(আগের কিস্তি)

১৩.
ছোট বেলা থেকেই রাতে একা ঘুমানোর অভ্যাস আমার। রুমে একা থাকতেই ভালো লাগে। কিন্তু আজ রাতে রুমের সাথে বেডও শেয়ার করতে হবে, একটু অস্বস্তি লাগছে। অপরিচিত মানুষের সাথে ঘুমানোটা ঝামেলার।

খাওয়ার পর পানি খাওয়া হয় নি। মিতা আপুর পানির বোতল থেকে পানি খেলাম। আপু বললেন, ডাইনিংয়ে ফিল্টার রাখা আছে ওখান থেকে বোতলে পানি ভরে রুমে রাখবা।

অনুমতি না নিয়ে আপুর বোতল থেকে পানি খাওয়া ঠিক হয় নি এটা  মিতা আপুর বোতলে পানি রাখার কথা শুনে বুঝতে পারছি। তাই মাথা নেড়ে বললাম, আচ্ছা আপু।

খুব ক্লান্ত লাগছে, সারাদিন রেস্ট পাই নি। পড়ার টেবিলের সামনে রাখা চেয়ারটা টেনে একটু বসলাম। বিছানায় গিয়ে শুতে ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু তোশক, বালিশ, বিছানার চাদর কোনটার মালিকানাই আমার না। তাই ইতস্তত লাগছে।

মিতা আপু খাটে আসন করে বসে খাটের সাথে লাগানো টেবিলে রাখা কম্পিউটারে DX-Ball খেলছেন। অনেকক্ষণ পর আমাকে বসে থাকতে দেখে হয়তো আপুর দয়া হলো একটু! কিন্তু একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার খেলায় মন দিলেন। আমি চেয়ারের হ্যান্ডেল ধরে অর্ধবন্ধ চোখে কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে আছি। ঘণ্টাখানেক পর আপুর টনক নড়লো। আমাকে বিছানায় গিয়ে ঘুমাতে বললেন।

আমি সেই অনুমতির অপেক্ষাতেই ছিলাম। হ্যাঁ না কিচ্ছু না বলেই সোজা বিছানায় একটু জায়গা ঠিক করে সটান হয়ে শুয়ে পড়লাম। মিতা আপু তার এক্সট্রা বালিশটা আগিয়ে দিলেন আমাকে। বললেন, নাও বালিশ তো আনো নি আপাতত আমার বালিশ মাথায় দাও। কাল কিন্তু কিনে নিও। তোমার মাথায় আবার উঁকুন টুকুন নাই তো?

উনার কথা শুনে গা জ্বলে গেল আমার। আমাকে অপমান করছেন বুঝতে পারলেও করার কিছু নাই। তাই কথার কোন শক্ত জবাব না দিয়ে বললাম, না উঁকুন নাই।

মিতা আপু একটু ভাবিস্ট কণ্ঠে বললেন, কী শ্যাম্পু দাও তুমি? মিনি প্যাক? সানসিল্ক দাও নাকি?

আরে! অদ্ভুত প্রশ্ন শুনে মেজাজটাই খারাপ হয়ে যাচ্ছে। একটা বালিশ দিয়ে কত রকম উল্টাসিধা কথা বলছে এই মেয়ে। না হয়, বালিশ বিছানা আনি নি তাই বলে আমাকে দেখে কি বোঝা যায় না আমি কেমন ঘরের মেয়ে। তা না হয় হলো, তবুও তো মানুষ এরকম অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে না কাউকে এমন স্বল্প পরিচয়ে। মাথা ঠাণ্ডা না রেখে কোন উপায় নাই আমার এখন তাই উত্তরই দিচ্ছি না।

উনি আবার বললেন, কী ঘুমাচ্ছো না কি? কোন শ্যাম্পু দাও তুমি?

বাধ্য হয়ে মুখ খুললাম, বেশ উচ্চস্বরে বললাম, না সানসিল্ক বাপের বয়সেও দেই নি। আমি প্যান্টিন অথবা ডাভ ব্যবহার করি।

এখন কোনটা ব্যবহার করো। প্যান্টিনের কোনটা দাও?

নমনীয় কণ্ঠে বললাম, প্যান্টিনের হেয়ার ফল।

যাক তাহলে তোমার মাথায় ড্যানড্রাফ নাই। আমার ডাক্তার বলেছে ড্যানড্রাফ ছোঁয়াচে। তাই চিন্তায় ছিলাম। তুমি শুধু শ্যাম্পু দাও, কন্ডিশনার-টনার কিছু দাও না কখনো?

একটু ত্যাড়া উত্তর দিলাম, আপনিও কি শ্যাম্পু ব্যবহার করেন চুলে?

মিতা আপু আমার দিকে ভিলেনের মতো তাকালো। আর উনার DX-Ball গেমের বল ডেঞ্জারের মুখোমুখি হওয়ায় উনি একটা লাইফ হারালেন। আমি মনে মনে শান্তি পাচ্ছি। লুকটা দিয়ে চোখ ছোট ছোট করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমার কি আমার চুল দেখে মনে হয় আমি জীবনে শ্যাম্পু দেই নাই?

