সবুজ নৈরাজ্যবাদী (২)

 

shabuj2 ba

(পর্ব ১ এর লিংক)

আমি কি এই মেয়েটিকে ভালোবাসি? এই যে মেয়েটি এখন আমার সামনে বসে আছে সোজা তাকিয়ে আছে আমার চোখে মেয়েটির চোখে কী এক আকুতি আমার চোখে সে কি কিছু খুঁজছে? ভালোবাসার কোনো চিহ্ন?

আমার সন্দেহ, হানা এতদিনে জেনে গেছে ওর প্রতি ভালোবাসার কোনো ছিটেফোঁটাও নেই আমার মধ্যে কিন্তু তবু ও নিজেকে এভাবে ব্যবহৃত হতে দিচ্ছে কেন দিচ্ছে, আমি অনুমান করতে পারি কিউরেটর বদ্রিলারের ওপর প্রতিশোধ নিতে চায় ও কেন?

আমি সেটা আর অনুমান করতে চাই না কী হবে এত কিছু জেনে? বদ্রিলারের চরিত্রের কোথায় কী দোষত্রুটি সেগুলো অনেক আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছে আমাকে, রিপোর্ট আকারে আমি তার ব্যাপারে রীতিমত অধ্যয়ন করেছি হানা যে আমার দিকে ঝুঁকবে, আমাকে দেখামাত্র তার মধ্যে বহু বছরের পুরনো প্রেম জেগে উঠবে, সেটা ছিল গণিতের মত ছকবদ্ধ

হানাকে আমি ব্যবহার করছি কিংবা আরো সঠিক ভাবে বললে, আমি ব্যবহার করছি একটা ভেঙে পড়া সম্পর্কের ধ্বংসাবশেষকে আমার লক্ষ্য, গ্যালাকটিক আর্কাইভের নিষিদ্ধ কক্ষ প্রতি সপ্তাহে সেখান থেকে একটি করে নথি সরিয়ে ফেলছে হানা এখানে এই রেস্টুরেন্টের টেবিলে সে গোপনে সেটা তুলে দিচ্ছে আমার হাতে এই রেস্টুরেন্ট: বিজ্ঞাপনের ভাষায় যেটা ইউনিভার্সের শেষ প্রান্ত

তবু হানার মুখোমুখি বসে এই অর্থহীন প্রশ্নটাই আমি নিজেকে বারবার করছি: আমি কি এই মেয়েটিকে ভালোবাসি? কিংবা,আমি কি এই মেয়েটিকে ভালোবাসতে পারতাম, যদি আমাদের মাঝখানে স্বার্থের জটিল এই বীজগণিত না থাকতো?

আমি জানি, প্রেম কথাটার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িয়ে আছে আরেকটা শব্দ: নৈতিকতা যখন দুটি মানুষের মধ্যে একটা যোগসূত্র তৈরি হয়, যখন একটা সম্পর্কের গণিত এসে দাঁড়ায়, তখনই নৈতিকতার সীমারেখায় আমরা পা দিয়ে ফেলেছি কিন্তু এও তো ঠিক যে, নৈতিকতা আসলে আরেকটা বৃহত্তর প্রপঞ্চের প্রবেশদ্বার মাত্র সেই প্রপঞ্চের নাম রাজনীতি প্রেম মানেই রাজনীতি বিশেষ করে, একটা ইন্টারগ্যালাকটিক সভ্যতায়, বহু স্তরে স্তুরীভূত সমাজে, ক্ষমতার বিন্যাসের গোলকধাঁধাময় কাঠামোর মধ্যে প্রেম ততটাই জটিল, যতটা জটিল রাজনীতি

আমি এইসব যখন ভাবছি, তখন হানার চোখে একটা মৃদু চাঞ্চল্য লক্ষ্য করলাম কাচের জানালার ওপারে দেখছি একটা স্পেসবাইক এসে থেমেছে সাদা পোশাকের দুটি লোক নামছে সেটা থেকে আমি এই পোশাক চিনি এরা এখন এসে রেস্টুরেন্টের সব অতিথির পরিচয়পত্র চেক করবে সার্চ করবে সঙ্গে থাকা কাগজপত্র

আমাকে কিছু একটা করতে হবে ওরা এসে পড়ার আগেই আমি উঠে দাঁড়ালাম হানাকে বললাম, তার ভ্যানিটি ব্যাগে আজ যে খামটা সে এনেছে, সেটা আমাকে দিয়ে দিতে হানা দ্বিধা করছিল তার চোখে আতঙ্ক আমি এক প্রকার ছিনিয়েই নিলাম ব্যাগটা পকেট হাতড়ে হলুদ খাম বের করে আমার প্যান্টের পকেটে পুরলাম তারপর হাঁটা দিলাম ল্যাভেটরির দিকে

ডকুমেন্টটা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে কমোডে ফেলার আগে ঝড়ের বেগে তাতে চোখ বুলিয়ে নিলাম আমি আমার জন্যে এটুকুই যথেষ্ঠ এসব পরিস্থিতির জন্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে আমাকে

কমোডের ফ্ল্যাশের শব্দ আর ল্যাভেটরির দরজায় টোকা দেওয়ার ঘটনা ঘটলো প্রায় একই সময়ে

 

আমাকে একটা চেয়ারে বসানো হয়েছে একটা টিমটিম করে জ্বলা বৈদ্যুতিক বাল্বের নিচে

আমাকে এখন জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে জানি, কেবল জেরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না এই জিজ্ঞাসাবাদ নানারকম কৌশল প্রয়োগ করা হবে,শারীরিক যন্ত্রণা যেটির সূচনাবিন্দু এরা একসময় আমার মস্তিষ্কের প্রতিটা স্মৃতিকোষ হাতড়ে বেড়াবে

বাইরে করিডোরে কয়েকটা পায়ের আওয়াজ এগিয়ে আসছে ধীর গতিতে যারা আসছে তাদের কোনো তাড়া নেই

