লৌহিত্যের ধারে (৯)

আগের কিস্তি । শুরুর কিস্তি

অধ্যায় ৯

হাতের ছিরি আঙ্গুইট সাধুরে বিকাইয়া সহরে
ভাঙ্গা ডিঙ্গা বান্ধাইতে আনো কারিকরে
কিছু মূলধন লইয়া বাণিজ্যেতে যাও
ধণরত্নে ভইরা লক্ষী দিবাইন তুমার নাও

“বাণিজ্যে বসতে লক্ষী” বইলা একটা প্রবাদ আছে। যারা ব্যবসা করেন তারা লক্ষীপূজা করেন, লক্ষী ধণসম্পদের দেবী তাই, আবার গণেশের পূজাও করেন, কারণ গনেশ সিদ্ধিদাতা। মুসলমানেরাও ব্যবসা করারে খারাপ মনে করে না, মহানবী নিজেই নাকি ব্যবসা করতেন। কিন্তু ব্যবসাবাণিজ্য হয় যেইসকল জায়গায় সেই জায়গাটারে খারাপ হিসাবে ধইরা নেওয়া হয়। এইটা একটা পরস্পরবিরোধী ব্যাপার।

আমরা যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, ১৯৯৫ সালে, ময়মনসিংহে তখন কেবল কানেকশন আসছে নতুন। আব্বা বাসায় থাকলে সারাক্ষণ স্টার স্পোর্টস চলত আর না থাকলে চ্যানেল ভি কিংবা এটিএন। সকল হিন্দী সিনেমার গান আমার মুখস্থ হইয়া গেছিল। এখনো একটা চটুল গানের লাইন মনে আছে, বাজার সম্বন্ধীয়, “আকেলি না বাজার যায়া করো, নজর লাগ জায়েগি/ সবকে নজরমে না আয়া করো, নজর লাগ যায়েগি/ সামঝো জারা বাত মেরি জনাব, বাজারিয়া মে সব কি নাজারিয়া খারাব।”

নায়ক বন্ধুবান্ধবসহ নায়িকারে বিরক্ত করতেছে আর কইতাছে মেয়েটা যেন একলা বাজারে না যায় কারণ বাজারের লোকের নজর খারাপ। আয়রনি হইল, খারাপ নজরের লোকেদের সামনে যাইবার আগেই মেয়ের হ্যারাসমেন্ট মোটামুটি আশিভাগ সম্পন্ন হইল। হিন্দী ছবিগুলাতে নায়কের শিভালরি এইভাবেই দেখায়, নায়িকারে ত্যক্ত কইরা সে মজা নেয়, আবার সত্যিকারের ভিলেইন আইলে বাঁচায়। রাস্তার পুলাপানগরে ইভটিজিঙে উদ্বুদ্ধ করার পক্ষে এই সকল গান খুবই কার্যকরী।

মিন্টু কলেজের সামনের রেইল ক্রসিঙে মাছের বাজার। এই বাজারে শুধু সন্ধ্যার পরে মাছ পাওয়া যায়।—লেখক

মমেনসিংয়ে মহিলারা বাজারে যান না। আব্বা মারা যাওনের পর পর আমরা যখন চরপাড়া বাজার থাইকা মুরগি বা গরুর মাংস কিনতে যাইতাম, এক সব্জিওলা আমারে মেডিক্যালের ছাত্রী ভাবছিল, কারণ মেডিক্যালের ছাত্রীরা হোস্টেলে থাকে, তাগর বাপভাই কাছে নাই বইলা বাজার নিজেগরই করতে হয়। এরপরে ১৭/১৮ বছর পার হইয়া গেছে , শহরের চেহারাসুরত অনেক পাল্টাইছে কিন্তু বাজারে নারীর সংখ্যা কমই।

পরিবর্তন একটা হইছে, লোকে মেয়ে বা মহিলাদেরে বাজারে দেখলে এখন আর অবাক হয় না। বাজারের ব্যবসায়ীদের এমনিতেও সময় নাই মাইয়া মাইনষের দিকে চায়া থাকনের, হেরা অনেক ব্যস্ত। কিছু আজাইরা লোকজন অবশ্য থাকে বাজারে, কিন্তু তাগর ধান্দা অন্য, মেয়েগর লগে ঠেলাঠেলি কইরা মজা নেওনের উদ্দেশ্যে যারা ঘুরে তারা শাড়িকাপড় আর প্রসাধনীর দোকানের সামনে থাকে, কাঁচাবাজারে না। এছাড়াও, শুধু বাজারে লোকজনেরই নজর খারাপ এই কথার লগেও আমি পুরাপুরি একমত না, বিশ্ববিদ্যালয়েও কিছু লোকের নজর খুব খারাপ। বারো হাত শাড়ি প্যাচাইয়া, দুইপল্লা কাপড়ের ব্লাউজের নিচে অন্তর্বাস পিন্দার পরেও উনাগর চোখ দেখলে মনে হয় য্যান ন্যাংটা হইয়া খাড়াইয়া রইছি, দৌড়াইয়া পলাইতে মন চায়।

