হোস্টেল (৪)

(আগের কিস্তি)

১৯.

খেতে বসলেই অসহায় লাগে আমার। মায়ের কথা মনে পড়ে।

ডাইনিং-এ রাতের খাবার খেতে এসেই কান্না পাচ্ছে। না খেয়ে চলে আসলাম। রুমে এসে লাইট অফ করে বসে আছি। মিতা আপু খাওয়া শেষ করে বিশ মিনিট পর রুমে আসলেন। আমাকে অন্ধকারে বসে থাকতে দেখে আপু বললেন, “এসব ঢং বাদ দে, দুনিয়ার মেয়েরা থাকে এখানে। সবাইর কষ্ট হয়। খেতে না পারিস অন্য কিছু খা। প্যান প্যান করিস না।”

আপু আমাকে এভাবে গুরুত্বহীন ভাবে বকবেন ভাবি নি। আপুর তো উচিৎ ছিল আমাকে সান্ত্বনা দেওয়া, উল্টা এভাবে কথা বলছেন! যদি আমার কথা সব জানতেন মিতা আপু তাহলে হয়ত আমার কষ্টটা সত্যিই বুঝতেন।

আপু লাইট জ্বালিয়ে দিলেন। কম্পিউটার ছেড়ে একটা মুভির সিডি নিয়ে বসলেন আমার পাশে।

আপুকে বললাম, আজ তোমার সিরিয়াল সব বন্ধ নাকি? চলে আসলে যে?

আপু বলল, ওরে ধুর তোর সিরিয়াল। যেই মুভি রাকিব দিয়েছে সেটা দেখে হাসতে হাসতে তুই মরেই যাবি। এখন চটপট প্যানপ্যানানি রেখে হাত মুখ ধুয়ে এসে মুভি দেখতে বস।

আমি আবার মুভি দেখতে খুব পছন্দ করি। তাই আমার দুঃসম্পর্কের আব্বা মানে মিতা আপুর বয় ফ্রেন্ড রাকিব ভাই প্রায় আপুকে নতুন নতুন মুভির ডিভিডি পাঠান আমার জন্য। মিতা আপুর সাথে অনেকবার, রাকিব ভাইয়া আর মিতা আপুর ডেটিং-এর সময় আমিও সাথে গিয়েছিলাম। একদিন বাসে করে নিউ মার্কেট যাচ্ছিলাম আমরা তিনজন।

কন্ডাক্টর মিতা আপুকে বলল, আন্টি ভাড়াটা দেন। আপু রাকিব ভাইয়াকে দেখিয়ে দিল। কন্টাক্টর রাকিব ভাইয়াকে গিয়ে বলল, আংকেল, আন্টি আর ছোট আপুর ভাড়াটা দেন। মিতা আপু গম্ভীর হয়ে আছে আর অমি তো হা হা হা করে হাসছি কন্ডাক্টরের কথা শুনে।
রাকিব ভাই একটা ধমক মেরে কন্ডাক্টরকে বললেন, চুপ কর। কীসের ছোট আপু লাগাইছ? নাও ভাড়া নিয়ে ফটো।

রাকিব ভাইয়ের ধমকে আমিও চুপ হয়ে গেলাম। মিতা আপু একটু মোটাসোটা আর রাকিব ভাইকে দেখলেও দুই বাচ্চার বাপই মনে হয়, তাই কন্ডাক্টর আমাকে ওদের মেয়ে ভেবেছে।

তারপর বাস চলছে কিন্তু কেউ কোন কথা বলছে না কারো সাথে। হঠাৎ মিতা আপু হো হো হো করে হেসে উঠলেন। আমি আর রাকিব ভাই একটু ভয় পেলাম হাসির শব্দে। মিতা আপু রাকিব ভাইকে বললেন, কী গো বীথির বাপ বাস থেকে নামবা না? চলে আসছি আমরা।
মিতা আপুর কথা শুনে রাকিব ভাই আর অমিও হাসতে হাসতে বাস থেকে নামলাম।

বাস থেকে নেমে আমি ভাইয়াকে সেদিন সারাক্ষণ আব্বা আব্বা বলেই ডাকলাম। নিউমার্কেটের দোকানদাররাও রাকিব ভাইয়াকে বলছিল আংকেল। ওই দিন থেকেই মজা করে রাকিব ভাইকে আমার দুঃসম্পর্কের আব্বা আর মিতা আপুকে দুঃসম্পর্কের আম্মা বলে ডাকি। হোস্টেলের ভিতর আপুকে আম্মা তেমন একটা ডাকা হয় না।