আমি একটু মজা পাচ্ছি, কেমন ফুরফুরে লাগছে। খুব ভদ্রকণ্ঠে আপুকে বললাম, আরে না না। আসলে আপু আমি তো চশমা পড়ি তাই দূর থেকে চশমা ছাড়া ঘোলা ঘোলা দেখি। এই জন্য আপনার চুলগুলি ময়লা, জটাবাঁধা, তেলচিটচিটে লাগছে। সরি আপু, চশমা ছাড়া এমন ভুল দেখার সমস্যা আমার দুই বছর আগেও একবার হয়েছিল।

মিতা আপু বেশ অগ্নিচক্ষু করে বলল, ভেরি স্মার্ট, ভালো! কালই চোখটা ঠিক করাবা ডাক্তার দেখিয়ে। তা না হলে ঘুমানোর সময়ও চশমা এটে ঘুমাতে আসবা। এই ভুল যেন আর না হয় তোমার এবং তোমার চোখের দুজনের জন্যই ওয়ার্নিং দিলাম।

কোমল ভাবে বললাম, আচ্ছা আপু। আমিও সেটাই ভাবছি। চোখের এমন সমস্যা হলে তো সারাজীবন আমাকে ভুগতে হবে।

মিতা আপু কোন উত্তর দিচ্ছে না দেখে খুব মজা পাচ্ছি। আপু আবার খেলায় মন দিযেছে।

আমি উল্টো পাশে শুয়ে বালিশটা মাথায় দিয়ে এপাশ-ওপাশ করছি। বিছানায় শুয়ে আছি ঘুম আর আসছে না। কানের পাশে DX-Ball-এর ঢুশ ঢাশ শব্দে ঘুম আরো কেটে যাচ্ছে।

হঠাৎ মিতা আপু জিজ্ঞেস করলেন, এই বিথী তোমার বাড়ি কোথায়? কেউ আসে নি তোমার সাথে? ঢাকায় কি প্রথম আসছো?

ইচ্ছে হচ্ছে না এসব প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে। তবু করার কিছু নাই। কিছু একটা সবাইকেই বলতে হবে। এখন তো কেবল শুরু। মন খারাপ করে বললাম, ঢাকাতেই। আর এই প্রথম না, জন্ম থেকেই ঢাকা আছি। এছাড়া কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয় নি এখনো।

উনি আমার ট্রাউজার ধরে টানতে টানতে বললেন, তাহলে এইখানে কেন আসছো? তোমর বাবা-মা কই থাকে? তুমি তো বালিশ, বিছানা, হাড়ি-পাতিল, বালতি-বুলতি কিচ্ছুই আনো নি।

আমি আর আপুর দিকে ফিরলাম না। ওইভাবে শুয়ে শুয়ে বললাম, আমার বাবার সরকারি চাকরি, উনি বান্দরবান বদলি হয়ে গেছে।
পুরোপুরি মিথ্যে বললে এই মহিলাকে অনেক কিছু বলতে হবে। আর মিথ্যে বলতে ক্লান্ত লাগে আমার। আমি সবটা সাজিয়ে বলতে পারতামও না। তাই এটাই মোক্ষম হলো। সত্যমিথ্যার মাঝামাঝি থাকলাম।

মিতা আপুর কিউরিসিটির মুখে ভাটা পড়লো। আবার কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে বললেন, তাহলে তো তোমার বেশ কষ্ট হবে। শহরের পরিবেশে থেকে বাবা-মায়ের সাথে থেকে এখন হঠাৎ আলাদা থাকা। ঠিক হয়ে যাবে থাকতে থাকতে। মন খারাপ করো না। ঘুমাও তুমি। সরে ঘুমাইয়ো, আমার জন্য যেন জায়গা থাকে।

আমি বললাম, আপনি ঘুমাবেন কখন?

আপু বললেন, দেরি আছে। আমি ইডেনে পড়ি, ক্লাস করি না তেমন। সারা রাত জাগলেও সমস্যা নাই। দেরিতে উঠবো সকালে।

আমি আর কথা বাড়ালাম না। ঘুমানোর জন্য চোখ বন্ধ করলাম। ঘুম আসছে না। এর তো ক্লাস নাই, আমার তো আছে। সকাল সকাল ঘুম থেকে আবার উঠতেও হবে। ফোনটা হাতে নিলাম। মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু মা কল না করা পর্যন্ত আমিও করবো না। আর সোনিয়াটা এত খচ্চর যে, আমাকে দিয়ে যাওয়ার পর একবার মাত্র খবর নিয়ে উধাও হয়ে আছে। ফোনটাও অফ রেখেছে! আমি আর ওকে কল দিব না। সবগুলি স্বার্থপর নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত। চোখ থেকে পানি গড়িয়ে বালিশে পড়ছে। বালিশ ভিজে যাচ্ছে দেখে আমার দুঃখ আরো বেড়ে গেল। এই পৃথিবীতে মনে হয় আমি সবচেয়ে দুঃখী। তাই আরো কান্না পাচ্ছে।

১৪.
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম মনে নেই। বিকট শব্দে বালিশের নিচ থেকে ফোনের অ্যালার্মের ক্রিং ক্রিং আওয়াজ। মিতা আপু তো চিৎকার করছে ঘুমের ঘোরে, আরে উঠো উঠো বিথী। নয় তো তোমার এই অ্যালার্ম পুরা হোস্টেলের মেয়েদের ঘুমের বারোটা বাজাবে।