আমারও তাড়া নেই আমি অলসভাবে সেরে নিচ্ছি কিছু মানসিক কাজ কিছু বিশেষ স্মৃতি কোডিং করছি আমি মস্তিষ্কের স্মৃতিচিহ্নগুলোকে এমনভাবে বিকৃত করে রাখছি, যাতে সেগুলো কিছুতেই নাক্তযোগ্য না হয় পরে সময়-সুযোগ পেলে এগুলো আবার ডিকোড করে নেওয়া যাবে

রেস্টুরেন্টের কমোডে ফ্ল্যাশ টানার আগমুহূর্তে কাগজটা দ্রুত পড়ে ফেলেছিলাম আমি এখন সেই স্মৃতি কোডিং করছি আর তা করতে গিয়ে সেটা আবার পড়তে হচ্ছে . বুলগাশেম জেহাফ নামে এক সৌখিন গণিতবিদের লেখা একটি রিপোর্ট মাত্র সাত পৃষ্ঠার রিপোর্টে এক গোপন কেলেঙ্কারির বিবরণ

 

ব্রুশব্যানি প্যারাডক্স

প্রফেসর আতিয়াহুন কিমানি যখন “ফিকটেশিয়ান প্যারাডক্স” নামে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সবচেয়ে বিরক্তিকর সমস্যাটির সর্বজনগ্রাহ্য সমাধানে পৌঁছে গেছেন, তখন তিনি ছিলেন গভীর ঘুমে। ঘুম থেকে জেগে বেশ কিছুক্ষণ তিনি অন্ধকারে বসে ছিলেন। ধাতস্ত হতে সময় নিয়েছিলেন। তারপর ফোন করেছিলেন তার সদ্য বিচ্ছিন্ন বান্ধবী ভাকলিয়েনা ফিওনাকে। ফোনে ওই দিনের মত তৃতীয় দফা তুমুল ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছিলেন তারা, বেশকিছু যৌনগন্ধী অশ্লীল গালিগালাজ বিনিময় হয়েছিল। প্রফেসর কিমানি নিজে পরবর্তীকালে এক স্মৃতিচারণে বলেছেন, ওই রাতে তিনি স্বপ্নে বিমবনি উপবর্গের একটি প্রাণির ঢালু পিঠ দেখতে পেয়েছিলেন।

সেভাবে দেখলে, ফিকটেশিয়ান প্যারাডক্সের সমাধানে পৌঁছানোর পেছনে ভূমিকা রেখে থাকবে তরুণী ফিওনার সঙ্গে প্রফেসর কিমানির সম্পর্কের তিক্ততা এবং বিচ্ছেদজনিত হতাশা। যে-নারী তার প্রতি এমন মুগ্ধ আসক্তিতে নিমজ্জিত ছিল, তিন মাসের ব্যবধানে সে কী করে এতটা বিষাক্ত ঘৃণা প্রকাশ করতে পারে, এই ধাঁধার জবাব খুঁজছিলেন কিমানি। আর ভালো করে তাকালে যে কারো চোখে না পড়ে উপায় নেই, ফিকটেশিয়ান কসমোলজিক্যাল প্যারাডক্সের সঙ্গে কিমানির এই ব্যক্তিগত সংকটের একটা সূক্ষ্ম যোগ আছে। দুটি সমস্যার ধরন এক। তাই বলে বলা যাবে না, মহাবিশ্ব আমাদের চৈতন্যেরই বিম্বিত প্রতিরূপ।

ফিকটেশিয়ান প্যারাডক্স শুরুতে পরিচিত ছিল “ব্রুশব্যানি রেইনবো ইল্যুশন” নামে। তখন মনে করা হতো, ব্রুশব্যানি গ্রহকে ঘিরে যেসব তর্ক দেখা দিয়েছে, সেগুলোর মূলে আছে পর্যবেক্ষণজনিত ত্রুটি। আমরা স্ববিরোধী বিষয় দেখছি, কেননা আমরা ভুল দেখছি। কিম্বা আসলে দেখছিই না।

ব্রুশব্যানি গ্রহকে অবলোকন করার ক্ষেত্রে কিছু ভৌত সীমাবদ্ধতা আছে বটে। কিন্তু দূরত্বই সেটার একমাত্র কারণ নয়। বিটা-রে টেলিস্কোপের কল্যাণে আমরা এখন ২৫ হাজার পারসেকের ওপারের জগতেরও বিবরণ পাচ্ছি। এটাকে বিপ্লব বললে কম বলা হয়।

ব্রুশব্যানি গ্রহের অবস্থান নিমফিয়া নামে যে অঞ্চলে, সেটা করপোরাল বেল্টের ওপারে ৩৫ ডিগ্রি কৌণিক বিচ্যুতিতে। এ কথা তো আজ আর গোপন কিছু নয় যে, পর পর মালার মতো সাজানো যে একসার কৃষ্ণগহ্বরকে আমরা করপোরাল বেল্ট নাম দিয়েছি, সেটা আমাদের দৃষ্টিপথে একটা স্থায়ী পর্দা টেনে রেখেছে। যে কারণে অনেকে এটাকে ব্ল্যাক কারটেইন নামে ডাকেন। এই পর্দার ওপারের জগতের খুব কম তথ্যই আমরা অবিকৃতরূপে পাই। ফলে করপোরাল বেল্টের ৩৫ ডিগ্রি বিচ্যুতিতে যে জগৎ, সেখান থেকে আসা তথ্যে ৬৫ পারসেন্ট ভেজাল থাকতেই পারে।

পারে? না, পারে না।

পারতো, যদি না দুই দশক আগে ফিলবিয়া মানমন্দিরের প্রফেসর সি কে হিট্টি এইসব তথ্য কারেকশনের একটি চৌকস গাণিতিক অ্যালগরিদম উদ্ভাবন করতেন। হিট্টির এই অ্যালগরিদম, যেটি হিট্টি থিওরেম নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে, এক বিস্ময়কর গাণিতিক ছাকনি, যা দিয়ে আপনি পুনর্নির্মাণ করে নিতে পারবেন সেইসব তথ্য, করপোরাল বেল্টের আবেশন যেগুলোকে বিকৃত করে পাঠিয়েছে।

