Pages Menu
TwitterRssFacebook
Categories Menu

Posted by on Jul 11, 2018 in উপন্যাস, হসপিটাল | Comments

হসপিটাল (৪)

হসপিটাল (৪)

আগের  কিস্তি। প্রথম কিস্তি

১৭.
গাড়ি থামল মোনাশ মেডিক্যাল সেন্টারে। বুট খুললে আমি তা দেখতে পাইলাম। পরিচিত জায়গা দেইখা খুশি হব কি না বুঝতে না বুঝতেই পুলিশ অফিসারদের নির্দেশে গাড়ি থিকা নামলাম। তারা জিজ্ঞেস করল আমি ঠিক আছি কি না। আমি বললাম ঠিক আছি। তারপরে হসপিটালের ইমার্জেন্সি দিয়া না নিয়া মেইন এন্ট্রেন্স দিয়া নিল আমারে। কিন্তু ঢুইকাই ডান দিকে কেন? ডান দিকে তো সাইকাইয়াট্রিক ওয়ার্ড! অবশ্য, ইতিহাসে তো নিশ্চয়ই এমন উদাহরণও আছে যে মূলধারা থিকা ব্যতিক্রমধর্মী চিন্তাভাবনা রক্ষা করার খাতিরে অনেকে যা না তা সাইজা সমাজ থিকা, রাজনীতির হাত থিকা নিজেদেরকে আড়াল করছে! এইটাও হয়তো সেই রকমই কোনো ব্যবস্থা।

ভাবতে ভাবতেই কোথার থিকা যানি একটা হুইল চেয়ার আসল। আমারে বলা হইল হুইল চেয়ারে বসতে। আমি বসতে চাইলাম না। হাঁইটাই যাইতে চাইলাম। ওরা বলল, আমি নিজে থিকা না বসলে আমারে বসানো হবে। অতএব আমি বসলাম।

লম্বা করিডোর ধইরা হুইল চেয়ার চলল। আমার দুই পাশে দুই পুলিশ অফিসার, আর পিছনে হুইল চেয়ার নিয়া আসা লোকটা। করিডোরের শেষ মাথায় ভারি কাচের পাল্লা ওয়ালা অটোমেটিক দরজা। তার সামনে থামতেই ওষুধের গন্ধ নাকে আসল আর উঁচু দরজাগুলা ইলেক্ট্রিক শেইভারের মতন “জিইইইই“ শব্দ তুইলা খুইলা গেল। এক মুহূর্তের জন্যে একটা ভয় ঘিরা ধরল আমারে। ‘এ আমারে কোথায় নিয়া আসছে? ওরা কী করবে আমারে? ওষুধ দিয়া ঘুম পাড়াইয়া রাখবে? ইলেক্ট্রিক শক দিবে?’ এইসব ভাবতে ভাবতে আরেকটা দরজার সামনে হুইল চেয়ার থামল। মনে পড়ল যে ঠিক এই জায়গাটাতে আমি আগেও আসছি, আমার প্রথম সাইকোসিসের সময়।

ইন্টারকমে একজন পুলিশ অফিসার জানাইল যে আমরা দরজার সামনে। ভিতর থিকা একজন আইসা দরজা খুইলা দিল। আমার হুইল চেয়ার ঠেইলা সবাই ভিতরে ঢুকল।

একজন পুলিশ অফিসার আমারে নামতে বলল। নামার পরে আমার ব্যাগটা আমারে দিল, তারপরে ওরা সবাই চইলা গেল। ব্যাগটা কান্ধে নিয়া আমি রিসেপশনে গেলাম। জানলাম, আমার ঘর কোনটা সেইটা এখনো ঠিক হয় নাই। ঠিক হইলেই আমারে জানাবে। আমি ততক্ষণ টিভি লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে পারি।

হঠাৎ স্কয়ার করিডোরটার দুই দিক থিকা দুইটা ছেলে দৌড়াইয়া আইসা, হাত ভাঁজ কইরা, দুইজন দুইজনের পেশীতে পেশী, কাঁধে কাঁধ লাগাইয়া, ঠিক আমার সামনে দাঁড়াইয়া হাসতে লাগল।

টিভি আমি খুব একটা দেখি না। তাই মাথা নিচু কইরা ছোট ছোট পা ফেইলা হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে লাগলাম এই সময়টা কেমনে কাটবে আমার।

