হোস্টেল (১০)

আগের কিস্তিপ্রথম কিস্তি

৪১.
ফোনটা নষ্ট হয়ে গেছে। হাতে টাকা শেষ। কেনার মত অবস্থাও নেই। ইদানিং অভাবের খপ্পরে পরেছি। অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে পারি নি, দেরি হয়ে গেল উঠতে। তাড়াহুরা করে আয়রন ছাড়া জামা পরেই কলেজে যাচ্ছি।

বাস স্ট্যান্ডে লাড্ডুর সাথে দেখা। একই কলেজে কমার্সে পরে লাড্ডু। আমার পশের একটা উন্নত মানের হোস্টেলে থাকে। বাড়ি ফরিদপুর। একসাথে কয়েক দিন আমরা যাওয়া-আসা করছি।

মাঝে মাঝে ফোন করে আমার ঘুম ভাঙায় লাড্ডু। দাঁড়িয়ে থাকে আমার জন্য। বাবা কৃষক। জমি বিক্রি করে টাকা পাঠায় মেয়েকে। গ্রামের একমাত্র মেয়ে যে এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছে। তাকে নিয়ে বাবা-মায়ের অনেক স্বপ্ন।

আমার বাবা-মায়েরও ছিল। ছিল মানে হয়ত মা এখনো আমাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। মাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে।

লাড্ডু আমাকে দেখে বেজায় খুশি। “তোমাকে কত্ত খুঁজলাম। দুইটা লেগুনাও মিস হইল। কেন জানি মনে হল আসবা আরেকটু পরই।”

লাড্ডুর কথা শুনে হাসলাম। বললাম, “হুম তুমি আছো, একসাথেই যাই চলো। একা ভাল্লাগে না আমারও।”

লেগুনাতে উঠলাম ঠেলাঠেলি করে। গ্রামের মেয়ে। আমার চেয়ে চাল্লু লাড্ডু। দেখতে চারকোনা টাইপের। মুখ ভর্তি ফাউন্ডেশন থাকে সবসময়। আমি অনেকবার বলেছি তোমাকে মুখে কিছু না দিলেও ভাল লাগবে। কিন্তু ওর বিশ্বাস হয় না। চাচাত ভাইয়ের বন্ধুর সাথে প্রেম করে। ছেলেটা নাকি বালু আর লোহার ব্যবসা করে।

লেগুনায় উঠে আমার কোমরে একটা চিমটি কেটে বলল, “ওই বিথী আমি তো খুব তাড়াতাড়ি বিয়ে করতেছি। লিটন ঢাকায় আসবে তারপর আমরা কক্সবাজার ঘুরতে যাব। ওখান থেকে এসে নিজেরাই বিয়ে করে ফেলব। পড়ালেখা শেষ হলে বাসায় জানাব। তারপর ফ্যামিলি থেকে আবার বিয়ে দিবে আমাদের। খুব খুশি খুশি লাগতেছে আমার।”

লাড্ডুর কথা শুনে বুকটা ধক করে উঠল আমার। প্রায় চিৎকার করে বললাম, “এসব কী বলো তুমি? বিয়ের করবা একা একাই? তোমার বাবা মা যদি জেনে যান? এটা কি ঠিক হবে লাড্ডু?”

আররেএএ আস্তে, দুনিয়ার মানুষকে শোনানোর জন্য বলছি নাকি তোমারে? একদম সিক্রেট। কাউকেই বলি নি, বলবও না। শুধু তোমাকেই বিশ্বাসে বললাম।”

আমি কিছুক্ষণ একদম চুপ করে আছি। ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, “তুমি বিয়ের আগে আবার কক্সবাজারও যাবা? কেন? শুধু তোমরা দুজনই যাবা? বিয়ের পরে যাওয়াও তো একই কথা।”

লাড্ডু লজ্জা লজা হাসি দিয়ে বলল, “হ, আমরা দুজনই তো যাব। তারপরেই ও বলছে বিয়ে করব মিরপুরে ওর এক বন্ধুর বাসায়। আর কক্সবাজারে যাওয়াটা আমার প্রেমের পরীক্ষা, ওইগুলা তুমি বুঝবা না।”

