Tag

ইতালি

Browsing

দিনো বুজ্জাতি (১৯০৬-১৯৭২) ইতালিয়ান ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, পেইন্টার, কবি ও সাংবাদিক। তিনি বিখ্যাত তার উপন্যাস ‘ইল দেজ্যার্তো দেই তারতারি’ (তাতার মরুভূমি) এর জন্য। পাঁচটি উপন্যাসের পাশাপাশি বেশ কিছু ছোটগল্প ও কবিতার বই আছে তার; কমিক বুকও লিখেছেন। তার অনেক ছোটগল্পই হরর, ফ্যান্টাসি ও সায়েন্স ফিকশন জঁনরায় লেখা। সমসাময়িক অন্যান্য ইতালিয়ান সাহিত্যিকের তুলনায় ইংরেজি ভাষাভাষীদের কাছে অতটা পরিচিত নন তিনি।

‘মহামারী’ ছোটগল্পটির ইতালিয়ান থেকে ইংরেজি অনুবাদ ১৯৬৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়, অনুবাদক ছিলেন জুডিথ ল্যান্ড্রি। আমি সেখান থেকেই অনুবাদ করেছি। — অনুবাদক


মহামারি

দিনো বুজ্জাতি
অনুবাদ: আয়মান আসিব স্বাধীন

 

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুপ্তসংকেত পরিদপ্তর।
সকালবেলা। কাঁটায় কাঁটায় সাড়ে আটটা বাজে।

দপ্তরের ভেতর বিশাল এক রুমের মাথায় নিজের ডেস্কে এসে বসলেন কর্নেল এন্নিও মোলিনাস। মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বাকিসব কর্মকর্তার মতো তিনিও সাদা পোশাকে আছেন। বিভাগীয় প্রধান হওয়ায় তার ডেস্কটা বাকি সবার চাইতে একটু উঁচুতে পাটাতনের ওপর বসানো, অনেকটা ডায়াসের মতো। ওখান থেকে সবার ডেস্কে সহজেই নজর রাখা যায়। দেয়ালের সাথে লাগোয়া লম্বা শেলফগুলিতে লাইনজুড়ে একের পর এক বই আর দলিল: ডিকশনারি, বিশ্বকোষ, মানচিত্র, নির্দেশিকা, সংবাদপত্রের সেট ও সাময়িক পত্রিকা—রিসার্চ ও রেফারেন্সের জন্য যা কিছু লাগে তার সবই আছে। সুবিশাল এই অফিসটা সাজানোই হয়েছিল আসলে যুদ্ধের জন্য। তবে কাজকর্মে এখন আর আগের মতো সেই গতি নাই। তারপরও বিভাগের সব কর্মীই আছেন। যারা ওখানে কাজ করেন, তারা সবাই নিজেদের বিশেষ কর্মক্ষেত্রে দেশসেরা। মন্ত্রণালয়ের বাকি সবাই তাই ঠাট্টা করে তাদেরকে একসাথে “চব্বিশ জিনিয়াস” বলে ডাকে।

কর্নেল তার গোঁফে হাত বুলিয়ে, ডেইলি রেজিস্টার খুলে, একটু আগে লিখে যাওয়া সেক্রেটারির মর্নিং নোটগুলি পড়ে, রোল কল করার জন্য সামনের দিকে তাকালেন। চব্বিশটার মধ্যে আটটা ডেস্কই খালি।

“উহুম,” নিজের বিশেষ ভঙ্গিতে একা একাই গজর গজর করলেন উনি। সামনের সারিতে বসে থাকা ডিকোডিংয়ের একজন কর্মী কর্নেলের দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত চাউনি দেখে তার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো। সবসময় ফ্রেন্ডলি থাকার পরও সবার সাথে একটা দূরত্ব মেইনটেইন করতেন কর্নেল সাহেব। তিনি মাথা ঝাঁকালেন। তরুণ কর্মীর হাসিটা দুইপাশে আরো ছড়িয়ে গেল: “এইভাবে চলতে থাকলে তো স্যার দুই দিনের মধ্যে পুরা ডিপার্টমেন্ট খালি হয়ে যাবে।” মোলিনাস সাহেব সম্মত হয়ে নিঃশব্দে মাথা নাড়েন।

