হোস্টেল (১)

একটা মেয়ে রুমে এসে বলল, রুমে নতুন মাইয়া কেডা? নিচে মকতার ভাইরে টাকা না দিয়া দাঁড় করায় রাখছে?

১.

ক্লাস টেন-এ থাকতেই একটা ছেলের সাথে সম্পর্ক হয় আমার। এক বছর যাবৎ ছেলেটার সাথে প্রেম চলছে। ওর নাম রিয়াদ। প্রাইভেট ভার্সিটিতে বিবিএ পড়ছে। আমার চেয়ে কয়েক বছরের বড়।

ভালোবাসা ব্যাপারটা খুব যে বুঝি তা না, কিন্তু রিয়াদের সাথে কথা বলতে আর ওর সাথে সময় কাটাতে বেশ ভালোই লাগে আমার।

প্রতিদিন মেসেজ আর সুযোগ পেলেই ফোনে কথা বলি আমরা। ফোনে টাকা শেষ হয়ে গেলেও আমাদের কথা শেষ হয় না। এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের কাজ এখন।

মেসেজ করতে করতে টাকা শেষ হয়ে গেলে, মাঝরাতে মা বাবার রুমে ঢুকে পা টিপে টিপে বাবার ফোন নিয়ে আসি। বাবা মা গভীর ঘুমে থাকেন। টের পান না। কিছুক্ষণ বাবার ফোন দিয়ে কথা বলি। কথা শেষ হলে আবার ঠিক জায়গায় রেখে আসি ফোনটা। সব মেসেজ আর কল লিস্ট ডিলিট করেই রাখি। তাই ধরা পড়ার সম্ভাবনা ছিল না।

কিন্তু আমি বুঝি নাই যে, রাতে ‘গুড নাইট’ বলে মেসেজ দেয়ার পর আবার রিয়াদ, ‘গুড নাইট লাভ ইউ’ বলবে! তাও, বাবার ফোন নাম্বারেই পাঠিয়েছে।

আমি ফোনটা বাবার রুমে খুব ভালো ভাবে রেখে আসছি। সব প্রমাণ ডিলিট করতেও ভুলি নি। আমার রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে উঠেই বাবা-মা রাগী রাগী কণ্ঠে ডাকলেন আমাকে। ফোনের মেসেজটা আমার মুখের সামনে ধরলেন, আমিও বোকার মত সব স্বীকার করে ফেললাম। রিয়াদের নামও বলে দিলাম।

মা নাকি কিছুদিন ধরেই সন্দেহ করছেন। আমার চলন-বলন নাকি পাল্টে গেছে। একা একা কথা বলি। খেতে বসলে আরেক দিকে হা করে তাকিয়ে থাকি। পড়াশোনাও ভালো ভাবে করছি চোখে পড়ে না মায়ের। আমার ফোন নিয়ে নিলেন মা। আরো কত কত মেসেজ এর ভিতর। ওসব দেখার পর তো বাবা আমার মুখই আর দেখতে চাইছেন না।

মা চিৎকার করে বলছেন, “এগুলো কী বিথী? এই শিক্ষা আমরা তোমাকে দিয়েছি? কোন না কোন রাস্তার ছেলের সাথে এইসব কথা তুমি বলেছো। ভাবতেই মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে আমাদের।”

আমি তো তেমন কিছুই লিখি না যে মাথা হেট হয়ে যাবে!—”তুমি খেয়েছো? সময় মতো লাঞ্চ করে নিও।” খুব বেশি খারাপ কিছু যদি লিখে থাকি তবে লিখেছি, “মিস ইউ জান। তোমাকে দেখতে ইচ্ছা করছে।”

আর রিয়াদ একটু একটু লেখে, “আজ চাঁদটা দেখেছো? কাল যখন ওই নীল টপসটা পরেছিলা তোমাকে এই চাঁদটার মতই লাগছিল তুমি ইদানিং বড় হয়ে বড় হয়ে যাচ্ছ বিথী। ঠিক আমার স্বপ্নের মত। তোমাকে বেশ সেক্সি সেক্সি লাগে…;)”

আমি এখনো তেমন সেক্সি কথাটার সাথে বেশি পরিচিত না। তাই রিপ্লাই দিয়েছিলাম, “মার খাবা বাজে কথা কেন বলো? ছিঃ।” রিয়াদের মেসেজ—”ও তাই নাকি তুমি আমাকে এখন মারতেও চাও? তাহলে থাক আর বলব না।”

এসব মেসেজের জন্যই এত বকাবকি শুনতে হচ্ছে। কেন আগেই ডিলিট করলাম না, রাগ হচ্ছে নিজের উপর।

মা বাবার মাথা হেঁট হওয়ার কথা শুনে আমিও মাথা নিচু করে থাকলাম। শুধু শুনেই যাচ্ছি আব্বু আম্মুর শক্ত শক্ত কথা। কিছু বলার মুখ নাই।

ওই দিন আব্বু আম্মু বেশ কয়েকটা চড়থাপ্পড় দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, এই বয়সে প্রেম করা কতটা খারাপ। আব্বু আমার ফোনটা এক হাতে নিয়ে আমাকে আরেক হাত দিয়ে জোরে একটা থাপ্পড় দিলেন। সাথে সাথে আঙুলের ছাপ পরে গেল আমার গালে। মাথা ওঠাতেই আম্মু টেবিলে রাখা চায়ের কেতলিটা দিয়ে আমার মাথায় বাড়ি দিলেন। চোখ দিয়ে পানি পড়ছিলো আমার। কিন্তু মুখ দিয়ে কিছু বলার অবস্থা ছিল না। বাবা আবারো দু একটা থাপ্পড় দিয়ে উঠে গেলেন। মা আর মারলেন না। মনে হলো বাবাকে দেখানোর জন্যই কেতলি দিয়ে মেরেছেন।

খুব রাগান্বিত ভাবে মা আমাকে বললেন, “যাও ঘরে যাও। দেখলে তো বাবা কেমন রেগে আছে। ভদ্র হয়ে যাও নয়তো পড়ালেখা আর করার দরকার নাই। রিক্সাওলাও জুটবে না তোমার কপালে। ওইসব ছেলেরা আসে আর যায়। এদের জন্য লাইফ বরবাদ কোরো না। এই ১৬ বছরেই তুমি এত পেঁকে গেছো!”

