হোস্টেল (৫)

(আগের কিস্তি)

২১.
সকালটা কেমন ম্যাজমেজে লাগছে। ঘুম ভেঙে দেখি আমার একটা পা মিতা আপুর কোমরের উপর। তাড়াতাড়ি পাটা নামিয়ে চুপ করে শুয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর আপু উঠে বললেন, “উফফ… তোর এই পায়ের যন্ত্রণায় আমার কোমর ব্যথা হয়ে গেল। সারাটা রাত তুই পাটা আমার উপর চাপাইলি আর আমি নামাইলাম, পরে ক্লান্ত হয়ে আর সরানো বাদ দিয়া ঘুমাই পড়ছি।”

আমি অপরাধী কণ্ঠে আস্তে আস্তে বললাম, “সরি আপু, আমি টেরই পাই নি। কখন কীভাবে যে পা উঠে যায় ঘুমের মধ্যে…।”

আপু বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘হইছে আর সাফাই গাইছ না। তুই যদি বুঝেশুনে পা রাখতি তাহলে কি তোর পা আমি আস্ত রাখতাম? এত ন্যাকামো বাদ দিয়া যা হাতমুখ ধুয়ে চল ডাইনিংয়ে যাই। কাল রাতে তো আর মুভিটা দেখা হল না। সবাইকে আবার দাওয়াত পাঠাইতে হবে।”

হাতমুখ ধুয়ে, প্লেট হাতে নিয়ে ডাইনিংয়ে নামলাম। শুক্রবার সকালে নাস্তায় হোস্টেলের মেনুতে খিচুড়ি আর ডিম। সাথে কেউ কেউ বাসা থেকে আনা মায়ের হাতের আচার খায়। আমিও আপুদের কাছ থেকে সেই আচারের ভাগ পাই।

এখানে ম্যাক্সিম্যাম মেয়ে আমার আপু আর আপা। ‘আপু’টা আহ্লাদ ছাড়া খুব কমই বলি। আর স্বল্প পরিচিতারা আমার ‘আপা’। কয়েকজন ‘দিদি’ও আছেন। একেকজনকে একেক নামে ডাকাটা আমার এক রকম স্টাইল সেটা সবাই জানত। তাই সাদরে আমার দেওয়া নামে সাড়া দেন দিদি, আপু ও আপারা।

খাওয়া শেষ করে উপরে উঠছি সিঁড়ি দিয়ে। হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠল, নাম্বারটা দেখে মনে হল ধাক্কা খেলাম। মায়ের নম্বর। বুঝতে পারছি না ফেনের ওপারে কে আছে, কী বলবে, কী হতে পারে আর আমি কী উত্তর দিব!

মাকে কখনো মা বলে ডাকি নি। মাম বলে ডাকতাম ছোটবেলা থেকে। আজ কোত্থেকে চিন্তা ভর করে উঠল ফোন ধরে মাকে কী বলে ডাকব। ভাবতে ভাবতে ফোনের রিং অফ হয়ে গেল বাজতে বাজতে। মিতা আপু বললেন, “কে রে ফোন দিল, ধরলি না?”

আবার ফোন বেজে উঠল। হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে আর একটা অপরাধবোধ মাথায় ঘুরছে। ফোনটা ধরে নিচু স্বরে বললাম, হ্যালো….। তারপর চুপ করে আছি। ওপার থেকে কয়েক সেকেন্ড পর মায়ের গলা। মা কাশলেন। তারপর বললেন, কেমন আছো মা? খেয়েছ সকালে? তুমি তো খেতে চাও না।

hostel 5 a

আমি কথা বলতে পারছিলাম না। মায়ের কথা শুনে মনে হচ্ছে অনেক দিন পর আমার একটা অস্তিত্ব আছে। বললাম, “হুম মাম, ভালো আছি। তোমার দোয়ায়। তুমি কেমন আছো? রিংকু কেমন আছে? তোমাকে জ্বালায় অনেক?”

বললেন, “এই তো আছে এক রকম। তুমি পড়াশোনাটা ভালো করে করো। আর তোমার কলেজের বেতন অমি সময় মত দিয়ে দিব। তুমি শুধু পড়াশোনায় মনোযোগ দাও। রাখি, পরে আবার ফোন করব।”

প্রথমে ফোন ধরার পর মাম যেভাবে কথা বললেন, পরে সেই মায়া-মায়া টোনটা ছিল না। কী যেন একটা ভালো লাগা পরক্ষণেই হারিয়ে গেল। ফোনটা হাতে ধরে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে আছি। মিতা আপু অনেকটা আগিয়ে গেছেন আমার থেকে। পিছন ফিরে বললেন, “কীরে বলদের মত দাঁড়িয়ে আছিস কেন? উপরে উঠে আয়। কার আবার ফোন আসল যে শোকে কাঠ হয়ে গেলি?”

