Pages Menu
TwitterRssFacebook
Categories Menu

Posted by on Jul 31, 2018 in উপন্যাস, হসপিটাল | Comments

হসপিটাল ৫

হসপিটাল ৫

আগের  কিস্তি। প্রথম কিস্তি

২২.
মাথায় চিনচিনে ব্যথা। কয়টা বাজে বা আমি কতক্ষণ এইভাবে বইসা আছি জানি না। সারা গা কেমন অবশ হইয়া আছে। বড় জানালাটা ভেদ কইরা বাইরের অন্ধকারে স্থির আমার দৃষ্টি। যতক্ষণ দিনের আলো ছিল, আমার চোখের সামনে তিনটা গাছ ছিল। তাদের গোড়ার কাছে ঝরা পাতারা জমতেছিল একটা দুইটা কইরা। পরম ভালবাসায় আঁকড়াইয়া ধরা ডালগুলা থিকা খইসা খইসা স্তূপ হইতেছিল তারা ঝরাপাতাদের দলে। কোনো এতিমখানায় বাচ্চারা একত্র হইতেছিল যেন। তারপরে দমকা হাওয়ায় ছিন্নভিন্ন হইয়া গেল পাতারা। যতটুকু আশ্রয় তাদের ছিল একে অপরের কাছে, সেইটুকুও হারাইল। এখন তাদের শুধু নিজেরাই সম্বল, আর সম্বল বাতাস ও তার মর্জি।

যতক্ষণ দিনের আলো ছিল, আমার চোখের সামনে তিনটা গাছ ছিল।

কোথায় নিবে আমারে এই বাতাস, এই সিস্টেম? গ্লেন নাকি কোন কমিউনিটি হাউজে গেছে। আর আমি কমিউনিটি হাউজে এক রাতও থাকতে পারলাম না। আচ্ছা, কমিউনিটি হাউজ কি হসপিটাল থিকা ভাল? হয়ত। কারণ ঐখানে ‘নিজ’ বইলা অন্তত কিছু থাকে। ‘স্ব’ বইলা কিছু থাকে, ‘ইচ্ছা’ বইলা কিছু থাকে। ইচ্ছা হইল তো কোথায় যাইতেছি, কয়টা নাগাদ ফিরব ইত্যাদি ডিটেইলস বোর্ডে লিখা বাইর হইয়া যাওয়া যায় নিজের পছন্দ মতন কোনো জায়গায়। নিজের পছন্দমত দোকানে পছন্দমত খাবার খাওয়া যায়। ইন্টারনেটে, কম্পিউটারে, বইয়ের পাতায়, নিজের কাজে, বাড়তে দেয়া যায় ‘নিজ’রে। সেইখানেও রশির বাঁধন আছে নিশ্চয়ই, ওষুধ খাওয়া সেইখানেও বাধ্যতামূলক, কিন্তু অনেক মোলায়েম কি সেই বাধ্যবাধকতা? আর সেই কারণেই আরও ভয়াবহও হইতে পারে কি সেইটা—ধীরে গরম হওয়া পানিতে ব্যাঙের নিঃশব্দ মৃত্যুর মতন?

অন্যদিকে, এইখানে, এই হসপিটালে, ‘নিজ’ বইলা কিছু বাড়তে পারে না। এইখানে কম্পিউটার আনা মানা। ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায় না, নিজের পছন্দ মতন বই বা আর্টিকেল পাওয়া যায় না। অন্যের মধ্যেও ঠিক নিজেরে খুইজা পাওয়া যায় না। কারণ কে, কখন, কোথায়, কতক্ষণ থাকবে সেইটারই ঠিক নাই! কথায় কথায় ওষুধ দিয়া দমাইয়াও রাখা হয় ‘নিজ’রে!