কয়েক দিন চুপচাপ ছিলাম। তারপর আবার লুকিয়ে দেখা করা শুরু করলাম। কলেজ শেষে রিয়াদের সাথে হাত ধরে রাস্তা পার হতে গিয়ে হাতেনাতে বাবার চোখে ধরা পড়লাম। কচুক্ষেত বাজার পার হয়ে মেইন রোডে ঢুকতেই বাবার রক্তচক্ষুর সামনে আমি আর রিয়াদ। রিয়াদকে বললাম, হাত ছাড়ো ছাড়ো সামনে বাবা। ও কিছু না দেখেই আমার হাত ছেড়ে দৌড় দিল।

আমি কোন দিকে না তাকিয়ে বাসায় চলে আসলাম। বাবা কোথায় গেলেন পিছন ফিরে একবারও দেখলাম না। ভয়ে ভয়ে বাসায় ঢুকে বুঝলাম আজ আর রক্ষা নাই। মা কোন কথাই বলছেন না।

বাবা বললেন, “ঘর থেকে বের হয়ে যাও। তোমার মত মেয়ে আমার ঘরে রেখে পালতে চাই না আর।”

আমি কিছু না বলে আমার রুমে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পর মা এসে আবার আমার সেল ফোনটা নিয়ে গেলেন। পরের দিন থেকে আমাকে কলেজেও যেতে দিলেন না।

সাতদিন ধরে এভাবেই চুপচাপ ঘরে বসে কাটাচ্ছি।

বাবাই মাকে পাঠালেন আমার রুমে, মা জিজ্ঞেস করলেন, “শোনো বিথী, সাফ সাফ তোমার বাবা তোমাকে বলে দিতে বলেছেন। তুমি কি ভালো হয়ে চলবা? ওই লোফারটার সাথে ঘোরাঘুরি বন্ধ করে পড়াশোনায় মন দিবা নাকি এভাবেই ঘরে থাকবা? তা না হলে তোমার পড়াশোনা চিরতরের জন্য বন্ধ। দেখ তোমাকে তোমার বাবা অনেক স্বপ্ন নিয়ে এত খরচ করেও এই কলেজে পড়াচ্ছেন। তবু তুমি বিপথে চললে আমরাও কতটা কঠোর বুঝতে পারবা।”

আমি এক নিঃশ্বাসে শুনছিলাম মায়ের কথা। অনেকক্ষণ পর বললাম, “আমি তো পড়াশোনা করছিই, তাহলে সমস্যা কোথায়?”

ওমনি মা চিৎকার করে বাবাকে ডাকলেন, “দেখো দেখো, তোমার মেয়ে কী বলে? আমাদের কী সমস্যা জিজ্ঞেস করছে।”

আমার বাবা তখন আয়েশ করে বেনসন লাইটে ধোঁয়া তুলছেন। হাতে পাথরের অ্যাশট্রে। আমার রুমে এসে কিছু না বলে হঠাৎ আমার দিকে অ্যাশট্রে ছুঁড়ে মারলেন।

আমি সরে যেতে সম্ভবত ভুলে গিয়েছিলাম। অথবা ভেবেছি বাবা আদৌ আমার দিকে মারেন নি, ভয় দেখানোর জন্য আশে-পাশে অ্যাশট্রে ছুঁড়ে মেরেছেন।

মাথায় এসে লাগল। কিছুটা সময় ঝিমঝিম করছিল মাথা, বাম কানও বন্ধ হয়ে গেল। কিছুই শুনছিলাম না। আধো চোখে দেখলাম বাবা চলে গেলেন, মা বসেই আছেন তখনো। কারো মুখে কোনো বিলাপের স্বর নাই। ঘাড় বেয়ে গরম তরলের মত কিছু ফিল করছি। হাত দিয়ে দেখলাম রক্ত। মা দেখলেন রক্ত পড়ছে, কিন্তু উঠে চলে গেলেন।

খুব অভিমান হলো ওই মুহূর্তে। রক্ত বেশ পড়ছে। মাথাটা ফেটে গেছে ভালোই। কপালের একটু উপরে কেটেছে। কিন্তু তেমন একটা ব্যথা করছে না। বেসিনে গিয়ে মাথায় পানি দিলাম। খুব রিয়াদকে দেখতে ইচ্ছা হলো। কতদিন কথাও হয় না ওর সাথে। ফোন মা নিয়ে গেছে আর দেয় নি।

রুমে এসে মায়ের ওড়না ছিঁড়ে কপালে বাঁধলাম। আমার নিজের কোন ওড়না নাই। এখনও ওড়না পরা শুরু করি নি। দেখতে বাচ্চা বাচ্চা লাগে সবাই বলে। তাই মা শখ করে আমাকে এই বয়সেও ফ্রক আর জিন্স টপস পরান। আমাকে নাকি কামিজ, ওড়নাতে লাঠির উপর কাপড় পেঁচানোর মত লাগে।

সারাদিন রুমে বসে ভাবছি… কী এমন দোষ করলাম যে আমার উপর এত কঠোরতা! কিছুই তো বলি নি! উনারা আমাকে ভালোই বাসে না। আমাকে তো ঘর থেকে বের হয়েও যেতে বলেছে। আমিই সকালে উঠেই চলে যাব। সারাদিন মা খেতেও দিল না। রাগ হচ্ছিল তখন মায়ের উপর। এত আদর করতো এসব কিছু ভুয়া তাহলে! দোষ করেছি শাস্তিও দিচ্ছে, তাই বলে এত নির্দয় উনারা, মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে।

রাতে ঘুমিয়ে পড়লাম ভাবতে ভাবতে। সকালে ঘুম থেকে ভোর পাঁচটায় উঠলাম। কলেজ ব্যাগে একটা ড্রেস আর কলেজের সব বইখাতা নিলাম। আর কিছু নেওয়ার মত পরিস্থিতি নেই। ঠিক করতে পারছি না কোথায় যাবো।

আস্তে আস্তে দরজা খুলে বের হয়ে গেলাম। কারো নাম্বার আমার কাছে নাই, ফোনও নাই। এত সকাল সকাল কোথায় যাব! দোকান থেকে রিয়াদকে কল করে সব বললাম। ওর সাথে কথা বলে একেবারে হতাশ হয়ে গেলাম। ও খুব বিরক্ত আমার উপর। রিয়াদ বলল, প্লিজ বাসায় যাও তুমি। আমাকে বিপদে ফেলো না।

আমার কান্না পাচ্ছে, গলা বন্ধ হয়ে আসছে ওর কথা শুনে। শুধু “রাখি” বলে ফোনটা রেখে দিলাম।

