সবুজ নৈরাজ্যবাদী (৩)

 

(আগের পর্ব)

হানা ও আমি

বেশ কিছুক্ষণ ধরে একটা শূন্য টেবিলে বসে আছি আমি। অপেক্ষা করছি।

রেস্টুরেন্ট প্রায় ফাঁকা।

হানা আজ আসে নি। কেন আসে নি, বুঝতে পাচ্ছি না। হয়তো কিউরেটর বদ্রিলারকে ফাঁকি দিতে পারে নি সে। অথবা হতে পারে, কোনো বিপদে পড়েছে। ধরা পড়ে গেছে গোপন নথি সরাতে গিয়ে।

 

আমি এখান থেকে একটা ফোন করতে পারি আর্কাইভ অফিসে। কিন্তু তাতে ঝুঁকি নেওয়া হবে।

হানা ধরা পড়লে ওরা কী করতে পারে, আমি অনুমান করার চেষ্টা করলাম। ইন্টারোগেশন সেলে নেবে, নিশ্চিত। হয়তো শারীরিক যন্ত্রণা দেবে। হানা কি আমার কথা বলে দিতে পারে? অসম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে এখানে বসে থাকা আমার জন্যে নিরাপদ না।

আমি উঠে পড়লাম।

রেস্টুরেন্ট থেকে মেট্রো স্টেশন খুব বেশি দূরে নয়। হেঁটেই যেতে হবে।

বেসমেন্ট থেকে একটা লোক আমার পিছু নিলো। বেটেখাটো। একটু খুড়িয়ে হাঁটছে। আমি হাঁটার গতি বাড়ালে সেও বাড়াচ্ছে। দুবার আমি চেষ্টা করলাম লোকটাকে ফাঁকি দিতে। আঁঠার মতো লেগে আছে লোকটা। আড়ালের তাগিদও যেন নেই।

মেট্রো স্টেশনের বেঞ্চে লোকটা বসলো আমার ঠিক পিছনে। বসে মাথা নিচু করে কী একটা ম্যাগাজিন পড়ছে।আমি তার নিঃশ্বাসের শব্দ পাচ্ছি।

ঝন ঝন শব্দে ট্রেন এসে পড়লো। আমি দ্রুত একটা কম্পার্টমেন্টে উঠে গেলাম। লোকটাও উঠলো আমার পিছু পিছু। আশপাশে প্রচুর জায়গা থাকলেও সে মাঝখানের আইলে দাঁড়ালো আমার শরীর ঘেঁষে। একবার আমাদের চোখাচোখি হলো। শীতল চোখ লোকটার। শক্ত চোয়াল।

আমি নামব এই পথের শেষ স্টেশনে। সেখানে টিউব বদল করতে হবে। আমি আগের স্টেশনেই নেমে পড়লাম। দরজা বন্ধ হওয়ার আগ মুহূর্তে এমন হুঁট করে লাফিয়ে নামলাম, লোকটা অনুসরণের সুযোগ পেল না।

অপসৃয়মান মেট্রোর জানালাপথে লোকটা তাকিয়ে আছে আমার দিকে। একটু যেন হাসির রেখা দেখলাম তার শক্ত চোয়ালে।

ফাঁকা স্টেশন। এক কোণায় একটা বন্ধ হয়ে যাওয়া ম্যাগাজিন স্টলের সামনে টিম টিম করে হলুদ আলো জ্বলছে। আমি তার সামনে একটা ধাতব বেঞ্চে বসলাম। তখন টের পেলাম আমার গাউনের পকেটে শক্ত কিছু একটা।

আমি টেনে বের করলাম: একটা হলুদ খাম। ওপরে লেখা: ‘হানার কাছ থেকে’।

লোকটা তাহলে হানার কাছ থেকে এসেছে। হানার বাহক?

আমি খাম খুললাম। সতের পৃষ্ঠার একটা টাইপ করা ডকুমেন্ট।

আমি পড়তে শুরু করলাম।

নিখোঁজ ফেরি

একটা নিখোঁজ ফেরির অনুসন্ধান এত দূর যাবে, কেউ অনুমান করতে পারে নি।

আন্তঃনাক্ষত্রিক পরিবহন ব্যবস্থা আমরা নিশ্ছিদ্র নিরাপদ করে তুলেছি, এমনটা কে দাবি করতে পারবে? কত রকম বিপত্তিই তো হয়, হচ্ছে। বিশেষ করে গ্রিন করিডোরের ভিতরে বোয়েমি পাইরেটদের হামলার আশঙ্কা আমরা যে পুরোপুরি দূর করতে পারি নি, সেটা তো একপ্রকার মেনে নেওয়া বাস্তবতাই।

তাহলে আর্নেটাপাসো নিখোঁজ হওয়া নিয়ে এত হট্টগোলের হেতু কী?

হেতু একটাই: ওই ফেরির কোনো চিহ্ন আজ অব্দি পাওয়া যায় নি। না কোনো ডিসট্রেস সিগনাল, না ধ্বংসাবশেষ। আর এটা একেবারে অস্বাভাবিক।

পাইরেটরা এই ফেরি আক্রমণ করে নি। এটা শতভাগ নিশ্চিত। গ্রিন করিডোরের থার্মোগ্রাফিক রেকর্ড ভুল হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আর তা ছাড়া আজ পর্যন্ত কোনো মুক্তিপণ কোথাও থেকে দাবি করা হয় নি। হয়েছে?

