Pages Menu
TwitterRssFacebook
Categories Menu

Posted by on Aug 22, 2018 in উপন্যাস, হসপিটাল | Comments

হসপিটাল ৬

হসপিটাল ৬

আগের  কিস্তি। প্রথম কিস্তি

২৪.
কোর্ট ইয়ার্ডের দরজা খুইলা ভিতরে ঢুকলাম। অনেকেই লাঞ্চ করতেছে। তাদের কয়েকজনরে চিনি না, আর কয়েকজনরে দেখছি শেয়ার্ড ঘরগুলার ভিতরে চুপচাপ বইসা থাকতে। কখনও ঘরের বাইরে দেখি নাই তাদেরকে। আইজকা যে তারা ডাইনিং হলে আইসা লাঞ্চ করতেছে, সেইটা কেন বা সেইটার কী মানে হইতে পারে বুঝতে পারলাম না।

আমি লাঞ্চ না করার সিদ্ধান্তে অটুট রইলাম। কোর্ট ইয়ার্ড থিকা অনেকেই ভিতরে আসতে শুরু করছে। তাদের কেউ কেউ লাঞ্চ নিয়া বসতেছে, আর কেউ কেউ নিজেদের ঘরের দিকে চইলা যাইতেছে। কেউ কেউ কিচেনে ঢুইকা একটা ফ্রুট বা এক কাপ চা অথবা বিস্কিট খাইতেছে। আমি লাঞ্চ চলাকালীন সময়টায় কিচেনে জেড, ক্রিস ও অন্যান্যদের সাথে এক কাপ চা হাতে নিয়া দাঁড়াইলাম। ছোট্ট কিচেনটা ভইরা গেছে মানুষে। ভিড় ঠেইলা একটা সাতাইশ-আটাইশ বছরের ছেলে আমার কাছে আইসা বলল, “হাই, আমি গ্লেন।”

জেড: ও তাইলে তুমিই গ্লেন টু? ক্রিস আমারে তোমার কথা বলছে। তুমি কালকে বিকালেই আসছ?

গ্লেন: হ্যাঁ, আমি কালকে বিকালে আসছি। আমি তোমাদেরকে দূর থিকা দেখছি। কাছে যাইতে চাইয়াও যাই নাই, কারণ, পরিস্থিতি সেই রকম ছিল না মনে হইল। কিন্তু আমি গ্লেন টু কেন? গ্লেন ওয়ান কোথায়?

ক্রিস: গ্লেন ওয়ান এইখানে নাই আর। ছিল। এখন কোথায় ঠিক জানি না আমরা। হয়ত কোনো কমিউনিটি হাউজে।

গ্লেন: ও, আচ্ছা আচ্ছা।

আমি: গ্লেন ওয়ানের কারণে হসপিটালে থাকার শুরুটা আমার জন্যে অনেক সুন্দর ছিল। আমরা তোমারে সেই রকম পরিবেশ দিতে পারলাম না। আই অ্যাম সরি!

গ্লেন: ও ডোন্ট বি সরি। আমি যেইখান থিকা আসছি, সেইখানের চেয়ে এই হসপিটালের পরিবেশ অনেক ভাল।

আমি: তুমি কোথার থিকা আসছ?

গ্লেন: ড্যান্ডিনং হসপিটাল থিকা।

জেড: আচ্ছা। তোমারে দেইখা মনে হইতেছে তোমার উপরে অনেক টর্চার হইছে।

গ্লেন: আর বইল না!

আমি: ঠিক আছে, আমরা আর না বলি। কিন্তু তুমি লাঞ্চ করবা না? লাঞ্চের সময় কিন্তু চইলা যাইতেছে!

গ্লেন: না, আমার অত ক্ষিদা লাগে না। আমি এক কাপ চা খাব তোমাদের সাথে।

আমরা সবাই হাসলাম। লাঞ্চের ট্রলিগুলা ঝন ঝন শব্দ তুইলা চইলা গেলো কিচেনের দরজার সামনে দিয়া।