২.
আমার বেস্ট ফ্রেন্ড সোনিয়ার বাসায় চলে আসলাম। আমাকে দেখে খুব অবাক সনি, সাথে আবার ব্যাগ। সব শুনে ও রিয়াদকে কল দিয়ে বকাবকি করছে।

রিয়াদ উল্টা সনিকে বলল, “তোমার বান্ধবী বাসা ঠিক রাখতে না পারলে কি সেটা আমার অপরাধ? তোমরা কী করবা ভাবো। আমার ফ্যামিলিতে বাবা-মা ভাই আছে। আমাকে প্লিজ তোমরা এসবের মধ্যে জড়িয়ো না।”

সোনিয়া আমার উপর রাগ হয়ে গেল, দেখলি তো রিয়াদ এখন ভাগতে চাচ্ছে। তুই বাসায় চলে যা। আন্টি-আঙ্কেলকে সরি বল। আর রিয়াদকে ডিলিট করে দে।

আমি হাউমাউ করে এবার কান্না শুরু করলাম সোনিয়াকে জড়িয়ে ধরে।

সোনিয়া বলল, আচ্ছা তুই এখানেই থাক, দেখি আমি কী হয়। আর ভাব তুই, মন চেঞ্জ হলে কী করবি তখনই বুঝতে পারবি।

"হিন্দি গান ‘চিগি বিগি’ ছেড়ে নাচছে।"
“হিন্দি গান ‘চিগি বিগি’ ছেড়ে নাচছে।”

সেনিয়া একটা অর্ধভাঙা পুরোপুরি রংচটা মোবাইল সেট আর সিম এনে আমার হাতে দিয়ে বলল, রিয়াদের সাথে ফাইনাল কোন কথা থাকলে বলিস।

দুপুরের দিকে মা সোনিয়ার ফোনে কল দিল। সোনিয়া মাকে আশ্বস্ত করল, “আন্টি ও এখানেই আছে। না, না ওই ছেলের ফোন বিথী ধরেই নি। যার জন্য এত কিছু তার চেহারাও ও দেখতে চায় না আর। ও আসলে বুঝছে বাবা মা কী জিনিস। কিন্তু মনটা খারাপ তো তাই এখনই বাসায় যেতে চাচ্ছে না।” এত সব মিথ্যা কথা বলল যে, সোনিয়ার উপর অনেক রাগ হল আমার। বললাম, “তোর বাসা থেকে বের করে দিতি, মিথ্যা কথা বলার কী দরকার ছিলো মাকে? তুই যখন চাসই না, আমি চলে যাচ্ছি।”

সোনিয়া বলল, আরে গাধা আন্টি যাতে না ভাবেন তুই ওই ছেলের সাথে ভেগে গেছিস তাই এসব বললাম। আন্টির সাথে অন্ততঃ আমার সম্পর্কটা ভালো থাকলে তোরই ভালো।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। ফোনটা হাতে নিয়ে রিয়াদকে কল দিলাম। মনে হচ্ছে রিয়াদ অভিমান করে রাগ দেখাচ্ছে। ও আসলে আমার কথা ভাবছে। তাই টেনশনে আমাকেই বকছে।

কল হচ্ছে, একবার কল ধরে আমার কণ্ঠ শুনে কেটে দিল।

৩.
তিনদিন হচ্ছে সোনিয়ার বাসায় আছি। সোনিয়ার বাবা আর্মি আফিসার, খুব রাগী আঙ্কেল। প্রথম দিন ভালো ভাবেই কথা বললেন। দুই দিন ধরে কথাই বলছেন না। আমি সালাম দিলে চোখে মুখে একটা বিরক্তি ভাব দেখাচ্ছেন। বুঝতে পারছি আঙ্কেল আমার এখানে থাকাটা ভালো ভাবে নিচ্ছেন না। তবুও আমি সালাম দেই আঙ্কেলকে।

প্রথম দিন আঙ্কেল অনেক গল্প করলেন খাবার টেবিলে। হাসি হাসি মুখেই অনেক কথা হলো আমার সাথে। আঙ্কেলের যে এমন গম্ভীর রূপ আছে, আগে দেখে মনে হয় নি কখনও। বাসার কর্তা বলেই হয়তো এই বাসায় আমার থাকাটা আঙ্কেলের কাছে দৃষ্টিকটূ লাগছে। ব্যাপারটায় একটু কষ্ট হচ্ছে আমার। কিন্তু আমিও হয়তো সোনিয়াকে আমার বাসায় নিয়ে গেলে আব্বু আম্মু এমনটাই করতেন। আমি তাদের নিজের মেয়ে তাও কত কষ্ট দিচ্ছেন আর এটা তো সোনিয়া। সোনিয়া ওর বাসার এসব সমস্যা আমাকে বলতে পারছে না।

আন্টি আমাকে বললেন, “বাবা-মায়ের সাথে রাগ করে কী হবে মা? যাও বাসায় যাও মা। তোমার আঙ্কেল আবার খুব রাগী মানুষ। উনি বাবা-মায়ের সাথে রাগ করা একদম পছন্দ করেন না।” আমি আন্টিকে শুধু বললাম, আচ্ছা আন্টি। সোনিয়া আমার পাশে এসে বসলো। বলল, “শোন, মন খারাপ করিস না। তোকে বাসায় যেতে হবে না। তুই আপাতত হোস্টেলে উঠতে পারিস। দেখ সময় যাক, তখন সব কিছু নরমাল হয়ে গেলে বাসায় চলে যাস।”

আমি রেগে গেলাম, তুই আমাকে বাসায় যাওয়ার কথা বলিস না। আর হোস্টেলে যে উঠবো, একা কীভাবে থাকবো?

