হোস্টেল (৬)

(আগের কিস্তি)

২৪.
সন্ধ্যার দিকে লুবনা আপু শাড়ি পরতে আসলেন মিতা আপুর কাছে। আমি আর মিতা আপু তখন ঘুরতে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিলাম। পুরা হোস্টেলে সুনাম আছে, মিতা আপু ভালো সাজাতে পারেন। প্রায় পারসোনার মতই সাজাতে পারেন। কোন আপুর যখন কোন ভাইয়ার সাথে ডেটিংয়ে যাওয়ার সময় আসে তখন মিতা আপুর তলব পরে।

কেউ কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ৫-৭ দিন আগে মিতা আপুর কাছ থেকে সময় নিয়ে রাখে। আপু তাতে মোটেও অনীহা দেখান না। যেই আপু আসেন আনন্দের সাথে তাকেই সুন্দর করে সাজিয়ে দেন। সাজানোটা আপুর একটা শখ। মাঝে মাঝে আমাকেই সাজানোর জন্য অস্থির হয়ে যান।

সাজলে আমাকে একদমই ভাল লাগে না। আর আমার ঠোঁটে লিপস্টিক লাগালে মনে হয় আলগা কিছু এঁটে রেখেছি। এভাবেই মা আমার লিপস্টিক লাগানো ঠোঁটের বর্ণনা করতেন। এক সময় আমি নাচ করতাম। জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছিলাম। মায়ের হয়ত ধারণা ছিল নাচ শিখেছি পুরস্কারও পেয়েছি, নাচ করা এখানেই শেষ। তাই আর আগানো হয় নি। ক্লাস এইটে উঠে ছেড়ে দিতে হয়েছিল।

তখন নাচের কোন স্টেজ পারফরমেন্স থাকলে সাজতে হত। আমাকে বেশ ভালোই লাগত। কিন্তু ঠোঁটটা উঁচু করে থাকতাম যতক্ষণ শেষ না হত অনুষ্ঠান। নাচ ছেড়ে দেওয়ার পর যতবার সেজেছি আমাকে মোটেও ভাল লাগত না। তাই একদম সাজ-গোজের ধারেকাছে যেতে ইচ্ছা হয় না। আবার আপুকে বলতেও পারি না, সাজলে আমাকে ভাল লাগে না।

আজ লুবনা আপুকে মনে হচ্ছে বেশ জাক-জমক ভাবেই সাজাবে মিতা আপু। ন্যান্সি আপু যেই শাড়িটা দিয়েছিল পরতে সেটা না পরে লুবনা আপু অন্য একটা শড়ি নিয়ে এসেছেন। মিতা আপু বললেন, লুবনা আপু, তুমি না ন্যান্সির শাড়িটা পরবা ঠিক করছিলা? তোহ এইটা আনছো যে?

লুবনা আপু মুখ ভেঙচি দিয়ে বললেন, নাহ ভাবলাম কী দরকার ওই ছেমড়িটার শাড়ি পরা। পরে এই শাড়ির বদলে কী কী সুবিধা যে চাইবে! তার চেয়ে থাক আমারটাই পরি।

মিতা আপু হেসে বললেন, হা হা হা, ভালোই বলছো। আচ্ছা তুমি আমার শাড়ি পরো। আমারও গোলাপি কালারের একটা শাড়ি আছে। এখনো পরি নি একবারও।

লুবনা আপু তিড়িং করে লাফ দিয়ে মিতা আপুর কাছে গিয়ে বলল, দেখি দেখি বার কর না। নতুন তোর কাছে আছে আগে বলবি না?

hostel 61

মিতা আপু ট্রাঙ্ক থেকে লুবনা আপুকে গোলাপি রঙের একটা কোটা শাড়ি বের করে দিলেন। লুবনা আপু ছোট বাচ্চাদের মত শাড়িটা হাতে নিয়ে মিতা আপুকে বললেন, দে না মিতা শাড়িটা পরিয়ে। তোর ভাই আমাকে দেখে পুরাই টাশকি খেয়ে যাবে। দেখিস…।

মিতা আপু শাড়িটা খুলে লুবনা আপুকে পরিয়ে দিচ্ছেন, আমি পাশে সেফটি পিন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। টুশি, রিজভিয়া আর ঝর্না আপু রুমে ঢুকলেন হাতে ফুল নিয়ে। আপুরা সবাই রিতিমত খিক খিক করতে করতে অস্থির হয়ে যাচ্ছে, কেউ কথাই বলতে পারছে না।

লুবনা আপু চিৎকার করে বললেন, ওই বেত্তমিজের দল, আবার নয়া কী বুদ্ধি পাকাইতে ফুল নিয়া আসলি? তোরা কি আমার বোকা, গাধা, ভদ্র জামাইটারে নাকানি-চুবানি না খাওয়াইয়া ছাড়বি না?

