Pages Menu
TwitterRssFacebook
Categories Menu

Posted by on Aug 2, 2016 in উপন্যাস, হসপিটাল | Comments

হসপিটাল (২)

হসপিটাল (২)

(শুরুর পর্ব)

অধ্যায় ২

৪.

ঝাকি লাইগা ঘুম ভাঙল। কে বা কী সেই ঝাকির উৎস জানি না।

আইপ্যাডে সময় দেখলাম। রাত তিনটা বাজে, ঠিক তিনটা।

এই ঠিক ঠিক সময় দেখতে দেখতে এখন চোখ সওয়া হইয়া গেছে। কেন আমার সাথে এই রকম হয় আর জিজ্ঞেস করি না।

কিন্তু জিজ্ঞেস করলে কোথায় মিলবে উত্তর? কোথায় কিছুটা স্বস্তি মিলবে? কোরান শরিফে?

আমার ঘরে অনেক পুরানো যেই কোরান শরিফ ছিল,  এখন নিচের তলার লাউন্জের শেলফে।

এত রাতে কাঠের সিঁড়ি খটখটাইয়া নামলে আব্বা-আম্মা নির্ঘাত ভাববে যে আমার কিছু হইছে! আমি জুতা খুইলা রাইখা খালি পায়ে সিঁড়ি দিয়া নামলাম। আব্বা-আম্মার ঘরে উঁকি দিলাম।

নাহ, কেউ জাগে নাই।

লাউন্জের দিকে পা বাড়াইলাম। সেইখানে শেলফে আমি যে কোরান শরিফে অভ্যস্ত তাও রাখা আছে। আমি নিলাম, তারপরে পা টিপা টিপা উইঠা আসলাম নিজের ঘরে।

পাতা উলটাইতেছি। নির্দিষ্ট কিছু খুঁজতেছি না। শুধু কোথায় একটু শান্তি মিলবে সেইটা বাইর করার চেষ্টা করতেছি।

কিছুক্ষণ পাতা উলটাইয়াই প্রশ্ন জাগল, আয়াতগুলার সাথের বাংলা অনুবাদ ঠিক আছে তো?

ইন্টারনেটে সূরা আল-জিন সার্চ দিয়া দেখলাম শুধু অনুবাদই না, আরবি হরফে লেখা সূরার দুই একটা শব্দও আমার কোরান শরিফের সাথে মেলে না!

কোনটা সঠিক, কোনটা বেঠিক জানতে আব্বার পড়ার ঘর থিকা আব্বার কোরান শরিফ নিয়া আসার জন্যে উইঠা দাঁড়াইলাম। সিঁড়ি পর্যন্ত যাইতেই দেখলাম, সিঁড়ির গোড়ায় আব্বা দাঁড়াইয়া আছে।

আব্বা: বাবা ঘুমাও নাই এখনও? ঘুম আসতেছে না?

আমি: ঘুম দিয়া উঠলাম।

—এত রাতে জাইগা আছ, ভয় পাইছ মা?

—না, ভয় পাই নাই।

—দাঁড়াও আমি আসতেছি।

—আসতে হবে না। আমি ভয় পাই নাই তো!

—তাইলে এইখানে আইসা দাঁড়াইছ, তোমার কিছু লাগবে বাবা?

—তোমার ঘর থিকা তোমার কোরান শরিফ আনতে যাইতেছিলাম।

—আমি নিয়া আসি? তোমারে কোরান শরিফ পইড়া শোনাই?

—না না, তুমি আইসো না। আমি একটা জিনিস দেখমু শুধু।

—সেইটা দেইখো। আমি আসতেছি কোরান শরিফ নিয়া।

আব্বা বিশাল কোরান শরিফ নিয়া বেশ দ্রুতই উইঠা আসল উপরে। আমরা আমার ঘরে ঢুকলাম। কাপড় দিয়া ঠাসা চেয়ারটা খালি কইরা দিলাম আব্বার বসার জন্যে, আর আমি আমার ভাঙা হাতল ওয়ালা চেয়ারটায় বসলাম।

আমি—তুমি কেন কষ্ট কইরা উপরে আসলা বাবা? আমি তো শুধু একটা জিনিস দেখতে চাইছিলাম। পাঁচ মিনিট লাগত আমার দেখতে।

আব্বা—কোনো অসুবিধা তো নাই মা। তোমারে পইড়া শোনানোর উসিলায় আমার জানাটাও একটু ঝালাই কইরা নেই।

—তাই বইলা এত রাতে?

—জাইগাই তো আছি দুইজনই।

—আচ্ছা ঠিক আছে, শোনাও।

আব্বা কোরান শরিফ আমার টেবিলের উপরে রাইখা কী যানি খোঁজা শুরু করল। কখনো প্রথম অংশে, কখনও শেষ অংশে আর কখনও মধ্যের অংশে।

খুঁজতে খুঁজতে আমার খোলা জানালা দিয়া বাইরের অন্ধকারে চোখ যাইতেছিল আব্বার। কাউরে কি কন্ট্যাক্ট করতেছে আব্বা?

এত্তগুলা হেলিকপ্টার এত রাতে এত শব্দ কইরা এত নিচে দিয়া যাইতেছে কেন?

হেলিকপ্টার থিকা কি আমার জানলা দেখা যায়?

ওরা কি আমার ছবি তুলতেছে?

কিন্তু কেন?

কে ওরা?

আমি নিজের মধ্যে কেমন গুটাইয়া গেলাম। গা ছম ছম করা শুরু করল আমার।

তখনই আব্বা জানাইল যে আব্বা সূরা ইয়াসিন খুঁইজা পাইছে। আব্বা বলল, “তুমি বরং শুইয়া পড়ো মা। আমি তোমার কাছে বইসা বইসা সূরা পড়ি। তোমার ঘুম আসলে ঘুমাইয়া পইড়ো। আমি বাতি নিভাইয়া দিয়া যামু।”

এত সুন্দর একটা প্রস্তাবে আমি কেন যানি স্বস্তি পাইলাম না। বরং রাগ লাগল আমার। আমি বললাম, “না, আমি বইসাই ঠিক আছি।”

আব্বা সূরা পড়তে শুরু করল। সূরা ইয়াসিন যে এত লম্বা আগে বুঝি নাই। শেষের দিকে আইসা আমি ঝিমাইতে লাগলাম।

"আব্বা সূরা পড়তে শুরু করলো।"

“আব্বা সূরা পড়তে শুরু করলো।”

আব্বা তাড়াতাড়ি সূরা পড়া শেষ কইরা বলল, “তুমি শুইয়া পড়ো বাবা, আমি যাই।”

শুইয়া পড়ার প্রায় সাথে সাথেই ঘুমাইয়া গেলাম আমি।

 

৫.
ঘুম ভাঙল দরজা ধাক্কানোর শব্দে। প্রায় সাথে সাথেই দরজা খুইলা গিয়া একটা মুখও উদয় হইল। আমি বিরক্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম, আম্মা, তুমি উইঠা আসছ কেন? তোমার না পায়ে ব্যাথা?

