shabuj1 (1)

হানা এবং আমি

হানার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা বারবোরো ভিটেনাস-এ। কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে এক্সকারশনে গিয়েছিলাম। হানা এসেছিল একটা দূরের গ্যালাক্সি থেকে।

হানা লাজুক মেয়ে। আর বারবোরো ভিটেনাসের আবহাওয়ার মধ্যে কী যেন একটা জাদু ছিল।

জাদু তো ছিলই। বারবোরো একটা অসমাপ্ত ইউনিভার্স।

মেগালিথ প্যারালালের পুব প্রান্তের নির্জন অংশে পূর্ণাঙ্গ একটা ইউনিভার্সই বানানোর ব্যয়বহুল যজ্ঞ শুরু হয়েছিল, বহুদিন আগে। কিন্তু কী একটা ডামাডোলে প্রকল্প পরিত্যক্ত হয় ৬০ শতাংশ কাজ বাকি রেখে। পদার্থবিদ্যার বেশিরভাগ তত্ত্ব সেখানে পুরোপুরি দাঁড় করানো যায় নি। বস্তু, শক্তি আর সময় সংক্রান্ত নিয়মগুলি বারবোরোতে চল্লিশ শতাংশ খাটে। মানে আরো সরল করে বললে, বারবোরো একটা চল্লিশ শতাংশ রিয়ালিটি।

বহুদিন পর্যন্ত এই ঊন-জগৎ নিষিদ্ধ ছিল। নানারকম গুজব শোনা যেত একে ঘিরে। পরে ইন্টারগ্যালাকটিক আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্ট লিজ নিয়ে বারবোরোকে একটা জায়ান্ট অ্যামিউজমেন্ট পার্কে বদলে ফেলে। সেখানেই রিভার্স সাইক্লিক রাইডে আমি যখন আমার উল্টোদিকে ঘুরতে থাকা ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে আছি, তখন হানা আমার বাহু আঁকড়ে ধরেছিল ভয় পেয়ে।

হানার সঙ্গে আমার মিলন হয় নি। কেননা আমরা চল্লিশ শতাংশ প্রেমে পড়েছিলাম। কিংবা উল্টো করে বললে, আমাদের প্রেমের বারো আনাই ছিল আন-রিয়াল।

আজ বহু বছর পরে হানা আর আমি আবার মুখোমুখি। রেস্টুরেন্টের এক কোণায় একটা টেবিলে বসেছি আমরা। স্যান্ডউইচ আর কফির অর্ডার দেওয়া হয়েছে। আমি তাকিয়ে আছি হানার দিকে। হানার দৃষ্টি কাঁচের দেয়ালের ওপারে একটা পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া নক্ষত্রের দিকে। নক্ষত্রটা  ধীরে ধীরে একটা জায়ান্ট ব্ল্যাক হোলে পরিণত হচ্ছে।

রেস্টুরেন্টের নাম রাটেওটু।রেস্টুরেন্ট অ্যাট দ্য য়েন্ড অফ দ্য ইউনিভার্স এর সংক্ষিপ্ত রূপ। বিগলব্যোম ক্লাস্টারের এই বিশেষ অঞ্চলটিকে মহাবিশ্বের শেষ প্রান্ত বলা যাবে না কোনোভাবেই। তবু এই নাম।দুটো কারণে। এর আদি মালিক লিও কুসানুস ছিলেন ডগলাস অ্যাডামসের ভক্ত। আর দ্বিতীয়ত, এই দিক দিয়ে সত্যি সত্যি হাইপার স্পেস বাইপাস সরণী বানানো হয়েছিল। একটা নয়, দুটা। আর রেস্টুরেন্টটা এই দুই বাইপাসের জাংশনে।

হানা কাছেপিঠেই একটা নিউট্রিনো পল্লীতে থাকে। হানাকে আমি খুঁজে বের করেছি। কারণ, সে এখানে গ্যালাকটিক আর্কাইভে কাজ করে। কিউরেটর বদ্রিলারের বিশেষ সহকারী হানা।

আমি একটা গোপন মিশন নিয়ে এসেছি। আমার প্রতি হানার এককালের মৃদু দুর্বলতাকে আমি কাজে লাগাতে চাই। আমাকে আর্কাইভের রেসট্রিকটেড স্টোররুম থেকে অতি গোপন কিছু নথি হাত করতে হবে। হানা সেই রন্ধ্র। কিন্তু তার আগে হানাকে পটাতে হবে। তার হৃদয় গলাতে হবে। আমি চেষ্টা করছি পুরনো সম্পর্কটা রিভাইভ করতে।

গত কিছুদিন ধরে প্রতি সপ্তাহে লাঞ্চ আওয়ারে আমরা এখানে আসছি। কোণার দিকের এই নির্জন টেবিলে বসছি। পুরনো দিনের গল্প করছি।

হানা আজ কিছু কাগজ নিয়ে এসেছে। একটা হলুদ খামে ভরা। সেটা সে ঠেলে দেয় আমার দিকে। আমি সেটা চকিতে ব্যাগে ভরে ফেলি।

হাইপার লেভিটেশন এক্সপ্রেস এসে পড়ার আগে মেট্রো স্টেশনে বসে আমি দ্রুত সেই হলুদ ফাইলে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছি। একটু পরে এগুলি নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে হবে। আমার মেমোরি ফটোগ্রাফিক। যা পড়ছি তা হুবহু মনে রাখতে পারবো।

আমাদেরকে বলা হয় গ্রিন অ্যানার্কিস্ট। ভুল করে বলা হয়। সবুজ রঙের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আর আমাদের অ্যানার্কিস্ট বলারও কোনো মানে হয় না। আমাদের কোনো সংগঠন নেই। আমরা শিথিলভাবে যুক্ত কিছু আদর্শবাদী যুবক গোপনে যা করছি, তাকে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন বলা যাবে না। আমরা একে বলি গবেষণা। আর খুব বৃহত্তর অর্থে এটা তো একপ্রকার গবেষণাই।