লাড্ডুর কথা শুনতে শুনতে কান দিয়ে যেন ধোঁয়া বের হচ্ছে। ততক্ষণে পৌঁছে গেছি কলেজের সামনে। নেমে দু’জনই হাঁটা দিলাম বড় বড় পা করে। দেরি হয়ে গেছে, পিটি ধরতে হবে। তার উপর আজ আমাকে ড্রাম বাজাতে হবে বেগম রোকেয়া ক্লাবের পক্ষ থেকে। হাতে আছে পাঁচ মিনিট মাত্র।

দৌড়ে গিয়ে অফিস রুম থেকে ড্রামটা তুলে গলায় গলিয়ে পিটিতে দাঁড়িয়ে পড়লাম। বাজনাটা হচ্ছিল না তালে তালে। পাশ থেকে থেকে ফয়জুন্নাহার ক্লাবের পাখি ভ্রু কুচকে বার বার আমার দিকে তাকাচ্ছে। ওর বিরক্তি দেখে একটু হাসি বিনিময় করার চেষ্টা করলাম।

মেয়েটা মুখ ঘুরিয়ে নিল।

আজ প্রথম ক্লাসটা উচ্চতর গণিত, আমার নেই। পড়ার ভয়ে রিয়াদ আমাকে পরিসংখ্যান নিতে বলেছিল। আমি রিয়াদের সব কথাই শুনতাম। ভাবতাম ও যা বলে সব কিছুতেই শুধু আমার ভাল আর ভাল। ভালোটা কী এখনো বুঝি নি, হঠাৎ করেই যেন সব খারাপ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। নতুন কিছুই আর ভাল আসছে না।

৪২.
লাইব্রেরিতে বসে আছি হাতে প্রথম আলো পত্রিকা। সম্পাদকীয় পাতায় হঠাৎ একটা লেখা দেখে থমকে গেলাম। বাপির লেখা।  অনেক দিন বাপির লেখা পড়ি না। পড়ি না বলতে বাপির লেখা নিজে কখনো পড়তাম না।  কোনো একটা লেখা শেষ হলেই বাপি ডেকে পড়ে শোনাতেন।

মনটা খারাপ হয়ে গেল। পত্রিকাটা হাতে নিয়ে বসে আছি। গলা ধরে আসছে। কেমন যেন কান্না কান্না পাচ্ছে, পড়তে পারছি না।

পেছন থেকে চোখ ধরল কেউ একজন। একটু চমকেই উঠলাম। চোখ ছাড়িয়ে পেছন দিকে তাকাতেই সনি বলল, “আমার পরাণ পাখি, তুমি কি একটা খবর নিয়েছো আমি বেঁচে আছি না মরে গেছি?”

সনিকে দেখে খুব হালকা লাগছে। জড়িয়ে ধরে বললাম, “কোথায় ছিলিস এতদিন? কোনো খবর নেই যে।”

সনি বিষণ্ন হয়ে বলল, “মরতে মরতে ফিরে এসেছি। পালিয়েছিলাম বাসা থেকে ওই বদমাইশটার সাথে। কিন্তু আব্বা ধরে নিয়ে আসছেন। খুলনা চলে গিয়েছিলাম ওর এক পাতানো কাকার বাসায়। বলেছিল বিয়ে করবে তিন দিন থাকল একসাথে কিন্তু বিয়েটা আর করল না। চাপ দিতে থাকলাম দুই দিন পর থেকেই। কোনো লাভ হচ্ছিল না। তাও মেনে নিয়েছিলাম। ভাবলাম করবে হয়ত। বিয়ে করবেই কয়েক দিন পরেই। কিন্তু কপাল খারাপ আমার, ও নিজেই আব্বাকে কল দিয়ে ঠিকানা জানাইছে আমাকে নিয়ে আসার জন্য।