কুপির আলোয় মাছ কেনার মধ্যে চ্যালেঞ্জ আছে, অন্ধকারে খারাপ মাছ গছায়া দিতে পারে বিক্রেতা। কিন্তু সব জায়গায় সিএফএল বাতির ক্যাটকেটা আলো দেখতে দেখতে এই আলো অতি মনোরম মনে হয়।—লেখক

মাইয়া মাইনষের বাজারে যাওয়া কিংবা বাজারে গিয়া নাকানিচুবানি খাওনের অনেক ঘটনা ‘আরব্য রজনী’তে পড়ছি। কায়রোরে নাকি বলা হয় বাজারের শহর। সম্ভবত কায়রোর একটা গল্পই এমন ছিল যে এক মেয়ে বাজারে গেছে কোন একটা জিনিস কিনতে, দোকানি তারে বলছে টাকা দিয়ে সে জিনিসটা দিবে না, মেয়েটা তারে গালে চুমা দিতে দিলে দিবে। গল্পের বাকি অংশ মনে নাই। তবে মেয়েটার সেই জিনিস এতই পছন্দ হইছিল যে সে এই শর্তে রাজি হইছিল আর দোকানি তার গালে কামড়াইয়া দিয়া ভাগছিল।

‘আরব্য রজনী’র অধিকাংশ গল্পই সেকশুয়াল পারভার্শনের গল্প। সাহিত্য হিসাবেও এইজন্যে এইটা অত উচ্চমানের না, তবে মধ্যযুগে মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার নারীরা যে গৃহবন্দি ছিল না সেইটুক তথ্য পাওয়া যায়।

অবশ্য মধ্যযুগের লোকে পার্ভার্ট ছিল আর এখনের মানুষ খুব ধোয়া তুলসীপাতা এই কথাও সত্যি না। ‘সেক্স অ্যান্ড দ্য সিটি’ সিরিয়ালের একটা পর্বে দেখাইছিল চার বান্ধবীর একজন শস্তায় খুব ভালো জুতা কিনতে পারতেছে কারণ জুতার দোকানি নিজে তারে জুতা পরায়া দেওনের শর্তে ডিসকাউন্ট দেয়, একবার একজোড়া জুতা ফ্রিতে দিয়া দিল। জানতে পাইরা বাকি তিন বান্ধবি থ মাইরা গেল, একজন জিগাইল ক্যান সেই ব্যাটা তোমারে খাতির করতেছে, মেয়ে আমতা আমতা কইরা কইল, “হি লাভস টু সি মি ট্রায়িং দোজ”, তখন আরেক বান্ধবি কইল “দিস ইজ ন্যু ইয়র্ক সিটি ডারলিং, নোবডি লাভস এনিথিং দ্যাট মাচ।”

ফুট ফেটিশওয়ালা সেই লোক আসলে মেয়ের পা ধইরা কচলাকচলি কইরা মজা পাইতেছিল, মেয়েটার ছিল শু ফেটিশ, ন্যু ইয়র্কের উইন্ডো শপের পাঁচশ ডলারের হিলজুতা নিজের পা ধরতে দেওয়ার বিনিময়ে পাওয়া তার কাছে লোভনীয় মনে হইছে।

আমি বাজারে গিয়া একবার এক মহিলার দ্বারা নাজেহাল হইছিলাম, সে আমারে ওড়না ঠিক করতে বলল, আমার ক্ষিদা লাগছিল বা অন্য কারণে মেজাজ খারাপ ছিল, তার এই অযাচিত উপদেশ আমার ভাল লাগে নাই, আমি চেইতা গেছিলাম, তারপরে সেই মহিলা আমারে উচ্চকণ্ঠে বকাবকি শুরু করল। এতক্ষণ যারা আমার দিকে ফিরাও তাকায় নাই তারাও আমারে দেখতে থাকল।

বউবাজারের এক নারী বিক্রেতা।—লেখক

আমরা ইশকুলে পড়তাম সময় নাটকঘরলেনে কোনো কাঁচাবাজার ছিল না। এখন আছে, রাস্তার দুইপাশের ফুটপাথে বসা বাজার দুপুর পর্যন্ত থাকে, বিকালের পরে আবার খালি। তন্ময়ের দেওয়া তথ্য ঠিক হইলে সেই বাজারের নাম ‘বউবাজার’ কারণ আশেপাশের এলাকার বউঝিরা হইল এই বাজারের প্রধান ক্রেতা। কয়দিন আগে আমার মামাত বোন রাইসা সেই বাজার থাইকা তাজা নাইল্যা শাক আর মিষ্টি কুমড়া কিন্না আনছিল। আমগর বাসা থাইক্যা মাইছ্যা বাজার বেশ দূরে, ইশকুল কলেজ কিংবা ব্যাংক অফিস যাওনের পথেও পড়ে না, চরপাড়া বাজারে অত টাটকা সবজি পাওয়াও যায় না। তাই বউবাজার থাইক্যা মাঝেমধ্যে আমিও জিনিসপত্র কিনছি। মেয়েরে ইশকুলে দিয়া আসার সময় রিকশা থামায়া শুকনা নাইল্যা পাতা কিংবা আধা কেজি টম্যাটো।