আবার কান্না পাইতেছে। সারাটা দিন এইভাবেই গেছে—কান্নাকাটি কইরা, স্থির বইসা থাইকা, আবার কান্নাকাটি কইরা…। কিন্তু এই জায়গাটায় আইসা বসার পরে একটুও নড়ি নাই আমি। দুপুর গড়াইয়া বিকাল হইছে, বিকাল গড়াইয়া সন্ধ্যা, তারপরে রাত্রি…। সারাটা সময় আমার দৃষ্টি জানালার বাইরে। বাইরে ঝড়-তুফান হইছে সারাদিন। মনের অবস্থার সাথে প্রকৃতির অবস্থা মিলা গিয়া এক ধরনের সান্ত্বনার সৃষ্টি হইছে। সেই সান্ত্বনার কাছে অঝোরে কানছি সারাদিন। মনে মনে বলছি “ওয়াসিয়া কুরসিইউ হুস্সামাওয়াতি ওয়াল আর্দ।” অর্থাৎ, তাঁর সিংহাসন স্বর্গ ও পৃথিবীর উপরে সম্প্রসারিত।

আমারে ইঞ্জেকশন নিতে বাধ্য করার পর রিসেপশনে দৌড়াইয়া গেছিলাম। চিৎকার চেঁচামেচি দূরে থাক, বেশি কথাও বলতে পারি না আমি। তাই শুধু অঝোরে কানছি আর বলছি কতটা অন্যায় তারা করছে আমার উপরে, কতটা নিষ্ঠুর তারা! রিসেপশনে বসা ওয়েন্ডি আমারে ধমক দিয়া বলছে, “সানিয়া, ঘরে যাও! এক্ষুনি ঘরে যাও!”

আমি: (কানতে কানতে) না, আমি যাব না! আগে বলো কেন তোমরা আমারে অত্যাচার করছ, আমি তো তোমাদের কোনো ক্ষতি করি নাই!

বডিবিল্ডার রাসেল: (ওয়েন্ডির গলায় গলা মিলাইয়া) সানিয়া, তুমি অসুস্থ, তুমি বুঝতেছ না।

আমি রাসেলের কথার জবাব দিতে গিয়া কথা বলতে পারলাম না। হাউমাউ কইরা কাইন্দা ফেললাম। রাগে, অপমানে, মুখ অন্যদিকে ফিরাইলাম। একটু আগে এই রাসেলই আমার পাছায় ইঞ্জেকশন দেয়ার সময় আমার ঘর থিকা কিছুতেই বাইর হবে না। তারপরে যখন বললাম যে তার সামনে আমি কাপড় খুলব না কিছুতেই, যা হওয়ার হোক, তখন জেইন ওরে ঘর থিকা বাইর করছে। তাই সে অসুস্থ না, কিন্তু আমি অসুস্থ শুইনা আমার গা’টা জ্বইলা উঠল। আমি রিসেপশনের দেয়াল ঘেইষা, মাটিতে পা ছড়াইয়া বইসা চিৎকার কইরা কানতে লাগলাম। জেড ওর ঘরের থিকা বাইর হইয়া দৌড়াইয়া আমার কাছে আইসা বসল।

আমি রিসেপশনের দেয়াল ঘেইষা, মাটিতে পা ছড়াইয়া বইসা চিৎকার কইরা কানতে লাগলাম।

জেড: কী হইছে সানিয়া, তুমি কানতেছ কেন?

আমি: (কানতে কানতে) আমার মনে হইতেছে যানি আমারে রেইপ করা হইছে। ইঞ্জেকশনের সুঁই যানি সুঁই না, অন্য কিছু!

নার্স ব্রেন্ডা: (ঐদিক দিয়া যাইতে যাইতে) ডোন্ট বি সো ডেলিউডেড! তোমারে সামান্য একটা ইঞ্জেকশন দেয়া হইছে, আর কিছু না!

আমি: কিন্তু আমারে তোমরা কয়েকজন মিলা ইঞ্জেকশন নিতে বাধ্য করছ। বলছ, আমারে আক্ষরিক অর্থে জোর কইরা ধইরা ইঞ্জেকশন দেয়া হবে! এইটা আমার শরীর এবং আমি তোমাদের কোনো ক্ষতি করি নাই কখনো। তোমরা জুলুম করছ আমার উপরে! (শেষের কথাটা বলতে গিয়া চিৎকার বাইর হইয়া গেল)।

ব্রেন্ডা: শোনো, ইউ নিড টু কাম ডাউন। তোমারে কি কিছু মুড স্ট্যাবিলাইজারস দিব শান্ত হওয়ার জন্য?