ঘুম থেকে উঠে দাঁত মাজতেছিলাম। হঠাৎ আব্বার গলা। মনে হল মনের ভুল।  কিন্তু না আরো দুইবার সোনিয়া সোনিয়া বলে ডাক দিল।  ছুটে গিয়ে দেখি আব্বা আর দুলাভাই, তাজ্জব হয়ে তাকিয়ে থাকলাম।

আব্বা গম্ভীর গলায় বললেন, ব্যাগ নিয়ে আসো।

কথাটা শুনে মনে হল পায়ের নিচ থেকে সব মাটি সরে যাচ্ছে। দূরে হায়দার দাঁড়িয়ে আছে। ভাবলেশহীন ভাবে।  বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল, চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। ওই দিকে শয়তানটা একবার তাকাচ্ছেও না। আব্বা মুখ শক্ত করে ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দুলাভাইকে বললেন, আহাদ ওকে বলো হাতে সময় নেই আমার।

আমি দৌড়ে ভিতরে গিয়ে নাকে মুখে ব্যাগটা হাতে নিয়ে দুলাভাইয়ের পাশে দাঁড়ালাম।  তখনো জানি না কীভাবে আব্বা জানলেন আমি হায়দারের সাথে খুলনায় আছি। হায়দার একবার আমার দিকে তাকালোও না। আমার চোখের পানি তার চোখে পড়লোও না। যেন সবই মিথ্যা ছিল। আমর প্রতি আসলে কোনো প্রেমই ছিল না ওর।

হায়দারের সেই কাকার বাসা থেকে বের হয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। সারা রাস্তা কেউ কোনো কথা বলল না। আমি চুপ করে বসে ছিলাম। রাতে বাড়িতে পৌঁছে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলাম। পরের দিন সকালে আপা দরজা ধাক্কালেন। ঘুমিয়ে ছিলাম, ধরফর করে উঠে দরজা খুললাম। জোরে কয়েকটা থাপ্পড় দিলেন আপা।  দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে আমাকে ধাক্কা দিয়ে খাটে বসালেন।

মাথা নিচু করে থাকলাম। আপা চিল্লায়ে চিল্লায়ে যা ইচ্ছা গালি দিলেন।—এত বিয়া করার প্যারা উঠছিল তো আমারে বলতিস। যার তার সাথে গিয়ে রাত কাটাইতে গেলি কেন। এত উঠে গেছিল তোর? বাপ-মায়ের সম্মানের কথাও ভাবিস নাই? দ্যাখ সেই পোলাই তোরে ধরায় দিল আব্বার কাছে। ফোন দিয়া বলছে, আপনার মেয়েরে আমার কোনো দরকার নাই, আমাকে জোর করতেছে বিয়া করার জন্য।  কিন্তু আমার ফ্যামিলি আপনার মেয়েকে কখনোই মেনে নিবে না। নিয়ে যান আপনার মেয়েরে দয়া করে।

এখন মুখপুরি তোরে কে মেনে নিবে? তোরে তো ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়া উচিৎ। আমি তো তোরে থাকতে দিমু না এই বাড়িতে। যা গিয়ে ওই হারামজাদার বাড়ি গিয়া কাজ কইরা খা।

বুক ফেটে কান্না পাচ্ছিল রে বিথী।  হাইমাউ করে কাঁদছিলাম। আম্মা ঘরে ঢুকে আপাকে বললেন, যা যা তুই যা হইছে ওরে খাইতে বল। নিজের কপাল তো খাইছে এখন পাড়ার মানুষরে আর না জানা এসব। ওরে গোসল কইরা নামাজ পইড়া খাইতে বল।”

হা হয়ে তাকিয়ে আছি সনির দিকে। গলা দিয়ে আমারই কথা বের হচ্ছে না। কী থেকে কখন কী হয়ে যায় আমাদের ছোট্ট এক একটা ভুলে। আর বাবা মাকে আমরা কষ্ট দিতে থাকি। আমার বাবা-মায়ের চেয়ে আংকেল-আন্টি অনেক ভাল। এখনও ঘরে রেখেছেন মেয়েকে, কলেজেও পাঠিয়েছেন!

