সালমান রুশদি—”এই সময়ে লেখক হওয়া এবং আশাবাদী হওয়া খুব কঠিন”

সালমান রুশদির এই সাক্ষাৎকারটি ২০১৩ সালের ২৭ মার্চ দি-টকস ডটকমে ছাপা হয়। একই সময়ে রুশদির মিডনাইটস চিলড্রেন নিয়ে করা একটি ছবিও মুক্তি পায়। রুশদি এখানে ছবি নিয়েও বলেছেন। পৃথিবীর অনেক দেশে নিষিদ্ধ স্যাটানিক ভার্সেস এর কারণে ১০ বছর লুকিয়ে থাকার অভিজ্ঞতা নিয়ে তার লেখা আত্মজীবনীর কথা এসেছে ইন্টারভিউতে। লেখক-জীবন নিয়েও বলেছেন তিনি।

 

সালমান রুশদির সাক্ষাৎকার (২০১৩)

অনুবাদ: মৃদুল শাওন

মি. রুশদি, পৃথিবী সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কি আশাবাদী?

– এক কথায়, না (হেসে)। আমি মনে করি পৃথিবীর ইতিহাসের এই সময়ে লেখক হওয়া এবং আশাবাদী হওয়া খুব কঠিন। কোনো একভাবে অন্ধকার দিকটাই তুলনামূলকভাবে ভালো প্রহসন তৈরি করে।

কোন জিনিসটি আপনাকে লেখালেখি করতে অনুপ্রাণিত করে?

– আমার আর কিছু করার নাই। আমি সবসময় লিখতেই চেয়েছি। আমার জীবনে আরেকটি পরিকল্পনা ছিল, আমি অভিনেতা হতে চেয়েছিলাম। সেটি হয়ে ওঠে নি। আমি সবসময় ভেবেছি, যদি মিডনাইট’স চিলড্রেন নিয়ে কোনো ছবি হয়, আমি অভিনয় করার জন্য জ্যোতিষীর চরিত্রটি পছন্দ করব। আমি যখন উপন্যাসটির প্লট তৈরি করেছিলাম তখন থেকেই ভেবেছি, যদি ছবি তৈরি হয় তাহলে আমার জ্যোতিষীর চরিত্রেই অভিনয় করা উচিৎ হবে।

আচ্ছা, এখন তো ছবি তৈরি হয়েছে। আপনি অভিনয় করেছেন এতে?

rushdi7yy

– পরিচালক আমাকে নিয়েছিলেন, কিন্তু আমিই নিজেকে বাদ দিয়েছি। কারণ, আপনি কখনোই চাইবেন না দর্শকরা দৃশ্যটি দেখে ভাবুক, এটি সালমান রুশদি নয়? (হেসে) ছবির যেখানে আপনার মনোযোগ থাকা উচিৎ সে জায়গা থেকে এটি তা সরিয়ে নিত। আমরা শেষপর্যন্ত দৃশ্যটি কেটে বাদ দিয়েছি।

খুব খারাপ।

– কিন্তু যে চরিত্রটি নিয়ে আমার সবচেয়ে বেশি অনুশোচনা হয়, উইল ফেরেল কোম্পানি আমাকে একটি চরিত্রে অভিনয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। তখন ছবিটির নাম ছিল ‘ইউনাইটেড উইল ফেরেল নাসকার মুভি’, পরে এটির নাম হয়েছিল ‘টাল্লাডেগা নাইটস’।

‘টাল্লাডেগা নাইটস’-এ সালমান রুশদিকে কোন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা যেত?

– তাদের চিন্তা ছিল শুধু একটি শটে। যেখানে একেবারে তিন রকমের তিনজন লোককে নাসকার ড্রাইভার হিসেবে দেখা যায়। এবং আমার মনে হয় তারা জুলিয়ান স্কনাবেল, লউ রীড এবং আমাকে প্রস্তাব দিয়েছিল। (হেসে) এবং আমাদের সবারই হেলমেট এবং ইউনিফর্ম পরে গরম কুয়াশার মধ্য দিয়ে স্লো মোশনে হেঁটে যাওয়ার কথা ছিল। এটি অসাধারণ হত, কিন্তু আমাদের কেউই এটা করতে পারে নি। আমি একটি বইয়ের ট্যুরে ছিলাম, লউ একটি মিউজিক ট্যুরে ছিল এবং জুলিয়ান কিছু একটা করছিল। এবং শেষ পর্যন্ত তারা এটা করার চিন্তা বাদ দেয়। এটা আর হয় নি। এটা করলে আমার ভালো লাগত।

রুশদির আত্মজীবনী

স্যাটানিক ভার্সেস প্রকাশিত হওয়ার পরে আপনার মৃত্যু ঘোষণা করে আয়াতুল্লাহ খোমেনি ফতোয়া জারি করে। এরপর আপনি দশ বছর আড়ালে থাকেন। দশ বছরের সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে আপনি সম্প্রতি একটি আত্মজীবনী প্রকাশ করেছেন। আপনার বুক থেকে একটি ভার নেমে যাওয়াতে কি আপনার ভালো লেগেছে?