এই বাজারের বিক্রেতারা সম্ভবত নিজের উৎপাদিত জিনিস বিক্রি করে, মিন্টু কলেজের সামনের রেল ক্রসিঙের বাজার কিংবা মাইছ্যা বাজারে সব জিনিসই প্রচুর পরিমাণে আসে,পাইকারের থাইক্যা কিন্না ব্যবসায়ীরা সবকিছু বেচে।

ছোটবেলায় মিন্টু কলেজের এই বাজার দেইখা আমি খুবই অবাক হইতাম। এরা কীভাবে জানে কখন ট্রেইন আসবে, ট্রেইনের যে যাওয়া আসার কোনো সময়গময় নাই সেইটা তো জানা কথা। যে মাছওলা লাইনের উপরে মাছ নিয়া বইসা আছে, ধরা যাক সে দূর থাইকা ট্রেইন আসতে দেইখা দৌড় দিল, তাইলে তার মাছের কী হবে? বয়স বাড়তে বাড়তে বিস্ময়বোধ কইমা যায়, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ আর কিচ্ছু দেইখাই অবাক হয় না। কিন্তু আমি এখনো মিন্টু কলেজের বাজারের লাইন ধইরা জ্বলতে থাকা কুপিবাতির আলো দেইখা বিস্মিত হই। আমার মনে হয় এই শহরের অল্প কিছু সুন্দর জিনিসের মধ্যে এইটা একটা। ব্যস্ততম এলাকায় একটা বাজার, রেইলওয়ে ট্র্যাকের উপরে মাছ সবজি নিয়া বিক্রি করতেছে লোকে, মৌসুমি ফল নিয়া বসে এক বুড়া, তার মাথায় টাক আর মুখে সাদা দাড়ি। বহুদিন আমি ভাবছি আয়েশ কইরা বইসা সফেদা, কামরাঙ্গা, কিংবা লটকন বিক্রি করার সময় সেই বুড়ার একটা ছবি তুলব। কিন্তু কখনোই তুলা হয় নাই। সম্ভবত বুড়ার চেহারা দেইখাই সাহস পাই নাই। মনে হইছে ছবি তুলার অনুমতি উনি দিবেন না। এই সাহসের অভাবেই আমার আর এই জীবনে ফটোগ্রাফার হওয়া হইল না।

এই সবজি বিক্রেতার নাম সিদ্দিকুর রহমান, নিজের গাছের পাইব্যা (পেঁপে) আর কলা ছাড়া উনি পোজ দিলেন না।—লেখক

আমার ক্যান জানি মনে হয় আমার দাদা গোলাম নবী, যিনি বাপের বাড়ির অংশের জমিজমা ভাইদের কাছে বেইচা দিয়া সার্কাসের জোকারের চাকরি নিয়া দেশে দেশে ঘুরতেন, তিনি সম্ভবত এমন দেখতে ছিলেন—মাথায় টাক আর মুখে সাদা দাড়ি। এখনো আমার মাঝেমধ্যে ইচ্ছা করে সাহস কইরা ক্যামেরা লইয়া বাইর হইতে, বুড়ার সাথে খাতির জমায়া কয়টা পোর্ট্রেট তুলতে।

মিন্টু কলেজের বাজার বসে সন্ধ্যার পরে, দিনে মাছ কিনতে হইলে আপনার যাইতে হবে মাইছ্যা বাজার। এই মাইছ্যা বাজারটাও খুবই সুন্দর। শহরে নতুন নতুন আসলে যে কেউ হারায়া যাবে। পালিকা মার্কেটের পাশ দিয়া ঢুকা যায়, গাঙ্গিনারপাড়ের জুতার দোকানের পাশ দিয়া যাওন যায়, স্বদেশীবাজার দিয়াও একটা রাস্তা আছে, রয়েল টি স্টোরের উলটা দিকের গলি দিয়া। ময়মনসিং শহরের রাস্তাঘাট চিপা, মূল শহরের আয়তনও খুব বড় না। কিন্তু এই বাজারটা যথেষ্টই বড়। বাজারের মাঝখানে ব্রথেল। কৃষ্ণা কেবিনের উল্টাদিকে ব্রথেলে ঢোকার একটা রাস্তা, আবার স্বদেশী বাজার পোস্ট অফিসের পাশ দিয়াও আরেকটা রাস্তা আছে।