সোনিয়া আমার চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলল, আরে আমাদের ক্লাসের রাকা তো ফার্মগেট হোস্টেলেই থাকে। আমাদের ক্লাসের অনেকেই থাকে হোস্টেলে। থাকতে থাকতে সমস্যা হবে না আর। চল আমার সাথে, দেখে আসি থাকা যায় কিনা। না পারলে অন্য কিছু ভাবা যাবে।

৪.
আমার খারাপ লাগল না হোস্টেলের আইডিয়া। আমি রেডি হতে উঠে গেলাম। ওয়াশ রুমের আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল। কাঁদলাম অনেকক্ষণ। কেঁদে কেটে মুখে চোখে পানি দিয়ে বের হলাম ওয়াশ রুম থেকে।

আন্টি খেতে দিয়েছেন। খাওয়া শেষ করে সোনিয়ার সাথে হোস্টেল দেখতে বের হলাম। ফার্মগেটে হোস্টেলের অভাব নেই। কিন্তু কম খরচের হোস্টেল দরকার আমার। খুঁজতে খুঁজতে ‘চারুলতা’র সন্ধান পেলাম। এখানে আমাদের কলেজের অনেকেই থাকে।

সোনিয়া এর মধ্যে আম্মুকে জানিয়ে দিয়েছে আমি হোস্টেলে উঠব, বাসায় যেতে চাই না। আমার মা বাবার চেয়ে নরম হৃদয়ের মানুষ। সোনিয়াকে বলেছেন আমার কলেজের ফি আর কলেজ বাসের টাকা দিয়ে দিবেন সময় মতো। ওটা নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে না। আমি যেন অন্তত পড়ালেখাটা করি। আশা করেছিলাম মা হয়তো হোস্টেল খরচও দিতে চাইবেন। উনি একবারও ভাবলেন না আমি হোস্টেল খরচ কোথায় পাব!

মোহাম্মদপুরে একটা টিউশনি করি, ওখানে তিন হাজার টাকা পাই। আমার ছাত্রীর নাম মৌমিতা। আমি মৌমি বলেই ডাকি। ক্লাস টেন-এ পড়ে। আমার চেয়ে এক বছরের ছোট হবে বা আমাদের বয়স একই হতে পারে। মোটাসোটা বলে আমার চেয়ে অনেক বড় মনে হয় মৌমিকে। ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রি পড়াই। সাইন্সের স্টুডেন্ট ছিলাম বলে কোন রকম টিউশনি পাওয়া যায়। এটার ভরসাতেই হোস্টেলে উঠবো।

বাবা-মা ঢাকায় আছেন তবু হোস্টেলে উঠতে হচ্ছে বলে কিছুটা ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। হোস্টেলে ভর্তি হতে লোকাল গার্ডিয়ান লাগবে। কেউ হতে চাচ্ছে না। আমার বন্ধুরা যারা আছে তাদের বলতেও চাই না এসব। সোনিয়ার বয়ফ্রেন্ড তো সোজা না বলে দিল। পারবেই না। রিয়াদ ফোন ধরে না। তাই নিরূপায় হয়ে মেসেজ দিলাম:

tmr samanno help chai. voy nai
tmk r chai na. tmr upr kono jhamalaw
hobey na. just amr hostel a local guardian
lagbey tai tmk reqst krchi tmi local
guardian hoa hostel a vortir bebosthata
korey daw. erpor r jalabona tmk.

মেসেজে কাজ হলো। রিয়াদ রিপ্লাই দিল:

ok. ami aschi. farmget asey call dicchi.
but i hav no tim… so amr tim nosto korona
kono vabey.

মেসেজ পরে খুব রাগ হচ্ছিল। কষ্ট পাচ্ছি না এখনো। আসলে সময় পাচ্ছি না কষ্টের কথা ভাবার। এখন আমাকে আগে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। এর চেয়ে পড়ালেখা বাদ দিয়ে বাপ-মায়ের ঘরে হাড়ি-পাতিল মাজাও সম্মানের কাজ। কিন্তু উপায় নাই, যাব না আর বাসায়।

সোনিয়া আমার বাসায় গিয়ে আমার কাপড় আর বইয়ের ব্যাগ নিয়ে আসলো। মা নাকি নিজেই সব গুছিয়ে দিয়েছে। কিন্তু একবারও বাসায় ফিরে যেতে বলে নি। ফোনও দিল না আমাকে। আমি কেন উনাদের কল দিব! তাই আমিও দিলাম না ফোন। সোনিয়ার হাতে দুই হাজার টাকাও দিয়েছেন মা।

৫.
রুমা আপু আম্মুর কাছে সব শুনে আমার নাম্বার নিয়ে ফোন দিলেন আমাকে, “বিথী কই তুমি? হোস্টেল পাইছো? কোন হোস্টেল?” রুমা আপু মাঝে মাঝেই আমাদের বাসায় আসতেন, গল্পের বই নেওয়ার জন্য। আপু একটা এনজিওতে চাকরি করেন। আমার আর রুমা আপুর সখ্য গল্পের বই থেকেই। আমি প্রায়ই ছাদে বসে গল্পের বই পড়তাম। আপু ছাদে কাপড় মেলতে আসতেন। তখনই টুকটাক কথা থেকে আমার কাছে বই পড়ার জন্য চাইতেন। বইয়ের সুবাদে আপু আমাদের বাসায় আসতেন।

আমরা প্রায় বিকালে গল্প করতাম। আপুর বয়স প্রায় ৩৪। বিয়ে হয় নি এখনও। আপুর ফ্যামিলিতে মেয়েদের পড়ানোর রেওয়াজ কম। আপুই সবচেয়ে শিক্ষিত ফ্যামিলির মেয়েদের মধ্যে। তাই বর হিসেবে শিক্ষিত ছেলেই চান। কিন্তু বাসা থেকে যে সব প্রস্তাব আসে, উনাদের সবাই আপুর চেয়ে কম শিক্ষিত। তাই বিয়েটা ঝুলে আছে। এই নিয়ে আপু আর আমি আলোচনাও করতাম, মানুষ আসলে মেয়েদের মন বোঝে না।

বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর রুমা আপুর ফোনটা পেয়ে অনেক ভালো লাগছে। কেউ আমাকে অন্তত গুরুত্ব দিচ্ছে। আমি আপুকে বললাম, আপু আমি চারুলতা হোস্টেলে উঠব। ফার্মগেটেই।

রুমা আপু উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন পরিবেশ ওখানকার?

আপুর আমাকে নিয়ে চিন্তা দেখে ভালো লাগছে। বললাম, আপু কম টাকায় হোস্টেল খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম চারুলতা-১। অস্বাস্থ্যকর অবস্থা হলেও, এখানেই থাকব। এছাড়া হাতে কোন অপশনও নাই।

আপু বলল, কলেজ ওখান থেকে কতদূর?