চা শেষ কইরা আমরাও টিভি লাউঞ্জের দিকে অথবা নিজ নিজ ঘরের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। রিসেপশনের কাছে থাইমা সময় দেখলাম আমি। দেয়াল ঘড়ি আর টেবিল ঘড়ির সময় একই এখন।  দুইটা ঘড়িতেই তিনটার মত বাজে। কিন্তু টেবিল ঘড়িতে বারের জায়গায় বৃহস্পতিবার দেখাইতেছে, অথচ আমি জানি আইজকা শুক্রবার। সিস্টার আমীরা পরশুদিন বলতেছিল যে শুক্রবারে ওর বাসায় গেস্ট আসবে, তাই ঐদিন ও ডিউটিতে থাকবে না।

নামাজ পড়ার জন্যে ঘরে ঢুকতে গিয়া দেখি ঘরের বাইরে “Cleaning in Progress” লেখা হলুদ সাইন বোর্ড মেইলা দেয়া হইছে। তার মানে আমার ঘর পরিষ্কার করা হইতেছে। বাধ্য হইয়া আমি প্রেয়ার রুমের দিকে গেলাম।

নামাজ পড়ার জন্যে ঘরে ঢুকতে গিয়া দেখি ঘরের বাইরে “Cleaning in Progress” লেখা হলুদ সাইন বোর্ড মেইলা দেয়া হইছে।

কিন্তু প্রেয়ার রুম, পুল রুম, দুইটাই বন্ধ। ডাইনিং হলে ঢুইকা দেখি, সাথের কিচেনের খোলা দরজার সামনেও একই সাইন বোর্ড, আর ভিতরে একজন ক্লিনার মন দিয়া সব পরিষ্কার করতেছে। কোর্ট ইয়ার্ডের দরজাও বন্ধ পাইলাম। কাচের দরজার বাইরে ভারি, ইলেকট্রিক হোজের ফোর্সফুল পানি দিয়া কোর্ট ইয়ার্ড পরিষ্কার করা হইতেছে আর ভিতরে “Cleaning in Progress” লেখা হলুদ সাইন বোর্ড।

অগত্যা আমি করিডোরেই গোল গোল—মানে চারকোণা চারকোণা—ঘুরতে লাগলাম। ঘুরতে ঘুরতে দেখলাম যে ভিতরে বেশ কয়েকজন ক্লিনার কাজ করতেছে বিভিন্ন জায়গায়। কিচেন যে পরিষ্কার করতেছিল, সে এখন দ্বিতীয় টিভি রুমটা পরিষ্কার করতেছে। সেই সুযোগে আমি কিচেনে ঢুকলাম।

একটা কুকি নিলাম। তারপরে আবার এক চক্কর হাঁটলাম। আবার আরেকটা বিস্কিট নিলাম। এইভাবে বেশ কয়েক চক্কর হাঁটলাম আর কুকিজ বা ক্র্যাকার্স নিয়া নিয়া খাইলাম। একটা চক্করের পরে কিচেনে বিস্কিট নিতে গিয়া দেখি, বিস্কিটের উপরে ফ্রুট রাখা। আশেপাশে তাকাইতেই দেখি অ্যারেন কিচেন বেঞ্চটপে হেলান দিয়া মিটি মিটি হাসতেছে। আমার খুব হাসি পাইল। অ্যারেনরে জিজ্ঞেস করলাম ও করছে কি না এই কাজ। অ্যারেন হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। তারপরে আমি একটা আপেল নিয়া খাইতে খাইতে আরেক রাউন্ড হাঁটার জন্যে পা বাড়াইলাম।

করিডোরের এক প্রান্ত পর্যন্ত যাইতে একটা ক্লিনিং ট্রলি পথে পড়ল। ক্লিনার দেয়ালে কী যেন স্প্রে কইরা দেয়াল মুছতেছে। সেই স্প্রে’তে একটা লেবু জাতীয় সুগন্ধ থাকলেও সেইটার টক্সিক ফিউম আমার নাক দিয়া ঢুইকা নিঃশ্বাস বন্ধ কইরা, নাক অবশ কইরা, গলায় জ্বালাপোড়া করাইতে লাগল।

আমি: এক্সকিউজ মি, আমি কি তোমার নাম জানতে পারি?