আমি লাফ দিয়ে উঠলাম, ভোর ৬টা বাজে কিন্তু রুমটা দেখে মনে হচ্ছে এখনো গভীর রাত। একফোটা আলো নাই। কাল রাতে আমাদের রুমের ঝুম্পা আপু রুমে ফিরে নি। বিকালের পর ব্যাগ নিয়ে কোথায় জানি গেল।

মিতা আপুর উপর দিয়ে উঠে চৌকি থেকে নামলাম। পায়ের কাছে চায়ের মগ ছিল। পা লেগে পড়ে গেল কাপে থাকা চায়ের অবশিষ্ট অংশ। ইশ, মানুষ এমন হয় যেখানে-সেখানে ফেলে রাখে খেয়ে! লুনা আপু একদমই গোছানো না। তার উপর বেশ অপরিষ্কার। পাটা ভিজে গেল। নাক সিটকে পা উঁচু করে বাথরুমের দিকে হাঁটা দিলাম। সকাল থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত দক্ষিণ পাশের বাথরুম ব্যবহার করা যাবে। বাথরুমের সামনে তিনজন কলেজ ড্রেস আর ব্রাশ হাতে দাঁড়িয়ে। আমিও হাতে ব্রাশ নিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম। আমার সামনে দাঁড়ানো মেয়েটা বেশ লম্বা। পিছনে ফিরে আমাকে দুবার দেখলো। তিনবারের বেলায় আমি বললাম, তুমি কোন কলেজে পড়ো?

মেয়েটা বলল, “ভিকারুন্নেসা কলেজ। তুমি কোন কলেজে? কোনে ইয়ারে?” মেয়েটা কলেজের নামটা একটু বেশি জোরে বলল মনে হলো।

আমি বললাম, শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজে পড়ি। আমি বিথী। তোমার নাম কী?

মেয়েটা বলল, আমার রাসফিনা। শর্ট ফর্ম রাসফি। তুমি আমাকে রাসফি ডাকতে পারো? কোথা থেকে এসেছো তুমি? স্কুলও কি ঢাকার বাইরে ছিল তোমার?

কথা বলতে বলতে লাইন ফাঁকা হয়ে গেল। আমি রাসফিকে বললাম, যাও, তোমার সামনে আর কেউ নেই লাইনে। নয় তো দেরি হয়ে যাবে।

রাসফি হাসলো। আমিও হাসলাম। বাথরুম থেকে যেই মেয়েটা বের হচ্ছিল সে হঠাৎ পানিতে পিছলে পড়ে গেল। আমাদের দুজনকে হাসি হাসি মুখে দেখে ভাবলো আমরা সেই মেয়েটা পড়ে গেছে দেখে হাসছি। ব্যাপারটা মোটেও তা ছিল না।

তবু মেয়েটা আমাদের উপর রাগ করে বলছে, সব ভাবে কী, নিজেদের রাণী মহারাণী। একটা মানুষ পড়ে গেল তাতেই বেশ মজা পেয়ে গেল।

তারপর রাসফির দিকে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা রাসফি, এই মেয়ে না হয় নতুন কিন্তু তুমি এত মজা কেন পেলা? তোমার আপুকে আমি বিচার দিব দাঁড়াও।

আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটা চলে যাওয়ার পর রাসফি উচ্চস্বরে হেসে বলল, আরে ভয় পেয়ো না। আমার আপুকে এর আগে কারণে-অকারণে নিশি বহুবার বিচার দিয়েছে। মেয়েটা একদম অজগ্রামের কিন্তু ঢাকায় এসে স্মার্ট হওয়ার চেষ্টায় আছে। স্টাইল করে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে তোমারই মত, হা হা হা।

রাসফির কথা ভালো লাগলো না আমার। বললাম, আচ্ছা যাও, আমার কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছে।

রাসফি বলল, আচ্ছা আগে তুমি যাও, আমার একটু দেরি হলে সমস্যা নাই।

আমি বাথরুমে এসে হাতমুখ ধুলাম, নিজের চেহারা আয়নায় দেখলাম, শুকিয়ে গেছি বেশ। তাড়াতাড়ি বের হয়ে গেলাম। বের হয়ে রাসফিকে ‘ধন্যবাদ’ বলে রুমে ঢুকলাম।

ব্যাগ থেকে কলেজ ড্রেস বের করে দেখি আয়রন করা নাই। ঝটপট পড়লাম, ব্যাগ গোছাচ্ছি। সাতটা বিশ বেজে গেছে। আটটায় ক্লাস শুরু। জুতাটা পরে সিঁড়ি দিয়ে প্রায় দৌড়ে নামলাম। ডাইনিংয়ের দিকে আর যেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। কলেজ ক্যান্টিন থেকে কিছু খেয়ে নিব।

মণিপুরি পাড়া এক নাম্বার গেট দিয়ে বের হলেই লেগুনা থাকার কথা। পেয়েও গেলাম লেগুনা। কিন্তু আমার মতো আরো মেয়েদের লাইন। সবাই একই কলেজের। হঠাৎ দেখি বিউটি। আমি বিউটি বিউটি ডাক দিচ্ছি। বিউটি পিছনে তাকিয়ে আমাকে দেখে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে বলল, কীরে এই কদিন কই ছিলি? কলেজ আসিস নাই কেন? এই খানে কইত্থেকে আমদানি হইলি? ভালোই হইলো, একসাথে কলেজ যাই চল।