আম্মা বলল, তোরে অনেক ডাকাডাকি করছি বাবা। পরে মনে হইল যে সারা রাত হয়ত ঘুমাস নাই, তাই এখনও ঘুমাইতেছস।

—এখনও ঘুমাইতেছি মানে? কয়টা বাজে?

—এগারোটা। ক্যাট [ক্রাইসিস অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট টিম] টিম থিকা লোক আসছে। নিচে যাইতে হবে মা।

—আচ্ছা, তুমি যাও, আমি আসতেছি।

আমি তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুইয়া, ওড়নাটা ভালভাবে জড়াইয়া নিচে নামলাম। দেখি পুরা ফ্যামিলি লাউন্জে বসা। ছোট্ট লাউন্জ ভইরা গেছে মানুষে। নিক বসছে থ্রি-সিটারটার এক পাশে; মধ্যের সিটটা খালি রাইখা থ্রি-সিটারের অন্য পাশে বসছে লুনা আপা। আব্বা বসছে থ্রি-সিটারটার পাশে রাখা একটু উঁচু অফিস চেয়ারটায়, নিকের বাম পাশে; আম্মা বসছে নিকের মুখামুখি একটা সিঙ্গেল সিটারে; আর আমার জন্যে জায়গা রাখা হইছে ঢোকার পথের কাছে সিঙ্গেল সিটারটায় অথবা তার পাশে টাব চেয়ারটায়।

দেখি পুরা ফ্যামিলি লাউন্জে বসা।

দেখি পুরা ফ্যামিলি লাউন্জে বসা। ছোট্ট লাউন্জ ভইরা গেছে মানুষে।

আমি ঘরে ঢুইকা সিঙ্গেল সিটারটায় বসলাম।

নিক—গুড মর্নিং। আমি কি তোমারে জাগাইয়া দিলাম?

আমি—না না, আমার জাগারই কথা ছিল।

—তোমার ঘুম হইছে যথেষ্ট?

—হ্যাঁ হইছে।

—খুবই ভাল কথা। ঘুম হওয়াটা খুবই জরুরি।

—হুম। গাগান আসলো না?
—না, ওর আরেক জায়গায় যাইতে হবে তাই এইখানে আসতে পারে নাই। আমি ওরে বলব যে তুমি ওর কথা জিজ্ঞেস করছো।

—না না সেইভাবে জিজ্ঞেস করি নাই। গতকাল ও বলল তো যে তোমরা আবার আসবা আইজকা, তাই ভাবছিলাম যে দুইজনই হয়ত আসবা, সেই জন্যেই বলা। যাই হোক, তুমি চা-কফি কিছু খাবা?

—অফার করার জন্যে ধন্যবাদ। কিন্তু আমি নাস্তা কইরা আসছি। এখন আর খাবো না। তুমি খাইলে খাও।

—আমি পরে খাবো।

—আচ্ছা। গতকালকে আমরা চইলা যাওয়ার পরে তুমি কী করলা?

—তেমন কিছু না। ব্যাংকে গেলাম, একটু ঘরের কাজ করলাম, গান শুনলাম, এই।

—ব্যাংকে তুমি একাই গেলা?

—না। আমার মা আর বোন সাথে গেছিল।

—আচ্ছা। জরুরি কাজ ছিল?

—হ্যাঁ, আমার বিশ্বাসের দিক থিকা জরুরি। আমি গেছিলাম ব্যাংকের থিকা ইন্টারেস্ট পাওয়া বন্ধ করতে। কোরান শরিফে ইন্টারেস্ট নেওয়ারে হারাম বলছে। সেইটা শুধু ব্যাংকের ব্যাপারেই নাকি অন্য ব্যাপারেও সেইটা অবশ্য আমি জানি না।

—মনে হয় না ব্যাংকের ব্যাপারে বলছে, কারণ ওই যুগে তো ব্যাংকই ছিল না!

—ও হ্যাঁ, তাই তো!

—সাইকোলজির পড়াশোনা করলা না কাইলকা?

—করতে চাইছিলাম, চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু বাসায় বোধহয় সেইটা আমার পক্ষে সম্ভব না।

—কেন?

—বাসায় আমি কনসেনট্রেট করতে পারতেছি না। আমার মাথায় কেমন একটা চাপ অনুভব করি। কম্পিউটারের সামনে বসলেই আমার চোখ বন্ধ হইয়া আসে।

—তাই নাকি? তোমার কী মনে হয়? কেন এমন হয়?

—আমার তো মনে হয় টেকনোলজি এত উন্নত হইছে যে সেইটার সাথে তাল রাখা আমাদের জন্যে কঠিন হইয়া পড়ছে।

—তা তো বটেই। তুমি একা না, আমরা অনেকেই এমন ফিল করি। কিন্তু তুমি কেন এই কথাটা বললা?

—কারণ, আমার মনে হয় এখনকার ল্যাপটপে আর বেশির ভাগ কম্পিউটার মনিটারে যে ক্যামেরা লাগানো থাকে, সেইটা আমাদেরকে যাতে মনিটার আর কন্ট্রোল করা যায়, সেই জন্যে।

—আচ্ছা। তুমি কি মনে করো কিছু দিন অন্য কোথাও থাকলে তুমি পড়াশোনায় মন দিতে পারবা?

—হ্যাঁ।

আমি খেয়াল করলাম যে নিক পা ছড়াইয়া বসছে, এবং ঢিলাঢালা শর্টস পরছে। আমার বেতমিজ দৃষ্টি ওর দিকে তাকাইতে গেলেই ওর শর্টসের মধ্যে ঢুইকা যাইতেছে! বারবার ওই দিকে চোখ গেলেই আমি লজ্জায় মুখ কালো কইরা ফেলতেছি। বিশেষ কইরা আমি ঘোমটা দেয়া মুমিন মুসলমান হইতে চাইতেছি বইলা আমার এই ব্যাপারটা আমার কাছে আরও বেশি খারাপ লাগতেছে। বারবার নিজেরে বললাম, “সানিয়া, চোখ নামাও, চোখ নিচু করো।”

আমি চোখ নিচু করলাম।

নিক বলল, আমাদের হাতে কিছু কমিউনিটি হাউজ আছে। এই যে সেগুলার একটা ব্রোশার। ইউ ক্যান চেক ইট আউট।

আমার মনে হইল, “ইউ ক্যান চেক ইট আউট” কথাটা নিক একটু যানি জোরেই বলল। আমার সঙ্কোচ একটু কাইটা গেল। আমি ব্রোশারটা হাতে নিয়া দেখলাম। বেশ টিপটপ বাড়িগুলা।