: আমার নাম মেই।

: তোমার ট্রলিটা একটু সরাবা মেই? আমি এইদিক দিয়া যাব।

: হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই। ট্রলিটা একটু ধাক্কা দাও, তাইলেই একপাশে সইরা যাবে।

(আমি ট্রলি একপাশে ঠেইলা দিয়া আবার হাঁটতে লাগলাম। মেই আরও কয়েকবার দেয়ালে স্প্রে কইরা দেয়াল মুছতে ব্যস্ত হইয়া পড়ল।)

২৫.
করিডোরের আরেক প্রান্তেও একই পদ্ধতিতে আরেক এশিয়ান ক্লিনার দেয়াল পরিষ্কার করতেছে দেইখা বললাম, “এই যে এই স্প্রে’টা, এইটার…।” আমার কথা শেষ না হইতেই ক্লিনার বলল, “স্প্রে?” বইলাই সে স্প্রে’র নজেল আমার দিকে দিয়া, আমার পাশের স্পেইসে কয়েকবার স্প্রে করল। আমি তাড়াতাড়ি দূরে সইরা গেলাম। বুঝতে পারলাম না সে কী মনে কইরা এই কাজ করল। সে কি ভাবল আমি স্প্রে করতে বলছি? নাকি এইটা শত্রুভাবাপন্নতা?

আমি বিষণ্ন মনে টিভি লাউঞ্জে ঢুইকা থ্রি-সিটার সোফাটার এক প্রান্তে বসলাম। হঠাৎ কেউ খুব নরম গলায় বলল, “হাই।”

: ও হাই গ্লেন টু, তুমি কি এইখানেই ছিলা?

: আমি এইখানেই ছিলাম।

: আমি তোমারে দেখি নাই যে?

: তুমি আমারে খোঁজো নাই।

টিভি লাউঞ্জে গ্লেন টু একা বইসা ছিল এতক্ষণ? তাও টিভি না চালাইয়া। ওর কি খুব মন খারাপ লাগতেছে? আমি চট কইরা সুন্দর কিছু ভাবার চেষ্টা করলাম—বন্ধুত্ব নিয়া কোনো গান বা কবিতা, যেইটা শুইনা ওর মনটা একটু ভাল হবে। আমার কিছুই মনে আসল না। শুধু একটা গানের কয়েকটা লাইন মনে পড়ায় আমি কোন প্রস্তুতি ছাড়া গ্লেন টু’র একটা হাত পাঞ্জা খেলার মত কইরা ধইরা কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, “এই… বন্ধুত্ব… কখনও… হুম…।”

গ্লেন টু ওর আরেকটা হাত আমার কাঁধে রাইখা বলল, “এইবার বলো।” আমি এইবার স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বললাম—

“এই বন্ধুত্ব কখনও হারাব না।
হারাবো প্রাণ তবু,
তোমার সঙ্গ ছাড়ব না।”

গ্লেন টু মেঝেতে হাঁটু গাইড়া বইসা, আমাদের পাঞ্জা ধরা হাতগুলার কাছে ওর মুখ আইনা, নিজের হাতে চুমু খাইল। বলল, “এত সুন্দর কথা আমারে কখনও কেউ বলে নাই।” আমিও ওর হাতে চুমু দিলাম। গ্লেন টু উইঠা দাঁড়াইয়া নিজের হাত ছাড়াইয়া নিয়া বলল, “আমি কেন তোমার হাতে চুমু না খাইয়া নিজের হাতে চুমু খাইছি, জানো?”

: কেন?

: যাতে তোমার মধ্যে এইটার রেশ না লাইগা থাকে।

: সরি। আমি এত কিছু ভাইবা আসলে…।

: ঠিক আছে। এইবার চলো।

: কোথায়?

: কয়েক রাউন্ড হাঁটতে।

: আমি তো হাঁটতেই ছিলাম। না পাইরা এইখানে আইসা বসলাম।

: আচ্ছা, তুমি তাইলে বসো, আমি হাঁটি।

: না না, আমিও আসতেছি।

গ্লেন টু আর আমি হাঁটতে শুরু করলাম। এখনও ক্লিনিং-এর কাজ চলতেছে। তার মধ্যেই আমরা দুই চক্কর হাঁটলাম। তৃতীয় চক্করের সময় ক্লিনার ইং আস্তে কইরা পুল রুমের দরজা খুইলা দিয়া ফিস ফিস কইরা বলল, “তোমরা এই রুমেও যাইতে পারো। আর কোনো রুমে যাইতে হইলে আমারে বইল। আমার কাছে চাবি আছে, খুইলা দিব।”

আমি বললাম, “থ্যাংক ইউ, ইং! তুমি কি ছোট কোর্ট ইয়ার্ডটার দরজা খুইলা দিতে পারবা আমাদেরকে?”