আবার কান্নার দমক উঠল। হতবাক জেড উইঠা কোর্ট ইয়ার্ডের দিকে গেল। আমি ঘরে আইসা বিছানায় বসলাম। সেই যে বসছি, এতক্ষণে মনে হইল যে অনেকক্ষণ ধইরা বইসা আছি।

চারদিক অস্বাভাবিক নীরব। রাত হইছে, কিন্তু অত রাত কি? সারাদিন কিছু না খাওয়াতে ক্ষিদা লাইগা আবার মিলাইয়াও গেছে। এখন কেমন একটা অসারতা জড়াইয়া আছে সারা শরীর।

বাথরুম থিকা বাইর হইয়াই প্রথমে রিসেপশনের দিকে গেলাম সময় দেখতে। রিসেপশনে দুইটা ঘড়ি। একটা দেয়ালে ঝুলানো দেয়াল ঘড়ি, আরেকটা ফ্রন্ট ডেস্কের উপরে রাখা টেবিল ঘড়ি। টেবিল ঘড়িটায় দিন এবং মাসও দেখায়। দুইটা ঘড়িতেই ঠিক দশটা বাজে। তাই ধইরা নিলাম সময় ঠিক আছে। কিন্তু দিন আর মাসও কি ঠিক আছে? জানি না। এইখানে দিন-মাসের কেউ হিসাব রাখে না। সময়ের হিসাবও রাখা হয় ব্রেকফাস্ট -, লাঞ্চ -, আর ডিনার – টাইম দিয়া। ভাবতে ভাবতে প্রচণ্ড পানি পিপাসা টের পাইলাম।

ডাইনিং রুমে যাইতেই সবাই হই হই কইরা স্বাগতম জানাইল।

জেড: সানিয়া, আমরা পিটজা খাইতেছি। তুমি আসো আমাদের সাথে খাও।

আমি: থ্যাংক ইউ জেড। কিন্তু আমি তো হ্যাম খাই না, আমি দেখি ফ্রিজ এ স্যান্ডুইচ আছে কি না।

এত রাতে এত মানুষ পিটজা খাইতেছে। তার মানে ওরাও ডিনার করে নাই? প্রোটেস্ট? আমার জন্যে?

আমি ঢক ঢক কইরা কয়েক গ্লাস পানি খাইলাম। তারপরে ফ্রিজ থিকা একটা সালাদ স্যান্ডুইচ নিয়া টেবিলের একপ্রান্তে বইসা খাইতে লাগলাম। আমার মতন আরও অনেকেই বিভিন্ন রকম স্যান্ডুইচ নিয়া খাইতেছে। কিচেনে আলাদা আলাদা বাস্কেটে চা, লং লাইফ মিল্ক, চিনি, ফ্রুট, কুকিজ এবং ক্র্যাকার্স রাখা। স্যান্ডুইচ শেষ কইরা আমি সেইখান থিকা কয়েকটা সিঙ্গেল সার্ভ ক্র্যাকার্স নিয়া আমার জায়গায় ফিরা আইসা মুখে গুঁইজা গুঁইজা দিতে লাগলাম। জোরে জোরে সেগুলা চাবানো শেষে সামনে তাকাইয়া দেখি, ফ্র্যাঙ্ক তার সানগ্লাসেস মাথায় উঠাইয়া, তার অসম্ভব সুন্দর নীল চোখে অসম্ভব মায়া ভইরা আমারে দেখতেছে। ওর চোখে চোখ পড়তেই আমি মুখ ভর্তি ক্র্যাকারস নিয়াই কাইন্দা ফেললাম। আর দেখলাম, ষাট বছরের টাফ-গাই ফ্র্যাঙ্কের চোখও ছল ছল করতেছে!