বলা বাহুল্য, আমি এই ব্রথেলে কখনো ঢুকি নাই। তবে ব্রথেলের একটা বড় অংশের মালিকের ছেলের প্রেসে একটা ছাপার কাজ করাইতে গেছিলাম, উনাদের বাসার নিচতলাতেই প্রেস, উনি উনার বাসায় নিয়া গেছিলেন। আমার পরিচিত সেই প্রেসমালিক নিজে বাদে উনার পরিবারের সকলেই আলহাজ, উনার আব্বা একাধিকবার হজ্জ কইরা আসছেন, বাসার মেয়েরা সবাই নেকাবসহ বোরখা পরেন।

গাঙ্গিনারপাড়ের দিকে ব্রথেলের প্রবেশপথ। এইখানে আসলেই ফরেন লিকার পাওয়া যায় কিনা তা আমি জানি না।—লেখক

ব্রথেলরেও কথ্য ভাষায় বাজার বলে এইটা আমি ছোটকালেই জানতে পারছিলাম, হুমায়ুন আহমেদের কোন এক গল্পের এক চরিত্র, চোর বা ডাকাইত, সে ফেরার হইয়া আছে, শুনতে পাইছে যে তার বউ “বাজারে ঘর নিছে।” এর মধ্যে একদিন সরস্বতী পূজার আগে স্বদেশী বাজারের পোস্ট অফিসে গেছিলাম সোনালি ব্যাংকের এটিএম বুথ ব্যবহার করতে। দেখি শ’ খানেক সরস্বতী প্রতিমা, কয়েকটা দোকানের সামনে সারি সারি সাজানো, ব্রথেলে ঢুকার মুখেই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ উপন্যাসে পড়ছিলাম বারবণিতাদের কাছে যাওয়ারে বলে ‘অবিদ্যার বাড়ি’ যাওয়া। অবিদ্যার বাড়ির দরজায় বিদ্যার দেবীর মূর্তি বিক্রি হওয়া মনে হয় স্বাভাবিক ব্যাপার, আমার কাছেই আয়রনিক্যাল লাগছে। সরস্বতী প্রতিমা যারা বেচেন তারা শিল্পী না ব্যবসায়ী তা আমি জানি না, তারা লক্ষী বা গণেশের পূজা করেন না বিশ্বকর্মার পূজা করেন তাও জানি না। বাজারে থাকেন যে নারীরা, নিজেদের দেহ বিক্রি করেন তাদের মধ্যে কেউ সনাতন ধর্মের হইলে উনি কোন দেবীর পূজা করেন সেইটাও জানতে মন চায়। তারা হয়তো পরের জন্মে শিবের মতন স্বামী পাইবার আশায় শিবপূজা করেন। কিংবা হয়তো কোনো পূজাই করেন না।

কাজী নজরুল ইসলাম বারাঙ্গণাদেরে ‘মা’ ডাকলেও সাধারণত বাজারের নারীদের জন্য প্রযোজ্য শব্দগুলা গালি হিসাবে ব্যবহৃত হয়। আমি অনেকরে খানিক পাল্টাইয়া গালি দিতে শুনছি, কোন মেয়ের চরিত্র সুবিধার না বুঝাইতে তারা বলে, “বাজাইরা মাইয়া”। কোনো কিছু খুব বেশি কমার্শিয়াল, চাহিদা আছে কিন্তু মান ভাল না হইলে সেগুলারেও ‘বাজাইরা’ বলার চল আছে। যেমন, বুদ্ধদেব গুহ একজন ‘বাজাইরা লেখক’ কিংবা তপন চৌধুরি ইদানিং ‘বাজাইরা গান’ গাইতেছেন এমন প্রায়ই কওয়া হয়।

আমার কাছে এই গালিটা লাগসই মনে হয় না। কোনো শিল্পোত্তীর্ণ সাহিত্য বা সঙ্গীত কি বাজারে বিক্রয়যোগ্য না? সুভা মুদগালের এক ইন্টারভিউতে শুনছিলাম উনি পপ ধরনের গান গাওয়াতে উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পীদের মহলে বেশ সমালোচিত হইছেন। বাণী বসুর ‘গান্ধর্বী’ উপন্যাসের এক উচ্চাঙ্গসঙ্গীত গায়িকা তার আরেক গায়িকা বন্ধুরে বকা দিতেছিল এই বইলা যে সে নজরুল সঙ্গীত গায়া গলা নষ্ট কইরা ফেলতেছে। নজরুল সঙ্গীতের যেহেতু ‘বাজারে’ চাহিদা আছে তাই পয়সার জন্যে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পীরা একটু আধটু নজরুলের গানটান গাইতেন তখন। সেই শিল্পীদের বিচারে নজরুলের গান নিম্নমানের।

বইয়ের ক্ষেত্রেও সবসময় হয়ত এই কথা প্রযোজ্য না হইতে পারে। বিদেশে বইয়ের যে জিনিসটা আমার ভাল লাগে না তা হইল, উপরে লেখা থাকে বেস্টসেলার, মানে বইটা প্রচুর বিকাইছে। এইটাও এক পদের বিজ্ঞাপন। আমাদের দেশেও ইদানীং কয়টা মুদ্রণ শেষ হইছে তা জানানো হয়। তবু যেন একটা ধারণা এমন যে বইয়ের বেচাবিক্রি নিয়া কথা বলা তেমন জরুরি কিছু না। অন্তত মলাটে ছাপানো হয় না বিক্রির তথ্য।