“এইসব বাড়িতে থাকতে হইলে কি বাড়িভাড়া দিতে হবে?”—আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“না, কোনো বাড়িভাড়া নাই। তবে হয়ত বাজার করার জন্যে কিছু কন্ট্রিবিউট করতে হইতে পারে। তোমার যদি এই থাকার ব্যবস্থা, এই শেয়ার্ড অ্যাকমডেশন পছন্দ হইয়া থাকে, তাইলে কাইলকা সকালেই আমাদের টিম থিকা কাউরে পাঠাইতে পারি তোমারে নিয়া যাওয়ার জন্যে।”

“না না, কাউরে পাঠাইতে হবে না। আমাদেরকে শুধু ঠিকানাটা দাও, আমরাই দিয়া আসতে পারব।”—লুনা আপা বলল।

“সেইটার আসলে রেওয়াজ নাই,” নিক বুঝাইল, “কমিউনিটি হাউজে সানিয়ারে পৌঁছাইয়া দেয়ার পরেও ওইখানে কিছু কাজ আছে যেইটার জন্যে আমাদের একজন টিম মেম্বার লাগবে।”

“কিন্তু সেইটা তো সানিয়া আমাদের গাড়িতে গেলেও সম্ভব,”—আব্বা বলল।

আম্মা আর লুনা আপা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।

“আমরা না হয় তোমাদের গাড়ি ফলো কইরাই গেলাম, কিন্তু সানিয়া থাকল আমাদের গাড়িতে,”—এইবার আম্মা বলল।

আব্বা আর লুনা আপা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।

আমার মনে হইল, এইখানে আমি ছাড়া সবাই আর সবার মনের কথা বুঝতেছে। কিন্তু কেমনে সম্ভব আরেকজনের মনে মনে বলা কথা বুইঝা ফেলা?

ঠিক তখনই লক্ষ্য করলাম, নিক আব্বার চোখে তাকাইল, আব্বা আম্মার চোখে, আম্মা লুনা আপার চোখে, লুনা আপা আবার আম্মার চোখে।

“সো, জাস্ট লাইক দ্যাট!” নিক একটু ভাইবা বলল, “হ্যাঁ সেইটা সম্ভব।”

আমার আবারও মনে হইল, “জাস্ট লাইক দ্যাট” কথাটায় নিক জোর দিল আমার প্রশ্নের উত্তরে। তো এইভাবে ওরা মনের কথা বোঝে, চোখে চোখ রাইখা। একজনের মনের কথা আরেকজনের কাছে পৌঁছাইয়াও কি দেয়া যায় একজনের পরে আরেকজনের চোখে চোখ রাইখা? মনে হয়!

নিক বলল, “তো ঠিক আছে, কাইলকা সকাল দশটার দিকে আমাদের একজন টিম মেম্বার আসবে তোমাদের বাসায়। তোমরা রেডি থাইকো। তোমরা আইজকাও গিয়া দেইখা আসতে পারো কমিউনিটি হাউজটা, এই যে এইখানে ঠিকানা লেখা আছে। সানিয়া, কোনো ব্যাপারে কোনো সমস্যা হইলে, বা কিছু জানতে চাইলে, কিছু বলার থাকলে ফোন করতে দ্বিধা কইরো না। উই আর নট মাইন্ড রিডার্স আফটার অল!”—শেষের কথাটুকু বইলা নিক হাসল।

আমি অবাক হইয়া তাকাইয়া রইলাম।

 

৬.
কলিং বেলটা বাইজা উঠল সকাল ১০:২০ এ। আমি সকাল ৮টা থিকাই রেডি হইয়া, স্যুটকেস গোছাইয়া অপেক্ষা করতেছি।

মেইন দরজা খুইলা আবার বন্ধ হওয়ার শব্দও শুনতে পাইলাম, আর তারপরেই আম্মার ডাক— “সানিয়া নিচে আসো, তোমারে নিতে আসছে।”

আমার মনটা কেমন কইরা উঠল! আম্মা নিশ্চয়ই চায় না যে আমি অন্য কোথাও গিয়া থাকি।

আমি ছোট্ট স্যুটকেসটা আর ল্যাপটপ নিয়া নিচে নাইমা আসলাম। স্যুটকেসটা আর ল্যাপটপটা সিঁড়ির কাছে রাইখা উঁকি দিয়া দেখলাম যে ওরা ফ্যামিলি রুমে বসছে।

আমি সেইখানে যাইতেই বইসা থাকা লোকটা উইঠা দাঁড়াইল। “হাই, আমি স্টিভ,” বইলা আমার সাথে হ্যান্ডশেইক করল।

—হাই স্টিভ, আমি সানিয়া।

—আমি তোমারে একটা কমিউনিটি হাউজে নিয়া যাইতে আসছি। তুমি কি সবকিছু প্যাক করছ, যা যা নিবা?

—হ্যাঁ, প্যাক করছি, দুই তিন দিন পরার মতন কাপড়, আর আমার ল্যাপটপ।

আম্মা—তোমার বালিশ নিবা না বাবা? ওই বালিশ ছাড়া তো তুমি ঘুমাইতে পারো না।

স্টিভ—বালিশ হয়ত লাগবে না। ওইখানে বালিশ আছে।

আমি—এখন না নিলাম আম্মা। যদি লাগে তো পরে নিমু।

আম্মা—আচ্ছা।

আমি—স্টিভ, ওইখানের বালিশ কেমন জানো?

স্টিভ—আমার মনে হয় নরমাল বালিশ যে পাওয়া যায় বাজারে, ওই রকমই হবে।

আমি—তুমি কী রকম বালিশ ব্যবহার করো?

স্টিভ—আমি? আমি পাতলা, ফ্ল্যাট বালিশ ব্যবহার করি। আমার মনে হয় ওইরকম বালিশই আমারে সবচেয়ে ভাল সাপোর্ট দেয়।

আমি—আচ্ছা।

স্টিভ: তো তোমাদের কী প্ল্যান? আমি আগে যাব কমিউনিটি হাউজটায় আর তোমরা সানিয়ারে নিয়া আমারে মিট করবা সেইখানে?

আব্বা—আমাদের আসলে এখন কোনো প্ল্যান নাই। সানিয়া যেই ভাবে যাইতে চায়, যেই ভাবে কমফোর্টেবল ফিল করে, সেইভাবেই যাবে। তুমি কীভাবে যাইতে চাও, বাবা?

