হোস্টেল (৮)

(আগের পর্ব)

৩৪.
লিমন ভাই আর লাভলি সিঁড়ি দিয়ে ওপরে হেঁটে উঠছে। সাথে দেখছি লাভলির মায়ের ছোট বোনও আছে। ওই মহিলার নাম চামেলি বাহা। নামটা শুনেছি লাভলির মা মানে আমাদের হোস্টেলের নেত্রী খালার মুখে।

উনি চৌকির উপর বসে হাক ডেকে ডেকে ডাকেন, “ওহে চামেলী বাহা তুই কনে? ভাতারের লগে হারাদিন ফুন করবি তো একানে আইসস কোন হেডোমটা দেখাইতে? যা না, তোর ভাতারের কোলে বইসা থাক না।”

নেত্রী খালার নাম হাসি। কিন্তু উনি মোটেও হাসিখুশি না। সারাদিন তার আশে-পাশের খালাদের গালিগালাজ ছাড়া কথাই বলেন না। এই নিয়ে কয়েকবার আমাদের চারতলার আপুরা খালাকে বলেছেও, “ও খালা তোমার ভাষা কি একটু ভালো করা যায় না? আমাদের কানেও তো লাগে নাকি?”

খালা ভীমের মত গলা খাকিয়ে উত্তর দিলেন, “ওরে আমার কান গো! তোমরা যে কী কী সব কারবার করো সবই তো পার পাইয়া যাও গা এই হাসি বেগমের গলার জোরে। আবার ছেমরিগো জোর দেখো না, খালারে কয় কানে লাগে তাগোর।”

মিতা আপু তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বললেন, “ও খালা রাগ কেন করেন? আপনি ছাড়া আমাদের কে আছে? ওমন না কইরা আরো দুইটা গালি দাও চামেলি বাহা খালারে।”

মিতা আপুর কথায় কিছুটা শান্ত হয়ে হাসি খালা হেসে দেন। সাধারণত ভুলেও হাসেন না উনি। কিন্তু নিজে মাঝে মাঝে কী যেন সব গল্প শোনান আমাদের, তখন একাই ভূড়ি নাচায়ে নাচায়ে হাসেন। আমরা কেউই খালার গল্প বুঝি না। যারা বুঝতো তারাও হাসতো না। কেউ কেউ কেউ হাসি হাসি মুখ করে দাঁতটা একটু বের করে আবার খাওয়ায় মন দেয়। খালা অতশত দেখেন না, চোখ দুইটা বন্ধ করে হেসেই যান। তারপর থামতেন যখন হাঁপায়ে যান। সবাই তখন সিরিয়াল দেখতো ডাইনিংয়ের টিভিতে।

হাসি খালার ছোট বোন চামেলি খালা। আর লাভলি হাসি খালার বা’ হাত। হাসি খালার মেজ বোনের মেয়ে লাভলি। দুনিয়ার আতিপাতি খবর জানানো, কে কখন কয়টায় লেট করে আসছে, কার কাছ থেকে টাকা খাওয়া যায় সেই তথ্য এমনকি যাকে লাভলি পছন্দ করে না সে একটা বেশি মাছের টুকরা নিলেও সর্বনাশ ঘটে। সব খবর পাচার করে হাসি খালার কাছে। তাই লাভলির কথা হাসি খালা বেশ শোনেন।

এই চামেলি খালা আবার লাভলিকে দেখতে পারেন না। তাই লিমন ভাই আর লাভলির সাথে চামেলি খালাকে দেখে আমি চিন্তিত হয়ে গেলাম। চামেলি খালার সামনে লাভলিকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছি না। তিন তলায় উঠতেই লাভলি চামেলি খালাকে বলল, “খালা যাও গা ছাদে কাপড় আছে উঠায় ফেলো গা। বড় খালা দেখলে আবার চিল্লাইবেন। এক্ষনি উঠাইয়া দিয়া আইসো। আর তিনতলার মিনি আফার কাপড়গুলান উঠায় দিয়া আসো। উনি টেকা দিবে নে।”

চামেলি খালা বললেন, “আইচ্ছা।”