সমস্ত রেকর্ড বলছে, আর্নেটাপাসো একবারের জন্যেও গ্রিন করিডোরের সীমা অতিক্রম করে নি। এই ফেরি নাক বরাবর এগিয়ে গেছে। তারপর মাঝপথে হুঁট করে হাপিশ। কোথাও কোনো ট্রেস নাই।

এই অন্তর্ধান রহস্যজনক।

তবে হট্টোগোল শুধু এ কারণে না। অন্য কারণও আছে।

কারণটা মূলত অর্থনৈতিক। বিপুল পরিমাণ বিমা লগ্নি করা আছে চার্টার কোম্পানি হিশেলের ফেরিগুলোর পেছনে। আপনারা তো জানেন, সাইক্লো-কমবাসশন ইঞ্জিন আবিষ্কারের পর স্বল্পপাল্লার পরিবহন রুটে এখন কী ভীষণ প্রতিযোগিতা। একটা ফেরি নিখোঁজ হওয়া মানে পুরো কোম্পানির ভাবমূর্তি ধসে পড়া, ছিটকে পড়া রেস থেকে। এই অন্তর্ধানের পর হিশেল কোম্পানির কাছে একটাই পথ খোলা ছিল: প্রমাণ করা যে, এটা পাইরেটদের কাজ। কিন্তু তা করতে হলে আগে তো দেড় হাজার মিটার দীর্ঘ যন্ত্রদানবটাকে খুঁজে বের করতে হবে।

ফেরিটাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল আরেকটা পক্ষ: নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ডাম্পিডাভি। তাদের দুশ্চিন্তা আরো বেশি। তিন বছর আগে এদের প্রোডাকশন লাইনের একটা জাম্বো ওয়াগন ধাক্কা লেগেছিল এক ধূমকেতুর গায়ে। তদন্তে প্রমাণ হয়, দুর্ঘটনার কারণ রাডার সিস্টেমে ত্রুটি। এত কম সময়ে আরেকটা গোলোযোগের অভিযোগ ওঠা মানে কোম্পানির মাথায় হাত।

একদিকে ফেরি খুঁজতে উঠেপড়ে লেগেছে এই দুই কোম্পানি, এটা প্রমাণ করতে যে, এ অঘটনে তাদের কোনো দায় নাই। আরেক দিকে, গোপন অনুসন্ধানে বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো। উদ্দেশ্য বিপুল অংকের বিমার ক্লেইম ফলসিফাই করা। কিন্তু এরা সবাই নিয়োগ করলো একটিই প্রতিষ্ঠানকে: বুকাদেরো ইনকরপোরেশন। পুরো গ্যালাক্সিতে এ কাজের উপযুক্ত আর কোনো প্রতিষ্ঠান নেই।

আমি এই বুকাদেরোর সঙ্গে জড়িত। কীভাবে জড়িত বলছি।

বুকাদেরো ইনক দাবি করে, এ ধরনের অনুসন্ধান কাজে তাদের পূর্বাভিজ্ঞতা আছে। অতিরঞ্জন। একবার একটা স্পেসবট অপহরণ ঘটনায় মুক্তিপণ হস্তান্তর আর আরেকবার জিম্মিদের ছাড়িয়ে আনার কাজে এই কোম্পানিকে নিয়োগ করা হয়েছিল। অভিজ্ঞতা বলতে ওইটুকুই। এ ধরনের অনুসন্ধান পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানটির বিশেষ কোনো লজিস্টিক সামর্থ্যও নেই। এরা যেটা করে তা হলো, যেখানে যত সরকারি উপাত্ত আছে বা নতুন করে তৈরি হচ্ছে—সব জোগাড় করা, সেগুলো বিশ্লেষণ করা। আর এরকম কাজে তারা বাইরে থেকে এমন কিছু লোককে ভাড়া করে, এককালে যাদেরকে ‘প্রাইভেট আই’ বলার চল ছিল। তরুণ বয়সে আমি ছিলাম এক স্বনিয়োজিত প্রাইভেট আই। কিন্তু পেশায় সুবিধা করতে না পারায় এখন বুকাদেরো কোম্পানির একপ্রকার রিটেইনারশিপভোগী হয়ে আছি। আমি এদের হয়ে ভাড়ায় খাটি। আলস্য আমার এই পরিণতির মূল কারণ। তবে এই রুটিন জীবন আমার মন্দ লাগে না।

আর্নেটাপাসোকে খুঁজে বের করার মিশনে আমার করণীয় খুব কঠিন কিছু ছিল না। তথ্য উপাত্ত জোগাড় করতে হবে—যেখানে যা আছে, সব। তথ্যের উৎস প্রধানত দুটি। প্রথমত, নেভিগেশন আউটপোস্টগুলোর অটোমেটেড ডেটা, থার্মোগ্রাফিক রাডারের রিডিং আর অডিও ট্রাফিক কনভারসেশন। কয়েকটি বেসামরিক দপ্তরে ধর্না দিয়ে কিছু মধ্যম সারির আমলাকে হাত করতে পারলে এই কাজ একেবারে ডালভাত। কঠিন হলো দ্বিতীয় ধরনের উপাত্ত সংগ্রহ। এই উপাত্ত ক্রমাগত তৈরি করে চলেছে সরকারি অনুসন্ধান দল। এদের সম্পর্কে একটু বিস্তারিত না বললেই নয়।

sabuj3bফেরি অনুসন্ধানে নেমেছে গ্যালাকটিক অথরিটির নেভিগেশন বোর্ড। সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ নামে এদের একটা জোড়াতালি দেওয়া ডিপার্টমেন্ট আছে। শেষ যে স্থান থেকে রাডার সিগনাল পিক করা হয়েছিল, ডিপার্টমেন্টের অনুসন্ধান শুরু সেখান থেকে। বিপুল আয়োজন। গ্রিন করিডোর আর তার আশপাশের ২৫ পারসেক পর্যন্ত টেরিটরি স্ক্যান করা হচ্ছে সাড়ে চারশো রেট্রোথার্মিক স্ক্যানার দিয়ে। ব্যাকগ্রাউন্ড ফ্রিকোয়েন্সি লেআউটে কোথাও কোনো ডিসটারবেন্স পাওয়া যায় কিনা তা অনুসন্ধানে নেমেছে সতেরটি প্যানারোমিক ভেসেল। এর বাইরে অজস্র স্পেসবট চক্কর দিয়ে ফানা ফানা করে ফেলছে লুক্কায়িত যত ডার্ক ও সেমিডার্ক টেরিটরি। এলাহি কারবার।

উপাত্ত অনুসন্ধানে নেমে প্রথমটায় আমি চক্কর খেয়ে গেছিলাম। বাপ রে! একটা ফেরির জন্যে এত কিছু।

আপনার মনে কোনো সন্দেহ জাগে নি?

