Tag

উপন্যাস

Browsing

ঠিক কেন কী কারণে মনে হইছিল জানি না, রংপুর পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে আমার মনে হইছিল আমার জন্ম হইছে সাহিত্যিক হওয়ার জন্য। ক্লাস ফাইভ থেকে সিক্সে উঠছি — ঐদিনই ফাইভের বৃত্তি পরীক্ষার শেষ হইছে। ভাল হয় নাই। আবার ফাইভের ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট আগের টার্মের চেয়ে খারাপ হইছিল, আমার মনে হইছিল বৃত্তি পরীক্ষার প্রিপারেশনের জন্য খারাপ হইছে রেজাল্ট।

মা আমার মন খারাপ দেইখা বিশ টাকা দিছিলেন, খেলতে যাইতেও বলছিলেন। দুই ওভার বল করে বল ডোবায় পইড়া গেছিল, ঠাণ্ডায় কেউই কাদায় নামতে চাইতেছিল না, আমার হাইজিন আর কমফোর্ট সেন্স কম থাকায়, কিংবা এ ওরে ঠেলে নামার জন্য — বিরক্ত লাগত, তাই সাধারণত আমিই নামতাম বল তুলতে। সেদিন খেলতে ভাল্লাগতেছিল না।  আমি কাউকে কিছু না বইলাই রংপুর কলেজের ভেতর দিয়ে হনুমানতলার সামনে দিয়া হাঁটতে হাঁটতে পুলিশ লাইন স্কুলের সামনে চিড়িয়াখানায় ঢুকব কি না বেশ অনেকক্ষণ ভাবছিলাম। তারপর পুলিশ লাইন স্কুলের আর একদিকে গার্লস স্কুল, কী কারণে জানি না, অনেক কলেজে পড়া মেয়ে ছিল রাস্তায় (বিকালের ঐ টাইমে হয়ত থাকেই, কিন্তু আমি আগে বিকালে রংপুর কলেজ পার হইয়া ওদিকে একাই আসি নাই বিকালে) হাসতে হাসতে বের হইতেছিল, তাদের হাসি আমারে কেমন একটা বুক হু হু করা নিঃসঙ্গতায় ফেলে দিছিল।
আটানব্বই সাল শেষ, নিরানব্বই শুরু হইছে কিংবা হবে — ব্রাজিল ওয়ার্ল্ডকাপ হারছিল সেইবছর, ঐ সময় আমাদের এলাকায় একজন তার বাচ্চার নাম রাখছিল জিদান। উনার বউটা সুন্দরী ছিল অনেক, তুইলা আইনা নাকি বিয়া করছিলেন। লোকটারে আমার অপছন্দ হইত। ছেলের নাম জিদান রাখায় মজা পাইছিলাম। আর ছেলের জন্মের পর পর উনার বউকেও দেখতে আর ভাল লাগত না। তাই পরবর্তীতে উনার প্রতি অপছন্দটা ছিল না। আগ্রহ নিয়া সালাম দিতাম, আর জিদান কেমন আছে খোঁজ নিতাম। তো রাস্তায় জিদানের মাকে দেখছিলাম সেদিন, চোখের নিচে কালো দাগ আর কোলে জিদানরে নিয়া তিনি একটা রিক্সায় আমাকে অতিক্রম কইরা সামনে চইলা গেছিলেন।

শীত যেমন পড়ে রংপুরে আর কি, ঐদিন দিনের অনেকটা সময় ধইরা কুয়াশা ছিল, আমি একটা সোয়েটার পরে ছিলাম এইটা মনে আছে। আমার সোয়েটারের হাতা সেইসময় সর্দিতে সাদা হইয়া থাকত। আমার আরো কী কী হইতো এই বিষয়ে আমার পরিষ্কার ধারণা ছিল। এই তীব্র আত্মসচেতনতা ঐ বয়সে আমারে এতই মগ্ন কইরা রাখত যে আমি প্রায় উদাসীন এক কিশোর হিসেবে শহরে পরিচিত হয়ে উঠছিলাম পরবর্তীতে। পাবলিক লাইব্রেরির ঘোলাটে জানালার ফাঁক দিয়ে আমার থেকে বয়সে বড় ছেলেরা ক্রিকেট খেলতেছিল, যে বল করতেছিল তার রানআপ দেখতে দেখতে আমার জন্মের উদ্দেশ্য আমি আবিষ্কার করে ফেলি। ঐ গোটা দৃশ্যের মধ্যে শক্তিশালী কিছু একটা ছিল, যেইটা আমাকে এখনো নাড়া দেয়।

এইরকম আর একটা দৃশ্য আমার মনে আছে। আরও ছোটবেলার। আমার খালার বাড়ি ছিল শালবন মিস্ত্রীপাড়া, আমরা তখন থাকতাম গণেশপুরে, খালা বাড়ি যাওয়ার সময় আমরা রিক্সায় করে বেতপট্টির উপর দিয়া যাইতাম। শ্যামাসুন্দরী খালের উপর একটা ছোট কালভার্ট আছে, সারা রংপুর শহর জুইড়াই এমন কালভার্ট ছিল, আমরা বলতাম পুল। ঐ জায়গায় প্রচুর শূকর চড়ত, আমার ইমিডিয়েট বড় যে বোন সে জানি কার কাছে শুনছিল শূকর দেখে যদি চল্লিশবার কালেমা না পড়া হয় তাইলে শরীর নাপাক থাকে। আমার শরীর পাক রাখার ফিচারটা তেমন টানে নাই। কিন্তু একদিন খালা বাড়ি থিকা আইসা আমার একটা খেলনা গাড়ি হারায় গেছিল জন্য ব্যাপারটা আমি সিরিয়াসলি নিছিলাম। ভাবছিলাম শূকর দেইখা কালেমা না পড়ার সাথে এই খেলনা হারনোর কোনো সম্পর্ক আছে। দুই আঙুলে চল্লিশ গুনতে এদিক ওদিক হইলে সেফ সাইডে থাকার জন্য আমি সারা রাস্তা কালেমা পড়ছিলাম একবার। পরে সিদ্ধান্ত নিছিলাম, ঐ জায়গাটা চোখ বন্ধ কইরাই থাকব। শহীদ জররেজ স্মরণী রাস্তাটা গোমস্তাপাড়ার, শেষ হইলে হাতের ডানে ঐ পুলটা। অনেক পরে এই রাস্তায় আমার কৈশোরের অনেক কাণ্ড হইছিল — সেইটা পরের গল্প, সেই রাস্তায় রিক্সা চইলা আসলেই আমি চোখ বন্ধ করে রাখতাম। একবার বৃষ্টির দিন, আমি আর মা যাইতেছিলাম। পর্দার ফাঁক দিয়ে আমি শ্যামা সুন্দরীর আবর্জনা ভরা খাল দিয়ে একটা দলছুট কেশরওয়ালা সিংহরে হাঁটতে দেখছিলাম। পারিপার্শ্বিকতা ইত্যাদি বিবেচনায় আমি যে একটা শুয়োরই দেখছি সেইটা আমি দশ এগারো বছর বয়সেই ধরতে পারছি। কিন্তু দৃশ্যটা এত প্রবল ছিল যে আমি বাস্তবতাটা বহুদিন না মাইনা পার করছিলাম।

