সানজিদা

১.
আমি নাইনে। টেনে উঠব, উঠছি।

আমাদের ছাদে ব্যাট বল নিয়ে ছোটভাইয়ের সাথে খেলতেছিলাম। গায়ে গাঢ় সবুজ চেকের টিশার্ট, মাথায় খেলাওয়াড়সুলভ ব্যান্ড। ঘটনাটা স্পষ্ট মনে পড়তেছে তাই কালার-মালারসুদ্ধা কইলাম। পাশের বিল্ডিং-এর ছাদে সানজিদা নামে মেয়েটা আসল, আমাদের রেলিং ঘেষে দাঁড়ায়া আমাকে ডাকল। আমাকে!?

সানজিদা এলাকায় নতুন। খুব একটা নাকি পাত্তা দেয় না, ভাব আছে। ফেস টু ফেস কখনও দেখি নাই, আলাপ দূরস্থ। তাকে মাঝে মাঝে দেখা যায়। কিন্তু আমি তার নাম শুনছি। আমার ভাইবোনেরা আগে থেকে চেনে। ভাইবোনদের মুখে তার কথা বহু শুনছি। কখনও পার্টিসিপেট করি নাই।

ছাদে আমি আর ছোটভাই ছাড়া কেউ নাই, তাই আমাকেই ডেকে জিজ্ঞেস করতে হল।

সানজিদাকে যা দেখলাম কাউকে পাত্তা দেবার কথাও না। আমাকে ডাকাতে অবাক হলেও সেটা প্রকাশ না করে কাছে গেলাম।

যা জিজ্ঞেস করল তা আমাকে জিজ্ঞেস করার কথা না বা তার বলার কথা না। বলল, পরীক্ষার কী অবস্থা?

আমি ভাবতেছি, কীসের পরীক্ষা? আমার তো পরীক্ষা চলে না। আমি তার সাথে পড়িও না।

তারপর বলল, মা কোথায়?

আমার মা!?—এটারও জবাব না দিয়ে ভাবতে লাগলাম। তার আমার মাকে খোঁজার কথা না।

তখন মা ছাদেই উঠছিল।

মাকে দেখালে সে বলল, ও আচ্ছা ঠিকাছে। কিছুক্ষণ দাঁড়াল।

ছোটভাই ডাক দিল। আমি হয় খেলায় ছোটভাইয়ের সাথে কিছু একটা নিয়া বিজি ছিলাম অথবা “আমার কাছে? সানজিদা? নিশ্চিত মজা নিতে আইছে” বুঝে আমি আবার তাড়াতাড়ি খেলায় ফিরে গেলাম।

সে আরো কী কইতেছিল বোঝা হয় নাই আর।

২.
দুপুর বেলা ঘুমাচ্ছি। আমি স্কুলের নিয়মিত ছাত্র। সেদিন হাফ বা ছুটি ছিল। দুপুরে খাবার পর গল্পের বই পড়তে বসার আমার অমোঘ আকর্ষণ আর তপস্যার ব্যাপার ছিল। বই পড়তে পড়তে ঘুমায়া পড়ছি। হঠাৎ গায়ে কী জানি পড়ল।

পাতা পুতা, গোলাপ, পাপড়ি। উঠানের সাথে লাগোয়া ঘর। বাতাসে গাছের পাতা পুতা, ফুল, ফল পড়ার কথা না। পাশে জানালা আছে, কিন্তু মাঝে বাউন্ডারি দেয়াল।

ব্যাপারটা আমলেই নিলাম না। বিছানা নোংরা হবার কারণে আপা ভাইয়ার কাছ থেকে গালি-মাইর খাবার আগেই ঝাড়পুছ করে পরিষ্কার করে ফেললাম।

এরপর ক্রনিকের মত কয়েকদিন এমন গায়ে ফুল পড়ার স্বপ্নে ঘুম থেকে জেগে উঠছিলাম। গুলায়ে ফেললাম। প্রথম দিন স্বপ্ন ছিল! শাল্লার!!

৩.
আমাদের বাসায় পোলাপান নিয়া একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করি। প্রায়ই করতাম ছাদে, উঠানে। পাশের বাড়ির পিচ্ছি অনেকগুলা ফুল নিয়ে এল।

বললাম, গোলাপ কই পাইলি?

বলল, এগুলা সানজিদা আপাদের ওখান থেকে। সানজিদা আপা গোলাপ লাগায়ছিল। সানজিদা আপা ছিঁড়তে দিত না। এতদিন ধরতে পারে নাই, এখন ওরা এলাকা ছেড়ে গেছে।

মাথায় হঠাৎ একটা বাড়ি খাইল, রিওয়াইন্ড করলাম। সানজিদা… গোলাপ…

আমি রোবটের মত স্লোমোশানে বলতে থাকলাম, ফুল না ফুটতেই…

পিচ্ছিটা বলল, না, ফুটছে তো।

ওরা চলে গেছে। আর কখনও দেখা হয় নাই, কখনও না।

এরপর বহুবার গোলাপ দেখছি। আলাদা করে কিছু মনে হয় নাই কখনও।

আজ কেন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে, মনে পড়ায়া দিবে পুঙ্খানুপুঙ্খ!

Tagged with:

About Author

হুমায়ূন সাধু
হুমায়ূন সাধু