১৮.
হঠাৎ স্কয়ার করিডোরটার দুই দিক থিকা দুইটা ছেলে দৌড়াইয়া আইসা, হাত ভাঁজ কইরা, দুইজন দুইজনের পেশীতে পেশী, কাঁধে কাঁধ লাগাইয়া, ঠিক আমার সামনে দাঁড়াইয়া হাসতে লাগল। আমিও না হাইসা পারলাম না।

একটা ছেলে হ্যান্ডশেইক করার জন্যে হাত বাড়াইয়া বলল, “আমি গ্লেন।” সাথে সাথে আরেকটা ছেলেও হাত বাড়াইয়া বলল, “আমি মাইকেল।” আমিও আমার নাম বললাম, হ্যান্ডশেইক করলাম। আমার মন অনেকটা হালকা হইয়া গেল।

গ্লেন: নাইস টু মিট  ইউ সানিয়া। তোমার নতুন বাসা কেমন লাগতেছে? হা হা। আমি দুষ্টামি করতেছি। বেশিদিন থাকতে হবে না তোমার এইখানে। দেখতে দেখতেই সময় কাইটা যাবে। আসো তোমারে তোমার বাসা ঘুইরা দেখাই।

আমি: ঘুইরা দেখাইতে হবে না। আমি এইখানে আগেও আসছি, এইটা একটা স্কয়ার শেইপের করিডোর।

গ্লেন: তবুও, অনেক চেইঞ্জ হইছে নিশ্চয়ই এতদিনে, যেই সম্পর্কে তুমি হয়ত জানো না!

আমি ওদের সাথে গেলাম। ওরা ঘুইরা ঘুইরা দেয়ালে টাঙানো আর্টগুলা, ফটোগ্রাফগুলা দেখতে লাগল আর বিভিন্ন কমেন্ট করতে লাগল। আমার ভাল লাগল ওদের অ্যানালিসিস। ওদের মধ্যে কোনো রকম অ্যাবনর্মালিটি দেখলাম না আমি। তবু কেন ওরা সাইকাইয়াট্রিক ওয়ার্ডে? ওরাও কি বিভিন্ন কারণে সমাজ থিকা, রাজনীতি থিকা নিজেদেরকে আড়াল করতে চাইতেছে, সাইকাইয়াট্রিক ওয়ার্ড নামের এই টেম্পোরারি অ্যাকমোডেশনে আইসা? পুরা শহরের সবচেয়ে ইউনিক মানুষরা এই ওয়ার্ডে আছে মনে হয়। কী ইউনিক অপর্চুনিটি আমার এদের সবার সম্পর্কে জানার। কে জানে, আমরা হয়ত একজন আরেকজনের কাজে কন্ট্রিবিউট করতে পারমু!

আমি গ্লেনরে ওর পেশা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। ও বলল, ও কার্পেন্টার। আমার ক্লাস নাইনের উড্ ওয়ার্ক ক্লাসের কথা মনে পড়লো। কত কষ্ট কইরা একটা কাঠের পাখি বানাইছিলাম কয়েক সপ্তাহ ধইরা। আচ্ছা, গ্লেনের এই দক্ষতা আমাদের এই গ্রুপে কী কাজে লাগবে? কোন নির্জন বনে গিয়া ঘরবাড়ি আর ফার্নিচার বানানোর কাজে? না মনে হয়। বরং কারপেন্ট্রিরে ধরা যায় শ্রম, অধ্যবসায় আর সৃজনশীলতার সংমিশ্রণ। কাজেই অন্য অনেক গভীর, সৃজনশীল ও অ্যানালিটিক চিন্তার কাজেও এইটা আসতে পারে।

হঠাৎ কাঁধে কারো হাত পড়ায় চমকাইয়া তাকাইলাম।

গ্লেন: স্যরি, তোমারে ভয় দেখাইতে চাই নাই। তোমারে অনেক ডাকডাকি করলাম, তুমি শোনো নাই, তাই…।

আমি: না না আমি ভয় পাই নাই। …হ্যাঁ, চিন্তা-ভাবনায় হারাইয়া যাওয়ার বাতিক আছে আমার।

—আচ্ছা আচ্ছা। সেইটা নিশ্চয়ই খুবই লিবারেটিং?

