরে সে চাকরি করবে না, খালি সংসারই করবে তাইলে তারে সেই অপশন দেওয়া উচিৎ। তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিরে কামে লাগাইতেই হইব এইডা চাপায়া দেওয়াও মনে হয় ঠিক না।

এই সংকট বাংলাদেশে অহন দেখা  দিছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাইয়ারা পড়াল্যাহা করছেন দেইখ্যা। আম্রিকাতে এইটা গত শতাব্দীর মাঝামাঝি শুরু হইছিল। জুলিয়া রবার্টসের ‘মোনালিসা স্মাইল’ ছবিতে উনি আর্ট হিস্ট্রি পড়াইতেন। এক ক্লাসে বিজ্ঞাপনের কিছু স্লাইড দেখায়া উনি নারী শিক্ষার্থীদেরে খুব সারকাস্টিক ভাবে জিগাইতেছিলেন বিয়া কইরা গৃহিণী হইয়া উনাদের ইশকুল কলেজ থাইক্যা আহরিত বিজ্ঞান বা কলার বিদ্যা কেমনে অ্যাপ্লাই করবেন। রবার্টসের চরিত্রটার নাম মিস ওয়াটসন, উনি অবিবাহিত।

মুমিনুন্নিসা কলেজে ২০০০ সালে তোলা ছবি
মুমিনুন্নিসা কলেজে ২০০০ সালে তোলা ছবি
পিছনে দাঁড়ানো বাম থাইকা লাবণী রহমান অমি, সিলভিয়া রহমান মিথিলা (সে বেঁচে নাই, ক্যান্সারে মারা গেছে), সামিয়া জেরিন পিয়া, লাইসা ইয়াসমিন লিজা (যে না থাকলে আমার ছেলেরে নিয়া নাকানি চুবানি খাইতে হইত), রাজশ্রী দেবনাথ মৌ (সে দেবনাথ স্যারের নাতনি হিসাবে, ভাল ছাত্রী হিসাবে আর অতি সুন্দরী হিসাবে বিখ্যাত ছিল), আমি, সানজিদা হোসেন কান্তা আর উম্মে রায়হানা মুমু (আমার যমজ বোন)
লোপা (অর ভালো নাম অনে নাই), সাদিয়া (সেও ডাক্তার, তার মা আমার আমার স্কুলের সহপাঠী ছিলেন) , রিফাত বিনতে সিদ্দিকী রুপু, হোমায়রা শবনম সিঁথি (বর্তমানে যেকোন স্বাস্থ্য পরামর্শের জন্যে আমি তারে ফোন করি, যদিও সে গাইনিকোলজিস্ট) , ইশরাত জাহান তানিয়া (সে আমার ফেইসবুকে নাই, আপডেট জানিনা) আর এলমিনা আকন্দ (রুপু আর সে ইদানীং পুত্রসন্তানের জননী হইছে) । – লেখক

চন্দ্রাবতী রামায়ণ লিখছিলেন দেইখ্যা অনেক সময় বিদূষী হিসাবে নারীবাদীরা উনার নাম উল্লেখ করেন। প্রাচীন কালের কুনো আইকনিক নারী ধরতে গেলে পশ্চিমে জো’ন অফ আর্ক আর পুবে খনা আর চন্দ্রাবতীর কথা কওয়া হয়।

জো’ন অফ আর্করেও খনার মতন মাইরা ফেলা হইছিল কিন্তু সেইটা উনার জ্ঞানের জন্যে না, সাহসের জন্যে। বার্নার্ড শ’য়ের সেইন্ট জো’ন নাটকটা লেখার অণুপ্রেরণার কথা উনি যেইভাবে বর্ণনা করছেন তাতে মনে হইছে শ’রও ভীমরতি ধরছিল।