আমি উইঠা দাঁড়াইলাম। একটু ফ্রেশ এয়ার হইলে ভাল হইত। কিন্তু সেইটার উপায় নাই। এইখানে কোনো জানালা খোলার ব্যবস্থা নাই। কোর্ট ইয়ার্ডগুলারও দরজা বন্ধ। আমি পুল-রুমের পাশে প্রেয়ার রুমে ঢুকলাম। সেইখানে বিভিন্ন ধর্মের বক্তব্য দিয়া দেয়াল সাজানো হইছে। সেগুলাতে চোখ বুলাইয়া আমি কোণার একটা চেয়ারে বসলাম। কিছুই না ভাবার চেষ্টা করলাম কিছুক্ষণ। পারলাম না। সূরা পইড়া কানলাম কিছুক্ষণ। মন কিছুটা যেন শান্ত হইল তাতে।

ঘরে ফিরা আইসা আমি সুন্দর কোনো ভাবনা দিয়া দিনটা শেষ করতে চাইলাম। ভাল কিছুই কি ঘটে নাই আইজকা? ঘটছে তো। কিছুক্ষণ আগেই ঘটছে ডাইনিং হলে। এছাড়াও, দিনের বেলায়, আমি যখন বিছানাটার উপরে বইসা ছিলাম, বাইরের তিনটা গাছের পাতাদের দুলতে থাকা, ঝরতে থাকা, জমতে থাকা, উড়তে থাকা, যেন কিছু বলতেছিল আমারে। ডায়েরিতে সেই সম্পর্কে লিখতে বসলাম—

হসপিটালে আমার জানলার কাছে
কিছু গাছপালা।
ওদেরকে দেখি আর কিছু শান্তি পাই
যানি আমার আত্মার কাছের আত্মীয় ওরা,
রক্তের সম্পর্কের নাইবা হইল।
বইসা বইসা যেই তিনটা গাছ দেখতেছি,
তাদের একটা চির সবুজ, একটা অটামের রঙে রঙিন,
আরেকটা ন্যাংটা দাঁড়াইয়া আছে—
যানি একটা ন্যাংটা বাচ্চা—কাপড় নাই তো চিন্তাও নাই।
এদেরকে দেখি আর আম্মার বাগানের কথা মনে পড়ে—
সবুজ, রঙীন, সজীব…
তার উপরে যখন বৃষ্টি পড়ে,
আমার জানলা দিয়া দেখা যায়—
মিষ্টিকুমড়ার পাতাগুলা কী সুন্দর ভিজা ওঠে বৃষ্টিতে!

২৩.
গভীর ঘুম পুরা কইরা তারপরেই জাগলাম। একই সাথে খুব আরামও লাগতেছে, আবার মাথাটা একটু ফাঁকাও লাগতেছে। ফাঁকা লাগার কারণ কি মিলাইয়া যাওয়া ক্ষিদা? বুঝতেছি না। অনেক বেলা হইছে নিশ্চয়ই! আবার সেই অস্বাভাবিক নীরবতা। এখন কি লাঞ্চ টাইম? নাকি লাঞ্চের সময় পার হইয়া গেছে? যেইটাই হোক, খাইতে ইচ্ছা করতেছে না। আমি বরং গিয়া দেখি সবাই কোথায়।

ঘর থিকা করিডোরে পা ফেলতেই ঝন ঝন শব্দ তুইলা খাবারের ট্রলিগুলা আসতে লাগলো। আমি একপাশে সইরা দাঁড়াইলাম। ট্রলিগুলা আমারে পাশ কাটাইয়া ডাইনিং হলের দিকে যাইতে থাকল। আমি রিসেপশনের কাছে গেলাম সময় দেখতে। দেয়াল ঘড়িতে দেড়টা বাজে, আর টেবিল ঘড়িতে সাড়ে বারোটা। কোনটা ঠিক জিজ্ঞেস করার জন্যে অনেকক্ষণ দাঁড়াইয়া রইলাম। কিন্তু সবাই এমন ব্যস্ত যে কেউ আমার দিকে তাকাইলও না, কথা বলা তো দূরে থাক! আমি ডাইনিং হলে ঢুকলাম। এইখানেও একটা দেয়াল ঘড়ি আছে। এই ঘড়িতে একটা পাঁচ বাজে।