আমাদের মধ্যে অভিন্ন রাজনৈতিক চেতনা বলে যদি কিছু থাকে, তবে সেটা এস্টাবলিশমেন্ট বিরোধিতা। আমাদের লড়াই অথরিটির বিরুদ্ধে। এখন সমস্যা হলো, একটা ইন্টারগ্যালাকটিক সমাজ, যার ভৌগোলিক পরিধি কয়েক ট্রিলিয়ন গ্যালাক্সি আর শত-সহস্র সুপার ক্লাস্টার, যেখানে কয়েক অর্বুদ বুদ্ধিমান সভ্যতার বিকাশ বিলুপ্তি আর নিরন্তর সংঘাত — জানা বোঝা আর ভুল বোঝার এই অতিকায় সমষ্টির মধ্যে এস্টাবলিশমেন্ট বা কর্তৃপক্ষ বলতে যে কী বোঝায় সেটা আমাদের অনেকের কাছেই একটা গুবলেট। মোটা দাগে আমরা যেটা করি, সেটাকে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ বলে অভিহিত করে থাকেন কোনো কোনো তাত্ত্বিক। এটাই বোধ হয় সত্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী বয়ান।

আমরা মহাজাগতিক সাপ্রেশন উন্মোচন করি। কথাটা ভালো করে বুঝে দেখুন। মহাজাগতিক সাপ্রেশন। এই ইন্টারগ্যালাকটিক মহাযজ্ঞ যারা পরিচালনা করছে (শাসন করা কথাটা এখানে পুরোপুরি খাটবে না), বিশেষ কিছু কারণে তাদের বিশেষ বিশেষ কিছু তথ্য গোপন করতে হয়। কর্তৃপক্ষ, প্রতিষ্ঠান – এগুলি থাকতে হলে তার উল্টোপিঠে থাকবেই সাপ্রেশন বা তথ্য গোপন করা, চেপে যাওয়া। থাকতেই হয়। নইলে সাম্রাজ্য টেকে না। এখন এই সাপ্রেশন ঘটে দুটি স্তরে। একটা মনস্তাত্ত্বিক স্তর।গ্যালাকটিক অথরিটি কী করে মানসিক স্তরে সাপ্রেশনের কাজটা করে, সেটা ধ্বনিতত্ত্ববিদ নারায়ণ সেনানায়েক দেখিয়ে দিয়েছেন তার “ভাষা, মাধ্যম ও অচেতন” বইতে। দ্বিতীয় স্তরে সাপ্রেশনের কাজটা কীভাবে হয়, সেটার প্রকৃষ্ট উদাহরণ গ্যালাকটিক আর্কাইভের নিষিদ্ধ কক্ষ। ওই কক্ষে স্তরের পর স্তর নথির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে সেইসব “আন-নলেজ”, যেগুলি কর্তৃপক্ষের ভাষায় “বিধ্বংসী”।

কী আছে ওইসব নথিতে?

আমরা নিশ্চিত নই। কিন্তু আমরা আঁচ করতে পারি। আমরা প্রায় নিশ্চিত জানি, সেখানে আছে যতোরকম অস্বস্তিকর ব্যতিক্রম, ব্যত্যয়, নিয়মবিরুদ্ধতা।এগুলি এক “গুপ্ত ভিন্নতার” দিকে ইশারা করে।  আমরা অনুমান করতে পারি, বিচ্ছিন্নভাবে একটি বা দুটি তথ্য তেমন বিপদজনক মনে না হলেও এগুলি একত্র করলে যে যোগফল দাঁড়ায়, সেটা এক বিশাল “গ্যালাকটিক অপর”।

আমার হাতে হানার দেওয়া হলুদ খাম। খামের ভেতর আটচল্লিশটি টাইপ করা পৃষ্ঠা। অন্ধকার অতল কূপের ওইপারের জগতের একটি টুকরো উন্মোচিত হচ্ছে আমার চোখের সামনে।

shabuj1 (2)

ঘণ্টা বাজছে।  হাইপার লেভিটেশন এক্সপ্রেসের চাকার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি।

আমি দ্রুত পড়ে শেষ করার চেষ্টা করছি লুপ্তপ্রায় বর্বন লিপিতে লেখা এক বিস্মৃত ইতিবৃত্ত।

 

শতরঞ্জ কে খিলাড়ি

(ক্টর নেপ্রুসের ডায়েরি থেকে)

প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে একটা মাইনিং হাসপাতাল থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন ডক্টরহ্লাদি নেপ্রুস। যে অঞ্চলটাকে এখন পরিহাস করে আউটার ফ্রিঞ্জ বলা হয়, সেখানে এককালে এক পাথুরে ধূমকেতুর গায়ে একটা টাংস্টেন খনি ছিলখনির পাশেই ড. নেপ্রুসের একতলা হাসপাতাল।  শোনা যায়, খনি শ্রমিকদের দেহে বিকিরণজনিত রোগের চিকিৎসা দেওয়ার আড়ালে ড. নেপ্রুস আসলে গোপন এক গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেনআউটার ফ্রিঞ্জের সংরক্ষিত এলাকার নিভৃতি কাজে লাগাচ্ছিলেন তিনি।

নিখোঁজ হওয়ার সাত বছর পর হাসপাতালের মেডিসিন স্টোররুম থেকে উদ্ধার হয় ড. নেপ্রুসের ডায়েরি। খনি শ্রমিক নগি থারসিডা এটি আবিষ্কার করেন।

ডায়েরির শেষ দিককার কিছু নির্বাচিত অংশ এখানে তুলে দেওয়া হলো। পড়ার সময় শুধু একটা ব্যাপার খেয়াল রাখতে হবে: ডক্টর নেপ্রুস সন গণনা করেছেন মহাবিদ্রোহকে মাইলস্টোন ধরে। সনের ঘরে উল্লিখিত সংখ্যাটি মহাবিদ্রোহ থেকে বাৎসরিক দূরত্ব নির্দেশ করে। হ্লোকভেক ক্যালেন্ডার প্রবর্তনের আগ পর্যন্ত সাউদার্ন হেমিস্ফিয়ারে এভাবেই সনতারিখ লেখার চল ছিল।             

      