বিউটি আমার হাত চেপে ধরে ভিড় ঠেলে আমাকে নিয়ে ধস্তাধস্তি করে লেগুনায় উঠল। লেগুনায় উঠে আমি আর বিউটি হাসতে হাসতে অস্থির। এইভাবে উঠতে হয়! বিউটি না থাকলে আজ আর কলেজ যাওয়া হতো না মনে হয়। লেগুনা থেকে নেমে ব্রিজ পার হয়ে দেখি কলেজের পিছনের গেট বন্ধ। সাতটা পঞ্চাশে বন্ধ করে দেয় এই গেট। এখন বিশ্ব ঘুরে সামনের গেট দিয়ে কলেজে ঢুকতে হবে। হাঁটা শুরু করলাম দুজনে। হাঁটছি না প্রায় দৌড়াচ্ছি। দশ মিনিট লাগবে সামনের গেট দিয়ে ঢুকতে। যাই হোক চুলের বেণি দুলিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে কলেজে ঢুকলাম। হাঁপাতে হাঁপাতে পিটিতে দাঁড়ালাম। পিটি শেষে ক্লাসরুমে ঢুকতেই বান্ধবীরা ছেঁকে ধরেছে। ওই কই ছিলি তুই? শিরীন ম্যাম তলব করেছে তোকে দুই দিন।

আমার তো ভয় লাগছে। মনে হয় সনি অথবা মা কেউ নিশ্চয় সব বলে দিয়েছে। এখন আমাকে আর টিচাররা পছন্দ করবে না। এখন কী হবে আমার।

১৫.
ইংরেজি ম্যাডাম ক্লাসে ঢুকলেন। হাতে ক্লাস টেস্টের খাতা। স্পিকারের সামনে দাঁড়িয়ে সনির রোল ডাকলেন খাতা দেওয়ার জন্য। তখনই সনির কথা মনে পড়ল আমার। না আজ সনি আসেই নি। এমন কখনো হয় না যে সনি কলেজ মিস করে। আজ এমন কী হল যে আসে নি। বের হয়ে কল দিব। এরপর আমার রোল ডাকলেন ম্যাম। আমি পাশ করেছি। পাশ আমি বরাবরই করি, ভালো রেজাল্টও আসে, কিন্তু ফেলের ১০০% আশঙ্কা থাকে ইংলিশ-এ। এই ইংরেজি বই আমি ভুলেও হাতে নেই না। আমার চিরতার রসের মতো লাগে ইংলিশ সাবজেক্টটা।

একটার পর একটা ক্লাস চলছে, আমার বিরক্ত লাগছে। মন বসছে না ক্লাসে। সনির কথা মনে পড়ছে। ওর কী হল। ফোন অফ ছিলো, ক্লাসেও আসলো না। টিফিন টাইমে বের হলাম আমি আর মারিয়া। বাকিদের সাথে কথা বলছি কম। যদি কোন কিছু জিজ্ঞেস করে ওরা!

সকালে কিছুই খাওয়া হয় নি, হোস্টেলের অখাদ্য খাবার রাতে পেটে দিয়ে আর কিছু খাই নি। একটা পুরি হাতে নিয়ে চিবাচ্ছি। মারিয়া বলল, কী রে তোর কী হয়েছে? মন কি খারাপ? উদাস হয়ে বইসা আছিস যে?

আমি বললাম, না এমনিতেই। সোনিয়া আসলো না আজ।

মারিয়া রেগে বলল, সারাদিন সনি সনি করিস কেন? জানিস শান্তার সাথে সনির গলায় গলায় ভাব। যেই মেয়ে তোরে হিংসা করে তার সাথে সনির দহরম-মহরম দেখতে পাস না?

মারিয়ার কথায় হাসলাম, হুমম, দেখছি। ওরা পাশাপাশি থাকে তাই এত ভাব। সমস্যার কী আছে? আমার এসব নিয়ে ঝামেলা নাই। শান্তার সাথে সনি তাল না দিলেই হলো। আর শান্তা হিংসুটে হলেও দুঃখী মেয়ে। তাই সনি ওর সাথে মিশে।

মারিয়া মুখ ভেংচি দিয়ে বলল, হ্যাঁ, দুনিয়ায় দুঃখী মানুষ বাইরা গেছে। তোর দুঃখ কেউ দেখে নাকি, তখন দেখিস। এখন রিয়াদের কথা বল। কী অবস্থা, কেমন চলছে তোদের কেমিস্ট্রি? পোলা তো পুরাই তোর জন্য দেওয়ানা।

আমি হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলাম। মারিয়া অবাক হয়ে গেল। বলল, আরে থাম থাম বুঝছি বুঝছি, ওই রকম ঝগড়া আমার আর আরিফেরও হয়। এই ব্রেকআপ হয় আবার ও আমাকে গিফট দেয়, সব ভুলে যাই। সো, তুইও সামনে বেশ বড়সর একটা গিফট পাচ্ছিস। এটা তো খুশির ব্যাপার, কান্নার কী হইলো?

