হোস্টেল (১২)

একটু পর একটা নার্স এসে বলল, "এইটা তো পুলিশ কেস, মেয়ে তো অষুধ খাইছে। ওয়াশ করাতে হবে।"

আগের কিস্তি প্রথম কিস্তি

৪৮.
আমার কলেজে সপ্তাহে একদিনই ছুটি। আমার ছুটিদিনই ভালো লাগে। কাপড় ধোওয়া যায়, ঘরটাও একটু পরিষ্কার করা যায়।

শুক্রবার হোস্টেলের সবাই কাজ করে। কাপড় ধোওয়ার ধুম পড়ে যায়। বাথরুমগুলিতে সিরিয়াল দিতে হয়, ভোরে উঠেই। শুধু মিতা আপু দেন না। আপুর হোস্টেলে অনেক পাওয়ার। আমারও পাওয়ার ছিল আপুর সাথে থেকে থেকে, কিন্তু ইদানিং আপু আমাকে আগের মত দেখেন না। একটু দূরত্ব রাখছেন। কারণটা ধরতে পারছি না। আপু এখনও ঘুম, আমি ভোরে উঠেই সকাল ৯টা থেকে চল্লিশ মিনিটের জন্য বাথরুম বরাদ্দ পেয়েছি।

আমি কাপড় কাঁচতে পারতাম না, এখনও তেমন পারি না। রিয়াদ বলত, আমার নাকি কখনোই কাপড় কাঁচার দরকার নাই। সব সেই করে দিবে। ভাবতাম সত্যিই দিবে, আমার কত আরাম।

রুমের মেঝেতে বসে বালতিতে কাপড় ভিজিয়ে মিতা আপুর ঘুমের দিকে তাকিয়ে আছি। খাটের মাঝখানে শুয়ে দুই পা দু দিকে দিয়ে উপুড় হয়ে নাক ডাকছেন। মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। পাশে আমার বালিশ পর্যন্তও চলে গেছে লালা। দেখেই গাটা গুলিয়ে আসছে। গাটা ঝাড়া দিয়ে উঠল, হঠাৎ হোস্টেলের এক বুয়া রুমে ঢুকে চিল্লায়ে বলল, ওই বিথী আফা, আপনার মামাত বইনে নাকি বিষ খাইছে, হেতের হোস্টেলে তন লোক আইছে আপনারে বিছরাইতাছে।

আমি আকাশ থেকে পড়লাম, আমার কোনোই মামাত বোন নাই। তার উপর এই হোস্টেলে তো থাকার সম্ভাবনাও নাই। কী যে সব বলছে বুঝলাম না, হা করে তাকায় আছি। বুয়াটা আবারও তাড়া দিল, ওই বিথী আফা, মাইয়ার অবস্থা ভালা না কইছে, আফনে গেলে মেডিকল নিব কইছে।

আমি গায়ে একটা চাদর পেচিয়ে বুয়ার সাথে দৌড়ে রিসেপশনে গিয়ে দেখি একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটাকে বললাম, আপনিই আসছেন আমার কাছে? আচ্ছা কার কী হয়েছে বলেন তো? আমি না বুঝতে পারছি না।

মেয়েটা বলল, আপা জেবনুন হোস্টেলে যে লাড্ডু আপা থাকেন আপনার মামাত বোইন, উনি রাইতে বিষ খাইছেন। আপনারে যাইতে হইব।

আমার মাথা ভন ভন করছে, হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল, লাড্ডুর না বিয়ে, সে কেন বিষ খাবে!

মেয়েটার সাথে বেড়িয়ে গেলাম রুম থেকে। লাড্ডুর হোস্টেলে আমি গিয়ে যে কী করব সেটাও মাথায় ঢুকছে না। আর আমি লাড্ডুর মামাত বোন, কে বলল এদের!

যেতে যেতে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, কেন বিষ খাইছে লাড্ডু বলতে পারেন? আর আমার কথা কে জানাল যে আপনারে পাঠাল আমার হোস্টেলে?

“আপা লাড্ডু আপা ভোর রাইতে নাকি গোঙাইয়া উঠছে। পরে, হোস্টেল সুপার উনার লগের মাইয়াগো জিগাইছে কেউ কিছু কইতে পারে না আফা কেন খাইছে। হেরপর, এক মাইয়া কইছে আপনে এই হেস্টেলে থাকেন, লাড্ডু আপা আপনের মামাত বোইন।”

“আচ্ছা লাড্ডুর বাবা মা কে জানানো হয় নি?”

