Pages Menu
TwitterRssFacebook
Categories Menu

Posted by on Jul 12, 2016 in উপন্যাস, হসপিটাল | Comments

হসপিটাল (১)

হসপিটাল (১)

অধ্যায় ১

১.
সকালে উইঠা দেখি যে লুনা আপা আমারে ইমেইলে মনে’র চারটা ছবি পাঠাইছে। ও চায় এগুলার কোনোটা সম্পর্কে আমার ভাবনাগুলা লিখি, বা এগুলা দিয়া ইন্সপায়ার্ড হইয়া একটা ছবি আঁকি। ওর ধারণা ফেসবুকে বা কম্পিউটারে বেশিক্ষণ থাকা আমার জন্যে খুবই ক্ষতিকর, তাই অল্টারনেটিভ সময় কাটানোর ব্যবস্থা।

ছবি আঁকতে আমি পছন্দ করি না। আমার ছবি আঁকার হাতও ভাল না। তবু ওর কথা রাখতে হয়, এতবার বলছে আমারে আগেও। আমি মনে’র ‘ব্রিজ ওভার দ্যা পন্ড অফ ওয়াটার লিলিস’ নিয়া বসলাম। প্রথমে ভাবলাম আমি মনে’র আঁকা ছবিটাই স্কেচ করব। তারপরে দেখলাম, আমার ছবিটা অন্যদিকে আগাইতেছে।

একটা পুকুর, তার মধ্যে ছোট্ট দ্বীপ। দ্বীপের সাথে মেইন ল্যান্ডের কানেকশন ফুটব্রিজ দিয়া। ব্রিজটা কিছুটা ট্রেনের মতো দেখতে। যেইটার শেষ ধাপ পৌঁছাইয়া দেয় একটা পদ্ম ফুলের কাছে।

পুকুরে একটাই পদ্ম ফুল। যেইটার লম্বা ডাটা হওয়াতে সে ঘুইরা বেড়ায় কখনো ব্রিজের বাম দিকের ঝাউগাছগুলার কাছে, কখনো ব্রিজের ডান দিকের উইলোগাছগুলার কাছে আর কখনো ব্রিজটার কাছে। ছবিতে দূরে মেইন ল্যান্ডে একটা বড় গাছের অর্ধেকটা দেখা যায়। সেই গাছটার কাছে ফুল ফুটতেছে, মেঘের কাছে পাখিরা উড়তেছে। ফুল দ্বীপটার দুইটা গাছের মাঝেও ফুটতেছে।

ছবি আঁইকা আমি ফেসবুকে আপলোড করলাম। আম্মা ডাকল নিচতলা থিকা, লুনা, সানি, তোরা উঠছস? নাস্তা করতে আয় বাবা, কত বেলা হইয়া গেল!

আমি আর লুনা আপা সমস্বরে উত্তর দিলাম, আসতেছি আম্মা!

নিচে নামতে নামতে লুনা আপা মজার সব কথা বইলা আমারে হাসাইতে লাগল। হাসতে হাসতে ঝর ঝরা ফিল করলাম আমি। গত রাতের ঘটনা যানি ঘটেই নাই!

 

২.
নাস্তার টেবিলে বইসা লুনা আপা বলল, “সানটু, এই যে দেখ, খয়েরি ব্রেড আর খয়েরি নাটেলা, আর ওই যে ওইখানে খয়েরি বইয়ের বাক্স। আর দেখ আম্মা খয়েরি একটা কাঠের চামচ দিয়া তরকারি নাড়তেছে।”

লুনা আপা হাসল। আমিও হাসলাম। একটু লজ্জাও পাইলাম।

কেন অমন হইল গত রাতে? আমি তো ভয় পাই না সহজে, তাইলে হঠাৎ কেন অমন খয়েরি রঙ ভীতি?

saniya-novel-4

“হঠাৎ মনে হইল, চারিদিকের সব খয়েরি রং— খয়েরি ঝরাপাতা, খয়েরি মেঝে, খয়েরি কার্পেট, খয়েরি কফিন আমারে ঘিরা ফেলতেছে।”—অলঙ্করণ. সানিয়া রুশদী