বাজারে ভালো বিক্রি হইছে বইলাই কি বইয়ের মান খারাপ হইতে হবে? ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অফ টাইম’ একটা বেস্টসেলার বই। তাই বইলা কি এর মান খারাপ? কিন্তু আমাদের দেশে বই বেশি বিক্রি হইলে তার মান খারাপ ধরা হয়। হুমায়ূন আহমেদের বই বেশি বিক্রি হয় এই প্রসঙ্গে সৈয়দ শামসুল হক নাকি বলছেন, “লুঙ্গিও তো বেশি বিক্রি হয়।” এই ঘটনার সত্যাসত্য জানি না। আম্মার কাছে শুনছিলাম, আম্মা নিশ্চয়ই কোথাও পড়ছেন। দাম কম হইলেও অনেক সময় বই বেশি বিক্রি হইতে পারে। যেমন আমরা ছোটকালে সেবা প্রকাশনীর পেপারব্যাক বই কিনতাম, সাত আট টাকা থাইকা পনের ষোল টাকা দাম ছিল। আর হার্ড কভার কিনতে হইলে বেশ দাম দিয়া কিনতে হইত, অন্তত সত্তর আশি টাকা, আমাদের ইশকুল জীবনে সেইটা অনেক বড় অ্যামাউন্ট।

মাইছ্যা বাজারের ভিতরে এইরকম সৌম্য চেহারার শৌখিন সবজি বিক্রেতাদেরে দেখা যায়, উনার চুলে সবসময় সুন্দর কইরা তেল দিয়া খোঁপা করা থাকে।—লেখক

সিনেমার ক্ষেত্রেও ধরা হয় যে ছবি অনেক বাণিজ্য করবে সেইটা খুব ভাল ছবি হবে না। হলিউডের ছবি অনেক ব্যবসা সফল হয় কিন্তু আসলে হলিউডে বানানো হয় ট্র্যাশ, এই ধরনের অনেক কথা আমি অনেক সমঝদারের মুখে শুনছি। একবার কৃষ্ণকলি দিদির বাসায় গিয়া আমি ‘শ্যাল উই ড্যান্স’ দেখা শেষ কইরা ‘গোস্ট’ দেখতেছিলাম দেইখা দিদি আমারে বকা দিয়া কইল “তুই একের পর এক হলিউডি ছবি দেখতেছিস ক্যান!” আমি নিজে চলচ্চিত্রবোদ্ধা না। হলিউডের অনেক ‘বাজাইরা’ ছবি আমার অনেক প্রিয়। যেমন ‘মাই বেস্ট ফ্রেন্ডস ওয়েডিং’ ছবিটা আমি অনেকবার দেখছি, ‘নটিং হিল’ সময় সুযোগ পাইলে আরো চৌদ্দবার দেখব। ‘নটিং হিলে’র যে জায়গায় হিউ গ্র্যান্ট একা একা হাইট্টা একটা বাজারের মাঝখান দিয়া যাইতে থাকেন আর ব্যাকগ্রাউন্ডে গান হইতে থাকে, “এই’ন্ট নো সানশাইন হোয়েন শি’জ গন, ইটস নট ওয়ার্ম হোয়েন শি’জ এওয়ে” আর এক হাঁটার মধ্যেই ঋতু পাল্টাইতে থাকে, কাপড়ের দোকান ফলের দোকান সব্জির দোকানের পরে ফুলের দোকান পার হইতে হইতে বছরের আরেক মাথা আইসা যায়, গানের শুরুতে যে গর্ভিণী নারীরে কাপড়ের দোকানে দেখা যায়, শেষ অংশে সে একটা ছোট শিশুরে কোলে নিয়া ফুলের দোকানের সামনে ফুল কিনতে থাকে… সেই গানটা আমি দিনে পঞ্চাশবার দেখতে আর শুনতে রাজি আছি।

কিছু কিছু অভিনেতা আছেন যাদের প্রতি আমি অবসেসড। হিউ গ্র্যান্ট সেই দলের। এমন আরেকজন অভিনেতার নাম নাসিরুদ্দীন শাহ। উনার অভিনীত একটা ছবি আছে নাম “বাজার’, ছবিটা অবশ্য আমি দেখি নাই, ‘মান্দি’ নামে একটা ছবিও আছে, এই শব্দের অর্থও মনে হয় বাজার জাতীয় কিছু একটা হবে। তবে আমি ‘মির্চ মসালা’ দেখছিলাম অনেক ছোটকালে, যারা ভাবেন হিন্দী ছবি মানেই খারাপ তাদের এই ছবিটা দেখা উচিৎ। একজন মানুষের আত্মসম্মান রক্ষার গল্প সেইটা। ছবিটা ইউটিউবে পাওয়া যায়।