“উনার আব্বায় আসতেছে, ফরিদপুর থেকে আইতে যতক্ষণ লাগে আর কি। কিন্তু আপারে মেডিকল নিতে আত্মীয় লাগব, তাই আফনারে আনতে পাঠাইছে হোস্টেল সুপার আফায়।”

কথা বলতে বলতে হোস্টেলের সামনে চলে আসছি। হোস্টেল সুপারের রুমে মেয়েরা গিজ গিজ করছে। কেউ কেউ চেউ চেউ। পাশেই একটা সোফায় লাড্ডুকে শোওয়ানো। চোখ বন্ধ, একটু পর পর হেঁচকি দিয়ে উঠছে, মুখ দিয়ে সাদা সাদা ফেনা বের হচ্ছে। আমার গা কির কির করছে দেখে।

আমাকে দেখে হোস্টেল সুপার বলল, আচ্ছা তুমিই তো বিথী? তোমার বোন ঘুমের অষুধ খেয়েছে। এখন রিলেটিভ ছাড়া আমরা মেডিকেল নিতেও পারছি না। লাড্ডুর বাবার সাথে কথা হল, উনি রিকুয়েস্ট করলেন থানা পুলিশে খবর না দিতে। কিন্তু এখন কিছু হলে তো আমরাও দায়ী থাকব।

আমি লাড্ডুর দিকেই তাকিয়ে আছি। মেয়েটা নিথর হয়ে পড়ে আছে। পাশের মেয়েগুলিকে বললাম, আপনারা একটু ধরেন চলেন, মেডিকেলে ভর্তি করাই ওকে।

হোস্টেল সুপার দারোয়ানকে সিএনজি আনতে বললেন। আমি লাড্ডুর মাথাটা ধরলাম, হোস্টেলের বুয়ারা ওকে ধরে ধরে ওঠাল সিএনজিতে। সাথে আমি আর হোস্টেল সুপার উঠলাম। পিছনে রিক্সায় লাড্ডুর একটা রুমমেট আর একটা বুয়া উঠেছে।

হোস্টেল সুপার বললেন, বিথী শোনো, আমরা কিন্তু ভাল কোনো মেডিকেলে নিতে পারব না। তাহলে তারা ভর্তি করবে না। মোটামুটি একটা মেডিকেলে নিয়ে জাস্ট ওয়াশ করে ওকে বিপদমুক্ত করতে হবে আগে, নয়তো আরো খারাপ হতে পারে। এর আগে একটা মেয়েকে নিয়ে এমন হয়েছিল, তখন হোস্টেল ৬মাস বন্ধ করে রাখতে হয়েছিল। আমার বেশ অভিজ্ঞতা আছে এদের ব্যাপারে। এই মেয়েগুলোর কোনো কাণ্ডজ্ঞান নাই, কী না কী হয় বাপমা সহ আশেপাশের সবাইকে বিড়ম্বনায় ফেলে দেয়।

আমার মহিলার কথা এখন শুনতে ভালই লাগছে না। ভয় ভয় লাগছে, কী হবে মেয়েটার। মরে যাবে না তো, যেই ছেলের সাথে প্রেম সে নিশ্চয় এমন কিছু করেছে যে লাড্ডু কষ্ট সহ্য করতে না পেরে এমনটা করেছে।

৪৯.
ফার্মগেটে এক বাসা বাড়ির তিন তলায় একটা মেডিকেল। খুব একটা যুৎসই লাগছে না। কিন্তু এখন করারও কিছু নাই। মেডিকেলে রুগী আসছে বলে খবর দেয়া হল, কয়েকটা লোক রুগী টানার বিছানা এনে লাড্ডুকে তুলে নিল। আমরাও সাথে সাথে ছুটলাম। লিফটে করে ওঠানো হল লাড্ডুকে, তখনও হেচকি দিচ্ছে লাড্ডু। ইমার্জেন্সিতে ঢুকানো হল লাড্ডুকে।

একটু পর একটা নার্স এসে বলল, এইটা তো পুলিশ কেস, মেয়ে তো অষুধ খাইছে। ওয়াশ করাতে হবে। আর ওয়াশ করাতে হলে মেয়ের আত্বীয়-স্বজনের সাইন লাগবে, নয়ত করানো যাবে না।