আমার ঐদিনের অস্থিরতার আর একটা কারণ ছিল। গত দুইদিন বৃত্তি পরীক্ষায় আমার পাশে গ্রামের স্কুলের একটা মেয়ে বসছিল, মেয়েটা শাড়ি পইরা আসছিল, খুব চকমকা — পরীক্ষা দিতে আমার বয়সী একটা মেয়ে শাড়ি পইরা আসবে সেটা বিরক্ত লাগছিল। একটু পর পর খাতা দেখতে চাইতেছিল, প্রথম দিন মোটামুটি উত্তর দেখাইলেও তার এই চাওয়া দাবিতে গড়াইতেছিল — এইটা কী লিখছি সেটা আবার জিজ্ঞেস করতেছিল। তারে যে আমি খাতা দেখতে দিতেছি এই বিষয়টা নিয়া আমার একটু সংকোচও ছিল, পরীক্ষায় আমার পাশে এমন একটা মেয়ে বসছে বইলা দুই তিনজন এমনিতেই হাসাহাসি করছে। সে আমারে আদেশের সুরে পৃষ্ঠা উল্টাইতে না করতেছে — সেইটা পছন্দ হইতেছিল না।

আমি এরপর দ্বিতীয় দিন যখন খাতা ঢাইকা লেখা শুরু করলাম, আশ্চর্য! মেয়েটা একবারও আমারে কিছু জিজ্ঞাসা করে নাই, গোটা পরীক্ষার টাইম সে কিছু লেখারও চেষ্টা করে নাই। পরে পরীক্ষা শেষে তার বাপ আর ছোট বোন পলিথিনের ব্যাগভর্তি  সদ্য কেনা সস্তা কাপড় নিয়া যখন দাঁড়ায় ছিল, তার বোন জানাইল সে চিড়িয়াখানায় গেছিল, কোনো কারণ ছাড়াই ঐ ভিড়ের মধ্যে তার ছোটবোনরে চড় মাইরা সে গড়াগড়ি দিয়া কান্না শুরু করছিল। কান্নাটা আমারে খুব অনুশোচনায় ফেলছিল। আমার কেন জানি মনে হইছিল এইখানে আমার কিছু একটা ভূমিকা আছে। কাউকে ক্লাসের কারণে উপেক্ষা করার মত স্বাভাবিক বিষয় ঐবয়সে গিল্টে ফেলে থাকতে পারে। কিন্তু মেয়েটার কান্নায় অনেক গভীর কিছু ছিল। সুতরাং আমার ঐ সাহিত্যিক হওয়ার জন্যই যে জন্ম এই ব্যাপারটা নিশ্চিত হওয়ার পর আমি সেই মেয়েটারে নিয়া একটা গল্প ভাবি। খুব দরদি গল্প। আউটলাইনটা মনে আছে।

আমি গল্পে লিখতে চাইছিলাম মেয়েটা যে শাড়ি পইরা আসছিল সেইটা তার মায়ের বিয়ার শাড়ি, ওদের বাড়িতে ভাল কোনো কাপড় নাই বইলাই সে এইটা পইরা আসছে। তার চিড়িয়াখানা দেখার খুব শখ, কিন্তু তাড়া খুব গরীব বইলা তার রংপুরে আসা হয় না, তার বাপে বুঝায় এইটে পরীক্ষা দিতে আসলে তখন দেখাবে কিন্তু তার আগেই তার বিয়া হয়ে যায়। গল্পটা আমি আর টানতে পারি না। কিন্তু আমার মনে হইতে থাকে গল্পটা যেইভাবেই যাক মেয়েটা মারা যাবে। মেয়েটার মৃত্যুর কথা ভাইবা আমি ঐদিন কান্দছি। পরে একাধিক দিন যেখানে আমার কাঁদা উচিৎ কিন্তু কান্না আসতেছে না, যেমন আমার দাদির মৃত্যুর দিন, যিনি আমার বয়সী কাজিনদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমাকেই আদর করছেন, ৯৯ সালের জুন মাসে উনি মারা যান, সবাই কানতেছিল, আমার কাজিনরাও, কিন্তু আমার কান্না আসতেছে না, তখন আমি ঐ মেয়েটার মৃত্যু উছিলা করে কান্না শুরু করতে পারছিলাম। এমন বহুবার আমি যে কোনো অপ্রীতিকর দুঃখে একান্ত পরস্বার্থে কান্নার আরামদায়ক রুচিশীল সংবেদনশীলতারে আস্কারা দিছি। আর গল্পটা আমি লেখার চেষ্টা করি নাই। এই যে গল্প নিয়া সেটার ভেতরে বিভিন্ন আকাশ কুসুম ভাবার নেশাটা তখন আমাকে আনন্দ দিছিল অনেক।

