স্যার আর্থার সি ক্লার্ক

বিশ্ববিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন লেখক স্যার আর্থার সি ক্লার্কের (১৯১৭-২০০৫) শ্রীলঙ্কার বাসভবনে গিয়েছিলেন ভারতের আরেক বিখ্যাত লেখক অমিতাভ ঘোষ। আর্থার সি ক্লার্কের সাথে দেখা করার ঘটনা নিয়ে তার নিজের ওয়েবসাইটে তিন পর্বের ব্লগ লিখেন অমিতাভ ঘোষ, ২০১১ সালে। এখানে সেই তিন পর্বের ব্লগের অনুবাদ একসাথে থাকছে।


আমি আর্থার সি ক্লার্কের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি কলম্বো ৭ এ একটি বড় পরিসরের বাড়িতে থাকেন। বাড়ির পাশেই সুন্দর একটি বাগান রয়েছে — কিন্তু সেটি খুব একটা বড় নয়। তিনি উপরের তলায় থাকেন এবং তাঁর অ্যাপার্টমেন্ট ও অফিস পাশে একটি সিঁড়ি দিয়ে যুক্ত। একটি গেট দিয়ে বাড়িতে ঢুকতে হয়। গেটটি রহস্যজনকভাবে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে খোলে। সিঁড়ির যে অংশ বাড়ির দিকে তাতে একটি বিশাল মুরাল প্লাস্টার করা –একটি উড়ে যাওয়া মুনস্কেপ।

সিঁড়ি দিয়ে গেলে কম্পিউটার ও ফাইলে ঠাসা একটি বড় অফিসরুম। দেয়ালে সারি করে রাখা স্মারকচিহ্ন (পরে তিনি বলেছেন এটা তার ইগো রুম)। সেখান থেকে অফিসের একজন লোক আমাকে পাশের স্টাডিরুমে নিয়ে গেল। স্টাডিরুমটি অনেক বড়, সুন্দর একটি রুম, কাঠের বুককেসগুলি সারিবদ্ধভাবে রয়েছে। তিনি রুমের একদম শেষে বড় একটি ডেস্কের অন্যপ্রান্তে একটি হুইলচেয়ারে বসে ছিলেন — পরনে বাটিক শার্ট এবং সারং। সারং ঢিল করে বাধা ছিল এবং খুলে যাচ্ছিল। তার চেহারা ছিল সাবধানী, প্রাণবন্ত এবং হাস্যোজ্জ্বল। তাঁর মাথার উপরের দিকের চুল খুব পাতলা এবং তার পেটের আকৃতি একদম একটা পাত্রের মত। আমি যখন ঢুকলাম তিনি তখন হাত নাড়লেন এবং দ্রুত ডেস্কের পিছন থেকে হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে বের হয়ে আসলেন। তিনি অনেক প্রাণবন্ত এবং উৎফুল্ল ছিলেন এবং তাঁর অনেক কথা বলার ছিল।

আমরা একটি সোফায় বসলাম। উপরে মসৃণভাবে এসি চলছিল। তার সামনে টেবিলে অনেকগুলি রিমোট কন্ট্রোল ছড়ানো ছিল। তিনি একটা তুলে নিয়ে বললেন, আমাদের এই ঠাণ্ডা বাতাস দরকার নেই এবং এসি বন্ধ করে দিলেন। আমার অস্বস্তি লাগছিল যে ওখানে বেশ গরম ছিল। তিনি তাঁর একজন লোককে বললেন আমাকে একটি ড্রিংক এনে দেয়ার জন্য। জিজ্ঞাসা করলেন আপনি কী পছন্দ করবেন, গরম কিছু বা ঠাণ্ডা কিছু? আমি একটা কোক/পেপসি চেয়েছিলাম কিন্তু আমাকে দেয়া হল একধরনের শরবত। তিনি বললেন, আমি জানি না এটা কী, কিন্তু এটা আপনাকে যেকোনো মাত্রার ডিহাইড্রেশন থেকে রক্ষা করবে।

তিনি দ্রুত কথা বলছিলেন এবং প্রায়ই গভীরভাবে নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য থামছিলেন। তিনি বললেন, যখন আপনার মত কেউ দেখা করতে আসে আর আমি বেশি উত্তেজিত হয়ে যাই তখন এরকম হয়।

ক্লার্ক ও অমিতাভ

ক্লার্কের বাসায় অমিতাভ

আমরা শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বললাম এবং তিনি বললেন যে তিনি জানেন না এই দেশ কোথায় যাচ্ছে কিন্তু ব্যাপার ভালো মনে হচ্ছে না। তিনি মুখ লম্বা করে বললেন এখন বিশ বছর ধরে যুদ্ধ চলছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম তিনি এই অবস্থা নিয়ে নিরাশ কিনা, তিনি বললেন, আমি নিজেকে পরিপূর্ণ করার মহিমায় বিশ্বাসী সুতরাং আমি আশাবাদী। কিন্তু তিনি মাথা নাড়লেন বিপরীতভাবে।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কি ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়ার কথা কখনো ভেবেছেন?