টুশি আপু একটু মুচকি হেসে বললেন, লুবনা আপু, আমরা কি কেবল নাকানি-চুবানি খাওয়াইতে জানি? দেখ তোমার জামাইরে খাওয়াবো বলে কোক, কেক, বিস্কিট, চানাচুর, আপেল কমলা কত কিছু আনছি। তাও নিজেদের টাকা দিয়া।

ঝর্না আপু বললেন, লুবনা তোর জামাইয়ের নতুন চাকরি বলে কথা…।

লুবনা আপু বললেন, “হুমম, ঝর্না তুই একটু পিনচ না করলে তো থাকতেই পারিস না। থাক, লিমনরে বলবো নে বেতন পাইয়া তোরেই আগে খাওনটা দিতে।

ঝর্না আপু মুখ ভেংচি দিয়ে বললেন, হইছে, দেখা যাবে কে খাওনের ট্রিটটা মনে রাখে।

মিতা আপু লুবনা আপুর নড়াচড়ায় বিরক্ত হয়ে বললেন, উফফ আমাকে শাড়িটা পরাইতে দিবা? নাকি লিমন ভাইয়া আইসা দেখবে তুমি ব্লাউজ, পেটিকোট পইরা বইসা আছো?

লুবনা আপু একটু লজ্জা পেয়ে বললেন, ধুর বাজে কথা কইছ না তো। নে পরা শাড়িটা সুন্দর কইরা, আর নড়মু না, এই মুখ বন্ধ রাখলাম।

মিতা আপু লুবনা আপুকে ঝাক্কাস করে শাড়ি পরিয়েছেন। ঠিকঠাক পার্লারের মত করে। এখন সাজাতে বসছেন। টুশি আপু ঝর্না আপুও বেশ সুন্দর ড্রেস পরেছেন। আমি আর মিতা আপুও পরেছি। কিন্তু আমরা তো বেড়াতে যাব। নয়তো আমি মনে হয় এমন নতুন বাইরে পড়ার ড্রেস পরতাম না।

লুবনা আপুকে সাজানো শেষ। পুরাই নতুন বউয়ের মত লাগছে। নতুন বউরা বিয়ের পর কোথাও ঘুরতে বের হলে যেই রকম সাজ দেয় সেই রকম লাগছে আপুকে।

আপু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একটা চিৎকার দিয়ে বললেন, “ওরে আমার চান্দের টুকরা বইন, লিমন তো আজ পাঙ্খা হইয়া যাইব আমারে দেখলে। তোরে তো কিছু না দিলেই না। আয় বুকে আয় বইন।” এই কথা বলেই লুবনা আপু মিতা আপুকে চেপে জড়িয়ে ধরলেন। মিতা আপু কোনোমতে “না” “না” বলতে বলতে বললেন, “হইছে ছাইড়া দাও লুবনাআআআ…. আপু। আমারে ছাইড়া দিলেই চলবে আর কিচ্ছু দরকার নাই।”

লুবনা আপু খিক খিক করে বললেন, ওক্কে দিলাম ছাইড়া।

টুশি আপুরা ফুলের তোরা এনেছে লুবনা আপুর রুমের ফুলদানিতে রাখবে বলে। আর লিমন ভাইয়াকে শিখিয়ে দিবে যেন লুবনা আপুর খোপায় একটা ফুল নিয়ে গুঁজে দেয়।

২৫.
আইডিয়াটা আসলেই বেশ রোমান্টিক। আমার তো রিয়াদের কথা মনে পড়ছে। এক সময় রিয়াদ আমাকে প্রতিদিন একটা করে গোলাপ উপহার দিত। তখনও আমাদের সম্পর্ক হয় নি। মানে, আমাকে তখনও রিয়াদ প্রোপজ করে নি। প্রায় এক বছর ধরে ডেইলি একটা করে গোলাপ দিয়ে বেশ পটিয়ে ফেলেছিল আমাকে। ফাইনালি একদিন যখন এসে বলল, “বিথী একটা কথা বলব তোমাকে? আসলে অনেক দিন ভাবছি বলব। কিন্তু সামনা-সামনি বলতে হবে।”

আমি তো মনে মনে হেব্বি খুশি, যাক এইবার বোবার মুখে কথা ফুটল। এই গোলাপ ডেইলি আর কত ভাল লাগে! আমি তো জীবনেও নিজে থেকে বলব না এই মদনটারে। আরে এত কথা বলিস আর এই ছোট্ট কথাটা বলতে গিয়ে শুধু হাতে একটা গোলাপ দিয়েই জবান বন্ধ। যাক, সেই দিন খুব শান্ত স্বরে ফোন করে বলল, বাসার ছাদে আসতে।

আমাদের বাসার ছাদে কেউ তেমন যেত না অফ পিক আওয়ারে। অফ পিক আওয়ার হল, দুপুর ৩-৪টা, সকাল ১০টা পর্যন্ত আর সন্ধা ৬ থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। রাত দশটার দিকে একবার অ্যাপার্টমেন্টের গার্ডরা চেক করে যায়। রিয়াদ আমাকে সন্ধ্যা ৭টায় আসতে বলল। আমি তখন বেশিক্ষণ বাইরে থাকতে পারতাম না।