এই সময় ‘সৈন্যচালনা ও ইন্টারসেপশন বিভাগ’ এর একজন সেক্রেটারি, অদ্ভুত রকমের রোগা ও বুভুক্ষ দেখতে, নাম সব্রিনজেল, ডিকোড করার জন্য হাতে করে একগাদা মেসেজের ফাইল নিয়ে, রুমে এসে ঢুকল। মাঝারি র‍্যাংকের কর্মী হবার পরও সব্রিনজেলকে সবাই বেশ সম্মান করত। কেউ কেউ বলত, ও হয়ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে জড়িত; যদিও এ তথ্য ভুয়া হতে পারে। অনেকে তো ওকে সোজাসুজি গুপ্তচরই বলে। মোট কথা, তাকে ভয় পেত সবাই। ওর উপস্থিতিতে সবাইকে বেশ রেখেঢেকে কথা বলতে হয়।

সব্রিনজেলকে রুমে ঢুকতে দেখে কর্নেল সাহেবের সহজাত প্রতিক্রিয়াই ছিল চটপট করে ‘সাবধান’ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে যাওয়া, যেন সব্রিনজেল তার উচ্চপদস্থ কেউ। কিন্তু নিজেকে সামলালেন উনি। বদলে বেশ চওড়া একটা হাসি দিলেন।

সব্রিনজেল পাটাতনের ওপর উঠে ফাইলটা নামিয়ে রাখল। চোখ টিপে ইশারা করল ডেস্কগুলির দিকে, যার তিন ভাগের এক ভাগই ঠন ঠন করছে। “তো, স্যার, একরকম মহামারীই শুরু হয়ে গেছে মনে হয়, হুঁম?” কোন এক কারণে তার রসিকতাগুলি সবসময়ই দ্ব্যর্থবোধক হয়।

“ইনফ্লুয়েঞ্জা, সব্রিনজেল সাহেব… এই বছর বেশ মহামারী হয়ে গেছে… ভাগ্য ভালো যে এখন পর্যন্ত তেমন ক্ষতিকর রূপ নেয় নাই, তেমন কোনো জটিলতা নাই… চারদিন বিছানায় শুয়ে রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।”

“হুঁম, চার দিন! আবার কখনো কখনো চার বছর, হুঁম!” আড় চোখে তাকিয়ে বলল সব্রিনজেল, বলেই বিশ্রী রকমের হাসি হাসা শুরু করল। রুক্ষ, শুকনো এক হাসি—যার গভীরে একেবারেই কোনো আনন্দ নাই।

মোলিনাস সাহেব বুঝতে পারলেন না। “চার বছর? ইনফ্লুয়েঞ্জা সারতে আবার চার বছর লাগে কীভাবে?”

“হুঁম”—সব্রিনজেলের প্রতিটা কথার শুরু আর শেষে এই অপ্রীতিকর নাঁকি শব্দটা সবসময়েই থাকে—”এটা অবশ্য ঠিক যে এখনো পর্যন্ত অবস্থা বেশ শান্ত আছে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি স্প্যানিশ ফ্লু’টাকেই প্রেফার করি, তা ওইটাতে যত বেশি ঝুঁকিই থাকুক না ক্যান… এই মহামারী যদিও মানুষের বিশাল কোনো বাহিনীকে পরকালে প্রেরণ করতে পারবে না, তারপরও তো অভিজ্ঞতাটা বেশ বিশ্রী, হুঁম!”

“ইনফ্লুয়েঞ্জার অভিজ্ঞতা আরামদায়ক হওয়ার তো কোনো সম্ভাবনা নাই!”

“হুঁম, আপনি তাহলে এই ব্যাপারে তেমন কিছুই জানেন না, স্যার, হুঁম।”

“কোন ব্যাপারে কী জানি না আমি? আর কী কী জানা দরকার আমার?”