আমার এমন গভীর দুঃখবোধ এবং নারী ক্ষমতায়ন টাইপ গল্পের ব্যাপারটা আসছিল সম্ভবত আমার সবচেয়ে বড় বোনের কারণে। আমার ক্লাস ফোরের ফাইনাল পরীক্ষার পর সে আমারে সমরেশের সাতকাহন এর দুই খণ্ডই পড়াইছিল। তখন সে কেবল ভার্সিটিতে ভর্তি হইছে, তার ছোট ভাইরে নিয়া এক্সপেরিমেন্টের এই কারণ আমি এখনো ধরতে পারি না। তারে পরবর্তীতে সবসময়ই আমার খুব ডাউন টু দ্যা আর্থ আর কনজারভেটিভ লাগছে । যাই হোক তার তত্ত্বাবধানে বড়দের বই পড়ার কারণে সে আর আমার বড় ভাই ভার্সিটিতে চইলা গেলে তাদের বইয়ের শেলফ আর ক্যাসেটগুলার দায়িত্ব আমি পাই। সুতরাং আমার সাহিত্যিক হবার মৌলিক আকাঙ্ক্ষাও মফস্বল মধ্যবিত্তের চর্চিত কিছু লিগেসি ভারাক্রান্ত হইয়া পড়ে। আমার বড় বোনের তরফ থিকা সুনীল সমরেশ হুমায়ূন শীর্ষেন্দু,তসলিমা, নচিকেতা ইত্যাদি আমারে নিতে হয় আমার বড় ভাইয়ের তরফ থিকা সুমন চট্টোপাধ্যায় আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। যদিও খোয়াবনামা আমি ঐ সময় বহুবার চেষ্টা কইরা পড়তে পারি নাই, পরে দুই হাজার দুই সালে মনে হয় পড়তে পারছি। অবশ্য নচিকেতা, সমরেশরে আমার বাতিল করতে টাইম লাগে নাই। আমি প্রথমে সাফার করছি সুনীলরে আর সুমনরে নিয়া, বড় দীর্ঘ সময়। সৈয়দ শামসুল হক পড়ার পর আমার মনে হইছে লেখা একটা স্টাইলেরও ব্যাপার, তারপর সুনীল হালকা হইতে লাগছিল। সে সব এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়। যেমন ক্লাস এইটে থাকতেই কাফকার ডায়েরি পইড়া আমি যেমন আপ্লুত হইছিলাম সেইটা অনেকদিন পর্যন্ত আমার কাছে বড় ব্যাপার মনে হইছিল। কিন্তু ঐ যে বোলারের রানআপ দেখতে দেখতে মনে হওয়া, আমার সাহিত্যিক হওয়ার জন্যই জন্ম সেইটা অন্য কিছু ছিল।
সব মফস্বল শহর এমন লাইফ সাইকেলের ভেতর দিয়া যায় কি না আমি জানি না। কিন্তু ঐ সময়টা রংপুর শহর উচ্চশিক্ষিত সন্তানের স্বপ্নে বিভোর ক্লান্ত বাপ আর মলিন মায়েদের দিয়া ভইরা উঠছিল। ব্যাচ কইরা পড়ার রমরমা অবস্থা। কোচিংও রমরমা। মহিলাদের বয়স ত্রিশের উপরে যাওয়া মানেই বাচ্চার বয়স দশের উপরে, তাদের স্কুল কোচিং ইত্যাদি নিয়াই তারা সময় পার করতেন। বিমর্ষ, বিষণ্ণ এক পরিবেশ। কোন বাড়ির ছেলেমেয়েরা পড়াশুনায় ভাল করলে একধরনের দীর্ঘশ্বাস, আবার খারাপ করলে নিজেদের সন্তানের জন্য শঙ্কা। আমি ঐ সময় অনেক স্কুল এবং কলেজ ম্যাগাজিনে দেখছি গল্পগুলাতে দুই ভাইবোনের বোনটা ডাক্তারি ভর্তি হইছে, ভাইটা বড়, সে বুয়েটে পড়ে, বোনরে টিউশনি কইরা পড়ার খরচ জোগায়। এইগুলারে আমার স্বপ্ন হিসেবে ভাল লাগে নাই। আমার জিদানের বাবার মত হইতে ইচ্ছা করছিল। একটা ভেসপা মটরসাইকেল, আর গোলগাল একটা বউ। ঐ লাইফটার ভেতরে আমি শহরের একটা কম উদ্বাস্তু স্পিরিট অনুভব করছিলাম।

রাতের বেলায় আমি বিছানা ঘেঁষা জানালায় দাঁড়াইলে আশেপাশের বাড়িগুলাতে টিম টিম ষাইট ওয়াটের লাল আলো জ্বলতে দেখতাম, মনে হইত ছোট ছোট নৌকা থেমে আছে, যেন ওরা এখানে কিছুক্ষণের জন্যে দাঁড়াইছে, আপতকালীন এই উপস্থিতিতে, হয়ত চইলা যাবে। এই বাড়িগুলারে, এই পরিবারগুলারে এমন ক্ষণস্থায়ী ভাবার দুইটা ঘটনা আমার মনে আছে । সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দীন মারা যাওয়ার পর, আমি উনার মৃত্যুর হাহাকার শুনছিলাম দৈনিক জনতা কিংবা যুগের আলো পত্রিকায়, তো উনার পরিবার মনে হয় আমাদের এরিয়ার আশেপাশে কোথাও থাকেন, উনার ছোট ছেলেটা আমার থেকে একটু বড় ছিল, তারে আমি কোনো একটা বাড়ির দাওয়াতে দেখছিলাম, ঐটুকুন একটা ছেলের প্রতিভাবান বাবা মারা গেছে সেইটা আমাকে মৃত্যু বিষয়ে খুব সচেতন কইরা তুলছিল — ওরা নাকি রংপুর ছাইড়া চইলা যাবে এমন শুনতেছিলাম।
আর একটা ঘটনা, বেশ হৃদয়বিদারকই। আমাদের ফ্যামিলির পরিচিত এক ফ্যামিলির তিনজন ইলেক্ট্রিক শক খেয়ে মারা গেছিল। আমি ঐ পরিবারটাকে চিনতাম না, আমার বড় ভাইবোনেরা চিনত। আমার জন্মের আগে আমার বাবায় যখন উপজেলায় চাকরি করতেন তখন কাউনিয়া কিংবা পীরগাছা এই নামের কোনো একটা উপজেলায় পাশাপাশি বাড়িতে থাকতেন উনারা। তো ঘটনাটা ছিল এমন শুক্রবারে ভদ্রলোক ছাদে কাপড় নাড়তে গেছিলেন, তো কাপড় শুকানোর লোহার তারের সাথে ঘাপটি মাইরা ইলেকট্রিক তার যে ছিঁইড়া জড়ায় ছিল সেটা তিনি টের পান নাই, ছাদে উনার সাথে উনার বড় আর ছোট ছেলেও ছিলেন, কাপড় তারে দেয়া মাত্রই উনি আটকায় যান, উনারে সরাইতে যাইয়া যথাক্রমে বড় আর ছোট ছেলেও বিদ্যুৎতাড়িত হন, ভদ্রমহিলা হুটাপুটি শুনে ছাদে আইসা এই দেইখা মূর্ছা যান। মেজো ছেলে বাসায় ছিল না। সবাই যখন এই খবর শোনে, এমন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর খবরের প্রাথমিক বিমূঢ় অবস্থা কাটায় তারা জিজ্ঞেস করে টিপুর (মানে বড় ছেলেটা) না সরকারি চাকরি হইছিল? বইলা তারা আরও কিছুক্ষণ ভাবে। আবার ভদ্রলোকের যেহেতু সাধারণত কাপড় নাড়তে দেয়ার কথা না, সুতরাং তার মৃত্যু নিয়াও একটু আফসোস ছিল। ঘটনাটা না ঘটলে মানুষ অবশ্যই খুশি হইত, কিন্তু আমার ধারণা ঘটনাটার একটা কম দুঃখজনক বিকল্প ছিল — মা, কম সম্ভাবনাময় মেজো ছেলে, এবং ছোট ছেলে এরা এই দুর্ঘটনায় মারা গেলে মানুষের দুঃখটা মনে হয় কম হইত। পরে উনারা বাড়ি বিক্রি করে গ্রামে চইলা গেছিল যতদূর শুনছিলাম।