আমি বড় বড় পায়ে তাড়াতাড়া উঠে আসলাম রুমে। টুসি, রিজভিয়া আপু রুমের সামনে দাঁড়িয়ে মিতা আপুর সাথে কিছু একটা নিয়ে ফিস ফিস করছে। তারপর সবাই রুমে আসলো। টুশি আপু আমাকে বলল, “পাটকাঠি তোর কি পড়াশোনা নাই? সারাদিন মিতা আপুর পিছে পিছে থাকিস।”

মিতা আপু মুখে উপটান লাগাতে লাগাতে বলেন, “যাও না টুশি ঝর্না আপুকে ডেকে আনো। কালকের মুভিটা তো দেখা হচ্ছে না আর।”

টুশি আপু হুররে হুররে চিল্লাতে চিল্লাতে মিতা আপুকে জড়িয়ে ধরে বলছে, “ঝর্না আপু মহা ব্যস্ত, আর এখন তোমাকে, আমাকে, পাটকাঠিকেও যেতে হবে, হাতে একদম সময় নেই।”

মিতা আপু বললেন, “ওহ, শুনতেছিলাম কানাঘুষা, আজ নয় কাল কাল নয় পরশু। শেষ পর্যন্ত সময়টা চলেই আসল? চল আমরাও যাই, আমাদেরও তো দায়িত্ব আছে একটা।”

এরপর আমরা সবাই লুবনা আপুর রুমে আসলাম। লুবনা আপু বালতির ভিতর গরম সাবান পানি দিয়ে পা ডুবিয়ে বসে আছেন। মিতা আপুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “বিচ্ছু তুই একদম চুপ। কোন রকম মজা নিবি না কিন্তু। তোকে নিয়েই আমার ভয়। গতবার পুলক ভাইকে যেই নাকানি-চুবানি খাইয়েছিস টুম্পা আপুর স্বপ্নে তো ছানি পড়ছিল। সো, মিতা নো হাঙ্কিপাঙ্কি।”

মিতা আপু খিক খিক করতে করতে বললেন, “এইটা কি বললা লুবনা আপু? বড় ভাইব্রাদারদের কাছে আবদার করব না? আর আমি আসতে না আসতেই তুমি ভয় পাচ্ছ? আমি যে কত সুযোগ-সুবিধার বন্দোবস্ত করি ভুলে গেছ?”

লুবনা আপু তখন সুন্দর একটা হাসি দিয়ে বললেন, “মিতা বোন আমার, এই প্রথম বার লিমন আসবে, নতুন চাকরি, বেতন এখনও হয় নি, একটু বুঝেশুনে হাকডাক দিস।”

মিতা আপু বললেন, “সেটা না হয় এইবারে মেনে নিলাম, কিন্তু সুযোগ-সুবিধা কি দরকার আছে না কি না হলেও চলবে লুবনা আপু?”

আমি আপুদের কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু সবাই মিলে হেসেই যাচ্ছে।

টুশি আপু লুবনা আপুর পা-হাত মেনি কিউর, পেডি কিউর করে দিচ্ছেন। ঝর্না আপু চুলে মেহেদি দিয়ে দিচ্ছেন। আর লুবনা আপুর রুম-মেটরা ঘর পরিষ্কারে ব্যস্ত। সারা বছর ঝুল জমে একসার, মেঝেতে চা পড়তে পড়তে কালশিটে হয়ে থাকলেও কেউ ফিরে তাকায় নি আর আজ কাজে কী মনোযোগ সবার মধ্যে। কাপড় গোছানোর কোন তাগিদ ছিল না কারো মধ্যে তারা কিনা আজ ধুমধাম করে ঘর গোছাচ্ছে! আমি অবাক হচ্ছি। কিচ্ছু মাথায় ঢুকছে না। তার উপর ছোট বলে, কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পাচ্ছি না।