মিতা আপু, রাকিব ভাইও আমাকে খুব পছন্দ করেন। তাই ভাইয়া প্রায় আমার জন্য নতুন মুভির ডিভিডি, খাবার, চকলেট বিভিন্ন জিনিস পাঠান আপুর হাতে।

এখন মুখ ধুয়ে রুমে ঢুকে দেখি আপু হিটারে নুডুলসের পানি গরম করতে দিয়েছেন।

হোস্টেলেই প্রথম আমি হিটারের ব্যবহার দেখলাম। একটা স্টিলের পেঁচানো লম্বা দণ্ডের সাথে তার দেওয়া, তারের মুখে প্লাগে দেওয়ার লাইন। এটাই ওয়াটার হিটার। হোস্টেলের মেয়েরা এই ওয়াটার হিটার খুব লুকিয়ে ব্যবহার করে।

মাঝে মাঝেই রুম চেক হয়। ওয়াটার হিটার আর আয়রন মেশিন পেলে হোস্টেল কর্তৃপক্ষ সাথে সাথে নিয়ে চলে যায়। কিন্তু যেই আপুরা হোস্টেলে লিড দেন তাদের ব্যাগ ধরে না চেকাররা। তাদের মধ্যে একজন ছিল মিতা আপু। একেক তলা ভিত্তিক লিডার ভিন্ন। তবে মিতা আপুকে অন্যান্য তলার লিডাররাও বেশ পছন্দ করত। কোন চুরি হলে পরামর্শ নিতে আসত আপুর কাছে কীভাবে চোর খুঁজে বের করা যায়। খুব অল্প দিনেই মিতা আপুর সাথে আমার জম্পেশ খাতির হয়ে গেছে তাই এইসব সুযোগ সুবিধা উপভোগ করতে পারছি আমিও।

আমাকে রুমে ঢুকতে দেখে আপু আমাকে বললেন, আসেন মহারাণী আপনি তো না খেয়ে রোগ বাঁধিয়ে আমাদের ভোগাবেন তাই নুডুলস বানাচ্ছি, খেয়ে চল মুভি দেখতে বসব। তুই টুসি, রিজভিয়া আর ঝর্না আপুকে ডেকে নিয়ে আয়।

আমি আর ঝর্না আপু আসলাম রুমে। মিতা আপুকে বললাম, টুসি, রিজভিয়া আপু খাবার দাবার নিয়ে আসছে একটু পর।

আপু আমার হাতে নুডুলসের বাটি দিলেন। আমি কম্পিউটার মনিটরের সামনে আসন করে বসছি। একটু একটু নুডুলস মুখে দিচ্ছি আর দরজার দিকে তাকাচ্ছি টুসি, রিজভিয়া আপু আসল কিনা দেখতে। মিতা আপু ডিভিডি চেক করে মুভি স্টার্ট করার জন্য রেডি হয়ে বসেছেন। ঝর্না আপু তার একটা পা আমার কোলের উপর দিয়ে শুয়ে শুয়ে মুভি দেখার জন্য রেডি। এই পা তোলার ব্যাপারটায় আমি খুব বিরক্ত হই। কিন্তু কিছু বলতে পারি না কারণ ঝর্না আপু মিতা আপুরও আপু হয়। আমি যদি কিছু বলি আর মিতা আপু আমাকে সাপোর্ট না দেন তাহলে আমার কেস ফাইনাল। আমার ক্ষমতার বারোটা বাজাবে অন্যরা। তাই ঝর্না আপুর মাতব্বরি সহ্য করে চলি। তবে বিরক্ত হচ্ছি এটা পুরোটা বুঝিয়ে দেই আমার কথাবার্তা দিয়ে।

 

২০.