যেইটা কইতেছিলাম, বিদূষী নারী হিসাবে চন্দ্রাবতীর নাম, কিন্তু মৈমনসিংহ গীতিকায় চন্দ্রাবতীর যে আখ্যান আছে তাতে বুঝা যায় উনার রামায়ণ লেখার মূল উদ্দেশ্য ছিল ধর্মচর্চা, জ্ঞানচর্চা না। আর সেই ধর্মচর্চায় মনোনিবেশের কারণও হইলো এক পুরুষের দ্বারা প্রতারিত হওয়া। জয়ানন্দ নামের সেই পুরুষ কুনো এক মুসলমান নারীর লগে লটরপটর শুরু করাতে চন্দ্রাবতী মনে আঘাত পাইয়া প্রায় হারমিটেজে চইল্যা যান। ফাইনালি কিচ্ছাডা ট্র্যাজেডি, জয়ানন্দ ফিরা আসবার পরে চন্দ্রাবতী সাড়া না দেয়াতে জয়ানন্দ আত্মহত্যা করেন।

loufitter-7c
স্কুলের ব্যাজ, ১৯৯২ এর ডিজাইন তিন কোনা, ১৯৯৩ এরটা গোল। তিন কোনাটা মুমুর, আমারটা হারাইয়া গেছিল, ক্লাস ফাইভে গোলটা নিছিলাম। – লেখক

ধর্মচর্চা করতে গিয়া আমার নানি সারা খাতুনও ফার্সি (কিংবা উর্দু) ভাষা শিখতে নিছিলেন। তহন উনার শ্বশুর উনারে নিবৃত্ত করছেন এই কইয়া যে ধর্মপুস্তক পড়নের লাইগ্যা আরবিই যথেষ্ট। আমার নানির কোরানের অনেক আয়াত মুখস্ত ছিল। উনি কিছু কিছু আরবি শব্দ বা বাক্যাংশ বুইঝা বুইঝা কোট করতেন। ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ মানে ‘সহজ পথ’, কিংবা ‘নাওমাকুম ছুবাতা’ মানে হইলো ‘ঘুম আরামের বস্তু’ এইগুলা আমরা মুখে মুখে নানুর কাছ থাইকা জানবার পারছিলাম।

উনার শিখনের উৎসাহ ছিল প্রবল। আমার আম্মা উনার সপ্তম সন্তান। আম্মা ক্লাস সিক্সে বিদ্যাময়ী ইশকুলে ভর্তি হইয়া উল আর কাঁটা দিয়া সোয়েটার বানানো শিখছিলেন, সেইটা দেইখ্যা আগ্রহী হইয়া উনি উলের কাজ শিখা শুরু করছেন। এর আগে খালি সুঁইসুতার কাজ পারতেন। আমরা যখন ইশকুলে পড়ি, উলসুতায় গিঁট দিয়া দিয়া ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড বানানি শিখছিলাম আমার মেজো খালার মেজো মেয়ে রিনি আপার কাছ থাইক্যা। রিনি আপা আমাদেরে শিখাইতেছেন দেইখ্যা উনি কইলেন, “আমারেও হিগায়া দে।”

রিনি আপা কইল, “আপনি এইটা শিখ্যা কী করবেন?”

নানু কইলেন, “তগরে বানায়া দিমু।”

সারা খাতুনের বাপের বাড়ি জামালপুর। উনি টাউনের মতন দিবাম/ দিয়াম, যাইবাম/যায়াম, খাইবাম/খায়াম কইতেন না, কইতেন দিমু, যামু, খামু।

ইশকুলে পড়ার সময় আমগরে কওয়া হইত “জুরে জুরে পড়, জুরে জুরে পড়।”

জোরে মানে দ্রুত না, উচ্চস্বরে। আমরাও আওয়াজ কইরাই পড়তাম। একদিন নানু আমারে জিগাইলেন, ‘অফ’ মানে কী।

ইংরেজি পড়া আওড়াইতেছি সময় উনি খেয়াল করছেন যে ‘অফ’ শব্দডা বারে বারে আইতাছে। উনারে ত পার্টস অফ স্পিচ বিষয়টা পুরাটা বুঝায়া কওয়া সম্ভব আছিল না, আমি নিজেই তহন প্রাইমারি লেভেলের পুলাপান।