২২.
এখানে সবাই আমার বড়। রাসফি আর আমি ছাড়া বাকিরা কলেজ পার করে ফেলেছে অনেক আগেই। হোস্টেল এসে একটা ব্যাপার আমার প্রথম প্রথম খুব অবাক লাগত। সব মেয়েরা অপেক্ষাকৃত ছোট ছোট ড্রেস পড়ে থাকে। অনেকটা বম্বের নায়িকাদের নকল করে কমদামি বিদেশী পোশাক পরে থাকে হোস্টেলের ভিতরে। থ্রি কোয়াটার প্যান্ট, বড় গলার টিশার্ট, শর্ট স্কার্ট, হাতাকাটা শর্ট মেক্সি আরো বিভিন্ন ছোট ছোট জামা ধানমণ্ডি হকার্স থেকে কিনে পরত প্রায় সবাই। দেখতে সবাইকে কেমন সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চা ইঁদুরের মত লাগত। যেন শরীরে কিছুই পরে নাই কেউ। যখন গোসলের সময় আসত সবাই জামা-কাপড় সব খুলে শুধু গামছা বা তোয়ালে জড়িয়ে বাথরুমে ঢুকত। গোসল করে বেরও হত ওই গামছা পরে।

গোসল করতে যাওয়ার সময় রুমে যেই থাকুক তোয়াক্কা না করে আপুরা তার সামনেই নির্দ্বিধায় জামাকাপড় খুলে একটা তোয়ালে গায়ে পেঁচিয়ে নিতেন। এই দৃশ্যটা দেখলে আমার ‘দিলওয়ালা দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’ মুভির কথা মনে হতো। এই ছবিতে কাজল গোসলের আগে-পরে শুধু তোয়ালে পরা অবস্থায় হেব্বি নাচগান করেছিল। ওইখান থেকেই মনে হয় হোস্টেলের সবাই এই বেশ ধার করেছে। কখনো কখনো অনভিজ্ঞতার কারণে কারো কারো তোয়ালে খুলে যেত। তখন একটু হাসি দিয়ে ভাবলেশহীন ভাবে তোয়ালেটা হাতে নিয়ে হাঁটা দিত তারা।

রিজভিয়া আপু আমাকে ধাক্কা দিয়ে বললেন, “বিথী, টেবিলটা গুছিয়ে ফেল। আর যত জঞ্জাল আছে এই কার্টুনটার ভিতর ঢুকিয়ে খাটের নিচে রেখে দে।”

আমি টেবিল গুছাতে একদমই চাই না। নিজেরটাই গোছানো ঝামেলা এখন লুবনা আপুদের রুমের আরো তিনটা টেবিলও গোছাতে হবে। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। তাও গোছানো শুরু করলাম। আমার ডাস্ট এলার্জি আছে। সমানে হাঁচি দিচ্ছি আর বই, কলম, পলিথিন, হাজারো জাত-বেজাতের হাবিজাবি জিনিস টেবিল থেকে পিচবোর্ডের কার্টুনে জমা করে খাটের নিচে রাখলাম। সবাই মিলে সারা ঘর ধুয়েমুছে ঝকঝক করে ফেলেছে। ঈদের সময় যেমন ঘরদর ধোয়ামোছা হয় তেমন ভাবে।

ধুলাবালিতে হাতমুখ কালি হয়ে গেছে। লুবনা আপুর রুম থেকে বের হয়ে বাথরুমের সামনের বেসিনে হাত ধুচ্ছি হঠাৎ কেউ একজন পিছন থেকে কাঁধে হাত রাখল। তাকিয়ে দেখি রাসফিনা। অনেক দিন পর দেখা হল, রাসফি আমাকে জড়িযে ধরল। যদিও আমাদের এই এক মাসে মাত্র তিনবার দেখা হয়েছে। চারতলায় থাকলেও এখানে দুটা দল আছে। যারা একদম রাফ অ্যান্ড টাফ চলে, আর এক দল তাদেরকে ইনডাইরেক্টলি এড়িয়ে চলে। এদের দু দলের ভিতরে আমি আর রাসফি আলাদা গোত্রের হয়ে গেছি। তাই নিজ নিজ দলের মনরক্ষার জন্য আমাদের কাঙ্ক্ষিত বন্ধুত্ব তেমন আগাতে পারছে না।