সবকিছু ঠিকই ছিল। আমি লাইট বন্ধ কইরা ঘুমাইতে গেলাম, হঠাৎ মনে হইল, চারিদিকের সব খয়েরি রং—খয়েরি ঝরাপাতা, খয়েরি মেঝে, খয়েরি কার্পেট, খয়েরি কফিন আমারে ঘিরা ফেলতেছে। আমি এক দৌড়ে গিয়া লুনা আপার ঘরের দরজায় নক করলাম।

লুনা আপা দরজা খুইলা জিজ্ঞেস করল, কী রে গুবলু, ভয় পাইছিস?

আমি বললাম, হুম। তুমি কি খয়েরি রঙের ভাল কিছুর কথা ভাবতে পারো? আমার শুধু মরা মরা জিনিসের কথা মনে হইতেছে।

হ্যাঁ, অনেক ভাল ভাল জিনিস আছে তো খয়েরি রঙের। ফ্রেশলি বানানো রুটি, কেক, চকলেট, পিয়ানো, বুকশেল্ফ্, আরও অনেক কিছু আছে।

ও হ্যাঁ, তাই তো!

ঘুমাইয়া পড়। আমি জাগাই আছি। খারাপ লাগলে বা কোনো কিছু লাগলে নক করিস। আমার সাথে ঘুমাবি?

না। আমি ঠিক আছি এখন।

ঐ সানটু, কই হারাইয়া গেলি? ঘুমাইয়া পড়লি নাকি?—লুনা আপা ডাকল।

আমি “ও না, ঘুমাই নাই” বইলা ওর দিকে দেখলাম।

—নাস্তা শেষ কর। যে কোনো সময় মামারা চইলা আসবে।

—ও, তাই?

—হ্যাঁ, আম্মা এইমাত্র বলল। কিছুই শোনস না?

—হি হি। না, এইটা শুনি নাই। কোন মামারা আসবে?

—দুই মামারাই।

—ও।

saniya-novel-3

“বেশ কিছু বসার জায়গা দেইখা একজনের পাশে বসতে গেছিলাম, ওমনি সে তার ব্যাগটা মেঝে থিকা উঠাইয়া খালি সিটটায় রাখল। অন্য খালি জায়গাগুলার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটল।”—অলঙ্করণ. সানিয়া রুশদী

আমি নাস্তা শেষ করলাম আর সাথে সাথেই কলিং বেল বাইজা উঠলো। দেখি, আমার দুই মামা-মামি আর কাজিনরা আসছে। সাধারণত আমাদের বাসায় মেহমানদারি আমিই করি। কিনতু আমার মামাতো বোনরা আমারে কিছু করতে দিল না। ওরাই সব করল।

ফরিদ মামা কী যানি বলল যে কার ছবি (ফটোগ্রাফি কি?) দুর্দান্ত হইছে এবং খুবই সুন্দর ভাবে একটা সমাজব্যবস্থারে তুইলা ধরছে। আমার এক কাজিন সেইটার ঘোর বিরোধিতা করল—”কিচ্ছুই হয় নাই। ঘোড়ার ডিম হইছে। একটা বাড়ি, বাড়ির দরজাটা প্রায় বাড়ির সমান, আর দরজাতে ইয়া বড় একটা তালা! তালাটাই আবার চাবি! এইটা কিছু হইল? এমন কখনো সম্ভব?”

আমার কেন যানি মনে হইল, আমার আঁকা ছবিটা নিয়াই মন্তব্যগুলা।

আমি আর সবার মধ্যে থাকতে চাইলাম না। নিজের ঘরে চইলা আসলাম। গত রাতে কেন ভয় পাইলাম, তা নিয়া ভাবতে বসলাম। ভয়টা কি তাৎক্ষণিক কোনো ব্যাপার ছিল, নাকি আস্তে আস্তে বাড়ছে দুপুরের দাওয়াতের পর থিকা?