ইং: (মাথা নাড়াইয়া) না, ঐটার চাবি তো আমার কাছে নাই।

: কার কাছে আছে?

: রিসেপশনে জিজ্ঞেস কইরা দেখতে পারো।

: তোমার কাছে সব ঘরের চাবি আছে, ছোট কোর্ট ইয়ার্ডের চাবি নাই কেন?

: ঐটা আমারে দেয়া হয় নাই। মনে হয় ঐখানে তো আর্টিফিশিয়াল ঘাস, পাখিরাও বসে না, তাই ক্লিন করার কিছু নাই, সেই কারণে।

ঐ কোর্ট ইয়ার্ডের বাউন্ডারির এক অংশ ঢেউ খেলানো টিন দিয়া তৈরি। সেই টিনের অংশের নিচে, মাটিতে একটা খাঁদ আছে। সেই খাঁদে বৃষ্টির পানি জমলে চলতে থাকা গাড়ির প্রতিবিম্ব দেখা যায়। তার মানে, বেড়ার অন্য পাশেই বড় রাস্তা। কেউ চেষ্টা করলে পালাইতে পারবে। হয়ত সেই জন্যেই আনসুপারভাইজ্ড প্রবেশ নিষেধ ঐ কোর্ট ইয়ার্ডে।

আমি ইং’রে সেইটা বললাম না। শুধু হাঁইটা গিয়া ডাইনিং হলের জানালাগুলার কাছে বসলাম, যেইখান থিকা ছোট কোর্ট ইয়ার্ডটা দেখা যায়।

কোর্ট ইয়ার্ডের বাউন্ডারিটার সৌন্দর্য নিয়া ভাবলাম। ঢেউ টিনের অংশটার পাশেই কনক্রিটের অংশে নীল আর কমলা রঙের ঢেউ পেইন্ট করা, যেন সূর্য ডুবতেছে আর সেইটার প্রতিফলন পড়ছে পানিতে। ঢেউ টিনের নিচের খাঁদে বৃষ্টি হইলে সত্যিকারের পানি জমে।—এইটা কি ম্যাজিক রিয়েলিজমের মধ্যে পড়ে?

ঢেউ টিনের নিচের খাঁদে বৃষ্টি হইলে সত্যিকারের পানি জমে।—এইটা কি ম্যাজিক রিয়েলিজমের মধ্যে পড়ে?

কোন ধরনের মানুষ পছন্দ করে ম্যাজিক রিয়েলিজম? কিছু পড়াশোনা করলে হয়ত বুঝতাম। আর এই ব্যাপারটা সাইকায়াট্রিক ওয়ার্ডের এক প্রান্তের বাউন্ডারিতেই কেন প্রকাশ করতে ইচ্ছা হইল কর্তৃপক্ষের?

যেন সাইকায়াট্রিক ওয়ার্ড আর রিয়েল ওয়ার্ল্ডের মধ্যেখানের বাউন্ডারি এই ‘ম্যাজিক রিয়েলিজম’!

২৬.
আমি কোর্ট ইয়ার্ড থিকা চোখ সরাইয়া গ্লেন টু আর ইং এর দিকে তাকাইলাম। ডাইনিং হলের অন্য প্রান্তে দাঁড়াইয়া কথা বলতেছে ওরা। মাঝে মাঝে আমার দিকে দেখতেছে। আমি উইঠা দাঁড়াইয়া ওদের কাছে গেলাম। ইং’রে ধন্যবাদ দিয়া গ্লেন টু আর আমি পুল রুমে ঢুইকা দেখি জেড, বেলিন্ডা, মাইকেল আর ট্যামি সেইখানে পুল খেলতেছে।

মাইকেল: হেইইই! ওয়েলকাম টু আওয়ার ওয়ার্ল্ড!

আমি: তোমাদের ওয়ার্ল্ড মানে? আমারও ওয়ার্ল্ড না কি এইটা?

মাইকেল: না, মানে তুমি তো পুল রুমে আসো না সাধারণত, সেইজন্যে বললাম।

আমি: (হাইসা) হ্যাঁ, আমি অবশ্য কোথাও টিকতে না পাইরাই আসলাম।

গ্লেন টু: হা হা। হ্যাঁ, যেমন তুমি টিকতে না পাইরা আমার খোঁজ নিলা।

আমি: মানে? আমি টিকতে না পাইরা টিভি রুমে গেছি ঠিকই, কিন্তু টিকতে না পাইরা তোমার খোঁজ নেই নাই!