কোনো ইচ্ছাহীনতা প্রকাশ করলেন না। আমরা চার তলায় চলে আসলাম ভাইয়াকে নিয়ে, আর চামেলি বাহা ছাদে চলে গেলেন। আমি একটু স্বস্তি পেলাম। লাভলির দিকে তাকিয়ে ধন্যবাদের হাসি দিলাম। মিতা আপু দাঁড়িয়ে আছেন চারতলার সিঁড়ি ঘরে। টুশি আর রিজভিয়া আপুও হাজির নিচ তলা থেকে। এসে বললেন, নিচের সব কিছু সেট করা আছে। সমস্যা আপাতত নাই। আর বাকিটা তো লাভলির হাতেই।

লাভলি ক্রেডিট মার্কা একটা হাসি দিল। এই মুহূর্তে লাভলির খুশিই আমাদের খুশি।

৩৫.
পুরো হোস্টেলের চার তলা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন আর সাজানো গোছানো। রজনীগন্ধা ফুলের সুবাসও পাচ্ছি। লিমন ভাইয়ার মুখে লাজুক লাজুক হাসি। মাথাটা ওঠাচ্ছেনই না। একটা রুমালের অভাব ছাড়া সবটাই নতুন জামাইয়ের মত হাবভাব দেখাচ্ছেন ভাইয়া।

পিছন থেকে টুশি আপু ভাইয়াকে চিমটি কাটলেন। ভাইয়া ক্যাঁ করে উঠলেন। আমি একটু অবাক হয়ে গেলাম। সবাই একসাথে বলে উঠলো কী হয়েছে কী?

টুশি আপু হাসতে হাসতে বললেন ,“আরে দেখলাম চিমটি কেটে লিমন ভাইয়া বেঁচে আছেন কিনা। অনুভূতি-টনুভূতি টের পাচ্ছেন কি না।”

লিমন ভাইয়ার ক্যাঁ করে ওঠাটা খুবই আনস্মার্ট ছিল। আমার কানে ক্যাচ ক্যাচ করে লাগল। মানুষ তো স্মার্টলিও উহ্‌ আহ্‌ করতে পারে! এমন কাকস্বরে কোনো স্মার্ট ছেলের চমকিয়েও তো ওঠা উচিৎ না। কেমন গেয়ো গেয়ো ভাবে ছ্যাৎ করে উঠলেন।

লুবনা আপুর কোনো ঠিকানা নাই। ভাইয়া হাজির আর আপু যে কোন গর্তের ভিতর, বের কেন হচ্ছেন না বুঝছি না। আমি মিতা আপু আর টুশি আপু লাভলির সাথে ভাইয়াকে নিয়ে লুবনা আপুর রুমের সামনে এসে দাঁড়ালাম। দরজা নক করলো মিতা আপু। দরজা খুলল রাসফি। দরজা লাল ফিতা দিয়ে আগলানো। রাসফি আর লুবনা আপু আরো কিচির মিচির করছে। ভাইয়ার জন্য লাল ফিতা কেটে ভিতরে যাওয়ার বিশাল ব্যাবস্থা করা হয়েছে। এর কিছুই আমি জানি না। কখন কী করল। ভাইয়া লজ্জায় লাল হয়ে মাথা নিচু করে বললেন, “আচ্ছা এসব না করলে হয় না?”

মিতা আপু হো হো করে হেসে ভাইয়ার কানে ফিস ফিস করে বললেন, “দুলাভাই আরো কাহিনী কিন্তু বাকি। পরী দেখবেন আর নজরানা দিবেন না ব্যাপারটা ঠিক পিওর হয় না ভাইয়া।”

ভাইয়া আর কোনো কথা না বলে কাচিটা হাতে নিয়ে ফিতা কাটতে গেলেন অমনি সবাই মিলে চিল্লিয়ে বলল, “আররররে ভাইয়া ফিতা কাটার ভ্যাট কই? এগারো শো এগারো টাকা দিয়ে তারপর কাটেন। নয়তো যেই পথ দিয়ে এসেছেন ফিরে যান উইদাউট গার্লস প্রোটেকশন।”

ভাইয়া আস্তে করে মিতা আপুকে বললেন, “আপু লুবনা কোথায়?”