যারা বলেন, প্রফেসর হিট্টি আমাদের নতুন চোখ দিয়েছেন, তারা নিশ্চয়ই বাড়িয়ে বলেন না। কেননা হিট্টি থিওরেমের পর আমরা এখন সম্পূর্ণ নতুন এক কসমোলজি পেয়েছি, যেটি আমাদের জানার এবং বিস্মিত হওয়ার সীমানাকে আরো দূরে ঠেলে দিয়েছে। কসমিক থার্মোগ্রাফিক মানচিত্রে এখন কারটেইনের ওপারের অঞ্চলটিকে চিহ্নিত করা হয় পোস্ট-হিট্টিয়ান টেরিটরি নামে।

sabuj2 c

গত দশক পর্যন্ত কোনো কোনো নিওস্ট্রাকচারাল থিওসোফিস্টের লেখায় কারটেইনের এপারের জগৎকে ‘আওয়ার ওয়ার্ল্ড’ আর ওপারের জগৎকে ‘দেয়ার ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে উল্লেখের চল দেখা যেত, পরে কালচারাল ইউনিওনিস্টদের দাপটের কালে যেটার পরিসমাপ্তি ঘটে।

আমরা এখন পোস্ট-হিট্টিয়ান টেরিটরি সম্পর্কে আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জানি, কিংবা আরো সঠিকভাবে বললে,এ সংক্রান্ত যাবতীয় জ্ঞানের অথেনটিসিটি আমরা এখন আরো জোরালোভাবে দাবি করতে পারি।

এ পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল।

কিন্তু গোল বাঁধলো এই টেরিটরির প্রান্তিক গ্রহ ব্রুশব্যানিকে ঘিরে। পোস্ট হিট্টিয়ান যুগে কসমোলজির এক নতুন সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হলো নিরীহ এই গ্রহটি।

সমস্যা হলো, হিট্টি থিওরেমের ছাকনি প্রয়োগের পরও ব্রুশব্যানি গ্রহ সংক্রান্ত অধিকাংশ তথ্যের ভেজাল দূর হয়নি। এই গ্রহ থেকে আসা তথ্যের পরস্পরবিরোধিতা আগের মতোই অটুট আছে। সমস্যাটা কোথায়? সংগৃহিত তথ্যে? হিট্টি থিওরেমে? নাকি ব্রুশব্যানি গ্রহে? এ নিয়ে তর্ক এবং নতুন নতুন ব্যাখ্যা জ্যোতিঃপদার্থ বিজ্ঞানীদের এক সৌখিন অবকাশ উপকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণিতের নতুন একটি ঘরানাই গড়ে উঠেছে ব্রুশব্যানি গ্রহ সংক্রান্ত সমাধান অনুমান করতে গিয়ে, যার নাম আমরা দিয়েছি ব্রুশব্যানি ম্যাথমেটিক্স, যেটি স্পেকুলেটিভ ম্যাথমেটিক্সের নবীনতম শাখা।

এ সম্পর্কে আরো কিছু বলার আগে পরিষ্কার করা দরকার, ব্রুশব্যানি গ্রহকে ঘিরে সংকটের প্রকৃতিটা কী, এর পরস্পরবিরোধী বিষয়গুলো আসলে কেমন।

তর্কটা প্রথম দেখা দিয়েছিল ব্রুশব্যানি গ্রহের ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে ঘিরে।

ফিলোমেট্রিক পলিগ্রাফ ব্যবহার করে একদল তরুণ সৌখিন স্টারগেজার দাবি করলেন, ব্রুশব্যানি গ্রহের পয়ঃপ্রণালি বিন্যাসের মধ্যে গভীর অসঙ্গতি আছে। এই বিন্যাস তরল পদার্থের একমুখী প্রবাহ নীতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। পরে তাদের সংগৃহীত উপাত্ত ব্যবহার করে হাইড্রোমেট্রিক প্রকৌশলী ফুরে প্যাশোঁ দাবি করলেন, এই অসঙ্গতি ব্যাখ্যা করতে হলে আমাদের তরল পদার্থের একমুখী প্রবাহ নীতির ভিত্তিকাঠামো পরিত্যাগ করতে হবে। এর ব্যবহারিক অর্থ এই দাঁড়ায় যে, ব্রুশব্যানি গ্রহে তরল পদার্থ একমুখী প্রবাহ নীতি মেনে চলে না। এর ড্রেনেজ ব্যবস্থার জ্যামিতিক কাঠামো ইঙ্গিত দিচ্ছে, এখানে বছরের দুটি ভিন্ন পর্যায়ে তরল পয়ঃবর্জ্য বিপরীত প্রবাহে পরিচালিত হয়। একবার উত্তর থেকে দক্ষিণে, তো আরেকবার দক্ষিণ থেকে উত্তরে। কেন?

এক্সোলজিস্টরা যখন এর ব্যাখ্যা খুঁজছেন, তখন আরেক পরত জটিলতার আমদানি ঘটলো। জানা গেল, শুধু ড্রেনেজ ব্যবস্থা না, একই অসঙ্গতি বহন করছে ব্রুশব্যানির নদীব্যবস্থা। বিশেষ করে এই গ্রহের সেতু কাঠামো এবং বাঁধ ব্যবস্থাপনা এই অনুমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত যে, বছরের দুটি ভিন্ন অর্ধাংশে এখানে স্রোত সম্পূর্ণ বিপরীত অভিমুখে প্রবাহিত হবে। মানে, দুই মৌসুমে নদীর স্রোত চলবে বিপরীত দিকে। আবারও প্রশ্ন, কেন?

এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়ার আগে আরো জানা গেল, ওই গ্রহের বেতার ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাও একই অসঙ্গত অনুমানের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। গ্রহের বিদ্যুৎ আর টেলিগ্রাফ খুঁটি সেরকম ইঙ্গিতই দিচ্ছে। এখন তড়িৎ চৌম্বকীয় আবেশ বছরের দুটি বিপরীত সময়ে বিপরীত সাইকেলে ঘুরবে, এমন অনুমান কোনো সুস্থ্য তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে ধারণ করা সম্ভব না, যদি না আপনি ওই কাঠামোর নাম রাখছেন ‘টোটাল কেয়োস’।

এরপর এক্সোবায়োলজিস্টদের পালা। তাদের পর্যবেক্ষণ জানালো, ব্রুশব্যানি গ্রহের অধিবাসীদের হৃদপিণ্ডের গঠনকাঠামো এমন যেন, তাদের দেহের রক্তস্রোত বছরের দুটি বিপরীত সময়ে বিপরীত অভিমুখে প্রবাহিত হয়।

এই আবিষ্কারের পর যেন একটা ফ্ল্যাডগেট খুলে গেলো। এরপর ব্রুশব্যানি গ্রহকে ঘিরে বানের পানির মতো যা-কিছু জানা যেতে লাগলো, তার যোগফলের নাম ‘সুপার কেলেঙ্কারি’। আমি এখানে আর উল্লেখই করবো না ওই গ্রহে আলোর দ্বিমুখী ব্যাতিচার কীভাবে আমাদের তাত্ত্বিকদের মনে অস্বস্তির জন্ম দিয়ে চলেছে।

Like সাহিত্য ডটকম on Facebook

আমি কেবল পলি-ফিলোলজিস্টদের একটি কেলেঙ্কারিময় দাবির কথা জানিয়ে আপাতত রাশ টানবো শুধু এটা দেখানোর জন্য যে, ব্যবহারিক পর্যায়ে ব্রুশব্যানি গ্রহকে সিরিয়াসলি নেওয়ার অবকাশ কীভাবে দ্রুত কমে আসছিল। পলি-ফিলোলজিস্টরা কী দাবি করছেন? তাদের আবিষ্কার ব্রুশব্যানি ভাষার লেখ্য রূপ নিয়ে। ড. তিরুভা সিয়ানি দলিল দস্তাবেজ উপস্থাপন করে প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন, ওই গ্রহের উত্তর গোলার্ধের আদি বাসিন্দাদের বর্ণমালা বা লিপিকাঠামো ইঙ্গিত দিচ্ছে, কীভাবে বছরের দুই অর্ধাংশে দুই বিপরীত অভিমুখে এগুলো পঠিত হয়। এক মৌসুমে বাম থেকে ডানে, তো পরের মৌসুমে ডান থেকে বামে। ফলে গ্রহবাসীরা এমন বিশেষ একটি বিন্যাসে তাদের অক্ষর পদ্ধতি সাজানোর চেষ্টা করেছে, যাতে উভয় দিক থেকে পড়লেও অর্থে হেরফের না হয়। বলা বাহুল্য, এই দুশ্চেষ্টার কারণে ব্রুশব্যানি গ্রহের উত্তর গোলার্ধের লিখনপদ্ধতি প্যালিনড্রোম-ধর্মী আর একঘেয়ে রূপ নিয়েছে। ড. তিরুভা আরো দেখালেন, এই চেষ্টার হাত থেকে রেহাই পায় নি গ্রহের শব্দতত্ত্ব এবং বাক্য বিন্যাসও। আর পরবর্তীকালে সেখানে পরান্বয়ী সাহিত্য আন্দোলনের বিকাশের মুখে এরকম দ্বিমুখি পাঠে অর্থের প্রতিসাম্য বজায় রাখা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয় নি। ফলে বছরের দুই বিপরীত ঋতুতে সেখানে টেক্সটের অর্থ বিপরীত ও বিশৃঙ্খল রূপ নেয়। সৃজণশীল টেক্সটের ক্ষেত্রে এর পরিণতি হয় সবচেয়ে করুণ। মিথ, কিংবদন্তী আর ধর্মগ্রন্থ পাঠে অর্থসাম্য ভেঙে পড়ার মানে দাঁড়ায় বছরের দুই ভিন্ন মৌসুমে ভিন্ন বা ক্ষেত্রবিশেষে বিপরীত ধর্মবিশ্বাসের বিস্তার। ড. তিরুভা দেখিয়েছেন,ব্রুশব্যানি গ্রহের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাট্যকার এপিমো আকিদিওস্তার চারটি ট্রাজিডি কীভাবে বিপরীত মৌসুমে কমেডি হিসেবে অভিনীত হয়ে আসছে। তিরুভা তার এই কেলেঙ্কারিময় প্রবন্ধ শেষ করেছেন এই বলে যে, চূড়ান্তভাবে দুটি বিষয় অনুমান করার হাত থেকে তিনি নিজেকে নিবৃত্ত করেছেন। প্রথমত, এই বিপরীত পঠনরীতির পরিণতিতে গ্রহের ব্যাকরণ কাঠামোর চূড়ান্ত রূপ কী দাঁড়িয়েছে (কেননা, ধাতুরূপ আর প্রত্যয় পরস্পর পরিচয় ও অবস্থান বদল করলে যা দাঁড়াবে, সেটা হবে যে-কোনো ব্যাকরণবিদের দুঃস্বপ্ন)। দ্বিতীয়ত, গ্রহের দক্ষিণ গোলার্ধের ভাষারীতি এই ফেনোমেনা থেকে নিজেকে আদৌ দূরে রাখতে পেরেছে কিনা (ড. তিরুভা দক্ষিণ গোলার্ধের কোনো টেক্সটের নমুনা হাতে পান নি বলে এ নিয়ে গবেষণা আগায় নি)।