অনেকক্ষণ পর বললাম, “মহা ভুল করেছিস। শিক্ষা হয়েছে তোর? আগেই বলেছিলাম এই ছেলেকে আমার প্রথম দেখায় ভাল লাগে নি। দেখতেও তো উটপাখির মত। শুধু চামড়াটাই সাদা ছিল। চাকরি-বাকরিও তো ছিল না। বাপের টাকাও তো তুই বলছিলিস নাই। কেন এই ভুলটা করলি সনি? এখন সব বাদ দিয়ে পড়ালেখায় মন দে।”

সনি হা হা করে হাসছে, “হইছে হইছে, পণ্ডিত আইসা গেছে, উঠ, চল মাঠের উপর হাঁটি কিছুক্ষণ।

সবুজ ঘাস, একটু ভেজা ভেজা। সনি আর আমি হাত ধরে হাঁটছি। দুজনেই মোটামুটি ভাল রকমের ছ্যাকা খেয়ে প্রকৃতির রূপ উপভোগ করছি। মাঠের এক কোণায় একটা গাছ আছে। সম্ভবত জারুল গাছ। সনিই বলছে এইটা জারুল গাছ।

গাছটা ভর্তি বিভিন্ন নাম লেখা। মনি + মিতু, রক্সি + রোমানা, হাসি + টিনি। সবই মেয়ে + মেয়ের নাম লেখা। কলেজে একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করতাম আমি আর সনি, এটা নিয়ে হাসাহাসিও করি।

মেয়েরাও মেয়েদের প্রেমিকা এই কলেজে। এমন অনেক জুটিও আছে। ওরা আমাদের তোয়াক্কাও করে না। দিব্বি প্রেমও করছে। যদিও এদের প্রেম অঘোষিত অথবা ওরা ওদের শুধুই বান্ধবী, বাকিটা আমাদের চোখের কাঁটা। কিন্তু তবু একটু কেমন যেন একজন আরেকজনের গায়ে পড়া।

কমার্সের খাদিজা আর জেসিকা একজন আরেকজনকে দুইদিন পর পর গিফট দেয়। ‘বাবু’ বলে ডাকে। টিফিন এনে নিজে হাতে খাইয়ে দেয়। কখনো আবার চুল বেঁধে দেয়। আবার একজন আরেক জনের উপর রাগ করে না খেয়েও থাকে। রাগ ভাঙায়, আবার হঠাৎ হঠাৎ গালে চুমুও খায়। সবই আমার কাছে অস্বস্তি লাগে। হাসি ওদের নিয়ে আমরা। ওদের ওসবে মাথাব্যথা নাই।

সনি বলল, “চল আমরাও আমাদের নাম লিখি গাছের উপর।

সনির কথা শুনে খিক খিক করে হাসতে হাসতে বসে পড়লাম। সনি একটা ইটের টুকরা এনে সনি + বিথী লিখল গাছের উপর। আমি আবার ইটের টুকরাটা হাতে নিয়ে একটু গাঢ় করে দিলাম লেখাটা। যাতে অনেকদিন বোঝা যায় আমাদের নামটা।

৪৩.
ক্লাসে ঢুকতেই টিচারস রুমে আমার ডাক পড়ল। টিচাররা তলব করলেই আতঙ্ক কাজ করে, কী যেন কী করে ফেললাম, আমি এখনই কোন না কোন শাস্তি রেডি আমার জন্য।

বাসা ছাড়ার আগে একবার রাসটিকেট হতে গিয়ে টিচারদের অনুরোধে ওই যাত্রায় ভিসি ম্যাম-এর কাছ থেকে বেঁচে ফিরে ছিলাম।

ক্যান্টনম্যান্টের রাস্তা খুব বাজে। রাস্তা পার হতে দুনিয়া ঘুরে ফুটওভার ব্রিজ দিয়েই পার হতে হয়। কলেজের দক্ষিণ পাশের কলোনি সাইডের দেয়াল টপকিয়ে প্রতিদিন সরাসরি ফুটওভার ব্রিজের নিচে নেমে পার হতাম।