টুশি আপু খিক খিক করে হেসে বললেন, “ওরে মোর খোদা, টাকা না ছাইড়া বউ খোঁজেন কেন?”

ভাইয়া এপাশ-ওপাশ উপর-নিচ চোখ বুলিয়ে পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে এক হাজার টাকা বের করে দিলেন। মিতা আপু হাতে নিলেন না। বললেন, “ভাইয়া, এগারো হাজার এগারো টাকা দিতে হবে।”

ভাইয়া আবার পকেট থেকে একশ ১৫ টাকা বের করে হাতে দিলেন। মিতা আপু টাকাটা হাতে নিয়ে বললেন, “আর চার টাকা আপনার বউকে ফিরত দিয়ে দিব। নেন এখন কাটেন ফিতা।”

রাসফিটা ফিতার ওই পারে। নয়তো ওইটার সাথে দাঁড়িয়ে আরো মজা নিতে পারতাম এখন। ভাইয়া ফিতা কেটে দরজা পেরিয়ে ঘরে ঢুকছেন। পেছনে পেছনে আমাদের দল। হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভাইয়া ঘরে ঢুকতে গিয়ে ধারাম করে পড়ে গেলেন মেজেতে। লুবনা আপুর ট্রলি ব্যাগটার হ্যান্ডেলটা সাইড দিয়ে বের হয়ে ছিল। সেটার সাথে ধাক্কা খেয়েই এই অবস্থা। আমরা সবাই মোটামুটি স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। লুবনা আপু কিছুটা দূরে দাড়িয়ে ছিলেন। “ও আল্লাহ গো” বলে একবার চিৎকার করে লুবনা আপুও চুপ।

hostel 8 a

“ও আল্লাহ গো” বলে একবার চিৎকার করে লুবনা আপুও চুপ। অলঙ্করণ. নওয়াজ ফারহিন অন্তরা

৩৬.
লিমন ভাইয়া কয়েক সেকেন্ড উপুড় হয়ে শুয়ে থেকে, তড়াক করে উঠে, সটান দাঁড়িয়ে গেলেন। আপুর চোখ ছানাবড়া। ভাইয়া উঠে লুবনা আপুর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, “যাক তাও তো দেখা পেলাম তোমার। ভেবেছিলাম এই রমণীরা আমাকে আজ আস্ত রাখবে না।” এই কথা বলেই লিমন ভাইয়া হেসে উঠলেন। হাসিটা একটু জোরেই হয়ে গেল।

মিতা আপু ভাইয়াকে বললেন, “ওই ভাইয়া আস্তে। আপনার হাসি নিচে গেলে আমরাও আস্ত থাকবো না।”

ভাইয়া জিব কেটে “সরি” বললেন। লুবনা আপু কাছে গিয়ে ভাইয়ার কাঁধে হাত রেখে উতলা কণ্ঠে বললেন, “লাগে নি তো কোথাও?”

তখন সবার লুবনা আপু আর লিমন ভাইয়ার দিকে অ্যাটেনশন। রাসফির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম আমি। রাসফিকে বললাম, “এই তোমার বোন কোথায়?”

রাসফি বলল, “ওই যে আপুর যেই বয় ফ্রেন্ডের প্রতি আমার নজর পড়েছিল, ওইটার সাথে গেছে।”

আমি “ও” বলে লুবনা আপুর দিকে তাকালাম। মিতা আপু ভাইয়াকে চেয়ারে বসতে দিল। তারপর ভাইয়াকে বললেন, “দেখেন ভাইয়া আপনাদের যা করতে হবে আমাদের মধ্যেই। একান্ত আপনাদের জন্য কোনো সময় দিতে পারবো না কারণ এই পথে সীমাহীন বাধা। যদি ধরা পড়ি আমাদের সবাইকে বের হয়ে যেতে হবে। তাই যা যা বলছি রুলসগুলো মনে রাখেন।”