হোস্টেল সুপার বললেন, শোনেন আপা, এই মেয়ে তো আমার হোস্টেলে থাকে, আমি জেবনুন হোস্টেলের সুপার। মেয়ের বাবাকে খবর দেওয়া হয়েছে। উনি রাস্তায় আছেন, ফরিদপুর থেকে আসবেন, কিন্তু এর আগে মেয়েটা তো মরেও যেতে পারে, তাই ওয়াশ করানোটা জরুরি। আর মেয়ের মামাতো বোনে আছে, ও সাইন করে দিবে। আপনি ব্যবস্থা করেন আপা। টাকা পয়সা তো দিবেই ওভাবে বুঝছেন না আপা? ডাক্তারকে বলেন, সমস্যা নাই।

একটা সাইন করে দেওয়া কোনো ব্যাপার না, কিন্তু আমি তো আসলে লাড্ডুর কোনো কালের মামাত বোনই না। নার্স একটা ফর্ম এনে দিল আামাকে। পূরণ করলাম নিজের নাম, রুগীর নাম, রোগের ধরন, চিকিৎসার ধরন, রোগীর সাথে সম্পর্ক। এর পরে লেখা, রুগীকে চিকিৎসার পর মৃত্যু হলে মেডিকেল কর্তৃপক্ষ দায়ী না। সকল দায়ভার আমার, আমি রোগীর সম্পর্কে ………… , দায়ভার নিলাম।

নিচে নাম, ঠিকানা, পেশা, বয়স।

সব লিখে জমা দিলাম ফর্মটা। সব দেখে হোস্টেল সুপারকে ডাক দিল নার্সটা, এই যে আপা, মেয়ের বয়সতো ১৬ মাত্র। এর তো আঠারো বছরই হয় নি। এই মেয়ের সাইনে তো ওয়াশ করানো যাবে না। এই রোগীরে নিয়া যাইতে হবে, নয়ত আত্বীয়স্বজন লাগবে।

হোস্টেল সুপার নার্সকে বললেন, দিদি, এখন আত্মীয়ের জন্য অপেক্ষা করলে রোগী মরেও যেতে পারে। যেহেতু আপনাদের  এখানে অলরেডি ভর্তি করানো হয়ে গেছে তাহলে আপনারাও দায়ী থাকবেন, আগেই বলতেন, ভর্তি করতাম না। আর বুঝতেছেন না, এই রুগী নিয়ে এখন কই যাব। দিদি ডাক্তারকে বলেন, রোগীর বাবা আসছে, উনি এসে আপনাদের সব টাকা মিটিয়ে দিবেন।

কথা বলতে বলতে একটু সাইডে গেলেন নার্স আর হোস্টেল সুপার। তারপর নার্সটা ভিতরে চলে গেল।

আমি হোস্টেল সুপারকে জিজ্ঞেস করলাম, ম্যাম, অপারেশন কি করবে?

উনি শুধু “হুম” বলে হেটে চলে গেলেন নার্সের পেছন পেছন।

আমি একটু স্বস্তি পেলাম শুনে। করিডরে রাখা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলাম। লাড্ডু নিশ্চয় এত কষ্ট পেয়েছে যে ও মরে যেতে চাইছে। তাহলে আমার চেয়েও লাড্ডুর কষ্ট বেশি, নয়তো আমিও তো কবেই মরে যেতাম। রিয়াদ আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, বাবামা কথা বলেন না, পরিচয়ও দিতে চান না। তবু্ও আমি বেঁচে আছি। ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।

কেউ একজন আমার ঘাড়ে হাত রাখল, আমি তড়াক করে উঠে পড়লাম। চোখ খুলে দেখি হোস্টেলের পাশের চায়ের দোকানে বসে থাকা বদ পোলাপানের মধ্যের ওই ভদ্র ভাবের ছেলেটা। একটু অস্বস্তি লাগছে ছেলেটাকে দেখে। নামটা তখনও জানি না।  ছেলেটা ঘাড়ে হাত দিয়ে বসছে, মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। ভ্রু কুচকে তাকালাম।

ছেলেটা বলল, আপনি এখানে যে? কী হয়েছে, কোনো সমস্যা?