তিনি নিশ্চিত এরকম কণ্ঠে বললেন, কখনোই না। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে তিনি বললেন, অবশ্যই, যদি অবস্থা বেশি খারাপ হয়ে যায় তাহলে আমাকে যেতে হবে। কিন্তু আমি সম্ভবত অস্ট্রেলিয়া যেতে পারি কারণ পুরো পরিবার ওখানেই আছে।

আমি বললাম, আপনার এখানে থাকার কারণে সরকার অনেক টাকা আয় করে।

– ‘হ্যা, আমি অনেক টাকা এনে দেই’।

‘এবং আপনার উপস্থিতি একধরনের আত্মবিশ্বাসের মত’

– ‘ভুল আত্মবিশ্বাস না, আশা করি।’ তিনি অনিশ্চিত ভঙ্গিতে বললেন।

তিনি আমাকে তাঁর ছবি এবং বই দেখালেন। ছবিগুলি তার অ্যাপোলো প্রোগ্রামে থাকার সময়ের, বাজ অলড্রিন এবং নিল আর্মস্ট্রং এর সাথে; টম হ্যাঙ্কসের স্বাক্ষর করা অ্যাপোলো-১৩ এর একটি পোস্টার, এলিজাবেথ টেইলরের সুন্দর একটা ছবি। কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ভারত নৌ বহরের অ্যাডমিরাল তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছিলেন।

রানির কাছে আমি যেমন বলেছিলাম, আমি নাম ফেলে দিতে ঘৃণা করি… বলে তিনি জোরে হেসে উঠলেন। পরে যোগ বললেন আমি দুইবার রানি এবং প্রিন্স চার্লসের সাথে দেখা করেছি।

তাঁর নাইটহুড উপাধি পাওয়ার ছবি তাঁর দেয়ালে প্লাস্টার করা ছিল।

তাঁর দেয়ালে এইচ জি ওয়েলসের একটা ছবি ছিল। তিনি বললেন, এটা এইচ জি ওয়েলস এবং আমার স্বাক্ষর করা একমাত্র ছবি। তারপর তিনি বললেন, আপনি জানেন আমি কখনো তাঁর সাথে দেখা করি নি।

তিনি এইচ জি ওয়েলসের সাথে দেখা করে থাকতে পারেন এই চিন্তা আমাকে অভিভূত করে রেখেছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ওয়েলস কবে মারা গিয়েছেন?

– ১৯৪৫ সালে — তিনি অ্যাটম বোম দেখার জন্য বেঁচে ছিলেন। যেটা নিয়ে তিনি আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।

তাঁকে স্বাক্ষর করে দেওয়া পুরো এক দেয়াল বই ছিল। জর্জ লুকাসেরও একটা ছবি ছিল সেখানে, ডার্থ ভেডারের ছবির উপরে। তিনি বললেন কয়েক বছর আগে কুবরিক তাঁকে ব্রায়ান অলড্রিখের ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ গল্পের চিত্রনাট্য করে দিতে বলেছিলেন। কুবরিক এই কথা তার বহু আলাপে উল্লেখ করেছে।

তিনি বললেন, ২০০১ (আ স্পেস অডিসি) আশাতীত সাফল্য পেয়েছিল। কুবরিক যখন তাঁকে অন্য চিত্রনাট্য করে দিতে বলেছিলেন তিনি বলেছিলেন কুবরিক তাঁর জন্য যা করেছে তার বিনিময়ে তিনি ফ্রি করে দিবেন অন্যগুলি। কোনো প্রসঙ্গ ছাড়াই তিনি বললেন, প্রতিবারই আমি যখন তারিখ লিখি যে এই বছর লিখব, এটা আমাকে থামিয়ে দেয়। যখন ২০০১ (আ স্পেস অডিসি) লিখেছিলাম এটা অনেক আগের কথা মনে হয়।

আমি বললাম, আমি নিশ্চিত অরওয়েল ১৯৮৪ নিয়ে একইরকম অনুভব করেছিলেন।

তিনি বললেন, আমি কখনো অরওয়েলের সাথে দেখা করি নি। আমি তাঁর স্ত্রী সোনিয়ার সাথে দেখা করেছি যদিও — সে হোয়াইট হর্সে এসেছিল।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হাডসন স্ট্রিটের হোয়াইট হর্স (ম্যানহাটনে)?