আমরা ফিরে যাবো প্রফেসর আতিয়াহুন কিমানির প্রসঙ্গে। আগেই বলা হয়েছে, কিমানি স্বপ্নের ভেতর দিয়ে ব্রুশব্যানি রেইনবো ইল্যুশন বা ফিকটেশিয়ান প্যারাডক্সের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যায় উপনীত হয়েছিলেন সুন্দরী ফিওনার সঙ্গে বিচ্ছেদের রাতে, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এক পরিস্থিতিতে। তিনি আসলে খুঁজছিলেন তার প্রতি ফিওনার প্রগাঢ় ভালোবাসা রাতারাতি তীব্র ঘৃণায় বদলে যাওয়ার ব্যাখ্যা।

ড. কিমানি আমাদের মনোযোগ দিতে বললেন ব্রুশব্যানি গ্রহের কক্ষপথের দিকে, যেটি নিঃসন্দেহে অস্বাভাবিক এবং কৌতূহলপ্রদ। এখন ভাবলে অবাকই লাগে যে, এ বিষয়টা কী করে বিজ্ঞানীদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে গিয়েছিল।

ব্রুশব্যানি সিঙ্গেল প্ল্যানেট সোলার সিস্টেম। মানে এর সৌরপরিবারে একটিই নক্ষত্র আর একটিই গ্রহ।

গ্রহটির কক্ষপথের জ্যামিতিক রূপ উপবৃত্তের মতো। পিমোতি এক্স-থ্রি নামে যে মাঝারি আকৃতির নক্ষত্রকে ঘিরে এটি প্রদক্ষিণ করে, সেই নক্ষত্রের অবস্থান উপবৃত্তের একটি কেন্দ্রে। আমরা জানি, একটি উপবৃত্তের দুটি কেন্দ্র থাকে। তার একটি কেন্দ্রে যদি প্যারেন্ট নক্ষত্রের অবস্থান হয়, অপর কেন্দ্রে অবস্থান কার?

কারো না। অপর কেন্দ্রটি শূন্য।

ড. কিমানি অংক কষে দেখালেন, ব্রুশব্যানি গ্রহের ভর আর পিমোতি এক্স-থ্রির সঙ্গে মহাকর্ষ বলের প্রাবল্য হিসাবে নিলে এটির কক্ষপথের আকৃতির পুরোপুরি ব্যাখ্যা হয় না। মানে কোনো অবস্থাতেই এটির কক্ষপথ উপবৃত্ত হওয়ার কথা নয়। হওয়ার কথা পরাবৃত্ত।

তাহলে?

কিমানি বললেন, একটিই মাত্র পথ খোলা আছে: আমাদের আরেকটি নক্ষত্রের উপস্থিতি কল্পনা করতে হবে, যেটিকে বসাতে হবে উপবৃত্তের অপর কেন্দ্রে। কিমানি বলছেন, এই অদৃশ্য নক্ষত্রের ভর দৃশ্যমান অপর নক্ষত্রের হুবহু সমান কিন্তু বিপরীত।

বিপরীত মানে?

ড. কিমানির ভাষায়, বিপরীত মানে ঋণাত্মক।

শোনা যায়, ফিলবিয়া মানমন্দিরের কনফারেন্স রুমে ড. কিমানি যখন এই হাইপোথিসিস প্রথম উপস্থাপন করছিলেন, তখন সামনের সারিতে বসা পদার্থবিজ্ঞানীদের মুখে একটা সূক্ষ্ম হাসির রেখা উঁকি দিয়েছিল, যেটা শ্রবণযোগ্য অট্টহাস্যে রূপান্তরিত হয়, যখন মানমন্দিরের তরুণ জ্যোতির্বিদ জেহাফ কাবানি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, ড. কিমানি ভূতে বিশ্বাস করেন কিনা। ড. কিমানি নির্মোহভাবে জবাব দিয়েছিলেন, সমীকরণে ঋণাত্মক ভরের অনুপ্রবেশ ঘটাতে ভূতে বিশ্বাসের প্রয়োজন পড়ে না। অদৃশ্য দ্বিতীয় নক্ষত্রটিকে অ্যান্টিম্যাটার হিসেবে গণ্য করলেই সব মিটে যায়।

তাহলে কিমানি হাইপোথিসিসের ব্যবহারিক রূপটি এই দাঁড়ালো যে, ব্রুশব্যানি গ্রহ তার কক্ষপথে দুটি বিপরীত ও বিরোধাত্মক নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করছে।একটি নক্ষত্র ম্যাটার দিয়ে তৈরি হলে অপরটি তৈরি অ্যান্টিম্যাটার দিয়ে। বলা বাহুল্য,এটা কাজ চালানো একটা হাইপোথিসিস,গণিতের এক ইন্সট্রুমেন্ট মাত্র। কিন্তু এর প্রয়োগ পুরো প্যারাডক্সটিকে জলের মতো সরল করে দেয়।

দুটি বিপরীতধর্মী নক্ষত্রকে প্রদক্ষিণ করার ফলাফল কী দাঁড়ায়?

ফলাফল এই যে, বছরের প্রথম অর্ধাংশ এটি যে ধরনের মহাকর্ষ বলের অধীনে থাকে, দ্বিতীয় অর্ধাংশ থাকে বিপরীত মহাকর্ষ বলের প্রভাবে। পরিণতি, সবকিছু উল্টে যাওয়া। বছরের দুটি ভিন্ন মৌসুমে দুটি বিপরীত গ্রহে পরিণত হয় ব্রুশব্যানি। যেন একটি ফটোগ্রাফির নেগেটিভ আর পজিটিভ প্লেট। ওই গ্রহে এ রূপান্তর কতটা সুদূরপ্রসারী হয়েছে,তার বিবরণ আমরা আগেই দিয়েছি।