আমাদের গণেশপুরের বাড়িটা ছাইড়া দিতে হইছিল স্থানীয়দের হুমকি-ধামকিতে। ১৯৯৬ সালে, আমি তখন জিলা স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হইছিলাম। মা আব্বা খুব শখ কইরা বাড়িটা বানাইছিলেন, তাই আব্বার অফিস কোয়ার্টারে চইলা আসায় উনাদের মন খুব খারাপ ছিল। আমার বড় দুই ভাইবোন পিঠাপিঠি ছিল, ওরা নিজেদের মধ্যে এই বিব্রতকর অবস্থাটা শেয়ার কইরা নিছিল। আমি আর আমার ইমিডিয়েট বড় বোন ব্যাপারটার ভাবগাম্ভীর্যটা ঐভাবে পালন করতে পারি নাই। কিন্তু সবার মন খারাপ অবস্থাটা আমাকে মাঝে মাঝে ক্ষেপায় তুলত আব্বার উপর। বাপেরা কোথাও ভয় পাইয়া চইলা আসলে ঐরকম বয়সে ছেলেদের বাপরে নিয়া একটা মোহভঙ্গ ঘটতেই পারে। ঐসময়টায় আমার ভেতরে বেশ একটা প্যাসিভ অ্যাগ্রেসিভ অ্যাটেটিউড গ্রো কইরা থাকতে পারে।

এই পরিবেশ আমার মধ্যে একধরনের উদ্ভট বঞ্চনাবোধ তৈরি করছিল । ক্লাস সিক্সের পুরা টাইমটা আমি স্কুল পালাইতাম। একা। কাচারিবাজার দিয়া শিশু নিকেতন হয়ে নিউ ইঞ্জিনিয়ারপাড়ার দিকে যাইতাম। ঐ জায়গাটা শুনশান থাকত। রংপুর শহরের পুরাতন লোকেরা এই নিউ ইঞ্জিনিয়ার পাড়া নামটা পছন্দ করত না, তার বলত “কীসের নিউ ইঞ্জিনিয়ার পাড়া, ওইটার নাম তো নাওয়াটারি।”

আমার এমন ঘোরাঘুরি দেইখা অনেকই আগ্রহ দেখাইত। তারা আমারে যাই জিজ্ঞাস করত আমি মিথ্যা বলতাম। যেমন বাবা কী করে, বাড়ি কোথায় ইত্যাদি। কিন্তু নিজের নামটা মিথ্যা বলতাম না। কারণ নাম দিয়াই যেহেতু শুরু হইত প্রশ্ন ঐটা কনফিডেন্টলি বলার দরকার থাকত।

“তো এমন ঘুরতে ঘুরতেই এক বাড়ির বারান্দায় বিশ বাইশের একজন মেয়ের সাথে পরিচয় হইছিল। উনি বারান্দার দড়িতে কিছু একটা শুকাইতে দিছিলেন, আমি তার কাঁপতে থাকা বুকের দিকে তাকাইছিলাম।” অলঙ্করণ. অর্জয়িতা রিয়াঐ সময় জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান মনে হয় আর্মি চীফ হইছিলেন। উনি ভোট করার জন্য প্রস্তুতি নিতেছিলেন। উনি নাকি জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলেন। তো রংপুরে ঐসময় উনারে নিয়া আলোচনা হইত। আমি ঐসময় একটা বয়স্ক লোক দেখছিলাম, উনি নাকি একসময় জিলা স্কুলের পিয়ন ছিলেন, তো উনি নাকি জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমানকে জিলা স্কুলে পড়তে দেখছিলেন, যদিও আমার যতটুকু মনে পরে উনার বয়স ৬০ এর কমই হবে, তাই আমার মনে হইছিল রাস্তাঘাট কল্পনার স্বাধীনতার জায়গা। এইখানে যা তা বলা যায়। তো এমন ঘুরতে ঘুরতেই এক বাড়ির বারান্দায় বিশ বাইশের একজন মেয়ের সাথে পরিচয় হইছিল। উনি বারান্দার দড়িতে কিছু একটা শুকাইতে দিছিলেন, আমি তার কাঁপতে থাকা বুকের দিকে তাকাইছিলাম। উনি বেশ কর্কশ স্বরে ডাকছিলেন, আমি গেছিলাম। আমার নাম-টাম জিজ্ঞেস করতেছিল, ভয়ে আমার গলা শুকায় আসতেছিল। আমি বাসায় দেরিতে গেলে আমার মায়ে চিন্তা করবে কি না এই বিষয়ে আগ্রহ দেখাইলে আমি জানাইছিলাম আমার মা মারা গেছে, আমি ঘোরের মধ্যেই বলছিলাম, ঠিক সচেতন মিথ্যা হিসেবে না। পরে আরও দুই একদিন তার সাথে দেখা হইছিল, উনি মনে হয় আমারে একদিন পেয়ারা খাইতে দিছিলেন। আমি ভাবতাম উনারে বলি যে সেদিন ভয়ে মিথ্যা কথা বলছি। কিন্তু আর বলা হয় নাই।

কয়দিন পর আমার স্কুল পালানোর আর একজন সঙ্গী জুটছিল। ওর মামায় নাকি লেখক। আমি ওর মামার সাথে দেখা করতে চাইছিলাম। কিন্তু ওর মামায় কুমিল্লায় থাকত। প্রকৃতপক্ষে ঐ ছিল মারাত্মক গল্পকার। ওর মামার বইয়ে লেখা আছে বইলা সে অনেক গল্প বলত, বাস হেল্পারের গল্প। ঐ বাস হেল্পার বিভিন্ন আজব শহরে যায়, বাংলাদেশের ভেতরেই। তার বলার ভঙ্গি এমন ছিল, তার কালো মুখ, ঠোঁটের উপরে তিল আর খনখনে গলা নিয়া সেই আমার কাছে বাস হেল্পার হিসেবে ধরা দেয়। গল্পের একটু পর পর বাস নষ্ট হয়, তো বাস হেল্পার কী কী কইরা বাসটারে আবার চালু করত এইসব অনেকক্ষণ ধইরা বলত। তার বাসের রুট ছিল মূলত আরব্য রজনীর দুনিয়া, জ্বীন ভূত আর খারাপ মেয়েতে ভর্তি। এই খারাপ মেয়ের কোনো বোধগম্য ক্রাইটেরিয়া কিংবা আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট করা যাইত না। মানে খারাপ মেয়েরা কী কী করে সেটা নিয়া তার গল্প আগাইত না, বরং যাত্রাপথে খারাপ মেয়ে ছিল একটা অনুসঙ্গ। খারাপ মেয়ে দুনিয়ার যাবতীয় ঘটনা ঘটাইতে সক্ষম ছিল, অনেক ক্ষেত্রে বাস নষ্টের কারণও হইত খারাপ মেয়ে, তারে বাস থাইকা নামায় দিলে আবার বাস চলতে শুরু করত। তবে হ্যাঁ, খারাপ মেয়েরা হইত সুন্দরী, তাকাইলে চোখ ফিরাইতে ইচ্ছা করবে না, আর খারাপ মেয়েরা রাস্তার মাঝপথে বাস থামানোর অনুরোধ করত।