হোস্টেলে আসার পর থেকে এত স্বাধীনতা আর রিয়াদই আমার কাছে নেই। ইশ একসময় কত ন্যাকামি করত। আমার সাথে দেখা হওয়ার কথা শুনলে নাকি তার বুকের ভিতর মোচর দিয়ে ব্যথা করত। মানুষ পারেও। আশ্চর্য লাগে এখন কত বদলে গেছে। একটা ফোনও আর করে নি। সনিকেও করল না। আমার খবর জানতেও ইচ্ছা হচ্ছে না তার। লিমন ভাই আজ হোস্টেলে আসবে লুবনা আপুর জন্য। কত ভালোবাসলে এভাবে আসতে ইচ্ছা হয় ভাবলেই অবাক লাগে। লুবনা আপুর খুশি দেখে আমারও খুব ভালো লাগছে। পুরা চারতলায় মনে হচ্ছে ঈদের আমেজ। উৎসব উৎসব ভাব চারিদিকে।

লিমন ভাইয়া আসবে বিকাল ৫টায়। কিন্তু আমরা প্রায় রেডি। আরো এক ঘণ্টা বাকি। ভাইয়া আসলে কী কী খাবার দেয়া হবে, কীভাবে আপুরা নিচের সুপারভাইজার খালাদের ম্যানেজ করবে সেই প্লানও তৈরি। শুনছি খালাদের মোটামুটি ম্যানেজ করা হয়ে গেলেও ভাইয়া আসলে নিচ থেকে গার্ড দেয়ার জন্য খালাদের অল্পবয়সী মেয়েদের কাউকে পাঠানো হবে। অফিস কর্তৃপক্ষের আদেশ এটা, যতক্ষণ মেকানিক কাজ করবে ততক্ষণ সেই গার্ডও থাকবে সাথে। এত বাধার পরও হোস্টেলে কিছু সময়ের জন্য অন্য সব মেয়েদের সামনে নিজের বয়ফ্রেন্ডকে উপস্থাপনের সুযোগ হারাতে চায় না কোন আপুই। যতই গার্ড থাক মিতা আপুরা সবটাই নিজেদের মত ম্যানেজ করে নিতে পারবেন।

লিমন ভাইয়া নাকি মগবাজার থাকেন। অলরেডি বের হয়ে গেছেন বাসা থেকে। সবার মধ্যেই দেখি বেশ আগ্রহ। আমার মধ্যেও খুব আগ্রহ কাজ করছে। কী হবে, ভাইয়া আসার পর কী করবে সবাই, লুবনা আপু কী করবে, কী কথা বলবে উনারা আরো আকাশপাতাল ঘটনা নিয়ে ভাবছি।

লিমন ভাইয়ার মত রিয়াদের বাসাও মগবাজার ছিল। এইজন্য রিয়াদ মগবাজার থেকে মিরপুর আমাদের বাসার ছাদে আসতো একটু আমার সাথে দেখা করতে। আর গার্ডরা রিয়াদকে কোথায় যাবেন জিজ্ঞেস করলে, আমি শিখিয়ে দিয়েছিলাম তিন তলার একটা ছেলের নাম বলতে। ওই ছেলেটা বেশির ভাগ সময় বাসাতেই থাকত আমি জানতাম সেটা। ছেলেটার নাম রিমন। খুব চুপচাপ। আমার সাথে প্রায়ই লিফটে দেখা হয়। নিজেই একদিন কথা বলল, তুমি কি থার্টিনে থাকো?

আমি বললাম, হুমম।

ছেলেটা চশমা একটু ঠিক করতে করতেই লিফট তিন তলায় চলে আসল। তারপর “বাই” বলে চলে গেল। এভাবে প্রায়ই একটু একটু কথা হত। কিন্তু ও তিন তলায় থাকত বলে লিফট তাড়াতাড়ি চলে আসত আর রিমনকে নেমে যেতে হত। তেমন ভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হত না আমাদের। কিন্তু আমি বুঝতাম রিমনের একটা আগ্রহ আছে আমার প্রতি।

একদিন লিফট অফ। স্কুল থেকে বাসায় ফিরছি। আমি হেঁটে উঠছি। লিমনও উঠছে। দেখা হয়ে গেল ওর সাথে, গল্প করছি আমরা। তুমি কোথায় পড়, কী করো, কতদিন এইখানে আছো, কয় ভাই বোন ইত্যাদি ইত্যাদি বলতে বলতে তিন তলা চলে আসলাম।

আমি বললাম, রিমন ভাল লাগল তোমার সাথে কথা বলে। তাহলে যাও বাসায়, টাটা।

রিমন মাথা চুলকিয়ে মাথা নিচু করে বলল, এখনও তো তোমাকে অনেক উপরে উঠতে হবে। তুমি যদি কিছু মনে না করো প্লিজ আমি তোমার সাথে থার্টিন পর্যন্ত উঠতে চাই। তুমি অনেক সুইট, আমি জানি তুমি নিষেধ করবা না। ট্রাস্ট মি, তুমি বোর হবা না আমার সাথে।

সিঁড়িতে কেউই ছিল না তখন। দুপুর টাইম বলে। আমি একটু ভেবে বললাম, “আচ্ছা চলো।”

রিমন একা, কোন ভাইবোন নেই। বাবা-মা মিনিস্ট্রিতে চাকরি করেন। সারা দিন একাই বাসায় থাকে। আমার সাথে অনেক গল্প হল। বাসায় যেতেও বলল। ভিডিও গেমস খেলবে আমার সাথে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ আইডিয়াটা মাথায় আসল। আমি রিমনকে বললাম, “রিমন তুমি আর আমি তো এখন ফ্রেন্ড হয়ে গেছি। আর আমরা তো একই ক্লাসেও পড়ি। সো, তুমি কি তোমার ফ্রেন্ডকে একটা হেল্প করবা?”