২৩৭ রেভ, ৪৭৭৯৯

আজ সন্ধ্যাবেলা হাঁটতে বেরিয়ে একটা ভীষণ কাণ্ড হলো।

রোজ যেদিকটায় বেরোই, আজ বেরিয়েছিলাম তার উল্টোদিকে। খনি এলাকা থেকে দক্ষিণ-পুব বরাবর কিছুদূর এগোলে একটা চুনাপাথরের খাদ। তার ব্যাদান করা মুখের ধার ঘেষে এগিয়ে ডানদিকে ঘুরলে সামনে একটা হলুদ উপত্যকা। শুকিয়ে যাওয়া উরট নদীর তীর ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমার সঙ্গি আর্দালি যুবকটি দূরে বালুর ওপর পড়ে থাকা একটি চকচকে বস্তু নির্দেশ করলো।

হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম।

কাছে গিয়ে দেখি সেটা একটা স্পেস বাইকের বিচ্ছিন্ন টুকরো। কাছেপিঠেই পাওয়া গেল বাইকের বাকি অংশটি।

সেখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে বালুর মধ্যে একটা অচেতন দেহ। বিশ্রীভাবে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া।

তখনও প্রাণ আছে।

sabu1 b

 

২৪০ রেভ, ৪৭৭৯৯

অজানা মহাকাশচারীর জ্ঞান এখনও ফেরেনি।

গত দুদিনে আমি তার হৃদপিণ্ড আর ফুসফুসকে কাজ চালানোর মতো অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছি। নেপোমুক বর্গের প্রাণিদের দেহে প্রতিসাম্য নেই। ফলে এদের অলটারনেটিভ অর্গান থাকে না। এরা সবসময়ই নাজুক। বিশেষ করে দুর্ঘটনার কাছে এরা সম্পূর্ণ অসহায়।

তাছাড়া খনি এলাকার উচ্চ বিকিরণমাত্রা এরা কতোটা সহ্য করতে পারবে আমার সন্দেহ আছে।

 

২৪৪ রেভ, ৪৭৭৯৯

অজানা মহাকাশচারী আজ প্রথম চোখ মেলেছে।

আমি ক্লোরোফম দিয়ে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিলাম। ফুসফুসে সামান্য ইনফেকশন। আরেকদফা শল্য চিকিৎসা চলবে।

 

২৮৮ রেভ, ৪৭৭৯৯

মহাকাশচারীর নাম থর বোসাম।

কফির মগে চুমুক দিতে দিতে এই নামই বললো লোকটা।

আমি নিশ্চিত, ছদ্মনাম।

কাছেই কেসিওপেদ্রো বেল্ট এলাকায় একটা পুরনো জীর্ণ কারাগার। সেটার দেয়াল ভেঙে পালিয়ে আসা কোনো ডেলিংকোয়েন্ট নিজের সত্যিকার পরিচয় দেবে এমনটা আশা করা বোকামি। যদি সত্যি দাগি আসামি হয়, আমার উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ আছে। এর পিছনে গন্ধ শুকে শুকে হাজির হোক কোনো মহাজাগতিক হাবিলদার, আমি চাই না।

 

৩১০ রেভ, ৪৭৭৯৯

মহাকাশচারীর আরচণ সন্দেহজনক।

সকালে হাসপাতালের পিছনে এক চিলতে বাগানে চিতঙ্গা বৃক্ষের ডালপালা ছেটে দিচ্ছিলাম। ক্র্যাচে ভর দিয়ে থর বোসাম কখন এসে পিছনে দাঁড়িয়েছে, টের পাইনি।

‌‌‌‌‌‘আমার খোঁজে কেউ এসেছিল?’

এমন আকস্মিক প্রশ্নে আমি চমকে উঠলাম।

লোকটা আবার জানতে চাইলো, এখানে কেউ এসে তার খোঁজ করেছিল কিনা, বিশেষ করে সে যখন অচেতন ছিল।

আমি বললাম, কেউ আসেনি।

‘এদিকটায় অচেনা কাউকে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছেন?’

‘দেখিনি।’

আমার কণ্ঠের বিরক্তি আঁচ করতে পেরে থর আর কিছু বললো না। চলে গেল।

রাতে করিডোরে দাঁড়িয়ে সন্তর্পণে জানালাপথে উঁকি দিয়ে দেখি লোকটা তার বিছানায় বসে একটা বড় কাগজ বিছিয়ে কী যেন আঁকিবুকি করছে। হাতে স্কেল আর কম্পাস।

দেখে অনুমান করলাম, কাগজটা একটা গোটানো মানচিত্র হবে।

আমি দরজায় নক করতেই লোকটা দ্রুত সব গুটিয়ে লুকিয়ে ফেললো।

বুঝলাম, বিপদ আসন্ন। এই উৎপাত বেশিদিন রাখা যাবে না।

 

৩১ রেভ, ৪৭৭৯

মহাকাশচারী আগন্তুককে আজ ভয় দেখালাম।

রাতে খাবার টেবিলে বসে বললাম, উরটের পশ্চিম তীরে একটা হলুদ স্পেসবাইক পার্ক করা দেখা গেছে। তার পাশে অ্যানোরাক পরা দুটি লোক দাঁড়িয়ে ছিল।

থর খাচ্ছিল মুখ নিচু করে। মোমবাতির অস্পষ্ট আলোতেও দেখলাম, তার মুখ থেকে রক্ত সরে গেছে। পরের একটা ঘণ্টা সে পই পই করে জানতে চাইল, আগন্তুক দুজনের বিবরণ।

তার চেহারার অস্থির ভাব সে গোপন করতে পারছিল না।

 

৩১৪ রেভ, ৪৭৭৯

যা শুনলাম, অবিশ্বাস্য।

এখনও আমার হাত কাঁপছে।

ভোরের মৃদু আলোয় দ্রুত লিখে ফেলছি থরের কাছে একটু আগে শোনা বিবরণ।

কাল রাতে আমার বাংলো ঘরের খোলা বারান্দায় চেয়ার পেতে বসে আছি। তাকিয়ে আছি অন্ধকার আকাশে জোড়া নীহারিকার উত্তরায়ণের দিকে। এর চেয়ে অপরূপ দৃশ্য মহাজগতে হয় না।  আমার নিচু বেড়ার গেটে খুট করে শব্দ হলো। দেখি, গেট পেরিয়ে খোড়া পায়ে ধীরে হেঁটে আসছে থর বোসাম।

সে এসে আমার পাশে বসে পড়লো।

শুরুতে টুকটাক এলোমেলো গল্প।

আমি টের পেলাম, থর আমাকে কিছু বলতে এসেছে। আর সেটা বলতে সে বেশি দেরি করবে না।

‘আমি কেন এখানে পালিয়ে এসে লুকিয়ে আছি, আপনি কি জানেন?’