হঠাৎ ছেলেটা নাই হইয়া গেল, ওর নাম ডাকলে আমি এদিক-ওদিক খুঁজতাম, কিন্তু অল্প কয়দিন পর স্যার রোল আর ডাকত না ওর। ওর বাড়ির ঠিকানা সে একেকবার একেকটা বলছিল, আমি খোঁজার ইচ্ছা নিয়াও আর খুঁজি নাই পরে। অনেকদিন পর্যন্ত আমি বাস হেল্পারদের মুখ খুঁটায় খুঁটায় দেখছি। কেউই ওর মত না।
(চলবে)

ছোটকালে আমি চাইতাম হাওয়ায় মিলায়ে যেতে। অদৃশ্য হয়ে যেতে। তবে একেবারে নাই হয়ে যাব না। মানে আমি থাকব ঠিকই কিন্তু আমাকে দেখা যাবে না যখন তখন।

তখন আম্মা খুব মারত পড়ার জন্য। সন্ধ্যার সময় ঘরে ঘরে সিরিয়াল চলে। আর আম্মা আমাকে মারে। মাইর খেয়ে আমি যত জোরে চিৎকার করে উঠি, তত জোরে জোরে মারে। পড়ার টেবিলে তিন ঘণ্টা বসে থাকার জন্য মারত। জোরে জোরে চিৎকার করে, কণ্ঠনালী যেন বের হয়ে আসে এরকম চিৎকার করে পড়ার জন্য আমাকে মারত। আমি জোরে জোরে কানতে পারতাম কিন্তু পড়তে পারতাম না। আমার লজ্জা লাগত।

অতক্ষণ আমার পড়ার টেবিলে বসে থাকতে ইচ্ছা করত না। ভাল লাগত না, মাথা চুলকাইত, পা চুলকাইত, খিদা লাগত, তৃষ্ণা পাইত। কিন্তু টেবিল ছেড়ে উঠতে গেলেই আম্মা মারত।

আমি তখন সন্ধ্যাবেলা কাঁধের দুই পাশে দুইটা বেণি ঝুলায়ে পড়ার টেবিলে পা দুলায়ে দুলায়ে ম্যা.. ম্যা.. ম্যা.. ধরনের আওয়াজ করতে করতে বইয়ের কোনো অর্থহীন লাইনের দিকে তাকায়ে ভাবতাম, যদি এমন হইত—একটা ট্যাবলেট খাইলাম আর অদৃশ্য হয়ে গেলাম! তারপর আম্মার চোখের সামনে দিয়ে বের হয়ে চলে গেলাম বাইরে। আর রাস্তার এতসব মানুষের সামনে দিয়েই নাচতে নাচতে গিয়ে আফজালের দোকানের সামনে থামলাম। না থামব না, সেখানে দাঁড়ায়ে একটা খেমটা নাচ নাচলাম! সবার সামনে জোরে জোরে লাফ দিলাম, চিৎকার করে হাসলাম, অথচ কেউ কিছু দেখল না। কেউ শুনল না!

আফজালের দোকানের সামনে যারা সন্ধ্যা থেকে ক্যারাম খেলে, মুড়ি খায়, চিল্লায়, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে ঝগড়া করে তাদের সবার চুল টেনে ধরব আমি। জোরে জোরে হাসলে দিব গালে ঘুষি। ওরা বুঝতেও পারব না কে ওদের এত মাইর দিল!

তারপর নাচতে নাচতে চলে যাব মুন্নির বাড়ি। মুন্নির বাড়ির সবাই সন্ধ্যাবেলায় মুড়ি খেতে খেতে সিরিয়াল দেখে। আমি সেখানে মুন্নির কোলে বসে থাকব। কেউ দেখবে না। না, না, মুন্নি খুবই শুকনা মেয়ে, ওর কোলে না, ওর বাবার কোলে বসলেই ভাল হবে। উনার বাটিতে শুধু মুড়ি না, গুড়ও থাকে। অল্প অল্প খাওয়াও হবে সেইখানে।

রাতের বেলা আমার বাসায় সব ঘুমায়ে গেলে আমি একবার বাইরে গিয়ে হেঁটে আসব। বড় রাস্তায় যাব। বড়লোকদের বাড়িতে ঢুকে যাব। ওরা এসি ছেড়ে ঘুমায়। ওদের নরম নরম কম্বলের নিচে ওদের সাথে ঘুমাব আর সকাল হবার আগেই আবার বাসায় এসে পড়ব। বাসার কেউ টেরও পাবে না আমি রাতে বাসায় ছিলাম না!

এইগুলা ভাবতে ভাবতে কখন আমার চোখ-মুখ-মাথা ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে পড়ে যাইত বইয়ের উপর আর  আম্মা এসে শক্ত করে আমার চুলের মুঠি ধরে চিকন বেত দিয়া মারত। মাইর খাইতে খাইতে, কানতে কানতে আমি আবার ভাবতাম অদৃশ্য হবার কথা।
তারপর একদিন শুনলাম ক্লোনের কথা। মানুষের হুবহু আরেকটা মানুষ বানানো যায়। আমেরিকা-ইউরোপের মানুষ নাকি বানায়া ফেলছে এক মানুষের মত আরো শত শত একই মানুষ।

ইস্! যদি আমার একটা ক্লোন থাকত। ক্লোনটারে পড়ার টেবিলে বসায়া রেখে আমি চলে যেতাম দেশ হতে দেশ-দেশান্তরে! তিন ঘণ্টা পরে ফিরে আসতাম। ক্লোনটারে ব্যাটারি খুলে খাটের নিচে রেখে দিতাম। কেউ টেরও পাইত না।

অদৃশ্য হওয়া অসম্ভব হইলেও ক্লোন কোনো অসম্ভব কিছু না। যাদের টাকা আছে তাদের ক্লোন আছে। তারা নিজেদের কয়েকটা ক্লোন বানাইছে। তারা দেশের প্রধানমন্ত্রী তাই যখন কোনো বোরিং সভা-সমিতিতে যায় তখন ক্লোনরে পাঠায়া দেয় আর আসল প্রধানমন্ত্রী ঘরে বসে চিল করে। বোরিং বিদেশ ভ্রমণে ক্লোনকে পাঠায়া দেয় আর নিজে ঘরে ঘুমায়। কিন্তু আমি তো কোনো প্রধানমন্ত্রী না, কোনো বড়লোক না, বিদেশি না—কোথায় পাব ক্লোন করার টাকা?