রিমন খুব আগ্রহ নিয়ে বলল, অবশ্যই। কী, বলো তুমি? আমি তোমাকে যে কোন রকম হেল্প করতে পারি। তুমি যে আমাকে এত তাড়াতাড়ি বন্ধু মেনে নিবা সেটা তো আমি ভাবতেই পারি না..! বলোই না কী হেল্প?

তখনই দেরি না করে বলে ফেললাম। “আসলে কী জানো রিমন, আমার মা বাবা খুব রাগী মানুষ। স্কুলে যাওয়া ছাড়া আমাকে কোথাও যেতেও দেয় না। খুব বেশি হলে একটু ছাদে উঠতে দেয়। এমনকি বন্ধুদের সাথে গল্পগুজব করারও সুযোগ নেই। এই দেখো, এখন তুমি ছাড়া এইখানে কারো সাথে কথাও হয় না। আবার কবে তোমার সাথে কথা হবে তাও জানি না।”

রিমন বলল, “আরে এই কথা? তুমি কোন চিন্তা করো না। তুমি ইন্টারকমে আমাকে জানিয়ে ‍দিবা কখন ছাদে উঠবা আমি হাজির হয়ে যাব।”

আমি একটু নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম, “হুমম, তা তো অবশ্যই কিন্তু আমার আরো কিছু ফ্রেন্ড আছে তারাও যদি আসতে পারত তাহলে ভাল হত। তাই আমার বাসার কথা বলে তো ছাদে ওরা উঠতে পারবে না। তোমার সাথে দেখা করার কথা বলে যদি ছাদে ওঠে তোমার কি কোন অসুবিধা আছে? প্রথম প্রথম গার্ডরা তোমাকে ইন্টারকমে বিরক্ত করবে। আমার বন্ধু রিয়াদ মানে, বন্ধুরা এসে তোমার কথা বললে। পরে গার্ডরা ওদের চিনে গেলে আর বিরক্ত করবে না। আসলে তোমার বাসায় তো কেউ থাকে না তাই বললাম।”

রিমন বলল, “আরে কী যে বলো। তোমার কোনো ব্যাপারে কোন অসুবিধা নাই আমার। তোমার বন্ধুরা তো আমারও বন্ধু।”

রিমনের এই কথাটায় একটু বিরক্ত লাগল আমার। তবুও একটু হেসে বললাম, “তা তো অবশ্যই। ধন্যবাদ তোমাকে। অনেক অনেক ধন্যবাদ।”

রিমনটা বেশ আঁতেল। ফ্যাল ফ্যাল করে হাসছে। আমার পিছন ছাড়ার কোন নামই নেই। যদিও ও অনেক বড় হেল্প আমাকে করতে রাজি হল, তবুও হ্যাংলার মত কথা বলার চেষ্টা করছে। আর তো কথাও খুঁজে পাচ্ছি না যে ওর সাথে গ্যাজাবো। প্রথম প্রথম ভালোই লাগছিল এখন কেমন যেন বিরক্ত লাগছে। কথা বলতে বলতে ১৩ তলায় চলে আসলাম। রিমনের সেই দিকে কোন খেয়ালই নাই।

আমি বললাম, “রিমন, আমি বাসায় চলে আসছি। এই যে বি/১৩ আামাদের। আমি তাহলে আজ আসি, আবার দেখা হবে। আর দরকার হলে আমি তোমাকে ইন্টারকমে কল দেব।”

রিমন তাও দাঁড়িয়ে আছে। চশমা খুলে আমাকে বলল, “চল না একটু ছাদে যাই। বাসায় বলবা যে লিফট বন্ধ, তাই একটু লেট হল।”

বুঝলাম হেল্প যখন চেয়েছি তখন ছাদেও যেতে হবে। তাই রাজি হয়ে গেলাম। কারণ রিয়াদকে ছাদে আনার আর কোন ওয়ে নাই। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ১৬ তলা পেরিয়ে ছাদে উঠলাম। এই সময় অফ পিক আওয়ার। ছাদে কেউ থাকে না। আমি আর রিমন একটা খাম্বার উপর বসলাম।
রিমন বলল, “চল আমার বাসায় পেস্ট্রি আছে খাওয়াবো তোমাকে। তুমি তো স্কুল থেকে সেই কখন এসেছো, কিছুই খাও নি।”

আমি জোর করে মুখে হাসি এনে বললাম, “হ্যাঁ আসলেই খিদে পেয়েছে খুব। এই জন্যই তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে চাচ্ছিলাম। খিদে পেলে আমি অসুস্থ হয়ে যাই। না খেলে এখন হবেই না।”

রিমন বলল, “দেখেছো আমি তোমাকে কত বুঝি। তোমার খিদে পেয়েছে আমি টের পেলাম। এইজন্যই বলছি চল বাসায় চল।”