হলিউডের ছবি দেখেন এমন অনেকরেও দেখছি হিন্দী ভাষায় তৈরি সকল ছবিরে শুধুমাত্র বম্বেতে নির্মিত বইলাই নিচা শ্রেণীর বইলা খারিজ কইরা দেন। এইটা এক ধরনের নাকউঁচাপনা মনে হয় আমার কাছে। কয়দিন আগে আমি চেতন ভগতের ‘দ্য থ্রি মিসটেকস অফ মাই লাইফ’ বইটা নীলক্ষেত থাইকা কিনছি, দেইখা তন্ময় হাসছে। আমার কথা হইল যেই জিনিসটা এত বেশি মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হইছে সেইটার কিছু বিশেষত্ব নিশ্চয়ই আছে, সেই বিশেষত্বটা কী তা জানার জন্যেও জনপ্রিয় বই পইড়া দেখা দরকার।

পপুলার কালচারের হিসাবে মমতাজের “বন্ধু তুই লোকাল বাস” ধরনের গানরেও নিকৃষ্ট বা নিম্নরুচির জিনিস বইলা উড়ায়া দেওনের উপায় নাই। তবে আমি গান শোনার সময় মমতাজ তো দূরের কথা শাকিলা জাফর বা বেবি নাজনিনের গানও জীবনে শুনি নাই। হিন্দী ছবির গানের ক্যাসেট বা সিডিও জীবনে কিনি নাই। রবীন্দ্র সঙ্গীত পছন্দ করি শুইনা রাজকুমারদাদা পরিচয়ের প্রথম দিনেই আমারে ‘এলিট’ বলছিল, আমি তখন সেইটারে অপমান হিসাবে নিছিলাম। ফার্স্ট ইয়ারে মাত্র ভর্তি হইছি তখন, উলটা জিগাই নাই “আপনার কী গান পছন্দ?” কিংবা “কোন গানগুলি শুনলে আমি এলিট হবো না?”

এলিট কোনো গালি না। কিন্তু মধ্যবিত্তদের এলিট হইবার প্রবণতাটা অনেক সময় হাস্যরস সৃষ্টি করে। শুধুমাত্র নিচু শ্রেণীর মহিলারা বাজারে যান, এলিটরা যান না এই ধারনা থাইকা বাইর হইতে না পারা মধ্যবিত্তরা তাগর বউঝিগরে বাজারে যাইতে দেন না। বেডাইনে পোকায় কাটা বুটের ডাইল, বস্তা ঝাড়া শুকনা মরিচ কিংবা কিংবা টুন্ডামুন্ডা বেগুন আইনা দিলেও তাই দিয়া রাইন্ধা রাখতে হইব বউগর, এমনই যেন দস্তুর। এই সমস্যার কিঞ্চিৎ সমাধান হইছে বাসায় ফেরিওয়ালারা সবজি আর মাছ পাড়ায় পাড়ায় বিক্রি করাতে। ঢাকায় দেখছি মুরগিও ফেরিওয়ালা নিয়া আসে। অবশ্য মুরগি কিনতে গিয়া বাজার থাইকা খারাপ জিনিস আনার সম্ভাবনা কম, ফার্মের মুরগির এমনেতেই রানীক্ষেত হয় না।

ঢাকায় মনে হয় মানুষদের এই এলিট হইতে চাইবার প্রবণতাটা আছে। আমি কলেজে পড়ার সময় আব্বার বন্ধুরা তাদের স্ত্রীদের নিয়া আসছিলেন, সম্ভবত মৃত্যুঞ্জয় ইশকুলের শতবর্ষপূর্তিতে। আমি বাজারে গিয়া গরুর মাংস কিন্না আনছিলাম দেইখা শেলিচাচি খুবই বিস্মিত হইছিলেন, ঢাকায় উনারা কল্পনাই করতে পারেন না যে একটা টিনেজ মেয়ে বাজারে যাবে। তাই বইলা ঢাকার মেয়েরা কি বাজারে যায় না? নিশ্চয়ই যায়, কিন্তু শেলিচাচির ক্লাসের মেয়েরা যায় না। আব্বা থাকলে আমরাও হয়ত কোনোদিন বাজারে যাইতাম না। আব্বা মারা যাওয়াতে আমাদের শ্রেণী খানিকটা নাইম্যা গেছে এতে সন্দেহ নাই।

শ্রেণী নিয়া আমরা যতই বড় বড় কথা বলি না কেন, শ্রেণিচেতনা থাইকা আমরা আসলে বাইর হইতে পারি না। প্রিন্টের কাপড়ের জামাকাপড় পরা, ফুলদানিতে কাপড়ের ফুল সাজাইয়া রাখা, কিংবা মেলামাইনের বাসনে খাবার খাওয়ার মতন কিছু ব্যাপার আমি সচেতনভাবে এড়াইয়া চলি, আমার কাছে এইগুলারে ক্ষেত মনে হয়। ভাইবা দেখছি, যদি ক্ষেত লাগেও, তাতে আসলে আমার সমস্যাটা কই? লোকে আমারে গ্রাম্য ভাবলেই কি আমার কিছু আসে যায়? আসলে ত আর আমি গ্রাম্য না।