আমার মন বলতেছে রিসেপশনের টেবিল ঘড়িটা ভুল সময় দেখাইতেছে। এখন কমপক্ষে একটা বাইজা গেছে। দেড়টাও বাইজা থাকতে পারে। আমি এইটা আন্দাজে বলতেছি, কিন্তু আমার ধারণা যারা নিয়মিত নামাজ পড়ে, বা প্রকৃতির সাথে যারা বেশি কানেক্টেড ফিল করে, ঘড়ির সময়ের ব্যাপারেও তাদের অনেক ক্ষেত্রেই ভাল আন্দাজ থাকে।

যাই হোক, লাঞ্চ সাধারণত সাড়ে বারোটার মধ্যেই দিয়া দেয়। এখন যদি একটা বা দেড়টা বাইজা থাকে, তাইলে বেশ দেরি কইরাই লাঞ্চ দিছে। এই দেরি কি ইচ্ছাকৃত? কেন এই দেরি? সবাই যাতে খায়, সব ঠিকঠাক আছে, সেইটা দেখানোর জন্যে এই দেরি? আমি খাব না তো! আমার ক্ষিদাও নাই আর এইসব ঢং ভালও লাগতেছে না। আমি থাইমা থাকা ট্রলিগুলারে পাশ কাটাইয়া কোর্ট ইয়ার্ডের দরজা খুললাম।

দরজার বাইরে পা ফেলতে একটু সঙ্কোচ বোধ হইতেছে। কবুতরগুলা দরজার একদম কাছ ঘেইষা দাঁড়াইয়া বা বইসা আছে। আমি জীবজন্তু খুব ভালবাসলেও তাদের কাছে যাইতে ভয় পাই, যদিও জানি যে তারা আমারে কিছু করবে না। অনেক সাহস সঞ্চয় কইরা দুইটা কবুতরের মাঝের জায়গাটায় একটা পা রাখতেই ওরা একটু সইরা গিয়া আমারে জায়গা কইরা দিল। সেই পথ দিয়া হাঁইটা আমি একটা বেঞ্চে গিয়া বসলাম।

কোর্ট ইয়ার্ডের বেঞ্চ একটাও খালি নাই। মেঝেও কবুতরে ভরা। ক্রিস ওর সি.ডি. প্লেয়ার স্পিকার মোড এ দিয়া গান শুনতেছে এবং সবাইরে শোনাইতেছে। মাঝে মাঝে গিটার বাজাইতেছে, বেসুরা একটু একটু গান গাইতেছে, কথা বলতেছে। কথা বলার এক পর্যায়ে ক্রিস কানতে শুরু করল। আমার ওরে খুব একা মনে হইল। আমি ওর কাছে গেলাম।

আমি: আমি কি তোমারে একটা হাগ দিতে পারি, ক্রিস?

ক্রিস: ঠিক আছে, দাও। কিন্তু চেস্ট এরিয়া দূরে রাখবা।

(আমি চেস্ট এরিয়া দূরে রাইখা ক্রিসরে হাগ দিলাম।)

জেড: আর আমারে? আমি যে তোমার জন্যে এত কষ্ট পাইলাম?

আমি হাসিমুখে জেডের পাশে বইসা ওরেও একটা হাগ দিলাম। ওর পায়ের কাছে যেই কবুতরগুলা ঘুরতেছে, তাদের মধ্যে ‘ইচি’ও আছে। ঐ কবুতরটারে ‘ইচি’ নাম দিছে মনে হয় ড্যানিয়েল। কবুতরটা অন্য কবুতরগুলার চেয়ে ছোট আকারের, এবং ঐটার একটা পাখা একটু ভাঙা। গলায় আর ঘাড়ে লোমও নাই কবুতরটার, এবং সে মনে হয় মানুষের সঙ্গ অনেক বেশি পছন্দ করে। এইখানের অনেক কবুতরই অবশ্য মানুষের কাছঘেঁষা! বিশেষ কইরা স্মোকারদের আশেপাশে সিগারেটের গন্ধ তাদেরকে মনে হয় টানে। জেড ইচিরে কোলে তুইলা নিল। সেইটা দেইখা আমি একটু সইরা বসাতে ও ইচিরে নামাইয়া দিল।

জেড: তুমি কবুতর ভয় পাও?