আমি কিছু বললাম না। হাসলাম। বদ্ধ বাতাসে “লিবারেটিং” শব্দটা ভাইসা বেড়াইতে লাগল।

গ্লেন: যেই জন্যে তোমারে ডাকতেছিলাম… এ হইতেছে ক্রিস। খুব ভাল গিটার বাজায়। এবং নিজেরে একজন বড় বিজ্ঞানি বইলা দাবি করে।

আমি: আচ্ছা, কী বিজ্ঞান পড়ছ তুমি ক্রিস?

ক্রিস: পদার্থ বিজ্ঞান, জৈব বিজ্ঞান, রসায়ন… সব কিছু।

আমি: আচ্ছা আচ্ছা।

ক্রিস: …এবং গণিত।

আমি: আচ্ছা, গণিতও?

ক্রিস: হ্যাঁ। ওয়ান প্লাস ওয়ান ইজ নট অলওয়েজ টু। ইট্ ক্যান অলসো বি থ্রি—ফাদার, মাদার অ্যান্ড দ্য বেবি। আচ্ছা, তোমরা কিছু মনে না করলে  আমি এখন যাই? আমার কিছু কাজ আছে।

আমি: না না কিছু মনে করব না। তুমি কাজ করো।

ক্রিস চইলা যাওয়ার পরে গ্লেন আর মাইকেল  আমারে নিয়া আবার করিডোর ধইরা হাঁটতে থাকল। এবং করিডোরের দুইপাশের দরজাগুলা দিয়া তাকাইয়া থাকা কৌতূহলি মুখগুলার সাথে আমার পরিচয় করাইয়া দিতে লাগল। বেশিরভাগেরই তেমন কোনো সমস্যা আছে বইলা মনে হইল না। একজন শুধু বিড় বিড়  কইরা কী যানি বলতেছে, আমারে দেইখাই যেইটা আওড়ানোর স্পিড বাইড়া গেল। সে আমার দিকে অদৃশ্য কী যানি ছুঁইড়া ছুঁইড়া দিতে লাগল। হয়ত সে যাদুমন্ত্র জানে। আমারে পছন্দ হয় নাই হয়ত, তাই তার বিদ্যা দিয়া আমারে ঘায়েল করতে চাইতেছে। কিন্তু আমারে ঘায়েল করা অত সহজ না, কারণ আমি আল্লাহ্‌র বান্দা।

কিছুদূর গিয়া আরেকজনরেও দেখলাম যে হয়ত আমারে পছন্দ করল না। তার ঘরের কাছে যাইতেই সে তার প্যান্টের জিপার খুইলা তার শিশ্ন বাইর কইরা ঝুলাইয়া দিল। আমি তার মুখের দিকে তাকাইলাম। ষাট-পয়ষট্টি বছরেও যে এত সুন্দর, সে তরুণ বয়সে দেখতে কেমন ছিল একটু ভাবার চেষ্টা করলাম। তার গাঢ় নীল ডাগর চোখে দগ দগ করতেছে কীসের অভিমান? কীসের বিদ্রোহ? আমি চোখ সরাইয়া নিলাম। মাইকেল আদেশের স্বরে বলল, “মিক, বিহেইভ ইওরসেল্ফ।” সাথে সাথে মিক তার ঘরে ঢুইকা গেল।

মাইকেল: কিছু মনে কইরো না। ওর মধ্যে এইরকম পাগলামি আছে, কিন্তু ওর মনটা খুব ভাল। দুই একদিন সময় দাও, ও যে আসলে কত সুন্দর একজন মানুষ সেইটা বাইর হইয়া আসবে।

আমি: সেইটা তো বাইর হইয়াই আছে!

গ্লেন আর মাইকেল হাসল।

গ্লেন: হ্যাঁ অনেক মেয়ে ওর জন্যে পাগল।

আমি: এইখানে আসার একটা ছুতা তো লাগবে!

গ্লেন আর মাইকেল আবার হাসল।

তখনই আমারে ডাইকা নিল একজন নার্স। আমার ঘর রেডি হইয়া গেছে।

১৯.
ঘরটা ভাল। ছোট্ট একটা সিঙ্গেল বেড, তার একপাশে দেয়ালে লাগানো একটা টেবিল আর সাথে একটা চেয়ার, আরেক পাশে একটা বেড সাইড টেবিল আর শেলফ। একটা বাথরুম আছে, যেইটা ঘরের একদিকের নেইবারের সাথে শেয়ার করতে হবে। আমার জন্যে সবচেয়ে স্বস্তির কথা হইল যে ঘর শেয়ার করতে হবে না। যা দেখলাম, শেয়ার্ড ঘরগুলাতে নিজের জন্যে স্পেইস আরও কম থাকে আর কোনো টেবিল থাকে না। ঘরে ঢুইকাই ঘুমাইয়া পড়ো আর কি, অবশ্য সেই সময়ে অন্যজনের যদি কোনো ভিজিটার না থাকে ঘরে, তাইলে। আমি হাতমুখ ধুইয়া ঘুমাইয়া পড়লাম।