স্বদেশী বাজার পোস্ট অফিসের সামনে সরস্বতীর প্রতিমা বিক্রি হইতেছে।—লেখক

আমার দাদার বাড়ি নানার বাড়ি কোনোটাই গ্রামে না। এই জন্যে আমার অনেক আফসোসও আছে। লোকে কি সুন্দর গ্রামের বাড়ি থাইকা আসা পিঠাপুলি খায়, নকশি কাঁথা গায়ে দেয়, আমরা এইগুলা পাই নাই। যে গ্রাম নাই দেইখ্যা আমার এত আফসোস সেই গ্রামের লগে সম্বন্ধ যে কোনোভাবেই স্থাপিত হইলে আমার ত আরো খুশি হইবার কথা। ভাইবা সিদ্ধান্ত নিলাম যে, আসলে গ্রাম্য বা ক্ষেতের ব্যাপার না, ব্যাপারটা হইল আমার রুচি যে যথেষ্ট অভিজাত সেইটা সকলরে বুঝাইতে আমরা উদগ্রীব।

আভিজাত্য বা বনেদিয়ানার ক্ষেত্রে নীললোহিতের একটা কথা মনে আছে, সে তার বন্ধু রফিকের কথা কইতেছিল যে রফিক যখন উত্তর কলকাতায় দাঁড়াইয়া কাউরে নিজের গাড়িতে লিফট দিতে চাইছে তখন পুরা উল্টাপথে ঘুইরা দক্ষিণ কলকাতায় যাইতে হইলেও তা সে করবে, “ওর বনেদিয়ানা এসবের উর্ধে।” এই কথা পইড়া আমার খুব ইচ্ছা করছিল রফিকের মতন বনেদি কোনো মানুষেরে দেখতে।

আমাদের আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে সেইরকম খাস বনেদি কেউ নাই। যারা ধনী আছেন তারা দুই পুরুষে শিক্ষিত আর তিন পুরুষে উচ্চবিত্ত, কষ্টমষ্ট কইরা দাদার বাপের নাম কইতে পারবেন, এর উপরে ফ্যামিলি ট্রির হদিস নাই।

তারপরেও হাস্যকরভাবে হেরা নিজেগরে বনেদি বা অ্যারিস্টোক্র্যাট হিসাবে প্রমাণ করতে মরিয়া। আমার আত্মীয়গর মধ্যে এমন অনেকরে আমি দেখছি নিজের বা নিজের শ্বশুরবাড়ির উল্লেখ করতে গিয়া বলতেছেন, “এই বাড়ির ছেলেরা…” কিংবা ”এই বাড়িতে কোনোদিন…।” শুইনাই আমার ঢাকাইয়া বাংলা ছবির সংলাপ মনে হইছে, “চৌধুরি বাড়িতে কোনোদিন হেন হয় নি কিংবা তেন হয় নি।” ভাবখানা এমন যেন উনাদের বাড়ির পাঁচ ছয়শ’ বছরের ইতিহাস কোথাও লিপিবদ্ধ আছে।

কয়েক দিন ধইরা টাকা হইলেই লোকে নিজেদেরে অন্যের চাইতে উন্নত প্রমাণ করার চেষ্টা করে দেইখা আমার হাসি লাগে। এইটা অবশ্য আমার রসবোধের দোষ। অনেকবার শুনা জোক শুইনাও মানুষ যেমন হাসে তেমন আমিও লোকের টাকা দিয়া আভিজাত্যের নামে ব্র্যান্ডের জিনিস কেনা দেইখা হাসি।

আমার সহকর্মী মুক্তাদিরের কাছে শুনছি ঢাকা ভার্সিটিতে নাকি ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের কোন এক বিভাগের ছাত্রেরা অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের সামনে নিজেগর বিভাগরে ‘বেস্ট ডিপার্টমেন্ট’ বইলা দাবি করে। এইটা আরো হাস্যকর।

রঘুনাথের মাছের দোকানের এই দুই কর্মচারীর লগে আমার ভাল খাতির। তাদের কাছে ভাল রুই কাতল ইলিশ না থাকলে আমারে তারা বলেন, “আইজকা মাছ সুবিদা অইত না, অইন্য মাছ লইয়া যাইন গা আফা।” দোকানের মালিকের নাম রঘুনাথ, উনি ছবি তোলার সময় ছিলেন না।—লেখক