টাকা পাওয়ার একটাই উপায় বেশি করে, ভাল করে পড়ালেখা করা। পড়ালেখা করে বড় বড় অফিসে চাকরি করে বেশি বেশি টাকা কামাই করা। আর এই একটা কাজই, এই পড়ালেখাই আমার দ্বারা হবে না।

কিন্তু এই কথাটাই আম্মা বোঝে না। সারাদিন বলে—পড়, পড়, পড়। পড়ালেখার জন্যই আম্মা অনেক কিছু পায় নাই জীবনে। তাদের সময়ে নাকি মেয়েদের কেউ পড়তেই দিত না। পড়ালেখা করানোর কোনো চিন্তাও কারো মাথায় আসত না।

আমার আম্মার বোধহয় খুব ভাল লাগত পড়াশোনা। আম্মা কি ডাক্তার হতে চাইত? নাকি ইঞ্জিনিয়ার? কে জানে! কিছু বলেও না। শুধু বলে, “পড়ালেখা ছাড়া কোনো গতি নাইরে মা, মানুষের ঘরের বান্দির মত জীবন কাটাইতে হবে, গোলাম হয়ে থাকবি, চাকরানি হইতে না চাইলে ভাল করে পড়।”

আম্মা তো কিচ্ছু পড়তে পারে না, এমনকি বাংলা একটু একটু পড়তে পারলেও ইংরেজি দেখলে ভয়ে কাঁপে। আর আমাকে সারাক্ষণ বলে পড়তে। বই নিয়া বসে বসে অর্থহীন বিড় বিড় করলেই আম্মার শান্তি। কার ভাল লাগে সারাদিন বিড় বিড় করতে! মাঝে মাঝে মনে হয়, আম্মার এই পীড়াপীড়ির জন্যই লেখাপড়া জিনিসটা আমার এত অসহ্য লাগে!

হুশ্, কেন আমার এইসব কথা মনে পড়ল? কী ভাবতাম, কেন ভাবতাম, ব্যর্থ সব ভাবনা! এইগুলা ভাবলে আমার বিরক্ত লাগে নিজের প্রতি এইটা ভেবে আমি কুয়ার মধ্যে ঝাঁপ দিলাম। জ্বি, ঝাঁপ  দিলাম। কিন্তু মরার জন্য না। কুয়ার মধ্যে সাঁতার কাটতে আমার ভাল লাগে।

এইরকম একটা কুয়ার পারে পরাগের সাথে আমার প্রেম হইছিল। আমি তখন টেনে পড়ি আর দুপুরের পরে বাসার সামনের উঠানে কুয়ার পাশে পাটি বিছায়া বসি। সমাজ বই নিয়া এমসিকিউ দাগাই। সবাই তখন ঘুমায়। বাইরে অল্প অল্প বাতাস হয়। বাতাসে অল্প অল্প আওয়াজ থাকে। ঘরে ঘরে সিলিং ফ্যানের আওয়াজ ছাড়া কিছু শোনা যায় না। আমার আম্মা তখন ঘুমায় না। আম্মা আমার মাথায় তেল দেয়, উকুন বাছে।

সেদিন অনেক গরম পড়ছে। বৈশাখ মাস। ভ্যাপসা গরম। আমি দর দর করে ঘামতেছি। আম্মাও উকুন বাছতে বাছতে আঁচল দিয়ে নিজের কপালের ঘাম মুছতেছে। বাতাস নাই। গাছের একটা পাতাও নড়ে না। আকাশ কেমন ঘোলা রঙের হয়ে রইছে। আমি একটু পর পর আকাশের দিকে তাকাইতেছি। এমন সময় জোরে একটা বাতাস এসে গেল আর ধাক্কা লেগে তেলের শিশিটা মাটিতে পড়ে গেল। সেটার মুখ ছিল খোলা, তির তির করে সমস্ত তেল পড়ে গেল মাটিতে আর আম্মা আমাকে বকতে বকতে সেই ‘আর একটু খানি তেল আছে’ শিশিটা রাখতে গেল বাসার ভিতরে।

এমন সময় একটা ছেলে গলা খাঁকারি দিল। আমি চমকে উঠলাম। এই ভরদুপুরে গলা খাঁকায় কে?

ওমা কী সুন্দর একটা ছেলে!

লম্বা, চওড়া, বাদামি রঙ, সুন্দর সাদা শার্ট পরা, আর নায়কদের মত ঢেউ খেলানো চুল! হঠাৎ বাতাস বইতে শুরু করল। ঝোড়ো বাতাস। এত ঠাণ্ডা বাতাস, মনে হচ্ছে ঝড়বৃষ্টি নিয়ে আসবে। বাতাসে ছেলেটার সব চুল পেছনের দিকে চলে যাচ্ছে, আর আমার চুলে জপ জপ করে তেল দেওয়া, একটা চুলও টু শব্দ করতেছে না। আমি চোখের কোণা দিয়ে আমার চুলগুলা দেখতে চাইলাম। হইল না। ঠোঁটে অল্প বাতাস বের করে উপরের দিকে পাঠায়ে চুলগুলা নাড়ানোর চেষ্টা করলাম। হইল না।

ছেলেটা তখনই আমাকে বলল, হাকিম সাহেবের বাসা কোনটা?

এত সুন্দর একটা ছেলে অথচ খুঁজল একটা খাইষ্টা লোকের বাসা! হাকিম সাহেবের বাসায় কেউ যায় নাকি? আর কোনো বাসা পাইল না?

আমি বই বন্ধ করে বললাম, আচ্ছা আপনার নাম কী?

ছেলেটা ঢোক গিলে বলল, পরাগ। হাকিম সাহেবের বাসায় যাব।

এমন সময় আবার বাতাস উঠল। এক গাছ থেকে আরেক গাছে। এক ডাল থেকে আরেক ডালে। কয়েকটা কাক ঘুমাচ্ছিল বোধহয়, ওরা কা কা কা করে ডাকতে ডাকতে কই জানি চলে গেল।

আমি উপরের দিকে তাকায়া ফুঁ ফুঁ করতে করতে কাকগুলারে দেখলাম। তারপর পরাগকে বললাম, আচ্ছা, আপনার কি কোনো ক্লোন আছে?

পরাগ বলল, মানে?