সব্রিনজেল মাথা নাড়ল। “গুপ্তসংকেত ডিপার্টমেন্টের হেড হিসাবে—আই মিন, যদি কিছু মনে না করেন—ব্যাপারটা আপনার কাছে একটু টু-মাচ হয়ে যাইতে পারে। আমার অবশ্য ঘটনাটা ধরতে পারার জন্য বাড়তি কোনো হেল্প লাগে নাই।”

“কোন ঘটনা?”

“হুঁম, উঁম—আপনাকে মেবি কথাটা বলা যাইতে পারে। আপনি তো দায়িত্ববান মানুষ, চাপা স্বভাবের লোক… দায়িত্ববান না হইলে কী আর এই পোস্টে আসতে পারতেন—” তারপর একটু সময় নিয়ে চুপ হয়ে গেল সব্রিনজেল। কর্নেলের উৎকণ্ঠা বেশ উপভোগ করছে সে। “কিন্তু স্যার, এই ইনফ্লুয়েঞ্জা যে তার ভিকটিমদেরকে র‍্যান্ডমলি সিলেক্ট করে না, এ ব্যাপারটা কি স্যার খেয়াল করেন নাই, হুঁম?”

“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, মি. সব্রিনজেল…”

“হুঁম, তাইলে আপনাকে ভেঙ্গে ভেঙ্গে বুঝায়ে বলতে হবে। এই যে এসব ব্যাকটেরিয়া না ভাইরাস না কী জানি বলে এগুলাকে… এদের বিশেষ এক ক্ষমতা আছে। ওরা এমন সব লোককে এমনভাবে খুঁজে খুঁজে বাইর করে, মনে হয় যেন তারা ওদের ভিক্টিমদের মনে কী চলতেছিল সেটা আগে থেকেই জানত। ওদেরকে ফাঁকি দেয়ার কোনো উপায় নাই, হুঁম!”

মোলিনাস চোখে ধাঁধা নিয়ে সব্রিনজেলের দিকে তাকালেন, “দেখেন, সব্রিনজেল সাহেব, আপনার হয়তো এখন রসিকতা করার মুড চলতেছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি এমন হেঁয়ালি করে কথা বলতে থাকবেন, ততক্ষণ আপনার একটা কথাও আমি বুঝতে পারব—এমন আশা করবেন না প্লিজ। এমনিতেও আজকে একটু স্লো মনে হচ্ছে নিজেকে… ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই মাথাব্যথা করতেছিল…”

“হুঁম, না স্যার! না! আপনাকে ইনফ্লুয়েঞ্জা ধরবে কেন স্যার? আপনি তো স্বয়ং ডিসিপ্লিনের মূর্ত প্রকাশ, হুঁম!”

“বুঝলাম না, ইনফ্লুয়েঞ্জার সমীকরণে ডিসিপ্লিন আসলো কোত্থেকে?”

“হুঁম, স্যার। আজকে অবশ্য আপনাকে দেখে খুব একটা সুস্থ মনে হচ্ছে না…” গলার স্বর আরো একটু নামিয়ে সব্রিনজেল বলল, “আসলে ঘটনাটা হলো, ফ্র‍্যাংকলি বললে, আপনার যদি ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়, তার মানে আপনি সরকারের বিরুদ্ধ শক্তি।”

“সরকারের বিরুদ্ধ শক্তি?”

“হুঁম, প্রথমে আমারও বিশ্বাস করতে কষ্ট হইছে… কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি বিশ্বাস আনতে বাধ্য হইছি। আমাদের নেতাজীর বুদ্ধিমত্তা যে কোন স্তরের, সেটা বোঝার সাধ্য তো আমাদেরও নাই। গোটা দেশের পালস বোঝার জন্য কী দুর্দান্ত এক আইডিয়া—রাষ্ট্রীয় ইনফ্লুয়েঞ্জা! দারুণ ব্যাপার না? এমন এক ইনফ্লুয়েঞ্জা যা শুধুই হতাশাবাদী আর সংশয়বাদী লোকজন এবং দেশের প্রতিপক্ষ ও লুকায়ে থাকা শত্রুদের ওপর ধরে ধরে অ্যাটাক করে! অন্যদিকে দেশের কাজে সর্বদা নিয়োজিত নাগরিক ও দেশভক্ত যারা, বিবেকবান শ্রমিক যারা—তাদেরকে ওরা ছুঁয়েও দেখবে না।”