আমি—আমি তো মনে করি যে এতজন যাওয়ার কোনো দরকার নাই। আমি স্টিভের সাথেই যাই।

লুনা আপা—আচ্ছা। আর আমরা বিকালের দিকে গিয়া তোমারে দেইখা আসব।

আম্মা—আচ্ছা মা, তাইলে তুমি ওইখানে পৌঁছাইয়া ফোন কইরো আমাদেরকে।

আমি—আচ্ছা।

বাসার সবাই বাইরে আইসা দাড়াইছে আমারে বিদায় দেয়ার জন্যে। আমি গাড়িতে উঠলাম। আম্মার চোখে কি পানি? ভাল কইরা দেখতে পারার আগেই গাড়ি চলতে শুরু করল। স্টিভের সাথে টুকটাক কথা হইলেও বেশিরভাগ সময়ই চুপচাপ বইসা রইলাম আমি। তারপরেও খুব তাড়াতাড়িই গন্তব্যে পৌঁছাইয়া গেল গাড়ি।

আমি গাড়ি থিকা নামলাম। স্টিভ নাইমা বুট খুইলা আমার লাগেইজ নামাইল। একটা বিশাল বাড়ি দেখাইয়া বলল, “এইটা হইল সেই কমিউনিটি হাউজ। অনেক বড়, তাই না?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ।”

স্টিভ বলল, “চলো ভিতরে গিয়া সবার সাথে পরিচিত হই।”

স্টিভ ভিতরে গেল। আমি আমার লাগেইজ নিয়া ওর পিছে পিছে ভিতরে ঢুকলাম।

ভিতরে কারও সাড়াশব্দ নাই। কেউ আছে বইলা মনে হয় না। স্টিভ অফিস-ঘরটায় নক করল।

দরজা খুইলা একটা মেয়ে বাইর হইয়া আইসা বলল, “হাই দেয়ার।”

“হাই জো, এইটা হইল সানিয়া। ওর ব্যাপারেই নিক আলাপ করছিল তোমার সাথে,” স্টিভ বলল।

—ও, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমাদের বাড়ির নতুন সদস্য। ওয়েলকাম সানিয়া! আমি স্টিভরে পেপারওয়ার্কগুলা বুঝাইয়াই তোমারে এই বাড়ি ঘুইরা দেখাইতেছি।

আমি বললাম, আচ্ছা, আমি এইখানে অপেক্ষা করি।

স্টিভরে নিয়া অফিস-ঘরে গিয়া পাঁচ মিনিটের মাথায়ই জো ফিরা আসল। আমারে বলল, তোমারে এতক্ষণ অপেক্ষা করাইয়া রাখার জন্যে দুঃখিত। আসো প্রথমে তোমার ঘরটা ঘুইরা আসি। সেইখানে তোমার জিনিসপত্র রাইখা তারপরে বাকি বাড়িটা দেখবো আমরা।

আমি রাজি হইলাম।

একটা বিশাল হল-ঘর

একটা বিশাল হল-ঘর, ডাইনিং এরিয়া, কিচেন এরিয়া পার হইয়া, একটা করিডোর দিয়া বাম দিকে গেলে আমার ঘর।

একটা বিশাল হল-ঘর, ডাইনিং এরিয়া, কিচেন এরিয়া পার হইয়া, একটা করিডোর দিয়া বাম দিকে গেলে আমার ঘর।

আমার ঘরের নাম্বার ছয়। সেই ব্যাপারটা ভাল লাগলো না আমার। শয়তানের নাম্বারও না ছয়? ‘দ্যা ওমেন’ মুভিটাতে তো তাই দেখাইছে।

আমি এইগুলা ভাবতে ভাবতে জো একটা সোয়াইপ কার্ড দিয়া আমার ঘরের দরজা খুইলা, ফিতা লাগানো কার্ডটা আমার হাতে দিল। আমারে কার্ডটা গলায় ঝুলাইয়া রাখতে বলল, যাতে ঘর থিকা বাইর হওয়ার সময় কার্ডটা সাথেই থাকে। আমি তাই করলাম, তারপরে ঘরে ঢুকলাম।

ঘরে ঢুইকাই ডান দিকে ওয়ারড্রোবটার পাশেই, দরজার কাছাকাছি, দরজার দিকেই মুখ করা একটা ছোট্ট পড়ার টেবিল বেশ উঁচুতে দেয়ালের সাথে লাগানো, আর সাথে একটা উঁচু চেয়ার। সেগুলার উল্টাদিকের দেয়ালে, বেশ উপরে এক ফালি জানালা। সেই জানালা দিয়া শুধু একটুখানি আকাশ দেখা যায় আর দেখা যায় বেড়ার ওইপাশের একটা পুরানো চার্চের কিছু অংশ। সেই জানলা ওয়ালা দেয়ালটা প্রায় ঘেইষা একটা ডাবল বেড আর বেডের দুই পাশে দুইটা বেড সাইড টেবিল। একটা বেড সাইড টেবিলে একটা টেবিল ল্যাম্প রাখা, অন্যটাতে একটা রেডিও অ্যালার্ম ক্লক। বিছানাটার পায়ের কাছে একটা কফি টেবিল আর একটা টাব চেয়ারও আছে। সব মিলাইয়া একটা সুন্দর অ্যারেন্জমেন্ট।

আমরা ঘরে আমার জিনিসপত্র রাইখা, আমার ঘর থিকা বাইর হইয়া বাকি বাড়িটা ঘুইরা দেখলাম।

কোথায় কোথায় বাথরুম, টয়লেট, কোথায় আর্টরুম, মিউজিক অ্যান্ড রিল্যাক্সেশন রুম, কোথায় কাপ, পিরিচ, প্লেট, গ্লাস রাখা, কোথায় খাবার রাখা, ব্যাক ইয়ার্ডের লন, স্মোকিং এরিয়া সব ঘুইরা ঘুইরা দেখাইল আমারে জো। তারপরে বলল, এখন যেহেতু কেউ বাসায় নাই, এখনই তোমার পড়াশোনা করার ভাল সময়। সবাই ফিরা আসলে তো অনেক হৈ চৈ হবে, তখন হয়ত আর পড়ায় মন দিতে পারবা না।

"জানলা ওয়ালা দেয়ালটা প্রায় ঘেইষা একটা ডাবল বেড আর বেডের দুই পাশে দুইটা বেড সাইড টেবিল।"

“জানলা ওয়ালা দেয়ালটা প্রায় ঘেইষা একটা ডাবল বেড আর বেডের দুই পাশে দুইটা বেড সাইড টেবিল।”

আমি বললাম, আচ্ছা পড়তে যাইতেছি, কিন্তু সবাই কোথায় গেছে এত সকালে?

জো দেয়ালে লাগানো একটা কাগজ দেখাইয়ে বলল, “ওই যে ওইখানে সব অ্যাক্টিভিটির টাইমটেবল আছে। আজকের, এই সময়ের অ্যাক্টিভিটিতে লেখা ‘আইকিয়া ব্রেকফাস্ট,’ তার মানে সবাই হাঁইটা আইকিয়াতে গেছে ব্রেকফাস্ট করতে, আবার হাঁইটা ফিরা আসবে।”

আমি বললাম, ও আচ্ছা।

জো বলল, এই অ্যাক্টিভিটিগুলা বাধ্যতামূলক না, তবে এগুলাতে পার্টিসিপেট করতে পারলে ভাল।

আমি বললাম, আচ্ছা, এখন তাইলে আমি একটু পড়াশোনা করি।

জো বলল, অফকোর্স, কোনো কারণে দরকার হইলে আমারে ডাইকো।

আমি “আচ্ছা” বইলা আমার ঘরে গেলাম।

পার্সের থিকা পঞ্চাশ সেন্টস বাইর কইরা, আমার ঘর থিকা বাইর হইয়া ডান দিকেই যে ফোনবুথটা, সেইটা থিকা বাসায় একটা ফোন করলাম, ঠিকঠাক মতো পৌঁছাইছি সেইটা জানানোর জন্যে।