বললাম, হোস্টেল থেকে ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ল্যাগুনায় কম ভাড়ায় যাওয়া যায়। আমি অবশ্য কলেজবাসেই যাওয়া আসা করব। কিন্তু বাসা থেকে কলেজ বাসের টাকা নিয়ে, ল্যাগুনাতে যাতায়াত করলে বাড়তি কিছু টাকা হাতে থাকবে। সেটা দিয়ে কিছুটা সাচ্ছন্দে থাকতে পারবো হয়তো। এসব দিক থেকে ফার্মগেট ভালো হোস্টেল থাকার জন্য। তাই এখানেই উঠব। এসব ঝামেলা শেষ করে তোমাকে ফোন করব। এখন রাখি আপু, আমি এখনও হোস্টেলে উঠি নি।

রুমা আপু একটু নিশ্চিন্ত হওয়ার কণ্ঠে বললেন, “আচ্ছা খোদা হাফেজ, ভালো থাকার চেষ্টা করো। আর আমাকে সব জানাবা কী হলো।”

রিয়াদ হোস্টেলের সামনে আসলো। ওকে নিয়ে ভিতরে গিয়ে ভর্তি হয়ে গেলাম হোস্টেলে। ও আসার পর থেকে আমার সাথে অপরিচিতের মত আচরণ করছে। একবার তাকালও না আমার দিকে। হোস্টেল মনিটরের কাছে আমার ভাই হিসেবে পরিচয় দিল। ভর্তির ফরমালিটিজ শেষ করে আর দাঁড়ালো না রিয়াদ। প্রায় পালানোর ভঙ্গিতে চলে গেল।

ভাব দেখাল আমার জন্য তার সময় নষ্ট হচ্ছে। কিছু বললাম না যদি আবার বেঁকে বসে তাহলে হোস্টেল ভর্তি বাতিল হয়ে যাবে। এত কাছের মানুষটা পর হয়ে যাচ্ছে দেখছি, কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না!

৬.
মেয়েদের হোস্টেলে কিছু পুরুষের যাতায়াতের অনুমতি আছে। এদের মধ্যে মাল টানার ভ্যানওলারা অন্যতম। আমি হোস্টেল অফিস রুমে আমার মালপত্র নিয়ে বসে আছি। ভর্তি রিসিট দেখালাম ওয়েটিং রুমে। আমার রুম চার তলায়।

আশ্চর্য ব্যাপার হলো, অনেকগুলো হোস্টেল যাচাই বাছাইয়ের পর যখন এখানে সিট বুকিং দিলাম তখন আর সিট দেখার ঝামেলা করি নি। শুধু কম টাকার মধ্যে পাচ্ছি শুনেই নিয়ে নিয়েছি। ডাবল সিটের ভাড়া ৩২০০ টাকা খাওয়া সহ। ওয়েটিং রুমে বসে অংক কষছি রুমটা কেমন হবে, টয়লেট কই থাকবে, থাকতে পারবো তো! রুমমেটদেরও তো দেখলাম না। তারা যদি খুব খারাপ হয়!

ওয়েটিং রুমে আমার পাশে বসে আছে একটা মেয়ে। হোস্টেল মনিটর জিজ্ঞেস করল মেয়েটাকে, কোথায় বাড়ি তোমার?

সে খুব আস্তে করে বলল, পঞ্চগড়।

বসে থাকতে আমার খুব বিরক্ত লাগছে, মেয়েটার সাথে কথা বলার জন্য নাম জিজ্ঞেস করলাম। ও নাম বলল, রুমানা। আমাকে আমার নাম জিজ্ঞেস করল না। আমি তাও বললাম, আমার নাম ফারজানা বিথী, ফ্রেন্ডরা বিথী বলেই ডাকে। রুমানা মলিন ভাবে একটু হাসি দিল। আমি আবারো বললাম, কোথায় পড়েন?

রুমানা একটু সহজ হয়ে বলল, “সিটি কলেজে ভর্তি হয়েছি, এই প্রথম ঢাকায় আসছি। গোল্ডেন পেয়েছি এসএসসিতে। তাই আমার বাবা ঢাকায় ভর্তি করাইলেন। বাবা বাইরে আছে, সাথে আমার মামাও আসছে। হোস্টেলেও এই প্রথম আসছি।”

আমি বললাম, আমিও প্রথম আসছি, চার তলায়। তুমি কয় তলায়? একই ক্লাসে পড়ি শুনে আপনি থেকে তুমি বলা শুরু করলাম। রুমানা রিসিট দেখে বলল, নিচ তলার রুমে। সিট আর ফাঁকা ছিল না।

রুমানাকে বললাম, আমার একটা আপু ফার্মগেটের হোস্টেলে থাকতেন। ইডেনে পড়তেন আপুটা। উনার কাছে শুনেছিলাম রুমমেট খারাপ পড়লে কপালে শনি আছে। শুনেছি রান্না করেও খেতে হয়। কিন্তু আমি তো রান্নার মত এই দুবোর্ধ্য কাজ কখনোই করি না। তুমি পারো রান্না করতে?

রুমানা মুখ কুঁচকে বলল, না পারি না। আমি পড়ালেখায় ভালো তাই আমার বাবা মাকে বলে দিয়েছে, আমাকে দিয়ে কোন কাজ না করাতে। তাই শিখা হয় নি কাজ, শুধু পড়াশোনা নিয়েই থাকি সারাদিন।

রুমানার কথা শুনে একটু নিচু স্বরে বললাম, না আমি পড়াশোনায় অত ভালো না। তবু রান্নাটা শিখি নাই।

হঠাৎ খেয়াল পড়লো আমি তো মালপত্র ওঠানোর লোকের জন্য অপেক্ষা করছি। রুমানা কেন বসে আছে! জিজ্ঞেস করলাম, তুমি তো নিচতলায় তাহলে রুমে যাচ্ছো না কেন?

রুমানা ঘড়ি ঠিক করতে করতে বলল, আমি তোশকে শুইতে পারি না। তাই বাবা ফোম কিনতে গেছেন।

শুনে আমার একটু কষ্ট কষ্ট লাগছিল, আমার ফোম তো দূরে থাক তোশক আনার মত অবস্থাও নাই। তাই ডাবলিং বেড নিয়েছি। আমার আর কথা বলতে ইচ্ছা হলো না রুমানার সাথে। ওকেও আগ্রহী মনে হচ্ছে না। কেমন একটা অহঙ্কার দেখাচ্ছে আমাকে। তাই চুপ হয়ে গেলাম।

অপেক্ষা করছি কোন এক ভ্যানওলা এসে আমার মালপত্র উপরে ওঠায় দিবে। অফিসে বসে থাকা ক্যাশিয়ারের কাছে জানতে চাইলাম, আর কতক্ষণ লাগবে মালপত্র ওঠানোর লোক আসতে?