এবার কর্নেল তার বিপক্ষ মত দেওয়ার সুযোগ পেলেন: “কিন্তু সব্রিনজেল সাহেব, এরকম কিছু হওয়া কি আদৌ সম্ভব, বলেন? আপনি কি বোঝাতে চাচ্ছেন যে আজকে যারা অফিসে আসতে পারেন নাই তারা সবাই সম্মিলিতভাবে সরকারের বিরুদ্ধ শক্তি?”

“হুঁম, একটু ঠাণ্ডা মাথায় একবার চিন্তা করে দেখেন… আজকে যারা অনুপস্থিত তাদের কথা একে একে ভাবেন দেখি… এর পুরা প্যাটার্ন আপনার কাছে ক্লিয়ার হয়ে যাবে। যেমন ধরেন, ওই যে! ওই ডেস্কটা! ওইটা কার ডেস্ক?”

“লেফটেন্যান্ট রেকরদিনি’র।”

“হুঁম! তো আপনি কি একেবারে কসম খেয়ে বলতে পারবেন যে রেকর্দিনি এই সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধের লোক না? একটু চিন্তা করে দেখেন না, আমি শিওর উনার কোনো না কোনো কাজ দেখে আপনি ঠিকই টের পাইছিলেন… বা উনি হয়তো আপনার সাথে কোনো সিক্রেটও শেয়ার করে থাকতে পারেন, হুঁম…”

“ইয়া আল্লাহ! রেকর্দিনি হয়তো নিজের কাজের ব্যাপারে সবচেয়ে উদ্যমী ব্যক্তি না, কিন্তু তাই বলে কি উনাকে এভাবে অভিযুক্ত করা যায় নাকি…”

“আরে, রাষ্ট্রীয় ইনফ্লুয়েঞ্জা কখনো ভুল করে না। আচ্ছা, ওইপাশের ফাঁকা ডেস্কটাতে কে বসে যেন?”

“প্রফেসর কুয়িরিকো, আমাদের ট্রিপল ড্যাটা এনক্রিপশন বিশেষজ্ঞ। ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে মেধাবী আদমি।”

“ওই তো! হুঁম, তার মানে তো উনার কর্তৃপক্ষের সাথে অলরেডি দুই-একবার গণ্ডগোল হয়ে থাকার কথা! আমার যদ্দুর মনে পড়ে, গত বছর না উনাকে আরেকটু হইলে বরখাস্ত করে দিতেছিল?”

“তা ঠিক,” মাথা নেড়ে সায় দিলেন কর্নেল, “কিন্তু এমন কি হইতে পারে না যে তারা অন্য কোনো রোগে অসুস্থ? এইভাবে অনুমানভিত্তিক ধারণা করে নেওয়া তো ঠিক না মনে হয়… এই সিস্টেমে খুব সহজেই ভুল হইতে পারে আমাদের।”

“তা নিয়ে টেনশন করতে হবে না, স্যার। সেটার জন্য তথ্য বিভাগ আছে না? আপনার রেজিস্টারে দেখেন, যাদের ইনফ্লুয়েঞ্জা হইছে তাদের সবার নাম লাল কালির ক্রস দিয়ে মার্ক করা। একদম পারফেক্ট।”

কর্নেল তার কপালের ওপর হাত ঘোরালেন একবার। যদি আমারও হয়? দুঃশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন কর্নেল সাহেব, আমি তো মনে মনে দুই একবার নেতাজীকে গালিগালাজও করে ফেলছি! আরে, কোন চিন্তা ভালো কোন চিন্তা খারাপ, এভাবে ভাগ করে কি চিন্তা আটকায়ে রাখা যায় নাকি!