ভাইয়া মাথা চুলকাতে চুলকাতে মিতা আপুর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, “আরে কী যে বলো। ওসবের দরকার নেই। আচ্ছা বলো বলো তোমার রুলস।”

আপু বললেন, “আপনি কম্পিউটারটা খুলে পার্ট পার্ট করে ফেলেন পাঁচ মিনিটে। তারপর ওই কলকব্জা আলাদা করা কম্পিউটারের সামনে বসে লুবনা আপুর সাথে মনের কথা বলেন। ইতিউতি তাকান, একটু হাত ধরেন, ইশারা দেন আমরা দূরে বসে আছি। যত দূরে থাকলে আপনাদের গুন গুন কানে না আসবে।”

ভাইয়া হেসে বললেন, “আরে তোমরাও থাকো পাশেই। কিচ্ছু একা টেকা সময় লাগবে না। ওকে এত কাছ থেকে দেখতে পেয়েছি সেটাই অনেক।”

মিতা আপু বললেন, “দেখেন ভাইয়া আমার বোনটাকে সকাল থেকে সাজিয়েছি। বউয়ের মত লাগছে। অনেক খাবার-দাবারেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। সবই আপনার জন্য। তাই দেখেন মন ভরে আমার বোনকে। আমরা গার্ডে আছি।”

লুবনা আপু হঠাৎ বিশ্বশান্ত শান্ত মুখ নিয়ে মাথা নিচু করে আছেন। যেন জীবনেও কথা বলেন নি। ভাইয়া চেয়ারটা টেনে কম্পিউটারের সামনে বসে যন্ত্রপাতি খোলা শুরু করলেন। দেখে মনে হচ্ছে ভাইয়ার ট্রেন চলে যাচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজটা শেষ করতেই হবে। আর লুবনা আপু টেবিলের পাশে খাটের উপর টিপ টপ ভঙ্গিতে সাজগোজ আগলে ভাইয়ার দিকে অপলক তাকিয়ে উনার কাজ দেখছেন। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মনোযোগ দিয়ে ভাইয়া এই প্রথম কোনো কাজ করছেন। ঝট পট কম্পিউটারটা খুলে পার্টপার্ট করে ফেললেন। আমরা ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বসে নিজেদের মধ্যে ফিস ফিস করে কথা বলছি। টুশি আপু আর রাসফি কী যেন একটা বলে নিজেরাই হেসে কুটি কুটি হয়ে যাচ্ছে। আমার শুনতে ইচ্ছা হল। মিতা আপুর পিছন থেকে বের হয়ে রাসফি আর টুশি আপুর কাছে যাচ্ছিলাম। এমন সময় ফোনটা টিং টিং করে বেজে উঠল।

ফোনের দিকে তাকিয়ে দেখি রুমা আপু কল দিয়েছেন। অনেক দিন পর আপু কল দিলেন। ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখলাম। আবার কল আসল, এবার মনে হল ধরা উচিৎ ফোনটা। রাসফির কাছে না গিয়ে লুবনা আপুর ঘর থেকে বের হয়ে আমাদের রুমের দিকে যাচ্ছি। আমাদের রুমে ঢুকতে হয় রুবিদের রুম হয়ে। আমি কখনো রুবিদের রুমে ঢুকি না একা। যেই দিন রুবি আমার নামে সাবান চুরির অপবাদ দিয়েছিল সেদিন থেকে যাই না। এই জন্য লুবনা আপুর রুমেও যাওয়া হয় না। আজ ঢুকতে হচ্ছে।

আমি ফোনটা রিসিভ করতে যাব এমন সময় চোখে পড়লো রুবিদের ঘরের জানলা দিয়ে লাভলি পাশের বাসার একটা ছেলের হাত ধরছে। বাড়ি দুইটা একদম পাশাপাশি। পাশের বিল্ডিংটা ছেলেদের মেস। আমি একটু স্লো হয়ে গেলাম। লাভলি যেই ছেলের হাতটা ধরে আছে হাতটা বেশ মোটা আর বড় বড় লোম। কেমন যেন কালোও ছেলেটার হাত। এটাই কি সেই ছেলে যে লাভলির নতুন পাশের বাসার মোটা করে বয়ফ্রেন্ড! হতে পারে, ভাবতে ভাবতে রুবিদের রুম পার হয়ে আমার রুমে চলে আসলাম।

hostel 8 b

লাভলি যেই ছেলের হাতটা ধরে আছে হাতটা বেশ মোটা আর বড় বড় লোম। অলঙ্করণ. নওয়াজ ফারহিন অন্তরা