কিছু একটা বুঝাইছিলাম আর খুব কষ্ট পাইছিলাম। অই দিনের কথা মনে হইলে আমার এখনও আফসুস লাগে। এইরকম আগ্রহী একটা মানুষ কিনা সামান্য একটু বাংলা আর আরবি ছাড়া আর কিছুই পড়বার সুযোগ পাইলেন না। অংক বিজ্ঞান বাদ দিলাম, ইংরেজি ভাষাডাও উনি একটু শিখতে পারতেন, কত ভাল হইতো। উনার প্রিয় কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ইংরেজি পড়লে নিশ্চয়ই জন মিল্টন বা জন ডান উনার প্রিয় হইতেন।

১৯৯৭ সালে বিদ্যাময়ী স্কুলের পুকুরঘাটে দাঁড়াইয়া আমি আর সাদিয়া হেলাল তিন্নি। তিন্নির আব্বা হেলালউদ্দিন ভূঁইয়া চাচা মমেনসিং শহরের নামকরা ক্রিকেটার ছিলেন একসময়। - লেখক
১৯৯৭ সালে বিদ্যাময়ী স্কুলের পুকুরঘাটে দাঁড়াইয়া
আমি আর সাদিয়া হেলাল তিন্নি। তিন্নির আব্বা হেলালউদ্দিন ভূঁইয়া চাচা মমেনসিং শহরের নামকরা ক্রিকেটার ছিলেন একসময়। – লেখক

মমেনসিঙের মাইয়াগরে মেধাবি মনে করেন আমার যে বন্ধু, সেই হুমায়রা নিজেই স্কলারশিপ নিয়া মহীশুর ইউনিভার্সিটিতে পইড়া আসছেন। আমি সারা খাতুনের নাতনি হইয়া বিদেশে পড়বার যাইবার পারি নাই। এই নিয়া আমার মনে মনে খুবই লজ্জা লাগে। আমার জাগাত আমার নানি যুদি এত্থানি পড়নের সুযোগ পাইতেন, আমি নিশ্চিত উনি বিলাত আম্রিকা থাইক্যা পইড়া আইসা পড়তেন। মফস্বলে মাস্টারি কইরা জীবন কাটাইয়া দিতেন না।

 

মমেনসিঙের আরও এক মাইয়ারে লইয়া আমার আফসুস আছে। উনি হইলেন মিতালি ভুপিন্দর সিং। আগে ছিলেন মিতালি মুখার্জী। উনার পরিবার দেশভাগের পরেও এই শহরেই ছিল। আম্মা যহন বিদ্যাময়ীতে পড়েন, উনিও পড়তেন, এক দুই ক্লাস উপরে। পরে ইন্ডিয়া চইলা গিয়া উনি ইন্ডিয়ার আর্টিস্ট হইয়া গেছেন। অবশ্য সংগীত জগতের জন্যে এইটা স্বাভাবিকও।

কলিকাতার শিল্পীরাও বেশি নামযশের আশায় বম্বে যান। পাকিস্তানের গায়কেরাও যান। এমনেতে দুই দেশের মধ্যে শত্রুতা, কিন্তু নুসরাত ফতে আলি খাঁ বা রাহাত ফতে আলি খাঁরাও ভারতে আইসা গান করছেন।

সবচে আজব লাগছে আমার ‘ভাগ মিলখা ভাগ’ ছবিতে মিশা শফিরে দেইখ্যা। হুদাই পাকিস্তানিগরে ভিলেন বানায়া যে ছবি সেইখানে তিনি অ্যাকটিং করলেন কী বুইঝ্যা। দেশভাগের কষ্ট ত খালি মুসলমান বা খালি হিন্দু বা শিখগর না। সকল সম্প্রদায়ই একই রকম যন্ত্রণা বা শোকের মইধ্যে দিয়া গেছেন।

মিলখা সিঙের পরিবারের মতন অনেক মুসলমান পরিবারও নিশ্চয়ই রায়টে নিশ্চিহ্ন হইছে ওই সময়ে। কিন্তু সিনামার ক্লাইমেক্স আনবার জন্যে দেখাইল পাকিস্তানের অ্যাথলেটগরও ভিলেনের লাহান চেহারা।

কিন্তু মিতালির ব্যাপারডা আলাদা। এই দেশে হিন্দুরা নিরাপদে থাকলে উনারা হয়তো যাইতেনই না ইন্ডিয়াতে, যেহেতু ‘৪৭-এও যান নাই।