টুসি আর রিজভিয়া আপু মুড়ি-চানাচুর, চকলেট, পপ কর্ণ ও মিরিন্ডা হাতে নিয়ে ঢুকতেই আমরা চিৎকার করে ওদের স্বাগত জানালাম। খাবার সবাইকে ভাগ করে দিয়ে মিতা আপু মুভি ছাড়লেন। সিনেমা হরর পরিবেশ আনার জন্য হাতে পপকর্ণ, লাইট ওফ করে আমরা দর্শকের সারিতে বসে, শুয়ে, কাত হয়ে হেলান দিয়ে মনিটরের পর্দায় তাকিয়ে আছি।

ততক্ষণে আশেপাশের রুমের মেয়েরা বুঝে গেছে আমরা আয়োজন করে মুভি দেখতে বসেছি। এই নিয়ে বেশ কিছু মানুষের খুব বিরক্তি। বিরক্তির কারণটা কী তারাও দেখতে পারছে না বলে না কি তারা অদৃশ্য কারণবশতঃ আমাদের আনন্দে অপকৃত হচ্ছে!

ছবির নাম ‘আজব প্রেম কী গাজব কাহানি’, নায়িকা ক্যাটরিনা কাইফ নায়ক রনবির কাপুর। হাসতে হাসতে আমরা গড়িয়ে পড়ছি। কমেডি মুভি এটা, এই জন্যই আপু বলেছিলেন আমার মনটা ভাল হয়ে যাবে।

ছবিটিতে একটা সিন আছে যে, রনবির হিন্দু থাকে আর ক্যাটরিনা খ্রীষ্টান ধর্মের। তোহ, রনবির ভেজিটেরিয়ান। ক্যাটরিনাকে ইমপ্রেস করার জন্য রনবিরের বন্ধুরা তাকে বলেছে চিকেন মাটন খাওয়া প্র্যাকটিস করতে। যাতে ডেটে গিয়ে ক্যাটরিনাকে মাটন খেয়ে দেখিয়ে ইমপ্রেস করতে পারে। এদিকে চিকেন খেতে দেখে রনবিরের বাবা তাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন। তবুও সে হার মানে নি, ক্যাটরিনাকে রেস্টুরেন্টে যেত রাজি করিয়ে ফেলল। রেস্টুরেন্টে গিয়েই ক্যাটরিনাকে কিছু জিজ্ঞেস না করেই মাটন চিকেন সব অর্ডার দিয়ে দিল রনবির। তারপর ক্যাটরিনা যখন বলল সে ভেজিটেরিয়ান, সেই দৃশ্য দেখে ঝর্না আপু অতিরিক্ত আবেগময় খুশিতে হো হো হো করে হেসে উঠলেন। আর আপুর মুখ ভর্তি মিরিন্ডা উপচে এসে পড়ল আমার চোখে মুখে। এরপর সিনেমা ওখানেই থেমে গেল। টুসি, রিজভিয়া আর মিতু আপু আমার মিরিন্ডাভেজা চোখ-মুখের অবস্থা দেখে থ হয়ে গেলেন। কিন্তু ঝর্না আপু হাসতেই আছেন। আমার দিকে তার কোন খেয়ালই নাই। যেন কিছুই হয় নি।

এটা যে ঝর্না আপু ইচ্ছা করেই করেছেন তা আমার সাথে সাথে অন্যরাও ঠিক বুঝতে পারছে। কিন্তু বড় বলে কথা, তার উপর সরাসরি কিছু বলারও কোন ওয়ে নাই। আপু হাসতে হাসতেই মিতা আপুকে বললেন, কী রে মিতা থামিয়ে দিলি কেন মুভি?

মিতা আপু একটু বিরক্ত হয়েই বললেন, “তুমি কী করেছ নিজই দেখো। বিথীকে তো মিরিন্ডা দিয়ে গোসল করিয়েছ। ও ধুয়ে আসুক তারপর ছাড়ছি।”

এরপর মিতা আপু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যা ধুয়ে আয়, কী আর করবি। এই ঝর্না আপুটা যে কী! টুশি, দেখ ঈ করেছে আপু।”

ঝর্না আপু মুখ ঝামটা দিয়ে বললেন, “তোর যত আদিখ্যেতা। পাটকাঠির আর কী আছে যে ভিজবে? এত ভাব করতেছিস মনে হয় এই চিচিঙ্গার ছাঁ যেন রানী মহারাণী…!!”

মিতা আপু ভ্রূ কুঁচকে ঝর্না আপুকে আবার বললেন, “আপু থাক, এখন তো চুপ করো। এই পিচ্চিটা তোমার কী এমন করেছে যে তুমি এমন কথা বলো?”