আইডিয়াটা তখন আমার ছিল, কিন্তু শুধু যে আমি দেয়াল টপকাতাম তা তো না। অথচ ধরা খেয়েছিলাম আমি একা।

বাবার কান পর্যন্ত গেলে হয়ত আরো আগে হোস্টেলে উঠতে হত। তাও ভাল ছিল। অন্তত কোনো ছেলেঘটিত কারণে তো আর বের করে দিত না ঘর থেকে। ওটার মধ্যেও একটা সম্মানের ব্যাপার ছিল।

সেদিনও পার হচ্ছিলাম। টিনটিনি, জুই আর রক্সির মত লম্বা না হওয়ায় ধরাটা আমিই খেয়েছিলাম। সবার আগে আমিই দেয়ালে অর্ধেক উঠে আরেক পা দিতে না দিতেই পিছন থেকে কামিজ ধরে কেউ একজন টানছে। হাত দিয়ে সরিয়ে দিলাম হাতটা। বললাম, উফফ, কীরে কী সমস্যা, দাঁড়াও দেখি স্মার্ট স্মার্ট আর্মিগুলো আছে কিনা, তারপর নামছি।”

আমার চোখ সামনের দিকে, নিচ থেকে এবার কোনো একটা ডালের মত কিছু দিয়ে কেউ একজন গুতা দিল। খুব বিরক্তি নিয়ে নিচে তাকাতেই দেখলাম, ভিসি ম্যাম। সাথেরগুলো সব হাওয়া। কোনো টু শব্দ না করেই আমাকে রেখে সবাই উধাও। হাত পা কাঁপছিল।

ম্যাম বললেন, “কোন রকম নড়াচড়া না করে নেমে আমার রুমে আসো।”

আমি আমতা আমতা করতে করতে বললাম, “জ্বী জ্বী জ্বী ম্যাম।”

ভিসি ম্যামের রুমে ক্লাস টিচার শিলা খাতুন আর বাংলা ম্যাডাম রেহেনা আক্তার বসে আছেন। খুব নমনীয় ভাবে সবাইকে এক এক করে সালাম দিলাম। ভিসি ম্যাম বললেন, তোমার কলেজে কি গেট নাই?

আমি মাথা নিচু করে থাকলাম। উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

ম্যাম আবার বললেন, “এই জন্য একদমই উচিত হয় নি সিভিলের বাচ্চাদের এই কলেজে পড়তে দেয়ার সুযোগ দেয়া। নিয়ম-টিয়ম আদব-কায়দা জন্ম থেকেই শিখে আসে নি তারা। নয়ত এত বড় সাহস কারো হয়, আপনি বলেন শিলা আপা। ওকে তো আমি রাস্টিকেট এখনই করে দিব। এই মেয়ের বাবা মাকে কিছু বলার সুযোগই দেয়া উচিৎ না।”

শিলা ম্যাডাম বললেন, ম্যাডাম আমি ওদের প্রত্যেকের ব্যাপারে খোঁজ রাখার ট্রাই করি। মোটামুটি জানি ম্যাম, ওদের কার কী সমস্যা। ও আসলে একটু পাজি টাইপের দুষ্টু মেয়ে। এ ছাড়া পড়ালেখায় ঠিকঠাক, ব্যবহার আচার আচরণও ঠিক আছে ম্যাম। ওকে আরেকটা সুযোগ দেয়া উচিৎ। ওরা কয়েকজন মিলে হেঁটে ঘুরে ঘুরে ফুটওভার ব্রিজে ওঠার ভয়ে দেয়াল টপকায়।”

ভিসি ম্যাম খ্যাচ খ্যাচ কণ্ঠে বললেন, “আমরাও তো দুষ্টু ছিলাম, পড়ালেখাও করতাম শিলা, কই এ রকম তো আমাদের মেয়েরাও করে না।”