আমি আমার দলের আপুদের সাথে থাকি, গল্প করি, মুভি দেখি আর মাঝেমধ্যে ঘুরতেও বের হই। আর রাসফি ওর বড় বোন ন্যান্সি, রোকসানা ও লিলি আপুদের সাথেই থাকে। উনারা সারাদিন রুমে থাকে নাকি থাকে না, ঘুরতে বের হয় নাকি সারাদিন পড়ে তাও খবর রাখি না। কিন্তু এই মুহূর্তে রাসফিকে দেখে খুব শান্তি লাগছে।

সবাই লুবনা আপুকে নিয়ে ব্যস্ত। আর আমার বিরক্ত লাগছে এই লুবনা আপুর কী হল যে সকাল থেকে সাজাচ্ছে সবাই। ঘর গোছানো হল, সব একেবারে ফিটফাট নতুন বিছানার চাদর থেকে পর্দা এমনকি পাপোসটাও নতুন।

কিন্তু কেন এই আয়োজন কারণটা আমি জানি না।

রাসফি আমাকে বলল, “আমার কিন্তু দারুণ লাগছে ৪-৫ মাস আগে যখন পুলক ভাইয়া আসছিল তখন হেব্বি মজা করেছিলাম। ন্যান্সি আপুও যোগ দিয়েছিল তাই চিল্লাচিল্লি করেছিলাম ইচ্ছামত। আর টুম্পা আপুকে তো নতুন বউয়ের মত সাজানো হয়েছিল।”

আমি বললাম, “টুম্পা আপু কে? ক’তলায় থাকেন? পুলক ভাইয়া কেন আসছিল এখানে? আচ্ছা রাসফি আজ কে আসবে, কেন আসবে, লুবনা আপু এতো রূপচর্চা করছেন কেন কিছুই বুঝতে পারছি না আমি!”

রাসফি বলল,‌ “ওহ তুমিও জানো না? পুলক ভাইয়া যখন আসছিল তখন আমিও জানতাম না। পরে ন্যান্সি বলছিল।”

রাসফি আমাকে টেনে ওর রুমে নিয়ে এসে বলল, “কিছু পুরুষ মানুষের এই মেয়েদের হোস্টেলে প্রবেশের অনুমতি আছে। তাদের মধ্যে আসতে পারবে কম্পিউটার মেকানিক। ডিশের লাইনম্যান, ভ্যানওয়ালা মামা, লক মিস্ত্রী, কম্পিউটার মেকানিক এবং পুলিশের অনুমতি আছে। যেই আপুর কম্পিউটার নাই হোস্টেলের ভিতর তার বয়ফ্রেন্ড আসেন লক মিস্ত্রী পরিচয়ে। আর আজ নাকি লুবনা আপুর বয়ফ্রেন্ড হোস্টেলে ঢুকবেন কম্পিউটার মেকানিক পরিচয়ে। এখন বুঝলা কেসটা কী?”

আমি একটু ভয় ভয় কণ্ঠে রাসফিকে বললাম, “যদি ধরা পড়ে যায়? কেউ যদি শত্রুতা করে বলে দেয়? তখন কী হবে?”

রাসফি বলল, “এই ব্যাপারে হোস্টেল একেবারে নিরাপদ। কারণ, নিজের পায়ে কেউ কুড়াল মারবে না সেটা সবাই জানে। আর এই যে দেখছো, একজনের বয়ফ্রেন্ডের জন্য সবার এত্ত ব্যস্ততা, এর কারণ হল তার বেলায় অন্যরা সাহায্য করবে। এটা হল আগাম কৃতজ্ঞতা।” এই কথা বলেই রাসফি হো হো করে হেসে উঠল। রাসফি অনেক জোরে হাসে। মেয়েরা সাধারণত ঠিক এইভাবে হাসে না।

রাসফি আবার বলল, “ন্যান্সি একটু ভাব নিয়ে থাকে দেখো না? কিন্তু এই মৌসুমে ও খাটাখাটনি তেমন না করলেও নিজের নতুন শাড়িটা লুবনা আপুকে পরার জন্য দিয়েছে। কেন জানো?”

আমি বললাম, “না, জানি না তো। কেন?”

রাসফি আরো নিচু স্বরে বলল, “আমার বোনের আগের ভাইয়ার সাথে ব্রেকআপ হয়ে গিয়ে এক মাসের মধ্যে হেব্বি একটা বড় লোকের একমাত্র পোলার সাথে রিলেশন হইছে। ভাইয়ার বাপের একখান গাড়িও আছে। আর উনার নিজের বাইক।”

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, “ওই ভাইয়ার জন্য শাড়ি কেন লুবনা আপুকে পড়তে দিল?”