“নাহ, তেমন কিছু না, আসলে আমার কলেজের একটা মেয়ে পাশের হোস্টেলেই থাকে, ও ঘুমের অষুধ খেয়েছে, দ্যান ওর হোস্টেলে নাকি জানে যে আমি ওর মামাত বোন তাই আমাকে খবর দিয়ে এনে এখানে সাইন নিয়ে ওকে ওয়াশ করাতে নিয়ে গেছে।”

ছেলেটা হেসে বলল, আরে আরে আস্তে আস্তে বলেন, হাঁপিয়ে যাচ্ছেন তো। বুঝেছি আমি এই ঘটনা, এ রকম এসব হোস্টেলে প্রায় হয়। মরেও যায় অনেকে। কত দেখলাম এমন ঘটনা। আমার জন্ম এখানে, এলাকায় আমার বাপের নিজের ৬টা নিজস্ব হোস্টেল ভবন। সব দেখাশোনা করি আমি, কোনো সমস্যা হলেও দেখি, সমাধানও করে দেই। আমাকে ডাকলেই পারতেন।

“নাহ আমি আসলে নিজেও অপ্রস্তুত ছিলাম।”

ছেলেটা হা হা করে হেসে উঠলে, ম্যাডাম, আসল কথা আপনি আমাকে দেখলেই বিরক্ত হন, কথা তো বলা পরের কথা। আমাকে আপনি কালপ্রিট গুণ্ডা বদমাশ ভাবেন, ততটা কিন্তু আমি না। আমি যে একটা আস্ত গুণ্ডা তাতে সন্দেহ নাই, তবে খুব খারাপ মানুষও না।

আমি কী বলব খুঁজে পাচ্ছিনা। একটু লজ্জা লজ্জা লাগছে। আমি যে ভাল জানি না ওকে, এটা ছেলেটাও বোঝে। কোকড়ানো চুলগুলি একটু পর পর হাত দিয়ে ঠিক করছে, ঠোঁটের কোণে মিষ্টি এক রকম বাঁকানো হাসি। চুলগুলি না গোসল করতে করতে মনে হয় সোনালি হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে সোনালি চুলের একটা উশকো-খুশকো ছেলে। তাকিয়ে থাকতে ভালই লাগছে। ও কথা বলেই যাচ্ছে, আর আমি শুনছি তাকিয়ে তাকিয়ে।

“আচ্ছা বিথী ম্যাডাম, আপনার বাড়ি কোথায়, আপনার বাবা মা কোথায় থাকেন?”

“মিরপুরে থাকেন বাবা-মা। আর বাড়ি ঢাকাতেই।”

তাহলে আপনি কেন হোস্টেলে থাকেন বলেন তো। কাহিনীটা কী?

মনের অজান্তেই সত্য কথাটা মুখে চলে আসছে, মনেই ছিল না যে বলব, অন্য কোথাও বাড়ি অথবা বাবার বদলির চাকরি ইটিসি ইটিসি…। অন্য সবাইকে যা যা বলি একে বুদ্ধি করে সে সব বলা হল না। ছেলেটার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কথা বলতে গিয়ে বস গুবলেট করে ফেললাম।

বললাম, না না আসলে, তেমন কিছু না, এই তো আর কি, যাই হোক আপনার নামটাই জানি না।

ছেলেটা বলল, ডার ম্যা কুচ কালা হ্যাইন।

আরে ছেলে কোনো কালা ধলা না। এমনি থাকে না মানুষ হোস্টেলে। এ ভাবেই আছি। আপনার নামটা তো বলবেন, নাকি জনাব?

আমার নাম গব্বার সিং। বলে নিজেই হা হা করে হেসে উঠল।

আমি ওর ঘাড়ে একটা থাপ্পড় দিয়ে বললাম, উফ বলবেন না কি বলবেন না সেটা বলেন তো? নামই তো শুনতে চেয়েছি, আর তো কিছু না তাই না?

রাজু চাচা।

আরে কি হেয়ালি শুরু করলেন বলেন তো। এত সিক্রেট যে বলছেনই না?