হুমায়রার কথাডারে তবু এক্কেবারে ফালায়া দেই নাই। কলেজে আমগর সহপাঠীরা অনেকেই শেষ পর্যন্ত যেইটা চেষ্টা করছে সেইটা করতে পারছে।

যে ডাক্তারি পড়তে চাইছে সে তাই পড়ছে, যে ভার্সিটিতে পড়তে চাইছে সে ভার্সিটিতে গেছে। আমি দুইবারে মেডিক্যাল কলেজে চান্স পাই নাই, আমার সহপাঠী লিজা আর দেবশ্রী প্রথম বারেই ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি হইছে। তানিয়া আর সাদিয়া হইছে ময়মনসিং মেডিক্যালে। আরও অনেকে অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজে।

রুপু পড়ছে বুয়েটের সিভিল ইন্জিনিয়ারিংয়ে, এলমিনা পড়ছে ঢাকা ভার্সিটির কম্পিউটার ইন্জিনিয়ারিংয়ে। অরা দুই জনেই এখন বিদেশে, রুপু নর্থ আমেরিকা (ইউএস বা কানাডা) আর এলমিনা অস্ট্রেলিয়ায়। লিজা এখনও ব্রাহ্মপল্লীতেই থাকে, মমেনসিং মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার পোস্টিং। সে পেডিয়াট্রিশান। আমার ছেলেরে জন্মের ঠিক পরেই নিওন্যাটোলজি বিভাগে ভর্তি করতে হইছিল, লিজাই সমস্ত সাহায্য করছে। ত্রিশালে চাকরি শুরু করার পরে একদিন দেবশ্রীর সঙ্গেও দেখা হইছিল পদ্মা গেইটলক বাসে। অর তখন ত্রিশালে পোস্টিং ছিল, পরে মমেনসিং চইলা আসছে শুনছিলাম, আর লিমার সঙ্গেও দেখা হইছিল, রুমা কনফেকশনারিতে দাঁড়াইয়া কী জানি খাইতেছিল, মেডিক্যাল কলেজের লাইব্রেরিতে পড়বার যাইব কইল।

এদের কারো লগে আমার কুনো যোগাযোগ ছিল না। নিজে মেডিক্যালে পড়তে না পারার হীনম্মন্যতা থাইকা আমি এদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম না। সুনীলের কবিতার লাইনের মতন অনেকটা, “আমরা হারতে হারতে বাঁচি আর জয়ীকে দিই ধিক্কার।” ধিক্কার না দিলেও এড়াইয়া গেছি আর কী। এহন ফেইসবুক হওয়াতে অনেকের আপডেট জানি বা দেখতে পাই।

মুমিনুন্নিসা কলেজে আমাদের কয়েকজন
মুমিনুন্নিসা কলেজে আমাদের কয়েকজন। বাম থাইকা সুরমা, এলি, আমি, ইকা (ভাল নাম মারিয়া হুসেইন, সেও ডাক্তার), তানিয়া (ভালো নাম ইশরাত জাহান) , এলমিনা, মুমুর চেহারা প্রায় ঢাইকা গেছে, রুপুরে জাতা মাইরা ধইরা আছে লিরা (ফারিজা সাবরিনা, সে ডেন্টিস্ট), পিছনে দাঁড়াইয়া আছে মেরি আর মেরির পিছনে যে কে চিনতেছি না। – লেখক

চন্দ্রাবতীর মতন প্রেমে ব্যর্থ হইয়া ধর্মে কিংবা জ্ঞানচর্চায় মনোনিবেশ করা আর আপনে থাইক্যা উৎসাহিত হইয়া পড়াল্যাহা করার মধ্যে পার্থক্য আছে নিশ্চয়ই। মাইয়া মাইনষে বেশি লেখাপড়া করলে বিধবা হয় এইরহম কথাও আগে প্রচলিত আছিল। ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘চোখের বালি’ ছবিতে দেখছি বিনোদিনীরে আশালতা কইতেছে বিনোদিনীর বিধবা হওয়ার কারণ হইলো বেশি পড়াশুনা।