কীসের সন্দেহ?

এই যে, একটা ফেরির জন্যে এত কিছু?

না। ভেবে দেখুন, সতের জন লোক নিখোঁজ। অথরিটির তো একটা দায় আছে। আছে না? তাছাড়া এমন তো আগে কখনও ঘটে নি। গ্রিন করিডোর হাতের তালুর মতো মুখস্ত জায়গা। এভাবে বাড়ির আঙিনা থেকে একটা ফেরির হারিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

অনুসন্ধানে নেমে আপনি একটা কিছুর গন্ধ পেয়েছিলেন। টের পেয়েছিলেন এটা সাধারণ কোনো অনুসন্ধান না। পান নি?

পেয়েছি। এতটা গর্দভ তো আমি নই। অনুসন্ধান মাঝপথে যাওয়ার আগেই আমি আঁচ পেলাম, এর মধ্যে আরো কিছু আছে। আমি আসলে একটা ডুবোচরের ওপরের অংশটা দেখতে পাচ্ছি মাত্র। রেসকিউ ডিপার্টমেন্টের বাইরে আরো একটা পক্ষ অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত আছে। তারা আছে গোপনে। কিছুতেই তারা তাদের উপস্থিতি জানান দিতে প্রস্তুত না। এবং ওই ফেরি খুঁজে পেতে তারাই সবচেয়ে ডেসপারেট।

কারা এরা?

আমি নিশ্চিত করে কিছু জানতে পারি নি।

কোনো অনুমান?

আমার একটা সূক্ষ্ম অনুমান হচ্ছে,এরা সামরিক কোনো পক্ষ। ওই ফেরি সম্ভবত এমন কিছু বহন করছিল, যার সঙ্গে সামরিক উদ্বেগ জড়িত।আর্নেটাপাসো একটা স্বল্প দূরত্বের প্রাইভেট কার্গো ফেরি।আমি এর কার্গো ইনভেন্টরি দেখেছি।সন্দেহজনক কিছুই আমি পাইনি। মূলত কৃষি পণ্য বহন করছিল ফেরিটি।

তাহলে?

তাহলে কী?

তাহলে অন্য কিছুর গন্ধ পাচ্ছেন কেন?

গন্ধ পাচ্ছি মূলত দুটি কারণে। একে তো অনুসন্ধান কাজে একটা অস্বাভাবিক ঢাক ঢাক গুড় গুড়। আর তাছাড়া রওনা দেওয়ার সতের দিন পর দ্বিতীয় আউটপোস্ট স্টেশনে জ্বালানি নেওয়ার সময় দুজন লোক উঠে পড়ে কার্গো ফেরিতে। আনশেডিউলড বোর্ডিং। যাত্রীতালিকায় এদের নাম ছিল না।এদের গন্তব্য কোথায় আমি ট্রেস করতে পারি নি। দুজন লোকের হাতে দুটি কালো স্যুটকেস। চোখে কালো সানগ্লাস। সম্ভবত ভারি কিছু ছিল স্যুটকেসের ভিতরে। কেননা লোক দুজনকে একদিকে সামান্য কেতরে হাঁটতে দেখা যাচ্ছিল। এরা বসেছিল প্যাসেঞ্জার কিউয়ের একেবারে পেছনের সিটে।

হিচহাইকিং তো বিরল কোনো ঘটনা না।

এরা কনভেনশনাল হিচহাইকার নয়। আমি এদের আগেপরের কোনো ডেটা ট্রেস করতে পারি নি। লোক দুজন যেন হাওয়া থেকে ওই স্টেশনে পয়দা হয়েছে। কী ছিল এদের স্যুটকেসে? জানার কোনো উপায় নেই। আমার কেন যেন মনে হয়, এদের সম্পর্কে একটা বৃহত্তর কৌতূহল জড়িত। অনুসন্ধানের মূল লক্ষ্যই এরা। হয় এই লোক দুটিকে পাওয়া দরকার অথবা দরকার ওই স্যুটকেস দুটো।

কার দরকার?

সামরিক অথরিটির।

ঘুরেফিরে সামরিক অথরিটির কথাই কেন আপনার মাথায় আসছে?

আসছে কেননা, অনুসন্ধান কাজে আমি এমন কিছু ভেসেল নিয়োজিত দেখেছি, যেগুলো নেভিগেশন ডিপার্টমেন্টের নয়। একটা বিশেষ সামরিক অথোরিটি এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করে বলে আমি জানি।

আপনি কি সুনির্দিষ্ট কিছুর প্রতি ইঙ্গিত করছেন?

না। তবে মনে করিয়ে দেব,হেটারোজোন এরোড্রোম থেকে চার মাস আগে একজন লোককে আটক করা হয়েছিল। তারও হাতে ছিল কালো স্যুটকেস। চোখে কালো সানগ্লাস। তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। আউটার ফ্রিঞ্জে গত কয়েক বছর ধরে একধরনের অসন্তোষ পুঞ্জিভূত হয়ে উঠছে। এমনি এমনি যে হচ্ছে না, সেটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। উস্কানিদাতা খোঁজা হবে, সেটাই স্বাভাবিক। আমি রাজনীতিগন্ধী নই। সবকিছুর পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র দেখতে পাওয়া আমার স্বভাব নয়। কিন্তু কিছু ইঙ্গিত বাতাসে ভাসছিল। অনুসন্ধানে আমি যতই এগুচ্ছিলাম, ততই বুঝতে পারছিলাম,এটা কোনো সাধারণ অন্তর্ধান নয়। নিশ্চিত হলাম, যখন বুকাদেরো থেকে ফোন পেলাম। আমাকে তদন্তে ইস্তফা দিতে বলা হলো।

আপনি দিলেন?