ছেলেটা মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, এই পছন্দ হল না তো নামটা তাই না? বাবার এক বন্ধু রেখেছিলেন নামটা—রাজু। ম্যাডাম আমার নাম রাজু। অরিজিনাল নাম এইটা আমার। আর আমার বড় ভাইয়ের ছেলে আমাকে চাচাই বলে। হা হা হা…।

“হুম, বুঝলাম জনাব, আপনাকে যতটা খারুজ ভেবেছি ততটা আপনি না।”

ঠোঁটটা একদিকে বাঁকিয়ে হেসে বলল, ওহ আমি ধন্য, আপনি তাহলে ভেবেছেন আমাকে নিয়ে একটু হলেও, যাক তাও ভাল। বিথী, আপনি তো অনেকক্ষণ ধরে এখানে তাই না?

আমি বললাম, হুম, বেশ অনেকক্ষণ হল। কী করব, এই ঝামেলা ওই ঝামেলা আর লাড্ডুর বাবাও আসল না এখনও।

রাজু বলল, এই লাড্ডুটা কে?

বললাম, যেই মেয়েটা ঘুমের অষুধ খেয়েছে তার নাম।

ছেলেটা বলল, “এত মজার নাম যার, তার যে কীভাবে বিষ খেতে মন চাইল বুঝিনা! আচ্ছা একটু দাঁড়ান আসছি আমি। এখানেই দাঁড়ান।” বলেই করিডর দিয়ে হাঁটা দিল রাজু।

৫০.
নার্স আর হোস্টেল সুপার আসলেন। বললেন, লাড্ডু বিপদমুক্ত এখন। ওর বাবাও চলে আসছে প্রায়।

উনার সাথে কথা বলতে বলতে রাজু পাশে এসে দাঁড়ালো। আমার হাতে একটা পানির বোতল দিয়ে বলল, নেন পানি খান, অনেকক্ষণ তো কিছুই খান নি।

রাজুকে দেখেই হোস্টেল সুপার আমার দিকে হা হয়ে তাকিয়ে স্টিল হয়ে গেলেন। আমি একটু বিব্রত হলাম। রাজুর ওই দিকে মনোযোগই নাই। সে জোর করে হাতে পানিটা দিয়ে বলল, আচ্ছা বিথী, জানায়েন আপনার বন্ধুর কী হয়, আমি এখন যাই। ভাল থাকবেন।

রাজু চলে যাবার পর হোস্টেল সুপার আপা বললেন, এই মার্ডার কেইসের খুনির সাথে তোমার কী সম্পর্ক বলো তো? ব্যাপারটা তো সুবিধার না।

আমি বললাম, মার্ডার কেইস? আমি তো কিছুই জানি না। আজকেই কথা হল। আমার হোস্টেলের আশেপাশেই ইনাদের বাড়ি। আসা-যাওয়ার পথে দেখা হয়। কথনো কথা হয় নি, আজই হল। আমি বসে ছিলাম, কেন আসছি জিজ্ঞেস করলেন। জাস্ট বললাম, আর কিছুই না।

হোস্টেল সুপার একটু ভেঙচি কেটে বললেন, কী বলো! এতেই পানি দিয়ে গেল?

বুঝলাম, কিছু উত্তর দিয়ে লাভ নাই। তাই কিছু বলছি না। চুপ করে আছি। কিন্তু রাজু একটা মার্ডার কেইসের আসামি! কই, আমার তো মনে হল না। কিন্তু আসলেই কি তাই? একটা মার্ডার কেইসের  আসামির সাথে এতক্ষণ কথা বললাম আমি!

মাঝবয়সী এক লোক দৌড়িয়ে হোস্টেল সুপারের কাছে এসে বললেন, আপা, আপা, লাড্ডুর কী অবস্থা, এখন কই ও? কেমন আছে আমার মেয়ে?

“এখন ওয়াশ করানো হয়েছে। জ্ঞান ফিরলে বাকিটা বোঝা যাবে। আপনি একটু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেন। দেখেন কী কী লাগবে, বিলের কী অবস্থা। আপনার জন্যই অপেক্ষা করছি। কী যে অবস্থায় ছিলাম। আপনার শালার মেয়েকে দিয়ে বাধ্য হয়ে পরে মেডিক্যাল ফর্ম পূরণ করিয়ে ওয়াশ করানো হলো।”