আমি বইটা পাটির উপর রেখে বললাম, ধরেন আরেকটা পরাগ যদি থাকে, সে এখন ওই খাইষ্টা লোক হাকিমের বাসায় গেল। আর আপনি এইখানে পাটির উপরে আমার পাশে বসে থাকলেন। আর আমার যদি একটা ক্লোন থাকে সে এখন পাটির উপরে বসে থাকল। আমি আপনার সাথে ঘুরতে গেলাম। তাহলে আপনার কাজও হইল, আমার কাজও হইল।

পরাগের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। বাতাসে তার চুল আরো জোরে জোরে উড়ল। এমন জোরে যে আমার মনে হইল ওর মাথা ছেড়েই চলে যাবে সেইগুলা। এমন সময় যার আসার কোনো দরকার ছিল না, সে—আমার আম্মা—চিৎকার করতে করতে এসে হাজির হইল।

বলল, শবনম, ঝড় আসতেছে, ঝড় আসতেছে, ঘরে যা।

ঝড় আর আসতেছে কী, এসেই গেছে। শোঁ শোঁ আওয়াজ করে আমার চোখেমুখে এতগুলা বালি ঢুকে গেল আর আমি আমার বই, খাতা, নীল কলম, লাল কলম, সবুজ কলম, টু বি পেনসিল, ইরেজার—সব, সব হারায়া ফেললাম। আকাশে ভয়ঙ্কর শব্দে বাজ পড়ল। চারদিক নীল হয়ে আবার সাদা হয়ে ঝুম ঝুম করে বৃষ্টি শুরু হইল। এইসবের মধ্যে আমি চোখ খুললাম। দেখি আমার সামনে পরাগ ভিজতে ভিজতে কাঁপতেছে, ওর চুল থেকে সমানে পানি পড়তেছে ওর মুখে আর একটার পর একটা বাজ পড়ে ওর চেহারা হইতেছে পূজামণ্ডপের দেবীর মতন—একবার সাদা, একবার নীল, একবার কালো, একবার সাদা।

আমি দৌড় দিয়া বাসায় ঢুকতে গেলাম। মাঝপথে থেমে গেলাম। কী মনে করে পেছন ফিরে আঙুল দিয়ে ডানে দেখায়া বললাম—ওই যে, খাইষ্টা হাকিমের বাড়ি।

খাইষ্টা হাকিমের বাড়িতে যাওয়া তো দূরের কথা, ওই লোকের বাসার সামনে দিয়াও কেউ হাঁটে না। ওর নাকি কুষ্ঠ রোগ হইছিল। কুষ্ঠ রোগ কী জিনিস আমি জানি না, পোলাপানরা বলে এইটা কুষ্ঠ—ওরা সিনেমায় দেখছে,  কিন্তু আম্মা বলে কুষ্ঠ বলে কোনো কিছু এখন আর নাকি হয় না। খাইষ্টা হাকিমের কান থেকে মাথা, ভ্রু থেকে ঠোঁট পর্যন্ত জায়গায় জায়গায় সাদা সাদা ছোপ। পাড়ার পোলাপান তাকে দেখামাত্র যে যেখানে পারে দৌড়ে পালায়।

এর কারণ অবশ্য কুষ্ঠ না, খাইষ্টা লোকটার খাইষ্টা স্বভাব। আমাদের এই সরকারি কলোনির এ পাড়ায় যত ছেলেমেয়ে আছে, সব ছেলেমেয়ের সাথেই এই লোকের কোনো না কোনো কুকাহিনি আছে। হয় কোনো বাচ্চারে কোলে নিয়ে আদর করার নাম করে সে প্যান্টের চেইন খুলে ওইখানে হাতাইছে, অথবা কোনো মেয়ের জামার ভিতরে হাত দিয়ে কখনো না কখনো কচলাইছে। পাড়ার সব ছেলেমেয়ে নিজেদের মধ্যে এই কথাগুলা আলাপ করে। বাপ-মাকে এগুলা বলা সম্ভব না। তাই সবাই একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিছে যে, ওই খাইষ্টা হাকিমের বাসার সামনে দিয়েও কেউ হাঁটবে না।

এইরকম একটা লোকের বাসায় পরাগ যাবে? কেন কলোনিতে বুঝি আর লোক ছিল না? খাইষ্টা হাকিমের বউ খুব সুন্দরী। কোন গ্রাম থেকে জানি মেয়েটারে বিয়ে করে আনছে! যেমন সাদা গায়ের রঙ, তেমন লম্বা উচ্চতায়, আর তেমনই লম্বা কালো চুল। ওই ব্যাটার বউকে অবশ্য বেশি একটা দেখা যায় না। বাসা থেকে বেরই হইতে দেয় না হারামজাদা লোক! হইতেও পারে পরাগ ওই ব্যাটার শ্বশুরবাড়ির লোক!

আমি বাসায় এসে আম্মার পিছে পিছে থাকলাম। আম্মা যেই রান্নাঘরে চুলা জ্বালাইল সেই বাসার সামনের দরজার ফুটা দিয়ে বাইরে তাকাইলাম। পরাগ কি আছে? নাকি আমার আঙুলের দিকে চলে গেছে?

না যায় নাই। বৃষ্টিতে ভিজতেছে। আর আমার বাসার দরজার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়ে আছে। যেন ওর উপরেই এতক্ষণ ঠাডাগুলা পড়ছে। খুশিতে আমার খিল খিল করে হাসতে ইচ্ছা করল। আমি চাই পরাগ এইখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়ায়া থাক। না যাক ওই বেটার বাড়িতে। ভেবেই আমি ফিক করে হেসে ফেললাম।

হেসে জিভ কাটতে গিয়ে দেখি আম্মা আমার পেছনে। আমার দিকে চোখ গরম করে বলল, এমনে এমনে হাসোস কেন? ভূতে ধরছে তোরে?

আমি মুখ অন্ধকার করে বললাম, কই আমি তো হাসি নাই! হাসি কই দেখলা?

আম্মা আরো রাগ হয়ে বলল, আমি এইমাত্র শুনলাম হাসির শব্দ। হো হো হো করে হাসতেছিস। কী কারণে?

আমি আবার অস্বীকার করলাম। তাছাড়া আমি হো হো হো করছি মনে মনে, আম্মা তো আর মনের শব্দ শোনে না।

আম্মা কড়া কণ্ঠে বলল, আজকে থেকে কুয়ার ধারে যাওয়া বন্ধ। কে জানে কী ভূত-প্রেত আছে ওইখানে। পরীক্ষার আগে তোরে আছড় না করে বসে!

২.
এই কুয়াটা দেখে আমার এতসব কথা মনে পড়ে গেল। আর মনে পড়ল বলেই তো সেইখানে ঝাঁপ দিলাম। প্রথমে ভাবছিলাম, কুয়ার ঠাণ্ডা পানিতে নামলে আমি বরফ হয়ে যাব। এমন কিছুই হইল না। উল্টা খুব ভাল লাগতেছে। মনে হইতেছে সেই ঝড়ের দিনের ঠাণ্ডা বাতাস যেন এখন আমার মনের মধ্যে ঢুকতেছে। নেশা ধরে গেল। সাঁতার কাটতে কাটতে আমি চলে গেলাম আরো নিচে, কুয়ার আরো গভীরে। এইবার ওঠা উচিত। নাহলে আর বাইরের দুনিয়া দেখতে হবে না আমার।

কথাটা মনে আসতেই চট করে একবার উপরে তাকাইলাম। কিচ্ছু দেখা যায় না। দিনের আলো পানিতে পড়ে ঘোলা পানির যে ঘোলা রঙ হয় সেটা আর নিজের শরীরের তৈরি এলোমেলো ঢেউ ছাড়া আর কিছুই না। এইবার সত্যিই আমার দম বন্ধ হয়ে আসতেছে। তাড়াতাড়ি হাত পা ছুঁড়ে উপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করলাম আমি। আর তখনই ঘটল ঘটনাটা।

কুয়ার নিচ থেকে একটা হাত উঠে আসল। হাতটা আমাকে টেনে নিয়ে গেল নিচে, আরো নিচে। কুয়ার শেষ কিনারায় সবুজ ঘাসের ওপর লাল ফুল ফুটে আছে। কী আশ্চর্য! এই পানির তলায় ফুলও ফোটে!