আমি: আমি কবুতর, কুকুর, বিড়াল, মথ, তেলাপোকা ও যা কিছুই নড়াচড়া করে, সব কিছুরেই ভয় পাই।

—কেন?

—জানি না। হয়ত তারা আনপ্রেডিক্টেবল, সেই কারণে।

—সেইভাবে দেখলে তো নড়াচড়া করা মানুষও কিছুটা আনপ্রেডিক্টেবল। কিন্তু তুমি তো অনায়াসে মানুষের কাছে যাও, তাদেরকে সান্ত্বনা দাও…।

—হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু ধরো, আমি তো কোনো সিরিয়াল কিলারের কাছে যাব না। কারণ সে আমারে মাইরাও ফেলতে পারে!

—কিন্তু তুমি তো এইসব পশুপাখিদেরকে হার্মলেস মনে কইরাও তাদের কাছে যাইতে ভয় পাও। তাইলে এইটা শুধুই আনপ্রেডিক্টেবিলিটি না বোধহয়, অন্য কিছুও।

—অন্য কী?

—তোমার মধ্যেই কিছু। তুমি ভাইবা দেইখো।

—ছোটবেলায় আমারে যেইভাবে কন্ডিশন করা হইছে সমাজে ও পরিবারে, সেইটা?

—আমি জানি না। তবে আমি তোমারে যতদূর দেখছি, তুমি ঠিক অ্যাসার্টিভ না। তুমি অ্যাগ্রিয়েবল।

কবুতরগুলার মধ্যে মধ্যে পা রাখতেই, একসাথে সবগুলা কবুতর উইড়া গেল।

—মানে?

—মানে, ধরো এই যে ক্রিস কানলো, আর সবাই বইসা আছে, কিন্তু তুমি ওরে সান্ত্বনা দেয়ার প্রয়োজন বোধ করলা। কারণ ওর কান্না তোমারে সরাসরি অ্যাফেক্ট করছে। তোমারে রেস্পন্ড করাইছে। অথবা ধরো ডমিনিক পয়সা চাইতেই তুমি দিয়া দিলা। সেইটা কেন দিলা?

—এম্প্যাথি?

—না, ঐ অর্থে এম্প্যাথি না এইটা মনে হয়। এইটা ঠিক কী হইছে সেইটা বিবেচনা করার আগেই ঘটে মনে হয়।

—তাইলে এই যে আর কেউ গেল না ক্রিসরে সান্ত্বনা দিতে, কিন্তু আমি গেলাম, অথবা আর কেউ ডমিনিকরে পয়সা দিল না, কিন্তু আমি দিলাম, সেইটা কি এক ধরনের অ্যাসার্টিভনেস না?

—তুমি তো “আমি এইটা চাই” বইলা নিজেরে অ্যাসার্ট করো নাই। অন্য কেউ ঐ অবস্থায় কী চাইতে পারে, সেইটা মনে রাইখা রিঅ্যাক্ট করছ।

—হইতে পারে।

—পশুপাখির ব্যাপারেও তাই। তুমি তারা কী চায় তোমার কাছে, এবং তুমি তা দিতে পারবা কি না বা চাও কি না, সেইটা ভাইবা দূরে দূরে থাকো।

—ঠিক।

—তুমিও কিছু চাইয়া দেখো তাদের কাছে। তারাও তো তোমার চাওয়াতে রিঅ্যাক্ট করতে চাইতে পারে!

আমি হাসিমুখে উইঠা দাঁড়াইলাম। কবুতরগুলার মধ্যে মধ্যে পা রাখতেই, একসাথে সবগুলা কবুতর উইড়া গেল। আমার একটুও ভয় লাগল না। খুব আনন্দ লাগল।

(কিস্তি ৬)

অলঙ্করণ. সানিয়া রুশদী