মমেনসিং শহরে বিদ্যাময়ী ছাড়াও আরও অনেক মেয়েগর ইশকুল আছে।বিদ্যাময়ী স্থাপিত হইছিলো ১৮৭৩ সালে।আমরা যেই বছর ভর্তি হইছি, ১৯৯২, তহন ওই ইশকুলের বয়স ১১৯ বছর।  রাধাসুন্দরী, মুসলিম গার্লস আর মহাকালির বয়স জানিনা কিন্তু খুব কমও হইবো না। অতদিন ভরা ইশকুলগুলা চলতাছে, আমগর পূর্বনারীরাই এই ইশকুলগুলিতে পড়ছেন। উনারা হগলেই খুব আহামরি কিছু হইতে পারছেন কি পারেন নাই সেইডা মূল প্রশ্ন না। প্রশ্ন হইলো ফিমেল এডুকেশন ব্রিটিশ আমল থাইক্যা চালু থাকাতে এই শহরের মাইনষের দৃষ্টিভঙ্গি উদার কিনা। খুব বেশি আলাদারকমের উদার বা মুক্ত বইলা মনে হয়।

আমি আর আমার বান্ধবী রিসনা। ২০১০ এর কনভোকেশনের ছবি। - লেখক
আমি আর আমার বান্ধবী রিসনা। ২০১০ এর কনভোকেশনের ছবি। – লেখক

এখনো এই শহরে ছেইড়াইনে সাইকেল চালায় না। আমার বান্ধবী রিসনা শুনছি দিনাজপুর শহরে সাইকেল চালাইয়া চইড়া বেড়াইতো। আমগরে সাইকেলচালানি শিখতেই দেওয়া হইছে না।

কিছু ছেইড়াইনে গানবাজনা করে,নাচ আর নাটকও করে কেউ কেউ। কিন্তু তাগর রেপুটেশন খুব অক্ষত থাকে বইলা মনে হয়না। আব্বার ইশকুল মৃত্যুঞ্জয় বয়সে আমগর বিদ্যাময়ীর চাইতে ছোট। আব্বা মারা যাওনের পরের বচ্ছর মৃত্যুঞ্জয়ের ১০০ বছর পূর্তি হইছিলো। সেই উপলক্ষ্যে আব্বার ইশকুলের বন্ধুরা উনাদের বউদেরে লইয়া আসছিলেন। একজনের বউ আবার জার্মান। বিদেশি চাচিরে আব্বা আমার শোয়ার ঘর ছাইড়া দিয়া অন্য চাচা-চাচিরা পাক্কাত বিছনা পাইত্যা ঘুমাইছিলেন।

মৃত্যুঞ্জয় ইশকুলের ১০০ বছর পূর্তি উৎসবেই আমি প্রথম ‘মহুয়া’র পারফরমেন্স দেখি। ‘বহুরূপী’র সেই প্রযোজনায় মহুয়ার চরিত্রে অভিনয় করছিলো আমাদের ইশকুলের সুইটি আপু। পুলাপান তারে দেইখ্যা যে উচ্ছ্বাসের আওয়াজ করছিলো সেইটা আমার কাছে খুব ভালো লাগেনাই। অবশ্য আমার ভুলও হইতে পারে। মঞ্চে উনারে দেইখা সিটিও যদি কেউ বাজায় তারমানে এইনা যে পথেঘাটে সাধারণ পোশাকে উনারে দেখলেও পুলাপান টিজ করবেই।

আমরা ইশকুল কলেজে যাওয়ার পথে পুলাপান টিজ করতো না এইটাও ঠিক না। অনেক হাবিজাবি ও নোংরা মন্তব্যও শুনতে হইতো। আমরা ‘কান বন্ধ আছে,কিছুই শুনি নাই’ ভাব ধইরা চইলা যাইতাম বেশির ভাগ সময়। আমার খালি মনে হইতো, এরা এগর এত প্রতিভা, এত সৃজনশীলতা ভালা কামে ব্যয় না কইরা রাস্তাত খরচ করতাছে ক্যান? ইদানীং এইসব পুলাপাইনেরে রাস্তাত খাড়াইয়া থাকতে দ্যাখা যায় না। এখন সব রকমের টাংকিবাজি মনে হয় ফেইসবুকেই চলে।