ঘরে ফিরা আইসা কম্পিউটারটা বাইর করমু কি না ভাবলাম। তারপরেই মনে হইল, এখন তো কাজ তেমন হবে না। তারচেয়ে আমার ডায়েরিটা নিয়া বসি। লুনা আপার দেয়া কমলা আর কালো প্রজাপতির ছবি ওয়ালা নোটবইটা খুইলা বসলাম। তাতে লিখলাম:

“আজকের দিনটা মনে থাকবে মনে হয়। আজকে ক্যাট টিম আমারে নিয়া আসলো বেটিনা স্ট্রিটের একটা কমিউনিটি হাউজে। অনেক বড় বাড়ি। অনেকজন নাকি থাকে এইখানে। যতটুক দেখছি খারাপ লাগে নাই, কিচেনটা মনে হয় রেনোভেটেড। কিন্তু অনেক কিছুই বেশ পুরানো। যেমন আমার ঘরের ভিতরের ফার্নিচারগুলা। যেই চেয়ারটায় বসছি, সেইটায় উইঠা বসতে বেগ পাইতে হইছে। বিছানাটাও মনে হয় খুব বেশি নরম। এইখানের সবকিছুতেই একটা পুরানো পুরানো গন্ধ। এমন পুরানো, যেই পুরানোতে নিজের কোনো স্মৃতি মিশা নাই, যেই পুরানো শুধুই অন্যের চলার পথে ফেইলা যাওয়া বহু ব্যবহৃত পুরানো।”

আমি নোটবইটা বন্ধ কইরা চেয়ার থিকা নামলাম, আর তখনই দরজায় টোকা পড়ল। ঘোমটা ঠিক কইরা দরজা খুইলা দেখি জো দাঁড়াইয়া আছে।

জো বলল, সবাই ফিরা আসতে শুরু করছে। আসো সবার সাথে পরিচিত হও।

আমি চেহারায় কনফিডেন্স আইনা বললাম, “আচ্ছা,” কিন্তু টের পাইলাম যে আমার বুক ধুক ধুক করতেছে। নিজেরে জিজ্ঞেস করলাম, “পরিচিত জানি কেমনে হয়?” নিজে উত্তরও দিলাম, “নাম জিজ্ঞেস করতে হয়।”

—তারপরে?

—নিজের নামও বলতে হয়।

—তারপরে?

—কে কী করে সেইসব বলতে হয় আর জিজ্ঞেস করতে হয়।

—কিন্তু এইখানে তো মনে হয় অনেকেই আমারই মতন অফিসিয়ালি কিছু করে না।

—তাইলে কি কে কী করত সেইটা জিজ্ঞেস করতে হবে?

—নাহ, মনে হয় না। অতীত নিয়া কথা বলতে হয়তো অনেকেই পছন্দ করবে না।

—তাইলে? কে কী করতে চায়, সেইটা জিজ্ঞেস করা যায়, কিন্তু প্রথম আলাপেই এত কিছু বলতে হয়তো অনেকে পছন্দ করবে না।

—থাক গিয়াই দেখি কী হয়।

আমি হলঘরের দিকে পা বাড়াইতেই দেখলাম, কিচেনে একটা ছেলে চা বানাইতেছে। আমার দিকে তাকাইয়া মৃদু হাসল। আমি একটু কাছে গিয়া বললাম, হাই, আমি সানিয়া।

ছেলেটা বলল, আর আমি মাইকেল। তুমি কি আইজকাই আসছো?

—হ্যাঁ।

—বলো আমি তোমার জন্যে কী করতে পারি। এক কাপ চা বানাইয়া দেই?

—না না, চা আমিই বানাইয়া খাইতে পারব।

—তাইলে চলো এই বাড়ি তোমারে ঘুইরা দেখাই।

—তোমার এত সময় নষ্ট করতে হবে না আমার জন্যে।

—সময় নষ্ট হবে না। আসো। জো কি তোমারে অলরেডি দেখাইছে?

—দেখাইছে, তবে আমার পুরাপুরি মনে নাই কোনটা কোথায়।

—কোনো সমস্যা নাই। আমি তোমারে সব কিছু আবার দেখাবো।

ছেলেটা আমারে পুরা বাড়ি দেখাইয়া বলল, তোমার কোনো কিছু লাগলে, কোনো সমস্যা হইলে আমারে বলবা। আর্ট ঘরের পাশের ঘরটাই আমার। আমি আর্টিস্ট তো, ওইখানে ঘর হওয়াতে আমার জন্যে ভাল হইছে।

আমি বললাম, কখনো তোমার আর্ট দেখতে হবে।

মাইকেল বলল, অবশ্যই।

 

৭.

হলঘরটায় পা রাখতেই কথাবার্তা আর হাসির শব্দ কানে আসল। বুঝলাম যে এই বাড়ির আরও কিছু সদস্য ফিরা আসছে। দেখলাম, কিচেনে তিনটা মেয়ে খুব সম্ভবত একটা রেসিপি দেইখা দেইখা কিছু কাটাকুটি করতেছে। আমি কাছে গিয়া সবার উদ্দেশ্যে ‘হাই’ বললাম। ওরা আমার দিকে এক পলক চাইল, তারপরে একজন আরেকজনের মুখ চাওয়া-চাওয়ি কইরা যা করতেছিল, আবার ব্যস্ত ভঙ্গিতে তাই করতে লাগল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কি কোনো কাজে আসতে পারি?”

একটা মেয়ে উত্তর দিল, তুমি আর জন চাইলে সালাদ কাটতে পার। ওই যে ওই ব্যাগটার মধ্যে আছে সালাদের আয়োজন।

আমি অনুমান করলাম যে এই ঘরের একমাত্র পুরুষ, যে ছয় ফুটের বেশি লম্বা, যার পালোয়ানের মতো শরীরের গঠন, এবং যে আইজকা লাল টিশার্ট পরছে, সেই লোকটার নামই জন। আমি কাছে গিয়া বললাম, “হাই জন!”

লোকটা কোনো জবাব দিল না। তখন, যেই মেয়েটার লিডার লিডার ভাব, যারে সবাই ‘অ্যান’ ‘অ্যান’ বইলা ডাকতেছে, ওই মেয়েটা জনরে ডাকতেই জন কাছে গেল।

অ্যান জনরে জিজ্ঞেস করলো যে ও কী কাটবে।

জন বলল, টমাটো আর ক্যাপসিকাম।

অ্যান আমারে বলল, তাইলে তুমি কাটো শশা আর গাজর।

আমি বললাম, আচ্ছা।

hospital-25

“জনের দিকে তাকাইয়া দেখলাম, ও একদম মগ্ন হইয়া টমাটো কাটতেছে!