লাড্ডুর বাবা আমার দিকে একটু তাকালেন, কিছু বললেন না। আমিই বললাম, “আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল, আসেন একটু কথা বলি। আঙ্কেল, আমি বিথী, একই কলেজে পড়ি লাড্ডুর সাথে। সকালে হঠাৎ ওর হোস্টেল থেকে খবর আসে ওর এই অবস্থা, ওরা এসে বলল, সম্ভবত লাড্ডুই বলেছে আমি ওর মামাত বোন। আমিও এই অবস্থা দেখে কিছু বলি নি। যাই হোক, এখন লাড্ডু ঠিক আছে আঙ্কেল, চিন্তা কইরেন না।”

আঙ্কেল হু হু করে কেঁদে উঠলেন, “মেয়েটারে জমি-জিরাত বেইচ্চা পড়াইতেছি কী এই জন্য, তুমিই বলো তো মা?”

আমি বললাম, “আঙ্কেল, সবাই তো এক রকম না, ও একটু নরম মনের তাই হয়ত কোনো একটা কষ্ট পেয়ে সহ্য করতে পারে নি। আঙ্কেল আপনি তো আসছেন থাকেন, আমি তাহলে যাই এখন। পরে এসে আবার দেখে যাব। আপনার নাম্বারটা দেন, খবর নিব। আমার ফোনটা নষ্ট তাই আমার কোনো নাম্বার নাই এখন। আপনি একটু শান্ত হোন, এখন বিপদমুক্ত। কোনো সমস্যা হলে জানাবেন।”

৫১.
মেডিকেল থেকে বের হয়ে স্বস্তি লাগছে। কিন্তু হাতে টাকা নাই। রিক্সা ভাড়াও নাই, তাও একটা রিক্সায় উঠে বসলাম। দুপুর হয়ে গেছে ভিজানো কাপড়গুলি মনে হয় রাতেই কাঁচতে হবে। কোনো ভাবেই বিকালের আগে বাথরুমের কোনো সিরিয়াল পাব না। হোস্টেলের সামনে রিক্সা থামিয়ে দারোয়ানের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভাড়া দিয়ে উপরে উঠলাম।

রুমে ঢুকে দেখি মিতা আপুর মেজাজ খুব খারাপ। আপু বললেন, কীরে বিথী তুই সকাল থেকেই নাকি গায়েব? তোর কোন বোন নাকি সুইসাইড করছে শুনলাম? লাভলি বলল। বুয়াজাতরে কি তুই চিনিস না? এরা কথা ছড়ায় বেড়ায় কেমনে? ও কইছে তুই নাকি এর সাথে জড়িত, তাই তোকে লোক দিয়ে ডেকে নিয়ে গেছে।

আমি বললাম, “আপু আমার কলেজে পড়ে মেয়েটা। পাশের জেবনুন হোস্টেলেই থাকে। সকালে আমি নিজেই অবাক যে আমাকে ডেকে নিয়ে গেছে। ও মনে হয় বলছে আমি ওর মামাত বোন। ওকে মেডিকেলে ভর্তি করানো হয়েছে, ওয়াশ করানোও হয়ে গেছে, ওর বাবাও আসছে মাত্র, তারপর আমি চলে আসলাম।”

“আচ্ছা যা যা, খেয়ে নে বেলা হয়ে গেছে। কী যে সব আলতু-ফালতুদের সাথে মিশতেছিস আল্লাহই জানেন। আবার কাপড়ও ভিজায় রাখছিস দেখলাম। দেখ কী করবি।”

আপু বললেন, খেয়ে নিয়ে রেডি হয়ে নিস, বিকালে বের হবি একটু আমার সাথে।

বললাম, আচ্ছা।

কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না। তাও মিতা আপুর মুখের উপর না বলা যায় না তাই রেডি হতেই হচ্ছে। ইদানিং জামা-কাপড় পরতে গিয়ে দেখি পরার মত কিছু নাই আমার। এভাবেই চলছি, একই জামা বার বার পরতে অস্বস্তি লাগে। নতুন জামা পরলে মনও ভালো থাকে আমার। আর পুরান জামা মন আরো খারাপ করে দেয়।

৫২.
মিতা আপু বাথরুম থেকে দৌড়ে ফোন কানে দিয়ে রুমে ঢুকে ঘুচুর ঘুচুর করে কার সাথে যেন কথা বলছেন। কথা শেষ করে আমাকে বললেন, “শোন বিথী, তোর রাকিব ভাই আসতেছে। আবার হেমন্তের সাথেও দেখা করার কথা ছিল, ও আসবে মনে হয়। তুই একটু ঘোরাঘুরি করিস হেমন্তের সাথে, আমি তোর রাকিব ভাইয়ের সাথে দেখা করেই আসব। আমার ফোন অফ থাকবে, তুই হেমন্তকে বলিস, আমার একটা বন্ধু বিষ খাইছে, আমি তার সাথে মেডিকেলে আছি। বুঝলি কী বললাম?”