মধ্যবয়সী মহিলাটি বসে বসে ক্যাশে টাকা গুনছেন। আমি কথা বলার তিন মিনিট পর চশমার ফাঁক দিয়ে আমাকে একটু দেখে নিয়ে বললেন বসো, আসতেছে তো। এত শর্ট টাইম হইলে নিজেই ওঠাও।

এই মহিলার সাথে কথা বাড়িয়ে কোন লাভ হবে না তাই বসেই আছি। কথা বাড়ালাম না আর।

হোস্টেলে ঢোকার পথে দেখলাম প্রত্যেকটা হোস্টেলের সামনে কিছু ভ্যানগাড়ি রাখা আছে। সেই ভ্যানের উপর মাল টানার লোকরা বসে চা-বিড়ি খাচ্ছেন আর একে অন্যের সাথে গল্প করছেন। নতুন কোন মেয়ে আসলে তাদের মালামাল হোস্টেলের বিভিন্ন তলায় ওঠানোর কাজ করেন এই ভ্যানওলারা। মাঝেমধ্যে কেউ কেউ এক হোস্টেল থেকে অন্য হোস্টেলে চলে যায় সেখানে ভ্যানে করে মালামাল বহনের জন্য ভ্যানগুলো রাখা থাকে। এটাই তাদের জীবিকা। হোস্টেলভিত্তিক ভ্যানওলাদের সাথে হোস্টেল কর্তৃপক্ষের কন্ট্র্যাক্ট করা।

হোস্টেলে আসার পর ক্যাশিয়ারের কাছ থেকে শুনেছি এই ভ্যানওলাদের সার্বক্ষণিক কাজ হোস্টেলের মেয়েদের মালামাল পৌঁছে দেওয়া। এরা বাইরে কাজ করে না। ৭  থেকে ১০ জন ভ্যানওলার একটা করে হোস্টেলের দায়িত্ব। সারাদিনে এই কাজে বেশ ভালোই আয় হয় তাদের। ভ্যানঅলাদের বউদের অনেকে হোস্টেল ধোয়ামোছার কাজ করে। তাদের মোটামুটি একটা হোস্টেলভিত্তিক জীবিকা নির্বাহ চলছে বছরের পর বছর ধরে।

হোস্টেলের ভিতর কোন চুরি হলে এই ভ্যানওলাদের তলব পরে। কিন্তু যুৎসই কোন ফলাফল আসে নি। হোস্টেলে কোন কিছু চুরি গেলে তার সিংহভাগই আর পাওয়া যায় না। তবুও সবাই চুরি যাওয়া মাল ফেরত পাওয়ায় চেষ্টার কমতি রাখে না।

৭.
আমার বই আর জামাকাপড়ের ব্যাগ ছাড়া তেমন কিছুই নাই। হোস্টেলে উঠতে অবশ্যই বালিশ আর তোশক লাগে। শুধু চৌকি আর কাঠের এবড়োখেবড়ো একটা করে পড়ার টেবিল-চেয়ার ছাড়া কিছুই দেওয়া নেই হোস্টেল রুমে। আমি বুদ্ধি করে তাই ডাবলিং সিট নিয়েছি। যাতে তোশক নেওয়ার ঝামেলা থেকে রেহাই পাই। ভেবেই রেখেছি রুমে উঠে বিকালের দিকে বাইরে গিয়ে একটা বালিশ কিনব। আর হোস্টেলে থাকতে আনুষঙ্গিক কী লাগে তাও জানি না। রুমে উঠে যখন যা লাগবে তখন কিনব।

এসব নিয়ে আপাতত তেমন মাথাব্যথা হচ্ছে না। তবুও কপালে হাত দিয়ে বসে আছি অফিস রুমে। একটু একটু খারাপ লাগছে বাসার জন্য, মনে হচ্ছে মা একবার কল দিলেও তো পারতো!

৮.
হোস্টেল সুপার ঠিক বলা যায় না এনাদের। সবাই খালা বলেই ডাকে। চারুলতা-১ এর দায়িত্ব এমন ৫ জন খালার উপর। একজন মোটা করে খালা আমার দিকে আঙুল দিয়ে ডাকলেন, “ঐ তুমি কি চাইর পার্টিশন?”

আমি হা করে তার কথা শুনলাম। বুঝতে পারলাম না। উনি প্রায় কর্কশ কণ্ঠে আবার বললেন, নতুন আইছো নি? চাইর তলার রুমে? আমি অতি নম্রভাবে বললাম, হুম।

হঠাৎ একজন মাল টানার লোক অফিস রুমে ঢুকলো। খালাটা আমার দিকে দেখিয়ে বলল, এই মাইয়া চাইরতলার।

ওই ভ্যানওলা মামা, লুঙ্গিটা কাছা দিয়ে আমার দিকে একবার তাকালেন। তারপর আমাকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই আমার বইয়ের ব্যাগ মাথায় তুলে আর কাপড়ের ব্যাগটা হাতে নিয়ে বড় বড় পায়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন। আমি একটু অবাক হওয়ার সময় না নিয়েই তার পিছন পিছন ছুটছি।

ভ্যানওলা মামা উপরের ওঠার সময় বেশ উচ্চস্বরে “আপামনিরা আইতাছি, আমি চার তলা যামু” রিপিট করে করে এক কথা বারবার বলতে বলতে উঠছেন। পরে বুঝলাম পুরুষ মানুষ হোস্টেলে ঢোকার কারণে ওরকম ‘আপামনি’ ‘আপামনি’ গলাখাকারি ছিল আগমনের সতর্কবাণী।

চারতলার একটা পিচবোর্ডের গেটের সামনে আমার ব্যাগগুলো রেখে নিচে নেমে গেলেন ভ্যানওয়ালা মামা। মনে হয়, ভর্তি ফি এর সাথে আনুষঙ্গিক টাকাও রেখে দিয়েছে। তাই টাকা না নিয়েই চলে গেলেন।

আমি হোস্টেল রিসিট দেখে নিশ্চিত হলাম এটাই আমার রুমের গেট। মার্কার দিয়ে লেখা 4-C পার্টিশান। আবছা হয়ে গেছে লেখাটা, হাতের ছাপ পড়ে পড়ে। গেটের ভিতর ঢুকে একটা মিষ্টি হাসি দিলাম তিনজন মেয়েকে দেখে। একটা বেশ মোটাসোটা মেয়ে থ্রি কোয়ার্টার আর টি শার্ট পরা। আর দুজন মেক্সি পরে হিন্দি গান ‘চিগি বিগি’ ছেড়ে নাচছে।

আমাকে দেখে খানিকটা বিরক্ত হয়ে একজন বললেন, তুমি সেই লেদু নিউ কামার..?