এখানে এইটুকু ইতিহাস স্মরণে রাখলেই চলবে যে, ফিলবিয়া মানমন্দিরে ড. কিমানির ওই দিনের বিস্ময়কর অভিভাষণের পর ব্রুশব্যানি গ্রহ দ্রুতই আমাদের দিককার মহাবিশ্বে পপুলার ইমাজিনেশন আর পপ কালচারের অংশ হয়ে ওঠে। নানারকম গাণিতিক পাজল তৈরি হতে থাকে ব্রুশব্যানি ফেনোমেনার আদলে। তৈরি হয় ভিডিও গেম। ‘দাবাবা’ নামে একটি খেলার উদ্ভাবন ঘটান গণিতবিদ সুবোশিঙ্কো, যেটি প্রচলিত দাবা খেলার একটি জটিল প্রলম্বিত রূপ, যেখানে প্রতি তৃতীয় চালের পর বোর্ড ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। ঔপন্যাসিক সুসান বিবুর সর্বশেষ ডিটেকটিভ থ্রিলারের পটভূমি ব্রুশব্যানি গ্রহ, যেখানে এক সিরিয়াল কিলার বছরের দুই অর্ধাংশে নিজের পরিচয় পাল্টে নিতে থাকে। সে পরিচয় বদল করে তারই পিছু নেওয়া এক ডিটেকটিভের সঙ্গে। বছরের এক অর্ধাংশে সে খুনি, তো আরেক অর্ধাংশে নিজেই নিজের খুনের রহস্য ভেদের পেছনে ছোটা ডিটেকটিভ।

ফিলবিয়া অভিভাষণের সাড়ে তিন বছর পর সুন্দরী ফিওনা ফিরে আসে প্রফেসর কিমানির জীবনে। একদিন ভদ্রা নদীর তীর ধরে তারা দুজন যখন হাতে হাত রেখে হাঁটছিলেন, তখন দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিওনা প্রতিজ্ঞা করে বসে, শেষ জীবনে তারা ব্রুশব্যানি গ্রহে গিয়ে বসবাস করবে (সরলা ফিওনার একথা জানা থাকার কথা না যে, ব্রুশব্যানি গ্রহের সঙ্গে সকল যোগাযোগ একমুখী, সেখানে যাওয়ার বা কোনো তথ্য পাঠানোর কোনো উপায় কোনোকালে তৈরি হবে না)।

এই পুনর্মিলন স্থায়ী হয় নি। পাঁচ বছরের মাথায় এক তরুণ মোটরসাইক্লিস্টের আহ্বানকে খাটো করে দেখতে ব্যর্থ হয় সুন্দরী ফিওনা।

প্রফেসর কিমানি অভিমানী প্রকৃতির মানুষ। দ্বিতীয় বিচ্ছেদের ধাক্কা সামলানো তার পক্ষে সম্ভব হয় নি। তিনি একটি তীব্র জ্বালাময় এসিড পান করে আত্মহত্যা করেন। আমি তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। এত বিখ্যাত একজন মানুষের এমন নিভৃত নিরাবেগ বিদায় অনুষ্ঠান আমাকে ব্যথিত করেছিল।

কাহিনীর এই স্থলে আমার অনুপ্রবেশ। আমি প্রফেসর বুলগাশেম জেহাফ একজন সৌখিন গণিতবিদ। কিমানির সংস্পর্শে আমি আসি তরুণী ফিওনার মাধ্যমে। আমি ফিওনার দ্বিতীয় প্রেমিক। তার সঙ্গে কিমানির প্রথম বিচ্ছেদের পেছনে আমার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল। কিন্তু ফিওনা ওই অধ্যাপকের কাছে ফিরে গেলে আমরা তিন জন একটি ত্রিভুজ সম্পর্কের মধ্যে নিজেদের আবিষ্কার করি। এবং প্রাথমিক শত্রুতার মনোভাব কেটে যেতে প্রফেসর কিমানির ব্যক্তিত্ব আর প্রতিভার মুগ্ধ ভক্তে পরিণত হই আমি।

শহরের প্রান্তদেশে কিমানির বাংলোবাড়ির স্টাডিরুমে মাঝবয়েসী অধ্যাপকের সঙ্গে আমি যে প্রায় নিয়মিতই তাত্ত্বিক আলোচনায় মেতে উঠতাম, ফিওনার নৈকট্য উপভোগ এর পেছনের একমাত্র অভিপ্রায় ছিল না। নানা বিষয়ে প্রফেসর কিমানির বিশ্লেষণী অভিজ্ঞান আমাকে সত্যি মুগ্ধ করতো। বিশেষ করে নৈশাহারের পর নদীতীরে হাঁটতে বেরিয়ে ড. কিমানি মাঝে মাঝে আমাকে শোনাতেন ব্রুশব্যানি গ্রহকে ঘিরে তার নতুন নতুন উপলব্ধির কথা। তিনি বলতেন, বিপ্রতীপ নক্ষত্র হাইপোথিসিস হয়তো ব্রুশব্যানি গ্রহব্যবস্থার শেষ কথা নয়। অস্বাভাবিক ওই গ্রহের পেছনে আরো কিছু ইশারা লুকানো আছে, যার গাণিতিক সমাধান আমাদের নতুন এক বিস্ময়ের মুখোমুখি দাঁড় করাবে।

আমি জানি, অন্তত দুটি অনুমানের পেছনে তথ্যপ্রমাণ খুঁজছিলেন প্রফেসর কিমানি। একটি হলো, ব্রুশব্যানি গ্রহের অদৃশ্য উপগ্রহ। কিমানি বলছেন, ব্রুশব্যানি সম্ভবত কোনো নিঃসঙ্গ গ্রহ নয়। এটির একটি উপগ্রহ থাকতে পারে, যেটি নেগেটিভ ভরযুক্ত, সুবিধার খাতিরে আমরা যেটাকে অ্যান্টিম্যাটার বলছি। এই উপগ্রহ কখনই দৃশ্যমান হয় না দুই বিপ্রতীপ নক্ষত্রের আলোর জটিল ব্যাতিচার ধর্মের কারণে। দ্বিতীয়ত, ব্রুশব্যানি গ্রহব্যবস্থায় আরো অন্তত তিনটি গ্রহ থেকে গেছে, যেগুলি কেবল দ্বিতীয় নক্ষত্রটিকে ঘিরে ঘোরে। ঋণাত্মক অভিকর্ষের বলয় থেকে এগুলো বের হয় না।