মিতা আপু আমাকে বললেন, “আয় চল ধুয়ে আসবি। টুশি, দেখিস মুভি চালাস না, আমরা আসি তারপর।”

ঝর্না আপুর পা দুখানা তখনও আমার কোলের উপর। আমি আপুর পা নামিয়ে রেখে খাট থেকে নামলাম মিতা আপুর সাথে। হঠাৎ ঝর্না আপু মিরিন্ডার বোতলটা মিতা আপুর কপালে ছুড়ে মারলেন। মিতা আপু মাটিতে বসে পড়লেন কপালে হাত দিয়ে। সবাই এই ঘটনায় অপ্রস্তুত হয়ে গেল। আর আমি তো অবাক হলামই, অপরাধবোধও হচ্ছিল। আমার জন্য এখন মনে হচ্ছে ঝগড়া মারামারি পর্যন্ত যাবে। টুশি আপু চিল্লিয়ে উঠলেন, এইটা কী করলেন ঝর্না আপা? আপনি কি বাচ্চা হয়ে গেছেন? এইসবের মানেটা কী? মিতা আপুর চোখে যদি লাগত? আপনি যে কী করেন এসব!

মিতা আপু কপালে হাত দিয়ে উঠে দাড়ালেন। ঝর্না আপু অন্য দিকে তাকিয়ে আছেন। মিতা আপু ঝর্না আপুকে বললেন, “এবার গেছে তোমার রাগ? শান্তি তুমি? এইবার চুপ করে বসো, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে এসে মুভি ছাড়ছি।”

সবাই কত কিছু বলছে কিন্তু আপুর মাথায় লাগল কিনা কেউ জিজ্ঞেস করল না ধরলোও না। আমিও ধরলাম না কেউ ধরছে না বলে।

ঝর্না আপু মুখ ভেংচি দিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বললেন, “যা যা পাঁচ মিনিট দশ মিনিট। তোর মাথায় তো লাগে নি আমি জানিই, যেই গণ্ডারের মত শরীর তোর।”

রিজভিয়া আপু এতক্ষণ চুপ করেই ছিল এখন বললেন, “হুম, তুমি তো জেনেশুনেই মারলা। এখন বাদ দাও। আর মিতা আপু, তুমি বসো, পিচ্চিটা একাই যাক, কোনার বেসিনে গেলেই তো হয়।”

মিতা আপু কোন উত্তর না দিয়ে আমাকে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে বেসিনের সামনে এসে মোবাইল টিপতে টিপতে বললেন, নে ধুঁয়ে নে।

আমি একটু সাহস করে হাতমুখ ধুতে ধুতে বললাম, “আপু আমার জন্য ঝর্না আপু তোমার সাথে ওমন করল, সরি।”

মিতা আপু মোবাইলের দিকে তাকিয়ে অমনোযোগী ভাবে উত্তর দিলেন, “তুই তোর কাজ কর তো।” বলতে বলতে আপু ফোন ধরে চাপা স্বরে চিল্লিয়ে বললেন, “কী ব্যাপার বলো তো, আর কত রাত এভাবে আমাকে অত্যাচার করে যাবা? আমার আর ভালো লাগছে না। বন্ধ করো এসব পাগলামি। না পারবা আমার সাথে থাকতে আর না পারবা আমাকে ভাল রাখতে। প্লিজ কিছু একটা ফাইনাল করো। এরপর ফোন দিও।”

ফোনটা রেখেই আপু হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে কাঁদতে লাগলেন। আমি কী করব বুঝতে পারছি না। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি ভিজা চোখে মুখে। আপুকে দেখছি। সমস্যাটা জানতে না পারলেও কিছু হয়েছে বুঝতে পারছি। আপুকে জড়িয়ে ধরলাম। বললাম, কেঁদো না আপু। কী হয়েছে বলবা আমাকে? আপুও আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকলেন কয়েক মিনিট। তারপর আমাকে ছেড়ে চোখেমুখে পানি দিয়ে একদম আগের মত হয়ে গেলেন। বললেন, “চল সবাই ওয়েট করছে, মুভি দেখবো।”

(কিস্তি ৫)

About Author

নওয়াজ ফারহিন অন্তরা
নওয়াজ ফারহিন অন্তরা

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ছেন। জন্ম- ঢাকা, মে ১৯৯৩।