ছোট্ট একটা সিঙ্গেল বেড, তার একপাশে দেয়ালে লাগানো একটা টেবিল আর সাথে একটা চেয়ার, আরেক পাশে একটা বেড সাইড টেবিল আর শেল্ফ। একটা বাথরুম আছে, যেইটা ঘরের একদিকের নেইবারের সাথে শেয়ার করতে হবে।

সকালে ঝন ঝন শব্দে ঘুম ভাঙল। দরজা খুইলা দেখি, চারজন শেফের ইউনিফর্ম পরা নারী-পুরুষ দুই ট্রলি ভর্তি ট্রে সাজাইয়া নিয়া যাইতেছে ডাইনিং হলের দিকে। দেইখাই পেটে ক্ষিদা মোচর দিয়া উঠল। হাতমুখ ধুইয়া রেডি হইয়া ডাইনিং হলে গেলাম।

ডাইনিং হলে অনেকেই লাইন ধরছে যার যার ট্রের জন্যে। অনেকে বইসা আছে যে লাইন আরেকটু ছোট হইলে গিয়া দাঁড়াবে। আমিও বসলাম ডাইনিং হলের একমাত্র সবুজ সোফাটায়। লাইন ছোট হইয়া আসছে। নার্সরা ট্রে হাতে নিয়া নাম ডাকতেছে আর বাকিরা গিয়া গিয়া ট্রে নিয়া আসতেছে। আমিও গিয়া একপাশে দাঁড়াইলাম। আমার নাম নাই কোনো ট্রেতে, কারণ আমি তো মিল অর্ডারের কাগজ পূরণ করি নাই আগের রাত্রে। তো আমারে ওরা এক্সট্রা খাবারের থিকা নিয়া একটা ট্রে বানাইয়া দিল। আমি ট্রে নিয়া প্রায় স্কয়ার সিটিং অ্যারেইঞ্জমেন্টের এক কোনায় গিয়া বসলাম। দেখলাম, গ্লেন আর মাইকেলও আসতেছে ট্রে হাতে। আমি হাত নাড়লাম। ওরাও হাসল। আমার দুই পাশে জায়গা নাই বইলা ওরা অন্যদিকে বসল, আমার মুখামুখি। আমি সবসময়ের মতই নিজের সাথে কথা বলতে বলতে বাটিতে কর্ন-ফ্লেইক্স ঢাললাম। সাথে সাথে গ্লেনসহ অনেকে উইঠা গেল। ওদের ট্রের দিকে তাকাইয়া দেখি, ওরা উইট-বিক্স খাইতেছিল। আমি ঠিক বুঝলাম না কী হইতেছে। তাই কর্ন-ফ্লেইক্সে দুধ ঢাইলা খাইতে শুরু করলাম।

তখন একটা মেয়ে “হোয়াট নন্‌সেন্স” বইলা উইঠা গেল। সাথে সাথে আরও বেশ কয়েকজন। আমার আর খাইতে ইচ্ছা হইল না। বাসার কথা মনে হইল। বাসায়ও কি অনেকটা এমনই হইতেছিল না ইদানিং? অনেক রকম খাবার দেখতাম কিন্তু খাইতে গেলেই বিরক্তির প্রকাশ দেখতাম, বাঁকা বাঁকা কথা শুনতাম। সেগুলা কি আসলেই হইছে? নাকি শুধুই আমার মাথার দোষ?