জেড: ঐটাও এক রকম টিকতে না পাইরাই নিছো। আইজকা দুপুরে আমরা কোর্ট ইয়ার্ডে কী আলাপ করলাম?

(জেড আর গ্লেন টু হাসতে হাসতে একজন আরেকজনরে হাই ফাইভ দিলো। আমিও হাসলাম।)

বেলিন্ডা: কী আলাপ করছো তোমরা?

আমি: একটু ব্যক্তিগত। বলতে চাইতেছি না।

বেলিন্ডা: জেডের কী এমন ব্যক্তিগত আলাপ থাকতে পারে যা আমারে বলা যাবে না? ও কি আমার সাথে যত ক্লোজ তোমার সাথে তার চেয়ে বেশি ক্লোজ? (বেলিন্ডার গলা একটু কাঁইপা গিয়া চোখ ছল ছল কইরা উঠল।)

আমি: আরে না না। ব্যাপারটা আমার ব্যক্তিগত। জেডের না।

বেলিন্ডা: না, আমি আগেও দেখছি এই রকম। জেড, আমার মধ্যে কী নাই যা ওর মধ্যে আছে? আমি কি সুন্দর না? সেক্সি না? বুদ্ধিমতী না? কথাবার্তায় ভাল না? তাইলে?

ট্যামি: (বেলিন্ডার সাথে গলা মিলাইয়া) কী এমন পাইছ তোমরা ওর মধ্যে, বলো তো মাইকেল!

২৭.
আমি এগুলার মধ্যে থাকতে চাইলাম না। বাইর হইয়া আসলাম। গ্লেন টু ও আমার সাথে বাইর হইয়া আসল। আমরা করিডোর ধইরা আবার হাঁটতে লাগলাম। এইবার আস্তে আস্তে, করিডোরের দুই পাশের দেয়ালে টাঙানো আর্ট ওয়ার্ক আর নোটিশবোর্ডগুলা দেখতে দেখতে। একটা নোটিশবোর্ডে দেখলাম কয়েকটা “before and after” ছবি লাগানো। একটা ছবিতে ‘before’-এর জায়গায় দেখাইছে একটা অগোছালো টেবিল আর ‘after’-এর জায়গায় একটা গোছালো টেবিল। আরেকটায় ‘before’-এর জায়গায় একটা অগোছালো বিছানা আর ‘after’-এর জায়গায় একটা গোছালো বিছানা। আরেকটায় ‘before’-এর জায়গায় পুরা ঘরই অগোছালো আর ‘after’-এর জায়গায় পুরা ঘর গোছালো ইত্যাদি।

আমার মনে হইল, ছবিগুলা পার্সোনাল হাইজিনের বাইরেও কিছু ইঙ্গিত করতেছে। কী সেইটা? আইডিওলজিকাল ও লাইফস্টাইলের ভিন্নতা ইঙ্গিত করতেছে মনে হয়। ইংরেজিতে লেখা, কাজেই স্বাভাবিকভাবেই ‘before’ বাম দিকে আর ‘after’ ডান দিকে। ছবিগুলা কী বলতেছে? সবকিছু নীট এবং টাইডি রাখ? কেন বলতেছে? আমার মনে পড়লো, হসপিটালে আসার আগে, কমিউনিটি হাউজে যাওয়ারও আগে, আমি মাথায় একটা প্রেসার অনুভব করতাম। একদিন আম্মা আমার ঘরে ঢুইকা মেঝেতে পইড়া থাকা প্লাস্টিকের ব্যাগ ও খালি প্যাকেটগুলা ওঠাইয়া ফালাইয়া দিয়া বলছিল ঘর পরিষ্কার রাখতে। ঐটুক পরিষ্কার করার পরেই আমার মাথার চাপ অনেকটা কইমা গেছিল। সেইটা সেই কারণেই কি না জানি না অবশ্য। সেই কারণে হইলে কীভাবে সম্ভব সেইটা?