আমি বললাম, “আসলে রিমন লিফট নেই। আর বিকেলের আগে লিফট ঠিকও হবে না। সো, আমি তোমার বাসায় গিয়ে খেয়ে আবার হেঁটে এত উপরে উঠলে মরেই যাব। খুব কষ্ট হবে আমার। তাই আজ আমি বাসায় গিয়ে খাই। আর তোমার সাথে কথা তো হবেই। ছাদেও উঠব আমরা। এখন তুমিও বাসায় যাও। আমিও যাই।”

রিমন মাথা নেড়ে বলল, “হুমম তা ঠিক, ঠিক…। সরি, ওকে। চল যাই আমরা।”

আমি আর রিমন নিচে নেমে আসলাম। আমি বাসার দরজায় দাঁড়িয়ে রিমনকে টাটা দিয়ে চলে যেতে বললাম। রিমন দাঁড়িয়েই আছে দাঁতগুলো বার করে। রিমনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে ভীষণ অসহ্য লাগছে। বাধ্য হয়ে বললাম, “রিমন আমি তো তোমার জন্য বাসায় কলিং বেল দিতে পারছি না। আমার মা যদি দেখে তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে আছ!”

রিমন বলল, “ও সরি সরি।”

রিমন প্রায় দৌড়ে নেমে গেল। মনে হল মায়ের কথা শুনে ভয় পেয়েছে।

লিমন ভাইয়া হোস্টেলে যেভাবে আসবেন আজ একসময় আমার বাসার ছাদেও রিয়াদকে এইভাবে লুকিয়ে ঢুকাতাম। রিমনের হেল্প না পেলে হয়তো রিয়াদের সাথে ছাদে বসে গল্প করা কখনও হত না। কলেজে ওঠার পর আর রিমনের সাথে যোগাযোগ হয় নি। লাস্টের দিকে রিয়াদ রিমনকে সহ্য করতে পারত না। সেই জন্য আর আমাদের বন্ধুত্বটাও টিকে নি। কিন্তু রিমন রিয়াদের ব্যাপারে কোন অভিযোগ করে নি।

hostel 6Y

রিমনের বাসার কথা বলে রিয়াদ ছাদে উঠত। প্রথম তিন মাস খুব জ্বালাতন করল রিমন। ওকে ইন্টারকমে যেদিন প্রথম গার্ড আঙ্কেলরা কল করে বললেন রিয়াদ নামের একটা ছেলে আসছে, ও বুঝে যায়। এর আগে আমি অবশ্য জানিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু শুধু রিয়াদ ছাড়া অন্য কেউ আসবে না, সেটা না বললেও রিমন বুঝতে পেরেছে। যাই হোক, আমি ছাদে গিয়ে দেখি রিমন রিয়াদের সাথে গল্প করছে। সেইদিন আমরা তিনজনই ছিলাম যতক্ষণ রিয়াদ ছিল। যেহেতু রিমনের যাওয়ার কোন সম্ভাবনাই দেখল না রিয়াদ, তাই সেইদিন গল্প করে চলে গেল।

এইভাবে তিন মাস কাটালাম রিমনকে নিয়ে। কিছুদিন পর আর রিয়াদ আসলে গার্ড আঙ্কেলরা রিমনকে ফোন করত না। কিন্তু মাঝে মাঝে রিমন আমাদের খুঁজতে ছাদে ঠিকই চলে আসত। আমি আর রিয়াদ মোটেও খারাপ ব্যবহার করার সাহস পেতাম না। ভয় ছিল যদি রিমন বলে দেয় রিয়াদের কথা সবাইকে। তাহলে রিয়াদের সাথে দেখা করা এবং মান-সম্মান সবই যাবে। তাই বেশ বুঝেশুনে চলতে হচ্ছিল।

২৬.
লুবনা আপু সেজেগুজে পটের বিবি হয়ে বিছানার উপর বসে আছেন। তেমন কথাও বলছেন না কারো সাথে। সাজ নষ্ট হয়ে যাবে বলে।

মিতা আপু লুবনা আপু আর ঝর্না আপুকে কানে কানে কী যেন বললেন। লুবনা আপু বিছানা থেকে উঠে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ৫০০ টাকা বের করে মিতা আপুকে দিলেন। মিতা আপু টাকাটা নিয়ে রিজভিয়া আপুর কাছ থেকে একশ একশ করে নোট ভাঙিয়ে নিলেন। তারপর ন্যান্সি আপুকে ডেকে বললেন, “ন্যান্সি শোনো, তুমি নিচের লাভলির মা মোটা খালাকে এই ৪০০ টাকা দিবা। বলবা, খালা এইটা লুবনা আপুর মারফত আপনার বকশিস।”

ন্যান্সি আপু দোনোমোনো করে বললেন, “আমি যাব মিতা? আমি তো এইসব খালা-টালাদের সাথে কথাই বলি না।”

মিতা আপু বিরক্ত ভাবে বললে, “কখনো বলো নাই এখন বলবা, তাইলেই তো হয়। আমরা সবার পরিচিত মুখ, আমরা মোটামুটি সাজগোঁজ অবস্থায় নিচের অফিসের লোক দেখলে সন্দেহ করতে পারে। তাই তুমি দিয়ে আসাটা ভালো। আর একটু লাভলিরে বইলো আমরা ডাকছি যেন এক্ষনি আসে।”