আমি বললাম, আমি জানি না।

‘জানতে চান না?’

‘আমার খুব বেশি কৌতূহল নেই। তবে আপনি বলতে চাইলে আমি শুনবো।’

‘আপনি শুনুন। আমি বলতে চাই। বলতে চাই, কারণ আমার সময় ফুরিয়ে আসছে। কাউকে না কাউকে সবকিছু বলে যেতে হবে আমাকে।’

আমি একটা দীর্ঘ বক্তৃতা শোনার প্রস্তুতি নিয়ে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলাম।

থর ভালো বক্তা নয়। তার বর্ণনা এলোমেলো। দরকারি তথ্যগুলি যথাস্থানে উল্লেখ করতে ভুলে যায়। অদরকারি তথ্যের পুনরাবৃত্তি থাকে। কথক হিসেবে সে জঘন্য।

কিন্তু যুগ্ম নীহারিকার মৃদু জ্যোৎস্নার আলোয় সামনের খা খা প্রান্তরে তাকিয়ে থেকে অগোছালো বিবরণে আমি যা শুনছিলাম, তা এতোই বিস্ময়কর আর অপ্রত্যাশিত যে, আমি পুরোটা সময় তন্ময় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকলাম।

থর বোসাম ব্রুবেশতানিয়া গ্রহের বাসিন্দা। একসময় মেট্রোপলিটান ব্যাকবোন নামে যে কাল্পনিক রেখা দিয়ে সবচেয়ে জনবহুল আর উত্থানশীল গ্যালাক্সিগুলির সমাবেশকে চিহ্নিত করা হতো, তার ডান শাখায় ব্রুবেশতানিয়ার অবস্থান। পুরো গ্রহটাই এক অতিকায় শোরগোলময় লোক গিজগিজে নির্ঘুম বন্দর।

sabu1 c

 

এই গ্রহে এক বীমা কোম্পানির সদরদপ্তরে এজেন্ট সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করতো থর বোসাম। মাইনে ভালো। দ্রুত প্রোমোশন। কেননা বীমার ব্যবসা রমরমা।

সুদিন দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

সমস্যা দেখা দিলো গার্গেলিয়ান আপহিভালকে ঘিরে। শুরুতে সেটা একটা শান্তিবাদী আন্দোলনই ছিল। কিন্তু পেছনে কারা যে কলকাঠি নেড়েছে, দেখতে দেখতে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে থাকলো। বিশেষ করে রেড মাস্ক বাহিনির কর্মকাণ্ড দ্রুত সহিংস দিকে বাঁক নেওয়ায় গভর্নর গলগোথা সিনেটকে পাশ কাটিয়ে একক সিদ্ধান্তে এটিকে নিষিদ্ধ করেন। এরপর শুরু হলো দমন অভিযান। নিষ্ঠুর, নজিরবিহীন। ফলাফল, সবকিছুর আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়া: রাজনীতি, দার্শনিকতা, প্রেম, প্রতারণা — সবকিছু। ‘অন্তর্ধান’ তখন বাতাসে সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত শব্দ। একটা বীমা কোম্পানির জন্য এর চেয়ে খারাপ সময় আর হয় না।

থর বোসামের কোম্পানিতে শুরু হয় গণছাঁটাই। বোসামের চাকরি কোনোমতে টিকলো বটে, তবে তার কাজের ধরন গেল পাল্টে। তাকে এখন ক্লায়ান্টদের ফলস ক্লেইম ভেরিফাই করতে হয়। অফিস কক্ষের আরামের দিন শেষ। পুরোটাই ফিল্ডওয়ার্ক।

গ্রহ থেকে গ্রহের শহরেবন্দরে দিনরাত মানুষের পিছু নেওয়া, হারিয়ে যাওয়া লোকের তত্ত্বতালাশ করা – এটা কি ভদ্রলোকের কাজ? দাঁতে দাঁত পিষে চাকরি করে যেতে লাগলো বোসাম। মন্দার কালে এর চেয়ে ভালো কিছু প্রত্যাশাও বিলাসিতা।

এরকম এক অস্থির সময়ে ম্যাক্সিমিলিয়ান ৩০০ গ্রহের অন্ধকার সংকীর্ণ গলিপথে এক প্রতারক নারী ক্লায়ান্টের ছুরিকাঘাতে আহত হলো থর। জখম গুরুতর ছিল। হাসপাতালে তিন মাস। এই দীর্ঘ কর্মহীন অলস তিনটি মাস থর বোসামের জীবনের এক মোড় ফেরানো সময়। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ছাদের কড়িকাঠের দিকে চেয়ে থেকে সে তার জানা তথ্যগুলিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিতে শুরু করলো। আর এভাবে এইসব অপাঙ্‌ক্তেয় তথ্য, অপতথ্য, ঘটনা, অঘটন, গোপনীয়তা, অনুল্লেখ আর অপনোদনের বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম প্যাটার্ন উঁকি দিতে দেখলো থর। সময় আর স্থানের দূরত্বে বিচ্ছিন্ন দুটি ঘটনার মধ্যে সে গোপন কিছু যোগসূত্র খুঁজে পেতে শুরু করলো। শুরুতে এটাকে সে তেমন গুরুত্ব দেয়নি। শ্যাওলাপড়া দেয়ালে তাকিয়ে থাকলে যেমন নানারকম প্রাণিদেহের ছবি উঁকি দেয়, এও খানিকটা সেরকমই। কিন্তু শিগগিরই থর অনুধাবন করতে শুরু করলো, এগুলি মামুলি কোনো যোগসূত্র নয়।  অন্তরালে গভীর আর সুদুরপ্রসারি এক ষড়যন্ত্র দানা বাঁধছে।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েও দুটি মাস চাকরিতে যোগদান করেনি থর বোসাম। তাকে পাওয়া যেতে লাগলো প্যারাগ্লিফিক লাইব্রেরি কক্ষের নির্জন কোণে। বহু বছরের পত্রপত্রিকা, ম্যাগাজিন আর মানচিত্রের স্তুপের মধ্যে ডুবে থেকে শুধু নোট নিতে দেখা গেল তাকে। এ সময় তার আচরণ ছিল উন্মার্গগামীদের মতো। তার চোখেও ঘোলাটে চাহনি। অন্তত ক্যান্টিনে বসে তাকে এই কথাই বললো উদ্বিগ্ন মীরা। মীরা মানে মীরাফ্লিকা, হাসপাতালের সেই ক্ষীণাঙ্গী নার্স মেয়েটি। বোসাম রিলিজড হওয়ার পরও তার চিলেকোঠার বাসায় নিয়মিত আসছে মীরা।