এই দুটি অনুমানই প্রমাণ করা সম্ভব, যদি এবং কেবল যদি আমরা কোনো একবার ব্রুশব্যানি গ্রহের গ্রহণ দেখাতে পারি। আমি জেনেছি, প্রফেসর কিমানি তার মানমন্দির থেকে এই গ্রহণের নিশানাই খুঁজছিলেন।

দ্বিতীয়বার প্রতারিত হয়ে প্রফেসর কিমানি যখন আত্মহননের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করে ফেলেছেন, তখন এক সন্ধ্যায় নদীতীরে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম আমরা। আমার পক্ষে অনুমান করা সম্ভব ছিল না তার মনের ভেতর তখন কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। মাথা নিচু করে হাঁটছিলেন কিমানি। নিশ্চুপ। অন্ধকার গাঢ় হয়ে এলে ফিরতি পথ ধরেন তিনি। তখন একবার আকাশে, বিশেষ করে আকাশের যে অভিমুখে করপোরাল বেল্টের অদৃশ্য কারটেইন থাকার কথা, সেই অভিমুখে তাকিয়ে অদ্ভুত একটা কথা বলেন কিমানি। তিনি বলেন, ‘ব্রুশব্যানি গ্রহকে নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় ভুলটা কী জানো, আমরা সবাই আমাদের দৃষ্টিকোণ থেকে ওই গ্রহটাকে দেখছি। একবারও হিসাবে নিচ্ছি না, ব্রুশব্যানি গ্রহের বাসিন্দাদের চোখে জগৎটা কেমন। একবার যদি আমরা ওদের চোখ দিয়ে দুনিয়াটা দেখতে পারি, আমরা যা দেখবো, আমি নিশ্চিত ড. বুলগাশেম, অনেক রহস্যের জট খুলে যাবে।’

প্রফেসর কিমানির বলার ভঙ্গির মধ্যে কিছু একটা ছিল, আমি তার এ বক্তব্যকে নিছক দার্শনিক উপলব্ধি হিসেবে গ্রহণ করতে পারি নি। আমি আঁচ পেয়েছি, বিধ্বস্ত এই গবেষক আক্ষরিক অর্থেই কিছু একটার পিছনে ছুটতে শুরু করেছেন।

shabuj2b

এর দুদিন পর কিমানির মরদেহ পাওয়া যায়। শোকের আবহ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে আমি তার পরিত্যক্ত বাংলোয় আনাগোনা শুরু করি। বিশেষ করে তার লেখার টেবিল হয়ে ওঠে আমার নতুন অনুসন্ধান ক্ষেত্র। মনে মনে আমি খুঁজছিলাম অসামান্য এই ধীমানের হাতে লেখা অসমাপ্ত কোনো অভিসন্দর্ভ। কিন্তু গুটি কয়েক জটিল জ্যামিতিক নকশা আর নোটবইয়ের মার্জিনে পেন্সিলে লেখা কিছু অসংলগ্ন বাক্যাংশ ছাড়া আমার পক্ষে বেশি কিছু খুড়ে তোলা সম্ভব হয় নি। তবু কোনো এক রোমান্টিক ভাবাবেগের বশে অপাঙ্‌ক্তেয় এই কয়েকটি কাগজের পাতাকেই আমি ড. কিমানির চিন্তাস্রোতের সর্বশেষ নিশানা হিসেবে গ্রহণ করি এবং নিজ পাঠকক্ষে ফিরে সেগুলো এমন গভীর অভিনিবেশে অধ্যয়ন শুরু করি, যেন আমি কোনো গুপ্ত সংকেতলিপি পাঠ্যোদ্ধার করছি।

পরবর্তী কয়েকটি মাস আমাকে এভাবেই অধ্যয়নরত দেখা যাবে, আমার নাওয়া-খাওয়া অনিয়মিত হয়ে পড়বে এবং অমসৃণ গালে আমাকে উদভ্রান্ত দেখাবে।

চতুর্থ মাসে আমি বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসি এবং সোল্লাশে চেঁচিয়ে ঘোষণা করি, প্রফেসর কিমানির নতুন হাইপোথিসিস এখন বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত।

Like Shibabrata Barman on Facebook

ফিলবিয়া মানমন্দিরের জনাকীর্ণ সম্মেলন কক্ষে একটি দুধসাদা বোর্ডে জ্যামিতিক আঁকিবুঁকি করে আমি যা তুলে ধরার চেষ্টা করছিলাম, তাকে আমি বলছিলাম ব্রুশব্যানি প্যারাডক্সের রিভার্স প্রজেকশন। আমি ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করছিলাম না যে, কিমানির শেষ উপপাদ্য হিসেবে আমি যেটি উপস্থাপন করছি, তা আসলে পুরোটা আমারই কল্পনার প্রক্ষেপ। রাতের পর রাত জেগে আমি আমার নিজস্ব চিন্তাকেই প্রফেসর কিমানির দুর্বোধ্য জ্যামিতিক ছকের মধ্যে আরোপ করেছি। সম্ভবত চূড়ান্তভাবে এই আয়রনি ব্রুশব্যানি প্যারাডক্সেরই একটি প্রকাশ মাত্র, যে কারণে এটির নাম রিভার্স প্রজেকশন।