ন্যান্সি আপু রোকসানা আপুর সাথে টাকাটা নিয়ে চলে গেলেন।

একটু পর লাভলি একাই আসলো। সাথে রোকসানা বা ন্যান্সি আপু কেউ আসি নি। লাভলিকে কাছে ডেকে মিতা আপু বললেন, “কীরে লাভলি, তোর প্রেম কেমন চলতেছে, মেসের গোলগাল পোলাটার লগে? ঝর্না আপু না থাকলে গতবার তোর আর তোর মা দুজনরেই হোস্টেল ছাইড়া বাড়িত যাইতে হইত।”

লাভলি ক্যানকেনে স্বরে বলল, “হ, তয় আমার মা তো চারতলার জইন্য বেবাগ কাম করতে লেঠ করে না।”

মিতা আপু বললেন, “হুমম তাতে কী, কয়েক মাস আগে যখন দুই তলার মেয়ের মোবাইল নিয়া ধরা পড়লি তহন তো আর কেউই তোদের রাখতে চায় নাই। এই আমি ফাইট কইরা রাখলাম তোদের।”

লাভলি মিতা আপুর কথায় তেমন কান না দিয়ে লুবনা আপুর দিকে তাকিয়ে চোখগুলি বড় বড় করে বলল, “ওম্মা লুবনা আফারে তো কারিশমার মত লাগতাছে। কে সাজাইল মিতা আফায় ক্যানে? চুপার লাগতাছে আফারে। ঘটনা কী আফা, সাজছেন ক্যানে?”

মিতা আপু ধমক দিয়ে লাভলিকে বললেন, “ওই, সন্ধ্যার পর নাস্তা করিস উপরে এসে। আর একটা ভাইয়া আসবে কম্পিউটার ঠিক করতে এক ঘণ্টার মত থাকবেন। তুই উনার সাথে উপরে চইলা আসিস। তারপর উনি উনার মত উপরে এসে কম্পিউটার ঠিক করবে তোরে যেমনে থাকতে বলব আমাদের সাথে থাকবি। আর উপরের কোন কথা নিচ পর্যন্ত যেন না যায়। মনে থাকবে? এই নে একশ টাকা, কানের দুল কিনিস।”

লাভলি খিক খিক করে হেসে বলল, “আফা ভাইয়া কি পরিচিত মিস্ত্রি? চিন্তা লইয়েন না, আমি সব সামলাইয়া নিমু নে।”

আপুরা কেউ কিছু বলল না লাভলির হেয়ালির ব্যাপারে। মিতা আপু বললেন, আচ্ছা এখন যা, সময় মত আসিস। আর তোর সাথে অন্য কেউ যেন না আসে খেয়াল রাখিস।”

লাভলি বলল, আইচ্ছা, নো টেনচন, আমি তো আছিই।

লাভলি চলে যাওয়ার পর রাসফি লুবনা আপুদের রুমে আসলো ওর বড় বোন ন্যান্সির সঙ্গে। এসে ওরা একটু কোনায় দাঁড়ালো। আমি রাসফিকে হাত ইশারা করে ডাকলাম। রাসফি ন্যান্সি আপুর কাছ থেকে সরে আমার পাশে এসে দাঁড়ালো। সবাই গল্পে ব্যস্ত তাই আমাদের দিকে কারো তেমন খেয়াল নেই।

রাসফি আমাকে নিচু স্বরে বলল, “ওই বিথী, আজ ন্যান-এর বয় ফ্রেন্ডরে আমারও ভাল্লাগছে। কী করি বল তো? ভাইয়াও দেখলাম কেমন আমার দিকে পিট পিট করে তাকাচ্ছিল। আমি তো ন্যানের মত দেখতে স্লিম না তাই আর সাহস করে টোকা দিলাম না ছেলেটারে।”

রাসফির এমন আজগুবি কথা শুনে আমি বললাম, ধুর কী বলো এইসব? আপুর বয়ফ্রেন্ড যখন তাহলে তুমি কেন তাকাবা? আপুদের তাদের মতই থাকতে দাও।”

রাসফি বলল, “কচুটা। কত্ত পোলারে ঘোরাইল ন্যান। এখন এই পোলার টাকা আছে বলে ন্যান-এর পেছনে আছে। নয় তো কবে বাদ দিয়ে দিত। আর আমি তাকাইলে দোষ?”

আমি বললাম, দোষ কেন হবে রাসফি? প্রেম আমিও করেছি। কিন্তু এখন আর নেই ছেলেটা। ছেলেরা ভালো না, তুমি প্রেম করলে বুঝতা।

রাসফি বলল, আর প্রেম কখন করব? বইনের প্রেম কীর্তন দেখতে দেখতে দিন পার করি। তারপর যা সময় থাকে পড়তে পড়তে চলে যায়।

আমি হেসে বললাম, আরে এখনো অনেক সময় আছে। তখন আমি আর তুমি দুজন মিলেই প্রেম করবো চুটিয়ে। একটু বড় হয়ে নেই।

তখন রাসফি একটু উচ্চস্বরে হেসে বলল, হুমম তাহ। তাহলে তোমার আর প্রেম হচ্ছে না। কারণ তুমি আর বড় হবা বলে মনে হয় না আমার।

আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল রাসফির উপর। রাগ করে বললাম, “হ্যাঁ, তোমারে বলছে…। চুপ থাকো তো। আজাইরা সব কথা তোমার। কী হয়েছে তোমার বলো তো আমাকে।”

রাসফি বলল, আচ্ছা পরে বলব।

রিমন ভাইয়া কল দিয়েছে মাত্র এখন বাংলা মটর। জ্যামে আটকে আছে। ওই এলাকাটাই এমন। শুধু জ্যাম জ্যাম আর জ্যাম। রিয়াদ যখন আসতো তখনও এমন ছিল।

সেইদিন যখন রিয়াদ দেখা করতে আসবে বললো আমি খুব ভয়ে ছিলাম যে ও ঠিক সময় ছাদে উঠতে পারবে তো!

হাজার ঝক্কিঝামেলা ডিঙিয়ে যখন রিয়াদ আমার বাসার ছাদে আসতো তখন খুব ভালো লাগত। যেদিন রিয়াদ ফোন করে বলল একটা জরুরি কথা বলতে আসবে সেইদিন আরো একটা ঝামেলার ভয় পাচ্ছিলাম। রিয়াদকে নিয়ে ছাদে উঠব ভাবতেই প্রথমে আশঙ্কায় ছিলাম রিমন না আবার হাজির হয়। এমনিতেই এত অপেক্ষার পর রিয়াদ কিছু বলতে চাচ্ছে তাও যদি বাধা আসে তাহলে হয়তো আর শোনাই হবে না। তাই বিকালে ঠিক করলাম রিমনকে ছাদে আসতে বলব গল্প করার জন্য। তাহলে আর হয়তো রিমনের সন্ধ্যার পর ছাদে ওঠার ইচ্ছা জাগবে না। তখন রিয়াদের কথা শান্তিতে শুনতে পারব। সেইদিন মনে মনে একটা গান সারাক্ষণ আওড়াচ্ছিলাম, “তুমি বলবে আমি শুনব, তুমি বলবে বলবে আমি শুনব…।”

রিমনকে আমি সেই প্রথম মায়ের ফোন থেকে কল দিলাম। তখনও আমার নিজের বলে কোন ফোন হয় নি। রিমনের নাম্বারটা একদিন নিয়ে ডাইরিতে টুকে রেখেছিলাম। আমার ফোন পেয়ে তো রিমন সেইই… খুশি হল।

অনেক বার করে বললাম এটা মায়ের ফোন, কল দিও না। তবু বিকাল চারটায় রিমন ঠিকই কনফার্ম হওয়ার জন্য কল দিল মায়ের ফোনে। ভাগ্যিস মা তখন রান্নাঘরে ছিলেন। তাই ফোনটা আমার হাতেই পড়ল। ফোনটা ধরেই ধমক দিয়ে বললাম, “আরে ১০ মিনিট পর আসো ছাদে। কিন্তু কোন কল আর দিও না। খুব ঝামেলায় পড়লাম ফোন নাম্বারটা দিয়ে। এই ছেলের কারণেই মনে হয় আমি আর রিয়াদ একদিন ধরা পড়ে যাব।

মাকে ছাদে ওঠার কথা বলে চলে গেলাম। তারপর রিমন আসল আরো ৫ মিনিট পর। ধমকালাম ইচ্ছামত। বললাম, “তুমি চাও কী বলো তো? তোমার জন্য তো মায়ের কাছে আরেকটু হলে আমি কালার হতাম। তোমাকে কল দিতে নিষেধ করার পরও কল দিলা! এইসব কারণে আমি তোমার সাথে আর কথাই বলতে চাই না।”

রিমন মাথা নিচু করে বলল, “সরি, আসলে বিশ্বাস হচ্ছিল না যে তুমি সত্যি সত্যিই আসবা আমার সাথে গল্প করতে। তাই শিওর হতে কল দিয়ে ফেলেছি। বিশ্বাস করো আন্টি ফোনটা রিসিভ করলে আমি কথা না বলেই রেখে দিতাম। এই বুদ্ধিটা আমার আছে। তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো।”

আমি খুব রাগ হয়ে বললাম, “থাক, তোমাকে আর আমার কোন নিশ্চয়তা দেওয়ার দরকার নাই। অনেক হয়েছে। রাগে তোমার সাথে আর কথা বলতেই ইচ্ছা হচ্ছে না। চুপ করো প্লিজ। যেখানে আমি বললাম, আমি আসব তুমি এসো ছাদে গল্প করব সেখানে তুমি এমন একটা কাজ কীভাবে করলা!”

রিমনের গলায় এতক্ষণ খুব নরম, অপরাধী একটা ভাব ছিল। হঠাৎ একটু চাপাস্বরে বলল, “কীভাবে বিশ্বাস করি বলো? রিয়াদ না আসলে তো তুমি ছাদেও আসো না আর তাই আমার সাথে কথাও বলো না। রিয়াদ আসলে তোমরা দুজনেই অনেক কথা বলো। আমি তো শুধু তোমাদের কথা শুনি। আর ও গেলে তুমিও চলে যাও। তাই আজ একটু অবাক হয়েছি। তাতেই আমার দোষ হয়ে গেল?”