আমি কোম্পানি থেকেই ইস্তফা দিলাম।

কিন্তু তদন্ত বন্ধ করলেন না, তাই তো?

না, করলাম না।

আপনি নিজে থেকে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছিলেন?

হ্যাঁ।

কেন?

কৌতুহল।

নিছক কৌতুহল?

অবশ্যই।

তাই যদি হবে, তাহলে আপনি আপনার অনুসন্ধান কেন তৃতীয় একটি পক্ষের কাছে নিয়মিত রিপোর্ট করছিলেন?

আমি? অসম্ভব।

লুকানোর চেষ্টা করবেন না। আমরা কিছু কনভারসেশন ইন্টারসেপ্ট করেছি। আপনার অনুসন্ধানের অগ্রগতি একটি “ওপেন-কি” কোডেড ল্যাঙ্গুয়েজে আপনি প্রতি সপ্তাহে পাঠিয়ে দিতেন মমেরো গ্রহের এক বিশেষ ব্যক্তির কাছে। তার নাম থিবো বিবিটা। আমরা অনুমান করছি, এই লোক আপনাকে নিযুক্ত করেছে। কে এই থিবো বিবিটা?

আমি আপনাদের আর কোনো প্রশ্নেরই জবাব দেব না। আগে জানতে চাই, কেন আমাকে এভাবে জেরা করা হচ্ছে?

জেরা করা হচ্ছে না। এটা একটা কথোপকথন।

কথোপকথন? এভাবে? চেয়ারের হাতলে হাত বাঁধা অবস্থায়? অন্ধকারে?

দুঃখিত। আমরা আলোর বন্দোবস্ত রাখি নি নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি নই বলে। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। আমরা আপনার পূর্ণ সহযোগিতা আশা করছি।

সহযোগিতা? হা-হা! বেশ, বলুন কী জানতে চান।

কে এই থিবো বিবিটা? আপনি কেন তার হয়ে কাজ করছিলেন?

থিবো বিবিটা একজন কবি। নামকরা কবি।

আপনি কি তার কোনো কবিতা পড়েছেন?

পড়েছি।

কেমন?

কেমন মানে?

কেমন লাগে তার কবিতা?

আমি তার কবিতার ভক্ত নই। তিনি যে ঘরানার কবিতা লিখতেন, আমি বলব, সেটার চল উঠে গেছে। মূলত সাইকোসুফি ঘরানার প্রভাব আছে তার মধ্যে। কিন্তু আমরা কি প্রসঙ্গ থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছি না? গ্রিন করিডোরে একটা কার্গো ফেরি নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে একজন কবির সাবেকি ধাঁচের কবিতা লেখার কী সম্পর্ক?

আমরা তো সেই প্রশ্নই আপনাকে করতে চাইছি।

আমি এসব পাগলামি প্রশ্নের জবাব দিতে প্রস্তুত নই।

আমরা আরেকটু খোলসা করি তাহলে। থিবো বিবিটার সঙ্গে একটি গোপন কাল্টের যোগ ছিল। সেই কাল্টের দুটি বৈঠকে তাকে যোগ দিতে দেখা গেছে। বিবিটার কবিতায় সাইকোসুফি বিষয়বস্তুর অনুপ্রবেশ ঘটতে শুরু করে মূলত এই কাল্টে তার যোগ দেওয়ার পর থেকে।

এগুলো একেবারে বানানো কথা।

উত্তেজিত হওয়ার দরকার নেই। আমরা আরো বলি: নিখোঁজ কার্গো ফেরি আর্নেটাপাসোতে একজন বিশেষ যাত্রী ছিলেন। সশ্রুমণ্ডিত। উদ্ভট পোশাকের। ওই কাল্টে তার যাতায়াত ছিল, আপনার রিপোর্টে একে ‘যোগী’ হিসেবে বারবার উল্লেখ করা হয়েছে।

আপনারা বানিয়ে বলছেন।

আমরা বানিয়ে বলছি না। বরং আপনিই নানান কিছু ইনভেন্ট করে চলেছেন। এই যোগী লোকটির উপস্থিতি আড়াল করার জন্যে আপনি সেকেন্ড আউটপোস্ট স্টেশনে দুজন স্যুটকেসধারী ব্যক্তির অবতারণা করলেন। এগুলো কি বানিয়ে বলা নয়?

আমি আর কিছুই বলবো না। আপনাদের সহযোগিতা করতে আমি বাধ্য নই।

বাধ্য নন, কিন্তু তারপরও আপনি কথা বলবেন। কেননা বড় ধরনের বিপাকে পড়তে যাচ্ছেন আপনি। এখন আমাদেরকে বলবেন কি অনুসন্ধানে নেমে আপনি ঠিক কী ধরনের তথ্য পেয়েছিলেন?

একেবারে মামুলি কিছু তথ্য। ফেরির অন্তর্ধান রহস্যে এগুলো কোনো আলো ফেলতে পারে নি। ফেরিটা সুভেনি গ্রহ থেকে যাচ্ছিল কারাকোরা গ্রহে। সবাই জানে, আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাসড়কে গ্রিন করিডোর একটা মাঝারি দৈর্ঘ্যের পথ। সবচেয়ে নিরাপদ মহাসড়কগুলোর একটি এটি। ট্রাফিকও প্রচুর। সাউথ ব্লকের বিপুল সংখ্যক অধিবাসী এই পথ ব্যবহার করে মূলত ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজে। সুভেনি ছাড়ার বাইশ দিনের মাথায় হারিয়ে যায় আর্নেটাপাসো। কারাকোরা গ্রহ সেখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। নিখোঁজ হওয়ার পনের সেকেন্ড আগে আউটপোস্ট স্টেশনের সঙ্গে শেষ বেতার যোগাযোগ হয়েছিল চালকের। আমি এই টু-ওয়ে কনভারসেশন শুনেছি। বেশ লাইট মুডে দেখা গেছে ফেরির চালককে। তিনি একটি অশ্লীল জোক শেয়ার করেছিলেন স্টেশনের রাতজাগা নারী সিগনাল কর্মীর সঙ্গে। মানে বোঝাতে চাচ্ছি, কোথাও এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না, যা থেকে মনে হতে পারে আর্নেটাপাসোর আসন্ন বিপদ সম্পর্কে কেউ আগাম কোনো আঁচ পেয়েছিল। যেখান থেকে ফেরিটা নিখোঁজ হয়,এর পনের ডাইসেক দূর দিয়ে একটি প্যাসেঞ্জার ক্রুজার যাচ্ছিল ওই সময়। এটির চালকও অস্বাভাবিক কিছু দেখেছেন বলে অনুসন্ধান দলকে জানান নি।