প্রফেসর কিমানির গবেষণার বরাত দিয়ে আমি বর্ণনা করছিলাম, ব্রুশব্যানি গ্রহের বাসিন্দারা তাদের জগৎটাকে কীভাবে দেখে। প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো,ওই গ্রহবাসীরা তাদের উপবৃত্তাকার কক্ষপথকে কখনই উপবৃত্ত দেখে না। তারা সেটা বৃত্তাকার দেখতে পায়। কেননা, দ্বিতীয় নক্ষত্রটি তাদের চোখে শুধু যে অদৃশ্য তাই নয়, ওই নক্ষত্রের কোনো প্রভাব তারা টের পায় না। বছরের অর্ধেকটা জুড়ে গ্রহের সব কিছুর ঋণাত্মক চলনও তাদের দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। অর্থাৎ, একক সৌরব্যবস্থা হলে জগৎ যেভাবে প্রতিভাত হতো, দ্বৈত নক্ষত্র ব্যবস্থা হয়েও জগৎ ঠিক সেভাবেই প্রতিভাত হচ্ছে তাদের কাছে। তাহলে ওই গ্রহের বাসিন্দারা কীভাবে নিশ্চিত হবে, তাদের জগতের সত্যিকার রূপটি আসলে কী? দ্বৈত না একক নক্ষত্র ব্যবস্থার সৌরজগৎ তাদের? কমনসেন্স বলছে, জানার বা নিশ্চিত হওয়ার কোনো পথ খোলা নেই। কিন্তু প্রফেসর কিমানির গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ বলছে, আছে। একটি পথ খোলা আছে। একটিই লুকানো চিহ্ন থেকে গেছে। মাত্র একটি। প্রতি পঞ্চাশ হাজার আবর্তনের পর একবারের জন্য ব্রুশব্যানি গ্রহের কক্ষপথ তার তল পরিবর্তন করবে। এই স্খলন খুবই সামান্য। দৃশ্যমান নক্ষত্রের সঙ্গে দশমিক শূন্য শূন্য তিন ডিগ্রি বিচ্যুতি দেখাবে এই তল।

আমি এই বিচ্যুতির নাম রাখলাম কিমানি ধ্রুবক, কেননা প্রফেসর কিমানি দাবি করছেন, শুধু ব্রুশব্যানি গ্রহের ক্ষেত্রে নয়, সকল ঋণাত্মক বাইনারি নক্ষত্রব্যবস্থার ক্ষেত্রে পাওয়া যাবে বিচ্যুতির এই জন্মদাগ।

এইটুকু বলে আমি থামি। হলভর্তি শ্রোতাদের দিকে তাকাই। তারপর বলি, সুধীবৃন্দ, এ কথা মানি যে, ব্রুশব্যানি গ্রহের এই আচরণ আমাদেরকে অস্বস্তিতে ফেলে। কিন্তু আমরা সত্যিকার বুদ্ধির পরিচয় দেব, যদি ওই গ্রহ থেকে আমরা আমাদের নিজেদের দিকে তাকানোর চেষ্টা করি। কী দেখতে পাই আমরা? এখানেও এক নক্ষত্র, এক গ্রহ। প্রফেসর কিমানির স্থির বিশ্বাস ছিল, আমরা যদি দীর্ঘ সময় আর ধৈর্য্য ব্যয় করতে প্রস্তুত থাকি, যদি গভীর অভিনিবেশে পর্যবেক্ষণ করি এই সৌরপরিবারের কক্ষপথ, তাহলে একবার না একবার আমরা ওই লুকানো জন্মদাগ এখানেও দেখে ফেলতে পারব। তখন, কেবল মাত্র তখন, এক নতুন আলোয় এ জগৎ উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। আমরা শুধু দ্বিতীয় একটা ঋণাত্মক নক্ষত্রই পাবো না, বোনাস হিসেবে পাবো আরো বহু সঙ্গী গ্রহ আর উপগ্রহ, যেগুলো অদৃশ্য হয়ে এতদিন আমাদের পাশাপাশিই পথ চলছে। হতে পারে তারা আমাদের অগম্য, কিন্তু তারা তো আমাদের ভুলে যাওয়া সহোদর-সহোদরাই। তখন এমন অনেক রহস্যের জট খুলে যাবে, যেগুলো এত দিন আমাদের বুদ্ধির অধরা ছিল। হয়তো আমাদের কাছে প্রতিভাত হবে অনেক ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের ব্যাখ্যা। জগৎ হয়ত তখন আর এমন অসহনীয় মনে হবে না।

একথা বলার সময় আমি দর্শক সারিতে চোখ বুলিয়ে একটি নির্দিষ্ট মুখ খুঁজছিলাম।

আমার বক্তৃতা দীর্ঘ হয়েছিল, তার একটা কারণ আমার পেশাজীবন এরকম পরিস্থিতির জন্য আমাকে কখনও প্রস্তুত করে নি।

বক্তব্য শেষে ডায়াস থেকে নেমে আমি হন হন করে বেরিয়ে গিয়েছিলাম।

হলভর্তি শ্রোতা তখনও নীরব হয়ে বসে ছিল, যেন বক্তৃতাকারীর ফিরে আসার জন্যে অপেক্ষা করছে।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। আমি একা হাঁটছি কারখানার দেয়ালের পাশ দিয়ে। আকাশে একটা একটা করে ফুটে উঠছে নক্ষত্র। আমি দৃষ্টি মেলে দিলাম আকাশের সেই অংশটির দিকে, যেখানে ব্রুশব্যানি গ্রহের থাকার কথা। আমি কিছুই দেখতে পেলাম না। খালি চোখে দেখা যায় না এই গ্রহ।

এখন আমি জানি, আরো অনেক কিছু আমরা দেখতে পাব না, কোনো কালে। কিন্তু সেগুলো খোঁজা শুরু না করে আমাদের আর উপায় নেই।

(পর্ব ৩)

About Author

শিবব্রত বর্মন
শিবব্রত বর্মন

কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক। জন্ম : ১৯৭৩, ডোমার, নীলফামারী। প্রকাশিত গ্রন্থ : ছায়াহীন; মিগুয়েল স্ট্রিট (অনুবাদ) ভি এস নাইপল; কদর্য এশীয় (অনুবাদ) সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ; পাইয়ের জীবন (অনুবাদ) আয়ান মার্টেল