মীরা একপ্রকার জবরদস্তি চালিয়ে লাইব্রেরির ছায়াময় কোণ থেকে উদ্ধার করে থরকে উড়িয়ে নিয়ে যায় সলোমার গ্রহের নির্জন সৈকত এলাকায়। সেখানে খোয়াবিছানো এসপ্লানেডে হেঁটে, টিলার ধারের মোটেলকক্ষের পালকের বিছানায় সঙ্গম শেষে ক্লান্ত থর উপুড় হয়ে শুয়ে মেঝেতে আঙ্গুল দিয়ে অদৃশ্য জ্যামিতিক অবয়ব আঁকছিল। তখন বিরক্ত মীরার হিস্টিরিয়াগ্রস্ত অনুযোগের মুখে প্রথমবারের মতো বোসাম বলতে শুরু করে, সে আসলে কোন চিন্তায় ডুবে আছে।

মীরা শুনছিল সোফায় আধশোয়া হয়ে।

বক্তা আর শ্রোতা দুজনেই নগ্ন।

বোসাম বোঝাচ্ছিল মার্কার পেন্সিল দিয়ে কাগজে অঙ্ক কষে আর নকশা এঁকে। আগেই বলেছি, সে ভালো বক্তা নয়। তার উপর একটা উদগ্রীব বেপরোয়াপনা ছিল তার বাচনভঙ্গিতে। তাছাড়া আইডিয়াটা তখনও পুরোপুরি আকার পায়নি মাথায়। এ কারণে মীরা প্রায় কিছুই বুঝছিল না।

প্রথমটায় বোসাম মীরাকে পত্রপত্রিকায় ছাপা হওয়া কয়েকটি সংবাদ এলোমেলো পড়ে শোনালো।‘কিছু বুঝছো?’

‘না।’

‘কোনো যোগসূত্র চোখে পড়ছে না?’

‘না।’

‘আচ্ছা, প্রথম সংবাদটির দিকে মনোযোগ দাও। লুকাগা নামে একটা শহরে ত্রিশ বছরের এক যুবকের আকস্মিক অন্তর্ধানের খবর। যুবকটির নাম পি কে মুরকক। তার আর কোনো হদিশ পাওয়া যায় না। এবার যেদিন ছেলেটি অন্তর্ধান হয়, সেইদিন ওই একই শহরে আমি আরেকটি রহস্যময় যুবকের আগমনের খবর দেবো। এই যে এই কাগজগুলি দেখো।’

মীরা বোসামের বাড়িয়ে দেওয়া হাত থেকে একতাড়া কাগজ নেয়।

বোসামের চোখে ঘোর।

‘এগুলি কী?’

‘এগুলি হলো লুকাগা শহরের ইমিগ্রেশন অফিসের এন্ট্রি লিস্ট। ওইদিন যারা লুকাগা শহরে ঢুকেছে, তাদের একজন এনড্রিকো। তার কাঁধে একটা ব্যাকপ্যাক, চুল ছোট করে ছাটা। সে হাঁটছিল মাটির দিকে তাকিয়ে। তাহলে আমরা কী পেলাম? লুকাগা শহরে আমরা দুটি ঘটনা পেলাম। একই দিন দুটি ঘটনা। একদিকে মুরকক নামে এক যুবকের অন্তর্ধান, আরেকদিকে এনড্রিকো নামে এক যুবকের আবির্ভাব। কোনো চিত্র পাওয়া যায়?’

মীরা শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না।

‘ঠিক আছে। আমি আমার তদন্ত আরেকটু এগিয়ে নেই। আমরা এবার দেখবো লুকাগা শহরে পা রাখার আগে এনড্রিকো নামের এই যুবক কোথায় ছিল। আমার তদন্ত বলছে, এর আগে সে ছিল তাদুক শহরে। পাহাড়ে ঘেরা একটা দুর্গ শহর। এনড্রিকো কোথা থেকে তাদুকে এলো? সে এসেছে বিন্ধা শহর থেকে। বিন্ধায় সে বেশ কিছুদিন বসবাস করেছে। তাহলে আমরা দেখছি,  এনড্রিকো নামের এই ব্যাকপ্যাকার অল্প সময়ের মধ্যে তিনটি দূরবর্তী গ্রহের তিনটি আলাদা শহর অতিক্রম করেছে। আমরা এবার এই তিনটি শহরের ভৌগলিক অবস্থান দেখবো। এই যে…’

বোথাম মেঝেতে একটা বড় মানচিত্র বিছিয়ে দেয়। সেখানে বিন্ধা, তাদুক আর লুকাগা শহর সে মার্কার দিয়ে যুক্ত করে। মানচিত্রের গায়ে ইংরাজি ‘L’ (এল্‌) অক্ষরের একটা নকশা তৈরি হয়।

‘নকশাটা দেখো মীরা। কী দেখছো?’