জন ওর পছন্দের ছুরি আর কাটিং বোর্ডটা নিল। আমি বাকি কাটিং বোর্ডটা আর একটা ছুরি নিয়া কাটা শুরু করলাম। কাটতে কাটতে জনের দিকে তাকাইয়া দেখলাম, ও একদম মগ্ন হইয়া টমাটো কাটতেছে! আর কাটতে কাটতে কী কী যানি বিড় বিড় করতেছে।

কাউরে বকতেছে কি? আমার টিভি সিরিয়ালে দেখা সিরিয়াল কিলার ডেক্সটারের কথা মনে পড়ল। মনে পড়তেই একটা ঠাণ্ডা শিহরন হইল আমার।

কে এই জন? আর এরা সবাই-ই বা কারা? আমি তাড়াতাড়ি আমার কাটাকুটি শেষ করলাম।

অ্যানের থিকা বিদায় নেয়ার সময় ও জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা, তুমি কি মুসলিম?

আমি বললাম, হ্যাঁ।

অ্যান বলল, আচ্ছা। তুমি এখন রেস্ট নাও, রান্না হইয়া গেলে সবাইরে ডাকব।

আমি “আচ্ছা” বইলা আমার ঘরে চইলা আসলাম।

ভাবলাম, একটু ঘুমাইয়া নিলে হয়তো ভাল লাগবে। আমি বিছানায় শুইয়া পড়লাম, কিন্তু বিছানা-বালিশ এতই নরম যে ঘুম আসল না। তাছাড়া বেড়ার ওইপাশের পুরানো চার্চটা থিকা অদ্ভুত সব শব্দ আসতেছে।

আমি কথাগুলা বোঝার জন্যে জানলা খুললাম। বেশিরভাগ কথাই মনে হয় অনেক পুরানো ইংলিশ বা ল্যাটিনে বলতেছে। আমি কিছুই বুঝলাম না। শুধু আওয়াজের ধরন শুইনা মনে হইল কোনো মন্ত্র পড়তেছে। যার উদ্দেশ্যে মন্ত্র পড়া, সে আবার কিছু বাক্য রিপিট করতেছে মনে হয়। মাঝে মাঝে গোঙানির শব্দে মনে হইল যে কাউরে খুব অত্যাচার করা হইতেছে।

কী হইতেছে ওইখানে? এক্সরসিজম না তো!? আচ্ছা, আমার ঘরের নাম্বার তো ছয়। আমারেও আবার এই রকম কিছু করবে না তো দুই-এক দিন পরে?

কয়েকবার নক পড়ল আমার দরজায়। আমি “কামিং” বইলা দরজা খুললাম।

অ্যানরে রান্নায় সাহায্য করতেছিল যেই মেয়েগুলা, তাদেরই একজন এই মেয়েটা। মেয়েটা মৃদু হাইসা বলল, “রান্না হইয়া গেছে। এখন সবাই ডাইনিং টেবিলে বইসা খাব একসাথে। আসো।”

আমি বললাম, ভাল খবর। খুবই ক্ষিদা লাগছে।

মেয়েটা হাসল। আমি যাইতে যাইতে মেয়েটার নাম জিজ্ঞেস করলাম। ও বলল ওর নাম ম্যারি।

 

৮.
ডাইনিং টেবিলে অনেকেই বইসা গেছে খাবার নিয়া। অ্যান কিচেন এরিয়াতে ওর রান্না করা চিকেন পারমিজানা সার্ভ করতেছে। সেই সুগন্ধে পুরা বাড়ি ম ম করতেছে। আমি অ্যানরে জিজ্ঞেস করলাম ও চিকেন পারমিজানাতে কী কী দিছে।

ও বলল, চিকেন আর পারমেজান চিজ।

আমি আমার প্লেট নিয়া বইসা গেলাম। ডাইনিং টেবিলে কাটা আর ছুরি রাখাই ছিল। আমি সালাদ দিয়া চিকেন পারমিজানা খাওয়া শুরু করলাম।

একটু খাইয়াই মনে হইল যে চিকেনের নিচে চিজ ছাড়াও আরো কিছু আছে। আমি অ্যানরে আবারও জিজ্ঞেস করলাম চিকেনের সাথে চিজ ছাড়াও আর কিছু আছে কি না।

ও হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল, ও হ্যাঁ, হ্যামও আছে। তুমি খাও না?

আমি বললাম, “না।”

ম্যারি বলল, হায় হায় তুমি তো তাইলে কিছু খাইতে পারবা না।

আমি বললাম, আমি সালাদ খাব, অসুবিধা নাই।

আমি সালাদ খাওয়া শুরু করতেই মাইকেল খাওয়া থামাইয়া অ্যানরে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি জানতা যে সানিয়া মুসলিম?

অ্যান বলল, হ্যাঁ জানতাম, কিন্তু জানতাম না যে মুসলিমরা হ্যাম খায় না।

মাইকেল বলল, আমি মনে করি সানিয়া তোমার থিকা একটা অ্যাপলজি ডিজার্ভ করে অ্যান।

অ্যান বলল, অ্যাপলজি ফর নট নোইং? আচ্ছা, আমি না জানার জন্যে ক্ষমা চাইতেছি।

মাইকেল খাওয়া ছাইড়া উইঠা গেল। আমিও উঠলাম, আর সাথে সাথে আরও কয়েকজন।

বাকি যারা ডাইনিং টেবিলে ছিল, তারা আমরা চোখের আড়াল হওয়ার সাথে সাথে হাসিতে ফাইটা পড়ল।

ঘরে আইসা আমি টাব চেয়ারটায় বসলাম। চার্চের সেই মন্ত্র পড়া এখনও চলতেছে।

আচ্ছা, আমি কী করতে পারি এখন? কম্পিউটারে হয়ত কিছু লিখতে পারি। কিন্তু ইচ্ছা হইতেছে না। তাইলে কিছু পড়তে পারি কি? সেইটাও ইচ্ছা হইতেছে না। আসলে আমার কিছুই ইচ্ছা হইতেছে না। বাসায় থাকলে এমন সময়গুলাতে সবাই মিলা হয়তো গল্প করতাম, তারপরে কোনো মুভি বা গান-টান দেখতাম।

এইসব ভাবতে ভাবতেই দরজায় টোকা পড়ল। দরজা খুইলা দেখি, জো দাঁড়ানো। আমারে বলল, “তোমার ফ্যামিলি আসছে তোমারে ভিজিট করতে। ডাইনিং স্পেসে অপেক্ষা করতেছে।”

সেইখানে গিয়া দেখি, আম্মা, লুনা আপা আর আব্বা টেবিলের এক প্রান্তে বইসা আছে। আমারে দেইখা সবাই বলল যে কমিউনিটি হাউজটা খুব সুন্দর, সবার খুবই পছন্দ হইছে। আমি বললাম, “হ্যাঁ, খারাপ না।”

আব্বা তেমন কোনো কথা বলতেছে না। শুধু আমারে দেখতেছে। আম্মা জিজ্ঞেস করল যে দুপুরে খাইছি কি না। আমি বললাম, “খাইছি, তবে কম।”