আমি ট্রে ট্রলিতে রাইখা গেলাম সবাই যেইখানে গেছে। স্মোকার্স কোর্টইয়ার্ডে। আসলে ওইটা স্মোকার্স কোর্টইয়ার্ড ছিল না। বড় বড় কইরা “নো স্মোকিং ইন দিস এরিয়া” লেখা বেশ কয়েক জায়গায়। কিন্তু স্মোকারদের তো একটা জায়গা লাগে স্মোকিঙের জন্যে। তাই স্মোকিং সহ সব ধরনের আউটিং ওই জায়গাটাতেই হয়। ডাইনিং হলে দাঁড়াইয়া কোর্টইয়ার্ডের দরজা খুলতেই এক ঝাঁক কবুতর উড়াল দিয়া কোর্টইয়ার্ডের চারপাশের চালে গিয়া বসল। আমার খুব ভাল লাগল তাদের পাখা ঝাপটানোর শব্দ। সবাই গল্প করতেছে আর কাগজে টোব্যাকো ভইরা সিগারেট বানাইতেছে। আমি স্মোকারদের থিকা দূরে একটা খালি বেঞ্চ পাইয়া বসলাম। সাথে সাথে মেঘ কাইটা গিয়া সূর্যের আলো পড়ল আমার মুখে। স্মোকাররা স্মোকিং শেষে ভিতরে ঢুকল, কেউ কেউ পুল খেলতে, কেউ কেউ টিভি লাউঞ্জে। আমি আমার ঘরে গেলাম কিছু আইডিয়া ডাইরিতে লিখা রাখার জন্যে।

ডাইরিটা লুনা আপার দেয়া। খুবই সুন্দর একটা বাউন্ড বুক। সামনে, পিছনে প্রজাপতির ছবি। অনেক কিছু লিখছি ইতিমধ্যেই। বেশিরভাগই বাক্য দিয়া, বর্ণনা দিয়া লেখা। কিছু জিনিস অংক দিয়াও দেখাবো ভাবতেছিলাম। কিন্তু সেইটা কি ঠিক হবে কি না বুঝতে পারতেছি না। একটা অংক আমি হসপিটালে আসার আগে, লাইব্রেরিতে বইসা শুরু করছিলাম। শেষটা মেলে নাই। শুরুতেই বোধ হয় গোলমাল ছিল, মানে ফর্মুলায়। কিন্তু আমি তো ফর্মুলা থিকা সরতে চাইতেছি। তাইলে ফর্মুলা কেন ব্যবহার করলাম? শুধুই অন্যদেরকে বোঝানোর জন্যে? অন্যদেরকে কেন বোঝাইতে হবে? তাদের ইচ্ছা হইলে তারাই আমার ভাষা বুইঝা নিবে। এইসব ভাবতেছি, আর তখনই আমার ঘরের কাছেই, রিসেপশনে হট্টগোল শুইনা বাইর হইয়া গেলাম।

২০.
দেখি, একটা মধ্যবয়সী লোক জনে জনে জিজ্ঞেস করতেছে কারো কাছে ৫০ সেন্টস আছে কি না। আর বলতেছে, “ফাদার মোর‍্যান আমারে কাইলকা ভিজিট করবে। আমারে নিয়া যাবে। আমি আমার ভাইদেরকে দেখব।” সবাই বলতেছে “খুব ভাল কথা ডমিনিক। আমরা বুঝছি, এখন শান্ত হও।” শুধু গ্লেন ওর সাথে সুন্দরভাবে কথা বলতেছে। সুন্দরভাবে ওর সব কথার জবাব দিতেছে।

আমারে রিসেপশনের এক কোণে দেইখা ডমিনিক আমার দিকে আগাইয়া আসল। বলল, “তোমার কাছে ৫০ সেন্টস আছে?”

আমি বললাম, “৫০ সেন্টস দিয়া তুমি কী করবা?”

ডমিনিক বলল, “ফাদার মোর‍্যানরে ফোন করব।” উচ্ছসিত গলায় ও আরো বলল, “ফাদার মোর‍্যান আমারে নিতে আসবে কাইলকা। আমার ভাইদের সাথে দেখা হবে।”

আমি বললাম, “তুমি একটু দাঁড়াও, আমি ৫০ সেন্টস নিয়া আসতেছি।”

আমি ঘর থিকা ৫০ সেন্টস আইনা ডমিনিকের হাতে দিলাম। ও খুব খুশি হইল। আমার নাম জানতে চাইল। বললাম।

২১.
ঘরে ফিরতে ফিরতে ভাবলাম যে সবই হইল, শুধু কোর্টইয়ার্ডে কেন হঠাৎ সবাই গেল আর কেনই বা স্মোকিং শেষে চইলাও আসল, সেই রহস্য ভেদ হইল না। তখনই দেখলাম যে গ্লেন একটা পানির বোতল হাতে টিভি লাউঞ্জে ঢুকতেছে। আমিও ওর পিছে পিছে টিভি লাউঞ্জে ঢুকলাম। ওর ঠিক পাশের সিটে বসলাম। ওরে কোর্টইয়ার্ডে সবাই কেন গেল জিজ্ঞেস করতেই ও বোতলটার নিচের অংশ দেখাইয়া বলল, “এই দেখো।”