আমি আরো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি। ঘণ্টা বাজলো। মারিয়া বলল, আচ্ছা অনেক হইছে রোনাধোনা, এবার ক্লাসে চল। তুই তো আবার পরিসংখ্যান ক্লাসে যাবি। চোখ মুছে ওঠ। ওই দেখ, টিনা হারামজাদিরা তোরে দেখতেছে। ওরা যদি বোঝে তাইলে সারা ক্লাস রটনা কইরা বেড়াবে। এটা চাস তুই?

আমি মারিয়ার হাত ধরে উঠে গেলাম। ক্লাস চারতলায়। পরিসংখ্যান ক্লাসটা কমার্সের মেয়েদের সাথে করতে হয়।

স্যারের প্যাক প্যাক শুনতে মন চাচ্ছে না। তবু ক্লাস হজম করলাম। নিচে এসে আবার ক্লাস। ল্যাব আছে আজ। মনে হচ্ছে শরীরের উপর দিয়ে বুলডোজার যাচ্ছে। ল্যাবে গিয়ে খুটখাট করছি। মারিয়া আর শিমলা নতুন ল্যাব স্যার জুনায়েদ স্যারকে নিয়ে হাসতে হাসতে আমার পাশে এসে দাঁড়াল। শিমলা আমাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, কীরে লেটুস পাতার মত চুপসায় আছিস কেন? শুনলাম তুই ছ্যাঁকা খাইছিস? তোরেও ছ্যাঁকা দেয় কোন ছেলে?

hostel2b2
ল্যাবে গিয়ে খুটখাট করছি। মারিয়া আর শিমলা নতুন ল্যাব স্যার জুনায়েদ স্যারকে নিয়ে হাসতে হাসতে আমার পাশে এসে দাঁড়াল।

হঠাৎ শিমলার উত্তম কুমার জুনায়েদ স্যার আমার পাশে এসে বলল কী হলো বিথী, তুমি একটা ল্যাব মিস করলে কেন? ওই দিনের টাস্কটা আমার কাছে অফ টাইমে বুঝে নিও। নয় তো পরেরগুলো কিছু বঝবে না।

আমি বিনয়ের সুরে স্যারকে বললাম, আচ্ছা স্যার।

স্যার যাওয়ার পর শিমলা আমার এক পাশের চুলের বেণি ধরে বলল, কোনো দরকার নাই তোর স্যারের কাছে যাওয়ার। আমি দরকার হইলে তোর বাসায় গিয়ে বুঝায় দিয়া আসবো।

আমি আর মারিয়া হা হা করে হেসে উঠলাম। আর শিমলা রাগে গট গট করে টিনার কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালো। আমি আর মারিয়া মজাই পাচ্ছি।

ক্লাস শেষ করে বিউটির জন্য দাঁড়িযে আছি মেইন গেটের সামনে। বিউটি কমার্সের আর আমি সায়েন্স বিভাগে তাই ক্লাস আলাদা। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব খুব ভালো। পরিসংখ্যান ক্লাসে আমাদের সখ্য। ওর বয়ফ্রেন্ড কুয়েত থাকে। আমার ফোনে কল দেয় দুপুরের দিকে। কলেজের টয়লেটে গিয়ে কথা বলে বিউটি। বিউটি হাত নাড়াচ্ছে। আমিও হাত নাড়ালাম। বিউটি আর আমি হাত ধরাধরি করে বের হয়ে হাঁটছি।

বিউটি জিজ্ঞেস করল, তুমি না কলেজ বাসে যাও? আর বাসা কি ফার্মগেটে নিয়েছো তোমরা?

আমি বললাম, না, আমি হোস্টেলে উঠেছি। বাবার সরকারি চাকরি, বদলি হয়ে গেছেন বান্দরবান। এইজন্য আমাকে হোস্টেলে উঠতে হল।

বিউটি বলল, আহারে, তাহলে তো অনেক কষ্ট হবে তোমার। আমি বোন দুলাভাইয়ের সাথে থাকি। আব্বা-মা মাদারিপুর গ্রামের বাড়িতেই থাকেন। আপা আমাকে অনেক আদর করেন। কিন্তু লিটনকে সহ্য করতে পারেন না। এইজন্য তোমার ফোন দিয়ে কথা বলতে হয়। আমার সাথে কথা না হলে ও আপার ফোনে করে দেয়। আর আপা রেগে যান। লিটন একদম এসব ব্যাপার বুঝতে চায় না। লিটন আমার চাচাতো ভাই, সেইজন্য সবাই জেনে গেছে আমাদের প্রেম।

আমি শুধু হুম হুম বলছি আর বিউটির কথা শুনছি। ফুটওভার ব্রিজ পার হয়ে লেগুনার জন্য দাঁড়ালাম। শত শত বাচ্চা-কাচ্চা কলেজ ছাত্র-ছাত্রীর ভিড়। বাস নয়তো লেগুনা একটা পেলেই উঠবে সবাই।

একটা BRTC বাস আসছে প্রায় খালি। আমরা হুমড়ি খেয়ে উঠলাম। আমি ছোটবেলা থেকেই বাসে উঠতে পারি না। অপরিচিত অথবা স্বল্পপরিচিত মানুষের গায়ের সামান্য ছোঁয়া লাগলেই আমার স্কিনে সমস্যা হয়। লাল হয়ে ফুলে যায়। ডাক্তার এটাকে স্কিন ডিজিজ অথবা এলার্জি বললেও টাচ এলার্জি নাম দেন নাই। কিন্তু এক অর্থে এটা টাচ এলার্জিই।

মানুষের টাচে টাচে আমি ডাচদের মত লাল হয়ে গেলাম। বিউটি আমাকে দেখে চিল্লিয়ে উঠল, ওমা কী হয়েছে তোমার মুখ হাত সব লাল হয়ে ফুলে গেছে দেখি!