যেই বাসায় দাওয়াত ছিল, সেই বাসায় একটা বিশাল কাঠের ডেক ছিল। আমারে আর লুনা আপারে ডেকের এক প্রান্তে একটা বেঞ্চে বইসা থাকতে দেইখা একজন মন্তব্য করছিল, যে ওই বেঞ্চটার বরাবরই নিচে ফারনেস জ্বলতেছে, ডেক ভাইঙ্গা পড়লে খবর আছে। সেই কথা শুইনা আমার কেন যানি ভয় করছিল।

আসলেই তো, ডেকটারে বেশি মজবুত মনে হইতেছিল না। লুনা আপা অবশ্য সেই কথা হাইসা উড়াইয়া দিছিল। আমি ভিতরে, মহিলারা যেইখানে বসছিল, সেইখানে গেছিলাম। বেশ কিছু বসার জায়গা দেইখা একজনের পাশে বসতে গেছিলাম, ওমনি সে তার ব্যাগটা মেঝে থিকা উঠাইয়া খালি সিটটায় রাখল। অন্য খালি জায়গাগুলার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটল।

কিনতু সবাই কেন অমন করল?

ভাবতে ভাবতে শুনতে পাইলাম নিচতলায় মামারা সবাই চইলা যাওয়ার জন্য রেডি হইতেছে। আমি উপর থিকাই সবাইরে বিদায় জানাইলাম।

তারপরে, নিজের ঘরে আইসা ফেসবুকিং করলাম আর গান শুনলাম। কিনতু কোনোটাই বেশিক্ষণ করতে পারলাম না। ইদানিং এমন হইছে যে কম্পিউটার খুইলা বসলেই ঘুমে চোখ বন্ধ হইয়া আসে, আবার ঘুমাইতে গেলে কেমন একটা ঠাণ্ডা চাপ ফিল করি মাথায়। সেই চাপে মনে হয় যে মাথাটা ফাইটা যাইতেছে। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় যে চামড়া পুইড়া যাইতেছে আমার। নিচে গিয়া বাসার সবাইরে এই কথা বলতেই আব্বা বলল, “বাবা, ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার তোমার।”

আমি: হুম।

আম্মা: হ্যাঁ, অনেকদিন তো যাও নাই মা।

লুনা আপা: অথবা আমি ক্যাট টিমরেও [ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট টিম] বাসায় আসতে বলতে পারি। ওদের টিমে ডাক্তারও থাকে আর অন্যান্য কন্ডিশন অ্যাসেস করার লোকও থাকে।

আমি: আচ্ছা। বাসার পরিবেশও অ্যাসেস করবে ওরা?

—হ্যাঁ।

—তাইলে সেইটাই বোধহয় ভাল হবে।

—আচ্ছা, আমি কাইলকাই ওদেরকে আসতে বলি তাইলে।

—আচ্ছা।

 

৩.
তারপরের দুই সপ্তাহ প্রতিদিন ক্যাট টিম থিকা বিভিন্ন মানুষ আসতে লাগল আমাদের বাসায়। প্রায় সময়ই দুইজন দুইজন কইরা। সাথে অনেক সময় ডাক্তারও আসছে।

আমার ওষুধ খাওয়া ধরতে হইছে আবার। আমি বুঝলাম না, আমার থাকার পরিবেশ অ্যাসেস না কইরা আমারে ওষুধ কেন খাওয়াইতেছে তারা!

মেইন্টেনেন্স?

হইতে পারে, কিনতু সেইজন্যে তো আমার সাইকায়াট্রিস্টই আছে।

ক্যাট টিম ওষুধের ডোজ বাড়াইয়া দিল কেন? আর ওরা রোজ রোজ বাসার অন্য কারো ইন্টারভিউ না নিয়া শুধু আমার ইন্টারভিউই কেন নেয়?

ওরা কি ভাবতেছে যে আমার আবার সাইকোসিস হইছে?