আমি দেখলাম, পানির নিচে সাদা সাদা গুঁড়া গুঁড়া কী যানি জইমা আছে। আমি হতভম্ব মুখে মনে মনে বললাম “আর্সেনিক!” তারপরে বড় বড় চোখে গ্লেনের দিকে তাকাইলাম। এইটা প্রোটেস্ট করতে সবাই কোর্টইয়ার্ডে গেছিল! কোর্টইয়ার্ড একটা প্রোটেস্টের জায়গা! কী অ্যাকটিভ! কী রোম্যান্টিক! আমি নিজের অজান্তেই গ্লেনের একটা হাত চাইপা ধরলাম। আমার হাত কাঁপতেছে। গ্লেন বোতলটা মেঝেতে নামাইয়া রাইখা ওর আরেক হাত দিয়া আমার হাতটা চাইপা ধরল।

মধ্যের দুইটা বেঞ্চ জুইড়া ওরা বসা। ড্যানিয়েল, মিক, ডমিনিক এক বেঞ্চে বসা, আর বেঞ্চের পাশে, ফ্লোরে গ্লেন। মাইকেল এবং আরও কয়েকজন উল্টাদিকের বেঞ্চটায় বসা, তাই আমারে এখনো ঢুকতে দেখে নাই ওরা।

তারপরে, বিকালে করিডোর দিয়া হাঁটতেছি, হঠাৎ কোথার থিকা যানি গ্লেন দৌড়াইয়া আইসা, হাঁটুর উপরে ভর কইরা আমার কাছ পর্যন্ত স্লাইড কইরা আইসা বলল, “নাও, এইটা তোমার জন্যে।” কী আমার জন্যে, আমি ভাল কইরা বোঝার আগেই ও উধাও। আমি হাতের মুঠা খুইলা দেখি, একটা সাদা ডেইজি। আমার খুব আনন্দ লাগল।

আমি ফুল হাতে নিয়া করিডোর দিয়া হাঁটতেছি, তখন মাইকেলের সাথে দেখা। ও বলল, “গ্লেন তো কাইলকা চইলা যাইতেছে।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায় যাইতেছে? বাসায়?”

মাইকেল বলল, “হয়তো কোনো কমিউনিটি হাউজে।”

“ও আচ্ছা,” বইলা আমি আবার হাঁটতে শুরু করলাম। আমার একটু ফ্রেশ এয়ারের দরকার। কোর্টইয়ার্ডের দরজা খুলতেই কবুতরগুলা আবারও একসাথে উইড়া গেল। বাতাসের ঝাপটায় আমার চুল উড়তে  লাগল। আমার ঝাপসা দৃষ্টি পরিষ্কার হইয়া গেল। আবার মেঘ কাইটা সূর্যের আলো পড়ল আমার চোখেমুখে।

এত সুন্দর সুরেলা গলা কার? আর কী সুন্দর গিটার বাজাইতেছে! মধ্যের দুইটা বেঞ্চ জুইড়া ওরা বসা। ড্যানিয়েল, মিক, ডমিনিক এক বেঞ্চে বসা, আর বেঞ্চের পাশে, ফ্লোরে গ্লেন। মাইকেল এবং আরও কয়েকজন উল্টাদিকের বেঞ্চটায় বসা, তাই আমারে এখনো ঢুকতে দেখে নাই ওরা।  মাইকেলই বা কখন আসল এইখানে কে জানে! গ্লেন আমার দিকে তাকাইয়া একগাল হাসি নিয়া গাইতেছে। ডমিনিকও গাইতেছে আমার দিকে তাকাইয়া। এত আবেগ ওর গলায়, আর এত সুন্দর গিটার বাজায় মাইকেল! আমি এক ঝলক হাইসা একটা বেঞ্চে বসলাম। ডমিনিক গাইয়া যাইতেছে:

“When I find myself in times of trouble

Mother Mary comes to me

Speaking words of wisdom, let it be

And in my hour of darkness

She is standing right in front of me

Speaking words of wisdom, let it be

Let it be, let it be

Let it be, let it be

Whisper words of wisdom, let it be…”

(কিস্তি ৫)