তাহলে?

তাহলে কী?

ফেরিটা গেল কোথায়?

এর জবাব আমার কাছে চাইছেন কেন, জিজ্ঞেস করুন সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ডিপার্টমেন্টকে।

ডার্ক স্পট সম্পর্কে আপনি কিছু একটা বলেছেন আপনার তৃতীয় রিপোর্টে। সেটা আরেকটু খোলসা করে বলবেন কি?

sabuj3cসত্যি বলতে ডার্ক স্পট সম্পর্কে আমার নিজেরও কোনো ধারণা ছিল না। ডেটা সংগ্রহে নেমে প্রথম এটির কথা জানতে পারি আমি। সরকারি অনুসন্ধান দলের একটি অংশ শুরু থেকে এটার ওপর জোর দিচ্ছিল। পুরো গ্রিন করিডোরে তিনটি বিশেষ আড়াআড়ি টানেল আছে, যেগুলো বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় কয়েক সেকেন্ডের জন্য রাডার সার্ভেইলেন্স আওতার বাইরে চলে যায়, মানে ব্ল্যাক আউট বলতে পারেন আর কি। গোপন সামরিক প্রয়োজনে এটা করা হয়। কেউ কেউ এমন তত্ত্ব প্রচার করতে শুরু করেছিলেন যে, আর্নেটাপাসো সম্ভবত এরকমই একটি ডার্ক স্পটে প্রবেশ করে সার্ভেইলেন্সের নিশ্ছিদ্র জাল এড়িয়ে গেছে। তারপর দিক পরিবর্তন করে আড়াআড়ি টানেল ধরে দূরে কোথাও সরে পড়েছে। কিন্তু এই তত্ত্ব বাতিল না করে উপায় নেই। ফেরিটা যেখান থেকে হারিয়ে গেছে,সবচেয়ে কাছের ডার্ক স্পটটাও সেখান থেকে অনেক দূরে। আর চাইলেও গ্রিন করিডোর থেকে খুব বেশিদূর সরে যাওয়া সম্ভব নয় ফেরিটার পক্ষে। আপনাকে জ্বালানির কথা মাথায় রাখতে হবে। আর্নেটাপাসোর যে জ্বালানি ট্যাংক, তা দিয়ে বড় জোর সাত হাজার ডাইসেক দূরত্ব পাড়ি দেওয়া সম্ভব ছিল। আগেই বলেছি, ডিপার্টমেন্টের অনুসন্ধানের চৌহদ্দি গ্রিন করিডোরের দুপাশে পনের পারসেক পর্যন্ত। প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি।

ওয়ার্মহোলের ব্যাপারটা কি ভেবে দেখা হয়েছে?

ভাবার অবকাশ নেই। গ্রিন করিডোরের ধারেকাছে কোথাও নেই কোনো ওয়ার্মহোলের অস্তিত্ব। এই পথে কোনো লোয়ার ফিল্ড ক্র্যাক কেউ কখনও রিপোর্ট করে নি। আমি বলছি তো,ফেরির অন্তর্ধানের কোনো ব্যাখ্যা হাজির করা সম্ভব হয় নি। রেট্রোথার্মিক স্ক্রিনে আপনি যদি চোখ রাখেন, দেখবেন করিডোর দিয়ে যেতে যেতে হুট করে হাওয়ায় মিশে গেল দেড় হাজার মিটার দীর্ঘ একটা টাংস্টেনের স্তুপ।

অনুসন্ধানে নেমে আপনি এ যাবৎ আঠারোটি রিপোর্ট তৈরি করেছেন। এগুলোকে আমরা দুটি ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম ধরনের রিপোর্ট আপনি পাঠিয়েছেন আপনার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান বুকাদেরোতে। এইসব রিপোর্টে আপনার সকল কৌতুহলের কেন্দ্রবিন্দু ফেরিটার সম্ভাব্য অবস্থান। আপনি নিজে যেন নিজেকে কনভিন্স করার চেষ্টা করেছেন, ফেরিটাকে কোথাও না কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে। যদিও শেষের দিকে আপনার হতাশা আপনি গোপন রাখতে পারেন নি। এ সময় আপনার রিপোর্টগুলো ক্রমশ সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছিল।

একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি করার তো কোনো মানে হয় না। অনুসন্ধানে নিযুক্ত যন্ত্রগুলোর ডেটা আসলে ঘুরপথে একই তথ্য দিয়ে যাচ্ছিল বিভিন্ন প্যারামিটারের আড়ালে।

ঠিক আছে। কিন্তু আমরা দেখি, বুকাদেরো পর্ব শেষ হতেই আপনার মনোযোগের বিষয়বস্তুর একটা প্যারাডাইম শিফট ঘটলো। ফেরির বদলে এবার আপনার সকল কৌতূহল কেন্দ্রীভূত হলো ফেরির সতের আরোহীকে ঘিরে। আপনি এমনভাবে এদের ব্যাপারে খোঁজখবর শুরু করলেন, দেখে মনে হতে পারে, এদের মধ্যে বিশেষ কাউকে আপনি খুঁজছেন। আমাদের সন্দেহ করার যথেষ্ঠ কারণ আছে, আপনার অভীষ্ট আর কেউ নয়, সশ্রুমণ্ডিত সেই রহস্যময় ব্যক্তি, যাকে আপনি ‘যোগী’ নামে অবহিত করেছেন বারবার।