শিলা ম্যাম একটু হেসে বললেন, ম্যাম আমি ওদের নিয়মের ব্যাপারে আরো কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি। আর বিথী যা করেছে সেটার জন্য শাস্তি পাওয়া উচিৎ, কিন্তু ও পড়ালেখায় যেহেতু ভাল আপনি একটু বিবেচনা করুন ম্যাম।”

ভিসি ম্যাম কিছুক্ষণ উপর-নিচে তাকিয়ে বললেন, “আমি এই মেয়ের নামে আর কোনো অভিযোগ পেলে কিন্তু রাখব না কলেজে।”

আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আই মেয়ে যাও। আর কখনো সাহস দেখাবা না।”

সে দিনের পর খুব ভেবে-চিন্তে চলি এই কলেজে। পান থেকে চুন খসলে আমাকে বের করে দিবে। তাই ভয়টা একটু বেশি লাগছে। এমনকি পড়ালেখায় কোনো রকম খারাপ করলেও বের করে দিবে। করিডোর দিয়ে হেঁটে টিচার্স রুমের সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, “মে আই কামিং ম্যাম।”

শিলা ম্যাম বললেন, “বিথী আসো, শোনো, তোমার মা আসছিলেন, আমার কাছে নিজে দিয়ে গেছেন বেতনের রশিদ। এবার থেকে উনি বেতন দিয়ে আমার হাতে রশিদ দিয়ে যাবেন বলেছেন।”

আমি যেন একটি ধাক্কা খেলাম। তাহলে কি ম্যাম জেনে ফেলেছেন আমি হোস্টেলে থাকি! কিন্তু ম্যাম খুব স্বাভাবিক ভাবেই তো বলছেন কথা। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে। এই কথা যদি ভিসি ম্যামের কানে যায় আমাকে এক্ষুনি বের করে দিবেন কলেজ থেকে।

আমি দাঁড়িয়ে আছি চুপচাপ। একটু সাহস করে ম্যামকে বললাম, ম্যাম মা কি আর কিছু বললেন?

ম্যাম বললেন, হুম তোমার পড়ালেখার কী অবস্থা, মন দিচ্ছো কি না। পরীক্ষা কবে এসব জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু বিথী, তোমার এবারের রেজাল্ট ভাল হয় নি। ক্লাস টেস্ট সবগুলোতে টেনেটুনে পাশ করেছো। পড়ালেখার প্রতি হঠাৎ অনীহা কিন্তু ভাল লক্ষণ না। হাতে বেশি সময় আর নাই, তাই সময় থাকতে পড়ালেখা করো ঠিক মত।”

আমি মাথা নিচু করে, “জ্বী ম্যাম, জানি ম্যাম, জ্বী ম্যাম মন দিচ্ছি” বলে বের হয়ে গেলাম।

মা কখন এসেছিলেন, আমাকে কি দেখেছেন? অন্য কেউ কি মাকে দেখেছে ভাবতে ভাবতে কেন যেন অস্থির লাগছে। তবে মাথা থেকে বিশাল একটা চিন্তা গেল। বেতন তিন মাসেরটা একবারে দিতে হয়। কীভাবে দিব ভাবছিলাম। কোনো কূল কিনারাই ছিল না টাকা-পয়সা পাবার। মনি আপু বলেছিলেন একটা টিউশনি আছে। সামনের মাস থেকে পাব। যা টাকা পাব সেটা দিয়ে হোস্টেল খরচ ছাড়া কিছুই হবে না। বাকিটা কীভাবে কী করব এখনও জানি না।

৪৪.
কলেজ থেকে ফিরে মনি আপুর সাথে উনার খালার বাসায় গিয়ে খালাতো বোনকে পড়ানোর ব্যাপারে কথা ফাইনাল না করতে পারলে সামনের মাস থেকে পথে নামতে হবে। খুব চিন্তায় পেয়ে বসছে। আর চিন্তা করলেই আমার বমি বমি লাগে। কিছু খেতেও পারি না।