‘এল্‌।’

‘ইয়েস এল্‌। বিচ্ছিন্নভাবে এই নকশা হয়তো কোনো অর্থ বহন করে না। কিন্তু আরেকটু বড় পরিসরে আমাদের তাকাতে হবে। আমি এবার আরো কয়েকটি শহরে পরিব্রাজক এনড্রিকোর চলাচল তুলে ধরছি। এই যে…’

থর বোসাম মানচিত্রের গায়ে আরো কয়েকটি “L” আকারের নকশা আঁকে।

‘দ্যাখো মীরা, দ্যাখো। এনড্রিকো যেখানেই যাক, সে একটা প্যাটার্ন অনুসরণ করে চলে। বরাবর এল্‌ আকৃতির দূরত্ব অতিক্রম করে সে। দেখেছো?’

মীরা এতোক্ষণ একটু অমনোযোগী ছিল। এবার সে ম্যাপের দিকে আরেকটু মনোযোগী চোখে তাকায়।

‘এবার দ্যাখো, পরিব্রাজক এনড্রিকো হঠাৎ করে হারিয়ে যায় হ্রদের শহর ডালুডা থেকে। যেদিন সে হারিয়ে যায়, সেদিনই ডালুডায় আবির্ভাব ঘটে আরেক যুবকের। এই যুবকের নাম প্রুদো। প্রুদো আরেক পরিব্রাজক। তার ভ্রমণের ইতিহাস কী বলে? এই যে প্রুদো যেসব শহর ডিঙিয়ে ডালুডায় এসেছে তার নকশা। একটা দীর্ঘ সরলরেখা। তাহলে এনড্রিকো আউট, প্রুদো ইন। কিন্তু এখান থেকে প্রুদো কোথায় যাচ্ছে?… এই যে এখানে…এই যে মোবাসা শহরে। যাত্রাপথটা দ্যাখো। আগের সরলরেখার সঙ্গে সমকৌণিক।’

মীরা এবার সোফা থেকে নেমে আসে। হাটু মুড়ে সে মানচিত্রের ওপর বোসামের এঁকে যাওয়া বিভিন্ন নকশা দেখছে। তার চোখে কৌতূহল।

বোসাম যেন ঘোরের মধ্যে নকশা এঁকে চলেছে। বিভিন্ন চরিত্রের বিভিন্ন শহরে অবস্থান আর অন্তর্ধানের বিবরণ দিতে দিতে নকশা আঁকছে সে। মানচিত্রটি দ্রুত হয়ে উঠছে নকশার দুর্বোধ্য জটাজাল।

‘কী বুঝছো?’

একটু আগেও মীরার মনে হচ্ছিলো সে যেন কিছু কিছু বুঝছে। কিন্তু আবার সব জট পাকিয়ে যেতে শুরু করেছে।

‘দ্যাখো, এটুকু তো পরিষ্কার যে, বিশেষ কতগুলি লোক কিছু বিশেষ প্যাটার্ন মেনে চলাফেরা করছে। এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, যে লোক যে প্যাটার্ন মানছে, সে কেবল সেই প্যাটার্নই মানছে। অন্য কোনো প্যাটার্ন সে অনুসরণ করছে না। তাদের চলাফেরা কেমন যেন ডিকটেটেড।’

মীরা মাথা নাড়ে।

‘এবার আমি একটু সরল করে দেই। প্রথম যে যুবকটির কথা বলেছিলাম, তার প্রসঙ্গে ফিরে যাই। কী যেন নাম বললাম যুবকটির?’

‘এনড্রিকো।’

‘কীরকম প্যাটার্ন মেনে চলে এনড্রিকো?’

‘এল্‌ প্যাটার্ন।’

‘হুম। আসলে এল্‌ নয়। আমি বলবো, আড়াই ঘর। সামনে দুই ঘর, পাশে এক। এভাবে আড়াই ঘর চলে এনরিকো।’

মীরা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। ‘সেটা আবার কী?’

নগ্ন বোসাম এবার উঠে দাঁড়ায়।

সে বিশাল মানটিত্রের জটপাকানো নকশার ওপর পায়চারি করতে থাকে।

‘তুমি দাবা খেলার নাম শুনেছো? দাবা? চেস? শতরঞ্জ?’

মীরা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।

‘শোনোনি? শোনো, দাবা হলো এই ইউনিভার্সের আদিম খেলাগুলির একটি। শোপিনরিড ক্লাস্টারের বিবলিও টেরিটোরির নাম-না-জানা এক গ্রহে এই খেলার জন্ম। যে অল্প কয়েকটি খেলা মহাযুগের সীমানা ডিঙিয়ে গ্যালাকটিক এরায় টিকে থেকেছে দাবা সেগুলির একটি।’

‘কিন্তু একটা পুরনো খেলার সঙ্গে এইসব অন্তর্ধান নকশার কী সম্পর্ক?’

‘সম্পর্ক আছে। গভীর সম্পর্ক আছে। আমি যাদের কথা এতোক্ষণ বললাম, তারা সকলেই দাবার ঘুঁটিগুলির নিয়ম মেনে চলাচল করছে। তার মানে কী, তুমি বুঝতে পারছো?’

‘না পারছি না। তার মানে কী?’

‘তার মানে, এরা সবাই দাবা খেলার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কয়েক হাজার গ্যালাক্সি জুড়ে বিস্তৃত এক অদৃশ্য দাবার বোর্ডে চলছে এক বিশাল দাবার গেম। এনড্রিকো একটা ঘোড়া বা নাইট। প্রুদো হচ্ছে বিশপ বা হাতি। মুরকক ছিল পওন।’

এতোক্ষণ উত্তেজনার ঘোরে কথা বলছিল বোসাম। এবার যেন সে কিছুটা ক্লান্ত বোধ করে। শুয়ে পড়ে মানচিত্রের ওপর।

***

এতোটুকু বলে থর বোসাম চুপ করে গেল। তাকিয়ে থাকলো সামনে ফাঁকা প্রান্তরের দিকে।

থরের পাশে বসে আমি এই অবিশ্বাস্য হাইপোথিসিস শুনছি।

জোড়া নীহারিকা দক্ষিণে ডুবে গেছে। আকাশে এখন অমাবস্যা।

আমি বললাম,‘তাহলে মুরককের অন্তর্ধান ঘটেছিল এনড্রিকোর কারণে?’