আমাকে সব ধরনের তথ্যই জোগাড় করতে হয়েছে। পেশাদার প্রাইভেট আই হিসেবে নিয়োগকারীর অভিরুচির প্রতি আমাকে অনুগত থাকতে হয়।

দেখুন, ঘুরেফিরে আমরা কিন্তু সেই একই জায়গায় এসে পড়লাম—এক সাইকোসুফি কবি, একটি গোপন কাল্ট আর এক রহস্যময় যাত্রী।

আপনারা অযথা কল্পনাশক্তির অপচয় ঘটাচ্ছেন।

আপনি রিল্যাক্সড হয়ে বসুন। আমরা এবার আপনাকে একটি কবিতা পড়ে শোনাবো। থিবো বিবিটার সর্বশেষ কবিতা।

আমি কবিতা শোনার মুডে নেই।

কবিতার নাম ‘ট্রান্সফরমেশন’। চার লাইনের কবিতা। শুনুন, আপনার মন্দ লাগবে না:

আমি তাকিয়ে আছি
আমার চোখের দিকে
তুমি দেখছো
চোখ ভেদ করে আমাকে।

কেমন?

ক্লিশে। কোনো অর্থ বহন করে না।

ভালো করে লক্ষ্য করুন চরণগুলো। কী বলা হচ্ছে? এখানে দুটি সর্বনাম। কিন্তু আসলে কতোজনের কথা বলা হলো? কয়টি চোখ? কে তাকাচ্ছে কার দিকে? কী দেখছে?

অর্থহীন।

লক্ষ্য করুন, এখানে পারসপেকটিভ বদল করা হয়েছে দুবার। একবার আপনি ভেতরে তাকাচ্ছেন, কিন্তু ভেতরে তাকিয়ে আসলে দেখছেন বাইরেটা। আবার, উল্টো করে আপনি আসলে বাইরে তাকাচ্ছেন, কিন্তু দেখছেন ভেতরটা। দৃষ্টি উল্টে যাচ্ছে।

একটা ক্লিশে কবিতার ততধিক ক্লিশে ব্যাখ্যা।

আমাদের সবচেয়ে বড় কৌতূহল কিন্তু কবিতাটার নাম নিয়ে। এটার নাম ট্রান্সফরমেশন কেন?

কবির খেয়াল।

লক্ষ্য করুন, বিবিটার ওই গোপন কাল্টের নাম ট্রান্সফরমেশন।

লক্ষ্য করলাম।

বিবিটাকে পাঠানো আপনার রিপোর্টগুলো আমরা ভালো করে লক্ষ্য করেছি। কয়েকটি বিষয় আমাদের কিছুটা ধন্দে ফেলে দিয়েছে। আমরা এগুলোর ব্যাখ্যা পেতে আগ্রহী। শুরুর দিকে আপনি খুবই কেতাবি ঢঙে তথ্য আর উপাত্ত উপস্থাপন করে গেছেন, অবশ্যই কোডেড ল্যাঙ্গুয়েজে। কিন্তু যতই সময় গড়িয়েছে,আপনার বিষয়বস্তু আর ভাষা দুটোই বদলে যেতে শুরু করেছে। আমরা দেখি,ধীরে ধীরে সাইকোসুফি ঘরানার কিছু উপকরণ আপনার রিপোর্টে ঢুকে পড়ছে। আপনি যেন একটা তদন্তের অগ্রগতির বিবরণ সরবরাহ করছেন না। একটা মরমী বৃত্তের বলয়ে যেন ধীরে ধীরে প্রবেশ করছেন আপনি।

মিথ্যে কথা।

একটু একটু করে অর্থহীন বক্তব্যে ভরে যাচ্ছে আপনার প্রতিবেদন। অষ্টাদশ রিপোর্টের শেষ বাক্যে আপনি লিখেছেন: ‘আমরা কী দেখছি, তা নির্ভর করে আমরা কীভাবে দেখছি তার ওপর। পারসপেকটিভই সব।’

ভুলভাবে ডিকোড করা হয়েছে আমার রিপোর্ট। কোথাও এ কথা বলা হয় নি।

ত্রয়োদশ রিপোর্টে আপনি একটা অদ্ভুত দৃশ্যের বিবরণ দিয়েছেন। খুব অপ্রাসঙ্গিকভাবে এসেছে দৃশ্যটা। একটা গ্রহণ হচ্ছে। ধীরে ধীরে নিজেরই উপগ্রহের ছায়ায় ঢুকে পড়ছে একটা গ্রহ। কেন?

আমার মনে পড়ছে না এরকম কোনো বিবরণ কোনো রিপোর্টে ছিল কি না। থাকলেও আমি বলব, নিয়োগকারীর অর্থ অপচয় করছিলাম আমি।

গ্রহণ সবসময় একটি দ্বিমুখি পারসপেকটিভের ব্যাপার। আপনি যদি গ্রহে অবস্থান করেন, তাহলে উপগ্রহের গ্রহণ দেখবেন। আর যদি উপগ্রহে থাকেন, তাহলে?

রাবিশ।

“তুমি দেখছো/চোখ ভেদ করে আমাকে…”

আপনারা আমাকে মুক্তি দিন। এই যন্ত্রণা আমি আর নিতে পারছি না।

বিবিটাকে পাঠানো আপনার কোনো রিপোর্ট কেউ গ্রহণ করে নি।

মানে?