সত্যি সত্যিই বমি বমি লাগছে। দৌড়ে টয়লেটে আসছি। বেসিনের সামনে দাঁড়াতেই বমি হয়ে গেল। চোখে অন্ধকার লাগছে। চোখে, মুখে, মাথায় একটু পানি দিলাম। আয়নায় নিজেকে চোখে পড়ছে। কেমন যেন শুকিয়ে গেছি। চেহারাটাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোন রূপ লাবণ্য তো নাই রসকষ নাই চেহারায়। বিরক্ত লাগল নিজেকে দেখতে।

চুলটা ঠিক করে বাঁধছি হঠাৎ একটা টয়লেট থেকে গুন গুন করে কথা বলার আওয়াজ আসল। একটু কাছে গেলাম। কিছু বোঝা যাচ্ছে না কথাগুলো, কিন্তু কথা শোনা যাচ্ছে।

প্রায়ই মেয়েরা লুকিয়ে ফোন নিয়ে আসে কলেজে। একটুও ভয় নেই, ফোনে কথাও বলছে। আমি তো বলব না কাউকে, কিন্তু অন্যরা টের পেলেই খবর আছে। সরে আসতে গেলাম, এমন সময় দরজা খুলছে ভিতর থেকে। আমার ইচ্ছা হচ্ছে কে ভিতরে ছিল দেখার, তাই একটু আড়াল হয়ে দাঁড়ালাম। কিন্তু টয়লেট থেকে একজনের বদলে বের হল দুইজন। মানে এক সাথে দুইটা মেয়ে একই টয়লেটে গিয়েছিল। আবার কথাও বলছিল।

ব্যাপারটা বিব্রতকর লাগল। জড়ো জড়ো পা করে সাঁই করে বের হয়ে গেলাম আমি।

ক্লাসে এসে দেখি সনি পিছনের বেন্চে বসে বুশরা আপুর সাথে হা হা হি হি করছে।  মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। কীভাবে ব্যাপারটা এক্ষুনি বলব সনিকে বুঝে উঠতে পারছি না।

বুশরা আপুর সামনে বললে সারা দুনিয়া বলে বেড়াবেন উনি। আমাকে বলতে বাধ্য করবেন কে কে ছিল টয়লেটের ভিতর। তারপর তাদের বিরক্ত করবেন বুশরা আপু।  মুখে কোনো কিছুই বাঁধে না তার। কত যে গালি আর বাজে কথা বলতে পারেন কিন্তু পড়ালেখায় খুব ভাল। সেকেন্ড ইয়ারে পড়লেও জুনিয়রদের সাথে মিশে থাকেন সবসময়। আমিও বুশরা আপুকে খুব পছন্দ করি, তবে ভালগারিজমের ডিব্বা একটা বুশরা আপু।

সব গাধা গাধা অল্প জানা মেয়েদের নিয়ে গোল করে বসে সেক্স কী জিনিস, থ্রি এক্স কে কে দেখছে, কে দেখে নাই, দেখা উচিৎ, এর ভিতর কী কী থাকে আরো বহুত আলোচনা জমায় দেন। আপুর মা বাবা দুজনেই আর্মি অফিসার। ভাই বোন কেউ নাই শুধু একটা বয়ফ্রেন্ড আছে। সেটাও নাকি টেম্পরারি।

দেখতে বেশ ভালই লাগে আমার। নাকের উপর দিয়ে গাল পর্যন্ত খয়েরি খয়েরি ডার্ক স্পটে ভরা মুখ। কিন্তু কেন যেন এই স্পটগুলাতে উনাকে আমার অন্য রকম সুন্দর লাগে। কেউ কেউ উনাকে সহ্য করতে পারে না। দেখলেই দূর থেকে ‘মাগি একটা’ বলে গালি দেয়। আপু জানেন সব কিছু কিন্তু পাত্তাই দেন না। আর আমাকে পেলেই খিক খিক করে হেসে বলেন, “কীরে সতিসাবিত্তি খবর কী? যা যা সন্ধি বিচ্ছেদ মুখস্থ করতে দিছিলাম করছিলি?”