আম্মা ব্যাগের থিকা বাটি বাইর কইরা বলল, এর মধ্যে একটু ভাত, লাউ-চিংড়ী আর কুমড়া ভাজি আছে মা, খাইয়া নে।

আমি খাওয়া শুরু কইরা দেখলাম যে, আব্বা তখনও আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকাইয়া আছে। খুব সম্ভবত আমার গলায় ঝোলানো কী-কার্ডটা দেখতেছে। আব্বা মুখ খুলল, বলল, “তোরে গলায় ঝুলানো এই কার্ডটায় মানাইছে তো! প্রফেশনাল প্রফেশনাল লাগতেছে।”

আমি কার্ডটা খুইলা ঠাস কইরা টেবিলে রাখলাম। তারপরেও দেখলাম যে আব্বা আমারেই দেখতেছে। আমি আব্বারে জিজ্ঞেস করলাম যে খাবে কি না।

আব্বা বলল, “না।”

আমার মনে হইল যে আব্বা আমার চোখে চোখ রাইখা আমার মনে মনে বলা কথা জানতে চাইতেছে। আমি টেবিলের অন্য সাইডে গিয়া বসলাম। আব্বা ওইদিকে ঘুরতে নিল, কিন্তু আম্মা ইশারায় ঘুরতে মানা করল।

আরও কিছুক্ষণ গল্প করার পরে ওরা বিদায় নিল। ওদেরকে মেইন দরজা পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিতে গিয়া দেখি পাশেই একটা হোয়াইট বোর্ডে কে কতক্ষণের জন্যে বাইরে থাকবে, কখন ফিরবে এই সমস্ত ডিটেইলস লেখা।

ওরা চইলা যাওয়ার পরে আমি জো’রে জিজ্ঞেস করলাম, আমিও কি ২-৩ ঘণ্টার জন্যে বাইরে থিকা ঘুইরা আসতে পারমু?

জো বলল, অবশ্যই। শুধু কোথায় যাইতেছ সেইটা লিখা যাও, আর কতক্ষণ লাগতে পারে, সেইটা।

আমি সেইসব ডিটেইলস পূরণ কইরা মোনাশ ইউনিভারসিটির দিকে রওনা দিলাম।

 

৯.
গরমকাল হইলেও বাইরে খুবই বাতাস থাকায় একটু ঠাণ্ড ঠাণ্ডা লাগতেছে দিনটা। বাইরে ঝড়ই হইতেছে প্রায়। কখন যে কোন গাছের ডাল ভাইঙ্গা মাথায় পড়ে, ঠিক নাই। তবুও এই যে এই ফ্রিডম আমি পাইছি, এইটা অতুলনীয়! এই ফ্রিডম সেলেব্রেইট করতে আমি রাস্তার পাশের একটা ফুয়েল স্টেশন থিকা দুইটা ছোট ছোট প্যাকেটে চিপস আর একটা চকলেট কিনলাম।

মোনাশ ইউনির একদম কাছে গিয়া ঠিক করলাম যে আইজকা আর মোনাশ ইউনিতে যামু না। আমি উল্টা দিকে ঘুইরা আবার কমিউনিটি হাউজে ফিরতে লাগলাম।

hospital-26a

“তবুও এই যে এই ফ্রিডম আমি পাইছি, এইটা অতুলনীয়!”

ফিরা আইসা হলঘর, কিচেন বা ডাইনিং এরিয়াতে কাউরে দেখলাম না। এমন কি জো’রেও না। কিন্তু ওরা কোথায় যাইতে পারে সেইটা নিয়া আমার বেশি মাথা ঘামাইতে ইচ্ছা করল না। তারপরেও অ্যাক্টিভিটিস অ্যান্ড ইভেন্টসের টাইমটেবলটা দেইখা বুঝলাম যে সবাই একটা কমিউনিটি মিটিং-এ আছে।

আমি আমার ঘরে গিয়া বিছানায় শুইয়া পড়লাম। এইটা সেইটা ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমাইয়া পড়লাম জানি না।

ঘুম ভাঙল ঠিক রাত আটটায়। আমি কোথায় আছি বুইঝা ওঠার সাথে সাথে এক লাফে বিছানা ছাইড়া উঠলাম। তাড়াতাড়ি কার্ডটা গলায় ঝুলাইয়া আর ওড়নাটা জড়াইয়া নিয়া হলঘরের দিকে রওনা দিলাম। কিচেনে দেখলাম অনেকে খাওয়া শেষ কইরা প্লেট ডিশওয়াশারে ভরতেছে। ডাইনিং টেবিলে অনেকেই ব্রেডে জ্যাম, নাটেলা, পিনাট বাটার, মধু ইত্যাদি লাগাইয়া স্যান্ডউইচ খাইতেছে।

আইজকা বোধহয় সবাই এইগুলা খাইয়াই ঘুমাবে। আমিও একটা পিনাট বাটার অ্যান্ড জ্যাম স্যান্ডউইচ বানাইয়া ডাইনিং টেবিলে বইসা খাইয়া, প্লেট ডিশওয়াশারে দিয়া, হলঘরে টিভির সামনে বসলাম।

বেশির ভাগ সময়ই টিভি দেখতে ভাল লাগে না আমার। কিন্তু এই সময়টায় টিভিই যানি আমার বাসার মানুষগুলার সাথে আমার একমাত্র কানেকশন।

কিছুক্ষণ টিভি দেইখাই উইঠা পরলাম আমি। আর তখনই খেয়াল হইল যে পুরা হলরুম, ডাইনিং এরিয়া আর কিচেন এরিয়া মিলাইয়া জন, আমি আর আরেকটা মেয়ে ছাড়া আর কেউ নাই! জো’রেও তো কোথাও দেখা যাইতেছে না!

এদিকে মেইন দরজাটা আর ফোনবুথের কাছের দরজাটা হা কইরা খোলা।

নাহ, কিছু একটা হইতেছে এইখানে।

আমি অফিস রুমের জানলায় নক করলাম। একটা অপরিচিত সুন্দর মুখ জানলা খুইলা বলল, “হাই, আমি কী করতে পারি তোমার জন্য?”

আমি বললাম, জো আছে?

—জো তো ডে-শিফটে ছিল। ও বাসায় চইলা গেছে। ওর জায়গায় আমি আছি এখন নাইট শিফটে। আমার নাম লিওনি।

—আমি কেমনে বুঝব তুমি যে তুমি?

—এই দেখো আমার কার্ড। এইখানে লেখা আছে যে আমি এইখানে একজন সাপোর্ট ওয়ার্কার হিসাবে কাজ করি।

—আচ্ছা, আমি তাইলে তোমারে বলতে পারি।

—কী?

—আমার মনে হয় এইখানে কিছু একটা হইতেছে। এই দেখো বাইরে যাওয়ার দুইটা দরজা কেমন হা কইরা খোলা। মনে হইতেছে যে এখনি কেউ এইখানে ডাকাতি, খুন বা কিডন্যাপ করবে অথবা কোনো অঘটন ঘটাবে!