“হুঁম, মাথা ব্যথা বলতেছিলেন না, স্যার? আজকে আপনাকে এমনিতেও কেমন ফ্যাকাসে লাগতেছে, হুঁম!” বলতে বলতে আস্তে করে বদখত একটা হাসি দিল সব্রিনজেল।

“না, না, এখন আমি পুরাপুরি ঠিক আছি।” নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন কর্নেল। “একদম ঠিকঠাক, থ্যাংক গড।”

“হুঁম। ঠিক আছে তাইলে, স্যার। আমি আসি আজকের মতো, হুঁম?” আপন মনে হাসতে হাসতে চলে গেল সব্রিনজেল।

পুরো ব্যাপারটাই কি মশকরা ছিল? সব্রিনজেল কি তাকে নিয়ে মজা করার জন্যই এসেছিল? নাকি সরকার মানুষের মতিগতি বোঝার জন্য আসলেই এরকম একটা পৈশাচিক তরিকা বেছে নিয়েছে?

মোলিনাস বেশ কিছুক্ষণ তার অনুপস্থিত আট জুনিয়ারকে নিয়ে চিন্তা করলেন। যতই তিনি ওদের নিয়ে ভাবলেন, ততই তার কাছে পরিষ্কার হতে থাকল যে রাষ্ট্রীয় ইনফ্লুয়েঞ্জা—মহামারীর ঘটনাটা যদি আসলেই সেরকম কিছু হয়ে থাকে—তার ভিকটিমদেরকে বেশ নৈপুণ্যের সাথেই বেছে নিয়েছে। যেকোনো কারণেই হোক, আটজনের প্রত্যেকেরই দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ আছে। ওরা সবাই অনেক বুদ্ধিমান; আর মানুষের পলিটিক্যাল আনুগত্যের প্রশ্নে বুদ্ধিমত্তা তো অবশ্যই একটা নেগেটিভ এলিমেন্ট।

কিন্তু তারপরও কর্নেল সাহেব চিন্তা করলেন, নিশ্চয়ই এসব ব্যাকটেরিয়ারও ভুল হতে পারে? ওরাও নিশ্চয়ই ভুলেতে ইনোসেন্ট মানুষজনের ওপর আক্রমণ করে বসতে পারে? কে জানে, হয়তো আমার ওপরেও করে বসলো? সবার মাথায়ই নিশ্চয়ই কখনো না কখনো নেতাজীকে নিয়ে বিদ্বেষমূলক চিন্তা এসেছে? তার প্রতি সারাক্ষণ শ্রদ্ধা কাজ করতে হবে এমনও তো কোনো কথা নাই। আমি অসুস্থ হয়ে গেলে ওরা কী করবে? বরখাস্ত করে দিবে? কোর্ট-মার্শাল? না, কোনওভাবেই হাল ছাড়া যাবে না, যেমনেই হোক! অসুস্থ হইলে হইলাম।

উনি আসলেও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার মাথাব্যথা আরো বেড়ে গেল। কানের ভেতর ভন ভন করছে। একটু উষ্ণ কোনো জায়গায় বিশ্রাম নেওয়ার চিন্তায় অভিভূত হয়ে যাচ্ছেন বার বার। সব্রিনজেলের রেখে যাওয়া ফাইলটা খুলে দেখতেও বেগ পেতে হলো তাকে। মেসেজগুলি ভালো মতো স্টাডি করে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে রাখলেন। কিন্তু অক্ষরগুলি যেন তার চোখের সামনে দুলে বেড়াচ্ছিল।

একটা পৃষ্ঠাভর্তি দুর্বোধ্য কিছু সংখ্যা দেখার বাহানায় তিনি চোরাগোপ্তাভাবে হাতঘড়িতে সময় মেপে নিজের নাড়ি দেখে নিলেন: আটানব্বই। তাপমাত্রা বেড়ে গেল নাকি? নাকি ভয় থেকে এই অবস্থা?

বাসায় পৌঁছেই দ্রুত থার্মোমিটারটা খুঁজে বের করলেন। পনেরো মিনিটেরও বেশি সময় ধরে থার্মোমিটারটা মুখের ভেতর ঢুকিয়েই রাখলেন উনি। শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট সাহস সঞ্চিত হওয়ার পর মুখ থেকে বের করে থার্মোমিটারের দিকে তাকালেন কর্নেল সাহেব। দম বন্ধ হয়ে আসলো তার: ১০২ ডিগ্রী জ্বর!