পুরো ব্যাপারটায় খুব বিরক্ত লাগছে। আমি কেন উনার হয়ে হেমন্তরে সময় দিতে যাব। আবার বলবও মিথ্যা কথা। মিতা আপু আমার বন্ধুকে তার বন্ধু বানিয়ে একটা বিশাল গল্পও বানিয়ে বসছেন। এসব নিতেও কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু করারও কিছুই নাই। এখানে থাকতে গেলে এসবও সহ্য করতে হবে। তাও করতাম না হাতে ভালভাবে টাকা-পয়সা থাকলে। মাস শেষে ঝামেলায় পড়লে এই মিতা আপুই হেল্প করেন। তাই  হেমন্তের সাথে গল্প না করলে আপুর মেজাজ‌ও খারাপ হয়ে যাবে।

৫৩.
রেডি হয়ে নামলাম নিচে। হেমন্ত দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে দেখে এগিয়ে আসলেন, ওই তোমার আপু কই? আর যে কত অপেক্ষা করাবে আমাকে।

বললাম, আপু নাই। মেডিকেলে গেছেন উনার বন্ধু বিষ খেয়েছে তাকে নিয়ে গেছেন। এসেই আপনাকে কল দিবেন বলছেন।

“হুম বুঝলাম, আচ্ছা, সব তোমাকেই বলল মিতা আমাকে বলল না কিছুই, ভাল তো, ভালই। আমাকে নিজেই আসতে বলল দিয়ে উনি সেবা করতে গেলেন। অবশ্য খারাপ না, সেবা মাত্রই ভাল কাজ। তা কোন হাসপাতালে মিতা? চলো যাই, আমি আর তুমি ওকে হেল্প করি।”

আমি বললাম, তা তো জানি না। আমাকে এ ব্যাপারে কিছুই বলেন নি।

হেমন্ত বলল, তাহলে তুমিই চলো আমার সাথে, আমি তোমাকে না নিয়ে যাব না।

আমি অবাক হয়ে বললাম, কোথায় যাব আমি, বুঝলাম না। আর আমি কেন যাব?

আরে সে দিন যেখানে গিয়েছিলা, ওই যে আমার রুমে। আজিজের উপরে আবাসিক মেসে। সমস্যা কী, সেদিন তো গেলাই।

আমি চোখ কুঁচকে বললাম, মানে কী? ওইদিন তো আপু ছিল সাথে। আর আমার পরীক্ষা আছে কলেজে। সন্ধ্যায় আবার স্টুডেন্ট পড়াতে যাব।

“আচ্ছা আচ্ছা, আমি তোমাকে স্টুডেন্ট-এর বাসায় দিয়ে আসব, হলো তো?”

আমি বললাম, আচ্ছা কিন্তু অন্য কোথাও চলেন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে যাই চলেন।

হেমন্ত বললেন, “না চলো ছবির হাঁট যাই, আমি তামক খাব, তুমি বইসে থেকো।”

বললাম, আচ্ছা চলেন।

রিক্সায় উঠলাম হেমন্তের সাথে। শাহবাগ যাচ্ছি। হেমন্ত বললেন, ওই তোমার পুরা নাম কী? বিথী রাণি দাশ, বিথী চ্যাটার্জি, নাকি বিথী ঘোষ?

আমি হেসে বললাম, কোনোটাই না। ফারজানা বিথী। কোনো টাইটেল নাই।

“তার মানে তুমি মুসলিম ধর্মের? আরে ভাবলাম এত দিন পর আমার কপাল খুলল যে কাউকে পাইছি একই ধর্মের, তাও হল না। কপালি খারাপ আমার।”

আমি হা হা করে হাসছি। হেমন্ত হঠাৎ আমার চোখের উপরে পড়ে থাকা এলোমেলো চুলগুলি হাত দিয়ে সরাচ্ছেন।

বললাম, আররররে কী করেন? চুলে হাত দেন কেন?