—আশা করা যায় যে এইগুলা কিচ্ছু ঘটবে না। এই দুইটা দরজা খোলা রাখা হইছে আমাদের স্টক আনা-নেয়ার সুবিধার্থে। একটা ট্রাক ভর্তি স্টক আসছে দেখো। আমাদের স্টোররুমটা কি তুমি দেখছো?

—না।

—থাক, এখনি দেইখা কাজ নাই। তার চেয়ে চল মিউজিক অ্যান্ড রিল্যাক্সেশন রুমে যাই।

—সেইখানে গিয়া কী হবে?

—তোমার ভয় আর আতঙ্ক কাটবে।

—আমি যাইতে চাই না।

—প্লিজ চলো। দুই মিনিটের জন্যে হইলেও চলো।

আমি লিওনির সাথে ‘মিউজিক অ্যান্ড রিল্যাক্সেশন’ রুমে গেলাম।

আমার মনে হইল যে লিওনি গুণ্ডা দলের সাথে জড়িত থাকতে পারে। আমারে এইখানে ব্যস্ত রাইখা ও হয়তো ওর কাজ সাড়াইয়া নিবে। আর তারপরে আমারে কিডন্যাপ করবে বা খুন করবে।

আমি এইসব ভাবতে ভাবতেই লিওনি একটা রিল্যাক্সিং মিউজিকের সিডি বাজানো শুরু করল। আমি আমার হাত-পা, শরীর একদম ছাইড়া দিলাম। আমার চোখ আপনা-আপনিই বন্ধ হইয়া আসল। দুঃশ্চিন্তা আর ভয় কাইটা এক ধরনের স্থিরতা ফিরা পাইলাম আমি। লিওনিরে ধন্যবাদ দিয়া ঘরটা থিকা বাইর হইয়া আসলাম। লিওনি কিছু বলল না।

হলরুমের এক মাথা থিকাই অন্য মাথায় কিচেন এরিয়াতে জনরে দেখলাম থালা-বাসন ধুইতেছে। যেই মেয়েটা এইখানে ছিল, সেও এখন আর নাই। আমার জনরে পাশ কাটাইয়া নিজের ঘরে যাইতে ভয় লাগল। তবুও প্রায় চোখ বন্ধ কইরা কয়েক লাফে কিচেন এরিয়া পার হইলাম। তাড়াতাড়ি আমার ঘরের দরজা খুইলা অনিচ্ছাকৃত ভাবে একটু জোরে দরজা বন্ধ কইরা হাপাইতে লাগলাম।

এদিকে আমার ঘরে বইসা থাইকাও শান্তি নাই। কেউ চাইলেই জানলা দিয়া আমারে গুলি করতে পারে।

আমি ঘর থিকা বাইর হইয়া প্রায় দৌড়াইয়া পাবলিক ফোনবুথটার কাছে গেলাম। ট্রিপল জিরো ডায়াল কইরা পুলিশরে চাইলাম। পুলিশরে সব বিস্তারিত বললাম। পুলিশ লিওনিরে চাইল।

লিওনি আর পুলিশের মধ্যে কী আলাপ হইল আমি জানি না, তবে লিওনি যখন আমারে বলল যে আমার পুলিশে ফোন করা ঠিক হয় নাই, আমার আবার ওরে সন্দেহ হইল। আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে কানতে লাগলাম।

লিওনি জিজ্ঞেস করল, তুমি কেন কানতেছ? আমি কি কিছু করতে পারি, যেইটাতে তোমার ভাল লাগবে?

আমি বললাম, আমি এইখানে সেইফ ফিল করতেছি না। আমি বাসায় ফিরা যাইতে চাই।

—তুমি কি আমারে বিশ্বাস করো?

আমি কিছু বললাম না।

—আমারে বিশ্বাস করলে এইটুক জাইনা রাখো যে আমি তোমার কোনো ক্ষতি করব না।

(কিছুটা স্থির হইয়া) আচ্ছা।

—তুমি তো বাসায় পড়াশোনায় মন দিতে পারতেছিলা না।

—তবুও বাসায় কোনো একটা ব্যবস্থা হবে। আমি হয়ত রোজ লাইব্রেরিতে যাব।

—ঠিকাছে, তুমি বাসায় যাইতে চাইলে যাবা। কিন্তু এত রাতে কেউ কি তোমারে নিয়া যাইতে পারবে? এখন রাত দশটা বাজে।

—আমার বোন মনে হয় এখনও জাইগা আছে। ওর ফোন নাম্বার মনে হয় আছে আমার ফাইলে। আর আমি ট্যাক্সিতেও যাইতে পারি। আমার কাছে ট্যাক্সি ভাড়াও আছে, আমাদের বাসার চাবিও আছে।

—না, এই অবস্থায় আমি তোমারে ট্যাক্সিতে যাইতে দিব না। তুমি এইখানে বসো, আমি তোমার বোনরে ফোন করতেছি।

আমি টিভির সামনের থ্রি-সিটারটায় বসলাম। কিছুক্ষণ পরে সোফাটা একটু নইড়া ওঠাতে আমি ভয়ে ভয়ে আড়চোখে বামদিকে তাকাইয়া দেখি, জনও আইসা থ্রি-সিটারটার অন্য মাথায় বসছে!

আমার হার্ট এত জোরে বিট করতেছে যে মনে হয় এখনি বাইর হইয়া যাবে। আমি মোটামুটি নিশ্চিত যে এইবার আমারে মাইরা ফেলা হবে।

আমি কাঁপতে কাঁপতে, কানতে কানতে এক দৃষ্টিতে মেইন দরজার দিকে তাকাইয়া কলেমা পড়তেছি। শেষে আর না পাইরা উইঠা দাঁড়াইলাম। সোফা দিয়া ঘেরা ছোট জায়গাটার মধ্যেই কানতে কানতে পায়চারি করতে লাগলাম।

hospital-27

“লুনা আপার গাড়িতে আমার জিনিসপত্র তোলার পরে দেখলাম যে আব্বা-আম্মাও আসছে।”

হঠাৎ খোলা দরজার অন্ধকার ভেদ কইরা লুনা আপার মুখটা ভাইসা উঠল। আমি হাসিতে, কান্নায় ভাইসা গেলাম। একটা সোফায় বইসা নিজেরে সামলাইয়া নেয়ার চেষ্টা করলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যেই লুনা আপা আর লিওনি আমার কাছে আসল। লিওনি আমারে বিদায় দিল। আমি ওরে অনেক ধন্যবাদ দিলাম।

লুনা আপার গাড়িতে আমার জিনিসপত্র তোলার পরে দেখলাম যে আব্বা-আম্মাও আসছে। আমি হাসলাম।

আব্বা-আম্মা জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছ মা?

আমি বললাম, ভাল।

(কিস্তি ৩)