ভালোমতো এক ডোজ কুইনাইন খেয়ে, গুম গুম করতে থাকা কান নিয়ে, প্রতি পদে মাথাব্যথায় কুঁকড়ে ওঠে, ওইদিন বিকালে আবার অফিসে ফেরত গেলেন কর্নেল সাহেব।

অদ্ভুত ব্যাপার, কর্নেলের ডেস্কে সব্রিনজেল অপেক্ষা করে আছে। তিনি ঢুকতেই বিদ্বেষভরা চোখে তার দিকে তাকাল সে, “হুঁম, স্যার, মাইন্ড করবেন না প্লিজ… কিন্তু আপনাকে দেখে মনে হইতেছে লাঞ্চটাইমে ওয়াইন একটু বেশিই খেয়ে ফেলছেন… চোখগুলা কেমন ভয়ঙ্করভাবে জ্বল জ্বল করতেছে আপনার, হুঁম।”

“দুই গ্লাসের এক ফোঁটাও বেশি খাওয়ার সুযোগ হয়নি,” সব্রিনজেলের টিটকারি এড়ানোর জন্য বললেন কর্নেল মোলিনাস।

“বাই দ্য ওয়ে, আপনার মাথাব্যথার কী অবস্থা, স্যার?”

“একদমই নাই।” প্রচণ্ড নার্ভাস কর্নেল সাহেব। তিনি এমন ভাব ধরা শুরু করলেন যেন তার হাতে জরুরি কাজের শেষ নাই। রাশি রাশি কাগজের টিলার মধ্যে এধার-ওধার করছেন শুধু।

সব্রিনজেল চলে গেল ঠিকই। কিন্তু কিছু সময় পর আবার ফিরে আসলো। নব নব অজুহাত খুঁজে বার বার সাক্ষাৎ করতে থাকলো সে কর্নেলের সাথে। নিজের দিব্যদর্শন নিয়ে কর্নেলকে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকল সে: কর্নেল সাহেব গলায় ওই স্কার্ফ পরে আছেন কেন? ঠাণ্ডা লেগেছে নাকি? নাকি কাশি আছে? একটু একটু কি গলাব্যথা করছে?

মোলিনাস আত্মরক্ষা করতে থাকলেন ঠিকই, কিন্তু বেশ ক্লান্ত লাগছিল উনার। সব্রিনজেলের কথাগুলি মাথার ভেতর ঘণ্টার মতো বাজতে থাকল। ঘাড়ের দিকটা কেমন ভার হয়ে আছে। কেঁপে কেঁপে দমক লাগছে। বুকের ভেতরটা বদ্ধ হয়ে আছে, জ্বলছে। পুরোদমে ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়ে গেছে তার। কাউকে বলতেও পারছেন না, কারণ তাতে অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যাবে। আর ওই বদমাইশ সব্রিনজেল গুপ্তচরের বাচ্চাটা তো নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছে যে কর্নেলের শরীরের অবস্থা ভালো না। কর্নেল সাহেব কখন বিধ্বস্ত হয়ে পড়বেন সেই অপেক্ষায় আছে শালা!

না, আত্মসমর্পণের সময় আসেনি এখনো। পরদিন তাকে আবারও কর্মরত দেখা গেল। যদিও তার জ্বর তখন প্রায় ১০৩ ডিগ্রিতে চলে গেছে, গলানো সীসার মতো ভারি লাগছে মাথাটা।

“কী ব্যাপার, স্যার? আপনার চেহারাটা কেমন লাল হয়ে আছে, হুঁম?”

“এমনিই ঠাণ্ডা লেগেছে হয়তো,” জবাব দিলেন কর্নেল; এখনি ভেঙে পড়া যাবে না।

“এভাবে কাঁপতেছেন কেন তাহলে, স্যার? হুঁম?”

“কাঁপছি মানে? কই? কী বলছেন এসব আন্দাজি কথা!”