‘হ্যাঁ। দাবার একটা ঘুঁটি আরেকটা ঘুঁটিকে খেয়ে ফেললে সেই ঘুঁটি বোর্ড থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।’

‘বুঝলাম। কিন্তুসরিয়ে কোথায় নেওয়া হয়?’

এ প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না বোসাম। সে নিরুত্তর তাকিয়ে থাকে।

‘আচ্ছা আরেকটা প্রশ্ন। দাবার গেম কি একটিই খেলা হচ্ছে?’

‘না। আমি হিসাব কষে দেখেছি, অন্তত তিনটি গেম চলছে। বোর্ডগুলি একটার ওপর আরেকটা সুপারইমপোজ করা। তবে একই কৌণিক বিন্যাসে না। একটা বোর্ডের সঙ্গে আরেকটার কৌণিক বিচ্যুতি সাড়ে ১৯ ডিগ্রি।’

‘ওরেব্বাস!’

‘কল্পনা করুন, কী ভীষণ এক জটিলতা। একে তো এক একটি ঘুঁটির শুধু চলাফেরা বিশ্লেষণ করে তাদের মধ্য থেকে প্যাটার্ন আবিষ্কার করতে হয়েছে আমাকে। সেটা তথ্য আর উপাত্তের দুরূহজটিল এক জঙ্গল। আবার পাশাপাশি দুটি ঘুঁটি খেলছে দুটি আলাদা বোর্ডের হয়ে।’

‘হুম। আপনি যে পাগল হয়ে যাননি, সেটাই অনেক। আচ্ছা, এবার একটা প্রশ্ন না করেই আর পারছি না। মানলাম যে, ইউনিভার্স জুড়ে ছড়ানো বোর্ডে চলছে গোপন এক দাবার খেলা। কিন্তু কারা খেলছে? খেলোয়াড় কারা?’

কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল থর। আমার প্রশ্ন শুনে থেমে গেল। তার চেহারায় একটা ছায়া পড়েছে। ভয়ের ছায়া।

থর চুপ করে থাকলো। দীর্ঘক্ষণ। যেন আমার প্রশ্নটি শুনতেই পায়নি।

আমি গলা খাকরি দিলাম।

‘থর বোসাম। কারা খেলছে এই গেম?’

‘বলবো। আমি সব বলতেই তো এসেছি। এইখান থেকে শুরু আমার অনুসন্ধানের দ্বিতীয় পর্ব। খেলার উপস্থিতি সম্পর্কে আমার মধ্যে যখন আর কোনো সন্দেহ থাকলো না, আমি তখন খুঁজতে শুরু করলাম নেপথ্যের খেলোয়াড়দের। যদি তিনটি গেম খেলা হতে থাকে, তাহলে অন্তত ছয় জন খেলোয়াড় আছে, এটা তো মানবেন?’

‘হুম। নিঃসন্দেহে।’

‘শুরুতেই আমাকে একটা কথা ভাবতে হলো। দেখুন, যখন দাবা খেলা হয়, তখন খেলোয়াড়রা ওপর থেকে নিচে তাকায়। বোর্ড থেকে তুলে নেয় ঘুঁটি। এখন আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি শুধু বোর্ড আর ঘুঁটি। এক একটা ঘুঁটি অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখছি আমরা। তার মানে কী?’

‘তার মানে খেলোয়াড়রা অন্য একটা জগতে অবস্থান করছে। আমাদের চেয়ে ভিন্নতর বা উচ্চতর একটা রিয়ালিটিতে।’

‘এগজাক্টলি। তার মানে আমরা তাদের নাগাল পাবো না, তাই তো? কিন্তু আমি আপনাকে আরেকটা কথা ভেবে দেখতে বলবো। আপনি যদি পদার্থবিদ্যার ডাইমেনশন বা মাত্রা দিয়ে বিষয়টি বিবেচনা করেন, তাহলে দেখবেন, একটা বস্তু সব মাত্রাতেই বিরাজ করে। আপনি যদি তিন মাত্রার একটা বস্তু হয়ে থাকেন, তাহলে দুই মাত্রার জগতে আপনার একটা ছায়া পড়বে। আর আপনি যদি পাঁচ বা ছয় মাত্রার বস্তু হয়ে থাকেন, তাহলে নিচের মাত্রার জগতগুলিতে আপনার ত্রিমাত্রিক বা চতুর্মাত্রিক ছায়া পড়বে। এখন এই দাবার খেলোয়াড়রা, তারা যেই হোক না কেন, এই জগতে তাদের একটা ছায়া উপস্থিতি আছে, থাকতেই হবে।’

‘মানছি।’

‘তাহলে আমাকে খুঁজে বের করতে হবে কতগুলি ছায়া। আমি ছায়া কথাটা রূপক অর্থে ব্যবহার করছি। এর সত্যিকার অর্থ হলো, আমি যাদেরকে খুঁজছি, তাদেরকে আমি ব্যক্তি হিসেবে নাও পেতে পারি। এই জগতে তাদের রূপটা হবে একেবারেই ভিন্ন। তারা আসলে ছদ্মবেশ নিয়ে থাকবে। হয়তো একটা বড় ভবন, বা একটা মেট্রোরেলের লোহার পাতের ছদ্মবেশে অবস্থান করছে তারা। ঠাট্টার মতো শোনাচ্ছে? কিন্তু আমি আসলে এ দিয়ে তাদের শনাক্ত করার ইমপসিবিলিটি বোঝাতে চাচ্ছি।’

‘হুম। তার মানে তো তাদের শনাক্ত করার কোনো উপায় নেই আসলে।’