দম নেবার জন্য যেন ফেটে যাইতেছে আমার ফুসফুস। হাঁস ফাঁস করতে করতে আর পারলাম না। অক্সিজেনের জন্য আকুলি-বিকুলি করা ফুসফুসটাকে বের করে আনলাম ভিতর থেকে। সেটাকে ভাসায়ে দিলাম কুয়ার পানিতে। ফুসফুসটা কী সুন্দর সাঁতার কেটে কেটে ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠতেছে, আর পানিতে ছড়াচ্ছে লাল রক্তের ফোয়ারা। আমি ভাবলাম এইভাবে নিজের ফুসফুসের পিছে পিছে তো আমিও উঠতে পারি! না,পারলাম না। দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু। কী খারাপই না হইল ব্যাপারটা!
হানিমুনে এসে এইভাবে কুয়ায় পড়ে মৃত্যু? লোকে কী বলবে? আসাদ কী ভাববে? আসাদের মা? ভাববে না—আসাদের ব্যর্থতার কারণেই শবনম এমন একটা কাজ করল? আসাদের ডাক্তার নিশ্চয়ই ভাববে, শবনম দুঃখে আত্মহত্যা করছে! আর পরাগ? পরাগ কি ভাববে ওকে বিয়ে করতে না পেরে মরেই গেছি আমি? পরাগের মা কি খুশি হবে নাকি তারও মন খারাপ হবে?
ঘুম ভেঙে গেল। অনেকক্ষণ কড়িকাঠের দিকে স্থির চোখে তাকায়ে থাকলাম আমি। অনেকক্ষণ। কিছুই না ভেবে অনেকক্ষণ! কী যে সব স্বপ্ন দেখি আমি! সমুদ্রের গর্জন একদম কাছেই শোনা যাচ্ছে। এখন জোয়ারের সময়। এই কাঠের বাড়ির চারিদিকে বারান্দা। এখন যে কোনো দিকের বারান্দায় দাঁড়ালে দেখা যাবে নিচে সমুদ্রের ঢেউ এসে আছড়ে আছড়ে পড়তেছে। এই রিসোর্টের ম্যানেজার বলছিল আমাদের কালকে।

আমরা যখন এখানে এসে পৌঁছাইলাম, তখন মনে মনে অনেক বিরক্ত ছিলাম। এইসব প্রমোদ ভ্রমণ আমার ভাল লাগে না। তার উপর আসার আগে আসাদের বাড়িতে কত্ত কাহিনি! কিন্তু এই রিসোর্টটা দেখেই আমার খুব পছন্দ হইল। মনে হয় আসাদেরও। আসাদ অবশ্য কিছু বলে নাই।

আমাকেই জিজ্ঞাসা করল পছন্দ হইছে কিনা, কোন ঘরটা নিবে, দুপুরে কী কী খাবে!

সাত ঘণ্টার বাস জার্নি আর দুই ঘণ্টার জাহাজ ভ্রমণের পর ডাঙায় নেমে আবার পঁয়তাল্লিশ মিনিট ভ্যানগাড়িতে চড়ার পরে আমার মনে হইতেছিল শরীরে আর কোনো এনার্জি নাই। কিন্তু এই চমৎকার বাড়িটা দেখে সব ক্লান্তি চলে গেল। সমুদ্রের খুব কাছে বাড়িটা। কোনো হিন্দু ভদ্রলোকের বাড়ি ছিল মনে হয় কোনো কালে। উঠানের মাঝখানে তুলসি গাছটা আর নাই, কিন্তু বেদীমতন একটা জায়গা এখনো রয়ে গেছে। একসময়কার গেরস্থ বাড়ি এখন রিসোর্ট।

ঘরগুলির অবস্থান দেখলে বোঝাই যায়, কোনটা কেমন ছিল। যেমন এই যে বেশ বড় একটা মাঠমতন উঠান পার হয়ে মাঝারি আকারের পুকুর, এটা নিশ্চয়ই এমন জলা পুকুর ছিল না। হয়ত হাঁস ঘুরে বেড়াত ওটার স্বচ্ছ পানিতে—রাজহাঁস। তারপরেই যে ঘরটা এখন রান্নাঘর, সেটা নিশ্চয়ই আগেও রান্নার ঘরই ছিল। কাঠের দোতলা বাড়ির সামনে গোল করে যে দুইটা ঘর সেইগুলা কি আগেও ছিল নাকি নতুন করে বানানো , সেটা অবশ্য আমি ধরতে পারি নাই। দোতলা বাড়িটার দোতলা ঘরটাই আমার চাই, এই কথা আসাদকে বলতেই হেসে ফেলল ওই ম্যানেজার। কী যেন নাম ওর, এখন আর মনে পড়তেছে না। খুব পাজি সেই ম্যানেজার।

এমন সময় আসাদ ডাকল।

—শবনম, এই শবনম? ঘুম ভাঙল তোমার?

ওরে বাবা আসাদ একদম রেডি। মাথায় ক্যাপ। পরনে হাফ প্যান্ট, টি-শার্ট, চোখে সানগ্লাস। হাতে দু্‌ইটা ডাব। ডাবের কাটা মাথা থেকে দুইটা স্ট্র দুইদিকে মুখ করে বের হয়ে আছে। এই কিম্ভূতকিমাকার আসাদকে দেখে হাসি পাইল আমার।

আসাদ মনে হয় একটু বিব্রত হইল। পায়ের খালি জায়গা সুড় সুড় করতেছিল ওর। সেইটা কি পায়ে লেগে থাকা সমুদ্রের বালুর কারণে নাকি আমার এই বাঁকা হাসিতে সেইটা ঠিক বোঝা গেল না। আসাদ কিছু না বলে একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে চলে গেল বারান্দায়। আমি আবার ওই ছাদের দিকে তাকায়া থাকলাম। ভাবতে লাগলাম আরেকটু ঘুমাব কিনা। ঘুমালে আবার খারাপ খারাপ স্বপ্ন দেখব নিশ্চয়ই। কিন্তু স্বপ্ন ছাড়া আর কোথায় আমি পরাগকে দেখতে পাবো? আচ্ছা, পরাগের সাথে কি আর কোনওদিন আমার দেখা হবে না?

(চলবে)