আমার হাত সরিয়ে দিয়ে বললেন, বিথী রাণী, আমি আপনার অবাধ্য চুলগুলো বশে আনার ট্রাই করছি। এত ব্যস্ত কেন হচ্ছেন আপনি?

“আমি কোনো রানী টানি না, শোনেন আমার চুল বশে আনারও কোনো দরকার নাই আপনার দয়া করে। যত্তসব আজাইরা আপনি। যাচ্ছেন চলেন, হাতাহাতি করেন কেন। আমি কিন্তু নেমে যাব রিকশা থেকে।”

হা হা হা করে কয়েক মিনিট ননস্টপ হেসে বললেন, আচ্ছা আচ্ছা এই যে হাতাহাতি বন্ধ করে দিলাম, তুমি আরাম করে বসো। নামতে হবে না রিকশা থেকে।

হেমন্তের সাথে আরো সাঙ্গপাঙ্গ, সবগুলা ভাঙ্গাচুরা দেখতে। কেমন যেন, হিরোইনচিদের মতো। কতগুলা মেয়েও আছে তাদের সাথে। তামাক পাতার মত কিছু একটা কেটে কেটে সিগারেটের ভিতরে ঢুকিয়ে খাচ্ছে। গন্ধ শুকেই বোঝা যাচ্ছে নেশা জাতীয় কিছু এটা। হেমন্ত তখনও আমার পাশে বসেই সবার সাথে গল্প করছে। একটা ছেলে ডাকল ওকে । হেমন্ত ছেলেটাকে হাত ইশারা দিয়ে, আমাকে বললেন, “শোনো বিথী, আমি একটু তামক টেনে আসি, তুমি জাস্ট বসো।”

আমি মাথা নাড়লাম। মেয়েগুলাও টানছে আর এলোমেলো বকছে। চোখ লাল হয়ে আছে সবার। যেন, কয়েক ঘণ্টা পুকুরে দাপাদাপি করে আসছে এরা। একটা ছেলে এসে সবার উপরে টলে টলে পড়ছে। আমার উপরেও পড়ল। আমি চীৎকার করে উঠলাম, পাশে একটা মেয়ে আমার মুখ চেপে ধরে আরেকজনকে বলল ছেলেটাকে সরিয়ে নিতে।

হেমন্ত দৌড়ে এসে বলল, কী বিথী কী হয়েছে, কী সমস্যা?

মেয়েটা আমার মুখ ছেড়ে দিয়ে বলল, “আরে জাকির টেম্পার হয়ে সবার উপরে পইড়া যাচ্ছিল, তখন উনার উপরেও পড়ছে। আর উনি চিল্লায় উঠছেন। দেখো দাদা, চারিদিকের মানুষ তাকিয়ে আছে। যেন কী না কী হইছে এখানে।”

হেমন্ত ধমক দিয়ে বলল, “চুপ করো তো স্বর্ণা। যে যতটুকু পারবে ততটুকু খাবে। বেশি খেয়ে অন্যদের বিরক্ত করবে কেন। কিছু না বলতে বলতে জাকির মাথায় উঠে গেছে। কই, কই জাকির, ডাকো এখনি।”

আরেকটা ছেলে ওই ছেলেটাকে নিয়ে আসল। ছেলেটা মাথা নিচু করে বলল, জ্বি দাদা, ভুল হয়ে গেছে। আর এমন হবে না।

হেমন্ত, চিল্লায়ে ধমক দিয়ে বললেন, যা চোখের সামনে থেকে, আগামী এক সপ্তাহ যেন তোর চেহারা না দেখি অত্র এলাকায়।

ছেলেটা কেঁপে উঠল। তারপর দাঁড়ানো অবস্থায় সবার সামনে প্রস্রাব করে দিল। প্যান্ট ভিজে গেছে, প্রস্রাব গড়িয়ে গড়িয়ে আমার স্যান্ডেলের তলা পর্যন্ত চলে আসছে। আমি তাড়াতাড়ি দূরে সরে গেলাম কয়েক পা।

ছেলেটা তখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

(চলবে)

More from নওয়াজ ফারহিন অন্তরা

হোস্টেল (৬)

রিমন তাও দাঁড়িয়ে আছে। চশমা খুলে আমাকে বলল, “চল না একটু ছাদে...
Read More