রাসফি বিরক্ত হয়ে বলল, “তোমাকে প্রত্যেকটা কথা এত কেন বোঝাতে হয়? আরে যখন ভাইয়া আসবে তখন যেন ন্যান্সকে লুবনা আপু একস্ট্রা কেয়ার করেন তাই এখনই রাস্তা ক্লিয়ার করছে আমার বোইন।” কথাটা বলেই খিক খিক করে হাসছে রাসফি। আমার মোটেই হাসি পাচ্ছে না, তবু ভদ্রতাবশত একটু মুচকি হাসি দিলাম।

মিতা আপু ‘বিথী’ ‘বিথী’ বলে ডাকছেন। বেশ জোরে জোরেই…। আমি রাসফিকে বললাম, “ব্যাপারটা বেশ মজার। এখন যাই আবার দেখা হবে, কিছুক্ষণ পরে আসছি আমি। তুমি তো রুমেই আছো?”

রাসফি বলল, “আচ্ছা। হুমম, সারাদিন রুমেই কাটাবো হেইলা দুইলা।” আমরা দুজনেই হাসি দিলাম।

মিতা আপুর ডাক আমাদের রুম থেকেই শোনা যাচ্ছিল। প্রায় ছুটে ঢুকলাম। আপু বলল, “কীরে কই ছিলি তুই? কখন থেকে দেখতেছি না চোখের সামনে।”

আমি বললাম, “আপু, ওই কোনার রুমের রাসফির সাথে কথা বলছিলাম।”

মিতা আপু বললেন, “ভাল সবার সাথে কথা বলা। কিন্তু ওর বড় বোনটা একটু ছিনাল টাইপের। তোকে হঠাৎ অনেক ফালতু কথা বলে বিরক্ত করতে পারে। তাই মেপে টেপে ওর সাথে মিশবি।”

আমি বাধ্য মেয়ের মত মাথা নেড়ে বললাম, “আচ্ছা আপু।”

এবার যা গোসল করে নে। আর ভাল একটা জামা পরিস। আমরা সন্ধ্যায় ঘুরতে বের হব।”

আপুর ঘুরতে বের হওয়ার কথা শুনে মনে আনন্দ আর থাকতে চাচ্ছে না। ঘুরতে খুব ভাল লাগে আমার কিন্তু কেউ নাই যে নিয়ে যাবে। রিয়াদ তো বেমালুম আমাকে জাহান্নামের দুয়ারে রেখে ভাগল আর খবরই নেই! এই সব ভেবে আর কী হবে। তাই হাতে কাপড়-জামা নিয়ে গোসলের জন্য বাথরুমের সামনে লাইন দিলাম। আমার সামনে একজন, ঝিলমিল ঘোষ নামের একটা মেয়ে। কখনো কথা বলি নি। সারাদিন পড়ালেখা নিয়েই ব্যস্ত এই আপুটা। কালেভদ্রে আমাদের রুমে আসেন। যতক্ষণ থাকেন ‘মোজাম্মেল’কে নিয়েই গল্প করেন। মিতা আপু তাই ঝিলমিল আপুকে দেখলেই মজা করে বলেন, “ঝিলমিল, মোজাম্মেল নতুন কি কিছু ঘটাইছে?”

ঝিলমিল আপু বোঝেন না মনে হয় সবাই মজা করে উনাকে নিয়ে। তাই হেসে বলেন, “আর বইলো না মিতা, মোজাম্মেল তো সারাদিন আমার মাথাটাই খারাপ করে রাখে, সেদিন না ও…।” তারপর মিতা আপু বলে, আচ্ছা ঝিলমি রাতে রুমে এসো, দুজন মিলে মোজাম্মেলের গল্প করব। এই বলে মিতা আপু হাসতে হাসতে বিদায় নেন। তবু এই ঝিলমি আপু মজা তো বোঝেনই না, উল্টো ব্যাপক উৎসাহ নিয় পরশু রাতে এসে মোজাম্মেল ভাইয়ার সাথে কীভাবে প্রেম হল সেই গল্প শুনালেন আমাকে। এর আগে ঝিলমি আপুর সাথে আমার হাই-হ্যালো ছাড়া কোন কথাই হয় নি। সবাই রুমে নিজেদের নিয়ে এত ব্যস্ত ছিল যে উনার গল্প আমাকেই শুনতে হয়েছে। আমি মোটেই বিরক্ত না হয়ে মজাই পেয়েছিলাম। আমার সাথেও গল্প করার কেউ ছিল না, তাই সময়টাও ভাল কেটেছিল।