আমি যা করতে পারি তা হইল ধৈর্য্য রাখা আর শান্ত ভাবে সব প্রশ্নের জবাব দেয়া, যাতে ওরা বোঝে যে আমি সুস্থ।

তাই করলাম আমি। শান্ত ভাবে জবাব দিলাম ক্যাট টিম থিকা আসা দুইটা ছেলের প্রশ্নের।

ছেলে ১: হাই, আমার নাম নিক। তোমার নাম সানিয়া, না? আমি কি নামটা ঠিক উচ্চারণ করছি?

আমি (একটু হাইসা): হ্যাঁ, তুমি ঠিক উচ্চারণ করছ। আমি সানিয়া।

ছেলে ২: আর আমি গাগান।

আমি (হাসিমুখে): হাই গাগান।

গাগান: তুমি কি জানো আমরা কেন এইখানে আসছি?

আমি: আমার বোন তোমাদেরকে আসতে বলছে।

—কেন আসতে বলছে?

—কারণ আমি মাথায় এক ধরনের প্রেশার ফিল করি, আর আমার গা-ও মাঝে মাঝে জ্বালাপোড়া করে।

—কী ধরনের প্রেশার একটু বলবা?

নিক: শার্প? ব্লান্ট?

আমি: ব্লান্ট। কোল্ড অ্যান্ড ব্লান্ট।

—এইটার জন্যে তুমি কিছু নিতেছ?

—না। এইটার জন্যে কিছু নেয়া যায়?

—হ্যাঁ, নেয়া যায়। আমরা তোমারে ওষুধ দিয়া যাবো।

—ওকে।

—তোমার ফ্যামিলি মনে হইল তোমার জন্য চিন্তিত। কেন বলতে পারো?

—ওরা কেন চিন্তিত তা ওরাই ভাল বলতে পারবে।

গাগান: তুমি কি মনে করো যে চিন্তার কারণ আছে?

আমি: না।

নিক: ওরা বলতেছিল যে তুমি ওদের সাথে সময় কাটাও না। সব সময় একা একা নিজের ঘরে থাকো।

আমি: সেইটা তো নতুন কিছু না। আমি তো সব সময়ই এমন। শুধু যখন আমার ডিপ্রেশন ছিল, তখন আমি একা থাকতে পারতাম না। আমার বাঁইচা থাকার জন্যে মানুষের সঙ্গ, কথোপকথন দরকার ছিল। আর আমার মায়ের অসুখের সময় আমি সংসারের সমস্ত কাজ করছি, সেইটাও আমারে আমার ফ্যামিলির ওই রূপে দরকার ছিল, সেইজন্যে। তার মানে এই না যে ওই সানিয়াই আমি।

—তার মানে তুমি এখন পুরাপুরি সুস্থ?

—আমি তো তাই মনে করি।

—তোমার কি কখনো কোনো সিরিয়াস অসুখ হইছিল, যেইটার জন্য তোমার হসপিটালে থাকতে হইছে?

—হ্যাঁ। ২০০৯ আর ২০১০ সালে আমার সাইকোসিস হইছিল।

—সেই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আমাদেরকে একটু বলবা?

—আমার খুবই অস্থির লাগত এবং একটা খারাপ অনুভূতি সব সময় থাকত সাথে, কারণ মনে হইত কেউ একজন আমারে দিয়া কিছু করাইতে চাইতেছে এবং আমি সেইটা করতে বাধ্য হইতেছি কারণ ওইটা না করলে বড় কোনো ক্ষতি হইতে পারে। আমার অস্থিরতার জন্যে আমি ঠিকভাবে ঘুমাইতে পারতাম না, এবং আমার মনে হইত আমার চারপাশের মানুষগুলার উপরেও অনেক সময়ই কারো একটা প্রভাব পড়ত, যেইজন্যে তারাও সব সময় তারা থাকতে পারতো না। এই ধরনের ব্যাপার আর কি।

saniya-novel-2

“তোমার কি কখনো কোনো সিরিয়াস অসুখ হইছিল, যেইটার জন্য তোমার হসপিটালে থাকতে হইছে?”—অলঙ্করণ. সানিয়া রুশদী

গাগান: তুমি কি টিভি, খবরের কাগজ, ইন্টারনেট ইত্যাদিতে কোড দেখতা?