মানে প্রাপকের প্রান্তে কেউ ছিল না। একটা ভুয়া ঠিকানায় গিয়ে রিপোর্টগুলো বাউন্স করেছে।

আমাকে যে ঠিকানা দেওয়া হয়েছে, যেখানে পাঠাতে বলা হয়েছে, সেখানেই পাঠিয়েছি।

আমাদের অনুমান, অপর প্রান্তে কোনো প্রাপকই ছিল না কোনোকালে। আপনি আসলে কোনো প্রাপকের উদ্দেশেই পাঠান নি রিপোর্টগুলো।

মানে?

আপনি নিজেকেই নিজে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন। মানে আপনি আর বিবিটা সম্ভবত আলাদা কোনো ব্যক্তি নন।

আপনাদের প্রলাপবাক্য শেষ হওয়ার জন্যে আমি অপেক্ষা করছি।

আপনি ছদ্মবেশী। এখানে আপনি এক অলস পর্যুদস্ত প্রাইভেট আই, কিন্তু মমেরো গ্রহে এই আপনিই এক মরমী কবি, যার কবিতার রসদ যুগিয়ে চলেছে একটি গোপন কাল্ট।

আমি ঘুমিয়ে পড়ছি।

আপনার শেষ রিপোর্টের শেষ বাক্যে আমরা এবার দৃষ্টি দেব। আপনি লিখেছেন, ‘তুমি মুছে যেয়ো না/অপেক্ষা করো/আমি মুছে দিচ্ছি ব্রহ্মাণ্ড।” এখন বলুন, কীভাবে ব্রহ্মাণ্ড মুছে দেওয়া সম্ভব?

সম্ভব, যদি আপনি কবি হন।

আরো একটি পন্থা আছে।

কী সেটা?

আমরা তো সেটাই বের করার চেষ্টা করছি আপনার কাছ থেকে।

আমি বিবিটা নই। আমি বিবিটা নই। আমি বিবিটা নই।

আপনি ওই যোগীকে এভাবে খুঁজছিলেন কেন? চুপ করে থাকবেন না।

শুনুন তাহলে। যোগীকে খুঁজছি, কেননা তাকে খুঁজে বের করতে থিবো বিবিটা আমাকে নিয়োগ করেছে। বিবিটা কেন তাকে খুঁজছে, এটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। আমার নিজের কিছু অনুমান আছে এ বিষয়ে।

আপনার অনুমানগুলো বলুন, আমরা শুনছি।

আমার অনুমান,যোগী আসলে আপনাদের লোক। কাল্টে তিনি ছিলেন একজন ইমপ্ল্যান্ট। যেদিন তিনি ঢোকেন, সেদিনই একটা সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।

কিন্তু আমরা কেন তাকে ইমপ্ল্যান্ট করব?

বিশেষ কোনো কারণে নয়। নিরাপত্তাজনিত সাধারণ উদ্বেগ থেকে। কিছু কিছু কাল্টের গোপন তৎপরতা তো সিকিউরিটির জন্য হুমকি হয়ে উঠছিলই। কে কী করছে, বাইরে থেকে আঁচ পাওয়া কঠিন। কাজেই এরকম সবগুলো কাল্টের ইনার সার্কেলে আপনারা যে একজন করে টিকটিকি বসিয়ে রাখবেন এটাই স্বাভাবিক। প্রথমদিকে থিবো বিবিটার কাল্টকে আপনারা আলাদা গুরুত্ব দেন নি। কিন্তু ভেতর থেকে ‘যোগী’ যেসব তথ্য পাঠাতে শুরু করলো, সেগুলোর জন্য আপনারা মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। আপনারা নড়েচড়ে বসলেন।

কী রকম?

আপনারা টের পেতে শুরু করলেন, বিবিটার কাল্ট শুধু একটা মরমী রিচুয়ালিস্টিক সংগঠন নয়। ওটা তাদের আড়াল মাত্র। এই কাল্ট আসলে একটা স্টাডি সার্কেলের মতো।

কী স্টাডি করতো এরা?

একটা সুপ্রাচীন লোকবিশ্বাস। সেই লোকবিশ্বাস বলছে,ব্রহ্মাণ্ড নিঃশ্বাস নেয়।

হা-হা। এরকম কত রকম লোকবিশ্বাসই তো চালু আছে। এরা কি ইউনিভার্সকে একটা জন্তু হিসেবে কল্পনা করতো না কি?

না। তা করতো না। কিন্তু এরা যেটা বিশ্বাস করতো, সেটা একটু পিকিউলিয়ারই বলতে হবে।

কী রকম?

এরা ইউনিভার্সের ট্রান্সফরমেশনে বিশ্বাস করতো। মানে এদের বিশ্বাস,কতোগুলো পূর্বনির্ধারিত দশায় ইউনিভার্সের ট্রান্সফরমেশন ঘটে। স্বভাবজনিত কারণেই ঘটে। একটা দশা পরিণতি পেলে সেখান থেকে আরেকটা দশায় জাম্প করে ইউনিভার্স। ভেতর থেকে সবকিছু পাল্টে যায়। কিন্তু বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় থাকে না। বিবিটার কাল্ট এই পরিবর্তনগুলো, এর লক্ষণগুলো বোঝার কৌশল রপ্ত করার চেষ্টা করতো। তবে এদের গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল পরবর্তী দশায় ইউনিভার্সের ট্রান্সফরমেশন প্রেডিক্ট করা, এই মহালগ্নের জন্য সকলকে প্রস্তুত করা।

Like সাহিত্য ডটকম on Facebook

এরা কি তা করতে পেরেছিল?

বলা মুশকিল। আলটিমেটলি এগুলো তো একপ্রকার মরমী বিশ্বাসই, কতোটা সিরিয়াসলি নেবেন, সিদ্ধান্ত নেওয়া মুশকিল। তবে আমি শুধু এই তথ্যে আপনাদের মনোনিবেশ করতে বলবো যে, শেষের দিকে যোগীর মধ্যে একটা বিচলিত ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। কোনো কারণে আপনাদের সঙ্গে তার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকবে। খুব ইমার্জেন্সি কোনো তথ্য আপনাদের জানাতে চাচ্ছিল যোগী। সে কারণে কাল্ট থেকে পালিয়ে যায় সে। পালিয়ে কার্গো ফেরি আর্নেটাপাসোতে উঠে পড়ে।

যোগী কী তথ্য বহন করছিল আপনার কোনো অনুমান আছে?