‘এই পদ্ধতিতে নেই। আমি তখন ভিন্ন একটা পথ বেছে নিলাম। আমি খেলায় মনোনিবেশ করলাম। আমি যদি ভালো করে গেমগুলি লক্ষ করি, যদি চালগুলি বিশ্লেষণ করি, তা থেকে আমি অন্তত খেলোয়াড়দের ব্যক্তিত্বের একটা ছাঁচ অনুমান করতে পারবো। বুঝতে পারবো, যারা খেলছে, তাদের স্বভাব কেমন, তাদের পরস্পরের মধ্যে কোনো আন্তঃসম্পর্ক আছে কিনা, খেলতে খেলতে তারা লম্বা বিরতি নিচ্ছে কিনা, বিরতিগুলির মধ্যে কোনো প্যাটার্ন আছে কিনা – মানে এগুলি কি খাবার বিরতি, নাকি ঘুমের — ইত্যাদি। বিশেষ করে যখন ভুল চাল দেওয়া হচ্ছে, তখন আমি আমার অনুসন্ধান আরো তীক্ষ্ণ করছি। দেখার চেষ্টা করছি খেলোয়াড়দের মধ্যে বিরক্তি বা রাগের উদ্রেক ঘটছে কিনা। বুঝতে চেষ্টা করছি, আমাদের ইহজগতের বিন্যাসের চেয়ে তাদের জগতের বিন্যাস কতোটা ভিন্ন।’

‘জিনিয়াস!’

‘ধীরে ধীরে আমি দেখলাম, ছয় খেলোয়াড়ের চিন্তাপদ্ধতি, চাল দেয়ার প্রবণতার ওপর আমার পূর্ণ দখল চলে এসেছে। এতটা দখল যে, আমি তাদের কিছু চাল আগাম প্রেডিক্ট করতে পারছি। আর তখনই আরেকটা ফন্দি এসে গেল মাথায়। আমি যদি গেমের মধ্যে ইন্টারফিয়ার করি? যদি চাল বানচাল করে দেই?’

‘মানে?’

‘মানে ধরা যাক, এনড্রিকো ঢুকবে লুকাগা শহরে। আমি আগাম সেটা জানি। জেনে আমি ওই শহরে তার ঢোকার পথ বন্ধ করে দিলাম। মিথ্যা মামলা দিয়ে আমি তাকে গ্রেপ্তার করালাম। কিম্বা….’

‘কিম্বা…?’

‘কিম্বা আমি তাকে খুন করলাম।’

আমার চোখ বিস্ফারিত।

বোসাম উঠে দাঁড়িয়েছে। সংকীর্ণ বারান্দায় পায়চারি করছে সে।

উত্তর আকাশে ধীরে ধীরে উঠে আসছে পনিরের মতো ছিদ্রময় উরিউরি গ্রহ। একটা পুরো গ্রহকে খনি মালিকরা কীভাবে শুষে নিঃশেষ করতে পারে, তার জলজ্যান্ত উদাহরণ উরিউরি।

‘আমি এই গ্রেট গেমে ইন্টারফিয়ার করি। একবার, দুইবার, তিনবার। প্রথমবার তারা বুঝতে পারেনি, কী ঘটছে। দ্বিতীয়বার তারা সতর্ক হয়ে ওঠে। তৃতীয়বার আমি ধরা পড়ে যাই। মানে তারা জেনে যায় আমার উপস্থিতি।’

‘সর্বনাশ! তারপর?’

বোসাম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে।

‘থর বোসাম। কী হলো তারপর?’

‘তারা তাদের উপস্থিতি জানান দিলো।’

‘কীভাবে?’

‘এমন এক পদ্ধতিতে, আমি যেটা চিন্তাও করতে পারিনি। আমার আগেই আঁচ করা উচিৎ ছিল। উফ, কী ভুলটাই না করেছিলাম।’

‘কী হয়েছিল?’

‘মীরা! মীরাফ্লিকা। মেয়েটাকে যতো নিরীহ দেখায়, সে ততোটা নিরীহ নয়। মীরা ছিল ওদের এজেন্ট, গুপ্তচর। বিশ্বজুড়ে ছড়ানো আছে তাদের এজেন্ট। নানারকম ভেক ধরে। নিষ্ঠুরতায় এরা যে কতদূর যেতে পারে, আপনি কল্পনাও করকে পারবেন না ডক্টর নেপ্রুস।’

‘কিন্তু কী হয়েছিল? কী করেছিল মীরা?’

‘সমুদ্র তীরের নির্জন মোটেলকক্ষে মীরা আমাকে হত্যার চেষ্টা করে। নিষ্ঠুরভাবে। আমি তখন ঘুমিয়ে ছিলাম। পুরো মোটেলকক্ষ দাউ দাউ আগুনে পুড়ে যায়। আমি বরাতজোড়ে বেঁচে গেছি। কিন্তু এরপর শুরু হলো আমার অন্তহীন ফেরারি জীবন। আমি জানি, এভাবে বেশিদিন ওদের ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়াতে পারবো না। এখানে এসে পড়বে ওরা। যে কোনোদিন।’

 

ডক্টর নেপ্রুসের দিনলিপি এখানেই শেষ।

এরপর আর কোনো ভক্তি নেই।

আমরা নিজেরা খোঁজ নিয়ে, নথি ঘেঁটে দেখেছি, ৪৭৭৯৯ অধিবর্ষের ২৩৭ রেভোলিউশনে সত্যি এক অচেনা পেশেন্ট ভর্তি হয়েছিল খনির হাসপাতালে। তবে রেজিস্ট্রি খাতায় তার নাম লেখা হয়েছে ফুয়েরো বারবোসা। ২৩৭ রেভ থেকে ৩১৬ রেভ পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছিল বারবোসা। তারপর এক ধূলিঝড়ের বিকেলে চুনাপাথরের খাদের তলদেশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অনুমান করা হয়, খাদের ঝুঁকিপূর্ণ সংকীর্ণ ধার ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন বারবোসা। আমরা পরে খনি শ্রমিকদের খুব ভালো করে ইন্টারভিউ করেছি। ওই দুর্যোগপূর্ণ দিনের আগে বা পরে আশপাশে কোনো স্পেসবাইক নামতে দেখেনি কেউ।

এ ঘটনার তিন মাস পর অন্তর্ধান ঘটে ডক্টর নেপ্রুসের।

অনেকে বলেন, ডক্টর নেপ্রুসের চলাফেরা খুবই সন্দেহজনক ছিল

(২য় পর্ব)