আমি বেশ ইতস্তত অবস্থায় তেমন কোন উত্তর দিলাম না। মৃদু হাসার চেষ্টা করে মাথা নাড়িয়ে বললাম, “জী আপু।”

রুমের মোটা আপুটা আমাকে ডেকে বললেন, আমার নাম মিতা। আর ওরা পাশের রুমেই থাকে।

একটা মেয়ে বলল, হাই আমি টুসি। আর এটা রিজভিয়া আপু।

আমি একটু হেসে বললাম, আমার নাম ফারজানা। ডাক নাম বিথী।

মিতা আপু আমাকে ডাকলেন ভিতরে, “আসো এইটা তোমার বেড, মানে আমার সাথেই তোমার বেড। শেয়ারিং। কিন্তু যদি দেখি তোমার শোয়া খারাপ সাথে সাথে তোমাকে নিজের বিছানা গুটিয়ে মেঝেতে নিয়ে যাইতে হবে।”

আমি বোকার মতো উত্তর দিলাম, ও! মেঝেতেও কি সিট হিসেবে ভাড়া দেয়?

সবাই হাসতে লাগলো আমার কথা শুনে। মেক্সিপরা লম্বা আপুটা তো হাসতে হাসতে আমার উপর পড়ে ঝুলতে থাকলেন। আমি প্রায় পড়তে পড়তে খাটে ভর দিয়ে দাঁড়ালাম। উনি আমার উপর থেকে ভর ছেড়ে দাঁড়িয়ে মুখ ভেঙচি দিয়ে আমাকে পাটখড়ির সাথে তুলনা করে বললেন, “আরে তুমি তো পাটখড়ি!”

এরমধ্যে অল্পবয়সী একটা মেয়ে রুমে এসে বলল, রুমে নতুন মাইয়া কেডা? নিচে মকতার ভাইরে টাকা না দিয়া দাঁড় করায় রাখছে?

আমি তৎক্ষণাৎ কিছু না বুঝেই নিচে নেমে আসলাম। আমার ব্যাগ যেই মামাটা উঠিয়েছেন তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। ২০ টাকা দিয়ে মকতার ভ্যানমামাকে সরি বললাম। টাকা দেখে রেগে গিয়ে মকতার মামা অফিসে রুমের ক্যাশিয়ার কাম মনিটরকে বিচার দিলেন, দেখেন এতক্ষণ দাঁড় করাইয়া ২০ টাকা দিছে।

আমার রাগ হচ্ছিল, সামনে গিয়ে বললাম, বলেন আর কত দিব?

আরো ২০ টাকা দিলাম তাকে। টাকাটা হাতে নিয়ে আমাকে সালাম দিয়ে চলে গেলেন মকতার।

৯.
সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছি। চারতলা উঠতে হবে আবার, ভাবতেই ক্লান্ত লাগছে। সিঁড়িতে উঠতে উঠতে দেখি, প্রত্যেক তলার সিঁড়িতে পাখির মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে, কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে। মুখে হাত চেপে ধরে, কোনো গোপন কথায় ব্যস্ত তারা। পাছে কেউ শুনে না ফেলে তাই চোখকান খোলা রেখেছে। পাশ দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে একটু থামছে। শুধু যে পড়াশুনায় মগ্ন তা নয়, হোস্টেলের চারপাশে বিনোদনের কমতি নাই। কেউ ফোনে গভীর প্রেমালাপে মগ্ন অবার কেউ আড়াল থেকে সেই বাক্যালাপ শুনে অন্যদের কাছে এসে বলছে।

চারতলার সিঁড়িতে এক কোণে দাঁড়িয়ে হ্যাংলা-পাতলা একটা মেয়ে ফেনে কথা বলছে। একটু চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলছে। প্রেম করছে বোঝাই যায়। কিন্তু ও যতোই সতর্ক থাকুক ওর গোপন কথা শোনার জন্য ওঁৎ পাতা আছে। চারতলার সবচেয়ে বিচ্ছু মনে হলো টুসি আর রিজভিয়া আপুকে। উনারা লুকিয়ে কান পেতে দাঁড়িয়ে আছেন। দেয়ালের পাশ থেকে মেয়েটার কথা শুনছেন আর দুজনে হাসছেন।

কারো ব্যক্তিগত কথা শোনার পক্ষপাতি আমি তখনও ছিলাম না। আমি উঠে রুমে আসলাম। আমার পিছন পিছন টুসি আর রিজভিয়া আপু জড়াজড়ি করে রুমে ঢুকলো। হাসতে হাসতে প্রায় আমাকে ধাক্কা দিয়ে মিতা আপুর কাছে গেলো। লাবণীর ফোনালাপগুলো অভিনয় করে করে বলতে গিয়ে নিজেরাই হেসে অস্থির। মিতা আপুও হাসতে হাসতে মাটিতে গড়িয়ে পড়ছেন।

টুসি হাসতে হাসতে সবাইকে বলছে, “মিতা আপু, তোমাকে একবার শোনাইতে যদি পারতাম যে লাবণী ওর বয়ফ্রেন্ডকে কীভাবে “ভেভি” “ভেভি” বলে ডাকে! ইদানিং তো ফোনের সাথে সুপারগ্লুর মেতে লেগে আছে।”

মিতা আপু বলল, “হুমম ওর বাড়ি তো ফরিদপুর। ওই অঞ্চলের মানুষের উচ্চারণ প্রায় এমন। কিন্তু ওর বয়ফ্রেন্ড বোঝে তো ভেভি কী জিনিস!” এই কথা বলে সবাই আবার হাসতে লাগলো।

আঞ্চলিকতার কারণে বেবি ডাক ভেভি শোনায়। এই কথা শুনে আমারো একটু হাসি পেল। অন্য দিকে তাকিয়ে হাসছি যাতে উনাদের চোখে না পড়ি। যেহেতু এখনো উনাদের সাথে আমার কোন সখ্য তৈরি হয় নি, তাই হাসির সাথে সরাসরি সংযুক্ত হতে একটু লজ্জা লাগছে।