আমার নিজের এই রকম অভিজ্ঞতা নাই। জাহাঙ্গীরনগরে বিবিএর ছেলেমেয়েরা আমগর বন্ধু ছিল, বাস্কেটবল খেলার রেজাল্ট নিয়া অগর লগে আমগর কাইজ্যা লাগত, কিন্তু বিভাগ নিয়া মাতবরি করতে দেখি নাই। ব্যবসায় অনুষদের পড়ালেখা কইরা অরা অন্যদের চেয়ে উন্নত কেমনে? বড় কর্পোরেট অফিসে বেশি বেতনে টাইবান্ধা কেরানির চাকরি করার জন্যে অরা বেশি যোগ্য বইলা হয়ত। লেখাপড়া করার মূল উদ্দেশ্য যেন চাকরিবাকরি পাওয়া। আগে মধ্যবিত্ত বাপমায়েরা পুলাপানরে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানাইতে চাইত, এখন ব্যবসায় প্রশাসন পড়ায়া বিবিএ এমবিএ বানাইতে চায়, বাজারে এইসকল ডিসিপ্লিনের চাহিদা আছে বইলা। তা দুনিয়াডাই যখন বাজার, বাপমায়ে যে পুলাপানেরে বেশি দামে বেচার লাইগ্যা পয়সা ইনভেস্ট করব সেইটা আর আশ্চর্য কী?

টাকা নিয়া যে লোকে বড়াই করবে এতেও অবাক হইবার কিছুই নাই। টাকা রোজগার করতে পারাটা এক ধরনের যোগ্যতা তো বটে। যুধিষ্ঠির অনেক আগেই বকরাক্ষসের “পৃথিবী কীসের বশ?” প্রশ্নের জবাবে বইলা দিছেন, ”পৃথিবী টাকার বশ।” সেই যুগে নিশ্চয়ই ক্যাপিটালিজম বা পুঁজিবাদ নামক টার্মগুলার প্রচলন হয় নাই। তবু উনি জানতেন যে টাকা বড় একটা ফ্যাক্টর। মজার ব্যাপার হইল এই একই যুধিষ্ঠির বকরাক্ষসের “সুখী কে?” প্রশ্নের উত্তরে বলছিলেন, “যে ব্যক্তি অঋণী ও অপ্রবাসী হইয়া অপরাহ্ণে নিজগৃহে শাকান্ন খায় সেই ব্যক্তিই সুখী।”

অর্থনীতি আমি একেবারেই বুঝি না, তবে ইদানীং যে ঋণ নিতে পারাটারেই আসল যোগ্যতা ধরা হয় সেইটা টের পাই, ঋণের টাকা ফেরত না দিয়া ঋণখেলাপি হইয়া যাওয়া নাকি আরো বড় যোগ্যতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থাইকা টাকা নিয়া দেয় নাই এমন অনেক ‘সেলিব্রিটি’ ঋণখেলাপি আছেন যারা বহাল তবিয়তে ব্যবসা বাণিজ্য কইরা খাইতেছেন। তাদের কিছুই হয় না। আবার এইটাও শুনছি গ্রামীণ ব্যাংকের মাইক্রোক্রেডিট প্রোগ্রামের আওতায় ক্ষুদ্রঋণ নিছিলেন এবং ফেরত দিতে পারার আগে মইরা গেছেন এমন কৃষকের লাশ দাফন করতে দেওয়া হয় নাই, ঘরের টিন বেইচ্যা টাকা দেওয়ার পরে লাশ ছাড়া হইছে।

ঋণ জিনিসটা ভাল না খারাপ তা নিয়া তর্ক বিতর্ক হইতেই পারে। কিন্তু বিকালবেলা ক্যাম্পাস থাইকা ফিরার পরে খাইতে বসলে আমার অবধারিতভাবেই ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের কথা মনে পড়ে। ব্যাংকের কাছে আমার কিছু ঋণ আছে।

ভাত খাইতে খাইতে মনে হয়, মাসখানেকের মধ্যে আমি হয়ত সেই ঋণ শোধ কইরা দিতে পারমু, তহন নিজেরে সুখী মানুষ বইলা দাবি করতে পারমু। এই শহরে তো আর আমি প্রবাসী না। ঋণ না থাকলে, নিজের দেশে নিজের ঘরে বইসা মাইছ্যা বাজারের রঘুনাথের দোকান থাইকা কিনা আর ডাইলের বড়ি দিয়া রান্ধা মাছের ঝোল খাই কিংবা বউবাজার থাইক্যা কিনা হেলেঞ্চা শাক বা সরিষাফুলের বড়া দিয়া, কী আসে যায়?

কিন্তু কী জন্যে জানি অনেক বছর ধইরা আমার ঋণ জমতেই আছে, অনেকবার অনেক টাকা শোধ করি, আবার ঋণ হইয়া যায়।

About Author

উম্মে ফারহানা
উম্মে ফারহানা

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ইংরেজি সাহিত্য পড়ান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন ২০০৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত। জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, ৬ অক্টোবর ১৯৮২। প্রকাশিত গল্পগ্রস্থ: দীপাবলি।