কলেজের তখন মাত্র একমাস হয়েছে, কলেজ বাসেই বাসায় যাই আসি। একদিন আমাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে অন্যদের সাথে আমাকেও নিয়ে বাসের পিছনের ছয় সিটে গিয়ে বসে গল্প করছেন। সব গল্পই শুধু সেক্স আর অশ্লীলতায় ভরা। আমাকে আর টিয়া নামের একটা মেয়েকে আপু জিজ্ঞেস করলেন, কীরে ব্লু দেখেছিস কবে প্রথম?

আমি হা করে থাকলাম।

আপু আবারো বললেন, তুই কি বুঝিস না নাকি ভান করিস? থ্রি এক্স বুঝিস? দেখছিস কবে প্রথম?

আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে বললাম, “শুনেছি, দেখি নি কখনো।”

আপু বললেন, “যা তোদের জন্য একটা রিক্স নিব। কাল মোবাইলে নিয়ে আসব।  পিছনে আমার জন্য সিট রেখে বসবি, যে আগে উঠবি।”

পরের দিন সত্যি সত্যি আপু মোবাইলে এনেছিলেন ৩-৪টা ব্লু ফিল্ম এর ক্লিপ ছিল। আমরাও হা করে দেখলাম। বাসের পিছনে বসে ভয়ে ভয়ে প্রথম নীল ছবি দেখার অভিজ্ঞতা মনে হয় আমাদের ছাড়া আর কারো কখনো হয় নি। আপু দেখানো শেষে সবাইকে টাস্ক দিয়েছিল কার কেমন লেগেছে সবাই কাল ১০ লাইনের একটা অনুভূতি লিখে আনবে। বাকিরা দিয়েছিল কিনা জানি না তবে আপু লেখা চাইলেই কান্নাকাটির মত করে “না” “না” বলতাম আর আপু হা হা করে হাসতেন। কয়েক দিন পর নিজেই ভুলে গেছেন, আর চান না।

আমাকে দূরে দাড়িয়ে থাকতে দেখে সনি বলল, “কীরে বিথী কই ছিলি আয় বস তাড়াতাড়ি আয়, আপু আমাদের সন্ধি বিচ্ছেদ শেখাচ্ছেন।” বলেই পাশের বাকিগুলাও খেক খেক শব্দে হাসছে।

এসব আমার ভাল লাগছে না, তাও বসলাম। বুশরা আপু সবাইকে হেড ডাউন করতে বললেন। সবাই মাথা নিচু করে কান খাড়া করল, আপু বললেন, বল তো চাদরের সন্ধি বিচ্ছেদ কী হবে??

সবাই সবার দিকে তাকাচ্ছে, কেউই পারে না। আমি একটু চেষ্টা করে বললাম, আপু চাদ + দর। আপু ফিক ফিক করে হেসে বললেন, তোর মাথা আর তোর বয়ফ্রেন্ডের ঠ্যাং।

এমন সময় ক্লাসে ইংলিশ ম্যাম ঢুকেই চিল্লায় বললেন, “ওখানে এত গ্যাজেল্লা কেন? কী সমস্যা? তোমরা কি দেখতে পাচ্ছো না ক্লাসে টিচার আসছে যে?

একটু থতমত খেয়ে সবাই উঠে দাঁড়ালাম।

ম্যাডাম বুশরা আপুর দিকে আঙুল তুলে বললেন, “বুশরা তুমি এখানে কী করছো? তোমার ক্লাস নেই, যাও নিজের ক্লাসে যাও।”

আপু “জ্বী ম্যাম” বলে আমাদের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ দিয়ে আস্তে করে বললেন, “মহিলার মাথা গরম আছে, বিয়ে হলে ঠিক হয়ে যাবে। থাক তোরা, যাই আমি।”

(কিস্তি ১১)

About Author

নওয়াজ ফারহিন অন্তরা
নওয়াজ ফারহিন অন্তরা

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ছেন। জন্ম- ঢাকা, মে ১৯৯৩।