আমার রিমনের কথা শুনে একটু একটু ভয় লাগল। ওমা পোলা বলে কী! এখন যদি ও সবাইকে বলে দেয় কী হবে আমাদের! তাই একটু গলাটা নরম করে বললাম, “ওমা আমি তো সময় পাই না রিমন, তাই তোমার সাথে কথা বলার সুযোগ হয় না। আর যখন তখন বাসা থেকেও বের হতে পারি না, এর মধ্যে তোমার আর রিয়াদের সাথে আলাদা দেখা করা কীভাবে সম্ভব বলো? এই যে বলছো আমি রিয়াদের সাথেই বেশি কথা বলি, আসলে রিয়াদ তো আমার অনেক আগের বন্ধু তাই ওর সাথে বেশি কথা বলি। এই জন্য তুমি রাগ করবা জানলে তো আমি তোমার হেল্প নিয়ে আর কখনোই রিয়াদকে ছাদে আসতে বলতাম না। ওকে, রিমন সরি আর রিয়াদ আসবে না।”

রিমন খুব কাচুমাচু করে নরম গলায় বলল, “সরি বিথী, তুমি প্লিজ এমন কথা বোলো না। আমি জানি তুমি রিয়াদকে অনেক পছন্দ করো, মোর দেন মি। কিন্তু আমিও তোমাকে অনেক পছন্দ করি, তাই একটু রুঢ়ভাবে কথা বলে ফেলেছি।”

রিমন হাঁটু গেড়ে নিজের কানে ধরে আমার সামনে বসে পড়ল। আমি দাঁড়িয়েই ছিলাম।

তাড়াতাড়া ওকে উঠিয়ে বললাম, “ওকে ঠিক আছে। আমারো কিছু ভুল আছে মেনে নিচ্ছি। আসলে তোমাকে তেমন সময় দিতে পারিনা। মাকে আমি খুব ভয় পাই এই জন্য বের হতে পারি না। একদিন তোমার বাসায় গিয়ে ভিডিও গেমস খেলব, ওকে তো?”

রিমন কান ছেড়ে উঠে বসে বলল, “উফ তাও যে ম্যাম আপনি ক্ষমা করেছেন, ভাবতেই পারছি না। ভাবলাম এইবারে মনে হয় আমার সাথে আপনি কথা বলা অফ করে দিবেন।”

আমি মনে মনে ভাবছিলাম, আল্লাহ ছেলে বলে কী। আমি আরো ভাবছি, আমার রিয়াদের আসা মনে হয় এইবারে বন্ধই হয়ে গেল। সে যাই হোক, কোনো মতে মেকাপ দিতে যখন পারলাম এখন সন্ধ্যার পর বের হওয়াটা নিয়ে ভাবতে হবে। প্রায় বিকাল পার হচ্ছে আমি রিমনকে বললাম, “এসব কিছু না রিমন। বন্ধুদের মধ্যে তো এসব হয়েই থাকে। ঝগড়া বিবাদ না হলে কি হয়?”

রিমন হেসে বলল, “তা তো ঠিকই। কিন্তু তুমি রেগে গেলে আমার ভয় লাগে। তোমাকে হারানোর ভয়। আর মনে হয় তুমি আমার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিবা। এমন লাগে।”

আমি রিমনের মুখে এমন অপ্রাসঙ্গিক রোমান্টিক কথা শুনে বিব্রত হলাম। এমন ধরনের কথা তো আমাকে আজ পর্যন্ত রিয়াদও বলে নি। রিয়াদের মুখে শুনলে ভালই লাগত। কিন্তু রিমনের মুখ থেকে শুনতে খুব অস্বস্তি লাগছে। মনে হচ্ছে কোনো মতে এইখান থেকে পালাতে পারলেই বাঁচি।

রিমনকে বললাম, “অনেক দেরি হয়ে গেছে, আমি যাই। মা চিন্তা করবে। বকবেও। বাই রিমন, আবার দেখা হবে।”

রিমন বলল, “আর একটু থাকো না প্লিজ?”

আমি ওকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই স্যান্ডেলটা পায়ে গলিয়েই রিমনকে টাটা দিতে দিতে ছুট দিলাম।

পিছন ফিরে আরেক বার বললাম, “আবার দেখা হবে। বাই রিমন। মা রাগ করবে।”

লিফটে কল দিয়ে সিঁড়িকোঠায় দাঁড়িয়ে আছি। রিমনকে দেখলাম না। অন্য দিন আমি চলে আসলেও, ও লিফট পর্যন্ত আসে। আজ নেই। যাই ভাবুক আমি তো বাঁচলাম। লিফটে উঠে ভাবছি আবার রাত আটটার দিকে মাকে কী বলে বের হব। রিয়াদকেই বা কী বলব এখন। কিছু একটা বুদ্ধি বের করে আজ রিয়াদের মনের কথা, ও কী বলতে চায় সব আমাকে শুনতেই হবে।

(কিস্তি ৭)

About Author

নওয়াজ ফারহিন অন্তরা
নওয়াজ ফারহিন অন্তরা

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ছেন। জন্ম- ঢাকা, মে ১৯৯৩।