আমি বললাম, এটা রোগ। আমার স্কিনে সমস্যা। কিছু করার নেই। ওষুধে তেমন কোন কাজ হয় না। তাই আর ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি।

বাস ব্রেক করতেই ব্যালেন্স ছেড়ে ছিটকে পড়লাম একটা পিচ্চির ঘাড়ের উপর। আদমজীর বুড়া বুড়া কলেজ বয়গুলি হো হো করে হেসে উঠল। আমি একটু লজ্জা পেলাম। ভাব দেখাচ্ছি কিছুই হয় নি। উঠে আমার জাগায় আবার দাঁড়ালাম। মণিপুরি পাড়া হোস্টেল গেট ২-এ নামা যায়। আমি আর বিউটি পারাপারি করে বাস থেকে নেমে গেলাম।

কাল সাতটায় এখানে থাকব বলে টা টা দিয়ে বিদায় নিলাম বিউটির কাছ থেকে।

১৬.
হোস্টেলের গেটে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে সোজা চারতলায় উঠে আসছি। গেটে তালা মারা। ওমা এখন আমি কী করব! আমার কাছে চাবি নাই।

রাসফির রুমের সামনে গিয়ে রাসফিকে খুঁজছি। কেউ নাই। একটা মেয়ে ইউসিসি কোচিং এর শিট একটা সামনে রেখে গুন গুন করে যাচ্ছে।

বের হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। দশ মিনিট পর পাশের রুমের রিজভি আপু বের হয়ে আমাকে চাবি দিয়ে বললেন, মিতা বাইরে গেছে, চাবি দিয়ে গেছে নাও।

আমি চাবিটা আপুর কাছ থেকে নিয়ে রুমে ঢুকেই সটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। খুব ক্লান্ত লাগছে। বাসায় থাকলে মা সাথে সাথে খাইয়ে দিতেন। আমি জামা-কাপড় ছাড়তে ছাড়তে খাই আর মা পিছন পিছন হাঁটতেন। আহা রে সেই সব দিন এখন স্বপ্ন। এত কষ্ট লেখা ছিল কপালে! ভাবতে ভাবতে চোখটা লেগে আসল।

হঠাৎ ফোনটা টেবিলের ভেতর থেকে বেজে উঠল। লাফ দিয়ে উঠে চাবি দিয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে ফোনটা বের করে দেখি ২১টা মিস কল। রিয়াদ এর নাম্বার থেকেই সবগুলি। খুব শান্তি লাগলো ফোনটা হাতে নিয়ে। পরক্ষণেই কান্না পেল। রিয়াদ যা করেছে এরপর আমাকে শক্ত হতে হবে। ওকে আমার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। নয়তো আমি ফোন ধরব না।

প্রায় আড়াইটা বাজে। খিদায় মরে যাচ্ছি। আপুর টেবিলের ওপর থেকে প্লেট নিয়ে ডাইনিংয়ে আসছি। সবার খাওয়া প্রায় শেষ মনে হচ্ছে। আমি এক চামচ ভাত নিয়ে রান্নাখালার কাছে ভাজা মাছ চাইলাম। মাছ নিয়ে ডাল দিয়ে কোনমতে খেয়ে রুমে উঠে আসছি। পানি আনতে মনে নেই আজকেও।

মিতা আপু রুমে নাই তাই উনার বোতল থেকে পানি খেয়ে শুয়ে থাকলাম। মনে হচ্ছে ঘুম আসছে চোখে। চোখ খুলে রাখার চেষ্টা করছি।

কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভেঙে দেখি আমাদের ছোট পিচবোর্ড পার্টিশনের এই রুমে প্রায় ১২-১৫ জন মেয়ে। অফিস থেকে এসেই এই রুমে সবাই। হাতে টিফিন বক্স, কারো হাতে ব্যাগ, ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরেই এই রুমে, কেউ কেউ ঘরের ছোট ছোট ড্রেস পরে বসে গল্প করছে। আমার চারপাশে এমন ভাবে সবাই বসে আছে, আমি উঠে বসবো এই স্পেসটা নাই।

হোস্টেলের মেয়েরা তুলনামূলক ছোট ড্রেস পরে থাকে হোস্টেলের ভিতর। যেহেতু এখানে শুধু মেয়েদের বসবাস তাই তারা তাদের পোশাক-পরিচ্ছদের সব শখই পূরণ করতে পারে হোস্টেলের ভিতরে। চোখেমুখে সদ্য স্বাধীন হওয়ার এক রকম চমক দেখা যায় এদের মধ্যে। অল্পতেই হাসে, মন খারাপে কেউ ভেঙে পড়ে আবার কেউ রাগে নিজের হাত কাটেও শুনেছি, অন্যের চুলও ছিঁড়ে নাকি!