আরো কী কী যেন লাবণী তার বয়ফ্রেন্ডকে বলছিল ফোনে। সেসব হাসির কথা আমার কান পর্যন্ত আসলো না। টুসি আর মিতা আপু কানাকানি করে বলছে আর নিজেরাই হাসছে।

১০.
প্রায় দুপুর হয়ে গেছে। আমি আর উনাদের কথায় কান না দিয়ে আমার জিনিসপত্র গোছানো শুরু করলাম। বইখাতা টেবিলে। আর কাপড় ব্যাগে করে চৌকির নিচে।

আমার ওজন ৩২-৩৪ ওঠানামা করে। স্বাস্থ্যের এই বেহাল অবস্থা দেখেই মনে হয় আমার বেড পার্টনার মিতা আপু আমাকে নিয়ে অন্যদের মত তেমন একটা মজা করছেন না।

কোথায় কী রাখতে হবে, নিয়ম কানুন, কটার মধ্যে ফিরতে হবে হোস্টেলে, কোন টয়লেট কখন ব্যবহার করা যাবে, খাবার কোথায় খেতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি বলে দিচ্ছেন।

আমি রীতিমত মিতা আপুর চেলা টাইপ ব্যবহার করছি। হোস্টেলে মিতা আপুর অবস্থান লেডি ক্যাডারের মত। সব আপুরা মিতা আপুর কথা শুনছে। উনি যা বলেন তাতেই সায় দিচ্ছে। এমনকি মিতা আপু জোরে গান শুনলেও কেউ অবজেকশন দেয়ার সাহস পাচ্ছে না। হোস্টেলের পরিবেশে এসব সুবিধা হলেই তো চলে। এতসব আলামত দেখে আমি নিরাপত্তার পথে মিতা আপুর নেওটা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

১১.
দুপুরে খাবারের সময় সবাই যার যার প্লেট বাটি আর গ্লাস নিয়ে নিচতলায় ডাইনিং-এ যাচ্ছে।

রিজভিয়া আপু প্লেট হাতে আমাদের রুমে ঢুকে বললেন, “ও মিতা আপু, নতুন লেদুটার সাথে আলাপ করতে করতে তো খাইতেই ভুলে গেছো মনে হয়। চলো চলো।”

সমস্যা বাঁধলো আমি প্লেট বাটি গ্লাস কিছুই আনি নি বাসা থেকে। এগুলো যে লাগবে জানতাম না। আর জানলেও বাসা থেকে আনার কোন ওয়ে ছিল না। বাবার চোখ এড়িয়ে মা সোনিয়ার হাতে যা দিয়েছেন তাতেই আমি ধন্য। তাই আমি পা গুটিয়ে বসে আছি চেয়ারে।

আমাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে মিতা আপু বললেন, কী বসে আছ কেন? খাবা না?

আপু আমি প্লেট আনি নি।

আপু কিছু না বলে উনার ট্রাঙ্ক থেকে প্লেট বের করে আমার হাতে দিলেন। প্লেটটা নিয়ে আপুকে ধন্যবাদ দিলাম। মিতা আপু আর রিজভি আপুর সাথে নিচে ডাইনিং-এ নামলাম।

১২.
এইখানে এলাহী কাণ্ড। প্রচণ্ড কালো মোটা একজন খালা উঁচু চৌকিতে বসে আছেন। পাশে আরো দুজন সিনিয়র খালা। তারা একজন আরেকজনের উঁকুন বাছছেন। বড় মেইন রান্না খালাটার পাশে রাখা বড় বড় দুইটা কড়াই। একটাতে মাছের তরকারি। আরেকটায় ভাজা মাছ রাখা। খালাদের সারা শরীরে, জামাকাপড় পর্যাপ্ত ময়লায় ভর্তি। দেখে মনে হচ্ছে, রান্নার পর আর গোসল করেন নাই খালারা।

টেবিলে ভাত সাজানো। প্লাস্টিকের ঝাজরি দিয়ে ঢাকা আছে। যার যতটুকু দরকার ভাত নিতে পারবে। কিন্তু তরকারির ক্ষেত্রে খালার পাশে রাখা কড়াইয়ের সামনে লম্বা করে দাঁড়াচ্ছে সবাই। সিনিয়র খালাটা কড়াইয়ের ঢাকনা একটুখানি খুলে কাউকে তরকারির সাথে মাছ দিচ্ছেন, আর কারো প্লেটে ভাজা মাছ দিচ্ছেন।

এসব দেখে বাসার কথা খুব মনে পড়ছে আমার। মা নিজে হাতে খাইয়ে দিতেন। আমি মাছ খাই না বলে যেদিন মাছ ছাড়া কিছুই থাকতো না সেদিন মা কড়া করে মাছ ভেজে চুলার নিচে রেখে দিতেন। মাছের তরকারিতে গন্ধ লাগে আমার। কিন্তু কড়া করে মাছ ভাজলে ওই গন্ধটা লাগে না।

সুখে থাকলে আসলেই ভূতে কিলায়। কেন যে অমন আত্মকেন্দ্রিক, সুবিধাবাদী ছেলের সাথে প্রেম করে বাবা-মাকে ক্ষেপালাম! নিজেই বুঝতে পারছি না। এসব ভেবে আর কী লাভ। তাই তরকারির জন্য আপুর পিছনে লাইনে দাঁড়ালাম।

একে তো মাছে চির-অভক্তি আমার তার উপর তরকারিতে টলটলে ঝোল টইটম্বুর। মাথা ঝিম ঝিম করছে। নিরূপায় হয়ে শুধু ডাল দিয়ে ভাত খেলাম। যারা তরকারিতে মাছ খায় না তারা আগেই ভাজা মাছের অর্ডার দিয়ে রাখে।

মিতা আপু আমাকে বললেন, থাক এখন খেয়ে নাও, খালাদের বলে দিব কাল থেকে তোমার জন্য ভাজা মাছ রাখবে।

মিতা আপু খাওয়ার পর রান্নার সিনিয়র খালাকে আমাকে দেখিয়ে বললেন, খালা ও নতুন আসছে, চারতলায়। আমার বিছনায় বেড নিছে। বিথীর জন্য এখন থেকে ভাজা মাছ রাইখেন।

(কিস্তি ২)

More from নওয়াজ ফারহিন অন্তরা

হোস্টেল (৪)

ঝর্না আপু তার একটা পা আমার কোলের উপর দিয়ে শুয়ে শুয়ে মুভি...
Read More