আমি: হ্যাঁ দেখতাম। আমার বাবার একটা কাগজ ফেলার বিন ছিল, আমি সেই বিনে ফেলা সমস্ত কাগজ, রিসিট ইত্যাদিতেও কোড দেখছি।

নিক: এখন দেখো না?

আমি: হা হা, না। সেইটা তো সেই অসুখের সময় দেখছিলাম।

—তোমার বোনও কিন্তু তোমারে নিয়া চিন্তিত, তুমি জানো সেইটা?

—হ্যাঁ, ও সব সময়ই একটু বেশি চিন্তা করে।

—লুনা বলতেছিল যে তুমি নাকি ফেসবুকেও কী দেখছ?

—ওইটারে কি তুমি কোড বলবা? আর্টিস্টরা, কবিরা যেই ধরনের সিম্বল ব্যবহার কইরা নিজেদেরকে প্রকাশ করে?

—কী হইছিল ব্যাপারটা?

—লুনা তো তোমাদেরকে বলছেই।

—তবু তোমার মুখ থিকা শুনি।

—ব্যাপার হইলো, ফেসবুকে আমার একটা লেখক ও আর্টিস্ট বনধু আছে। আমার আর আমার বোনের কমন ফ্রেন্ড। আমার বেশিরভাগ বনধুই ফেসবুকে, সেইজন্যে আমি ফেসবুকে অনেক সময় কাটাই, যেইটা অনেকেরই পছন্দ না। যাই হোক, আমার আর্টিস্ট ও লেখক যেই বনধু, সে রিসেন্টলি তার আঁকা কিছু ছবি ফেসবুকে পোস্ট করছে। আমার মনে হইছে যে ছবিগুলা এবং তার কিছু লেখা একটার পরে একটা যেইভাবে সে পোস্ট করছে, তার মধ্যে একটা ধারাবাহিকতা আছে, এবং হয়তো আমার কিছু পোস্টের সাথে মিল রাইখা, আমার লেখার উত্তরে সেই পোস্টগুলা আগাইছে। শেষের দিকের একটা ছবি দেইখা আমার মনে হইছে যে সে আমারে প্রোপোজ করতেছে। আমি দুইদিন সময় নিছি ভাবার জন্যে। যখন আমার মনে হইছে যে আমি রাজি, তখনই ওই ছবিতে আমি লাইক দিছি। এবং আমি লাইক দেয়ার পরেই ও আবার ফেসবুক ব্যবহার করা শুরু করছে। যেই দুইদিন আমি ফেসবুক ব্যবহার করি নাই, ওই দুই দিন সেও করে নাই। এইটা শুধুই আমার একটা ধারণা, যেইটা ভুলও হইতে পারে, ঠিকও হইতে পারে, আমি জানি না। এইটা লুনারে বলছি আর ও বলছে যে এইভাবে কেউ কথা বলে না। আমার ধারণা ভুল।

—তুমি কী মনে করো?

—আমি জানি না।

গাগান: আচ্ছা, তুমি কি কখনো বিয়ে করছিলা?

আমি: হ্যাঁ আমি বিয়ে করছিলাম। আমার সেকেন্ড সাইকোটিক এপিসোডের পরে ভাইঙ্গা গেছে।

নিক: আমি খুবই দুঃখিত এইটা জাইনা।

আমি: দুঃখের কিছু নাই। আমি খুশি যে ও ভাল আছে।

গাগান: তোমার বাবা বলতেছিল তুমি একসময় সিডনি গেছিলা পি.এইচ.ডি. করতে?

আমি: হ্যাঁ। কিনতু শেষে আর পি.এইচ.ডি. করা হয় নাই। মাস্টার্স কইরা চইলা আসছি। ওইখানেই দেখা হইছে আমার এক্সের সাথে।

—আচ্ছা। তারপরে মেলবোর্নে আইসা বিয়ে হইছে?

—হ্যাঁ।

—কতদিন বিবাহিত ছিলা তোমরা?