আছে।

কী সেটা?

sabuj3d

যোগী জেনে গিয়েছিল পরবর্তী ট্রান্সফরমেশনের দিনক্ষণ। আর আমার আরো অনুমান, এবারেরটা স্বাভাবিক কোনো ট্রান্সফরমেশন ছিল না। এটা ছিল ইনডিউসড। বিবিটা কাল্ট কোনো এক রহস্যময় উপায়ে ইউনিভার্সের নিজস্ব ট্রান্সফরমেশন প্রক্রিয়াকে তরান্বিত করার উপায় উদ্ভাবন করে থাকবে।

সেক্ষেত্রে আবারও প্রশ্ন: ফেরি নিখোঁজ হলো কেন?

ফেরি নিখোঁজ হয় নি। ফেরিটা তার নিজের জায়গাতেই আছে। তার সামনে পুরো ব্রহ্মাণ্ডটা হারিয়ে গেছে, নিখোঁজ হয়ে গেছে। আমাদের পারসপেকটিভ থেকে আমরা দেখছি,একটা ফেরি চলতে চলতে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। কিন্তু আপনাকে আসলে দেখতে হবে ফেরিটার পারসপেকটিভ থেকে। ফেরিটা ছুটছে সুভেনি গ্রহ থেকে কারাকোরা গ্রহে। গ্রিন করিডোর বেয়ে ছুটছে ফেরিটা। পালাচ্ছে। ছুটতে ছুটতে তার সামনে পুরো জগৎটা মুছে গেছে। হঠাৎ করে।

কিন্তু আমরা টের পাচ্ছি না আমাদের নিজেদের এই ট্রান্সফরমেশন।

কে বললো টের পাচ্ছি না! ভালো করে তাকিয়ে দেখুন। প্রতিটা অনু-পরমাণু বিশ্লিষ্ট করে দেখুন, নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করুন প্রতিটি তুচ্ছ আবর্তন, দেখবেন কিছুই আর আগের মতো নেই। ওই ফেরি আমরা কখনই খুঁজে পাবো না,কেননা আমরাই আসলে হারিয়ে গেছি।

সবকিছুর ট্রান্সফরমেশন ঘটলো কেবল ওই ফেরিটা ছাড়া?

ফেরি নিখোঁজের আর কী ব্যাখ্যা হতে পারে বলুন।

বিবিটার কাল্টের কোনো হাত ছিল এতে?

অবশ্যই ছিল। ওই কাল্ট যোগীকে তার গন্তব্যে পৌঁছতে দিতে চায়নি। বাধা দিতে চেয়েছে। আর খুবই অদ্ভুত উপায়ে সেটা তারা করেছে। ফেরিকে গায়েব করার বদলে তারা গায়েব করে দিয়েছে ফেরির গন্তব্যকে। ওই ফেরি এখন সম্ভবত এক নিঃসীম শূন্যতায় ভাসছে,একটা সময়হীন স্থবিরতায়।

***

জানালার বাইরে নিচে ব্যস্ত শহরের কোলাহল।

আমি চেয়ার টেনে উইন্ডোসিলে পা তুলে দিলাম। আয়েশি ভঙ্গিতে সিগার টানছি।

দেখতে পাচ্ছি বাইরে লম্বাটে অ্যানোরাক পরা একটা লোক মোড় পেরিয়ে আমার পাঁচতলা ভবনের দিকে এগিয়ে আসছে।

বেল বাজছে।

আমি দরজা খুলে দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালাম।

-আমি থিবো বিবিটা।

-আমি আপনাকে চিনি।

-আর্নেটাপাসো নামে একটা কার্গো ফেরি নিখোঁজ হয়েছে। মাত্র কিছুদিন আগে। সেটার তদন্তকাজে আপনাকে ভাড়া করতে চাই।

-আমি অলরেডি ওই তদন্তে নিযুক্ত।

-অসুবিধা নেই। একটু পরে আপনার নিয়োগকর্তা বুকাদেরো ইনক থেকে একটা ফোন পাবেন আপনি। তারা আপনাকে তদন্ত ড্রপ করতে বলবে।

-কেন বলবে?

-এটা সামান্য কোনো অন্তর্ধান ঘটনা নয়। বুকাদেরো এটা হজম করতে পারবে না।

-আমাকে কী করতে হবে?

-আর্নেটাপাসোতে সতের জন যাত্রী ছিল। তার মধ্যে একজনের নাম যোগী। একটা গোপন কাল্ট চালায় লোকটা। তার সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করবেন।

-এর মধ্যে ঝুঁকির কোনো ব্যাপার নেই তো?

-নেই। আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি।

-কীভাবে?

-আমি অথরিটির লোক। আন্ডারকাভার। থিবো বিবিটা আমার নাম নয়। কাল্টের ভেতরে ঢোকার জন্যে আমাকে এই নাম নিতে হয়েছে। কিন্তু আপনাকে এতোকিছু ভাবতে হবে না। যোগী নামক যাত্রী সম্পর্কে আপনি তথ্য জোগাড় করবেন।

-আপনারা আসলে কী চান?

-যোগী লোকটাকে ঠেকাতে।

-কেন? কী চায় লোকটা?

-জগৎটাকে বদলে দিতে চায়।

(চলবে)

About Author

শিবব্রত বর্মন
শিবব্রত বর্মন

কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক। জন্ম : ১৯৭৩, ডোমার, নীলফামারী। প্রকাশিত গ্রন্থ : ছায়াহীন; মিগুয়েল স্ট্রিট (অনুবাদ) ভি এস নাইপল; কদর্য এশীয় (অনুবাদ) সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ; পাইয়ের জীবন (অনুবাদ) আয়ান মার্টেল