কোনোমতে একটু উঠে বসলাম। চারপাশের সবাইকে দেখছি। আমি যে নতুন এসেছি এই রুমে তাই সবার চোখে একবার করে চোখ রেখে হাসি বিনিময় করছি। যেন ওদের কারণেই আজ আমি হোস্টেলে উঠলাম এই ভঙ্গিতে। কেউ কেউ নতুন মুখ আমার কাছে। কালকে দেখি নাই অনেককেই।

একজন নাম জিজ্ঞেস করলো, কোথায় পড়ি, বাড়ি কোথায়, বাবা কী করেন ইত্যাদি বায়োডাটা দিতে থাকলাম সবাইকে। কেউ আবার তার প্রথম হোস্টেলে আসার দিন ব্যক্ত করছেন।

এরমধ্যে ঝর্ণা নামের একটা আপু বললেন তিনি নাকি হোস্টেলে আসার পর তিনদিন ধরে কেঁদেছিলেন বাসার জন্য, তাও কিছু না খেয়ে। আমি যেন কান্নাকাটি না করি।
ঝর্ণা আপুর সাথে কথা বলে জানলাম উনি একটা এনজিওতে চাকরি করেন। বাড়ি বরিশাল। বয়স প্রায় ৩২-৩৪ হবে এখনো বিয়ে করেন নি। একটা ছেলেকে ভালোবাসেন। ছেলেটা বেকার ছিলো সেই সময়। ঢাকায় BRTC বাসে পরিচয় হয়েছিল ঝর্ণা আপুর সাথে। আপু বলল, ভাইয়াটার নাম রিহেল।

আপু আমার সাথে কথা বলছেন, অন্যরা নিজের নিজের মত কথা বলছে। যেন গল্পের আসর বসছে।

রিহেল নামটা বেশ আনকমন, শুনে আমারো ভালো লাগলো। প্রথম দেখায় ঝর্ণা আপু এত কথা বলছে দেখে আমার খুব অবাক লাগছিল। শুনতে বেশ ভালোই লাগছে অবশ্য। তাই হা করে শুনছি আর আপুকে গল্প বলতে উৎসাহ দিচ্ছি।

ঝর্ণা আপু বললেন, অফিসে যাচ্ছিলাম ফার্মগেট থেকে মহাখালি। তো, বাসে উঠে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। হাতে স্টিলের লম্বা টিফিন বক্স। কোন রকম দাঁড়িয়ে আছি। সেই সময়ও মহিলা সিটের আবির্ভাব ঘটে নি। তাই যে কেউ দাঁড়িয়েই চলাচল করতো সেই সময়। আমার সামনে ফর্সা চেহারার খাঁজকাটা নাক-চোখের রিহেল সিটে বসে আছে। আর আমি রড ধরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ বিজয় সরণীর দিকে বাস ব্রেক করলো, আমার ব্যালেন্স ফসকে গেল। হাতে রাখা ভাতের টিফিন বক্সের ঢাকনা কোনো ভাবে খুলে সব ভাত তরকারি পড়লো রিহেলের জামা-কাপড়-শরীরে।

এই কথা শুনে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল! আমি তো প্রবল আগ্রহে ‘তারপর’ ‘তারপর’ বলছি। আপুর চোখে হতাশা। আমার কথার কোন উত্তর দিচ্ছেন না। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে ঝর্ণা আপুর। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আপু বালিশ জাপটে ধরে চিৎকার করে কাঁদছেন।

সবাই নিজেদের গল্প রেখে আপুকে জড়িয়ে ধরে উনার রুমের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি কিছুই বুঝলাম না! কিন্তু বোঝার তীব্র আগ্রহ তাড়া করছে। ওই কান্নাকাটির মহড়ায় কাউকে জিজ্ঞেসও করতে পারছি না। রুমে দিয়ে আসতে আমিও সাথে গেলাম। ঝর্ণা আপুর রুমে ২০ মিনিট বসে থেকে সবাই আপুকে শান্ত করে যে যার রুমে চলে আসলো। আমি আর মিতা আপুও চলে আসলাম।