ভাবতে ভাবতে করিডোরের অন্যপাশের দেয়ালের নোটিশবোর্ডে চোখ পড়ল। দেখলাম, নোটিশবোর্ডের ডানপাশে একটা বড় পোস্টারে বড় কইরা একটা ফটোকপিয়ারের ছবি। তার উপরে লেখা “The best invention of the 20th century is the copy machine.” এইটার অর্থও ঠিক ধরতে পারলাম না আমি। শুধু বুঝলাম যে কোনো চলতি তর্কে, কোনো এক দলের মানুষদেরকে এইখানে ফটোকপিয়ারের সাথে তুলনা করা হইছে হয়ত, যারা হয়ত একজন আরেকজনরে কপি কইরা বা কপি বানাইয়া আসতেছে।

আরও কিছুদূর হাঁইটা রিসেপশনের কাছ পর্যন্ত যাইতেই, মেডিসিন রুমের করিডোরের দিকের দেয়ালে বড় বড় কইরা পেইন্ট করা:

“Working collaboratively to provide
individualised care that promotes
wellness and recovery.”

এইখানে ‘individualised’ বলতে কী বুঝাইছে? কেমন সমাজব্যবস্থার ও upbringing এর অবস্থান থিকা ‘individualised’?

একটা কালেক্টিভিস্ট সমাজের মানুষরা একজন আরেকজনের সাথে সার্বিকভাবে মিলামিশা যাইতে চাইতে পারে। একজন আরেকজনের পরম ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলাও জাইনা যাইতে পারে। কিন্তু তাই বইলা, এবং সেইজন্যেই সেইখানে সত্যিকার অর্থে মুক্তি নাই। একজন আরেকজনের উপরে নির্ভর করতে করতে একজনরে আরেকজন হইয়া যাইতে হইতেছে ক্রমাগত। ফলে, যে স্বভাবতই নরম, অথবা যার ‘নিজ’ বা ‘স্ব’ তুলনামূলকভাবে অবিকশিত, তার নিজস্বতারে হারাইয়া ফেলতে হইতেছে বার বার, তার চেয়ে কঠোর বা বিকশিত ‘স্ব’-এর কাছে। আর তাই, একটা কালেক্টিভিস্ট সমাজে, ‘নিজ’ বা ‘স্ব’ প্রয়োগিকভাবে অনেক বেশি বিদ্যমান। উপরন্তু, সবাই একইভাবে একজন আরেকজনের উপর নির্ভর করে না। কেউ নির্ভর করে ভালবাইসা, কেউ নির্ভর করে কিছু একটা না পাইরা আর কেউ নির্ভর করে ক্ষমতা প্রয়োগ কইরা। এইরকম সমাজে ভালবাসা এবং না পারারে দুর্বলতা ধরা যাইতে পারে। ফলে যে যত বেশি জানবে সমাজ, সমাজের কাজ ও সমাজের মানুষদের ব্যাপারে, সে তত বেশি ক্ষমতাবান হবে এবং সেই ক্ষমতা দুর্বলদের উপর প্রয়োগ করতে পারবে, যদিও বা যারে দুর্বল ধরা হয়, সে অন্য আইডিওলোজিতে বিশ্বাসী হইয়া থাকে, এবং সেই আইডিওলোজির অবস্থান থিকা দুর্বল না হইয়া থাকে। ফলে, যাদের বাস্তব বুদ্ধি কম বা নাই—কিছু একটা ‘জানা’-র জন্যে যা প্রয়োজন—তাদের জন্য এই সমাজব্যবস্থা উপযুক্ত না। এইরকম সমাজ তাদেরকে শুধু শোষণই করবে। কিন্তু তাদের চিন্তাভাবনা যে অনেক বেশি সৃজনশীল, অনেক বেশি ইন্ডিভিজুয়ালাইজ্ড—কারণ তারা কোন কাজের জন্যে ভিতর থিকা প্রেরণা পায়, বাইরে থিকা পাওয়ার তুলনায়—সেইটা কি এইরকম সমাজ দেখে? তাদেরও যে নিরাপত্তা দরকার, কেয়ার দরকার সেইটা কি বোঝে? তাদের জন্যে সত্যিকার অর্থে ‘ইন্ডিভিজুয়ালাইজ্ড’ কিছু করতেছে কি এই মেডিসিন বেইস্ড সো-কল্ড ‘কোলাবোরেটিভ,’ ‘কালেক্টিভিস্ট’ সিস্টেম?