২৩.
ঝিলমি আপু একদিন কাঠফাটা রোদের দুপুরে ভার্সিটি থেকে ফেরার পথে খামার বাড়িতে নেমে একটা শশা-গাজর বিক্রির ভ্যানের ছাউনির নিচে বসলেন। আপুর বর্ণনা এমন ছিল যে, আপু কুত্তার মত হাঁপাচ্ছিল তখন। তারপর পানির পিপাসা পেল আপুর কিন্তু বাইরের পানি তো খাবেন না। তাই শশাঅলার কাছ থেকে তারই চেয়ারে বসে একটা শশা কিনলেন। কিন্তু শশাঅলার হাতেও তো খাবেন না। তাই শশাঅলার কাছ থেকে ছুরিটা চাইলেন। সেই ভ্যানঅলাও দিল ছুরিটা। সেটাকে ভাল করে ধুয়ে আপু শশার ছোকলা ছাড়াচ্ছিলেন খুব যত্ন করে। অনেকক্ষণ পর ঝিলমি আপু লক্ষ্য করলেন একটু দূরে দেয়ালে হেলান দিয়ে একটা হ্যান্ডসাম ছেলে আপুর দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে। আপু একটু নড়ে চড়ে বসলেন। ছেলেটা তবুও তাকিয়ে আছে। আপু এরপর শশাটা কেটে হাতে নিয়ে খেতে খেতে হোস্টেলের দিকে রওনা দিলেন। অনেকক্ষণ ছেলেটা পিছনে হাঁটছিল। কিন্তু একটু পর আর দেখলেন না। হোস্টেলের ভিতরে চলে আসলেন সেইদিন। এর কয়েকদিন পর একটা ছেলে ঝিলমি আপুকে পিছন থেকে ডাকল। আপু ফিরে তাকানোর পর একটু একটু চেনা লাগলেও চিনতে পারলেন না। আপু ভ্রু কুচকে বললেন, কে আপনি পিছন থেকে এমন বেয়াদপের মত ডাকছেন কেন? সেই ছেলেটা হেসে উত্তর দিল, সামনে থেকে পেলাম না তো তাই। তারপর বলল, আমার তেমন সময় নেই অফিস যেতে হবে। তোমাকে একটা জিনিস দেয়ার ছিল সেটাই দিতে আসছি। পকেট থেকে একটা নীল খাম বের করে আপুর হাতে দিয়ে ছেলেটা গট গট করে সামনের রাস্তায় হেঁটে চলে গেল।

ওই খামটার ভিতরে একটা চিঠি ছিল। আর চিঠিতে লেখা ছিল:
তোমাকে দেখেছি সেই কাঠফাটা রোদে। দেখেছি বার বার, হাতে ছিল ধারালো ছুরি। না, আমাকে ক্ষতবিক্ষত করো নি তাও ঠিক। কিন্তু এত যত্ন করে যে শশা কাটতে পারে তাকে নিয়ে রোদ বৃষ্টি জলোচ্ছাস অনায়াসে পার করে দেয়া যায়। তাই ওই কোমল হাতে শুধু ধারালো ছুরি তুলে না নিয়ে আমার খসখসে কঠিন হাতেও রাখতে পারো হাতটা। হলোই না হয় একটু ভিন্ন কিছু, না জানা মানুষটার সাথে জানাজানি। তবে কি হয় দেখা যাক। নিচে স্পষ্ট অক্ষরে তোমার ওই ডাগর কালো চোখের জন্য আমার একটা বাংলালিংক নাম্বার দিলাম, উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম…।

মোজাম্মেল-০১৯*******২। মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার।

তুমি চাইলে তোমার মোজাম্মেল হয়ে যেতে পারি আমি।

শেষ পর্যন্ত আপু ফোন করেছিলেন “আমার মোজাম্মেল বলছেন” বলে। এরপর থেকেই এই মোজাম্মেল ভাই আর ঝিলমি আপুর সম্পর্ক তিন বছর হয়ে যাচ্ছে।

(কিস্তি ৬)

About Author

নওয়াজ ফারহিন অন্তরা
নওয়াজ ফারহিন অন্তরা

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ছেন। জন্ম- ঢাকা, মে ১৯৯৩।