– হ্যাঁ। আমি এটা বলার জন্য অনেকদিন অপেক্ষা করেছি কারণ, আমি এই বিষয়টি থেকে যথেষ্ট দূরে একটা জায়গায় পৌঁছাতে চেয়েছিলাম যাতে আমি বিষয়গত দিক থেকে এটি লিখতে পারি। আমি এটাকে কোনো ধরনের আবেগী গল্প করে তুলতে চাই নি। আমি চাই নি এটা অপরাহ শো এর কোনো পর্বের মত হোক। তাই আমি এই ঘটনা শুরু হওয়ার পরে ২৩ বছর অপেক্ষা করেছি। আমি শুধু ফতোয়া জারির ওই বছরগুলি নিয়েই লিখতে চাই নি, এখানে আমার জীবনের শুরুর দিকের কথাও রয়েছে। সত্যিকারভাবে, কখনো ভাবি নি আমি একটি আত্মজীবনী লিখব।

কেন নয়?

– আমাকে মানুষ যখন শুরুর দিকে আত্মজীবনী নিয়ে জিজ্ঞেস করত, আমি বলতাম, আমার আগ্রহ নেই। আমি কেন আত্মজীবনী লিখব? আমি নিজের সম্পর্কে লিখতে আগ্রহী না। আমার লেখক হওয়ার কারণ ছিল অন্য মানুষদের নিয়ে লেখা।

আপনি তাহলে সে ধরনের স্মৃতিকাতর ব্যক্তি না?

– না। আমি শুধু দুর্ভাগ্যবশত একটা আকর্ষণীয় জীবনের অভিশাপ বেছে নিয়েছি।

আপনাকে যদি হুমকি দেওয়া না হত তাহলে কি আপনি আজকে আলাদা একজন লেখক হতেন?

– না। আপনি যদি আমার জীবন সম্পর্কে কিছু না জানতেন—আমার জীবন সম্পর্কে যদি একটা জিনিসও না পড়তেন এবং আপনার কাছে যদি শুধু আমার বইগুলি থাকত—এবং আপনি এই বইগুলিই পড়তেন যেখানে ১৯৮৯ এর সেই অদ্ভুত ঘটনাটি নেই, আমি মনে করি না, আপনি দেখতে পেতেন এই লেখকের জীবনে সেই মুহূর্তে বড় একটি ফাটল ধরেছিল এবং সে ঘটনার পরে তার বইগুলি একদম আলাদা। আমি মনে করি বইগুলির নিজস্ব ধারাবাহিকতা আছে এবং তারা নিজেরাই নিজেদের যাত্রা ঠিক করে নিচ্ছে।

৭০ এর রুশদি

৭০ এর রুশদি

আপনার কি এখনো আপনার কাঁধের ওপর দিয়ে পিছনে ফিরে দেখার তাড়না আছে?

-না, নেই আসলে। সাড়ে দশ বছর হয়ে গেল যেখানে আসলে কোনো কিছু নিয়ে সাবধান হওয়ার কিছু নেই। এটি অনেক বড় একটি সময়। আমি গত দশ বছর ধরে নিউ ইয়র্ক এবং লন্ডনে বসবাস করছি এবং আমি একদম নিখুঁতভাবে স্ট্রেইট-ফরোয়ার্ড জীবন যাপন করি।

আমি শুনেছি যে মিডনাইটস চিলড্রেন ছবিটি বানানোর সময়ে ব্যাপারটি গোপন রাখা হয়েছিল এবং এটির অন্য একটি নাম ছিল। এটা কি মুসলিম র‍্যাডিকালদের আন্দোলনের ভয়ে?

-না। আপনি ভারতে শ্যুটিং করতে গেলে যা হয়—শুধু ভারতে-ই না, পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে—যদি কোনো বই অথবা প্রজেক্ট নিয়ে মিডিয়া খুব আগ্রহী থাকে তাহলে তারা ব্যাপকভাবে সেই প্রজেক্টটির প্রতি মনোযোগ দেয়। এটি আসলেই একটি বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। সে কারণে ছবিটিতে একটি ডামি টাইটেল (বা ছদ্ম শিরোনাম) ব্যবহার করা হয়েছিল এবং এর কারণ ছিল আমরা কারো মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই নি। সেটে প্রবেশ করার জন্য, সাক্ষাৎকার এবং এটা-সেটার জন্য আশেপাশে সবসময় ঘুরতে থাকা এইসব লোকজনকে এড়িয়ে ছবি বানানো যথেষ্ট কঠিন।

আপনি কি ভারতে বেশ বিখ্যাত?

-(মৃদু হেসে) হ্যাঁ, এই সামান্য। এটি ম্যাডোনা বা ইউ-টু হওয়ার মত না। সে ধরনের বিখ্যাত না। আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই এদিক-ওদিক ঘুরতে পারি। আসলে একজন লেখকের জীবনের অধিকাংশই খুব প্রাইভেট অবস্থায় কাটে, নিঃসঙ্গতার মধ্য দিয়ে সে কাজ করার চেষ্টা করে।

About Author

আশরাফুল আলম শাওন
আশরাফুল আলম শাওন

জন্ম টাঙ্গাইলে। পড়াশোনা ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।