২৮.
ভাবতে ভাবতে কখন নিজের ঘরের সামনে আইসা দাঁড়াইছি খেয়াল করি নাই। তাকাইয়া দেখি, গ্লেন টু আমার দিকে তাকাইয়া হাসতেছে। আমিও হাসলাম। ভাবলাম, আমার অন্যমনস্কতা দেইখা হাসতেছে। সামনে ভালভাবে দেখার পরে বুঝলাম হাসির আসল কারণ—আমার ঘর পরিষ্কার করা হইছে ঠিকই, কিন্তু আমার বিছানায় কে যানি কম্বল গায়ে দিয়া ঘুমাইতেছে। শেল্ফটাতেও অপরিচিত সব কাপড় আর জিনিসপত্র রাখা। ব্যস্ত হইয়া রিসেপশনে গেলাম আমি। বললাম, “এক্সকিউজ মি জেইন, তিন নম্বর ঘরে কে যেন শুইয়া আছে। আর শেল্ফে আমার জিনিসপত্রও নাই।”

: ও, ঐ ঘরটা নতুন প্যাশেন্টরে দেয়া হইছে। ১০ নম্বর  ঘরটায় এখন তুমি থাকবা।

: আর আমার জিনিস?

: তোমার জিনিস এই তিনটা ব্যাগে (দরজা খুইলা ব্যাগ তিনটা দিতে দিতে)।

আমি গ্লেন টু’রে বিদায় দিয়া, ব্যাগ তিনটা নিয়া ১০ নম্বর ঘরে ঢুকলাম। এই ঘরটাও সুন্দর। জানালার বাইরে গাছপালা দেখা যায়। আর ঘরটা একটা করিডোরের ঠিক এক প্রান্তে—ডাইনিং হল ভেদ কইরা, পুল রুম, প্রেয়ার রুমের পাশ দিয়া যেই করিডোরটা গেছে, সেই করিডোরটার এক প্রান্তে।

দেখি, দরজায় একটা অসম্ভব সুন্দর ২৬-২৭ বছরের ছেলে দাঁড়ানো। ছেলেটার চেহারা থিকা চোখ সরতে চায় না। ছেলেটা বলল, “আমি কি ভিতরে আসতে পারি?”

আমি ব্যাগ খুইলা জিনিসপত্র জায়গামত রাখতেছি, আর তখনই খোলা দরজায় টোকা পড়লো। দেখি, দরজায় একটা অসম্ভব সুন্দর ২৬-২৭ বছরের ছেলে দাঁড়ানো। ছেলেটার চেহারা থিকা চোখ সরতে চায় না। ছেলেটা বলল, “আমি কি ভিতরে আসতে পারি?”

: আসো আসো।

: (ডান হাত পাইতা) মে আই হ্যাভ ফিফটি সেন্টস?

: হি হি। তুমি এইটা কেমনে জানো? তুমি কি দেখছ আমারে ডমিনিকরে পঞ্চাশ সেন্টস দিতে?

: মে আই হ্যাভ ফিফটি সেন্টস?

: আচ্ছা, দাঁড়াও দেখি, আছে কি না আমার কাছে। আগে তোমার নাম বলো।

: ইভান।

: (পার্স থিকা পঞ্চাশ সেন্টস বাইর কইরা) এই নাও পঞ্চাশ সেন্টস।

খোলা দরজার ভিতরে আমি ইভানের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাইয়া রইলাম। শুধু ও দেখতে সুন্দর সেইজন্যেই না, বরং ডমিনিকের সাপোর্টে ডমিনিকরে যে অনুকরণ করল, সেই কারণেও। আমি একটা সুন্দর দেহের মধ্যে একটা সুন্দর মানুষরেও দেখতে পাইলাম। ইভানও আমার দিকে সুন্দরভাবে তাকাইল। সেও কি আমার মধ্যে একটা সুন্দর মানুষ দেখতে পাইল?

তখনই দরজার বাইরে তাকাইতেই দেখি গ্লেন টু করিডোর ধইরা হাঁটতে হাঁটতে আমার ঘরের একদম কাছে চইলা আসছে। ওর চোখ ছল ছল করতেছে। আমি বিছানার এক কোণায় বইসা দরজার বাইরে তাকাইয়া রইলাম। ইভান ঘর থিকা বাইর হইয়া গেল। গ্লেন টু রাউন্ডের পর রাউন্ড হাঁটতে লাগল। ঘামে ভিজা উঠলো ওর টিশার্ট।

(চলবে)