রুমে এসে অনেকক্ষণ খুটখাট করছি কিন্তু শান্তি পাচ্ছি না। কী এমন হলো যে আপু ওভাবে কাঁদলো! অনেক ভেবে শেষে  মিতা আপুকে জিজ্ঞেস করলাম। মিতা আপু তেমন আগ্রহ দেখালেন না। তবুও বললেন, ওই দিনের পর সরি বলে, রিহেল ভাইয়ার ফোন নাম্বার নিয়ে আপু কল করেছিলেন। উনাদের প্রেমও হয়েছিল। ভাইয়ার কোন চাকরি ছিল না। সৎ মা ছিল। আর সৎ মামার বাড়িতে মানুষ হয়েছে রিহেল ভাই। নিজের বাবা অসুস্থ ছিল কোন কাজ করতো না। ভাইয়া কোন রকম বিএ পাশ করে চাকরি খুঁজছিল। কিন্তু চাকরি তখনও মিলে নি। দুই বছর ভালোই ছিল রিহেল ভাই আর ঝর্ণা আপু। একদিন ঝর্ণা আপুকে রিহেল ভাইয়ের মামাতো বোন ফোন করে বলে, রিহেলের সাথে আমার বিয়ে হয়েছে সো, ওকে কোন রকম ফোন করবেন না আপনি। আপু প্রায় পাগল হয়ে গেল। হোস্টেলের মেয়েরা রিহেল ভাইয়ের মামার বাড়ি গিয়ে জানতে পারে, রিহেল ভাইয়াকে তার সৎ মামা ছোট বেলা থেকে মানুষ করেছে বলে কিনে ফেলেছে তার সৎ মায়ের কাছ থেকে। আর তাই বাধ্য হয়ে বিয়ে করতে হয় মামাতো বোনকে। তার কিছুদিন পর রিহেল ভাই তার বউকে নিয়ে নাকি পাকিস্তানে স্যাটেল হয়েছিল। এই ঘটনার পর থেকে ঝর্ণা আপু এমন পাগল পাগল আচরণ করেন। আর কাউকে পেলেই রিহেল ভাইয়ের কথা বলতে গিয়ে চিৎকার করে কাঁদেন।

আমার খুব কষ্ট হচ্ছে ঘটনাটা শুনে। আমারো কান্না পাচ্ছে। কোন রকম চোখের পানি সংবরণ করছি।

সন্ধ্যার পর বিস্কিট আর পানি খেয়ে আমি পড়তে বসছি টেবিলে। চারতলায় বয়সে সবচেয়ে ছোট আমি। আমাদের রুমে দুটা সিঙ্গেল আর একটা ডাবল বেড।

ডাবল বেডে আমি আর মিতা আপু, একটা সিঙ্গেল বেড তখনও খালি ছিল অরেকটা সিঙ্গেল বেডে ঝুম্পা আপু। ঝুম্পা আপু কমার্স কলেজে ১২ ক্লাসে পড়ে। সন্ধ্যার পর রুমে ঢুকে আমাকে দেখে অতিশয় বিকৃত চোখে ভ্রু কুঁচকে সিনিয়রিটির লুক দিলেন। আমিও একটা এক্সেপ্টেবল বিনয়ী হাসি দিয়ে তা সাদরে গ্রহণ করে বইয়ের পাতায় মন দিলাম। পরের দিন আমার ক্লাস টেষ্ট।

রাতে নয়টার মধ্যে খেতে যাওয়ার নিয়ম হোস্টেলে। আমার অভ্যাস নাই এত তাড়াতাড়া রাতের খাবার খাওয়ার। এখানে রুমে এনে খাওয়ারও নিয়ম নেই। তাই বাধ্য হয়ে মিতা আপুর প্লেট নিয়ে আবারো ডাইনিংয়ে নামলাম।

রাতের ম্যানু ডিম। দুর্ভাগ্যবশত ডিমও খাদ্যের মধ্যে আমার জন্য অখাদ্যস্বরূপ। ডিমের গন্ধ আমি সহ্য করতে পারি না। উৎকট লাগে। তার উপর রান্নাকরা সিদ্ধ ডিম আমার জন্য অশান্তিকর ছাড়া কিছুই না। আলুভর্তা আর ডাল দিয়ে খেয়ে সবার আগে উঠে পড়লাম।

ডাইনিংয়ে টিভি আছে। সবাই হা করে ভাত গালে দিয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। কোন একটা হিন্দি সিরিয়াল চলছে। স্টারপ্লাসে হচ্ছে। সিরিয়ালের কাহিনি এক অন্ধ আধুনিক যুগের রাজপুত্রকে ভালোবাসে এক কাজের লোকবেশি মডার্ন নায়িকা। আমার উঠে আসতে ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু রুমের চাবি ছিল মিতা আপুর কাছে। এখনও আমাকে কেউ রুমের চাবি বুঝিয়ে দেয় নি। রাত সাড়ে দশটা বেজে গেল। আপুর খাওয়া শেষ হলো, সাথে সেই সিরিয়ালও শেষ হলো।

রুমে আসার পর ভাবছি আজ একটু তাড়াতাড়া ঘুমিয়ে পড়বো। কাল কলেজ আর ক্লাস টেষ্টও আছে। একটু পর আশপাশের রুম থেকে রিজভিয়া, ফারজানা ও ঝর্ণা আপু আমার আর মিতা আপুর খাটে উঠে বসলেন। হাতে তাসের বান্ডিল।

মেয়েরাও যে রাতভোর তাস খেলে সেই প্রথম দেখছি। আমি চেয়ারে বসে আছি রাত ১২টা পর্যন্ত তখনও খেলা চলছে পুরোদমে।

মিতা আপুকে অতি ভদ্রতার ভঙ্গিতে বললাম, আপু কাল তো আমার ক্লাস আমি কি ঘুমিয়ে পড়বো?

আপু মুখে কিছু না বলে হাত ইশারা করে অনুমতি দিলেন। আমি অতি কষ্টে পাশ দিয়ে লম্বাটে সোজা হয়ে শোয়ার কোনো রকম একটু জায়গা পেলাম।  মিতা আপুর এক্সট্রা বালিশ মাথায় দিলাম।

চোখ বন্ধ করে তাস বাটার শব্দ শুনতে শুনতে কোনো একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম।

(কিস্তি ৩)