ছেড়িকালে আমি সাইকেল চালাইবার পারছি

আমি আমার স্কুটি লইয়া চালাইবার চেষ্টা করতাছিলাম। - লেখক
আমি আমার স্কুটি লইয়া চালাইবার চেষ্টা করতাছিলাম। – লেখক

না, এই দুঃখে বুড়িকালে একখান স্কুটি কিনছি। স্কুটিহান লইয়া সার্কিট হাউজ ময়দানো গিয়া চালাইবার চেষ্টা করতাছিলাম। দ্যাখলাম মুতের বিজলা পুলাপানে আয়া আমারে ছবক দিয়া যাইতাছে, “অত লড়ুইন না য্যা, টাইট হইয়া বইয়া থাহুইন”, “আন্টি, আন্টি, ইস্পিড বাড়াইন, নাইলে পইড়া যাইবাইন গা”।

ব্যাডাইনের মন্তব্য আবার অন্যপদের। হেরা উপদেশ না দিয়া প্রশ্ন করেন, “কত দিয়া কিনছেন?” “আপু কি জব করেন?”, “কোন এনজিওতে আছেন?”, “এইটা কি ব্যাটারিতে চলে নাকি ম্যাডাম?”

আমি সবার প্রশ্নের জবাব ভদ্রভাবে দেওয়ার চেষ্টা করি। নাইলে কেডা জানে স্কুটি লইয়া বাইর হইলে পরে যুদি আবার পিছে থ্যা ধাক্কামাক্কা মাইরা দ্যায়, বলা যায়না।

ইদানীং মানুষ বড়ই অস্থির আর হিংস্র হইয়া যাইতেছে।

কিন্তু বাইচ্চা পুলাপানডির মাতবরি দেইখ্যা খালি প্যাট ফাইট্যা হাসি উঠে। একেকটা এতই ছুট্টু যে মটর সাইকেল দূরে থাক, দুই চাক্কার সাইকেলেই বসতে পারবে কিনা সন্দেহ, তারা আমারে টিপস দিতে আসে, স্কুটিতে বইসা কেমনে কী করতে হইব।

এইটুক বয়সেই এরা টের পাইয়া গেছে যে মাইয়া মাইনষের উপরে ইচ্ছামতন মাতব্বরি করা যায়। মাইয়া মানে মাইয়াই, হে অশিক্ষিত হইলেই কী উচ্চশিক্ষিত হইলেই কী, ছেড়ি হইলেই কী আর বুড়ি হইলেই কী।

স্কুলের পিকনিকে
স্কুলের পিকনিকে আমি, সুরমা, মুমু আর এলি। তখন বান্ধবীরা এক রকম জামা বানানোর হিড়িক পড়ছিল। এই রকম চক্রাবক্রা কাপড় কিনার কারণ হইল শায়িকা করিম সুরমা এই কাপড় পছন্দ করছিল। সে ছিল লিডার পদের, কিছু হইলেই চ্যালেন্জ কইরা কইত, “এইটা ঠিক না হইলে আমি আমার নাম শায়িকা করিম পাল্টায়া নায়িকা করিম রাখব।” সে এখন ইউকেতে থাকে। – লেখক

ট্রেইনি বাইকারগর মধ্যে আমি বাদে সবাইই ছেলে নাইলে বয়স্ক লোক। তাদেরে এরা টিপস দিতে যায় নাই।

আমি বাচ্চাগুলারে গালি দেই নাই, তাড়াইয়াও দেই নাই, খালি তাকায়া হাসছি।

মোনালিসা স্মাইলের মতন আর কি, “হু কেয়ারস, অ্যাজ লং অ্যাজ শি ইজ স্মাইলিং?”

(কিস্তি ৮)

More from উম্মে ফারহানা

লৌহিত্যের ধারে (৯)

মাইয়া মাইনষের বাজারে যাওয়া কিংবা বাজারে গিয়া নাকানিচুবানি খাওনের অনেক ঘটনা ‘আরব্য...
Read More