৩৭.
রুমা আপু এর মধ্যে চারটা কল দিয়ে দিয়েছেন। আমি রুমে এসে কল ব্যাক করলাম। আপু ফোনটা ধরেই অভিযোগের সুরে বললেন, “কী বেপার কী বীথি আমি কি পর? জানো তোমার মা কি পরিমাণ কান্না কাটি করেন? তোমার রুম ডেইলি গোছান। তোমার জামা-কাপড় ধুয়ে রাখেন। কাঁচা কাপড় আবার ধুয়ে রাখেন।”

আমি কিছুক্ষণ শুনে বললাম, “আপু আমার তো ধোয়া কাপড় দরকার। কারণ আমি কাপড় ধুতে পারি না। খুব কষ্ট এ সবে। চেষ্টা করি কিন্তু পরিষ্কার হয় নি।”

রুমা আপু বললেন, “কী ভাবছো? ওই ছেলেটার কী খবর? তোমার খেয়াল রাখে? তুমি তো ভালোই আছো। পরে বুঝতে পারবা হয়তো। আমি দোয়া করি তোমরা খুব ভালো থাকো। একসাথে থাকো।”

আমি বললাম, “হুম আপু। দোয়া কইরো।”

আপু বললেন, “বলো সোনা, কেমন আছো তুমি?”

আমি বললাম, “আপু, এই তো আছি আপু। তুমি কেমন আছো?”

রুমা আপু বললেন, “একটা ছেলে পেয়েছি বিদেশে থাকে। বান্ধবীর মা জোগার করেছেন সম্বন্ধটা। দেখা যাক কোনো কূল পাই কি না।”

আমি বললাম, “দোয়া করি আপু হয়ে যাবে। তুমি ভালো ইনকাম করছ। তাহলে বিদেশে থাকা ছেলে কেন?”

আপু বললেন, “আর ছেলে। বয়স তো বেড়ে গেল, খেয়াল করি নি! এখন দেশ-বিদেশ একটা হলেই হল। অন্তত আমার সমান পড়ালেখা জানলেই হয়।”

রুবিদের ঘর থেকে কেউ একজন দুইজন চিল্লাচ্ছে। আস্তে আস্তে চিল্লানি কিচির মিচির বাড়ছে। বুঝলাম না কী। রুমা আপুকে বললাম, “আপু একটু পরে কল দিচ্ছি হোস্টেলে কিছু একটা চেঁচামেচি হচ্ছে। দেখি কী হলো।” বাই বলেই কেটে দিলাম ফোনটা।

প্রায় দৌড়ে হুমড়ি খেয়ে ভিড়ের মধ্যে পড়লাম। লুবনা আপু লিমন ভাই পর্যন্ত রুবিদের রুমে। রুবি লাভলির এক হাতের কবজি শক্ত করে ধরে আছে। আর মিতা আপুকে বলছে, “দিখেন এক্ষন। মিছা কথা কি আমিই বলি? আমার রুমে ঢুকে আমারি নতুন জিনছের ফ্যান্টা জামার কোচোরের মধ্যে লইছিল আর আমি দেইখা ফেল্লাম। এখন আমি তো যামুই যামু খালার কাছে।”

মিতা আপু ফাপরে পড়লেন, কিচ্ছু বলছেন না। অন্য সময় হলে তো লাভলির চুরির চেষ্টার অপরাধে জেল হাজত হয়ে যেত। মিতা আপু তো কাউকে ছেড়ে কথা বলেন না। বরং একটু সুযোগকে বড় বানানোই আপুর ব্রত। সেই মিতা আপু লুবনা আপু টুশি এমনকি রিজভি আপুও চুপ। রাসফি আমার পেটের একটু উপরে একটা চিমটি কেটে নিচু স্বরে খিক খিক করে হাসছে। আমি তো অবাক এই থমথমে পরিবেশে কেউ হাসতেও পারে! লিমন ভাই একটু দূরে টেনশন টেনশন মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লুবনা আপু লিমন ভাই থেকে আরো দূরে। কেউ যেন কারো নয় দূরত্বে আছেন উনারা।