“হুঁম। আপনি অসুস্থ হয়ে গেলে আমার খুবই খারাপ লাগবে, স্যার।”

“ধুরো, যত আন্দাজি কথা আপনার… গলার কাছে ওই এমনিই একটু খচ খচ করছে।”

একশ দুই দশমিক ছয়, একশ দুই দশমিক আট। তারপরও কর্নেল সাহেব একেবারে রোবটের মতো নিয়মানুবর্তী হয়ে সময় মতো অফিসে আসতে থাকলেন। জুনিয়ারদের মধ্যে কাজের ভাগ-বাঁটোয়ারা শেষ করে নিশ্চল হয়ে উনি ডেস্কে গিয়ে বসে থাকেন। শুধু একটু পর পর শুকনো কাশির দমকে অতিষ্ঠ হয়ে যান।

“হুঁম, স্যার, আপনার কি ব্রংকাইটিস হয়ে গেল নাকি?”

“না না। ওই গলায় একটু সমস্যা করছে।… আমি পুরো সুস্থ আছি, দুঃশ্চিন্তার কিছু নেই।”

চতুর্থ দিনে এসে কর্নেল যেন প্রায় হার মেনে নিচ্ছিলেন। “চলেন স্যার, এক কাপ কফি খেয়ে আসি বাইরে থেকে,” সব্রিনজেলের এই নিমন্ত্রণের পেছনে নিশ্চয়ই কর্নেলকে বাগে পাওয়ার ধান্দা ছিল৷ বাইরে তখন তীব্র শীত, আর অফিসের গরমেই তখন কর্নেলের দাঁত ঠক ঠক করছে।

“না, থাক। আজকে অনেক কাজ জমে গেছে।”

“হুঁম, আমাদের বেশিক্ষণ লাগবে না তো… দুই মিনিট।”

“থাক সব্রিনজেল ভাই।”

“আপনার মেবি অসুস্থ লাগতেছে, হুঁম?”

“না না। ওইরকম কিছু না। সব ঠিকঠাক।”

“হুঁম। সরি, স্যার। আজকে আপনাকে কেন জানি খুব মলিন লাগতেছে দেখতে…”

পঞ্চম দিনে এসে তিনি ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছিলেন না আর। জুনিয়ারদের মধ্যে যাদের ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছিল (এখন তাদের সংখ্যা ষোল) তারা কেউই আর অফিসে ফেরত আসেনি। কী হলো ওদের? তাদের বাসায় ফোন করা হলে কোনো এক আত্মীয় ধরে “উনি বাসায় নেই” বলে আর কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই ফোন রেখে দেয়। জেলে ঢুকিয়ে দিল নাকি? পলাতক? নির্বাসনে? মোলিনাস ততদিনে শিওর যে তার নিউমোনিয়া হয়েছে, কিন্তু ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার সাহস নাই। ডাক্তার তাকে দেখলেই রেস্টে পাঠিয়ে দিবে। আবার, ঠিক নাই, মন্ত্রণালয়কেও জানিয়ে দিতে পারে।

ষষ্ঠ দিন। চব্বিশটা ডেস্কই খালি; ওদের সবার ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে। সব্রিনজেলের ঠেসমার্কা চাপা হাসি ওইদিন আরো বিস্তৃত— “হুঁম। তা স্যার, নেতাজী যে ইন্টেলেকচুয়ালদেরকে অবিশ্বাস করার ডিসিশন নিছিলেন, সেই ডিসিশন কি ভুল ছিল বলেন? আমাদের বিখ্যাত গুপ্তসংকেত পরিদপ্তরের আর বাকি রইল কে? ডেলিভারি ম্যান, দারোয়ান, সিকিউরিটি গার্ড আর কেরানিদের মতো সহজ-সরল মানুষগুলাই রয়ে গেছে। ওরাই তো বিশ্বাস করে মনে-প্রাণে। আর জিনিয়াসরা সবাই লুকাছাপা করে খালি। একেকটা জিনিয়াস একেকটা সরকারবিরোধী৷ হুঁম, স্যার, হুঁম। আপনিই শুধু আলাদা। এখনো টিকে আছেন।” সব্রিনজেল চোখ দিয়ে এমন এক ইশারা করল যেন বলতে চাচ্ছে, “আপনিও তো একই গ্রুপের আদমি। আপনারও যাওয়ার টাইম চলে আসছে!”