—৮ বছর।

—ও, আর তোমার মাস্টার্সের টপিক কী ছিল?

—মারকিউরি আর ক্যাডমিয়ামের ইফেক্ট মাইক্রোটিউবিউলের উপর।

—ও, দুইটাই হেভি মেটাল, শরীরের জন্যে খুবই ক্ষতিকর।

—হ্যাঁ।

—এখন কীভাবে সময় কাটে তোমার? সারাদিন কী করো?

—সারাদিন গান শুনি, ফেসবুকিং করি আর একটু একটু পড়ার চেষ্টা করি।

—কী পড়ো?

—সাইকোলজির পড়াশোনা। ২০০৯ এ আমার অসুখের আগে যা পড়তেছিলাম।

—পড়াশোনার স্ট্রেসেই কি তুমি অসুস্থ হইছিলা?

—আমার মনে হয় না, কারণ আমি আমার পড়াশোনা খুবই ভালবাসি, সেইটা আমারে স্ট্রেস দেয় না।

—আচ্ছা। তবে একবারে বেশি চাপ নিও না। খুব প্রিয় কাজও খুব বেশি করলে স্ট্রেসফুল হইতে পারে।

—আচ্ছা।

নিক: আর রাত্রে ঘুমানোর এক ঘণ্টা আগে থিকা কম্পিউটার বা টিভি বন্ধ কইরা রাইখো। এইগুলার আলো অনেক সময় ঘুমাইতে দেয় না।

আমি: আচ্ছা।

—তো আইজকা এই পর্যন্তই থাকুক। কাইলকা আমরা আবার আসবো। যাওয়ার আগে তোমার ওষুধগুলা দিয়া যাই (নিক ওষুধগুলা আমার হাতে দিল)। এই ওষুধটা, যেইটা তুমি এই কয়েকদিন খাইয়া আসতেছ, তুমি এখনই খাইয়া ফেলো আমাদের সামনে, আর ঘুমের ওষুধটা তোমার শুধু দরকার হইলেই খাবা।

—কিনতু এইটা তো একটা অ্যান্টি সাইকোটিক!

—হ্যাঁ, এইটা অনেক কিছুই সারায়। তুমি যেই কন্ডিশনগুলার কথা বললা, এইটা ওইগুলাও সারায়। এইটা শুধু তোমার শর্ট টার্মে নিতে হবে। তারপরে আর নিতে হবে না।

আমি এক গ্লাস পানি আইনা ওদের সামনে ওষুধ খাইলাম।

গাগান: আচ্ছা আমরা তাইলে এখন আসি। কালকে আবার দেখা হবে। বাই।

নিক: সি ইউ টুমরো।

আমি: সি ইউ।

ওরা চইলা যাওয়ার পরে আমি ওয়াশিং মেশিন থিকা ধোয়া কাপড় নিয়া ব্যাক ইয়ার্ডে গেলাম মেইলা দেয়ার জন্যে। নিক ছেলেটা কী আর্টিকুলেট আর কী কমফোর্টেবল ফীল করাইতে পারে! আমার ওদের সাথে কথা বইলা ভাল লাগতেছে। আমি কাপড় মেলতে মেলতে অনেক কথা বললাম নিজের সাথে। আমার মনে হইলো, আশেপাশের সবাই আমার কথা শুনতেছে। শুনুক।

hospital-34

“এক রাশ ছোট ছোট শুকনা পাতা উইড়া আইসা আমার উপরে বৃষ্টির মতো পড়তে থাকলো।”—অলঙ্করণ. সানিয়া রুশদী

কাপড় মেইলা দেয়ার পরে দেখলাম যে ঝড় আসতেছে। আমি ক্যামেলিয়া গাছটার কাছে দাঁড়াইলাম। সাথে সাথে কোথার থিকা যানি এক রাশ ছোট ছোট শুকনা পাতা উইড়া আইসা আমার উপরে বৃষ্টির মতো পড়তে থাকলো।

কী যে ভাল লাগলো আমার!

(কিস্তি ২)