মিতা আপু অনেকক্ষণ পর মুখ খুললেন, “রুবি ভাগ্যিস তুমি দেখছিলা। তুমি কোনো চিন্তা করো না। যা করছো খুব ভালো করছো। এটার একটা ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তুমি নিশ্চিন্তে থাকো।”

রুবি বলল, “হে করেন করেন। এভাবে তো চলা যাইবো না। এখন আমিও বিচার চাই।”

মিতা আপু অতি কোমল স্বরে রুবির কাঁধে হাত রেখে বললেন, “রুবি, আমি তো এটার ব্যবস্থা করবই। শোনো তুমি তো জানো আজ একজন বাইরের ছেলে আসছেন হোস্টেলে তাই উনাকে আগে বিদায় করে দ্যান বিচার ঠিক করবো লাভলিকে কী করা যায়।”

রুবি একটু ক্যাঁক করে উঠলো, “মানে এটা কীতা কইলেন। সময় লইবেন? আমার ফ্যান্টটা এখন চুরি হইতেছিল আর বিচার হইবো পরে?”

মিতা আপু ঠাণ্ডা স্বরে বললেন, “হুম, কারণ না হলে আমরা সঠিক বিচারটা করতে পারবো না তাড়াহুড়ায়।”

রুবি বলল, “কেন কী হয়সে? একন কী প্রবলেম?”

আপু আবারো ওকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বললেন, “দেখছো না ওই একটা ভাইয়া। উনি হোস্টেলের বাইরে যাক তারপর। ব্যাপারটা তুমি না বুঝলে আমরা তোমার পক্ষে কীভাবে থাকবো বলো?

লাভলি কিচ্ছুই বলছে না। কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ বলে উঠলো, “হ করেন করেন যা করার আমি কিন্তু আমি কইলাম ওই আফার বন্ধুরে নিচে লইয়া দিয়া আসোত আর পারুম না। হইসে হইসে।”

মিতা আপু ভ্রু কুচকে বললেন, “তুই মনে হয় চাচ্ছিস চোর হয়ে থাকতে, তাই না? তুই যাইতে না পারলে তো এখানের সবাই বলবে তুই এটা সেটা চুরি করতে ছিলিস। সবাই যখন বলবে তুই কি আর থাকতে পারবি এখানে? তোর মা খালারাও তো আর থাকবে না তাহলে।”

লুবনা আপু লাভলিকে বললেন, “যা করছিস একটা ব্যবস্থা তো নিতেই হবে। তুই এখন ভাইয়ারে দিয়া আয়। আমি তো আছি, যা এখন দিয়া আয়। চুরি তো করার দরকার নাই। আমাদের বলতি।”

লাভলি একটা ঝাপটা মেরে ভিড় ঠেলে লিমন ভাইয়ার পাশে গিয়ে বলল, “লন ভাই নিচে নামি।”

ভাইয়া লুবনা আপুর দিকে কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে লাভলির সাথে নিচে নেমে গেলেন।

লুবনা আপুকে হতাশ লাগছিল। কপালের টিপটার আঠা সম্ভবত আলগা হয়ে টিপটা খুলে পরে গেল। আপু চোখটা কচলালেন হাত দিয়ে আর কাজল লেপটে চোখে নাকে ভরে গেল। আপু হাত দিয়ে নাক খুটছেন। রাসফি আর আমি আপুর দিকে তাকিয়ে আছি। রুবি কী করছে দেখছিও না।

(কিস্তি ৯)

About Author

নওয়াজ ফারহিন অন্তরা
নওয়াজ ফারহিন অন্তরা

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ছেন। জন্ম- ঢাকা, মে ১৯৯৩।