অষ্টম দিন। বুকে যেন জ্বলন্ত কয়লার স্তুপ, তাপমাত্রা বেড়ে প্রায় ১০৪ ডিগ্রী— তারপরও কর্নেল সাহেব সময়মতো অফিসে এসে ঢুকলেন। ভূতের মতো লাগছে তাকে দেখতে। একটু পরেই সব্রিনজেল এসে পড়বে, তাকে আবারও দক্ষতার সাথে এড়িয়ে চলতে হবে— এ চিন্তাতেই তার বমি বমি লাগছে। কেমন যেন বিশ্রীরকমের মিষ্টি মিষ্টি স্বাদ হ্যান্ড বেসিনের পানির মতো উপরের দিকে উঠে এসে গলার কাছে দলা পাঁকাচ্ছে অনবরত।

কিন্তু আজকে সকালে সব্রিনজেলের আসতে দেরি হচ্ছে। মোলিনাস ভাবলেন, হয়তো ও জানে আমার ইনফ্লুয়েঞ্জা হয়েছে। অলরেডি হয়তো আমার নামে রিপোর্টও করে দিছে। আমার খ্যাতিনাশের আর কিছু বোধহয় বাকি নাই; ক্যারিয়ার শেষ। তাই হয়তো আর আজকে ব্যাটার খবর নাই।

একটু পর নিঃশব্দ ফাঁকা রুমটাতে কারো হেঁটে আসার শব্দ পেলেন তিনি। না, সব্রিনজেল না; ওর কোন চামচাকে ফাইল দিয়ে পাঠিয়েছে।

“সব্রিনজেল সাহেব কোথায়?”

লোকটা হতাশভাবে মাথা নেড়ে বলল, “উনি আসেন নাই আজকে অফিসে। আজকে আসতে পারবেন না, বেডরেস্টে আছেন।”

“বেডরেস্টে কেন?”

“প্রচণ্ড জ্বর আসছে।”

“কী? সব্রিনজেলের জ্বর?”

“উনারেও ইনফ্লুয়েঞ্জা ধরছে। একদম আচানক। ভয়ঙ্কর অবস্থা।”

“সব্রিনজেলের ইনফ্লুয়েঞ্জা? ফাজলামি করছেন নাকি?”

“কেন? এত অবাক হওয়ার কী আছে? কালকেও তো উনার অবস্থা একদমই ভালো ছিল না।”

কর্নেল সাহেব তার চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন। হুট করেই উজ্জীবিত হয়ে উঠলেন তিনি। নিজের ওপর ভরসা পেলেন আবার।

তিনি বেঁচে গেছেন! তিনি জিতে গেছেন! ওই গুপ্তচরের বাচ্চার পতন হয়েছে। তার কিছুই হয়নি। মোলিনাস বেশ ভালো বোধ করা শুরু করলেন। অসুখের আর কিছু বাকি নাই। বুকের ভেতর আর জ্বলছে না, জ্বরও নাই শরীরে। বাজে সময়গুলি শেষ হয়ে গেল তাহলে।

বুক ভরে শ্বাস নিলেন উনি। অনেক অনেক দিন পর আজকে চোখ তুলে জানালার দিকে তাকালেন, দেখলেন, বরফ জমা ছাদগুলি ছাড়িয়ে, আকাশে এক কণা মেঘ নাই; ওই আকাশের নিচে, অনেক অনেক দূরের পাহাড়গুলি তুষার গায়ে চক চক করছে। ওদেরকে দেখে মেঘের মতো লাগছে—পৃথিবীর সকল দুঃশ্চিন্তার উপর দিয়ে ধীরে সুস্থে খুশিমনে ভাসতে থাকা রুপালি মেঘ। তিনি তাকিয়ে থাকলেন। কত দিন হলো ওদের কথা একেবারেই মনে নাই তার? ভাবলেন, আমাদের মানুষদের চাইতে ওরা কতই না আলাদা, কতই না খাঁটি, কত সুন্দর!