— না, লন্ডনের হোয়াইট হর্স। আমাদের সব সায়েন্স ফিকশন লেখকেরা সেখানে যেত। (আমার মনে হয় তিনি সোহোর হোয়াইট হর্সের কথা বুঝিয়েছিলেন।)

তিনি বললেন, তিনি নিউ ইয়র্কের চেলসি হোটেলে অনেক সময় কাটিয়েছেন। তিনি ২০০১ সেখানে লিখেছেন। ১৯৯৮ সালে তাঁর সফলভাবে নিউইয়র্কে ফিরে আসার পর তিনি আবার সেখানে থেকেছিলেন। পরে কলম্বোর গলে ফেস হোটেলের কথা তিনি বললেন, এটা প্রাচ্যের চেলসি।

আমি তাঁকে বললাম গলে ফেস হোটেল একসময় যেমন ছিল তেমন আর নেই। তিনি ভিন্নমত দেখালেন, এটা একটা হোটেল মাত্র। প্রাচ্যের চেলসি। এবং আমি অবশ্যই সবসময় মালিকের স্যুইটে থেকেছি।

শ্রীলংকার দক্ষিণ উপকূলের দ্বীপ তাপ্রোবানের ছবি দেখালেন তিনি আমাকে। সেখানে পল বাওয়েল মারা গিয়েছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি তাঁকে চিনতেন?

– পল বাওয়েলস? না, কিন্তু তিনি নিউইয়র্কের চেলসিতে থেকেছিলেন।

তাঁর দেয়ালের একটা ছবি একটি টিভি সিরিজের ছিল, সেটাতে তিনি সোলার টুপি পরা। তিনি ব্যাখ্যা করলেন যে তিনি লেওনার্দো উলফের শ্রীলঙ্কা উপন্যাস থেকে তৈরি লেস্টার জেমস পেইরিসের ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। তিনি বললেন আমার মনে হয়েছিল আমি অভিনয় করেছিলাম ‘কে লিওনার্দো উলফকে ভয় পায়’-এ।

তিনি জিজ্ঞাসা করলেন আমি টেবিল টেনিস খেলি কি না, আমি বললাম হ্যাঁ। তাই যখন তিনি আমাকে তাঁর সাথে অটারস ক্লাবে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন আমি গ্রহণ করলাম। এটা তাঁর নড়াচড়ার ক্ষেত্রে জটিল একটা চেইন তৈরি করলো, তাঁর অফিসের স্টাফরা নার্স হিসাবে কাজ করছিল। তারা খুব মনোযোগী এবং চটপটে ছিল। আমার মনে হয় তিনি খুব দক্ষভাবে জাহাজ পরিচালনা করেন — অন্য কেউ নয়, তিনি নিজেই। কিন্তু প্রথমে তিনি ইমেইলের দিকে মনোযোগ দিতে চাইলেন — তিনি প্রতিদিন প্রায় দুইশটির মত পেয়ে থাকেন।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার কোনো ওয়েবসাইট আছে?

চারশ, তিনি বললেন, অথবা আমার একজন বন্ধু কিছুদিন আগে অন্তত চারশটির একটি লিস্ট করেছে যেগুলি ভিজিট করার মত।

সেগুলির কোনোটি কি অফিসিয়াল?

তিনি বললেন, আমি নিশ্চিত তাদের অনেকগুলি-ই, একভাবে না হয় আরেকভাবে।

তার বইয়ের বিক্রি সম্পর্কে তিনি বললেন, আমার ধারণা নেই তাদের কতগুলি এখন বাজারে আছে। হতে পারে বিশ মিলিয়ন অথবা পঞ্চাশ মিলিয়ন অথবা তারও বেশি। অনেক পাইরেটেড সংস্করণ রয়েছে।

(অনুবাদ)

 

About Author

অমিতাভ ঘোষ
অমিতাভ ঘোষ

জন্ম: জুলাই ১১, ১৯৫৬ কলকাতা, ইন্ডিয়া। বর্তমানে তিনি স্ত্রীর সাথে নিউইয়র্কে বসবাস করেন। তার বিখ্যাত বই দি শ্যাডো লাইনস, ক্যালকাটা ক্রোমোজম, দি গ্লাস প্যালেস, সি অব পপিজ ইত্যাদি। দি গ্লাস প্যালেস উপন্যাসের জন্য তিনি কমনওয়েলথ রাইটার্স পুরস্কার পান।